শাকম্ভরীর দ্বীপ – ১

জমকালো হোটেল বিল্ডিংটার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখলো সুমনা। কতবার এখান দিয়ে যাওয়া-আসা করেছে। সেভাবে লক্ষ্য করে নি। পার্ক স্ট্রিট মানেই ভালো ভালো হোটেল, রেস্তোরাঁ। উল্টোদিকের ফুটপাত থেকে এখন দেখছে, কেননা এটাই তার নতুন কর্মক্ষেত্র। সাধারণ একটা অ্যাড ফার্ম থেকে এই যে লিফ্‌টটা ও পেলো, এটা ভাগ্য বলতে হবে। এই চাকরিটার দৌলতে এখন থেকে সে মিসেস রডরিগস-এর গেস্ট হাউজে একটা পুরো স্যুইট নিয়ে থাকতে পারবে। শোবার ঘর, বসবার লাউঞ্জ, সেখানেই কিচেন আর টয়লেট। ইচ্ছে করলে এখনও মিসেস রডরিস্-এর কাছে খাওয়ার বন্দোবস্তটা রাখতেই পারে। ইচ্ছে করবে কিনা সেটা একটু ভাবতে হবে। কদিন না গেলে বলা যাচ্ছে না। শিফ্‌ট ডিউটি করে তো অভ্যেস নেই! যে শিফটে কাজ করবে সেই শিটের সময়ে লাঞ্চ বা ডিনার হোটেলেই পাবে। ব্যবস্থাটা তার পক্ষে সুবিধের। খানিকটা টাকা জমিয়ে নিয়ে হোটেল ম্যানেজমেন্টের একটা কোর্স করে নেবার খুব ইচ্ছে আছে।

নেভি-ব্লু লং স্কার্ট আর একটা চমৎকার লাল রঙের কোট এই হল তার ড্রেস। নেভি ব্লু রংটার সঙ্গে স্কুলের দিনগুলো মিশে আছে। স্কুলের দিন, কনভেন্টের দিন। হঠাৎই যেন নিজেকে আঠারো বছর আঠারো বছর লাগে। মনে হয় এক্ষুনি গিয়ে কোর্টে দাঁড়াতে হবে, হাতে টেনিস র‍্যাকেট। স্পোর্টস-এর দিনগুলো ফিরে এলো যেন। বাজ্ করে একাট গুঞ্জনধ্বনির মতো উঠছে। বোলতার চাকে খোঁচা দিয়েছে যেন কেউ। গ্যালারির একদিকে মাদার সুপিরিয়র, সিস্টার জেন, সিস্টার অর্পিতা, সব বসে, আরও টিচাররা, তিনদিক জুড়ে স্কুলের প্রেপ থেকে টুয়েলভ্ পর্যন্ত মেয়ের দল। কোর্টের একদিকে সে র‍্যাকেট হাতে দুলছে, অন্যদিকে শিকারীর চোখে তার হাতের দিকে তাকিয়ে রয়েছে স্যারা, মিসেস ডিবেচার মেয়ে। দারুণ খেলতো।

মাথাটা ঝাঁকিয়ে নিয়ে এই সময়ে ফিরে আসে সুমনা। কেন যে কনভেন্টের অতীত কিছুতেই তার পিছু ছাড়ছে না! কেন যে তার সিস্টার সুচরিতা, সিস্টার জেন আর মাদার সুপিরিয়রকে সব সময়ে মনে পড়ে! কেন যে সে এখনও ওই সময়টার ওপর নির্ভর করে আছে! সে তো ছোট থেকেই জানতো সে একলা। মোটামুটি একটা শিক্ষার পর তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে এবং বাদবাকি জীবন নিজের মগজ দুটো হাত দুটো পা-র ওপর ভরসা করেই একা-একা পথ চলতে হবে।

রাস্তা পেরিয়ে উল্টো দিকে যায় সে। গেটম্যান দরজা খুলে দেয়। ভেতরে শীতল আরাম। কয়েকটা ধাপ উঠে সে পৌঁছে যায় রিসেপশন কাউন্টারে।

গুড মর্নিং। এই মেয়েটির নাম বোধহয় মল্লিকা, রায় না কর কিছু একটা। সুন্দর হেসে তাকে অভ্যর্থনা জানালো।

—মর্নিং। তোমাকে প্রথমে অফিসে যেতে হবে— কাউন্টারের একটা দিক খুলে ধরলো মল্লিকা।

স্বভাবতই। অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার সরিৎ বিশ্বাসের কাছেই তাকে রিপোর্ট করতে হবে। উনিই স্টাফ-ম্যানেজমেন্টে আছেন। ইন্টারভিউয়েও ছিলেন। বেশি কথা বলেন নি। যখন সে বললো, কনভেন্টে মানুষ, বাবা-মা কেউই নেই তখন তার দিকে কীরকম করে যেন তাকিয়েছিলেন দু পলক। দৃষ্টিটার মানে সে এখনও বুঝতে পারেনি।

.

ঘণ্টা বাজছে দূরে— তার জন্য বিশেষ প্রেয়ার। যখন সমবেত সিস্টারদের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো— সিস্টার সুচরিতা ওকে জড়িয়ে ধরলেন। সবাইকারই চোখ ছলছল করছে। মাদার বললেন— একটা সীমানা ছাড়িয়ে তুমি আরও বড় একটা জায়গায় যাচ্ছো সুমনা, আটকে থাকবার কোনও মানে নেই। এখন তোমাকে আরও প্র্যাকটিক্যাল হতে হবে। প্রস্তুত থেকো। অপ্রত্যাশিত আঘাত, সংকট, আবার অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তিও হতে পারে। প্রস্তুতিই বাস্তবের মোকাবিলা করবার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। তুমি মনে রাখবে তোমার মা মৃত্যুর আগে তোমাকে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তোমাকে আমরা স্নেহমমতা দিয়ে মানুষ করেছি। এই স্নেহমমতা বা নিরাপত্তা তুমি বাইরের জীবনে পাবে না। নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে হবে।

সিস্টার জেন তখন খুব হাসছিলেন— ভয় পাবে সুমনা? ওর গাছে চড়া আর পাঁচিলে হাঁটা মনে আছে?

মাদার কিন্তু একইরকম সিরিয়াস। বললেন— যা-ই করুক সে তো আমাদের এই চৌহদ্দির মধ্যে জেন! পৃথিবী বড় কঠিন ঠাঁই। চট করে কাউকে বিশ্বাসও করবে না, অবিশ্বাসও করবে না, সতর্ক থাকবে, আর মনটাকে নিজের আয়ত্তে রাখবে। তাহলে আর কোনও বিপদ তোমার কাছে ঘেঁষতে পারবে না। এটাই এক মাত্র রক্ষা কবচ, মনে রেখো সুমনা।

— মাদার। আমি কি আর আপনাদের কেউ নই? কেউ থাকবো না?— সে থাকতে না পেরে বলেছিল।

তখন মাদার তাকে কোলে টেনে নিয়েছিলেন।— ভুল বুঝো না সুমনা। বিপদে আপদে সব সময়ে আমাদের পাশে পাবে।

আসবার সময়ে কিন্তু তার ভয়-টয় করেনি। সত্যি বলতে কি খুব একটা রোমাঞ্চ হচ্ছিল। রিপন স্ট্রিটে গেস্ট হাউসটা ওঁরাই দেখেশুনে ঠিক করে দিয়েছিলেন। প্রতি রবিবার সে কনভেন্টে যেতো। এখন কাজ বেড়েছে। বন্ধু বেড়েছে। এখন অতটা পারে না। এখানে যেমন। একটা অফ ডে আছে। কিন্তু রবিবার-টার নেই।

মা-বাবা নেই। না হয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু কোনও আত্মীয়স্বজনও নেই? কাকা? পিসি? মামা? এসব প্রশ্নগুলো অবশ্য অনেক বড় হয়ে তার মনে উঠেছে। কেন না সম্পর্কগুলোর কথা তো সে জানতোই না। ক্লাসে বন্ধুদের কাছে শুনে শুনে মনে হতে থাকে। তখন সে সিস্টারদের জেরা করতে শুরু করে। ‘তোমার মা ছিলেন সদ্য বিধবা, শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে এসে আমাদের হসপিটালে ভর্তি হলেন, তোমার সেই দাদু ঠাকুমা সারাক্ষণ কান্নাকাটি করছিলেন ছেলে মারা গেছে বলে, তোমার মাকে “অপয়া” বলছিলেন। তোমার জন্ম দিয়ে কদিন পরে যখন উনি মারা গেলেন, আর ওঁরা এ মুখো হলেন না। মেয়ে হয়েছে শুনেই কী রাগারাগি। ওঁরা অন্য কোথাও টাউনে থাকতেন, শেয়ালদার ঠিকানা দিয়েছিলেন। সেটা একটা হোটেল। আমরা ওঁদের ট্রেস করতে পারিনি। খুব সম্ভব ছেলে হলে নিয়ে যেতেন।’ খুবই হতাশাজনক খবর।

—কেন সিস্টার?

—আরে এ দেশে মেয়ে লোকে চায় না। বিয়ে দিতে হবে, ডাউরি দিতে হবে। বংশরক্ষা করবে না। এইসব নানান কুসংস্কার…

যে দেশ আর সমাজের চেহারা সে ওই আড়াল থেকে দেখেছিল তা মানুষকে দমিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু সে ছিল ডাকাবুকো, অত সহজে ভেঙে পড়বার পাত্র নয়। তাকে ওঁরা খুব যত্ন করেই মানুষ করেছিলেন। চার বছর পর্যন্ত হসপিটালে। তারপর নার্সারি, ক্রেশ, সন্ধে হলে কনভেন্টে। ওঁদের বারাসতে অরফ্যানেজ আছে। কিন্তু সুমনাকে ওঁরা সেখানে রাখেন নি। সিস্টার জেন আর সিস্টার সুচরিতার ঘরে সে বড় হয়েছে। তারপর হস্টেল। নিজেদেরই ক্যাম্পাসের মধ্যে হস্টেল। হস্টেলের বন্ধুরা যে যার সময় পার হলে বাড়ি ফিরে গেল। সে স্কুলবোর্ডিং থেকে কলেজ হস্টেল তারপর অচেনা পৃথিবী। সুমনা, তোমার কেউ নেই, তোমার শুধু তুমিই আছো। এই মন্ত্রটা সে ক্রমাগত জপ করে যায়। সকালে ঘুম থেকে উঠেই বলে। রাত্তিরবেলা শোবার আগে প্রার্থনা করাও তার কনভেন্টের অভ্যাস। সে সময়েও ওই একই মন্ত্র সে জপ করে— সুমনা তোমার কেউ নেই, তোমার শুধু তুমিই আছো। তবে ওই দুবারই। বিষণ্ণ থাকা তার স্বভাব নয়। সারাদিনটা সে যথেষ্ট ব্যস্ত থাকে। সকালে উঠে নিজের খাবারটা নিজে করে নেওয়া। তারপর চান-টান করে তৈরি হওয়া, আয়নায় নিজেকে একবার দেখে নেওয়া, কাঁধ পর্যন্ত স্টেপ কাট ঢেউ খেলানো চুল, অ্যাথলিট চেহারা, খুব ফিট। পাঁচ সাত মতো হাইট হবে তার। রঙটা উত্তরাধিকার সূত্রে খুব উজ্জ্বল পেয়েছে, মুখশ্রী ভালো। কিন্তু তার আসল সৌন্দর্য হল স্বাস্থ্য। সপ্রতিভতা, শিক্ষার, আত্মপ্রত্যয়ের দীপ্তি, এবং তার অজেয় মনোভাব। কিছুদিন আগেই মল্লিকা বলছিল— য়ু নো হোয়াট আই লাইক অ্যাবাউট য়ু বেস্ট? ইয়োর পজিটিভ অ্যাটিটিউড, য়ু হ্যাভ নিদার এনি কমপ্লেক্স, নর এয়ার্স।

অনাথ, আত্মীয়পরিজনহীন, সন্ন্যাসিনীদের আশ্রয়ে ও করুণায় বড় হয়ে ওঠা একটি মেয়ের পক্ষে এগুলো খুব কম প্রশংসা নয়!

সুমনা বছর দুয়েক হল কনভেন্ট ছেড়েছে। কিন্তু এখনই পর্যন্ত যত জনকে দেখেছে, যত জনের সঙ্গে আলাপ হয়েছে সবাইকেই তার ভালো লাগে। মিসেস রডরিগস, ওঁর নাকটা একটু বেশি লম্বা, সুমনা ভাব দেখায় ও তাঁর সব কথাই মানছে খুব। উনি তাতেই খুশি। প্রথম প্রথম তার অনাথত্ব নিয়ে উনি খুব অপবিত্র কৌতূহল প্রকাশ করেছিলেন। খুবই।

—তাই তো! তোমার তো খুব কষ্ট সুমনা, মা বাবার নাম পর্যন্ত জানো না।

—কে বললে জানি না! মায়ের নাম সুরমা মণ্ডল। বাবা অনন্তনাথ মণ্ডল।।

—তাই বলো। কী বলে ওকে? বে আইনি, ইললিগ্যাল চাইল্ড নও তাহলে! নট দ্যাট আই মাউন্ড, বুঝলে? সকলেই ঈশ্বরের পুত্র-কন্যা আমার চোখে।… আনফর্চুনেট, ভেরি আনফর্চুনেট!

ওর ভালো লাগে নি। কী করে লাগবে! কিন্তু ও কথাগুলো ঝেড়ে ফেলে দিয়েছিল। সিস্টার সুচরিতা আসার আগে একদিন একান্তে বলেছিলেন, সুমনা নিজের জন্ম, এই যে তুমি পিতৃমাতৃহীন…এ নিয়ে বাইরের পৃথিবীতে কিছু কুৎসিত কৌতূহল, বাঁকা মন্তব্য তুমি শুনতেই পারো। সেগুলো নিয়ে অনর্থক ব্রুড করো না। তোমার অবশ্যই পরিচয় আছে। হসপিট্যালের রেজিস্টারে এনট্রিটা তোমাকে দেখিয়েছি আমরা শুধু তোমার মনে বিশ্বাস জাগাতে কিন্তু এখন তুমি বড় হয়েছো তোমার বোঝা উচিত, ইললিগ্যাল কথাটার মধ্যেও শিশুর সম্পর্কে কোনও অসম্মান থাকার কথা নয়।

—তাহলে কি আমি ইললিগ্যাল সিস্টার? আমাকে ভোলাবার জন্যে…

—নো, নো, হাজারবাব না সুমনা। এবং ওইজন্যেই তোমাকে অরফ্যানেজে না রেখে আমরা নিয়মবহির্ভূতভাবে নিজেদের মধ্যে রেখে বড় করেছি। আমি তোমাকে বোঝাতে চাইছি ইট ডাজ নট মেক এনি ডিফারেন্স। এই ধরো, বারাসতের অরফ্যানেজে এমন অনেক শিশু আছে, যাদের বাবা-মা পালন করতে না পেরে আমাদের কাছে নিঃশর্তভাবে দিয়ে দিয়েছে। তাদের লিগ্যাল হয়েই বা কী লাভ হল?

মিসেস রডরিগস এর কৌতূহলে উত্তেজিত না হয়ে হাসিমুখে কদিন জবাব দিতেই উনি মিইয়ে গেলেন। এখন তো উনি তাকে রীতিমতো পছন্দ করেন। উপদেশ বর্ষণ করে যান, তুমি কোনও ফ্যামিলির মধ্যে বড় হওনি তো, কে আর তোমাকে সাবধান করবে, কটা কথা বললে নিশ্চয় কিছু মনে করবে না।

—না না, বলুন না। — সুমনা বললো না সাবধান করার বিষয়ে মঠগুলো পরিবারের থেকে কিছু কম যায় না।

—মানে বুঝলে, এই ইয়াং মেন সব আজকালকার, একদম বাজে রদ্দি। মিশতে তোমাকে হবেই। কিন্তু খুব সাবধানে মিশবে। কারো কথায় ভুলবে না একদম। দে আর ফুল অব প্রমিস। রেসপনসিবিলিটি নেবার বেলায় চুঁ চুঁ। অ্যান অপরচুনিস্ট লট, ফিক, সেলফিশ অ্যাজ লং অ্যাজ পসিবল নো ডেটিং। বুঝলে তো! ডেট করতে চাইলেই আমার কাছে নিয়ে আসবে। আমি খোলনলচে উল্টে-পাল্টে দেখে নেবো তারপর চুজ সামবডি স্টেব্‌ল্, ফেয়ারলি মানিড, অ্যান্ড সেল্‌ ডাউন। আরেকটা কথা, কারো কথায় কখনো চাকরি ছাড়বে না। বুঝলে? এই আমি ছেড়েছিলাম। তারপর ফটাস করে মিঃ রডরিগস মারা গেলেন। ছেলেটাকে মানুষ করতে হবে। কী করি? চাকরি আর পেলুম না। অন দা রং সাইড অব ফর্টি। লজার নিতে শুরু করলাম। এখন ছেলে ম্যারিনে আছে। ভালো আয় করে। আমাকে পাঠায়। চুপচাপ ইনভেস্ট করে দিই। আমার নিজস্ব রোজগার এই লজিং— এ আমি ঈশ্বর যতদিন না আমায় ডেকে নিচ্ছেন করে যাবো।

খুবই বাস্তববোধসম্পন্ন মহিলা। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কথা বলেন, সে কান পেতে শোনে। কোনও মন্তব্য করে না।

লাঞ্চের সময়ে ডাইনিং হলে একসঙ্গে বসতে বসতে সরিৎ বিশ্বাসের সঙ্গে তার বেশ আলাপ হয়ে গেছে। বয়স হয়তো সবে ত্রিশ পার হয়েছে কি না হয়েছে। সরিৎদা একজন দুর্দান্ত দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ। খুব আন্তরিক এবং ভদ্র। কোনদিন তার কনভেন্ট তার ব্যাকগ্রাউন্ড, জন্মবৃত্তান্ত এসব নিয়ে কৌতূহল প্রকাশ করেন না। সরিৎদার ম্যান-ম্যানেজমেন্ট এত ভালো যে যতদিন উনি এসেছেন অর্থাৎ গত তিন চার বছর এই হোটেলে যেমন কোনও লেবার প্রবলেম নেই, তেমন কর্মীদের কাজকর্মে ভদ্রতায় কোনও গাফিলতিও নেই। বেয়ারা, বেল-বয়, জমাদার সব রকমের হাউজস্টাফ কেউ এমন নেই, যাকে উনি নিজের ব্যবহার দিয়ে জিতে নেননি। মাঝে মধ্যেই টুক করে রিসেপশন ডেস্কে দাঁড়াবেন। কোনও বিশেষ পার্টি এলে তো আসবেন বটেই। ব্যাংকোয়েট হল কনফারেন্স রুম কেউ ভাড়া নিলে উনি নিজে তদারকি করবেন দাঁড়িয়ে। আরও ভালো ভালো রেস্তোরাঁ থাকতেও এই ফোর স্টার হোটেলের আতিথ্যের বিশেষ সুনাম আছে এটা কাউন্টারে দাঁড়িয়ে বেশ ভালো বুঝতে পারে সুমনা। জার্মানি থেকে কেউ ফোন করছে, তার ইংরেজি বোঝা দুঃসাধ্য— সরিৎদা এসে জার্মানে কথা বলে তাঁর রুম বুকিং, ছোট কনফারেন্সরুম বুকিং সব করে দিয়ে গেলেন। বেশির ভাগ অন্য প্রদেশীয় বা বিদেশীয়রা ফোন করেই বলেন ওঁদের কোনও চেনা পরিচিত এখানেই রেকমেন্ড করেছেন ওঁদের। সরিট বিশওয়াস নামে সামবডি আছেন না এখানে ম্যানেজার?

এই সরিৎদাকেই সে একদিন মিসেস রডরিগস-এর গেস্ট হাউজে ডেকেছিল। ওঁকে আর মল্লিকাকে। থাই রান্না করে খাওয়ালো। এই কুকারি কোর্সটা ও নিয়েছিল তার পরীক্ষা হল সেদিন। মিসেস রডরিগসও নিমন্ত্রিত ছিলেন। খেয়ে সবাই খুব খুশি। ওরা চলে যাবার পর রাতে মিসেস রডরিগস এসে বললেন— ডিপেন্ডেন্ত্। য়ু ক্যান গো অ্যাহেড।

—আরে? কী বলছেন রডরিগস মাসি?

— ওই যে বিশ্বাস! হি ইজ গুড।

ঠোঁট কামড়ে সে বললো— একটু বেশি বেশি না?

— এই তো তোমাদের দোষ। এইসব আজকালকার মেয়ে তোমরা, নটি গার্লস, তোমরা ফ্লার্টিং, মিসচীফ…এই সব ভালোবাসো। দ্যাট ল্যান্ডস ইউ ইন ট্রাবল, মাইন্ড য়ু। সে বললো না— এই সরিৎদাকে তার সত্যিই দাদা মনে হয়। তার জোর ফু হয়েছিল। তিনদিন যেতে পারেনি। দ্বিতীয়দিনেই এসে খোঁজ নিলেন। বললেন— ফু জিনিসটাকে কখনো লাইটলি নেবে না। প্যারাসিটামল খেয়ে জ্বর কমালে শুধু হবে? নিজের গাড়িতে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন।

ফেরার সময়ে মুচকি হেসে সুমনা বলেছিল— আপনার ম্যান ম্যানেজমেন্টে এটা আছে নাকি সরিৎদা?

খুব স্মার্ট। ঘাবড়ালেন না। হেসে বললেন— ম্যানের আগে একটা হিউ বসিয়ে নাও, আর বুঝতে অসুবিধে হবে না।

কখনও মল্লিকার সঙ্গে কখনও সরিৎদার সঙ্গে সে সিনেমা দেখে। আর বাড়ি বসে টি.ভি.র নব ঘুরিয়ে টেনিস। হোটেলেও রিসেপশন কাউন্টারের উল্টো দিকে একটা টি.ভি.সেট উঁচুতে বসানো আছে কোণাকুণি। সেটাতেও বেশির ভাগ সময়ে স্পোর্টস চ্যানেল ধরাই থাকে।

সেদিনও সকালে বোর্ডাররা অনেকেই কাউন্টারে চাবি রেখে বেরিয়ে গেছে। সে একাই বসে খাতা থেকে কমপিউটারে তুলছিল তথ্যগুলো।

ক্যান আই মীট সরিৎ বিশ্বাস।

গলার স্বরটা দারুণ, ভদ্রলোক নিশ্চয়ই গান টান করেন মনে করে সে মুখ তুলে দেখে তার সামনে একটি রীতিমতো রূপবান যুবক দাঁড়িয়ে। বড়ি-বিল্ডিং-টিং করে বোধহয়। একেবারে বেতের মতো চেহারা, মুখটা এত ছেলেমানুষি মাখানো যে মায়া হয়।

—জাস্ট গো ইনসাইড দা রুম অন দা লেফ্‌ট্।

ছেলেটি চলে গেল। স্টেপগুলো নিলো স্প্রিং-এর মতো।

মিনিট দশেক পরে সরিৎ যুবকটিকে নিয়ে কথা বলতে বলতে বাইরে বেরিয়ে এলো। দুজনে কথাবার্তায় মগ্ন। নিশ্চয় সরিতের খুব বন্ধু।

—টেনিস আছে সাউথ ক্লাবে, যাবে নাকি? যুবকটি বললো।

—এখনও টেনিসে টিকে আছো? সরিৎ জবাব দিল, দুজনেই হো হো করে হাসছে। সুমনা কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু কানে আসছে কথাগুলো।

ছেলেটি বললো— ফ্রম হকি টু ক্রিকেট, ক্রিকেট টু টেনিস এটা তো স্বীকার করবে রঞ্জন নারায়ণ মুখার্জি একজন অলরাউন্ডার ইন এভরি সেন্স অব দা টার্ম। চট করে চোখ তুললো সুমনা। কথার শেষে সরিতের দিকে চেয়ে বাঁ চোখটা টিপলো ছেলেটি। সরিৎ বললো— তোমার অ্যাডভেঞ্চারের গল্প শুনতে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। গ্রো আপ মাই ফ্রেন্ড। বয়সটা কমছে না বাড়ছে?

উত্তর এলো— বাড়ছে? হাসালে সরিৎ আ অ্যাম জাস্ট ইয়োর এজ, টোয়েন্টি এইট, বাট আই লুক ইয়ংগার।

সুমনা এবার মুখ তুলে তাকালো। সত্যিই কিন্তু তার মনে হয়েছিল এ ছেলে তাদের সমসাময়িক হলেও হতে পারে। চোখাচোখি হয়ে গেল। যুবকটি বললো— হাই!

সে-ও বললো— হাই! তারপর কাজে মনোনিবেশ করলো।

রঞ্জন বললো— তাহলে আসছো তো সরিৎ? রিমেমবার দোজ ডেজ উই ইউজড্ টু বি পার্টনার্স…

—অর রাইভ্যালস্! রাইট!

রঞ্জন ছেলেটি হেসে সরিতের কাঁধে একটা থাবড়া মারলো— বেশ, যেটা তোমার পছন্দ। পার্টনারশিপ, রাইভ্যালরি দুটো চয়েসই রইলো। এসো কিন্তু, জোর খেলা হচ্ছে।

কয়েক পদক্ষেপে কাচের দরজার কাছে পৌঁছে গেল রঞ্জন, বেরিয়ে যেতে যেতে মুখ ফিরিয়ে সুমনার দিকে চাইলো, বললো— সি ইউ!

.

সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে ভালো করে একবার চান করে নেয় সুমনা। এটা ওর বহুদিনের অভ্যেস। আসলে প্রতিদিনই, স্কুলই হোক কলেজই হোক, বিকেলবেলা খানিকটা গা সে ঘামাবেই। কোনও খেলা না হলে অন্তত দৌড়। তাই বাড়ি ঢুকেই আগে চান। জীবন পাল্টে যায়। অভ্যেস পাল্টায় না। সে কি জানতো তার এইরকম একটা স্থাণু চাকরি হবে! সারাদিন, কাউন্টারের পেছনে, পাশে কমপিউটার। একের পর এক অতিথির সঙ্গে ভদ্রতা ও হাসি বিনিময়। নাঃ সে ভাবে নি। ট্রেনিং! ট্রেনিং বিনা, আরও ডিপ্লোমা ডিগ্রি বিনা সে কী-ই বা করতে পারে আর! আর চাকরি মানেই বোধহয় এইরকম স্থাণুত্ব। সবই তো ডেস্ক ওয়ার্ক। এক যদি মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ হওয়া যেত, ট্রাভলিং সেলসম্যান…।

ঘরে পা দিতে দিতে সে আপন মনেই বলছিল— ওহ্ তোমাকে বড্ড মিস করছি। বড্ডই।

রুচি— আরেকজন বোর্ডার, বোধহয় বাইরে দিয়ে যাচ্ছিল, গলা বাড়িয়ে বললো— কাকে! কোন সে ভাগ্যবান বয়ফ্রেন্ড ভাই!

সুমনা বললো— মারো গোলি বয়ফ্রেন্ডকো। আমি টেনিসের কথা ভাবছিলাম। এসো না!— সে দরজাটা ভালো করে খুলে ধরলো। বললো— আমার খেলাধুলোর বারোটা বেজে গেল এই চাকরি করতে গিয়ে। না খেললে তখন খিদে হত না, ঘুম হত না।

রুচি হেসে বললো— বেশ। চাকরিটা ছেড়ে দিলেই তো হয়।

—দানাপানি? সুমনা মুখে একটা মজার ভঙ্গি করে বললো— কীধর মিলেগা ভাই?

রুচি বললো —কেন? টেনিস ফেনিসে তো মিলিয়ন মাল্টি-মিলিয়ন ডলার ঘোরাফেরা করে শুনতে পাই।

হেসে ফেললো সুমনা।

—বাঃ হাসির কী হল? — রুচি একটা চেয়ারে গুছিয়ে বসে বললো।

—আরে রুচিদিদি টেনিস মানেই কি স্টেফি গ্রাফ কি শারাপোভা? স্রেফ ভালোবাসা খেলাটার জন্য। গভীর ভালোবাসা। অনেক খেলার জন্যেই। খেলাই আমার সবচেয়ে বড় রিল্যাকসেশন বলো রিল্যাকসেশন, রিক্রিয়েশন বলো রিক্রিয়েশন। কিন্তু চাকরি ছেড়ে দিলে যে টিনের মগ হাতে রাস্তায় বসে যেতে হবে!

তোয়ালেটা মাথায় জড়ানো ছিল। এখন খুলে নিয়ে চুলগুলো আরেকবার মুছে নিয়ে মাথা ঝাড়া দিল সুমনা।

রুচি বললো— একেবারে টিনের মগ? ছদ্মবেশটাও তো নিতে হবে তাহলে! শিওর—

সুমনা বললো—ধরো একটা উলোঝুলো পরচুলা, ফাইন সব বলিরেখা মুখে, হাতটাতগুলো চিরকুট্টি একটা কাপড়ে ঢেকে রাখতে হবে। কত অ্যাক্টিং করেছি। একবার গো অ্যাজ য়ু লাইক-এ রাণী রাসমণির স্ট্যাচু হয়েছিলাম, দেড় ঘণ্টা একঠায় বসে।

কথা বলতে বলতে সে টি.ভি. সেটটার দিকে এগিয়ে যায়। নব ঘুরিয়ে ঘুরিযে কোনও একটা টেনিস টুর্নামেন্টের রিপ্লে খুলে বসে পড়ে। চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলে— ফল্ট, ডাবল্ ফল্ট— দূর, সামপ্রাস তো সার্ভেই জিতে যাবে।

রুচি বললো— কী যে আগডোম বাসডোম বকিস। ধুৎ, সে চলে যায়।

সুমনা লক্ষ্যই করে না বন্ধুর প্রস্থান। আর হঠাৎ মনে পড়ে যায— হাঃ হাঃ ফ্রম হকি টু ক্রিকেট, ক্রিকেট টু টেনিস…অলরাউন্ডার ইন এভরি সেন্‌স অব দা টার্ম। কী যেন সরিৎদার বন্ধুর নামটা! রণেন…রণেন্দ্র…কীরকম জমিদার জমিদার নাম ধুৎ একদম মনে পড়ছে না। রণেন্দ্রনারায়ণ মুখার্জি…ওঃ হো রঞ্জননারায়ণ। কী লাকি! খেলাধুলোয় আছে। পার্ফেক্ট স্পোর্টসম্যান। আর সেইজন্যেই ওরকম চাবুকের মতো চলাফেরা। সেইজন্যেই সরল দেবদূতের মতো মুখ। চট করে দেখা যায় না। কী লাকি! ইশশ্…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *