শাকম্ভরীর দ্বীপ – ৩

বিকেল হয়ে এসেছে। এইখানে সবসময়ে কৃত্রিম আলো জ্বলে, সময় বোঝা যায় না। ঋতু বোঝা যায় না। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সুমনা একটা হাই তুললো। রাকেশ একমনে কমপিউটারে কাজ করে যাচ্ছে। ছটা নাগাদ মল্লিকা এসে যাবে। তার ছুটির এখন তেমন ব্যস্ততা নেই। গলার আওয়াজে মুখ তুলে তাকালো। রঞ্জন।

বললো— সরিৎ বিশ্বাসকে পেতে পারি?

সুমনা হেসে ফেললো— পেতে পারেন কিনা জানি না, সেটা সরিৎ বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করছে তবে দেখা করতে পারেন, স্যরি, উনি একটু বাইরে গেছেন। এসে যাবেন। ওয়েট করুন একটু কাইন্ডলি।

রঞ্জন কাউন্টারের ওপরে কনুইটা রেখে দাঁড়িয়েছিল। চোখ দুটো চিকমিক করে উঠলো, বললো— সো? রিসেপশনিস্ট হলেই পোকার ফেস হতে হয় না, মাঝে মাঝে মুখোশ নামিয়ে রেখে হাসিঠাট্টা চলতে পারে?

সুমনা বললো— মোটেই পোকার ফেস নয়। তবে হ্যাঁ ফর্ম্যাল তো একটু হতেই হয়। আপনি যেভাবে বললেন— পেতে পারি? যেন আর একটা স্যান্ডউইচ কি কচুরি চাইছেন।

দুজনেই হাসলো। অদূরে রাখা কৌচে গিয়ে বসলো রঞ্জন। পা-টা মাটিতে আস্তে আস্তে ঠুকছে। বারবার ঘড়ির দিকে চাইছে। একটা ফোন এলো। ইন্টারকম। সুমনা কথা বললো, রেজিস্টার স্কুলে দেখলো, ২৭ নম্বরের ভদ্রলোকটি জানতে চাইছেন ৩৩ নম্বরে যাঁর আসার কথা ছিল সেই কুলকার্নি এসেছেন কিনা। কোনও অজ্ঞাত কারণে কুলকার্নি তাঁর আজ দুপুর থেকে বুকিং থাকা সত্ত্বেও এখনও এসে পৌঁছোন নি। সে ভদ্রলোককে আশ্বস্ত করলো। এলেই জানাবে।

রঞ্জন উঠে এলো— আর কতক্ষণ বসবো মাদমোয়াজেল! আপনার সরিৎ কি সত্যিই জল হয়ে গেল?

মৃদু হেসে সুমনা বললো— প্লিজ, আর একটু। উনি এসে যাবেন।

রঞ্জন ফিরে যাচ্ছিল। হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় বললো— আচ্ছা মাদমোয়াজেল বলে ভুলটুল করলাম না তো, যদি মাদাম হন। মাফ করবেন।

সুমনা টি.ভি. সেটটা খুললো। নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে টেনিসে নিয়ে এলো নাভ্রাতিলোভার খেলা দেখাচ্ছে। সে বললো— মাফ করার প্রশ্ন নেই।

টি.ভি. স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রঞ্জন বললো— আচ্ছা। আপনার টেনিসে ইনটারেস্ট আছে নাকি?

সুমনা সাইলেন্ট মোডে নিয়ে এলো টি.ভি.টা। বললো— ভীষণ। খেলতাম তো!

তাই নাকি! সাউথ ক্লাবে একটা টুর্নামেন্ট হচ্ছে। আমি খেলছি। য়ু আর মোস্ট ওয়েলকাম।

সুমনা বললো— ডিউটি…পারবো না! সে যাই হোক অনেক ধন্যবাদ। পেছন থেকে সরিৎ বললো— রঞ্জন! কতক্ষণ!

রঞ্জন ফিরে দাঁড়িয়ে বললো— বহুক্ষণ। তবে সময়টা টুক করে কেটে গেল শ্ৰীমতী…

সুমনা হাসিমুখে বললো— সুমনা।

এই শ্রীমতী সুমনার সৌজন্যে। তুমি কি জানতে শ্রীমতী সুমনা টেনিস ভালোবাসেন।

— কই না! সরিৎ বললো।

এই সময়ে হন্তদন্ত হয়ে এক ভদ্রলোক ঢুকলেন। হাতে করে একটা ব্যাগ টেনে আনছেন। সুমনা তাকালো, ইনিই সম্ভবত বহু প্রতীক্ষিত কুলকার্নি। সে ব্যস্ত হয়ে গেল। দরজা ঠেলে নিজের অফিসে ঢুকলো সরিৎ। বললো— বোসো রঞ্জন। সে টেলিফোনে কিচেনে কিছু খাবার-দাবার পাঠাবার কথা বললো।

—বিকেল বেলায়? হঠাৎ?

রঞ্জন একটু উত্তেজিত গলায় বলে উঠলো— ভাবতে পারো বুড়ি জোর করে আমার বিয়ে দেবার চেষ্টা করছে।

সরিৎ হেলান দিয়ে বসলো, বললো— করতেই পারেন। তোমার তো বিয়ের বয়স হয়েছে? না কী?

আরে সৌভিকের হয়নি? তার দিক না, আসলে বয়স-ফয়স কথা নয়, আমাকে খাঁচায় পুরতে চাইছে। সৌভিকের দিকে। আমাকে নিয়ে টানাটানি কেন বাবা, বাই নাউ ইট শুড বি ক্লিয়ার টু হার দ্যাট আই ওয়ন্ট টু লিভ মাই ওন লাইফ। তুমিই বলো না, করবো কেন? উনি নাকি কথা দিয়েছিলেন। সো হোয়াট! পাগলা না কি?

কে? মেয়েটি?

আরে ওঁর যৌবনের বন্ধু। প্রেমিক হওয়াও অসম্ভব নয়— ভাটিয়া, তাঁর নাতনি।

সরিৎ চোখ দুটো তুলে ওর দিকে এক পলক তাকালো। বললো— অসুবিধেটা হচ্ছে কোথায়? দেখতে খারাপ? সরিৎ জানে রঞ্জন সুন্দরী ছাড়া অন্য মেয়েদের পাত্তার মধ্যেই আনে না।

রঞ্জন খুব আপত্তির সুরে বললো— খারাপ ভালোর প্রশ্ন না। শী হ্যাজ আ টেরি ইগো। টেম্পার। রঞ্জন এন মুখার্জি কারো ইগো ফিগোর তোয়াক্কা করে না।

সরিৎ বললো— তাই কি পালিয়ে এসেছো?

রঞ্জন একটু অস্বস্তির সঙ্গে বললো— বুঝলে? একটা জম্পেশ চাকরি!

নিজে স্বাধীন হবার একটা উপায় খুঁজছি,

— ওই অত সম্পত্তি থাকতে?

— কী করে যে এই কথাগুলো বলো সরিৎ? রঞ্জন প্রতিবাদ করে উঠলো— অ্যাম আই আ বেগার? কারো সম্পত্তির তোয়াক্কা করি না। দিলে দেবে, না দিলে না দেবে। আই ওয়ন্ট মাই ফ্রিডম।

সরিৎ একটু ইতস্তত করে বললো— যদি কিছু মনে না করো, এই মেয়েটির সঙ্গে তোমার একটা অ্যাফেয়ার ছিল না?

আরে দূর, রঞ্জন হেসে উঠলো— কাফ লভ। রাতদিন ওখানে এসে থাকতো। অ্যাডলেসেন্সের সময়ে একটা রোম্যান্টিক গলো-গলো ভাব হয় না!

তাতে ক্ষতি কী?

রঞ্জন বললো— দ্যাখো সরিৎ প্রথম কথা আমার ইচ্ছে। ইচ্ছের ওপর আমি কারো জবরদস্তি সইব না। সেকেন্ডলি প্রচণ্ড অহংকারী। ইগো প্রবলেম, বললাম না? একেবারে কাট-অফ করে চলে এসেছি। শী ইজ নট মাই কাপ অব টি। একটু থেমে বললো— ওহ, কান্ট য়ু গেট আউট অব দিস বীস্টলি অফিস!

ব্যস্ত হচ্ছো কেন, আমি এক্ষুণি বেরোবো। তোমার জন্য চা পাঠাতে বললাম?

চা! হাসালে সরিৎ। লেটস গো টু সামহোয়্যার এলস। আই নিড কম্প্যানি। সরিৎ জানে রঞ্জনকে এখন চায়ের জন্য বসিয়ে রাখা যাবে না। ভীষণ অস্থির হয়ে আছে। দূরে বেয়ারাকে আসতে দেখছিল সে, হাত নেড়ে না করে দিল। উঠে দাঁড়ালো। বললো— চলো।

আসলে রঞ্জনের প্রতি তার বন্ধুত্বে কোনও খাদ নেই। আর বন্ধুত্বেও কিছু দায়— দায়িত্ব থাকে।

বাইরে এসে দাঁড়ালো ওরা। সুমনাও ওর ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে আসছে।

হ্যালো সুমনা রঞ্জন বলে উঠলো ছুটি না কি?

— হ্যাঁ, শেষ। সুমনা হাসলো।

হোয়াই ডোন্ট য়ু জয়েন আস দেন?

সরিতের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইলো সুমনা। সরিৎ বললো— সুমনা, আমার বন্ধু রঞ্জন কোথাও একটা নিয়ে যাচ্ছে আমাকে। আই ডোন্ট নো এ্যাগজ্যাক্টলি হোয়্যার। ও তোমাকে ইনভাইট করছে।

একবার সুমনার দিকে তারপর সরিতের দিকে তাকালো রঞ্জন।

কী হল? আমি আবার কিছু ভুল-টুল করে ফেললাম না কি? সরিৎ তোমার বস্? ওহ্। স্যরি।

সরিৎ হেসে বললো— দ্যাটস ওকে। আমরা তো বেরিয়ে এসেছি। ওখানে কাউন্টার ফাউন্টার পাঁচজনের সামনে একটু ফর্ম্যাল হওয়াই ভালো।

সুমনা বললো— কিন্তু সরিৎদা এই য়ুনিফর্ম পরে….।

রঞ্জন বলে উঠলো— সরিৎ। আমরা তো সুমনাকে ওর বাড়িতে নিয়ে যেতেই পারি। লেট হার চেঞ্জ। দেন…

সুমনা বললো— আজ না হয় থাক। অন্য একদিন…

কেন? কোনও কাজ আছে?

তা নয়— সুমনা সরিতের দিকে চাইল।

সরিৎ বললো— কী আশ্চর্য! আমার দিকে চাইছো কেন? চলো, তোমায় বাড়ি নিয়ে যাই।

এই ছেলেটি, মানে সরিৎদার বন্ধু, খুব ছটফটে এবং ইমপালসিভ। যা ইচ্ছে হয়, একেবারে হঠাৎ সেটাই করে ফেলে। সুমনা বললো— অনেক হাঙ্গামা, কী দরকার। আজ থাক না।

রঞ্জন বললো— সরিৎ তুমি বলো না, বলছো না ভালো করে।

শুনুন সুমনা। ইটস মাই পার্টি। আমি আপনাকে রিকোয়েস্ট করছি। আপনার বস মত দিয়েছেন, আবার কী? এই না আপনি খেলাধুলো ভালোবাসেন? বি স্পোর্টিং।

সরিতের গাড়ি কিন্তু চালাচ্ছে রঞ্জন। উঠেই ঠেলে সরিয়ে দিল সরিৎকে। এই সরো, হাত নিশপিশ করছে আমার।

লাইসেন্স সঙ্গে আছে?

— ইয়েস ম্যান এত নিটিরপিটির নিটিরপিটির করে বাঁচো কী করে!

দারুণ হাত। যদিও সন্ধের ট্রাফিকে বারে বারে আটকাচ্ছে গাড়ি। তবু এঁকেবেঁকে ওর ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এমন কায়দায় যেন সাইকেল চালাচ্ছে।

সুমনা বললো— সরিৎদা আমি যদি এর ওপরে একটা শাদা কার্ডিগ্যান পরে নিই?

গুড আইডিয়া। রঞ্জন বললো। তাহলে আমি স্ট্রেট চললাম।

দক্ষিণ কলকাতার একটা রেস্তোরাঁয় এসে ঘ্যাঁচ করে থামলো রঞ্জন।

কী সরিৎ কথা বলছো না যে!

সরিৎ হেসে বললো— এতক্ষণ নিশ্বাস বন্ধ করে ছিলাম। এখন গাড়ি থামলো, এবার কথা বলা যায়। সত্যি তোমার লাইসেন্স আছে? আমি বিশ্বাস করি না।

দেখবে? রঞ্জন বললো— তারপর হেসে ফেলে বললো— আরে বাবা, নিটিরপিটির করে বাঁচার কোনও মানে হয় না। কী বলেন সুমনা!

সুমনা বললো— আইন মেনে চলাই তো ভালো।

বাপ রে। মেমসাহেব প্রথম সুযোগেই বকে দিলেন?

এত দামি জায়গায় সুমনা কখনও আসেনি। ওর ভালো লাগছিল মিউজিক। ভালো লাগছিল ছবি। চারপাশে এত মানুষ। বেশির ভাগই যুবক-যুবতী। জীবন্ত প্রাণশক্তিতে ভরপুর যেন জায়গাটা। এই যে এত যুবক-যুবতী…ওদের জীবন কী রকম! বাড়িতে মা বাবা আরও কে কে সব যেন থাকে! ভাই বোন তো বটেই। সেইখানে জন্মে, বড় হতে হতে এইখানে এসে পৌঁছেছে ওরা, তাই ভাবভঙ্গিতে কেমন একটা অনায়াস সাবলীলতা, পায়ের তলার মাটি শক্ত হলে এ রকমটা হয়। অন্যের দয়ায় বোর্ডিং-এ বড় হয়ে এক ঝটকায় অ্যাড এজেন্সির কাউন্টার আরেক ঝটকায় হোটেলের কাউন্টার, ঘুমোনোর জায়গা একটা লজিং-এ রকম হলে জীবনটা কীরকম দেখায় ওরা জানে না। সেও জানে না এইরকম একটা আড্ডা খাওয়া-দাওয়ার পর বাড়ি ফিরে মা বাবা এইরকম আপনজনের সঙ্গে দুচারটে কথার আদানপ্রদান, তারপরে সকলের মাঝখানে নিজের নির্জনতায় বাস করতে কেমন লাগে।

রঞ্জন বললো বিয়ার নিচ্ছি আমরা, আপনি?

― যে কোনও সফট ড্রিংক।

বলেন কী? রঞ্জন আকাশ থেকে পড়লো— চি বিয়ার তার তুলনা আছে? এ যুগের মেয়ে এত স্মার্ট….জাস্ট সফট ড্রিংক? হাসালেন আপনি। ভাবালেনও।

সুমনা বললো— কেন? ভাবনার কী আছে? আমি ড্রিংক করছি না, তাতে আপনাদের অসুবিধে কী! বারণ করছি না তো আপনাদের।

তা ভাবছেন না, রঞ্জন মুখটা করুণ করে বললো— কিন্তু জাজ করছেন তো! এ লোকটা আজ বিয়ার নিয়ে বসলো, কালই হুইস্কি নেবে…লজিক! সিম্পল লজিক!

কী আশ্চর্য, সুমনা হেসে ফেললো— তো খাননা আপনি হুইস্কি, স্মোক করুন, ডিস্কোয় যান তাতে আমি কেন বাদ সাধবো?

দ্যাটস ব্যাড— রঞ্জন কাঁচুমাচু মুখে বললো— এক তো বিয়ারের পেছন পেছন হুইস্কি স্মোকিং,…. ডিসকো সব লাইন দিয়ে পরপর চলে এলো। তার ওপরে…আমার কিছুতেই আপনার কিছু আসে যায় না! ভেরি ব্যাঙ্― কী সরিৎ। কিছু বলো।

সরিৎ হাসলো— আমার আবার কী বলার থাকবে! সত্যিই তো, তুমি বা আমি বা সুমনা স্বাধীন অ্যাডাল্ট। যে যার মর্জি মতো চলবো। চলতেই পারি। হোয়াটস দা প্রবলেম?

আরে আছে, তুমি বুঝছো না। রঞ্জন রীতিমতো উত্তেজিত।

সরিৎ জানে রঞ্জনের এই বৈশিষ্ট্য। ও নিজের পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। কিন্তু অন্যের স্বাধীনতার ব্যাপারটা ওর মগজে ঢোকে না। ওর এই ব্যক্তিত্বের প্রচণ্ড জোর একটা আকর্ষণও বটে আবার বিকর্ষণের কারণও বটে। ওর সঙ্গে কারো ঘনিষ্ঠতা টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। তাই-ই কি ওই মেয়েটি, ভাটিয়া না কী এতদিনে বিদ্রোহ করতে শুরু করেছিল? অস্বাভাবিক নয়। আত্মসম্মানবোধ থাকলে সর্বক্ষণ অন্যের ইচ্ছেয় তাল দিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আর অমনি মেয়েটিকে ও ছুঁড়ে ফেলে দিল! এইরকমই কিছু একটা ঘটেছে।

কী ভাবছো সরিৎ! দূর এই নন-স্মোকিং এরিয়ায় আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে। একটু আসছি। ড্রিংকটা এসে গেলে আমায় একটা রিং করে দিও প্লিজ।

রঞ্জন লাফিয়ে উঠল, একটা চিতাবাঘের মতো গুচ্ছ গুচ্ছ জটলার মধ্যে দিয়ে পথ করে করে চলে যাচ্ছে। সুমনা নিবিষ্টমনে দেখছিল। সুমনাকে দেখছিল সরিৎ। তার কপালে একটা ছোট্ট চিন্তা-ভাঁজ।

সুমনা মুখ ফিরিয়ে বললো— সরিৎদা এই রঞ্জননারায়ণ আপনার কোথাকার কবেকার বন্ধু!

দুজনেই জেভিয়ার্স-এ পড়তাম। ও অবশ্য হস্টেলে।

তারপর?

তারপর ওকে ওর ঠাকুমা ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে দিলেন। সেখানে কী পড়েছে কতদূর কী করেছে ও-ই জানে। আর আমি তো জানোই বাবার একগাদা পয়সা খরচ করে।…

সুমনা বললো— তাতে আপনার এমন সংকোচের কী আছে সরিৎদা? ইশশ্ বাবা-মা থাকলে কত সুবিধে পাওয়া যায়। জীবনটাই অন্যরকম হয়ে যায়…. আমি অবশ্য জানি না সে কী রকম।

চট করে তার গম্ভীর মুখের দিকে তাকালো সরিৎ। বললো— বাবা-মা না থাকাতেও তো তোমার সত্যিকার কোনও অসুবিধে হয়নি সুমনা। তোমার কনভেন্ট কি তোমাকে যথেষ্ট স্নেহমমতা দেয়নি?

সুমনা ঘাড় নাড়লো। তার চোখ সামান্য চকচক করছে।

সরিৎ বললো— তবে?

কনভেন্টের কাছে তো আবদারের কথা চলে না সরিৎদা। কিন্তু বাবা মার কাছে চলে। বলা চলে, বাবা আমাকে আরেকটু পড়াশোনা কি ট্রেনিং-এর সুযোগ দাও। বলা চলে, আমি স্পোর্টসই কেরিয়ার করবো বাবা।

সরিৎ চমকে উঠলো— তুমি স্পোর্টস এত ভালোবাসো? কেরিয়ার করার কথা পর্যন্ত…

— হাস্যকর না? সুমনা হাসলো— আসলে বোধহয় সরিৎদা আমি জন্ম রোম্যান্টিক। অজানা অচেনা অনিশ্চিতকে আমি ভয় পাই না, যদি সেটা ভালোবাসি, পারবো কি পারবো না এ চিন্তাও আমার মনে আসে না। আই জাস্ট ওয়ান্ট টু ডু অ্যান্ড বি হোয়ট আই রিয়্যালি রিয়্যালি ওয়ান্ট।

রঞ্জনের গলার স্বরে দুজনেই চমকে উঠেছে। ইতিমধ্যে ও ফিরে এসেছে। বেয়ারা ফেনাভর্তি বিয়ার রেখে গেল। বললো— হোয়াটস দ্যাট?

সরিৎ বললো— হোয়াটস হোয়াট!

— ওই যে সুমনা বলছিলেন হোয়াট আই রিয়্যালি রিয়্যালি ওয়ান্ট।

সুমনা বললো— মাদমোয়াজেলটা যখন বাদ দিয়েছেন তখন ‘বলছিলেন ‘টা বাদ দিলেও কিছু মনে করবো না…

রঞ্জন বললো— বাঁচালেন। সত্যি ইন্ডিয়ান ভাষার এই তুই, তুমি, আপনি…. যাচ্ছেতাই।

ফরাসিতেও আছে কিন্তু। সুমনা বললো।

— ইয়েস, আছে… ঠিকই। তো তুমি ফরাসিও জানো?

সুমনা বললো— দূর জানলাম আর কোথায়? একটা দুটো সেমেস্টার করেছিলাম বাস!

বাঃ, ছাড়লে কেন?

আমার চাকরির খুব দরকার ছিল। চাকরিটা পেয়ে গেলাম।

চাকরি? হায় ভগবান! তোমার চাকরির দরকার হল!

সুমনা বললো— সরিৎদা, তুমি তোমার বন্ধুকে বলো নি আমি অরফ্যান, কনভেন্টে মানুষ!

সরিৎ ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে বললো— কী যে বলো সুমনা। আমার বন্ধুর সঙ্গে তোমার প্রাইভেট ব্যাপার নিয়ে আমি আলোচনা করতে যাবো কেন?

কী ব্যাপার? আমি জানতে পারি? রঞ্জন বিয়ারে চুমুক দিয়ে বললো। সুমনা তাড়াতাড়ি ব্যাপারটা হালকা করে নিতে হেসে বললে— হ্যাঁ আপনি জানতে পারেন পেতে পারেন।

রঞ্জনও হেসে ফেললো— ‘মে আই’ ফর্মটা পাঁচ-ছ বছরের অভ্যেস তো! ইংরেজরা এইসা ঘুরিয়ে নাক দেখানো জাত! অভ্যেসটা ছাড়লেও ছাড়তে চায় না, তো?

সুমনা বললো— তো আর কি? বাবা-মা না থাকলে কী হবে, মাদার ছিলেন?

কে! মাদার টেরিজা নাকি!

সুমনা সরিৎ দুজনেই হেসে উঠলো। সুমনা বললো— মাদার টেরিজা ছাড়াও মাদার আছেন রঞ্জনদা। আমাদের মাদার সুপিরিয়র ছিলেন বীথিকা ভেরোনিকা। উনি, তাছাড়াও সিস্টাররা ছিলেন এঁদের সবার ভালোবাসায় বড় হয়ে উঠেছি। না…আসলে মা বলতে আমি ওইরকমই বুঝি। অন্যরকম মানে লালপাড় শাড়ি-টাড়ি সিঁদুর টিপ পরা মা…আমি জানি না।

সে তার ড্রিঙ্কের গ্লাসটা তুলে নিলো। সরিৎ আর রঞ্জন চোখ চাওয়া-চাওয়ি করলো। যতই বাস্তববাদী, সপ্রতিভ মেয়ে হোক এই জায়গাটা সুমনার দুর্বল জায়গা। সরিৎ আগে কখনও সুমনাকে এই নিয়ে এতটা বিচলিত হতে দেখেনি। বাবা মা ভাই বোন এগুলো সব রহস্য রোমাঞ্চময় সম্পর্ক সুমনার কাছে। এগুলোর জন্যে ওর ভেতরে একটা আকাঙ্ক্ষা কাজ করে যায়। সেটা আজ যতটা প্রকাশ পেলো আগে কখনও এতটা হয় নি। অথচ এই স্বতঃসিদ্ধ সম্পর্কগুলো যাদের আছে, তারা অনেকেই বীতশ্রদ্ধ। রঞ্জনই তার একটা উদাহরণ। মা-বাবা না থাকুন। পরিবার যাকে বলে, পারিবারিক শিক্ষা, ভালোবাসা, আদর যাকে বলে, তার চূড়ান্ত তো ও পেয়েছে। অথচ যিনি সব দিয়েছেন তাঁর কাছ থেকেই ও পালাতে চাইছে। সে নিজেও মা-বাবা না হোক দাদা, ভাই, এই সম্পর্কগুলো থেকে ইতিবাচক তো কিছু পেলো না!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *