৭
তিন চার দিন হল রঞ্জন অফিস যাচ্ছে। সল্টলেকে অফিস। সাড়ে ছটা নাগাদ সে অফিস থেকে বেরোতে পারলো। বাইকটা চালু করলো। বাইপাস দিয়ে যাচ্ছে। পাশ দিয়ে শাঁ শাঁৎ করে গাড়ি চলে যাচ্ছে। হঠাৎ একটা সিলভার গ্রে হন্ডা সিটি তার পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। এয়ারপোর্টের দিকে যাচ্ছে। গাড়িতে চালকের আসনে এবং তার পাশে রঞ্জনের অত্যন্ত চেনা দুই মুখ। ওরা রাস্তার সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। কিছু দেখছে না, শুনছে না, একাগ্র। বিশেষত মেয়েটি একেবারে পাথরের মূর্তির মতো। বিস্ফারিত চোখে সেদিকে চাইলো রঞ্জন। জিনি! জিনি! সে চিৎকার করে উঠলো স্থানকাল ভুলে। ‘ড্যামিট’ লাথি মেরে বাইকটা একটা হেয়ার পিন বেন্ড নিলো তারপর তাড়া করলো গাড়িটাকে। কিন্তু বেন্ডটা পেতে খানিকটা সময় গেছে। অজস্র গাড়ির স্রোত। তার মধ্যে মিশে রুপোলি হন্ডা কোথায় মিলিয়ে গেছে। উল্টোডাঙা পর্যন্ত তাড়া করলো সে। তার আর তেমন নিয়ন্ত্রণ থাকছে না। দুপাশ দিয়ে গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে, মুখ বাড়িয়ে গালাগাল বা তিরস্কার করছে কেউ কেউ। লেন বদলে বদলে ধারে নিয়ে এসে কোনক্রমে সে বাইক থামায়। তারপর সিটের ওপর ঘুষি মারতে থাকে— জিনি! জিনি। জিনি! অর্ধেক চিৎকার, অর্ধেক কান্না।
বাইক শহরের দিকে মোড় নেয় ক্রমশ। প্রায় লক্ষ্যহীন ভাবে লক্ষ্যে পৌঁছে যায় রঞ্জন! বাইক পার্ক করে। চাবি নিয়ে দু তিন লাফে ওপরে উঠে যায়। ঘরের দরজা খোলে। ঢুকে শব্দ করে বন্ধ করে দেয়, তারপর বিছানার ওপর আছড়ে পড়ে। দুহাতে চুল আঁকড়ে ধরেছে, ভাঙা গলায় সে চিৎকার করতে থাকে, জিনি! মাই জিনি! ওহ গড়। ওহ গড়…
কিছুক্ষণের মধ্যেই বিছানাটা যুদ্ধক্ষেত্রের আকার ধারণ করে। রঞ্জন শান্ত হয়ে শুয়ে থাকে উপুড় হয়ে। তার হাত মুঠি পাকানো। কোথায় গেল ওরা? কলকাতার বাইরে? তবে কলকাতায় এসেছে! কবে এলো? কেন? ওহ কোয়েশ্চনস্ কোয়েশ্চনস্! আর কোনও মানে নেই এ সবের। কিছুর কোনও মানে নেই।
চুপচাপ শুয়ে শুয়ে অনেকক্ষণ ধরে ফোঁসে রঞ্জন। হঠাৎই সেলফোনটা তুলে নেয়— সরিৎ! সরিৎকে ডেকে কী লাভ! উপদেশের ঝুড়ি বার করবে। ডু দিস। দ্যাট। য়ু আর টু ব্লেম…হি মেকস মি ম্যাড।
রাত তখন প্রায় সাড়ে আটটা। আজকে বিকেলেও ছবির প্রদর্শনী ঘুরে এসেছে সুমনা আর সরিৎ। সুমনা বিকেলের দেখা ছবিগুলোর কথা ভাবছে। তারা অফিসের জন্য ছবি কিনতে চায়। লেডি রানুর ছবিটা তাকে ছাড়ছে না। হঠাৎ সে বুঝতে পারলো কেন। একটা মানুষের কথা বারবার শুনলে, তার সম্পর্কে একটা ধারণা হয়। লেডি রাণুর ছবিটা দেখলেই তার মনে পড়ছে একটা নাম রাজেশ্বরী দেবী। শাকম্ভরীর দ্বীপের কর্ত্রী। উনি বোধহয় কতকটা এইরকম। আরও বয়স্ক। কিন্তু এমনি বয়সে উনি নিশ্চয়ই এমনি ছিলেন। ব্যক্তিত্বটা যেন তাকে চুম্বকের মতো টানছে। একজন সেকালের মহিলা, স্বামী যুদ্ধে মৃত। পুত্র-পুত্রবধূ অ্যাকসিডেন্টে চলে গেলেন। একমাত্র ছেলে। চারটি ছোট ছোট শিশু নিয়ে বিরাট সাম্রাজ্য পরিচালনা করছেন। সবদিকে নজর। আশ্চর্য মানুষ! এঁদের কথাই বইয়ে লেখে। সেল ফোনটা বাজলো। আজ রাতের মতো সে এক্ষুনি সুইচ অফ করে দিত— হ্যালো।
ওদিক থেকে ভারী ভাঙা গলা ভেসে আসে— সুমন। আসবে একবার? আই নিড য়ু।
রঞ্জনদা? কী ব্যাপার? আপনার গলা এরকম শোনাচ্ছে কেন? আবার কিছু বাধিয়েছেন?
সুমন আই নিড য়ু। প্লিজ কাম।
এখন? এই রাতে!
এক্ষুনি। আমার অবস্থা খুব খুব খারাপ। আ অ্যাম ইন ডিপ ডিপ ট্রাবল।
উদ্বেগ গলায় উঠে এসেছে। সুমনা বললো— সাড়ে আটটা বেজেছে রঞ্জনদা। এখন কোথাও যাওয়া যায়? মিসেস রডরিগস আমাকে বার করে দেবেন, তাহলে। সরিৎদাকে একটা ফোন…
ফর গডস সেক সুমন। তুমি যদি আসতে না পারো ঠিক আছে, কিন্তু সরিৎ? নো।
কী হল? সামথিং সিরিয়াস!
অবভিয়াসলি! আই অ্যাম ডেসপ্যারেট।
কোথায় আপনি?
আমার হোটেলের ঘরে, আমি কাউন্টারে বলে দিচ্ছি তোমার নাম
কী মনে করবে ওরা?
কেউ কিছু মনে করবে না। প্লিজ। তোমাকে বেশিক্ষণ আটকাবো না।
সুমনা এখনও পোশাক বদলায়নি। সে বেরিয়ে পড়লো ঘরে চাবি দিয়ে। একটা ট্যাক্সিতে উঠে ফাঁকা রাস্তায় মিনিট পনেরোর মধ্যে পৌঁছে গেল হাঙ্গার ফোর্ড স্ট্রিট। হোটেল রিচ। কাউন্টারে গিয়ে প্রথমেই জিজ্ঞেস করলো— আর.এন.মুখার্জি কি অসুস্থ? আপনারা কিছু জানেন?
রিসেপশনিস্ট বললো— ম্যাডাম সুমনা? আপনার আসবার কথা উনি বলে রেখেছেন। প্লিজ চলে যান। উনি অপেক্ষা করছেন।
সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকে সুমনা। কীরকম একটা উত্তেজনা, অস্থিরতা, ভয় তাকে পেয়ে বসেছে। নিজের মন নিজেই বুঝতে পারছে না সে। কেন রঞ্জন এভাবে তাকে এই সময়ে ডাকলো! কাউন্টারে বলে রেখেছে। কোনও খারাপ উদ্দেশ্য থাকলে বলত না। খুব বিপজ্জনক প্রায় এই নটা রাতে কোনও অর্ধ পরিচিতি পুরুষের হোটেলের ঘরে যাওয়া। কেন সে এল? এটা এড়ানোই তো উচিত ছিল তার। সরিৎদা সঙ্গে থাকলে ঠিক আছে। সরিৎদাকে ডাকতে বারণ করেছে। ভীষণ সন্দেহজনক পরিস্থিতি। সুমনা তুমি এত তাড়াতাড়ি মাদারের সতর্কবাণী ভুলে গেলে? কেন যাচ্ছো? ফেরত যাও। হঠাৎ ভেতর থেকে কে বলে উঠলো এ তো সামান্য একটা আপদ! আপদও নয়। আশঙ্কা! এটুকু সামলে নেবার বুদ্ধি ক্ষমতা তোমার আছে সুমনা। নেই? সে দরজায় টোকা দিল।
প্লিজ কাম ইন— ভারী গলা ভেতর থেকে। দরজা খোলা। রঞ্জন তার মুখোমুখি বসে আছে। ঘরে মৃদু আলো। ভালো করে দেখা যাচ্ছে না সব। সুমনা আগের দিন আলোর ঠিকানা জেনে গেছে। সে সুইচ টিপে দিল। লাফিয়ে উঠলো ঘর তার বিছানা, বেডসাইড টেবল, কার্পেট, ক্যাবিনেট….সমস্ত নিয়ে। রঞ্জন এখনও তার অফিসের পোশাকেই বসে আছে। চুলগুলো অবিন্যস্ত। টাইয়ের নটটা আলগা। তাকে সত্যিই খুব বিপর্যস্ত অসুস্থ দেখাচ্ছে।
দরজার কাছ থেকেই সুমনা বললো— কী হয়েছে রঞ্জনদা? হঠাৎ এমন জরুরি ফোন? এই রাতে?
রঞ্জন হঠাৎ দু হাতে মুখ রেখে একেবারে ভেঙে পড়ে— সেভ মি সুমন আ অ্যাম ইন লাভ উইথ য়ু। তোমাকে না পেলে আমি বাঁচবো না।
সুমনা হতভম্ব। সে কোনমতে বললো— কী বলছেন? হঠাৎ এরকম?
রঞ্জন বললো— বলতে পারিনি, ভয় পাচ্ছিলাম যদি কিছু মনে করো। যদি না বলো। যদি আর কাউকে ভালোবাসো! তুমি জানো না তুমি সরিৎকে চাও ভেবে আমি উন্মাদ হয়ে যাচ্ছি।
সুমনা খুব মৃদু গলায় বললো— সরিৎদা আমার খুব বন্ধু। এত ভালো লোক আমি আর দেখি নি।
রঞ্জন বলে উঠলো— বিশ্বাস করো সুমনা আমিও খারাপ লোক না, হয়তো একটু ক্ষ্যাপাটে, বাট আ অ্যাম ম্যাডলি ইন লাভ
সুমনার গলা কেঁপে যাচ্ছে। বললো— এ হয় না রঞ্জনদা। আপনাদের বনেদি বংশ অত ধনসম্পত্তি… ট্র্যাডিশন… আমি একটা অনাথ মেয়ে, কর্পদকহীন তার ওপরে ক্রিশ্চান। আপনি ওঁকে আগে জানান।
শী ইজ আ গর্গন। ওঁকে আমি আমার জীবনে বারবার এনট্রি নিতে দেবো না। তুমি ক্রিশ্চান কি অরফ্যান আমার দেখার দরকার এই। তুমি চমৎকার মেয়ে, এরকম আমি আর দেখিনি। এত পিওর, ইনটেলিজেন্ট, স্মার্ট, অথচ এত সহানুভূতিশীল, আমার কি কাউকে ভালোবাসারও অধিকার নেই? সম্পত্তি, বংশ এইসব উড়ো আপদ সবসময়ে মাঝখানে এসে দাঁড়াবে?
রঞ্জন উত্তেজনায় উঠে দাঁড়িয়েছে।
সুমনা বললো— আমাকে একটু ভাববার সময় দিন…প্লি..জ— বলতে বলতে দরজার নব-এ তার হাত পৌঁছলো, হাতটা কাঁপছে। শাদা হয়ে গেছে।
ট্রাস্ট মি সুমনা। প্লিজ। আমরা একটা ছোট্ট ঘর বাঁধবো। শুধু তুমি আর আমি। নো শাকম্ভরীর দ্বীপ। নো রাজেশ্বরী দেবী। নো সম্পত্তি। নিজেদের কেরিয়ার আমরা নিজেরা গড়ব। তুমি আমার আইডিয়্যাল ওয়াইফ। ন্যাকা নয়, রাগী নয়। ডাউন টু আর্থ। তোমার আমার ইনটারেস্ট সব একধরনের, তুমি যদি আজ কথা না দাও…তাহলে আমি…
— তাহলে কী?
রঞ্জন মাথার চুল মুঠো করে ধরে বললো— জানি না জানি না।
সুমনার সামনে সরিতের মুখটা অদ্ভুতভাবে ভেসে উঠলো। সে বললো— সরিৎদার সঙ্গে আমার ওরকম কোনও সম্পর্ক নেই রঞ্জনদা। আপনার তো অস্থির হবার কিছু নেই। কিন্তু প্লিজ আমাকে একটু ভাববার সময় দিতে হবে।
রঞ্জন বললো— প্রমিস। তুমি সরিৎকে এসব…
বলবো না। বলে সুমনা দরজা খুলে বেরিয়ে এলো। তাড়াতাড়ি নিচে নেমে এলো। আনমনে রিসেপশনিস্টের হাসির উত্তরে হাসলো। বেরিয়েই সামনের ট্যাকসি ধরলো। দশ বারো মিনিটের মধ্যে নিজের ঘরে পৌঁছে গেল।
পরবর্তী কদিন স্বপ্নের মধ্যে কেটে যায় তার। এ কি সত্যি হতে পারে? অসম্ভব! অলীক! অফিসের পর সে ক্যাথিড্রালে চলে যায়। অনেকক্ষণ ধরে প্রার্থনা করে। হাঁটতে থাকে, হেঁটে হেঁটে সমস্ত দুশ্চিন্তা যেন ক্ষইয়ে ফেলবে সে। এবং সর্বত্র, দিনে রাতে কাজে বিশ্রামে রঞ্জনের ফোন তাকে উতলা করে দেয়।
সুমনা, আই লাভ য়ু।
সুমনা প্লিজ ট্রাস্ট মি
সুমনা আ অ্যাম ডাইং টু মিট য়ু। এবং এবং এবং।
সে কি মাদার, সিস্টার সুচরিতার কাছে যাবে? অনেকবার ভাবে সে। ভেতর থেকে কে বলে সুমনা নিজের কাছে জবাব খোঁজো। তুমি ছাড়া তোমার মন কে জানবে? এবং সেইভাবে জানতে গিয়ে সুমনা আবিষ্কার করে তার ভেতরটা রঞ্জনের দিকে মুখ ফিরিয়ে রয়েছে ঠিক যেমন সূর্যমুখী থাকে সূর্যের দিকে। প্রতিমুহূর্তে সে রঞ্জনকে ভালোবেসেছে কিন্তু তার পাওয়ার অতীত বলে কখনও ভুলেও সে হাত বাড়ায় নি। রঞ্জনের দ্বীপ, রঞ্জনের ঠাকুমা এসবও একটা রোমাঞ্চকর আকর্ষণ। কিন্তু আসল আকর্ষণ রঞ্জন নিজে। তার সুঠাম, চটপটে দেহ, তার গলার অর্গ্যান স্বর, মোহময় চাউনি, তার খামখেয়ালিপনা সব কিছুতে তাব সাবলীলতা। শুধু প্রশংসা নয়। এতদিন সে ভেতরে ভেতরে একজনকে ভালোবেসে এসেছে। অপ্রাপ্য বলে শুধু চায় নি মুখ ফুটে
নিজের কাছে জবাব পাওয়ার পর সে আর দেরি করলো না। সেন্ট পলস্ ক্যাথিড্রালে রবিবারের প্রার্থনায় যোগ দিল। বাইরে বেরিয়ে দেখলো একটা মেঘমুক্ত নীলাভ দিন। ঘাসের ওপর নতজানু হয়ে বসে পড়ে সে রঞ্জনের নম্বর টিপলো।
হ্যালো।
সুমনা বললো— আমি রাজি। বলেই সুইচ অফ করে দিল ফোনটার।
