১৩
বাথরুমটা তার ফার্নরোডের বাড়ির শোবার ঘরের চেয়েও বড়। চমৎকার বাথটব। নির্বাক লোকটি বাথটব ভরে, তাতে সুগন্ধি ছড়িয়ে দিল। ঘরের টেবিলে মস্ত বড় ফুলদানিতে ফুল এনে রাখলো। নিচু হয়ে নমস্কার করে চলে গেল।
ঘণ্টাখানেক ধরে চানের উষ্ণ আরাম নেবার পর, সুমনার ঘুম এসে যাচ্ছিল। কিন্তু সে বেশ কিছুক্ষণ ধরে মন দিয়ে প্রসাধন করল। নীল সমুদ্র রং শিফন শাড়ি। ভিজে চুলগুলো ড্রায়ারে শুকিয়ে একটা ক্লিপ দিয়ে বেঁধে রাখলো। চোখে কাজল, মাসকারা, গালে সামান্য ব্লাশার। ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপস্টিক। সাজ দেখাচ্ছো রাজেশ্বরী দেবী? সাজগোজ করে আসতে হবে? ঠিক আছে। আয়নায় নিজেকে দেখে তার ভালোই লাগলো। তুমি যত রূপসীই হও তেজস্বিনী ভাটিয়া, রঞ্জন ভালোবেসেছিল আমাকে, আমাকে, তোমাকে নয়। রঞ্জনের স্কেচটার দিকে চাইল সে। হঠাৎ কী মনে করে ফুলদানের গুচ্ছগুচ্ছ সাদা ফুল থেকে একগুচ্ছ নিয়ে কানের পাশে পিন দিয়ে আটকে নিল। সে এভাবে সাজলেই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতো রঞ্জন। বলতো— তুমি কি ম্যাজিক জানো?
— কেন!
— একেকটা ড্রেসে তোমার ব্যক্তিত্বের একক রূপ ফোটে।— ও অবশ্য এসব কথা ইংরেজিতেই বলতো।
দোল চেয়ারটায় বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলো সে। এখন বেশ অন্ধকার। জোনাকি জ্বলছে এত যে সে একটা দেখবার জিনিস। ঝিঁঝির আওয়াজ ক্রমশ এত জোর হয়ে যাচ্ছে যে শেষ পর্যন্ত সুমনা কানে আঙুল দিল। ওঃ কী একখানা জায়গা! একদিন দুদিন দল বেঁধে বেড়াতে আসা যায়। কিন্তু দিনের পর দিন এখানে থাকা! এই ভয়ংকর দ্বীপটাকে ও এত ভালোবাসতো! এ তো সভ্য জগতের বাইরে! পুরো দ্বীপটার যেন একটা স্বাধীন সত্তা আছে। ইচ্ছা-অনিচ্ছা। কে জানে রঞ্জন সরে যাচ্ছে বুঝে এই দ্বীপটাই ওকে মরণটানে টেনে নিল কিনা!
চানের আগেই ওকে চা এবং কিছু খাবার দিয়ে গিয়েছিল রতনলাল। খাওয়া, চান, তার ওপর বাইরের ওই ঝনঝনে অন্ধকার। সুমনা ঘুমিয়ে পড়ে।
কোথাও একটা গম্ভীর ঘণ্টা বাজছে। গং গং গং বেজেই যাচ্ছে। চার্চে কী? সে কি চার্চে রয়েছে! প্রেয়ারের সময় হল? দরজায় টোকা। সে জেগে উঠলো। কুপকুপে অন্ধকার এখন বাইরে। ঘরে জ্বলজ্বলে আলো, সে দরজা খুলে দিল— রতনলাল। মুখের কাছে আঙুল দিয়ে খাওয়া বোঝালো। আয়নায় সে নিজেকে একবার দেখে নিল, একটু ঠিকঠাক করে নিল। দরজায় চাবি দিল। চাবিটায় আংটা আছে কোমরে ঝোলাবার। সেও এখন হাই হিল পরেছে। তবে তার জুতোর আওয়াজ খটখট খটখট নয়।
বিশাল ডাইনিং হল। বিরাট টেবিল। তাদের হোটেলের ছোট ব্যাংকোয়েট রুমটার মতো। মাথার ওপরে ঝাড়। একদিকের প্রান্তে বসে রাজেশ্বরী। তাঁর মুখ চোখ এখন অনেক সজীব দেখাচ্ছে। পাশে দাঁড়িয়ে নার্সজাতীয় একজন মহিলা। টেবিল ঘিরে আরও বেশ কিছু মানুষ যাদের সে চেনে না। রাজেশ্বরী নিজের ডান দিকের চেয়ারে তাকে বসতে ইঙ্গিত করলেন। সব শেষে ঢুকলো তেজস্বিনী। সে বেয়ারা দুজনকে নির্দেশ দিচ্ছে খুব নিচু গলায়। ট্রলিতে করে খাবার আসছে।
রাজেশ্বরী বলে উঠলেন— সুমনা, তোমার আত্মীয়দের সঙ্গে পরিচয় করো। অন্য কোনও আত্মীয় তো যতদূর জানি তোমার নেই, তুমি অরফ্যান, অ্যাম আই রাইট?
দপ করে জ্বলে উঠলো সুমনার ভেতরটা। কিন্তু সংযত রাগের সুরে সে বললো— আত্মীয় ঠিক কাকে বলে আমি নিশ্চিত নই ম্যাডাম। তবে কথাটার মানে যদি হয়— ভালোবাসার, আশ্রয় দেবার, সাহায্য করার লোক— তাহলে তা আমার আছে। আপনি ভাববেন না।
সব মুখগুলোই সুমনার দিকে, কিন্তু সুমনা সেদিকে তাকালো না।
রাজেশ্বরী হেসে বললেন— — গুড। স্মার্ট। যাই হোক যারা তোমাকে ভালোবাসে না, আশ্রয় দেয় না, সাহায্য করে না মনে করছ অথচ ঘটনাচক্রে তোমার আত্মীয় হয়ে গেছে তাদের সঙ্গে পরিচয় করো। টেবিলের উল্টোদিকে, তাঁর মুখোমুখি, আঙুল দেখিয়ে বললেন— আমার বড় নাতি প্রদীপনারায়ণ।
ভদ্রলোক পাজামা-পাঞ্জাবি পরা, খুবই সৌম্য চেহারার। একটু লাজুক মনে হল। হাত জোড় করে নমস্কার করলেন। তারপর চোখ নিচু করে ফেললেন।
ওর বাঁ দিকে বুঝতেই পারছো আমার বড় নাত বউ, মাই ফার্স্ট গ্র্যান্ড ডটার ইন ল— শর্মিষ্ঠা। খুব বড় ঘরের মেয়ে। ওর বাবা জাস্টিস ব্যানার্জি সুপ্রিম কোর্টের জজ ছিলেন। এলাহাবাদে আমাদের রিয়্যাল এস্টেটের ব্যবসা। প্রদীপ দেখে।
শর্মিষ্ঠা একটু নধর চেহারার। ফর্সা। মাথায় অনেক চুল, একটা বড় খোঁপা ঘাড়ের কাছে। বড় বড় চোখ, নাক। একটু বোদা লাগল সুমনার। মহিলা বেনারসি শাড়ি পরেছিলেন। এবং যথেষ্ট গয়না। বড় ঘর, তাতে আর সন্দেহ কী! সুমনা নমস্কার করল, ভদ্রমহিলা খালি হাসলেন।
রাজেশ্বরীর দৃষ্টি ঘুরে যায়।— তোমার বাঁ দিকে আমার ছোট নাতি অর্জুননারায়ণ। এর সঙ্গেই রঞ্জনের মিল সবচেয়ে বেশি। সেই ভয়ানক ঝড়ের রাতের কথা মনে করে কেঁপে উঠলো সুমনা। অর্জুন তার চোখে চোখ মেলাতে পারছে না। আড়ষ্টভাবে নমস্কার করলো। সম্ভবত সেই ভয়ানক রাতের কথা তারও মনে পড়ছে।
পাশে বুঝতেই পারছো অর্জুনের স্ত্রী, মাই ইয়াংগেস্ট ডটার ইন-ল রাখী। রাখী বললো— হাই, সুমনাও জবাব দিল— হাই।
রাখীও খুব বড় ঘরের মেয়ে। ওর বাবা ইন্ডিয়ার বিগেস্ট ক্লোদস এক্সপোর্টার টু দি ইউ.এস.এ.। অর্জুন এখন ওর বাবার পার্টনার। আমার তরফ থেকে। রাখী দার্জিলিং-এ আগাগোড়া মানুষ। শিলিগুড়িতে আমার ফুড প্রসেসিং-এর ব্যবসা আছে। অর্জুন-রাখী সেটাও দেখছে, আমার মেজ নাতির অবর্তমানে। অন মাই বিহাফ। ইন ফ্যাক্ট আমাদের সম্পত্তির প্রতিটি টুকরো এই আমার হাতের মুঠোয়। ডান হাতটা তুলে মুঠো করলেন ভদ্রমহিলা একটা অদ্ভুত হেসে। টেবিলের অন্যদিকে তাকিয়ে বললেন— আর ও হল তেজস্বিনী, আমার বাল্য বন্ধু ক্যাপটেন ভাটিয়ার মেয়ে। আমার মেজ নাতি সৌভিক নারায়ণের বিধবা স্ত্রী। বর্তমানে ও আমার সেক্রেটারির কাজ করে। উত্তরপ্রদেশ, নর্থ বেঙ্গল, দক্ষিণ বাংলায় ছড়ানো বিস্তৃত জোত-জমা-ব্যবসা পত্র ইনভেস্টমেন্টের চাবিকাঠি আর পুরো হিসেব ওর হাতে। এখানে আমার হয়ে হোস্টেসের কাজটাও ও— ই করে। এমন শিখেছে যে কোনও মাল্টিন্যাশন্যাল ওকে লুফে নেবে। তবে সে সব জায়গায় যোগ দিতে হলে শুকে এই ডাইনি বুড়ির মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
ধূর্ত এক ধরনের খ্যাঁক খ্যাঁকে হাসি হাসলেন উনি।
কী হল? খাওয়া শুরু করো!
সুমনা এই সময়ে খুব নিচু স্বরে বলতে লাগলো হে ঈশ্বর। তুমি আমাকে এই যে অন্নজল দিলে তোমার অসীম করুণা দিলে তার জন্য তোমাকে নমস্কার…
রাজেশ্বরী বললেন— ওহ্। গ্রেস বিফোর মীট। আমি ভুলে গিয়েছিলাম তুমি ক্রিশ্চান।
সুমনা বললো— রোম্যান ক্যাথলিক।
রাজেশ্বরী বললেন— ওহ্! ইউস আ গুড জেসচার। তবে কি জানো ইয়াং লেডি, আমাদের ইন্ডিয়ান ট্র্যাডিশনেও এ জিনিস আছে। নিষ্ঠাবান লোকেরা অন্ন ঈশ্বরকে নিবেদন করে খান। তবে আমার কথা যদি বলো আই লাইক মাই ফুড অ্যান্ড ড্রিংক। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেওয়ার স্পর্ধা আমার নেই, কিম্বা নিবেদন করার দুর্মতি। সো লেটস স্টার্ট।— এমন করে বললেন যেন রেফারি বাঁশি বাজাচ্ছে।
সুমনা লক্ষ্য করলো একমাত্র রাজেশ্বরী ছাড়া আর কেউই খুব স্বস্তিতে খাচ্ছে না। যদিও বেশ ভালো রান্না, ভালো ভালো পদ। রাজেশ্বরী খেলেন খুব কম। কিন্তু খুব তৃপ্তির সঙ্গে। একবার বললেন— জিনি, আজ বোধহয় রান্না ভালো হয়নি। কেউ ভালো করে খাচ্ছে না। রাখী তুমি আর ডায়েটিং করো না। খ্যাংরাকাঠি আর মডেল যাই বলো— হয়ে কী লাভ! য়ু হ্যাভ প্লেন্টি টু ডু, অ্যান্ড প্লেন্টি টু এনজয়। অর্জুন তুমিও কি বউয়ের পাল্লায় পড়েছো! বিরিয়ানি নিচ্ছো কই? …প্রদীপ এরই মধ্যে হাত গুটিয়ে নিলে। শর্মিষ্ঠা তোমার এই সাধুপুরুষ স্বামীটিকে আজও বশ করতে পারলে না।
সুমনা কী খাচ্ছিল, খেয়ালই করছিল না। ক্রিম দিয়ে বাগদা চিংড়ির একটা পদ সে খেয়াল করলো। এটা তাদের হোটেলের শেফকে বলতে হবে। এতে আর কী কী আছে মোটামুটি বললেই ভদ্রলোক ধরে নেবেন।
ফিঙ্গার বোল এলো। রাজেশ্বরী বললেন— সুমনা তুমি বড্ড রাগ করে আছো, কিছুই খেলে না।
সুমনা একটু হাসলো, বললো— আমি যা খাবার ঠিক খেয়ে নিয়েছি।
রাজেশ্বরী বললেন— বাস এবার আমি বিশ্রাম নেবো। কিন্তু তোমরা, প্রদীপ, শর্মিষ্ঠা, অর্জুন, রাখী এবং জিনি তোমরা পার্লারে যাও। সুমনার সঙ্গে আলাপ করো। ওর ধারণা আমরা ওকে আত্মীয় ভাবছি না। মাইন্ড ইট। তোমাদের আলাপের বিষয় ও ফলাফল কী হয় আমি কাল শুনবো।
তেজস্বিনী ও নার্স মহিলা হুইল চেয়ার আনে। ডাইনিং চেয়ার চাকা ঘুরিয়ে নিচু করে, অদ্ভুত কায়দায় রাজেশ্বরী হুইল চেয়ারে উঠে যান। তেজস্বিনী চেয়ার ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যায়। চৌকাঠ পর্যন্ত গিয়ে রাজেশ্বরী আঙুল তোলেন— বাস এই পর্যন্ত জিনি। তুমি ওদের সঙ্গে যোগ দাও। আমি এবার চলে যেতে পারবো। নিজেই হুইল চালিয়ে চলে গেলেন, পেছন পেছন গেল নার্স মেয়েটি।
তেজস্বিনী অর্ধেকটা ওদের দিকে ফিরে বললো— দাদা, আপনারা বসুন। আমার আসতে একটু দেরি হবে। কাউকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সে চলে গেল।
ডাইনিং হলের পাশেই পার্লার। প্রদীপ এগিয়ে এসে খুব নরম গলায় বললো— সুমনা এসো, আমরা একটু গল্পসল্প করি।
সুমনা ঢুকে দেখলো অর্জুনের সোফার হাতলে বসেছে রাখী। সত্যিই মেয়েটি খুবই তন্বী। এবং সাজ পোশাক একটু কৃত্রিম, খানিকটা মডেলদের মতো। খাবার ঘরে অর্জুন, রাখী তার পাশাপাশি বসেছিল বলে সে ভালো করে দেখতে পায়নি। শর্মিষ্ঠা একটা আলাদা সোফায় গা এলিয়ে বসে আছে। খাবার ঘরে যে আড়ষ্টতা ছিল তা থেকে ছাড়া পেয়ে সবাই যেন বেঁচেছে। সুমনা প্রদীপের মুখোমুখি একটা সোফায় বসেছে। সে বললো— সুমনা, মেয়েকে কার কাছে রেখে এলে?
শর্মিষ্ঠা অমনি বলে উঠলো— হ্যাঁ আমরা ভাবছিলাম তোমার তো সত্যি সেভাবে কেউ নেই, না নিয়ে এসে ভুল করেছো ভাই!
প্রদীপ স্নিগ্ধ স্বরে বললো— না। ও ঠিক করেছে। রাস্তাটা তো গোলমেলে। এতটা নদীপথ। তাছাড়া একেবারে নতুন জায়গা। সুমনা বুদ্ধিমতী মেয়ে।
শর্মিষ্ঠা আর রাখী চোখ চাওয়াচাওয়ি করে হাসলো।
সুমনা প্রদীপের দিকে তারপর শর্মিষ্ঠার দিকে তাকিয়ে বললো— আমার কনভেন্টের সিস্টারদের কাছে রেখে এসেছি। আপনাদের ভাবনার কোনও কারণ নেই।
প্রদীপ বললো— ওই আমাদের একমাত্র বংশধর। এখনও পর্যন্ত। দেখবার খুব ইচ্ছে ছিল।
অর্জুন বললো— আমি অবশ্য জাস্ট এক ঝলক দেখেছি। একেবারেই শিশু তখন। ঠাকুমার মতো ফর্সা। তোমার মতো কোঁকড়া চুল। সুমনা, তোমাকে তুমি বলছি কিন্তু। দাদা ঠিকই বলেছে। আমাদের একমাত্র বংশধর।
রাখী বললো— ওহ অর্জুন, হাউ য়ু টক। জাস্ট পাঁচ বছর আমাদের বিয়ে হয়েছে। এক্ষুনি ধরে নিলে কিছু হবে টবে না!
শর্মিষ্ঠা বললো— সত্যি আশ্চর্য! আমাদের না হয় সাত আট বছর হয়েছে। কিন্তু আশা ছাড়ার তো কোনও কারণ দেখতে পাচ্ছি না। সবাইকারই কি বছর ঘুরতেই… প্রদীপ তাড়াতাড়ি বললো— আমি বলেছি এখনও পর্যন্ত। কথাটা বোধহয় তোমরা কেউ খেয়াল করোনি।
অন্যদিক থেকে কেউ বলে উঠলো— অভিশপ্ত ফ্যামিলি। এখানে আর কেউ আসবে না।
সবাই চমকে মুখ তুলে দেখলো তেজস্বিনী। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেমন দৈববাণীর ভঙ্গিতে বললো কথাগুলো। অন্যদের থেকে যত দূরে সম্ভব বসলো। সুমনার সঙ্গে চোখাচোখি হল। কেমন একটা হিংস্রভাব। চোখের ওপর আলো পড়ে যেন জ্বলছে।
সুমনা তার দিকে এক পলক তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিল। মনে পড়লো— রঞ্জন বলেছিল শী হ্যাজ আ টেরিবল ইগো।
রাখী হঠাৎ একটু দুষ্টু দুষ্টু ন্যাকা ন্যাকা ভঙ্গি করে বললো— সুমনা, আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে তোমার আর রঞ্জনের কথা…
শর্মিষ্ঠা সঙ্গে সঙ্গে যোগ দিল— সত্যি! আসলে এই ব্যাপারটা একটা মিস্ট্রি আমাদের কাছে। শাকম্ভরীর বাঘকে তুমি-ভাই কী করে বশ করলে? জাদু জানো, না কী?
প্রদীপ বললো— আহ্ শর্মিষ্ঠা!
শর্মিষ্ঠা বললো— তোমরা ছেলেরা উঠে যাও না বাবা। আমাদের সুমনার সঙ্গে অনেক অনেক প্রাইভেট কথা আছে। যাও প্লিজ।
অর্জুন হঠাৎ একটু অস্বাভাবিক উত্তেজনা নিয়ে বলে উঠলো— হ্যাঁ হ্যাঁ জেনে নাও, জেনে নাও, অনেক কিছু জানতে বাকি আছে তোমাদের…সে তীব্র চোখে রাখীর দিকে তাকালো।
রাখী বললো— আহা, রাগ করছো কেন? বি স্পোর্টিং…আমরা তিনজনে মিলে আজ সুমনার সঙ্গে…বুঝলে জিনি?
দেখা গেল তেজস্বিনী নেই। উঠে গেছে।
সুমনা প্রদীপের দিকে চেয়ে বললো— যদি কিছু মনে না করেন আমি এবার একটু রেস্ট করব। সে সবার দিকে তাকিয়ে বললো— গুড নাইট। কোনও উত্তরের
অপেক্ষা করল না। চলে গেল।
অর্জুন চাপা গলায় বললো— রাখী, তোমাকে বারবার বারণ করে দিচ্ছি, এসব নিয়ে ওকে বিরক্ত করবে না। কিসের থেকে কী মনে হবে! শী ইজ নো ফুল!
শর্মিষ্ঠা বললো— আহা, আমরাই কি ফুল। জাস্ট মজা!
রাখী বললো— অ্যান্ড কৌতূহল! আ অ্যাম ভেরি ভেরি কিউরিয়াস। এই শাদামাটা মেয়েটার মধ্যে কী এমন দেখল রঞ্জন!
শর্মিষ্ঠা বললো— আ অ্যাম ডাইং উইথ কিউরিয়সিটি।
দুজনেই হেসে উঠল। অর্জুন বিষণ্ণ গলায় বললো— আনফর্চুনেট, ভেরি ভেরি আনফর্চুনেট… স্যাড।
শর্মিষ্ঠা বললো— এগজ্যাক্টলি, আমাদের সঙ্গে যায় না।
রাখী বললো— সেটা তো রাজরাজেশ্বরী একরকম বলেই দিলেন, মুখের ওপর।
প্রদীপ বললো— রাখী, ঠাকুমার সম্পর্কে এভাবে কথা বলাটা আমার অরুচিকর মনে হচ্ছে। অর্জুনের কথা জানি না অবশ্য। আর সুমনার কথা যদি বলো— শী ইজ আনস্পয়েন্ট, চার্মিং, সিনসিয়ার অ্যান্ড ভেরি ভেরি ইনটেলিজেন্ট!
শর্মিষ্ঠা বললো— বিশেষণের বান ডাকিয়ে দিলে যে! ভেরি ভেরি ইনটেলিজেন্ট? তাই নাকি?
রাখী বললো— শর্মি, দাদার অর্জুনের সবারই ভেরি ভেরি ইনটেলিজেন্ট অ্যান্ড সিনসিয়ারকে পছন্দ। বুঝলে? ওর সবই ভালো। নকল মুক্তোর মালা থেকে কানের পাশে ফুলের গোছা! স— ব।
অর্জুন একটু হেসে বললো, তোমরা কি জানো ও একটা ফোর স্টার হোটেলের লিয়াজঁ অফিসার! ডোন্ট প্রিটেন্ড যে এই স্টেটাসের একটা মেয়ে ড্রেস করতে জানে না। শী ইজ সিম্পল অ্যান্ড গ্রেসফুল।
শর্মিষ্ঠা ভুরু কুঁচকে বললো— আচ্ছা খাবার সময়ে ওর ওই গ্রেস-এর ঢংটা করা কি উচিত হয়েছে। উই আর নট ক্রিশ্চানস।
রাখী বললো— ইমপ্রেস করার চেষ্টা। ও যে ক্রিশ্চান, এবং সেই আলাদা আইডেনটিটি বজায় রাখতে চায় এটা আমাদের কায়দা করে জানিয়ে দিল। কানিং
প্রদীপ বললো— তুমি শোনোনি বোধহয় ও রোম্যান ক্যাথলিক। ক্যাথলিকরা একটু বেশি আচারপরায়ণ হয়। তার ওপর কনভেন্টে মানুষ। দ্যাট ইজ হার হ্যাবিট, সেকেন্ড নেচার।
প্রদীপ উঠে পড়লো। অর্জুনও উঠে দাঁড়াতে রাখী আদুরে গলায় বললো— থাকো না বাবা আর একটু। দ্যাখো রঞ্জননারায়ণ বিয়ে করল, পরের বছরই বংশধর এসে গেল। তুমি চার বছর, অথচ…
শর্মিষ্ঠা বললো— আমার কিন্তু গায়ে লাগছে রাখী। আমাদেরও কিন্তু আট বছর। কে জানে বাবা, জিনির অভিশাপ কি না!
দুই ভাই বিরক্ত মুখে চলে গেল। শর্মিষ্ঠা আর রাখী খুব ঘনিষ্ঠভাবে, নিচু গলায় কথা বলে আর হাসে। কথা বলে আর হাসে।
