১০
আষাঢ় মাসের এক বিকেলে সুমনা হঠাৎ ইন্টারকমে সরিৎকে ডাকলো। ডাকটায় কিছু ছিল। সরিৎ হাতের কাজ না সেরেই বেরিয়ে এল। সুমনার ঘর উল্টো দিকে। ঢুকে দেখে সে কাজ করছে না কিছু। গালে হাত দিয়ে শুকনো মুখে বসে আছে।
কী ব্যাপার সুমনা? মেয়ে ঠিক আছে তো?
হ্যাঁ। ক্রেশ-এ বেশ মানিয়ে নিয়েছে। কিন্তু… কিন্তু কী?
রঞ্জন ফেরেনি এখনও।
কত দিন?
উইক এন্ডে গেল, আরেক উইক এন্ড পেরিয়ে গেল। একটা খবর না। কিছু না। সরিৎদা ও বোধহয় আমাদের ভুলে যাচ্ছে। বলতে বলতে তার চোখ উপছোতে লাগল।
তোমার এমন মনে হবার কোনও কারণ আছে সুমনা?
না, ও তো বলে ট্রাস্ট মি, হ্যাভ ফেথ ইন মি, তোমার হক আমি ছিনিয়ে আনবোই। আমি হক-টক বুঝি না সরিৎদা। ও থাকলেই আমি খুশি।
সরিৎ হালকা গলায় বললো— দূর, ও একটা খ্যাপা, তুমি ওর জন্যে ভেবো না। চাকরি টাকরি করা ওর ধাতে নেই। তিন বছরে দু বার পাল্টালো। তা ছাড়া….
সরিৎদা আজ আমার সঙ্গে একটু বাড়ি যাবে?
রঞ্জনের অনুপস্থিতিতে যাওয়াটা কি ঠিক হবে?
সুমনার মনে পড়ে গেল সে সরিৎকে কিছু কড়া কথা শুনিয়েছে। ম্লান মুখে বললো— ডাকলেও আসবে না আর? টুকটুক বাড়ি ফিরেই তোমায় খোঁজে।
কী করে বুঝলে?
দাদা দাদা করে কাঁদে।
সরিতের মুখটা স্নেহের হাসিতে ভরে গেল। বললো— ডবল প্রোমোশন? কাকা মামা টপকে দাদা?
সুমনা বললো— দাদা মানে দাদু নয়, আমি সরিৎদা বলি, ও-ও ইৎ-দা ইৎ-দা বলে।
সরিৎ বললো— যাক আশ্বস্ত হলাম। চলো পুঁচকেটাকে দেখে আসা যাক। সুমনার মন খারাপ। এতদিন রঞ্জন আসছে না সেটা একটা ভাবনা। রঞ্জনের চাকরির কোনও উন্নতি হচ্ছে না সেটাও আরেক ভাবনা। সরিৎ তাকে নানাভাবে আশ্বস্ত করতে চেষ্টা করে। বলে— অত বলিয়ে কইয়ে ছেলে। চাকরিতে মন বসাতে ওর দেরি হচ্ছে। যখন উন্নতি হবে ওকে আর কেউ আটকাতে পারবে না। আসলে অন্যভাবে মানুষ তো। যা চেয়েছে সব চিরদিন পেয়ে গেছে। দায়িত্ববোধটা এখনও ঠিক আসেনি। খ্যাপাটেও বটে! সব ঠিক হয়ে যাবে। অত ভেবো না।
সত্যি বলছো?
না তো কী!
যাক, আকাশ কালো করে আসছে সুমনা, সরিৎ বললো— আজ উঠি সাবধানে থেকো। সরিৎ চলে গেল। সুমনার মন থেকে যেন একটা বিশাল ভার নেবে গেছে। সে গান চালিয়ে দিল। মেয়ের সঙ্গে খুব খানিকটা হুল্লোড় করল। তারপর মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে গল্পের বই পড়তে লাগলো। আগাথা ক্রিস্টি। অনেক রাত বৃষ্টি নামছে দেখে জানলা বন্ধ করে সে শুয়ে পড়লো।
গভীর রাত। কোথায় কাদের জানলা খটাস খটাস করে পড়ছে। একটানা বৃষ্টি আর ঝড়ো বাতাসের শব্দ। মাঝে মাঝেই সুমনার ঘুম ভেঙে যাচ্ছে, কোথাও যেন কে কার দরজায় প্রবল ধাক্কা দিচ্ছে। ঘুমের মধ্যে তলিয়ে যায় সে, তারপর আবার শব্দে উঠে বসে। বেড সুইচটা টিপে দেয়। আলো জ্বলছে না। পাওয়ার কাট। এই সময়ে সে স্পষ্ট শুনতে পেল তাদেরই দরজায় ধাক্কা পড়ছে। কী করবে সুমনা? উঠে বসে সে কোনমতে একটা টর্চ হাতড়ায়। দরজার কাছে যায়। কান পাতে। সুমনা! সুমনা! তাহলে রঞ্জন ফিরলো? এই এত রাতে, দুর্যোগে। সে আইহোলে চোখ রাখে, হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলকে ঝলসে ওঠে পরিচিত ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল। সে দরজা খুলে দেয়— রঞ্জন! তুমি এত রাতে! তাড়াতাড়ি ঢুকে এসো।
রেনকোটের প্রান্ত থেকে জল ঝরছে, মাথার চুল বিস্রস্ত ভিজে। রঞ্জন অন্ধকারে ঢুকে আসে। বলে— আমি রঞ্জন নই! অর্জুন। রঞ্জনের ছোট ভাই।
হঠাৎ সুমনার কেমন শীত করতে থাকে। সে বিস্ফারিত চোখে শুধু চেয়ে থাকে। অর্জুন বলে— একটা খুব খারাপ খবর আছে। ম্যাডাম আপনি…মানে রঞ্জন, প্লিজ বি স্টেডি…রঞ্জন অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে। একেবারে হঠাৎ।
সুমনা টলছে। অর্জুন খেয়াল করছে না। বলে যাচ্ছে নেশাগ্রস্তর মতো। আপনার… জানা উচিত সবটা। বুঝলেন! ভালুকটিলা বলে একটা জায়গা আছে, ওখানে উঠলে নদী খুব ভালো দেখা যায়। আকাশও… প্রায়ই যেত। কীভাবে পা ফসকে নিচে পড়ে যায়। মানে কেউ জানেই না…ভীষণ কুমির…. নো হেলপ্…।
সুমনা পড়ে যাচ্ছে। অর্জুন ধরে ফেলছে। ঘরের ভেতর এসে কৌচের ওপর শুইয়ে দিচ্ছে। বাইরের দরজা বন্ধ করল। এবার কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাঁক দিল— কেউ আছেন? কোনও সাড়া নেই। হঠাৎ আলো চলে এল। সে দেখতে পেল সুমনার মোবাইল ফোন চার্জে বসানো আছে। তুলে নিয়ে স্টোরটা পরপর দেখে যায়। সরিৎ বিশ্বাস। সরিৎ..সরিৎদা নাকি? সে বোতাম টেপে।
হ্যালো!
— আমি অর্জুন বলছি।
— প্লিজ, কাল করবেন। এত রাতে…
— আমি রঞ্জনের ভাই অর্জুন বলছি—
সরিৎ বিছানায় উঠে বসলো। কানে মোবাইল।— কে বললেন?
— রঞ্জন নারায়ণের ভাই, জেভিয়ার্সের সরিৎদা তো আপনি?
— হাঁ।
— রঞ্জনের বন্ধু তো!
— হ্যাঁ।
— আমি অর্জুন। সরিৎদা রঞ্জন ইজ নো মোর।
— কী বললে?
— ইট ওয়জ আ ন্যাস্টি অ্যাকসিডেন্ট।
— কোথা থেকে বলছ?
— রঞ্জন-সুমনার বাড়ি থেকে। সুমনা সেন্সলেস হয়ে গেছে। আমি বুঝতে পারছি না কী করবো।— পুরো সময়টা অর্জুনের গলা কাঁপছে।
— হাউ ডেয়ার য়ু? এই খবর নিয়ে সুমনার বাড়ি এত রাতে! তুমি কি মানুষ? মাই গড। ওহ মাই গড। আমি এক্ষুনি আসছি। দিস মোমেন্ট।
