শাকম্ভরীর দ্বীপ – ১৫

১৫

ভোর হচ্ছে। পাখির ডাকে ভরে যাচ্ছে চতুর্দিক। এত ডাক এত ডাক যে ঘুম ভেঙে যায়। ক্রমশ চারদিক ঝলমল ঝলমল করে। রাজেশ্বরীর ঘর অফিস ঘরের সংলগ্ন। তিনি ব্রেকফাস্ট সারছেন। তাঁর সঙ্গে খাচ্ছে তেজস্বিনীও। একটু দূরে নার্স মহিলা দাঁড়িয়ে। খাওয়া পরিপাটি করে শেষ করে ন্যাপকিন দিয়ে মুখ মুছলেন। বললেন— জিনি, ওর ব্যবস্থা!

তেজস্বিনী বললো— ঠিক আছে। ব্রেকফাস্ট পাঠানো হয়েছে।

কে গেল?

হরিহর।

হরিহর যাক। তোমার একবার যাওয়া উচিত। সেটা তুমিও ভালোই জানো। ও আমাদের অতিথি। সবাইকার কাছে তোমাকে হোস্টেস বলে প্রেজেন্ট করছি। তার গুরুত্ব বোঝো?

তেজস্বিনী চুপ করে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে।

রাজেশ্বরী নরম গলায় বললেন— বুঝতে পারছি কোথায় তোমার লাগছে। কিন্তু দা কিং ইজ ডেড, হি ইজ নো মোর। আর কী এসে যায়! মৃত্যুর পর আর কোনও ভালোবাসা নেই, প্রত্যাশা নেই, প্রত্যাখ্যান নেই, হতাশা নেই। হিংসা অর্থহীন। থেকে যায় শুধু স্তব্ধতা। শান্তি হয় তো নয়। কিন্তু স্তব্ধতা। সব প্রশ্নের সমাধি। জিনি নিজেকে কনট্রোল করো। তুমি দুর্বল চরিত্রের মেয়ে হলে আমার সবচেয়ে দরকারি, সবচেয়ে গোপন কাজগুলো তোমাকে দিয়ে করাতাম না। য়ু আর আ জুয়েল অব আ উওম্যান। নাউ নাউ জিনি কনট্রোল ইওরসেলফ। অতীতকে অতীতে থাকতে দাও। এখন গিয়ে দেখো ও খেলো কি না। ভালো লাগল কিনা, তারপর ওকে ডাকো। ওর সঙ্গে আমি কথা বলতে চাই। শী ইজ ভেরি ইমপর্ট্যান্ট ফর মাই ফিউচার প্ল্যানস।

গীতা! এগুলো নিয়ে যাও।— নার্স ব্রেকফাস্টের ট্রে সব নিয়ে গেল। রাজেশ্বরী হুইল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে জানলার কাছে গেলেন, কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন স্নিগ্ধ বনভূমির দিকে। কাল রাতে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে মনে হচ্ছে। তার পর তিনি আবার চাকা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অফিসঘরে গেলেন। সেক্রেটারিয়েট টেবিল নয়। কিছুদূরে সোফা-কৌচ পাতা, নিচু টেবিলের ওপর ডোঙার মতো ফুলদানি ভর্তি টাটকা ফুল। সেখানে এসে চাকা থামালেন। মিনিট পাঁচ ছয় পরেই সুমনা ঢুকলো।

সে চান সেরেছে। চুল খোলা ভিজে। সে সালোয়ার কামিজ পরে এসেছে। দেখাচ্ছে আরও ছেলেমানুষ, সজীব। কোনও প্রসাধন করেনি।

বসো। তেজস্বিনী-ই-ই।— একদিকের দরজা দিয়ে তেজস্বিনী ঢুকে আসে।

সুমনা বললো— আমি বসতে আসিনি ম্যাডাম। আমি চলে যেতে চাই। এক্ষুনি।

কেন? আশ্চর্য হয়ে উনি বললেন— তোমার সঙ্গে কেউ খারাপ ব্যবহার করেছে?

দেখুন, প্রথমত আপনি কোনদিন আমাকে স্বীকার করেন নি। বারবার রঞ্জনকে ডেকেছেন, আমাকে ডাকেন নি, সেটা আমার পক্ষে চূড়ান্ত অপমান। রঞ্জনও তাই মনে করতো। এনিওয়ে। আজ কেন ডাকছেন আমি এখনও বুঝতে পারছি না। ডাকলেন, লিখলেন নাকি আমার জন্য সব ব্যবস্থা থাকবে। কোথাও কিছু ছিল না। ক্যানিং-এ কোনও লঞ্চ না, ফেরি ঘাটে কোনও লোক না। কেউ দরজা খুলে অভ্যর্থনা করেনি। পথ দেখিয়ে দেয়নি। আমি তো আসতে চাইছি না। শুধু শুধু এতটা পথ এসে এই অবজ্ঞা সইবার কোনও মানে আমি দেখতে পাচ্ছি না।

— চুপ করো। চুপ করো মাই গার্ল। কী বললে? আমি তোমাকে কোনদিন ডাকি নি? রঞ্জনকে একা ডেকেছি? দ্যাটস আ লাই। আমি প্রত্যেকবার তোমাকে ডেকেছি। দেখতে চেয়েছি! প্রত্যেকবার! জিনি!

তেজস্বিনীর মুখ অস্বাভাবিক সাদা দেখাচ্ছে।

— ওই চিঠিগুলোর কপি আছে?

না।

কেন?

কত জাংক জমাবো? মাঝে মাঝে তো সাফ করতেই হয়!

সুমনা তোমার কাছে আছে?

না। চিঠি রঞ্জনের কাছেই আসতো, ও-ই পড়তে, প্রচণ্ড রেগে যেত। ও ও আসতে চাইত না। আমিই জোর করে পাঠাতাম। এখন সেসব কোথায় গেছে আমার জানা নেই।

সেকেন্ডলি কী যেন বললে? ক্যানিং-এ শাকম্ভরী সার্ভিসের কোনও লঞ্চ ছিল না? ফেরিঘাটে তোমাকে নিতে কেউ যায়নি? কালও বলেছিলে বটে। জিনি-ই! এসব কী?

— ইনস্ট্রাকশন দেওয়া আমার কাজ। দিয়েছি। বাড়ির মধ্যে গেস্টরুম গুছিয়ে রাখার কথা রেখেছি। সুবিধে-অসুবিধের খোঁজ নিয়েছি। কাল রাতেও। যদি কোথাও কমিউনিকেশন গ্যাপ হয়ে যায় দুঃখিত, এখন আমার জরুরি কাজ আছে। যেতে পারি?

—যাও।—তেজস্বিনী খটখট করে চলে গেল। তার কথাবার্তা, চলন সব কিছুতেই একটা বিদ্রোহ।

তেজস্বিনীর যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বৃদ্ধা বললেন— উদ্ধত। ইমপার্টিনেন্ট। রঞ্জন আমারই রক্ত। সে কখনও ইমপার্টিনেন্স অ্যারোগ্যান্স সইবে না। সুমনা তুমি শুধু আজ কেন কালও যেতে পারছো না। কোনও লঞ্চ আসবে না। কাল আমার জন্মদিন। দিনটা খুব ইমপর্ট্যান্ট। কেন সেটা সেই দিন বুঝতে পারবে। তার আগে নয়। কদিন এখানে থাকবার জন্য প্রস্তুত হয়ে এসে না থাকো তো, তোমার সাইজের সালোয়ার কামিজ, জি-টপ যা তোমরা পরো এবং শাড়ি সব আছে, ভর্তি তোমার ওয়ার্ডরোব। প্রত্যেক জন্মদিনে যেমন রঞ্জনকে দিয়েছি তেমন তোমার জন্যেও কিনেছি, করিয়েছি। তুমি এখন যেতে পারো।

উনি বেল টিপতে যাচ্ছিলেন। সুমনা বললো— আমি একাই যেতে পারবো।

পারবে জানি। কিন্তু রতনলাল তোমার সঙ্গে সবসময়ে থাকবে এই আমার হুকুম। যেখানে খুশি যাও। যা খুশি করো। ঘুরে দেখো এই দ্বীপ। খালি আমার ব্যবস্থা মানতে হবে।

নিজের ঘরে গেল সুমনা। রতনলালের সঙ্গে। ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। এর মানে? উনি বলছেন উনি প্রথম থেকে তাকে ডেকেছেন? অথচ চিঠি সে ভাবে লেখা হয়নি! মিথ্যেটা কে বলছে? উনি না তেজস্বিনী? সমস্ত ব্যবস্থা উনি তেজস্বিনীকে করতে বলেছেন। সে-ও যথাযথ নির্দেশ দিয়েছে। অথচ নির্দেশ মানা হয়নি। কে মাঝখান থেকে এসব ভণ্ডুল করলো? হঠাৎ তার কী মনে হল, ওয়ার্ডরোবটা খুলল। হ্যাঙারে সারি সারি সালোয়ার কুর্তা। শাড়ি, জিনস, টি-শার্ট। আশ্চর্য এটা তো তাহলে উনি মিথ্যে বলেন নি! নাকি এও একটা চাল! ঠিক আছে রাজেশ্বরী ঠাকুরানী তোমার আলমারির একটা পোশাক আমি পরছি। সে একটা জিনস ও টি-সার্ট-এর সেট বার করে নিয়ে পরলো। নিজের ব্যাগের মধ্যে থেকে বাইনোকুলার বার করে গলায় ঝোলালো। ছুরিটা ক্লিপ টিপে রাখলো প্যান্টের পকেটে। বেরিয়ে পড়লো। সঙ্গে চললো রতনলাল।

কে যেন বলেছিল? রঞ্জনই বোধহয়— জঙ্গুলে চেহারাটা উনি সাবধানে বজায় রাখেন? সত্যি! ওঁর বাড়ির চারপাশের উদ্ভিদ একরকমের। সে চৌহদ্দি পেরোলেই সুন্দরবন, ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। হেঁতালের বড় বড় ঝোপ। সুন্দরী গাছ। গরান। এ ছাড়াও আছে শিশু, পাকুড়, প্রত্যেকটি টাইপের গুঁড়িতে নাম লেখা। নদীর কাছাকাছি যেতেই উঁচিয়ে থাকা শূল দেখতে পেল সে। রতনলালের ইঙ্গিতে পেছনে হঠে এল।

— আচ্ছা রতনলাল, তোমাদের এখানে ভালুকটিলা বলে একটা পাহাড় আছে? রতনলাল উঁচু করে দেখায় হাত নেড়ে না না করে, তারপর আরেকটু নিচু করে হাতটা। বারবার। একটু চেষ্টা করে সে বুঝতে পারে ও বোধহয় বলতে চাইছে। পাহাড় নয়, ঢিপি।

ভালুকটিলায় নিয়ে চলো তো!

এমন সময়ে পেছনে গলার আওয়াজ শোনা যায়। প্রদীপ আর অর্জুন।

— কী? এক্সপ্লোর করতে বেরিয়ে পড়েছো? সুমনা? ওদের গলায় হালকা খুশি।

সুমনা হতাশ মুখে বললো— আপনারা?

অর্জুন বললো— এই সময়টা আমরা বাইরেই ঘুরি। ভেতরে তো তেমন কিছু করবার নেই। ইনডোর গেমস আছে অবশ্য।

প্ৰদীপ বললো— সুমনার তো খেলাধুলোর অভ্যেস আছে। বিলিয়ার্ডস খেলো?

  • চেষ্টা করে দেখতে পারি। কখনও খেলিনি।

— তুমি ভালো করে ব্রেকফাস্ট খেয়েছো তো?

  • হ্যাঁ। অনেকক্ষণ।

অর্জুন পকেট থেকে একটা পাউচ বার করে। ভেতরে মেওয়া রয়েছে। সে সুমনার হাতে সেটা দিতে যাচ্ছিল, রতনলাল বিদ্যুদ্বেগে এসে সেটা ছিনিয়ে নেয়। অর্জুন রাগত গলায় বললো— এটা কী হল রতনলাল?

রতনলাল আঙুল দিয়ে বাড়ির দিকে সেখায়। সুমনার দিকে দেখায়, মুখের দিকে আঙুল তাক করে, তারপর দুহাত নেড়ে না-না করতে থাকে।

প্রদীপ বললো— ঠাকুমা ওকে সুমনার বডিগার্ড করে পাঠিয়েছেন অর্জুন। কারো দেওয়া খাবার যেন সুমনা না খায়। নির্দেশ আছে।

লাল হয়ে গেছে অর্জুন। বললো— বশ অ্যান্ড ননসেন্স। এর মানে কী? আমরা সুমনাকে খারাপ কিছু দেবো?

প্রদীপ বললো— রাগ করো না। তুমি তো ওঁকে জানো। কিছু একটা মাথায় খেলেছে। আফটার অল শী ইজ এইট্টি।

তাই বলে… তাই বলে ভাববেন সুমনাকে আমি বিষ দিতে পারি?

মেওয়াগুলো তুমি কোথা থেকে এনেছো?

স্টোর থেকে। অবভিয়াসলি।

তাহলে?

কী তাহলে?

তুমি যে বললে উনি ‘তোমাকে’ সন্দেহ করছেন, কথাটা ঠিক নয়।

সুমনা হকচকিয়ে গিয়েছিল। এখন সুযোগ বুঝে বললো— রতনদা আমাকে ভালুক টিলায় নিয়ে চলো।

সঙ্গে সঙ্গে দু ভাইয়ের কথা কাটাকাটি থেমে গেল। অর্জুন বললো— ভালুক টিলা? তুমি ভালুকটিলায় যাবে কেন সুমনা?

সুমনা একটু চুপ করে রইল, তারপর বললো— এমনি

প্রদীপ আস্তে আস্তে বললো— আমি বুঝতে পারছি অর্জুন, ও কেন যেতে চায়। তার সমস্ত মুখটা কষ্টে বিকৃত হয়ে যায়। যেন অনেক চেষ্টায় কান্না থামিয়ে রেখেছে।

অর্জুন বললো— না। যেতে যদি হয় আমরা তোমার সঙ্গে যাবো। জায়গাটা ভালো না। প্রচুর বিছুটি গাছ। জোঁক। রাতে রীতিমতো শেয়ালের আড্ডা বসে।

সুমনা বললো— আমি যাবো। যদি কোনও সূত্র পাওয়া যায়।— তার গলা খুব শান্ত। আপনারা যেদিকে যাচ্ছিলেন যান না।

এই সময়ে অদূরে কুকুরের ডাক শোনা গেল। অ্যালসেশিয়ানের চেন হাতে উদয় হল প্যান্ট পরা রাখী ও সালোয়ার ঢোলা কুর্তা পরা শর্মিষ্ঠা।

সুমনা ভদ্রতা করবার কোনও চেষ্টাই করলো না।

শর্মিষ্ঠা বললো— গুড মর্নিং সুমনা।

রাখী বললো— হ্যালো।

অর্জুন বললো— তোমরা?

রাখী একটা ভ্রুভঙ্গি করলো— নতুন হলে না কি? সকালে ওই হানাবাড়ির মধ্যে বসে কি তাস খেলবো?

শর্মিষ্ঠা বললো— এই সুমনা, তুমি ডেফিনিটলি আমাদের ওপর রাগ করেছো। প্লিজ রাগ করো না। কত বড় দিদি তোমার, বলো! আমাদের এই অ্যালসেশিয়ান গ্যারি কিন্তু গোমড়ামুখ দেখলেই কামড়াতে যায়।

সুমনা বললো— আপনি কি আমায় ভয় দেখাচ্ছেন?

ওমা! কথা শোনো মেয়ের। ভয় দেখাবো কেন? তুমি একটু হাসো প্লিজ। এত সীরিয়াস থেকো না সবসময়ে।

রাখী বললো— আসলে আমরা তোমাকে ভোলাবার চেষ্টা করছি ভাই। অনেস্টলি। তিন বছর হয়ে গেল। এখনও যদি তুমি এ রকম…

সুমনা বললো— আপনাদের তিনবছর আর আমার তিনবছর এক নয়। রতনদা, চলো।

রাখী শ্রাগ করলো। শর্মিষ্ঠার দিকে তাকিয়ে একটা অর্থপূর্ণ হাসি হাসলো। দুজনে কুকুর নিয়ে অন্য দিকে চলে গেল।

ওরা কেউ দেখলো না, বেশ কিছু দূরে। একটা ছোট্ট ঢিপির ওপর থেকে বাইনোকুলর চোখে লাগিয়ে ওদের দেখছে তেজস্বিনী। এবং তেজস্বিনীও দেখল না ম্যানশনের ভেতরে এক জানলা থেকে চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে তাকে দেখছেন রাজেশ্বরী দেবী। একটু আগেই তিনি প্রাণপণে হুইল ঘুরিয়েছেন। এখন হাঁপাচ্ছেন। গীতা! গীতা! নার্স মেয়েটি দৌড়ে এল। উনি বললেন। দৌড়ে যাও— জিনি কী করছে, কী দেখছে দেখে এসো। সাবধান, যেন টের না পায়।

গীতা একটু দূর দিয়ে আসছিল। কিন্তু ধরা পড়ে গেছে। তেজস্বিনী চকিতে বাইনোকুলর নামিয়ে কাঁধের ব্যাগে পোরে। গীতা! গীতা! কোথায় যাচ্ছো? গীতা পেছন ফিরে বললো— মা বললেন কিছু ফুল তুলে আনতে!

কী ফুল পাবে এখন?

যে কোনও, গোছা গোছা আনতে বলেছেন।

তেজস্বিনী বললো— চলো আমি দেখছি।

নিজের মনেই সে বললো— দোপাটিগুলো এখনও তেমন হয়নি। শীতকালে এবার ওঁকে গোছা গোছা গোলাপ দেবো। হঠাৎ তার চোখ জ্বালা করে জলে ভরে যায়। কোনও স্মৃতি! দুঃখের! সুখের! সে অন্ধের মতো গীতার পেছন পেছন চলতে থাকে। রাজেশ্বরী দাঁতে দাঁত চেপে বলেন— ওয়ার্থলেস! একটা কাজ ঠিকঠাক পারে না। কেন এদের রেখেছি? কেন মাইনে দিই এত? তাড়াতাড়ি হুইল চালিয়ে নিজের ঘরের দিকে যেতে থাকেন।

  • ঠাকুমা আপনি ফুল চেয়েছিলেন? তেজস্বিনী সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

— হ্যাঁ হ্যাঁ। কেমন রাগের গলায় বলেন উনি।

গীতা বললো— জিনিদিদিই তো সব তুললেন। খুঁটিনাটি জানেন কোথায় কী আছে।

রাজেশ্বরী ফুলগুলো কোলের ওপর নিয়ে বললেন— এগুলো সবচেয়ে বেশি ফোটে ভালুকটিলার আশে-পাশে, না জিনি? যখনই দুজনে ওদিকে যেতে আনতে আমার জন্যে! আমি কোনদিন কোনও নিষেধাজ্ঞা জারি করিনি। পুরো ফ্রিডম দিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি— য়ু ফুল— তুমিই পারলে না। ইয়োর টেম্পার, ন্যাস্টি টেম্পার। শেষ হয়ে গেল। সমস্ত শেষ। আশি বছর পূর্ণ হবে। দু দুজন নাতি ডেড অ্যান্ড গন।

তিনি কোলের ওপর থেকে ফুলের বোঝা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। তারপর মাথায় হাত দিয়ে মুখটাকে যথাসম্ভব নিচু করে ফেললেন। গীতা তাঁর চেয়ার ঠেলতে ঠেলতে ঘর পেরিয়ে করিডর পেরিয়ে, ডানদিকে মোড় নিয়ে অন্য কোনও দিকে নিয়ে গেল।

তেজস্বিনীর চোখ জ্বলছে। হাতদুটো সে একবার মুঠো করছে। আবার খুলছে। হঠাৎ নিজের খোলা চুল সে মুঠো করে ধরে। রক্তলাল হয়ে গেছে মুখ। বলে— না কোনটে সহ্য করা বেশি শক্ত। সামবডি ডেড, অর সামবডি অ্যালাইভ। জানি না, জানি না।

সে নিচু হয়ে ফুলগুলো তুলে নিল। নিজের ঘরে চলে গেল। সেখানে রঞ্জনের কোনও ছবি নেই। আছে সৌভিকের। ছবির তলার টেবিলে ফুলগুলো ফেলে দিয়ে সে বলতে লাগল— ওহ, হোয়াই রঞ্জন, হোয়াই, হোয়াই দিস?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *