শাকম্ভরীর দ্বীপ – ২

স্কুলকলেজের দিনগুলো মনে পড়ে যায় সরিতেরও। যদিও সে স্কুল কলেজি জীবনদর্শন থেকে অনেকটাই দূরে সরে এসেছে। পরিণতমনস্ক হয়ে উঠেছে। তবু! রঞ্জনকে দেখে মনে পড়ে গেল। তাদের যৌথ পরিবার। নিজের তিন ভাই এক দিদি। স্ট্রাগল একটা ছিলই। যৌথ পরিবারের সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে চলার স্ট্রাগল। বাবা-মার উচ্চাশা পূর্ণ করার স্ট্রাগল। মেজ ছেলে হবার দরুণ দাদা বিদেশে চলে যেতে তার অনুরূপ আকাঙ্ক্ষাকে মূলেই বিনষ্ট করতে হল। সে অবশ্য দাদার মতো বিদেশে বসবাস করার কথা ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। সে বাবা-মার দিকটা ভাবতো। তবে বিদেশে যাবার ইচ্ছে ছিল। ছোটভাই বলতো — তুই পিকিউলিয়র মেজদা। কেন কী বৃত্তান্ত কখনও বিশদ করে বলেনি। বোনের বিয়ে হয়ে যাবার পরে তাদের যৌথ বাড়ি ভাগ হল। বাবা মারা যেতে পাইকপাড়ার বাড়ির ভাগ বিক্রি করে মা আর ভাইকে নিয়ে সে সি.আই.টি. রোড পদ্মপুকুর এলাকায় চলে আসে। ভাই এখন চাকরিতে সাময়িক ইতি দিয়ে বাঙ্গালোরে এম.বি.এ. পড়ছে। সে আর মা। সরিৎ বুঝতে পারে ভাই বাইরে কোথাও চাকরি নিয়ে থাকতে পছন্দ করবে। এটা কেন মনে হয়, যুক্তি দিয়ে বোঝানো যাবে না। একটা অনুভূতি। কেউ যদি পাঁচজনের দায়িত্ব নিতে শুরু করে তখন আর যারা আছে তারা দায়িত্ব যত দূর পারে ঝেড়ে ফেলে। এ রকমটাই তার অভিজ্ঞতা। এই নিয়ে সে ভাবে না। তাছাড়া মা বাবা ভাই বোন এগুলোকে সে দায়িত্ব হিসেবে দেখে না, সম্পর্ক হিসেবেই দেখে। কিন্তু জয়পুরে একটা দারুণ প্রোমোশন তাকে প্রত্যাখ্যান করতে হল। মাকে একা থাকতে হবে। সে হোটেলের ভেতরেই কোয়ার্টার্স পাবে, সেখানে মায়ের অসুবিধে হবে। বন্ধু বান্ধবেরা বলে থাকে ওহ সরিৎ! স্যাক্রিফাইসিং টাইপ! সরিৎ এটাকে ঠিক স্যাক্রিফাইস বলে ভাবে না। মায়ের অসুবিধেটা তো তারও অসুবিধে! চাকরি করা কেন? সকলে মিলে আনন্দে থাকা যাবে বলে। সকলের মধ্যে মা তো প্রধান। ভাই যদি এখানে চাকরি নিত সে কিছুদিন জয়পুর ঘুরে আসতে পারতো। আরেকটা বড় লিফট্ নিয়ে কলকাতায় চলে আসা খালি সময় ও ইচ্ছের ব্যাপার। উচ্চতম জায়গায় পৌঁছোতে গেলে একটু ঘোরাফেরা করতে হয়। সেইটা তার সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।

একসময়ে ভালোই খেলাধুলো করতো। এখন এই হোটেল ম্যানেজমেন্টের কেরিয়ারটার এত দাবি যে সময় করে উঠতে পারে না। রঞ্জন কিন্তু খেলছে, খেলে যাচ্ছে। লাকি গাই। ওর এত সম্পত্তি যে ও যেমন খুশি জীবনটা কাটাতেই পারে। ইচ্ছেমতো খেলে বা পড়ে বা বেড়িয়ে। রঞ্জন ন্যাশন্যালসে নামছে এটা তার কাছে খবর। গ্র্যাজুয়েশন শেষ না করেই ও ইংল্যান্ড চলে গেল। কী পড়তে গেল না গেল সে জানে না। কোনও ধারণাই নেই। হঠাৎ উদয়— একেবারে ন্যাশন্যাল চ্যাম্পিয়নশিপ খেলছে! আশ্চর্য! কাজ শেষ করে সাউথ ক্লাবে যখন পৌঁছলো তখন সাত নম্বর কোর্টে খেলছে রঞ্জন। শেষের দিকে জেতার মুখে। গ্যালারি হাততালিতে ফেটে পড়ছে। অন্য ছেলেটি সাউথ ইন্ডিয়ান, রেড্ডি। বয়স বেশ কম। রঞ্জন কিন্তু জিতছে। আসলে ও অসম্ভব বেপরোয়া, ভীষণ সাহসী, নার্ভ কাকে বলে জানে না। ওর ধরনটা হল— জিতবো, জিততেই এসেছি।

তোয়ালে কাঁধে ঘর্মাক্ত কলেবরে ফিরছে রঞ্জন। সরিৎ এগিয়ে এসে হাত ঝাঁকালো— কংগ্র্যা।

ওহ তুমি এসেছো! রঞ্জন খুশি হয়ে বললো— ফার্স্ট রাউন্ড তো সবে হল, রেড্ডি ইনএক্সপিরিয়েন্সড্। এর মধ্যেই নো কংগ্র্যাটস। সেভ ইট।

সরিৎ— রেড্ডি ইজ নট ব্যাড দো। প্রমিসিং। তারপরে তোমার খবরাখবর কী? লন্ডন থেকে কবে ফিরলে?

রঞ্জন— ওহ বহুদিন। দিব্যি দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল, রোম্যান্টিক, ফুল অব অ্যাডভেঞ্চার… দেবী ডাক পাঠালেন। আর ব্যারিস্টার হতে হবে না। ফিরে এসো।

সরিৎ— ও তুমি ব্যারিস্টারি পড়তে গিয়েছিল? শেষ করলে না? যাঃ।

রঞ্জন— আচ্ছা সরিৎ, কামন্ ম্যান তুমি ভাবতে পারো, কালো জোব্বা পরে আমি কোর্টে সওয়াল করছি?

সরিৎ— ক্ষতি কী? আন্যান্য পেশার মতোই একটা পেশা। প্রেস্টিজিয়াস, পেয়িং। রঞ্জন— যদি তোমার তাতে মন বসে— ইয়েস আর নো!

সরিৎ— যদি পছন্দ না হয়েছিল তো অ্যাট্ অল গিয়েছিলে কেন?

রঞ্জন গলা ছেড়ে হেসে উঠলো— আরে বুড়িকে টুপি পরিয়ে বছর পাঁচেক তো ইউরোপ ঘুরে আসা গেল!

সরিতের হাসিটা ভালো করে ফুটলো না। সে বললো— তোমার ইলাসট্রিয়াস ঠাকুমার কী খবর?

মুখোমুখি বসলো দুজনে। রঞ্জন শাওয়ার নিতে যাচ্ছে। যেতে যেতে বলে গেল— অ্যাজ ইলাসট্রিয়াস অ্যাজ এভার। ডমিনেটিং ওল্ড ফুল।

রঞ্জনের ঠাকুমার কথা কিছু কিছু জানে সরিৎ। বিশাল ধনী। নাতিদের জীবনে একমাত্র অভিভাবক। রঞ্জনের কথাবার্তায় কখনও মনে হয় বুঝি রূপকথার ডাইনি। কখনও মনে হয় সেই ভিক্টোরিয় ইংল্যান্ডের ডাচেস-টাচেসের মতো। দুটো ছবির মধ্যে থেকে সত্যি ঠাকুমাকে চিনে নিতে খুব অসুবিধে হয়। ঠাকুমা বলতে যে চেহারাটা ভাসে তার সঙ্গে কিছুতেই মেলানো যায় না।

রঞ্জন চান করে বেরিয়ে এলে সে যেন আগেকার কথার জের টেনেই বললো— আচ্ছা রঞ্জন যে ভদ্রমহিলা তোমাকে এভাবে মানুষ করলেন, নাতি বলতে যিনি পাগল, তাঁকে ওল্ড ফুল টুল বলাটা…টুপি ফুপি পরানো…

রঞ্জন বললো— আরে ওটা আদর। ওল্ড ফুল মানে কী বলো তো! জাস্ট বুড়ি। বুড়িয়া…। আদর করেই বলছি, তবে কতদিন বলতে পারবো জানি না।

সরিৎ জিজ্ঞেস করলো— মানে?

রঞ্জন হাতের একটা ভঙ্গি করে বললো— আরে ছোড়ো ইয়ার। ইয়াং ম্যান, এখন ঠাকুমা দিদিমা…ধুৎ সময় নষ্ট। এখন হোটেলে ফিরবো। কষে একটা সাঁতার দেবো। কাল সজ্জনের সঙ্গে খেলা, সজ্জন সিং। ভীষণ টেনাসিটি।

সরিৎ বললো— হোটেলে কেন? তোমার সেই থিয়েটার রোডের ফ্ল্যাট কী হল?

রঞ্জন বিরক্ত একটা মুখভঙ্গি করলো, বললো— তবে আর বলছি কী! তার চাবি বুড়ি আমায় দেয়নি এবার। কলকাতায় আসা খুব অপছন্দ। ওখানে থাকতে হবে সারাবছর। এস্টেট চালানো শিখতে হবে। ক্যান য়ু বিলিভ ইট? আরে বাবা তাহলে হস্টেলে রেখে বেস্ট স্কুল কলেজে পড়ালো কেন? ওইখানে জংলি নায়েব-গোমস্তা হতে হলে এত কী দরকার!

সরিৎ চিন্তিতমুখে বললো— তুমি বুঝিয়েছো?

বুঝোই নি? বলে সবই নাকি এস্টেটের ওভারল তদারকির জন্যে লাগবে।

ওভারল তদারকি…তুমি কেন? তোমার ওপরেও তো দুই দাদা।

ওদের তো যুতে দিয়েছে। দাদা এলাহাবাদ, কানপুর…রিয়্যাল এস্টেট। মেজদা আছে শিলিগুড়ি, ছোট কলকাতা-সুন্দরবন করছে সমানে। সে বটানি পড়েছে। সুন্দরবনে হাজার রকম স্টাডির খোরাক পায়। তা তাকে বসাও না, কী যে বুড়ির বাই। আমাকে না দেখে উনি নাকি থাকতে পারেন না।

সরিৎ বললো— আনফর্চুনেট। তবে উনি আর কতদিন? আশি টাশি তো হল!

রঞ্জন তেতো হাসি হাসলো একটা— আশি এখনও হয়নি, তবে আশি-নব্বুই-একশ হতেই বা অসুবিধে কী? বুড়ির মাসিওর, ইয়োগা, ফোসিয়্যাল সব আছে, হুইল চেয়ারে বসে গেছে তাই, নইলে বয়স বুঝবে না। চলো না একবার দেখিয়ে নিয়ে আসি, কী জিনিস!

লোভ হয় দেখে আসতে, তা যদি বলো রঞ্জন। একজন আশির কাছাকাছি মহিলা একা সুন্দরবনের একটা দ্বীপে বসে সাম্রাজ্য পরিচালনা করছেন, রিমাকে। তোমাদের কারো মধ্যে এই ক্ষমতাটা উনি বোধহয় দেখতে চান বা তৈরি করে দিয়ে যেতে চান।

— টু হেল উইথ ইওর ক্ষমতা সরিৎ— ইন দ্যাট কেস— আমি না হয় তোমার নামটাই ওঁর কাছে রেকমেন্ড করে পাঠাই। কী বলো? রাজি?

সরিৎ একটু অন্যমনস্ক হাসলো। বললো— নিজের রক্ত যখন নিজেকে বোঝে না চেনে না…আনফর্চুনেট। রঞ্জন আমাকে দিয়ে ওঁর কাজ হবে না, কাজটার জন্য উনি নিজের রক্তের সম্পর্ক চাইছেন। এইটাই তুমি বুঝছো না। আচ্ছা আজ চলি। উইশ ইউ অল সাকসেস।

বাইরে বেরিয়ে এলো সরিৎ। ঝকঝক করছে আজ রাস্তাঘাট। প্রাক-ডিসেম্বরেও বৃষ্টি পড়ে আবহাওয়া পরিষ্কার হয়ে গেছে। গরমের ভয়াবহতা নেই। কিন্তু শীতও নেই তাই বলে। অদ্ভুত ছেলে এই রঞ্জন। বিশাল ধনী ঘরের ছেলেরা যেমন হয়। সেই অহঙ্কার, বেপরোয়া ভাব, কিন্তু এটা তো স্বীকার করতেই হবে যে সে আপাদমস্তক খেলোয়াড়। নানা বিষয়ে রঞ্জনের শখ, আগ্রহ। এটা তো ওরা অনেকদিন থেকেই জানে। অ্যাস্ট্রনমি। তারা দেখতে ভালোবাসে রঞ্জন। ও বিষয়ে পড়াশোনাও যথেষ্ট। এটা রঞ্জনের একটা গভীরতার দিক। স্কুল কনসার্টে পিয়ানো বাজাতো রঞ্জন, দারুণ গলায় গাইতো। মেয়েরা তো বটেই ছেলেরাই রঞ্জন বলতে পাগল ছিল। অথচ এত খেলাধুলো গানবাজনা, আকাশবিজ্ঞান সব গুলোই শুধু শখ, শখের চর্চা। শখের চর্চা করতে করতেই ন্যাশন্যালস্— এ খেলতে চলে এলো। তাহলে সত্যিকারের চর্চা করলে কী না হতে পারতো! জীবিকা অর্জনের তাড়া বোধহয় আমাদের সবচেয়ে বড় তাগিদ। আজকাল। যাতে সত্যিকার আগ্রহ বা ভালোবাসা আছে সে সব পেছনে ফেলে কিসে উপার্জন বেশি হবে, সামাজিক মানমর্যাদা ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে এই তাড়াই আমাদের অন্যদিকে নিয়ে চলে। সে নিজে তো চুপি চুপি কবিতা লিখতো, লিটল ম্যাগাজিনে বারও হত সেগুলো। একটা সময় কবিতা ছিল দারুণ একটা প্যাশন। পাগলের মতো পড়তো। কিন্তু কখনও ভাবতে পারেনি, অন্য কিছু না করে কবিতা চর্চাতেই মন দেওয়া যাক। বললে, লোকে পাগল ভাবতো। সেই অখ্যাত কিন্তু হতে-পারতো সার্থক কবি পরিষেবার চাকরিতে চলে এলো। ভেবে দেখতে গেলে এটা কি একটা জীবিকা হল? চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, আইনজ্ঞ এসব হবার জন্য হয়তো কবিতা বিসর্জন দেওয়া যায়, কিন্তু পেশাদার আতিথেয়তা? এটা কি একটা যথেষ্ট কারণ হল? ক্ষতিপূরণ হল? রঞ্জন সোনার চামচে মুখে নিয়ে জন্মেছে। জীবিকার তাড়না নেই। এটা যে কত বড় ভাগ্য! নিজের পছন্দমতো গ্রহ তারা দেখে। টেনিস খেলে, গান করে শুনে জীবন কাটানোর যে সুযোগ সে পেয়েছে তার সদব্যবহার করবে না-ই বা কেন? সবাইকেই কিছু না কিছু হতে হবে তার কী মানে আছে? আসল হল আনন্দ পাওয়া, জীবনটাকে তিলতিল করে উপভোগ করা কী জিনিস সেটা রঞ্জনের চলাফেরা চেহারা দেখলেই বোঝা যায়। শুধু একটাই কথা। একটু অন্তত দায়িত্ব নিতে তোমাকে হবে। আর একটা কথা। তোমার স্বাধীনতা, তোমার উপভোগ যেন অন্যের ক্ষতির কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। সত্যি, নির্দায় উপভোগ ভালো না দায়যুক্ত নিরানন্দ ভালো? বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছোতে পৌঁছোতে সে স্থির করে ফেললো একটা মাঝামাঝি কিছু চাই। এই যে সে আজ বাড়ি ফিরছে, দিদি আর ভাগনে আসার কথা আছে। মায়ের সঙ্গে ওরা নিশ্চয়ই এতক্ষণে গল্প জুড়ে দিয়েছে। বাড়ির ভেতরে পা রাখলেই পরিচিত প্রিয় কণ্ঠগুলো তাকে ঘিরে ধরবে। মার একটু একা-একা লাগতে শুরু করেছে। দিদি এলে মুখটা এক্কেবারে বদলে যায়। গাড়ি গারাজ করে সে খুশি মনে ওপরে উঠতে লাগলো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *