৪
এটা উপক্রমণিকা। সুমনার সঙ্গে রঞ্জনের আলাপের। কাজের সময়ে, বিশ্রামের সময়ে যখন-তখন তার সেলফোনে রঞ্জননারায়ণ মুখার্জির অর্গ্যান গলা ভেসে ওঠে।
— সুমনা। হাউ আর য়ু?
— এই তো কালই ফোন করলেন। ভালো আছি বললাম তো!
— তুমি কি বিরক্ত হচ্ছো?
না না। বিরক্ত হবো কেন?
আসলে কী জানো, সব সময়ে তোমার কথা মনে পড়ছে। সামহাউ আই কান্ট ফরগেট ইয়োর ফেস।
ভোলবার দরকার কি? রেখে দিন না। সুমনা হাসলো।
আজ বিকেলে সময় হবে?…
কেন?
প্লিজ। সুমনা, আজ সন্ধেয় একটু এসো কাজ আছে।
থাক কাজ, প্লিজ।
অতএব কোনদিন স্বভূমিতে, কোনদিন নল বনে সন্ধে নামে। সন্ধে নামে প্রিন্সেপ ঘাটে। দূরে স্টীমারের ভোঁ। দুজনেই উন্মনা। আস্তে আস্তে হাঁটছে। হ্যালো বলবার পর থেকে কেন কে জানে সুমনা আজ কোনও কথা খুঁজে পায়নি। ভেতর থেকে একটা চাপা টেনশন তাকে স্তব্ধ রেখেছে।
রঞ্জন প্রায় আত্মগত বললো— সো য়ু আর আ ক্রিশ্চান!
সুমনা চমকে বললো— কিছু বললেন রঞ্জনদা?
রঞ্জন বুকে ক্রস করে বললো— আমেন।
একটা বেঞ্চে বসলো রঞ্জন।
সুমনা বললো— হঠাৎ ক্রস করলেন? আমেন, কেন?
রঞ্জন হঠাৎ হেসে কিছু.একটা ভাবনা যেন ঝেড়ে ফেলে দিল, বললো— না ভাবছিলাম শ্রীমতী সুমনা তুমি তাহলে ক্রিশ্চান?
— অবভিয়াস। জন্মের আগেই বাবা অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছেন। মা ‘আমাকে জন্ম দেওয়ার দু তিন দিন পরেই মারা গেলেন। উনি নিজে মাদারের হাতে আমাকে তুলে দিয়েছিলেন। ওঁরাই বড় করেছেন। ওঁরাই ব্যাপ্টাইজ করেছেন, ওঁদের নিয়ম।
রঞ্জন একটু ইতস্তত করে বললো— তুমি কি খুব গোঁড়া?
সুমনা বললো— গোঁড়া? কই না তো! তবে আমার প্রেয়ার, ম্যাস, গ্রেস, যীশু, মা মেরি, চার্চ, চার্চ বেল— সব খুব ভালো লাগে। সব।
রঞ্জন শুনতে শুনতে উঠে দাঁড়িয়েছিল। বললো— তোমার সঙ্গে আমার কী আশ্চর্য মিল! এতটা যে আমি শুনতে শুনতে অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম। আমার বাবা-মা দুজনেই একই অ্যাকসিডেন্টে মারা যান। তুমিও যেমন মা নয়, একজন মাদারের কাছে মানুষ হয়েছো আমিও তেমনি। তবে তোমার মাদার সুপিরিয়র, হেসে যোগ করলো, আমার মাদার ইনফিরিয়র এই যা।
সুমনা বললো— ধ্যাৎ এরকম আবার কেউ বলে না কি! ছিঃ— দুজনেই হেসে ফেলে।
রঞ্জন বললো— ঠাট্টা না। সত্যি। এইজন্যে আমাকে আজও কেউ বুঝলো না। উনি আমাকে দারুণ ভালোবাসেন। অন্যদের পড়াশোনা শেষ হতেই কোনও না কোনও ব্যবসায় বসিয়ে দিয়েছেন। আমাকে কাছাকাছি রাখতে চান। কোনও কাজ করতে দেবেন না। কাছছাড়া হতে দেবেন না। জাস্ট থিংক অব ইট! শি ইজ আ উইচ!
— এমা, এরকমভাবে বলবেন না রঞ্জনদা প্লিজ।
আরে আমারই কি ভালো লাগে বলতে! আফট্রল উনি আমার মা, ঠাকুমা, দিদিমা সব। যা চেয়েছি দিয়েছেন। যা বলেছি মেনেছেন। ইংল্যান্ডে পাঠালেন গ্র্যাজুয়েশন করলাম লন্ডন ইউ থেকে, কিন্তু ব্যারিস্টারি আমার ভালোই লাগছিল না। কে অত ল-এর কচকচি মনে রাখে। বোঝোই তো সিরিয়াস লেখাপড়া আমার ধাতে নেই। আমি খেলা পাগল ছিলাম। আমার কোচ তখন আমার মধ্যে অনেক সম্ভাবনা দেখছেন, উনি আমাকে ডেকে পাঠালেন। এলাম। ব্যাস আর যেতে দিলেন না। সুমনা ডোন্ট গেট মি রং। আই ডু লাভ হার। বাট, দিস ইজ টু মাচ!
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইলো। ব্যক্তিগত সমস্যা একজন প্রায় অপরিচিত ব্যক্তির। সমস্যার চাপটা বেশি বলেই কি ও এত সঙ্গ খুঁজছে? কে জানে! হতে পারে! কতটুকু মেলামেশা করেছে সে মানুষের সঙ্গে! কিছু বলা উচিত কি উচিত নয় তাই সুমনা বুঝতে পারে না।
ভাবতে পারো? রঞ্জন বলে উঠলো— থিয়েটার রোডে আমাদের একটি ফ্ল্যাট আছে, সেটার চাবি পর্যন্ত এবার উনি আমাকে দিলেন না।
— এখানে কোথায় থাকেন? সন্তর্পণে জিজ্ঞেস করলো সুমনা।
হোটেলে। স্রেফ হোটেলে। একটা চাকরি জোটাবার চেষ্টা করছি। আইল্যান্ডে আমি আর ফিরবো না।
আইল্যান্ড?
রঞ্জন বললো— হ্যাঁ। সরিৎ তোমায় বলেনি?
কী বলবে? আপনার কথা খামোখা আমাকে…
রঞ্জন অধৈর্য হয়ে বলে উঠলো— আরে খামোখার কি আছে। সবাই জানে আমার ঠাকুমা রাজেশ্বরী দেবীর একখানা গোটা আইল্যান্ড আছে সুন্দরবনে। আমার ঠাকুর্দা ছিলেন মিলিটারিতে মেজর। ফার্স্ট কাশ্মীর যুদ্ধে মারা যান। ঠাকুমা বেশিরভাগই থাকতেন ভোপালে। ওঁর বাবা ফ্যাবুলাসলি রিচ। তাঁর একমাত্র মেয়ে। বোঝো কীরকম স্পয়েলট! এনিওয়ে আমার বাবাকে উনি দুন স্কুলে রেখে মানুষ করেছিলেন। হি ওয়জ আর্মি ডক্টর। আমরা চার ভাই জন্মালাম। আমার ছোট ভাই যখন বছর তিন, আমি পাঁচ তখন মাত্রই হিমাচলপ্রদেশ থেকে দিল্লিতে ফেরবার পথে এয়ারক্র্যাশে আমার মা বাবা দুজনেই শেষ। তখন থেকেই উনি আর লোকালয়ে থাকতে পারলেন না। সুন্দরবনে একটা দ্বীপ ছিল ওঁদের। সেটাকেই ডেভলপ করলেন। নিজস্ব লঞ্চ সিসটেম। সব কিছু। নির্জনবাস শুরু হল।
— ইশ। সুমনার কষ্ট হতে লাগল ছেলেটির জন্যে।— আপনার মনে আছে ওঁদের? সে বলল।
রঞ্জন দূরের দিকে তাকিয়ে বললো— স্লাইট।
তারপর?
আমার বড়দা প্রদীপকেই প্রথম স্কুলবোর্ডিং-এ পাঠালেন ঠাকুমা। তারপর একে একে আমাদের সবাইকে….ছুটিতে আমরা দ্বীপে যেতাম। খুব হুটোপাটি, মজা হুল্লোড়…. বাই দা ওয়ে ওই দ্বীপটার নাম শাকম্ভরীর দ্বীপ।
সুমনা হঠাৎ কেমন শিউরে উঠলো। বললো— অদ্ভুত নাম তো! শাকম্ভরীর দ্বীপ!
রঞ্জন হেসে বললো— আসলে ওখানে শাকম্ভরী দেবীর একটা মন্দির ছিল। তাই থেকেই নাম।
শাকম্ভরী কী দেবী? কখনও শুনিনি তো!
— আমিই কি অত জানি। বোধহয় দুর্গার অন্য একটা নাম। মন্দিরটা আধভাঙা, বনজঙ্গল। মূর্তিটাও হাতভাঙা…ওইখানে আমি বাঘের ছানা নিয়ে খেলা করতাম।
বাঘের ছানা? সুমনা চমকে বললো।
আরে অত চমকাবার কী আছে? আমি তো বাঘ পুষতাম। একটু বড় হলে
লঞ্চে করে জঙ্গলে গিয়ে ছেড়ে দিয়ে আসতাম।
বাপ রে! সাঙ্ঘাতিক! ওখানে কারা থাকে?
কেউ না মাদমোয়াজেল। খালি রাজেশ্বরী দেবী। তাঁর ম্যানশন, এবং তাঁর লোকজন। বেশির ভাগটাই জঙ্গল। কিউটিফুল। খুব সাবধানে জঙ্গুলে লুকটা মেনটেন করেন উনি। বাঘ নেই, তবে সাঁতরে চলে আসতেও পারে। আর কুমীর মাঝে মাঝেই পাড়ে শুয়ে রোদ পোয়ায়।
রোদ পোয়ায়! কখনও মানুষ মারে না!
মারে বই কি। সুযোগ পেলেই মারে। একবার আমাদের এক স্টাফকে ঠ্যাং ধরে নিয়ে এক্কেবারে মাঝনদীতে…। তখন আমি ছোট।
কী কাণ্ড। ওই ভয়ানক জায়গায় থাকতে ভয় করে না আপনাদের? ওঁর?
শী ইজ আ টাইগ্রেস, তা যদি বলো। ভয় ডর নেই।
আর আপনার?
রঞ্জন হঠাৎ জোরে হেসে উঠলো।
কী হল হাসছেন?
হাসবো না? তুমি আমাকে এই চিনলে? বললাম না বাঘের ছানা নিয়ে খেলা করতাম! রঞ্জন মুখার্জি ভয় কাকে বলে জানে না। ডিকশনারিতে নেই। হোয়াট অ্যাবাউট ইউ? তোমাকে তো খুব ভিতু ভিতু মনে হয় না?
সুমনা বললো— একটু ভাবতে হবে।
ভাবো, ভেবে বলো। আমি অপেক্ষা করছি।
কিছুক্ষণ পর সুমনা ভেবেচিন্তে বললো— ভূতের ভয় নেই। জীবনে বিপদ-আপদ সংকট এলে আমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই রঞ্জনদা। কেন বলুন তো!
রঞ্জন বললো— কেন!
কেন না হারাবার কিছু নেই। আর বাঘ? বাঘ-টাঘ সামনে দেখলে কী করবো আমি সত্যিই বলতে পারবো না। টাইগার টাইগার বার্নিং ব্রাইট। অত সুন্দর একটা জীব,
অথচ ভয়ানকও তো!
সুন্দরবনের বাঘ ভয়ানক ধূর্তও সুমনা। বুদ্ধিতে ওদের সঙ্গে এঁটে ওঠা খুব শক্ত। তুমি নিশ্চিন্তে পথ চলেছো ধরো, ভাবছো এখানে আশে পাশে বাঘ নেই, মোটের ওপর খোলা জায়গা, নদীর ধার। কোথাও কোনও বাঘের পায়ের দাগ নেই। হঠাৎ তোমার ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে পড়লো, টুটি টিপে শেষ করে নিয়ে গেল জঙ্গলের ভেতরে। তারপর ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে— রঞ্জন পুরো জিনিসটা অভিনয় করে দেখালো।
সুমনা শিউরে উঠে বললো— বাবা! আপনি এমন করে বলছেন!
রঞ্জন হেসে বললো— আচ্ছা ঠিক আছে। অনেক ভয় দেখিয়েছি। চলো এক জায়গায় নিয়ে যাই। লেটস এনজয় লাইফ।
বাইরে রঞ্জনের মোটর বাইক পার্ক করা রয়েছে। ও একলাফে চড়ে বসলো। সুমনা পেছনে রসলো সন্তর্পণে।— কোথায় যাচ্ছি আমরা?
দেখা যাক।
বাইকের গতি দারুণ উপভোগ করে সুমনা। কোথায় যাচ্ছে রঞ্জননারায়ণ সে জানে না। যদি কোথাও না গিয়ে শুধু এইরকম চলা যেত কোনও ফাঁকা রাস্তায়! তাহলে বোধহয় আরও ভালো লাগতো। টাকা জমিয়ে সে-ও একটা বাইক কিনে ফেলরে। দারুণ। এহ্, টাকা জমলে তো ট্রেনিং নেওয়ার কথা, কোনটা আগে করবে! অবশ্যই ট্রেনিংটা আগে। নইলে শুধু অভিজ্ঞতার জোরে আর কত দূর যাওয়া যায়!
বেশি দূর না। বাইকটা পার্কস্ট্রিটেরই একটা হোটেলে এসে দাঁড়ালো। সিঁড়ির ধাপ পেরিয়ে নাইটক্লাবে ঢুকলো রঞ্জন। মৃদু আলো। ঘরে ঢুকতেই মিউজিক, তার সঙ্গে সঙ্গে বহু মানুষের গুঞ্জন কানের ওপর আছড়ে পড়লো। কোণের দিকে একটা জায়গা বেছে দুজনে বসলো। একটু পরে রঞ্জন বললো— কীরকম লাগছে?
সুমনা প্রশ্নটাকে পাশ কাটিয়ে বললো— আমি কখনও আসিনি। আপনি কি প্রায়ই আসেন?
ওহ্ নো। অ্যাকচুয়ালি আমি কিছুদিন খুব ডিসটার্বড…
ডিসকোয় শান্তি পান?
রঞ্জন বললো— কেন আপত্তি আছে?
সুমনা সাবধানে বললো— না জাস্ট ভাবছিলাম…
রঞ্জন বললো— শব্দ আছে, লটস অ্যান্ড লটস অব সাউন্ড, দৃশ্য আছে লটস অ্যান্ড লটস অব সাইটস।… ভাবনা চিন্তাগুলো ডুবে যায়।
সুমনা এবার হেসে বললো— আপনার কেস খুব খারাপ রঞ্জনদা। আপনার ভেতরে শেকড় গেড়ে বসে আছে আপনার ওই শাকম্ভরীর দ্বীপ, জলে কুমির ডাঙায় বাঘ। আর ম্যানশনের মধ্যে আপনার ঠাকুমা, যিনি মা-ঠাকুমা-দিদিমা সব। একবার অন্তত ওখান থেকে ঘুরে আসুন। আমার খালি মনে হচ্ছে খুব দামী কিছু, আপনার জীবনের কেন্দ্রীয় কিছু ওখানে রয়ে গেছে।
রঞ্জন হাত বাড়িয়ে সুমনার হাতে রাখলো… শিউরে উঠলো সুমনা।
সো সুমন, তুমি বুঝতে পারছো? ইউ ফীল দ্যাট! না?
সুমনা মৃদু হেসে তাকিয়ে রইলো। তার হাসি ঈষৎ লাল।
— য়ু আর আ ন্যাচারাল ফ্রেন্ড। ভেরি ভেরি আন্ডারস্ট্যান্ডিং অ্যান্ড গ্রেশাস!— রঞ্জনের চোখ দুটো এখন খুব নরম হয়ে এসেছে।
রঞ্জনের সামনে চিলড্ বিয়ার, সুমনার সামনে শাদা পানীয়। বিয়ারটা শেষ করে রঞ্জন হঠাৎ বললো— সুমন প্লিজ, এসো নাচি।
— আমি পারি না রঞ্জনদা।
আরে এখানে তো তোমাকে কোনও বল ডান্স করতে হচ্ছে না। জাস্ট মিউজিকের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যাবে। তুমি একটা স্পোর্টসওম্যান। ফ্লেক্সিব্ল্ বডি। আপনা থেকে হয়ে যাবে।
সুমনা সেভাবে কখও নাচে নি। কিন্তু সত্যিই খেলা শরীরে একটা ছন্দ এনে দেয়। কোনও কিছু নিয়েই তার বেশি না-না করতে ইচ্ছে করে না। পুরো জীবনটা, এই শহর ভর্তি মানুষ, তাদের অতীত, উৎস, সবই তার অজানা। সঙ্গের রঞ্জননারায়ণ নামে ব্যক্তিটিও অজানা। কিন্তু বিস্ময়! দারুণ চিত্তাকর্ষক! সে হাসিমুখে নাচতে উঠে যায়। বাজনার তালে তালে একেবারে মুক্তছন্দে বা বল। উচিত মুক্তমুদ্রায় নাচতে সত্যি কথা
বলতে কি তার আশ্চর্য ভালো লাগে। যেন সে এই প্রথম কোনও পরমকাম্য মুক্তির স্বাদ পেলো। আপনাতে আপনি পূর্ণ হবার স্বাদ। কোনরকম জড়তা ছাড়া, আত্মসচেতনতার অতীত এই বিচরণ তাকে অন্য জগতে নিয়ে যায়। সেখানে মাদার বা সিস্টারদের আদেশ বা মমতা কাজ করছে না। সেখানে পেশাদার জীবনের ইতিকর্তব্যের কোনও প্রতিফলন নেই। তার যে পশ্চাৎপট, অনাথ পিতৃমাতৃহীন আত্মীয়হীন অবস্থা সেই ব্যাপারটাই সে ক্রমশ ক্রমশ ভুলে গেল। এ যেন এক বিচিত্র ছন্দোময় জগৎ। এই ছন্দে আশার অতিরিক্ত মুক্তি আছে।
রঞ্জন যেন কেমন একটা অদ্ভুত কৌতূহলের চোখে তাকে দেখছিল। দুটো তিনটে মিউজিক বদলে গেল, তখনও সুমনা বিভোর হয়ে নেচে যাচ্ছে। রঞ্জন বললো— সো য়ু আর এনজয়িং ইট, আরন ট য়ু?
সুমনা বিভল মুখে মাথা নাড়ে। তারপর দুজনে আবার এসে বসে।
ওয়ান্ডারফুল! রঞ্জন বলে মুগ্ধ হয়ে— য়ু আর আ নাচারাল ডান্সার।
তাই? চকচকে মুখে সুমনা বলে।
ইয়েস। এখন নিশ্চয় বুঝতে পারছো সব ভুলতে আমি কেন এখানে চলে আসি।
ওরা যখন বেরিয়ে এলো রাত বারোটা বাজছে। গলির মোড়ে তাকে ছেড়ে দিয়ে রঞ্জনের বাইক চলে গেল। চাবি ঘুরিয়ে নিজের স্যুইটের দরজা খুললো সুমনা। হঠাৎ যেন সে বাস্তবে ফিরে এসেছে। মিসেস রডরিগস আবার খেয়াল রেখেছেন নাকি? কৈফিয়তের সামনে পড়তে হবে? আশ্চর্য, একটুও অপরাধবোধ নেই মনে। সে যেন পাখির ডানায় ভর করে উড়ছে। এরকম অনুভূতি তার আগে কখনও হয়নি।
আমি কি আত্মনিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছি? সবটাই কেমন অবাস্তব! রঞ্জননারায়ণ অবাস্তব, তার সঙ্গে জড়িত সব কিছুই অদ্ভুত, রোমাঞ্চকর এবং অবাস্তব। বারবারা কার্টল্যান্ড যে রকম রূপকথার রাজপুত্তুর আঁকেন সেইরকম।
ঘোরের মধ্যেই জামাকাপড় বদলালো সে। মুখটুখ ধুলো। এত রাতে আর চান করতে ইচ্ছে করছে না। তা ছাড়াও তার সমস্ত শরীরে যেন মায়া, সুগন্ধ, স্বপ্নের হালকা ছোঁয়া লেগে রয়েছে। জল দিলে বুঝি সেসব ধুয়ে মুছে সাফসুতরো দৈনন্দিনের সুমনা বেরিয়ে পড়বে। সুমনা মেরিল মণ্ডল— বাবা-মা আত্মীয় স্বজনহীন একটা একলা মেয়ে বিরাট পৃথিবীতে যে পায়ের তলার মাটি খুঁজতে বেরিয়েছে। বাইরের রাস্তায় আলো পড়েছে কুণ্ডলী পাকানো দুটো কুকুরের ওপর। সামনের বাড়ির শেষ আলোটা নিবে গেল। বিছানায় আসে সে আস্তে। হাঁটু গেড়ে বসে প্রার্থনা করে শুয়ে পড়ে–কে যেন কানে কানে বলে— য়ু আর আ ন্যাচারাল ফ্রেন্ড…য়ু আর আ ন্যাচারাল ডান্সার। অন্ধকারে তার চোখ চিকচিক করে। এই তেইশ বছরের জীবনে সে কিছু কিছু প্রশংসাবাক্য শুনেছে ঠিকই। অনেকটাই তাকে উৎসাহ দেবার জন্যে বলা কিন্তু শ্রেষ্ঠ কমপ্লিমেন্ট যদি সে কিছু পেয়ে থাকে সে হল ওই ন্যাচারাল ফ্রেন্ড, ন্যাচারাল ডান্সার।… একটা সবুজাভ আলোর সমুদ্রে সে ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকে।
আলোটা যেন আলো নয়, একটা হাতছানি। কে তাকে নিশির ডাকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে গভীর সবুজের মধ্যে। এটা কোন দেশ! সে এগিয়ে চলে, এগিয়ে চলে। একটা ভাঙা মন্দির। দরজাটা ক্যাচ ক্যাচ করছে। শব্দটা সে শুনতে পাচ্ছে না কিন্তু বুঝতে পারছে। দরজাটা খুলবে? ভালো করে? ওর ভেতরে একটা মূর্তি আছে। ভাঙা। সে শুনেছে। দরজাটা তাকে খুলতে হবে। হাত ঠেকিয়েছে কি না ঠেকিয়েছে ভেতর থেকে একটা ক্রুদ্ধ হুংকার। লাফিয়ে বেরিয়ে এলো একটা বাঘ, গর্জনের পর গর্জনে ভরে যাচ্ছে চারদিক। চিৎকার করে উঠে বসলো সুমনা। ঘামে ভিজে জবজব করছে সে। দূর থেকে অ্যালসেশিয়ানের ডাক ভেসে আসছে। ছাবরিয়াদের দুটো অ্যালসেশিয়ান আছে। ক্রস করলো সুমনা। বুকের ধকধকানি থামছে না। ওহ্, উহ্! কী ভয়ানক স্বপ্ন। কী ভয়ানক!
