৮
অতঃপর ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের অফিসে দুজনে। সরিৎ আর মল্লিকা রঞ্জনের দুই সহকর্মী এরা সাক্ষী। সরিৎ গম্ভীর। মল্লিকা উচ্ছল।
রঞ্জনকে এত প্রশান্ত দেখাচ্ছে যে চেনা যাচ্ছে না। সে হাসিমুখে বললো— সিঁদুর পরাবো?
সরিৎ বললো— এটা সিভল ম্যারেজ রঞ্জন, তোমরা যে যার ধর্মমত অনুযায়ী চলতে পারবে। কী সুমনা?
সুমনা অপ্রতিভভাবে বললো— না, মানে সিঁদুরটা ঠিক…
রঞ্জন হেসে বললো— ঠিক আছে ঠিক আছে। সিঁদুর অর নো সিঁদুর…তুমি এখন থেকে মিসেস রঞ্জননারায়ণ মুখার্জি।
মল্লিকা বললো— বউয়ের নামটা কেড়ে নিচ্ছেন কেন রঞ্জনদা, টু ব্যাড। সুমনা মুখার্জি। কী সুমনা?
সুমনা হেসে বললো— একশবার।
সরিৎ হাসল, বললো— যাক। তবু ভালো।
সেদিন সরিৎ-সুমনার হোটেলেই বিয়ের খাওয়াটা হল। সরিতের আয়োজন। তারপর ওরা চলে গেল প্রিয়নাথ মুখার্জি লেনের একটা ছোট ফ্ল্যাটে।
.
এইখানেই পরে একদিন সরিৎ রঞ্জন মুখোমুখি হয়।
ফ্ল্যাটটা ছোট, সাধারণ, নতুন রং করা। পরিচ্ছন্ন। বাইরের ঘরে বেতের আসবাব। একদিকে নিচু তক্তপোশে গালচে পাতা। দুজনে চুপচাপ বসে আছে। সুমনা আপাতত নেই। সন্ধেবেলা।
রঞ্জন উচ্ছলভাবে বলে উঠলো— কী রকম দেখছো সরিৎ?
সরিৎ বললো— দেখাটা বড় না বোঝাটা বড় ভাবছি রঞ্জন। ভেবে স্থির করতে পারছি না।
দুজনে দুজনের দিকে সন্ধানী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
কিছুক্ষণ পর সরিৎ বললো— কাজটা কি তুমি ঠিক করলে?
রঞ্জন উঠে দাঁড়ায়।— চমৎকার! আমার নিজের ইচ্ছেমতো ভালোবাসবার অধিকারও নেই।
সরিৎ বললো— নিশ্চয় আছে। তবে এই সেদিন যে তেজস্বিনীর বিয়ে হয়ে গেছে বলে উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলে।
সরিৎ। বোঝবার চেষ্টা করো। দ্যাট চ্যাপটার ইজ ওভার। আমার ওই কষ্টটা কেটে গেছে সুমনাকে পেয়ে। আমি ওকে ভালোবাসি, গডস্ ট্রুথ।
সরিৎ সংক্ষেপে বললো— আই হোপ সো।
তোমার কেন এত সন্দেহ হচ্ছে আমি জানি না সরিৎ।
সরিৎ সোজাসুজি ওর চোখের দিকে চাইলো, বললো— তুমি এই ধরনের ছোটখাটো ছাপোষা অ্যাডভেঞ্চারহীন গৃহস্থজীবনের জন্যে তৈরি নও রঞ্জন, স্বীকার করো।
— ভাবছি, রঞ্জন বললো— কিন্তু এটাও তো ঠিক ওই অ্যাডভেঞ্চার আধিপত্য ধনসম্পত্তি ওই জীবনের আসল চেহারাটা আমি দেখতে পেয়েছি। মানুষ তো বদলায়।
— আই সিনসিয়ারলি হোপ সো…সরিৎ বললো।
এই সময়ে সুমনা হই হই করে ঢুকলো। তার সঙ্গে মুটে।— কী ব্যাপার? পুরো বাজারটাই তুলে আনলে নাকি? রঞ্জন বললো। সুমনা উজ্জ্বল হেসে বার করতে লাগলো তার সওদা। বেডকভার, পাপোশ, ওয়ল হ্যাঙ্গিং,… ভাবতে পারছো? এত সস্তা এত সুন্দর!
রঞ্জন বললো— নাহ, ভাবতে পারছি না। সে উঠে গিয়ে সুমনার গালে নাক ঘষলো। সরিৎ মুখটা ফিরিয়ে নিল।
আরও জিনিস নামাচ্ছে সুমনা। বললো— সরিৎদা এই মুখোশটা দেখো। দারুণ না? আফ্রিকান সর্দার, বান্টু না কী যেন বলে? কী কালারফুল!
রঞ্জন হঠাৎ ভীষণ বিরক্ত হয়ে বললো— উঃ, তুমি আর কিছু পেলে না? দ্যাট ওয়াইল্ড গডড্যামড্ থিং…সে উঠে চলে গেল।
সুমনা বললো— কী হল সরিৎদা? এটা খারাপ?
সরিৎ হাত উল্টে বললো— ওয়াইল্ড তো! বোধহয় ওর আইল্যান্ডের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।
— ইশশ্ সুমনা চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে রইলো। তাই? আমাকে আরও সাবধানে চলতে হবে।
সরিৎ কেমন একটা তিক্ত হাসি হেসে বললো— যা জানোই না, সে বিষয়ে সাবধান তুমি হবে কী করে?
একটা সামান্য মুখোশ দেখে যদি ওর এত রাগ, এত ঘেন্না…আচ্ছা সরিৎদা এ কেমন ঠাকুমা? এ কেমন স্নেহ? বাবা-মা নেই। ছোট থেকে মানুষ করেছেন এত আদরে। নাতির ইচ্ছে-অনিচ্ছের একটুও দাম দেবেন না? ওই জঙ্গুলে দ্বীপে পড়ে থাকতে হবে? কী সাংঘাতিক রাগী, হিংসুটে, পজেসিভ টাইপ!
সরিৎ খুব শান্ত গলায় বললো— অনেকগুলো বিশেষণ ব্যবহার করে ফেললে সুমনা। কিন্তু কে জানে! আমরা তো ভদ্রমহিলাকে ব্যক্তিগতভাবে দেখিনি। চিনি না। একজনের রি-অ্যাকশন থেকে যতটুকু জানা যায়। মানবচরিত্র বড় জটিল সুমনা। কে জানে কোথায় কী ঘটছে, কেন ঘটছে! যাও গে তুমি তোমার ঘরটর সাজাও। আমি চলি। ওকে বলে দিও।
সুমনা সরিতের চলার পথের দিকে তাকিয়ে রইলো। সরিৎদা মাঝে মাঝে কী যে সব রহস্যময় সংশয়ের কথা বলে! কেন যে বলে! তার মনটা খারাপ হয়ে যায়। জটিলের কী আছে! সরিৎদা নিজে কি জটিল? মোটেই না। যা বলে তা করে। অত্যন্ত আন্তরিক। মল্লিকা, রুমা, কেতন, তার কলীগরা সকলেই কী ভালো! আর রঞ্জন! সরিৎদা কি সত্যিই তাকে? নাহ্, মোটেই না। শেষ কথাগুলো সে উচ্চারণ করে বললো। রঞ্জন যে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে জানতো না। রঞ্জন বললো— কী নাহ্!
— কী, বলবো?
রঞ্জন বললো— শুনতেই তো চাইছি।
সুমনা বললো— তুমি বলেছিলে না!
কী?
ওই সরিৎদাকে নিয়ে তুমি জেলাস! ইজ ইট পসিবল রঞ্জন? তুমি থাকতে আর কারো কথা মনে পড়ে? মনে আসে? সত্যি কথা বলবো রঞ্জন। আমি তোমাকে প্রথম দিনই। লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট। তোমার অনেক অনেক আগে থেকে।
রঞ্জন ভীষণ খুশি হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলো, বললো— য়ু আর রং। যে-ই দেখলাম একটা চমৎকার মিষ্টি মেয়ে নেভি ব্লু স্কার্ট আর লাল টুকটুক টপ পরে কাউন্টারের পেছনে দাঁড়িয়ে ভীষণ কেজো কেজো মুখ করে কথাবার্তা বলছে অমনি রঞ্জন নারায়ণ কাত। ওইজন্যেই তো সরিতের কাছে অত যেতাম!
সুমনা বললো— আমার কী ভয় ছিল জানো! তুমি সব দিক থেকেই একেবারে অন্য লেভেলের। আমার থেকে অনেক উচুতে, অনেক দূরে। আমি তোমাকে স্বপ্নে দেখতাম। সত্যি পাবো কল্পনাতেও আসেনি। জানো, আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারি না। মনে হয় স্বপ্নই দেখছি।
রঞ্জন বললো— ভোরের স্বপ্ন। সবসময়ে সত্যি হয়। আই অ্যাডোর য়ু, সুমন। সে সুমনাকে জড়িয়ে ধরে নিবিড়ভাবে চুমো খেল।
রঞ্জন, কিন্তু ঠাকুমাকে তোমার জানানো উচিত। তিনি যেমনই হোন।
— উহুঁ, রঞ্জন বিদ্রূপের গলায় বললো— রাজরাজেশ্বরী থাকুন না বসে তাঁর স্বপ্ন নিয়ে। ছোট্ট রঞ্জননারায়ণ ঠাকুমার কোলে বসে বাঘের বাচ্চা নিয়ে খেলা করছে। অল হিজ লাইফ। কোনদিন বড় হবে না। ঠাকুমা যা হাতে তুলে দেবে তাই নিয়েই আঙুল চুষবে। সে বাঘের বাচ্চাই হোক আর ছেলের হাতের মোয়াই হোক
সুমনা তার মুখে আঙুল চাপা দিল— প্লিজ এভাবে বলো না রঞ্জন। আমার খুব খারাপ লাগে। গিল্টি লাগে। বাবা-মা-ভাই-বোন। ফ্যামিলি কী জিনিস কোনদিন জানিনি।
রঞ্জন বললো— ফ্যামিলি কী জিনিস জানো নি দ্যাটস গডস গ্রেস।
তার মুখ কালো হয়ে রয়েছে।
সুমনা বললো— কী যে বলো, পরিবারই তো সবসময়ে পাশে থাকে, ফ্যামিলিই ওষুধ।
রঞ্জন বললো— শিওর, তবে বড্ড তেতো।
দুজনেই হেসে ফেললো।
সুমনা বললো— দ্যাখো, আমি একদিন চুপি চুপি শাকম্ভরীর দ্বীপে চলে যাবো ঠিক।
এই। এসব ভাবলে আমি কিন্তু সত্যি সত্যি রেগে যাবো। খবরদার নিজের আত্মসম্মান হারাবে না।
সত্যিসত্যিই সুমনা মাঝে মাঝে ভাবতো, হুট করে একদিন চলে গেলে কী হয়! চোখের সামনে দেখলে, নিচু হয়ে সম্মান জানালে কি রাজেশ্বরী দেবী তাকে কাছে ডাকবেন না? কিন্তু ভাবনা ভাবনা-ই।
সুমনা যাই ভাবুক, রঞ্জনের আপত্তি আছে এমন কাজ সে করে না। রাজেশ্বরী দেবী ও তাঁর দ্বীপ সম্পর্কে কৌতূহল কুলুপ বন্ধ হয়ে থাকে, সে মন দিয়ে সংসার করে। কিন্তু রঞ্জন ঘরে থাকতেই চায় না। সে হয় বাইক নিয়ে বাইপাসে ঝড়ের বেগে চলবে। নয় যাবে রেস্তোরাঁয়, বারে, ডিসকোথেকে। সুমনা বুঝতে পারে বড়লোকের ছেলে এইটুকু ফ্ল্যাটে হয়তো ভালো লাগছে না। সে প্রাণপণে চাকরিতে উন্নতি করতে চেষ্টা করে। শিগগিরই তার প্রোমোশনও হয়। লিয়াজঁ অ্যান্ড মিডিয়া পার্সন। তার নিজস্ব ছোট অফিস। নাইট শিফট বলে কিছু নেই। সারাক্ষণ একপায়ে খাড়া থাকতে হয় না। কোনও কোনও দিন বেশি রাতে বাড়ি ফেরে রঞ্জন। মুখে অ্যালকোহলের গন্ধ থাকে। খায় না। সোজা বিছানায় শুয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে ঘুম। আবার কোনও কোনওদিন তাড়াতাড়ি বাড়ি আসে, বলে— চলো ঘুরে আসি।
রঞ্জনকে টেনিসে উৎসাহ দেয় সুমনা। ও নিয়মিত খেলছে আজকাল। ওর টুর্নামেন্ট থাকলেই সুমনা যায়। সরিও যায় কোনও কোনওদিন। রঞ্জন শুরুটা করে খুব উৎসাহের সঙ্গে। কিন্তু একটু পরেই কেমন মিইয়ে যায়। সমানে ডাবল ফল্ট, সমানে সোজা মার ফসকে যাচ্ছে, সুমনা ইশ ইশ করে ওঠে ওর মার দেখে। সরিৎ হেসে বলে— স্টেফি গ্রাফ দর্শকাসনে, আগাসি খেলছে, তবু কিছু হচ্ছে না। র্যাকেট আছড়ে ফেললো রঞ্জন। প্রতিপক্ষের সঙ্গে হাত মেলালো না। সামান্য ম্যানার্সও কি ও ভুলে গেল? সুমনা ভাবে, ওই ছেলেটি নতুন খেলছে, ওর সঙ্গে তো হাসতে হাসতে জেতা উচিত ছিল রঞ্জনের
ওর খেলায় একদম মন ছিল না, বুঝলে সরিৎদা।
সরিৎ অন্যমনস্ক। বললো— ফ্রাসট্রেশনটা কিসের? সুমনা ঝগড়া বিবাদ কিছু… ঝগড়া-বিবাদ ওর সঙ্গে আমার? হাসালে সরিৎদা।
সরিৎ বললো— ঝগড়া-বিবাদ খুব সাধারণ ব্যাপার সুমনা, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হয়েই থাকে।
আমাদের মধ্যে হয় না। আমাকে অধৈর্য হলে চলবে না সরিৎদা। কত বড় আঘাত ওর, ওর সব ক্ষত ভুলিয়ে দেবার জন্যই তো আমার যত চেষ্টা।
সরিৎ একটু চুপ করে থেকে বললো— তুমি খুব বদলে গেছে সুমনা, অগে কত লাইভলি ছিলে, জলি….ছেলেমানুষ…সে সব দিন তো খুব দূরেও নয়…অথচ কোথায় গেল তোমার সেই সাহস? তেজ! ইনডিপেন্ডেন্ট স্পিরিট…তুমি ফিরে এসো সুমনা। সরিতের গলায় কেমন একটা অচেনা আবেগ, তাগিদ যা আগে কখনও সুমনা শোনে নি। সে বললো কোথা থেকে।
— ওই যেখানে চলে গেছ, সেখান থেকে। আমার মনে হয় তুমি একটা অন্ধকার ভয়ের জগতে বাস করছো, কাম ব্যাক টু ইয়োর রিয়্যাল সেলফ্। আমি তো আছি। বলিনি যে কোনও অসুবিধেয় আমাকে বলতে দুবার ভাববে না!
সুমনা একটু তীক্ষ্ণস্বরে বলে উঠলো— বাজে কথা বলো না সরিৎদা। বিয়ে হলে একটু চেঞ্জ হবেই। এখনও আগেকার মতো লাফ-ঝাঁপ, তর্ক, যখন খুশি সিনেমা, বেড়ানো এগুলো পারছি না। সেটাই স্বাভাবিক। আর প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড আমাদের একটা প্রাইভেট লাইফ আছে। সেখানে যদি কোনও সামান্য গোলমালও হয় একজন থার্ড পার্সন, আউটসাইডারের কাছে সে কথা বলতে যাবো? লেট মি গ্ৰো আপ…
যত বলছে সে সরিতের মুখ কালো হয়ে যাচ্ছে। শেষকালটা যেন সপাটে একটা চড় খেলো।
রঞ্জন বেরিয়ে এলো, এই সময়ে। উচ্ছ্বলভাবে বললো— কী? খুব ডিস্যাপয়েন্টেড হয়েছো তো?
সুমনা হেসে উড়িয়ে দিল কথাটা দূর, খেলায় ওরকম হারজিত আছেই। ছাড়ো তো!
রঞ্জন বললো— এনিওয়ে সুমন, তোমাকে বাড়িতে রেখে আমি আর সরিৎ একটু ঘুরে আসি।
সুমনা বললো— কেন? আমি গেলে তোমাদের অসুবিধে হবে?
রঞ্জন বললো— তুমি ভুলে যাচ্ছো সুমনা, ডাক্তার তোমাকে রেস্ট নিতে বলেছেন। এখন বেশি ঘোরাফেরা…চতুর্দিকে যা পলিউশন!
সুমনাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে ওরা দুজন গাড়িতে উঠলো। সরিৎ বললো— কোথায় যেতে চাও?
— এনি প্লেস, চলো বরং কাছাকাছি একটা বার-ফার এ যাই।
— তুমি একটু বেশি ড্রিংক করছো কিন্তু…
- আই নো হোয়াট আ অ্যাম ডুয়িং।
সরিৎ আর কিছু বললোনা। বালিগঞ্জ অঞ্চলেই একটা ছোট্ট বার-কাম রেস্তোরাঁয় ঢুকলো দুজনে। রঞ্জনের ভুরু কুঁচকে আছে। সরিৎ যে খুবই অস্বস্তিতে সেটাও স্পষ্ট। বিয়ারের অর্ডার দিয়ে দুজনে বসলো।
রঞ্জন বলে উঠলো— দ্যাট ওল্ড হ্যাগ। আমার বিয়ের খবর জানিয়ে চিঠি দিয়ে ছিলাম। লিখে পাঠিয়েছে আমার মুখ দেখতে চায় না, লেট দ্যাট ক্রিশ্চান গোল্ড-ডিগার গো টু হেল। সম্পত্তি থেকে ছেঁটে ফেলছে আমাকে। আ অ্যাম টেরিবলি আপসেট।
সরিৎ গ্লাসটা তুলে ধরলো, বললো— হার্ডলি এনি চিয়ার্স লেফ্ট দেন? কিন্তু রঞ্জন এটা তুমি গোড়ার থেকেই জানতে। জানতে না? তখন আমি তোমাকে বোঝাইনি? তুমি যেমন জেদি, উনিও তেমনি। তোমারই ঠাকুমা তো! তখন তুমি বলেছিলে তুমি কিছুর পরোয়া করো না। সম্পত্তিরও না।
গোমড়া মুখে রঞ্জন বললো— এদিকে আবার সুমনা কনসিভ করে বসে আছে।
সরিৎ চমকে উঠলো, শুকনো গলায় বললো— একা একাই করল না কী!
ওঃ তুমি এমন একেকটা কথা বলো না! অসুবিধেটা বোঝো!
দেখো বিয়ে হলে সন্তান-সম্ভাবনা আছেই, না চাইলে প্ল্যান করে চলতে হয়। তা যখন করো নি কাঁদুনি গেয়ে তো লাভ নেই। অসুবিধেটা কিসের? টাকা পয়সার?
সে তো আছেই।
সরিৎ বললো সে না হয় আমি তোমাকে হেল্প করলাম। কিন্তু এত খরচের অভ্যেসটা তো তোমাকে এবার কমাতে হবে। তুমি এখন বিলিওনেয়ারেসের নাতি নও। একজন স্ট্রাগলিং এগজিকিউটিভ। আজকের প্রতিযোগিতার বাজারে তোমাকে প্রতি মুহূর্তে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। তার ওপর তুমি এখন ফ্যামিলি ম্যান। লাইফ স্টাইল বদলাও।
তোমার কথায়?— রঞ্জন ফুঁসে উঠলো— আমার পকেটমানি কত ছিল জানো?
সরিৎ একটু তপ্ত গলায় বললো— জেনে আমার কাজ নেই। এই জীবন তুমি নিজে বেছে নিয়েছো। তখন তোমার প্রচুর উৎসাহ দেখেছি, প্লেন্টি অব ডিটারমিনেশন। তোমার মতন একজন কোয়ালিফায়েড এবলবডিড ইয়াং ম্যান খাটবে নিজের আইডেনটিটি নিজে তৈরি করবে…এতে…
সেভ ইট সরিৎ। রঞ্জন চাপা গলায় প্রায় ধমকে উঠলো— তোমার উপদেশ শুনতে ডাকিনি।
সরিৎ কড়া গলায় বললো— তাহলে কিসের জন্য ডেকেছো? মায়া-কান্না শোনাতে? একদম গোড়ার থেকে তোমায় বলে যাচ্ছি রঞ্জন ঠাকুমার প্রতি তোমার অ্যাটিচ্যুডটা ঠিক না। আই হ্যাভ আসকড্ য়ু টু লীভ সুমনা অ্যালোন!
ধূর্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রঞ্জন বললো— কোথায় তোমার কামড়াচ্ছে আমি জানি সরিৎ। ভেবো না আমি অত আহাম্মক। তবে ফর ইয়োর ইনফর্মেশন শী অ্যাপ্রোভ্ মি ফার্স্ট। পিটিফুল স্টেট। শী ওয়াজ ম্যাডলি ইন লাভ্ উইথ মি, অ্যান্ড আই টুক পিটি অন হার …
লায়ার। মিথ্যে কথা বলছো তুমি। ড্যামড্ চীপ লায়ার…
রঞ্জন একটা ঘুষি তুললো। সরিৎ হাতটা ধরে ফেললো। বললো— সুমনা সম্পর্কে আর একটাও মিথ্যে বাজে মন্তব্য যদি শুনি তোমায় আমি ছেড়ে দেবো না…মনে রেখো…চেয়ারটা ঠেলে উঠে দাঁড়ালো সরিৎ। বেরিয়ে গেল। তার মুখ থমথম করছে।
.
শাকম্ভরীর দ্বীপ থেকে দ্বিতীয় চিঠি এসে পৌঁছলো রঞ্জনের বাড়ির ঠিকানায়। চিঠিটাকে উল্টেপাল্টে অনেকবার আদর করলো সুমনা, ভাবলো খুলবে কিনা। নাঃ অন্যের চিঠি খোলা? ওটা সে পারবে না। রঞ্জন বাড়ি ফিরেছে, সুমনা চিঠিটা পেছনে লুকিয়ে হাসতে থাকে খানিকটা। খানিকটা বাড়াবাড়ির পর চিঠিটা হাতে পেলো রঞ্জন। ঠাকুমা এবারও রঞ্জনকে দ্বীপে যেতে লিখেছেন। কিন্তু শুধু তাকে। মুখটা তার থম থম করছে। সুমনা খুবই নিরাশ। এতদিনে তার মনে অভিমান জমছে। সে বললো— ডেকেছেন। যাও।
নো, নেভার। তোমাকে না ডাকলে যাবো না।
সুমনা বললো— শোনো রঞ্জন, আমি ব্যাপারটা নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখে বুঝতে পারছি। তুমি গোঁয়ার্তুমি করো না। প্লিজ যাও। এভাবেই হয়তো একদিন উনি স্বাভাবিক হয়ে যাবেন।
না-না করে শেষ পর্যন্ত সুমনার জোরাজুরিতে গেল রঞ্জন। উইক-এন্ডটা কাটিয়ে ফিরলো। যেন অনেক নিশ্চিন্ত হয়ে। কিন্তু সুমনার আশা মিটল কই? ঠাকুমা তাকে গ্রহণ করতে এখনও অস্বীকার করেছেন। রঞ্জন বললো— আস্তে আস্তে চেঞ্জ করবে বুড়ি। শী ইজ আ হার্ড নাট টু ক্র্যাক। কিন্তু ওর সম্মতি আমি আদায় করবোই। ধীরে… খুব ধীরে। আরেকটা চিঠি এল। তখন সুমনার বাচ্চা হওয়ার দিন ঘনিয়ে এসেছে। রঞ্জন গেল, ফিরে এল। কিন্তু অফিসের জমা কাজ সামলাতে সে ভীষণ ব্যস্ত। সুমনার যখন মেয়ে হল, পুরো ব্যাপারটা সামলাতে হল সরিৎকে। সিজর হবে। কোথাও রঞ্জনের দেখা নেই, অবশেষে ফর্মে দাদা বলে সই করলো সে। নার্সের কাছে শুনতে হল বাচ্চা ঠিক মায়ের মতো সুন্দর হয়েছে। কিন্তু মামার আদলও নাকি স্পষ্ট বোঝা যায়।
সরিৎ চমকে বললো— নেভার স্পীক সাচ ননসেন্স। একটু পরেই বললো—
পারি সিস্টার। সিস্টার হেসে বললেন— আপনি অত রেগে গেলেন কেন বুঝলাম না। মামার মতো তো বাচ্চারা আকছার হয়।
হালকা গলায় সরিৎ বললো— এত ছোট্ট, আপনারা এসব মিলটিল বুঝতে পারেন?
সিস্টার বললেন— সমানে দেখছি। বুঝবো না? তবে ও কিন্তু দারুণ ফর্সা, একেবারে মেম সাহেবের মতো। আপনি তো নয়ই। ওর মা-ও অতটা ফর্সা নয়। এটা বোধহয় ওর বাবার জিন।
রঞ্জন কিন্তু বাচ্চাটাকে দেখেই বললো এ তো বসানো রাজেশ্বরী ঠাকুরানী!
সাবধানে বাচ্চাটাকে ওর কোলে তুলে দিল সরিৎ। এই সময়ে সিস্টার এসে বললেন— বাচ্চাটাকে এখনই অত নাড়াঘাঁটা করবেন না প্লিজ। বাই দা ওয়ে মিঃ মুখার্জি আপনিই তো বাবা!
রঞ্জন বললো— অবভিয়াসলি।
সিস্টার নীরস গলায় বললেন— আমাদের খুব কনফিউশন হচ্ছিল। আসলেন একজন। অনন্যোপায় হয়ে সইও দিলেন। অথচ বাবা আরেকজন— আনরীচেবল। এরকম সাধারণত হয় না। তবে হ্যাঁ দাদারও একটা দায়িত্ব থাকে বই কি!
রঞ্জনের মুখটা অন্ধকার, সে বললো— হাউ দে টক! মানুষের কাজ থাকতে পারে না? সরিৎ গম্ভীর গলায় বললো— তুমি মোবাইলটা অফ রেখেছিলে কেন? ও বারবার তোমাকে চেষ্টা করেও পায়নি। নিজেই ব্যাগ নিয়ে একা হসপিট্যালে এসেছে। আবার ট্রাই করেছে। পায়নি। তখন আমাকে করেছে।
রঞ্জন হালকা গলায় বললো— আর বলো না। একটার পর একটা বাজে কল। বিরক্ত হয়ে সুইচ অফ করে দিলাম।
কী করে দিলে রঞ্জন? তুমি জানতে না সুমনার টাইম…
— কৈফিয়ত চাইছো? কেমন একটা চাপা হুংকারের মতো করে বললো— রঞ্জন।
সরিৎ বললো— চাইতেই পারি। যে কাজটা তোমার করার ছিল সেটা আমাকে করতে হল কিনা। দেয়ার ওয়ার লস অব ফর্মালিটিজ।
রঞ্জন হঠাৎ খুব উদারভাবে বলে উঠলো— কী জানো সরিৎ শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা ঠিকই হয়েছে। তুমি যত এফিশিয়েন্টলি এ কাজগুলো পারবে, আমি কি ততটা পারতাম? মাই ওয়ার্ল্ড ইজ ডিফরেন্ট। এইসব কাঁথাকানি, ডায়াপার, বেবিফুড, ফীডিং…মিডলক্লাস গেরস্ত টাইপ…
এই সময়ে বেড-এর দিকে থেকে ক্ষীণ স্বর ভেসে আসে। সুমনা বলছে— তোমরা ঝগড়া করো না প্লিজ। বলে আবার ঘুমের অতলে তলিয়ে যায় সে।
সরিৎ বিরক্ত চোখ ফিরিয়ে নেয়।
