১৪
সুমনা নিজের ঘরে ড্রেসিং টেবিলের সামনের টুলে পুতুলের মতো বসেছিল। তার কেমন বুক জ্বলছে। কীভাবে কথা বলে এরা! এই কি বনেদিয়ানার শিক্ষা। কী বিশ্রী রুচি! ছি ছি! রঞ্জন মাঝে মাঝে ওর বউদি ও ভাইয়ের বউয়ের কথা বলে ওকে হাসাত বটে! জানলায় সূক্ষ্ম জাল দেওয়া। তা সত্ত্বেও খাটে মশারি টাঙানো টান টান করে। সুমনার পোশাক পাল্টানো হয়ে গেছে। সে আনমনে মুখে ক্রিম ঘষছে। দরজায় টোকা পড়লো দুবার।
সুমনা তাড়াতাড়ি হাউজকোট চাপিয়ে নিল। দরজা খুললো। বাইরে তেজস্বিনী।
বললো— সরি টু ডিসটার্ব য়ু। দেখতে এলাম সব ঠিক আছে কি না। কোনও অসুবিধা?
না ধন্যবাদ।
— কী ক্রিম মাখছো? ড্রেসিং টেবলের ড্রয়ারে সব আছে। কসমেটিকস্। সব রঞ্জনের পছন্দের। ইমপোর্টেড। ওর পছন্দের পার্ফম রয়েছে। তুমি বোধহয় জানো, …জানো না? আই সি।— তার কথার মধ্যে একটা গোপন বিদ্বেষ। যদিও আপাতদৃষ্টিতে খুব ভদ্র। আয়নার দিকে তাকিয়ে সুমনা দেখতে পেল তেজস্বিনী ওর দিকে চেয়ে রয়েছে। দৃষ্টিটার মানে বুঝতে পারলো না সুমনা। হঠাৎ ঘাড় ফিরিয়ে বললো— গুড নাইট। বেড-এর সঙ্গে বেল আছে। দরকার হলে টিপো। রতনলাল চলে আসবে।
দরজা বন্ধ করতে করতে সুমনার মনে হল মেয়েটি সত্যিই আশ্চর্য সুন্দর। কী গ্রেসফুল, কী পয়েজ! অন্য দুজনের মতো একেবারে না। এত সুন্দরী, গুণী একটি মেয়েকে ছেড়ে রঞ্জন কেন তাকে বিয়ে করল! আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বর দিকে তাকিয়ে তার চোখ জলে ভরে এল। তবু, তবু রঞ্জন তাকেই ভালোবেসেছিল। ভালোবাসা সম্পূর্ণ আলাদা জাতের জিনিস। সৌন্দর্য দিয়ে, গুণ দিয়ে কিছু দিয়েই তাকে পাওয়া যায় না। কোনও অন্তর্নিহিত রহস্যময় কারণে একজনের সঙ্গে আরেকজনের মনের মিল হয়। সেই মিল তারই সঙ্গে খুঁজে পেল রঞ্জন।
অন্যমনেই সে ড্রয়ার খুলল। বাস্। সত্যিই কসমেটিকস-এ ভর্তি। এ সব এ সব তো কোনদিন তাকে কিনে দেয়নি রঞ্জন! কে জানে হয়ত পেরে উঠতো না। রাজকুমারের রুচি তো এইরকম মহার্ঘ হবেই। কিন্তু সে যদি রাজ্যহারা হয়, যদি মাসমাইনেতে সংসার চালাতে হয়…! একটা পার্ফম তুলে নিল সে। আরে এইটাই তো সে নিজেই একদিন কিনে মেখেছিল! খুব দামী ফরাসি পার্ফম। কী ভীষণ রেগে গিয়েছিল সেদিন রঞ্জন! বাতাসে নাক তুলে বললো— এ পার্ফুম তুমি কোথায় পেলে? আই হেট ইট। কোনদিন আর ব্যবহার করবে না। শিশিটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল জানলা দিয়ে। আশ্চর্য! সে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তবে! তবে কি এ পার্ফম তেজস্বিনীরই? তেজস্বিনী ব্র্যান্ড? তাই সহ্য করতে পারতো না! কী অদ্ভুত সম্পর্ক! এত সুন্দর গন্ধ। সেটাও অসহ্য?
দরজায় আবার টোকা পড়লো।
উঃ। এরা তাকে শান্তিতে ঘুমোতেও দেবে না। সে একবার ব্যাগের দিকে চাইল। ওতে একটা সরু ছুরি আছে। বার করবে না কি? নাঃ থাক। সে সাবধানে দরজাটা খুললো। বাইরে প্রদীপনারায়ণ।
সস্ মানে সুমনা। প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড, য়ু আর আ ওয়ান্ডারফুল গার্ল। কিছু মনে করো না কারো কথায়, ব্যবহারে। দে… দে আর… উই আর অ্যান আনফর্চুনেট লট ভাই। মাফ করে দিও।— হঠাৎ মুখ তুলে ভদ্রলোক বললেন—
হঠাৎ মুখ তুলে ভদ্রলোক বললেন— ও কী? কেয়া? কেয়া কে রেখেছে তোমার ঘরে? কেয়ার গন্ধে সাপখোপ আসতে পারে। এই দ্বীপে ওই জিনিসটির অভাব নেই। বি কেয়ারফুল। একটু দাঁড়ালেন যেন আরও কিছু বলবেন, বললেন না, ইতস্তত করলেন একটু তারপর বললেন, আচ্ছা আসি। হ্যাভ আ গুড স্লীপ।
দরজা বন্ধ করে ফুলদানটার দিকে তাকিয়ে রইলো সে। তাই বলো? কিছু সাদা থোকা থোকা ফুল ছিল, যার থেকে বেছে চুলে পরেছিল সে। মাঝখানে এই লম্বা ফুলটাই সেই বিখ্যাত কেতকী? নামই শুনেছে। দেখেনি কখনও। কী উগ্র গন্ধ! সাপ আসে! কী ভয়ানক! কেউ কি এইভাবে তাকে খুন করার চেষ্টা করছে? ভাগ্যিস টুকটুককে আনেনি। ভাগ্যিস সরিৎদার কথা শুনেছিল! ফুলটা সুন্দর। সে ফুলটা তুলে নিয়ে জানলার কাছে গেল। একটা ফ্রেমের মধ্যে জাল, এগুলো খুলে নেওয়া যায়। সে এদিক-ওদিক দেখে ফ্রেমটা খুলে নিল, তারপর ছুঁড়ে ফেলে দিল ফুলটা। পাখা চালিয়ে দিল জোরে। তারপর মশারি তুলে ভেতরে ঢুকে গেল।
