৫
মনটা কদিন খুব খুশি-খুশি রঞ্জনের। সরিতেরও। রঞ্জন একটা ভালো এগজিকিউটিভ পদে চাকরি পেয়েছে। পি.আর.ও. একটা ভালো কম্প্যানিতে। সরিৎ কাজটা পেতে সাহায্য করতে পেরেছে বলে তার মন খুশি। রঞ্জনের চাবুকের মতো চেহারা, ফোয়ারার মতো অনর্গল কথাবার্তা। লন্ডন য়ুনিভার্সিটির ডিগ্রি, স্পোর্টস কেরিয়ার, বংশমর্যাদা! কিছু নয় শুধু জায়গা মতো বসিয়ে দেওয়া। এইরকম পাঁচ সাতটা চাকরি এক্ষুনি পেতে পারে ও। যদি লেগে থাকে স্কাই ইজ দা লিমিট। এটা সরিতের ভাবনা। সেই সঙ্গে সংশয়। আদৌ কি মন বসাতে পারবে রঞ্জন! মাস তিনেক হয়ে গেছে। রঞ্জন সুখী আপাতত।
দিনের শেষে বাড়ি ফিরছে রঞ্জন। তৃতীয় মাসের মাইনে কড়কড়ে নোটগুলো ওয়ালেটে। ব্যাংক থেকে সামান্যই তুলেছে অবশ্য। কে আজকাল কাঁচা টাকায় দেওয়া— নেওয়া করে। দুটো ক্রেডিট কার্ড। এ.টি.এম.। ভাবনা কী? তার উত্তরাধিকারে প্রাপ্তব্য হাতখরচের চেয়ে খুব কম নয় অঙ্কটা। তবে হ্যাঁ এর চেয়ে বেশি চাইলে রানী রাজেশ্বরী দিয়ে দিতেন। বোকা কোম্পানিটা দিতে চাইলো না। টু ব্যাড।
বাইকটা গারাজ করলো। দুতিন লাফে উঠে গেল হোটেলের লাউঞ্জে। এটা একটা মধ্যম মানের হোটেল। বহু লজার অল্প কিছুদিনের জন্য এ শহরে থাকতে হলে এটাকে ঠিকানা করে। কাউন্টার থেকে চাবি নিয়ে তর্জনীতে একবার ঘুরিয়ে নিলো সে। রিসেপশানের ছেলেটি বললো— স্যার, আপনার একটা চিঠি আছে।
চিঠি? আমার? রঞ্জন একটু অবাক।
— এই যে,–ছেলেটি বড় একটা আয়তাকার খাম এগিয়ে দিল। মোটা বালি রঙের খাম, যে রকম পার্সেলের জন্য ব্যবহার করে। ভেতরে ভারী কিছু আছে বলে মনে হচ্ছে না। খামটা লুফতে লুফতে সিঁড়ি ভাঙতে লাগলো রঞ্জন। শিস দিতে দিতে ঘরের চাবি ঘোরালো। ঢুকে এ.সি. চালিয়ে দিল, আলো জ্বেলে দিল। চাবিটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে দিল। সোফায় বসলো. সামনের টেবিলে চিঠিটা রাখলো। জুতো টাই খুলতে খুলতে গজগজ করতে লাগলো— গাঙ্ক মেল আর কী! ম্যাগাজিন-ফ্যাগাজিন। নিত্য নতুন উঠছে। বিজনেস ম্যাগাজিনের সাইজ আরেকটু ছোট হয় অবশ্য। কে জানে কী!
জুতোটা গুছিয়ে রাখলো। টাইটা টাঙালো। কিন্তু শার্টটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে দিল। –ড্যামিট। কী গরম সারাদিন!— শুধু প্যান্ট পরে কিছুক্ষণ একটা রিক্লাইনিং চেয়ারে চোখ বুজিয়ে বসে রইলো কিছুক্ষণ।
হঠাৎ বিরক্ত স্বরে বলে উঠলো— বক বক বক। বকতেও পারে বটে!
উঠে বাথরুম গেল। শর্টস পরে ফিরে এলো কিছুক্ষণ পরে। দরজায় টোকা। চেঁচিয়ে বললো— কাম ইন।
বেয়ারা ঢুকলো। ট্রেভর্তি খাবার, টিপট সব সোফার সামনের টেবিলে রেখে গেল। আস্তে আস্তে এসে বসলো রঞ্জন। চা ঢেলে চুমুক দিল, একটা প্যাটিস জাতীয় কিছুতে কামড় দিল আনমনে।— ওহ দ্যাট জাঙ্ক মেল!
খামটা তুলে নিয়ে একটু চেষ্টা করে ওপরের সেলোটেপ খুলে ফেলে খামটা খুললো, ভেতরে আর একটা বড় থাম, গাঢ় রক্তের মতো লাল, যাকে বলে খুন খারাপি রং। তাতে সোনালি মনোগ্রাম।
আরে কী ব্যাপার! বুড়ি তাহলে এবার বুঝেছে!— উল্লাস ছড়িয়ে পড়ে তার মুখে। ডাকো! ডাকো মা রাজরাজেশ্বরী, ইগো ত্যাগ করে রঞ্জননারায়ণের পায়ে পড়ো। না হলে যাচ্ছি না। নো ওয়ে।
খামের ভেতরে একটা কার্ড। শুভবিবাহ লেখা। পড়ছে ছেড়ে ছেড়ে।
২৫এ ফাল্গুন গোধূলি লগ্নে…প্রয়াত ক্যাপটেন সুরজলাল ভাটিয়ার কন্যা কল্যাণীয়া তেজস্বিনীর সঙ্গে…আমার পুত্র স্বর্গত প্রভাসরঞ্জনের দ্বিতীয় পুত্র শ্রীমান সৌভিক নারায়ণের শুভ বিবাহ সম্পন্ন হইবে।
ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো রঞ্জন চিঠিটার দিকে। তারপর সামনের খাবারের ট্রেতে একটা লাথি মারলো। ঝনঝন করে কাঁচ ভেঙে ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে। বাঁ হাতের ওপর ডান হাত দিয়ে ঘুষি মেরে গর্জন করতে লাগলো ড্যাম ইট। ড্যাম দ্যাট ওল্ড হ্যাগ।
মুখটা তার ছেলেমানুষি চেহারা ছেড়ে অতি ভয়ংকর দেখাচ্ছে এখন। মোবাইল ফের বার করলো। ওহ দ্যাট গডফরসেকন ল্যান্ড কানট বি রীচড়। আবার ফোনে একটা নম্বর টিপলো। ওদিক থেকে সাড়া এলো— হ্যালো!
রঞ্জন বললো— সরিৎ শিগগির একবার আসতে পারবে?
আরে আমার ডিউটি শেষ হতে আরও এক ঘণ্টা।
রঞ্জন চাপা গর্জন করে উঠলো— ড্যামিট। ওসব আমি শুনতে চাই না। এক্ষুনি এসো। দিস মিনিট। কোনও অজুহাত নয়। ইট ইজ অ্যাজ ইম্পর্ট্যান্ট অ্যাজ হেল।
ফোন অফ করে বসে পড়লো সোফায়। পা দিয়ে বাকি যা টেবিলে ছিল ফেলে দিল এক ঝটকায়। পা একটু কেটে রক্ত ফুটে উঠলো। গ্রাহ্যও করলো না। মুখের চেহারা বাঘের মতো। মাথার চুলগুলো ঝাঁকালো, তারপর দুহাতে চুল আঁকড়ে বসে রইলো।
সরিতের কর্মক্ষেত্র থেকে এই হোটেল বেশি দুরে ময়। কিন্তু ঝড় উঠছে। মিনিট কুড়ি লাগলো তার পৌঁছতে। কী ব্যাপার? এইরকম তাড়া! ফোনের মধ্যে দিয়ে যতটা ক্রোধ ততটাই বিপন্নতা টের পাওয়া যাচ্ছিল। চাকরি স্থলে কিছু হল না কি? চিরদিনই মেজাজি, খেয়ালি রঞ্জন। কিন্তু কতটা পরিবর্তন তার হয়েছে সে জানে না। সত্যি কথা বলতে কি এখন মনে হচ্ছে ওর জন্য কোথাও সুপারিশ করাও ঝুঁকির কাজ। সে জানে কতটা দায়িত্ববোধ ওর। কারুর অধীনে কাজ করার মনোবৃত্তিই ওর নেই। ক্ষমতাটা বড় কথা নয়। মিলিটারি মেজাজ, জমিদারি মেজাজ। রঞ্জন নিজেও জানে না সে কতটা অনুপযুক্ত যে কোনও চাকরির। শুধু তার মনোভাব, দৃষ্টিভঙ্গির জন্যে। এখন কী শুনতে হবে কে জানে! কিন্তু সে সরিৎ, কর্তব্য বা দায়িত্ব এড়ানোর ছেলে নয়। কমিটমেন্ট জিনিসটা তার মজ্জাগত। সে পরিবারের প্রতিই হোক, বন্ধুর প্রতিই হোক। রঞ্জনের ঘরের নম্বর সে জানে, রিসেপশনের লোকেরা তাকে চিনে হাসলো। সরিৎ ওপরে উঠে গেল। দরজায় নক করতে, ভেতর থেকে একটা চাপা হুংকার ভেসে এলো— কাম ইন, না হালুম বোঝা দায়। সরিতের হাসি পেয়ে গেল। কী মনে করে ছেলেটা? ওর এই হালুম-হুলুম সর্বত্র চলবে। বুদ্ধমির একটা সীমা আছে। দরজা খুলেই সরিৎ আঁতকে উঠলো।
চতুর্দিকে ভাঙা পেয়ালা পিরিচ। টি পটের ভাঙ্গা নলটা বড় সড় একটা শামুকের মতো সামনে পড়ে বসেছে। সেই সঙ্গে খ্যাতলানো, ভাঙা খাবার, রক্ত।
এ কী! ব্যাপার কী রঞ্জন! এত কাঁচ ভাঙলো কে? পাল্টা কেটে গেছে যে! ইশ বেশ রক্ত পড়ছে…
উত্তরে রঞ্জন শুধু উচ্চারণের অযোগ্য একটা চার অক্ষরের ইংরেজি অশ্লীলতা উচ্চারণ করলো, টেবিলে ঘুষি মেরে বললো— ড্যাম, ড্যাম ইট।
সরিৎ সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোন তুললো, নির্দেশ দিল। কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বসবার জায়গা বলতে খাট। সে এগিয়ে গিয়ে খাটের ওপর কিছু পড়েছে কিনা দেখলো। একটু পরেই অবশ্য হোটেলের স্টাফ ঢুকলো, নিঃশব্দে ঘর পরিষ্কার করে চলে গেল। আরও একজন ঢুকলো হাতে একটা ফার্স্ট এড বক্স। পায়ের কাটা জায়গাটা মুছে, ওষুধ লাগিয়ে একটা স্ট্রিপ লাগিয়ে দিল। চলে গেল। রঞ্জন চিৎকার করে বললো— হুইস্কি অন দা রকস্। অ্যান্ড স্টপ দ্যাট ড্যাড্ এ.সি.। আই ফীল সিক।
সরিৎ এগিয়ে গিয়ে এ.সি.টা বন্ধ করে দিল। তার ইঙ্গিতে লোকটি পর্দা সরিয়ে জানলা খুলে দিল।
বাইরের প্রচণ্ড ঝড়ের তাণ্ডব সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঢুকে পড়লো। সব ওলটপালট করে দিচ্ছে। সরিৎ জানলাটা বন্ধ করতে গেল। রঞ্জন বলে উঠলো— থাক। এবার সরিৎ তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো কী হল রঞ্জন? কী হয়েছে?— লাল চোখে শুধু একবার তাকালো রঞ্জন। হুইস্কি এসেছে। সামনে লম্বা গ্লাসে বরফ দিয়ে ঢেলে ঠিকঠাক করে দিল বেয়ারা। আইস বাস্কেট আর বোতল রেখে চলে গেল। এক চুমুকে গ্লাস খালি করে দিল রঞ্জন। চিঠিটা মাটিতে পড়ে আছে সোফার গা ঘেঁষে, আঙুল দিয়ে শুধু দেখালো সেটাকে। সরিৎ চিঠিঠা ভুলে পড়লো। বললো— ভালো খবর তো। তোমার মেজদার বিয়ে হয়েছে আজ নাইনটিস্থ মার্চ মানে কদিন আগেই…তো কী! দেরি হয়ে গেছে, উৎসবে যোগ দিতে পারো নি? ঠিক আছে, এখন যাও ঘুরে এসো, দাদাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে…
কথা শেষ করতে দিল না রঞ্জন। বিকৃত গলায় বলে উঠল— আইল কিল দ্যাট রাস্কেল।
কী ব্যাপার বলো তো? সরিতের স্বরে বিরক্তি গোপন নেই।
ক্যান য়ু ইম্যাজিন ইট! আমার ছোটবেলাকার বন্ধু জিনির সঙ্গে বুড়ি সৌভিকের বিয়ে দিয়ে দিয়েছে।
সরিৎ চুপ করে গেল। একটু পরে ইতস্তত করে বললো— এই তেজস্বিনীই সেই মানে যাকে তুমি….
রঞ্জন উদ্ধত গলায় বললো— হ্যাঁ, ইয়েস, রিজেক্ট করেছিলাম। ইচ্ছে হয়েছিল করেছিলাম। পানিশমেন্ট। আমার ওপর মেজাজ দেখায় এত বড় সাহস…! তার মানেই বুড়ি তার সঙ্গে সৌভিকের…ওহ গড।
দু হাতে মুখ ঢেকে বসে থাকে রঞ্জন। সামনে সরিৎ চুপ। বৃষ্টি শুরু হল। ঠং ঠং আওয়াজ হচ্ছে। সরিৎ বললো— শিলাবৃষ্টি নাকি! সে উঠে জানলার কাছে যায়। রঞ্জন তীব্র গলায় বলে উঠলো— সরিৎ জানলা থাক। ইটস আ হেইল স্টর্ম অলরাইট, লেট ইট ডেসট্রয় এভরি ড্যামড্ থিং…।
একটু পরে হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়। জানলার ধারে সরিতের কাছে চলে যায়। বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে দুজনেই, সরিৎ সরে এলো। বসলো সোফায়। রঞ্জন একটা ঝাঁকুনি দিয়ে পেছন ফিবলো, বিদ্রুপের স্বরে বললো— তোমার সেই ঝুড়ি? প্রশ্নের ঝুড়ি নাবাবে না? কেন? ‘কী? কেমন? কেন…কেন…কেন…।
সরিৎ শান্তভাবে বললো— এখন রাগারাগি করে তো লাভ নেই। হঠকারিতা করেছো। তার ফল। কাম ইয়োরসেল্ফ প্লিজ— আমি চললাম।
সে চলে গেল। দরজা বন্ধ হবার শব্দ হল। ঠাস করে। সরিৎ বিরক্ত হয়েছে।
.
রঞ্জন কিন্তু নিজেকে শান্ত করতে পারলো না। সেই যে ঘরে দু তিনটে হুইস্কির বোতল আনিয়ে নেয়, ব্যাস আর বেরোয় না, অফিস টফিস সব ভুলে মেরে দিয়েছে বোধহয়। তৃতীয় দিনে সরিৎ আবার এলো। সে খবর পেয়েছে রঞ্জন অফিসে আসছে না। তবে কি ও দ্বীপে চলে গেল? গেলেই ভালো করবে। যা হয়ে গেছে তা আর ফেরানো যাবে না। কিন্তু রাজেশ্বরী দেবীর সঙ্গে একটা বোঝাপড়ায় আসতে পারে। চান্স আছে। সরিৎ মনে মনে খুবই চাইছে রঞ্জন তার নিজের জায়গায় ফিরে যাক। এই মাতঙ্গকে সামলানো তার পক্ষে সম্ভব নয়। উঃ কী ভীষণ জট যে পাকিয়েছে!
রঞ্জনের হোটেলের কাউন্টারে এসে দাঁড়াতেই কিন্তু রিসেপশনিস্ট ছেলেটি বলে উঠলো— স্যার আপনি আর.এন.মুখার্জির বন্ধু না?
— হ্যাঁ কেন বলুন তো?
— উই আর ইন ট্রাবল। ভদ্রলোক কাল থেকে ক্রমাগত ড্রিংক করে যাচ্ছেন। ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার কিচ্ছু খাননি। দরজা খুলছেন না। সাড়া দিচ্ছেন না। আমরা ইন্টারকমে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তুলে রেখে দিচ্ছেন। কিম্বা বেজেই যাচ্ছে। মুশকিল করলে তো! সরিৎ একটু ভাবলো, তারপর বললো— ওর ঘরের ডুপ্লিকেট চাবিটা নিয়ে একটু যেতে পারি।
ছেলেটি বললো— নিশ্চয়ই। সেটাই তো আমরা চাইছি।
সরিৎ একটু এগিয়ে আবার ফিরে এলো। বললো— লুক, আই ওয়ন্ট সামবডি টু গো উইথ মি। আর ডাক্তার চাইলে সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যাবে তো?
ছেলেটি বললো— আমি কল প্লেস করে দিচ্ছি। রিসক্ নেওয়ার দরকার কী! পার্টিশন ঠেলে সে বেরিয়ে এলো।
আধো অন্ধকার ঘরে রঞ্জন উপুড় হয়ে ঘুমোচ্ছে। চারদিকে জিনিসপত্র ছড়ানো। সাবধানে এগিয়ে গেল সরিৎ।
রঞ্জন! রঞ্জন!— উঠলো না।
জল আনব স্যার?— রিসেপশনিস্ট বললো— জল আনতে সরিৎ জোর করে রঞ্জনকে চিত করে দিল, তারপর ক্রমাগত জলের ছিটে দিতে লাগলো মুখে।
মুখটা ঝাঁকিয়ে অল্প চোখ মেললো সে, অস্ফুটে বললো— ডোন্ট ডিসটার্ব মি য়ু বাগার।
গেট আপ রঞ্জন, যতক্ষণ না উঠছো আমি কিন্তু ছাড়বো না। ভাই আপনি ডাক্তার এলে ইমিডিয়েটলি ওপরে নিয়ে আসুন।
রঞ্জন এবার ভালো করে চোখ মেললো কোথায়? ওহ এটা কি নরক-ফরক? ওহ সরিৎ! আমি একটা বিশ্রী স্বপ্ন দেখেছি। সে উঠে বসলো।
কাল থেকে তো শুনছি কিছু খাওনি। ডাক্তার আসছেন।
ওহ আ অ্যাম স্টার্ভিং শিগগির কিছু আনতে বলো। বাট..ডাক্তার? কেন? আই সিম্পলি হ্যাড আ ব্যাড ড্রিম। ইটস ওভার নাউ।
ডাক্তারকে নিয়ে একজন ঘরে ঢুকলো। এবং সেই মুহূর্তেই সরিতের সেল ফোনটা বাজলো।
সরিৎদা, তুমি চেয়ারে নেই। কোথায় আছো?— সুমনার গলা ভেসে এলো।
একটু বাইরে এসেছি সুমনা, হয়তো আজ আর ফিরবো না। আমার এক বন্ধু অসুস্থ।
কে বন্ধু? আমি তো জানতুম আমিই তোমার একমাত্র বন্ধু। হাসছে সুমনা— রঞ্জননারায়ণ না কি!
সরিৎ বললো— রাইট!
সুমনা সঙ্গে সঙ্গে বললো— আমি আসছি এক্ষুনি। ফোনটা বন্ধ করে দিল। সরিৎ হতাশ ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকালো। রঞ্জন বললো— কে?
সরিৎ বললো— সুমনা। আসছে, এক্ষুনি। তোমার হঠাৎ অসুখ করেছে, তাই।
ওহ গড। রঞ্জন ধপাস করে শুয়ে পড়লো। তারপর বললো— এই কে আছো ঘরটা সাফ করে দাও। দিস মোমেন্ট। হঠাও হঠাও সব। কুইক। জানলাগুলো খুলে দাও তো সরিৎ। পাখা খুলে দাও। এইও! রুম ফ্রেশনার টার আছে? এক্ষুণি স্প্রে করো, এক্ষুনি
ডাক্তার বললেন— কী ব্যাপার? আপনার অসুবিধেটা কী!— তিনি ব্লাড প্রেশার মাপতে শুরু করছেন। রঞ্জন বলে উঠলো— নাথিং। অ্যাকচুয়ালি আমার একটু বেশি ড্রিঙ্ক করা হয়ে গেছে।
রিসেপশনিস্ট বললো— উনি কাল সারাদিন, আজ এখনও পর্যন্ত কিছু খাননি।
ডাক্তার মৃদু হেসে বললেন— এখন খিদে পাচ্ছে তো! খান যত খুশি খেয়ে নিন।
রঞ্জন রিসেপশনিস্টকে বললো— কিচেনে বলে দিন শুধু স্যুপ আর স্যান্ডউইচ। আর কিছু না। ফর দা টাইম বিয়িং। ডক্টর, ভাইরাল ফিভার হলে তো এইসব মানে একটু হালকা খাওয়াই ভালো।
হতভম্ব ডাক্তারকে পেরিয়ে তার চোখ পৌঁছোয় সরিতের দিকে। সরিৎ প্লিজ, নাক মলছি, কান মলছি আর করবো না। ডোন্ট ডিসক্লোজ দিস প্লিজ।
এই সময়ে সুমনা ঢুকলো। রঞ্জন চেঁচিয়ে বলে উঠলো— না না, এখন আর জ্বর— টর নেই। কাল মাঝরাত থেকে প্রচণ্ড মাথার যন্ত্রণা…
সুমনা সামনে আসতে রঞ্জন আবার তড়াক করে উঠে বসলো—
আরে সুমনা! তুমি কোত্থেকে? এই সরিৎটা এত বাড়াবাড়ি করে না। বসো, বসো ওদিকে। ঠিক আছে ডক্টর, ব্লাডটেস্টটা কালকেই তাহলে…. থ্যাংকিউ বাই!
ডাক্তার ও রিসেপশনিস্ট চোখ চাওয়া চাওয়ি করে মুচকি হেসে চলে গেলেন। খাবার ট্রে হাতে লোক ঢুকলো, সাজিয়ে দিল। রঞ্জন প্রায় বাঘের মতো থাবা দিয়ে একটা স্যান্ডউইচ তুলে নিল।
সুমনা বললো, যাক খিদে আছে। এটা ভালো লক্ষণ। কলকাতার যা হাল হয়েছে না! ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, এনকেফেলাইটিস…কিছু আর বাকি নেই।
রিয়্যালি! ডিসগাস্টিং!…রঞ্জন বললো।
সুমনা বললো— দয়া করে কদিন একটু রেস্ট নিন, বুঝলেন। নইলে আপনাকে পার্সেলে করে আপনার ঠাকুমার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
হেসে রঞ্জন চোখ বড় বড় করে বললো— ওরে বাবা একেবারে বাঘিনীর খপ্পরে।
ইতিমধ্যে সরিৎ আর সুমনার জন্যেও কিছু স্ন্যাকস কফি ইত্যাদি নিয়ে এলো একটি বেয়ারা।
সুমনা প্লেট থেকে একটা ভাজা মুরগীর টুকরো তুলে নিয়ে বললো— রঞ্জনদা আপনি এখন সুপ ফুপ খান। আমরা আপনাকে দেখিয়ে দেখিয়ে ভালো-ভালো জিনিস খাবো। সরিৎদা আপনার খিদে পায়নি?
সরিৎ বললো— তা আবার পায় নি? চীয়ার্স রঞ্জন।— আবহাওয়াটা চট করে হালকা হয়ে গেল।
.
রঞ্জনের ওখান থেকে যখন ওরা বেরলো রাত সাড়ে আটটা তো হবেই। সুমনা ভয় পাবার মতো কিছু দেখেনি, সাধারণ জ্বর-টর হবে রঞ্জনের। সে বললো— কাল কি আমরা অ্যাকাডেমিতে যাচ্ছি সরিৎদা? সরিৎ অন্যমনস্ক হয়ে ছিল, বললো— ও হ্যাঁ অ্যাকাডেমি। শিওর।
আর্ট এগজিবিশন চট করে বাদ দেয় না সরিৎ। সময় করে নেয়। সুমনা নিজে ছবি আঁকে। তারও বেশ আগ্রহ আছে। বেশ কয়েকজন নতুন শিল্পী মিলে এগজিবিশন করছেন। বেশ কিছুদিন ধরেই ওরা চেষ্টা করছিল অফিসের পর অ্যাকাডেমিতে যাবার। গাড়ি পার্ক করে সরিৎ কিছুক্ষণ বসে রইলো। কী যেন ভাবছে। একটু পরে বললো— চলো।
সেন্ট্রাল গ্যালারিতে এগজিবিশন। ঢোকার পথে লেডি বানু মুখার্জির ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে পড়লো সুমনা। দাঁড়িয়েই রয়েছে।
সরিৎ বললো— কী হল, ছবিটা কি তুমি আগে দ্যাখো নি?
— ছবিটা আমাকে কেমন টানে সরিৎদা। কী পার্সোনালিটি! পুরোটা বেরিয়ে এসেছে অতুল বোসের হাতে। আই উইশ আই হ্যাড মেট হার।
সরিৎ হেসে বললো— মারা গেলেন। কী উপায়! আমারও তো ইচ্ছে করে বেগম আখতারের সামনে বসে গান শুনি। যদি রবীন্দ্রনাথের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারতাম!
সুমনা বললো— ওঁর সেই সূর্য প্রণামের সময়ে। না ধ্যানস্থ। প্রথম সূর্যের আলো এসে পড়েছে রুপোলি চুলে….
সরিৎ বললো— তোমার এসব মনে হয়? তুমি কনভেন্টে মানুষ না?
সুমনা বললো— তুমিও তো ক্রিশ্চান স্কুলে কলেজে পড়েছো।
সরিৎ বললো— আগাগোড়া বিলিতি প্রথায় কিন্তু আমি মানুষ হইনি সুমনা। আমার আদি বাড়ি ছিল পাইকপাড়ায়। খাঁটি বাঙালি রীতি-নীতি প্রচলিত ছিল সেখানে। ঘটপুজো হত। রবীন্দ্রনাথ, সুভাষচন্দ্র, বিবেকানন্দ এঁদের আমরা দেবতার মতো ভক্তি করতে শিখেছিলাম।
দেবতার মতো! এটা একটু যুক্তিহীন নয় সরিৎদা? এটা কি ঠিক? ন্যাশন্যাল ক্যারেকটারটার ক্ষতি করে না?
বাঃ বাঃ— সরিৎ হেসে ফেললো— তুমি আমাদের জাতীয় চরিত্র-টরিত্র নিয়েও ভাবো! আমি তো জানতাম তুমি একটা ডাকু মেয়ে, ইমপালসিভ, রোম্যান্টিক…. সুমনা বললো— তা যদি বলো, ডাকাতি দমন শাখায় আমি ভালোই মানাতে পারবো। এই যে হাত দেখছো, শক্ত লোহা! ক্যারাটের বাবা!
সরিৎ বললো— তাই না কি? তা একদিন পরখ হয়ে যাক।
যাক, আমার আপত্তি নেই। তুমি কতদিন শিখেছো?
সরিৎ বললো— এক দিনও না! -বলতে বলতে আস্তে আস্তে হাতটা পেছনে নিয়ে গিয়ে সুমনার একটা হাতের পাতা বজ্রমুষ্টিতে ধরলো। সুমনা অবাক হয়ে গেছে। একটু টানাটানি করলো, ছাড়াতে পারলো না। হঠাৎ সরিৎ হাতটা ছেড়ে দিল।
সুমনা বললো— ওরে বাপ! এ তো আয়রন গ্রিপ। যাকে ধরবে আর ছাড়বে না, উঃ এখনও লাগছে।
লাগছে? স্যরি। আসলে কী জানো সুমনা। য়ু আর রাইট ইন আ ওয়ে। যাকে ধরি তাকে আমি আর ছাড়ি না। ধরি অনেক ভেবে চিন্তে। তাই ছাড়ার প্রশ্ন নেই। নো নেভার।
সুমনা অবাক হয়ে গেছে— কিছু হয়েছে? সরিৎদা?
কই কিছু না তো! সরিতের মুখ স্বাভাবিক।
তুমি হঠাৎ কী রকম অন্যরকম হয়ে গেলে আমার মনে হল তোমাকে আমি চিনি না! সরিৎ শান্ত গলায় বললো— তোমাকেই কি আমি চিনি সুমনা! চিনতে সময় লাগে। ধৈর্য লাগে, আই কিউ লাগে।
আই কিউও লাগে? মানুষ কি ম্যাথস্ না কুইজ!
দুজনে এগজিবিশন দেখলো। কিন্তু সরিৎ খুব অন্যমনস্ক। সুমনার স্বাভাবিক উচ্ছলতাটা চলে গেল। সে মন দিয়ে ছবিগুলো দেখলো। কোনও মন্তব্য করলো না।
পরে ওরা বেরিয়ে পেছন দিকের দোকানটায় গেল। কফি নিল। সরিৎ বললো—
ডবল কাপ দাও ভাই, ছ্যাঁকা লাগবে। আর কিছু খাবে সুমনা?
— না না।
দুজনে সরে এসে একটা সিঁড়ির ধাপে বসলো। চুপচাপ। একটু পরে সুমনা বললো— হঠাৎ তোমার মুডটা কেমন পাল্টে গেল সরিৎদা! আই ডোন্ট লাইক ইট! সবই তোমার পছন্দসই হবে এ কথা তোমায় কে বললো? কনভেন্টের সন্ন্যাসিনীরা?
সুমনা বললো— তাঁরা তো উল্টো কথাই বলেছিলেন। বলেছিলেন সতর্ক থাকবে। কাউকে বেশি বিশ্বাসও করবে না। অবিশ্বাসও করবে না।
সরিৎ শুধু বললো—হুঁ।
— আমি কি কোনও ভুল করেছি? তোমাকে আঘাত দিয়েছি?
সরিৎ এবার হেসে বললো— তুমি… ভুল? আমাকে… আঘাত? ওহ সুমনা তুমি পারো বটে। হাবে-ভাবে প্র্যাকটিক্যাল দেখালে কী হবে! আসলে …
সুমনা বললো— ইমোশন্যাল ফুল?
সরিৎ তাড়াতাড়ি বললো— তাই বলেছি! তবে সুমনা তুমি তো ছেলেমানুষই… মানে লোকে যেমন একটা কথার কথা বলে না! টেক কেয়ার অব ইয়োরসেলফ সেটাই আমি আন্তরিকভাবে বলছি। আই মীন ইট।
‘মীন’ শব্দটার ওপর জোর দিল সে। হাঁটতে হাঁটতে দুজনে গাড়িতে উঠলো। সারা রাস্তা আর বিশেষ কথা হল না। সুমনাকে নামিয়ে দিয়ে হুশ করে চলে গেল সরিৎ।
