শাকম্ভরীর দ্বীপ – ১৯

১৯

ঘরটা ঝলমল ঝলমল করছে আজ। এত আলো ছিল এ ঘরে জানা ছিল না। সিলিং থেকে নানা রকমের উইন্ড চাইম, রুপোলি সোনালি তারা ঝোলানো হয়েছে। নানান জায়গায় গুচ্ছ গুচ্ছ ফুল। ঠাকুমার আসনের পাশে একটা টেবিলের ওপর ট্রেতে, দুটো তিনটে গোছায় সাজানো আছে কার্ড। এক এক করে দুই ছেলে ঢুকলো ডিজাইনার পাঞ্জাবি ও চোস্ত পায়জামা পরে। সত্যিই রাজকুমারের মতো দেখতে লাগছে। বড় বউ শর্মিষ্ঠা জমকালো জরিদার শাড়ি। ছোট বউ লেহেঙ্গা চোলি। দুজনেরই সর্বাঙ্গে ম্যাচিং গয়না। রাজেশ্বরী ঢুকলেন তাঁর হুইল চেয়ারে। পরনে সেই একইরকম ঘিয়ে শাদা সিল্কের শিফন, তফাতের মধ্যে আজ পাড়টা সোনালি জরির। গীতাও ভালো সিল্কের শাড়ি পরে সেজেছে। তেজস্বিনীকে আজ চেনা যাচ্ছে না। তার সেই দৈনন্দিন কালো নয়। আজ সাদা জর্জেট তার অঙ্গে, সরু হিরের কণ্ঠি। হাতে মস্ত বড় হীরের আংটি। তার থেকে আলো ঝলকাচ্ছে। কানেও ছোট ছোট জ্বলজ্বলে হীরে। তাকে অপূর্ব দেখাচ্ছে। সব শেষে রতনলালের সঙ্গে ঢুকলো সুমনা। চৌকাঠ পর্যন্ত তাকে পৌঁছে দিয়ে রতনলাল চলে গেল। সে রাজেশ্বরীর দেওয়া কোনও পোশাক বা গহনা পরেনি। কালো শিফন শাড়ি, ব্লাউজ। কানে গলায় হাতে অকসিডাইজড্ ধাতুর গয়না। লকেট কালো। সকলেই এমন আশ্চর্য হয়ে গেছে যে যে যার আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। একমাত্র রাজেশ্বরীর কোনও ভাবান্তর নেই। বললেন— ওয়েলকাম সুমনা।

সুমনা এগিয়ে এসে হাত জোড় করে নমস্কার করল, কিন্তু কোনও শুভকামনা জানাল না। আজ তার ঠিক উল্টো দিকেই তেজস্বিনী। তাদের দুজনের পাশেই একটা করে খালি চেয়ার। টেবিলে রুপোর প্লেট কাঁটা চামচ ছুরি সব সাজানো। এগুলো কাদের জন্য?

হঠাৎ সব আলো নিভে গিয়ে মোম জ্বলতে লাগল। দেয়ালগিরিতে জ্বলছিলই। সেগুলোই জ্বলছে। মায়াময় হয়ে উঠেছে আবহাওয়া। রাজেশ্বরীর গলা শোনা গেল।

–সুমনা আজ তোমার ডিনার পূর্ব প্রার্থনা করো, আমরা শুনবো, যোগ দেবো। আই লাইক ইট।

সুমনা মাথা নিচু করে বললো— হে ঈশ্বর আজকের এই অন্নজল যে দিয়েছো তার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ জানাই।

রাজেশ্বরী বলে উঠলেন— আশি বছরের যে সুখদুঃখময় জীবনকাল দিয়েছ… হঠাৎ কঠিন গলায় বলে উঠলেন— তার জন্যে তোমায় আমি অভিসম্পাত করি। অভিসম্পাত করি। আই কার্স য়ু হু এভার য়ু আর।

সকলে চমকে উঠলো।

গীতা কার্ডগুলো কারা পাঠিয়েছে। মোটামুটি পড়ে শোনাও। আমার হাতে দাও।

গীতা একটা করে কার্ড কর্ত্রীর হাতে এগিয়ে দেয়। প্রেরকের নাম বলে, রাজেশ্বরী পরিচয় দ্যান।… প্রদীপ তোমার শ্বশুর শাশুড়ি।… রাখী তোমার বাবা-মা।… কলকাতার শিশুতীর্থ অরফ্যানেজ।… মধুপুরের বৃদ্ধাবাস। সৈয়দ আহমদ হাসান, ঢাকার ক্লোদস এক্সপোর্টার।… গগন মেহতাব মণ্ডল, সন্দ্বীপের জমিদার। মিঃ ভানপ্রতাপ বরজাতিয়া স্টীল…আশুতোষ শেঠি, কপার কিং… গোটা কুড়ি পড়বার পর কর্ত্রী বললেন— আর গুলো পরে দেখবো, নিয়ে যাও। নাও তোমরা খাওয়া শুরু করো।

খেতে খেতে নিচু গলায় কথাবার্তা হচ্ছে নিজেদের মধ্যে। তেজস্বিনী সবাইকে একটা করে কেকের টুকরো দিল। সুমনাকে বললো— এটা আসে। আসলে পার্ক স্ট্রিটের কনফেকশনার্স অ্যাসোসিয়েশন অনেকগুলো বিশাল কেক পাঠায়। বেশির ভাগটাই আমরা প্রজাদের মধ্যে বিলি করে দিই। নিজেদের জন্য জাস্ট একটু রেখে দিই। কেক কাটা জন্মদিন উনি পছন্দ করেন না।

সুমনারও স্বাভাবিক গলায় বললো— ও। কোনও প্রশ্ন করল না এ নিয়ে। বরং বললো— আগের দিন একটা ক্রিম দিয়ে চিংড়ি হয়েছিল। সেটার রেসিপি তোমার কাছে চাইবো ভাবছিলাম।

নিজের জন্য না তোমার হোটেলের জন্য?

সুমনা বললো— হোটেল— সে একটু হাসলো। শেফকে অবশ্য একটু গুছিয়ে বললেই ধরে নেবে। আসলে তেজস্বিনী একটু সহজ হতে চেষ্টা করছে। সুমনার মনে হল তারও চেষ্টা করা উচিত। নানারকম তাজা ফল ও শুকনো ফলের একটা অসাধারণ আইসক্রিম এল শেষে। তার ওপর গরম চকো-সস।

এটাও খুব ভালো, সুমনা বললো— ওয়াইন দিয়েছো, না?

তেজস্বিনী হাসলো— তুমি তো অনেক কিছুই জানো।

হঠাৎ রাজেশ্বরীর গলা গমগম করে উঠলো। তোমাদের আমার কিছু বলবার আছে।

সুমনা, জিনি, প্রদীপ, অর্জুন রাখী, শর্মি, তোমরা আমার সবচেয়ে নিকটজন এবং ঈশ্বর, যদি থাকো তো, তুমি আরও বড় আত্মীয় কেন না আমি তো তোমার থেকেই উৎপন্ন হয়েছি, লোকে বলে থাকে। আজ আমার জন্মদিন। আশি বছর পার হয়ে গেল। ভালো কথা, খুব ভালো। আমি বলবো না অনেক হয়েছে এবার আমার চলে যাওয়াই ভালো। আবার এও বলবো না আমাকে বাঁচতে দাও আরও আরও। নিজের জন্যে কোনও খেদ, কোনও দুঃখ আমার নেই। নো রিগ্রেটস। যতদিন বেঁচেছি রাজার মতো বেঁচেছি। বহু সম্পত্তি নাড়াচাড়া করেছি, বহুজনের উপকার করেছি। অন্য যে কোনও শিল্পপতি বা মন্ত্রীশাস্ত্রীর থেকে অনেক বেশি জনকল্যাণের কাজ আমি করেছি। কিন্তু বারবার, বারবার আমার এই জীবন অস্বাভাবিক মৃত্যু দেখেছে অতি আপনজনের। এ কি আমার পাওনা ছিল?— চোখ ওপরের দিকে তুলে বললেন— আমি তখন ১৪ বছরের আমার প্রাণের চেয়ে প্রিয় ভাই জলে ডুবে গেল— এ কিসের শাস্তি? বিবাহ হল, আজ আর বলতে বাধা নেই, এক হিংস্র, দুশ্চরিত্র, বদমেজাজি মেজরের সঙ্গে। একটিমাত্র সন্তান পেলাম। আমার সমস্ত যত্ন, ভালোবাসা, ক্ষমতা দিয়ে তাকে বড় করলাম। বীভৎস এ্যাকসিডেন্টে সে চলে গেল। কেন? কিসের পাওনা? জবাব দাও। সৌভিক। আশা করি এসেছো, আশা করি তোমার জন্য সাজানো আসনে তুমি বসেছো আজ। আমার সবচেয়ে বাধ্য, বিবেচক, চমৎকার মেজাজের নাতি, জবাব দাও তুমি কেন আত্মঘাতী হলে? তেজস্বিনী ভাটিয়া, তোমার মায়ের মৃত্যুর পর নিজের মেয়ের মতো তোমাকে মানুষ করেছি, তোমার বাবা দ্বিতীয় বিবাহ করলে তার আঁচটিও লাগতে দিইনি তোমার গায়ে। আজ এই সবার সামনে বলো সৌভিককে কেন আত্মঘাতী হতে হল। সৌভিক বসে আছে তোমার পাশে, তোমার জবাব শুনবে বলে। আর তোমার সামনে বসে আছে আমার প্রাণপ্রিয় রঞ্জন, তাকে তুমি কেন হত্যা করলে? কী করে করতে পারলে? এই জিঘাংসা কিসের? আর কাল রঞ্জনের স্ত্রীকেই বা হত্যা করতে গিয়েছিলে কেন?

একটা হইচই উঠলো ভীষণ। পটপট করে কয়েকটা আলো জ্বলে উঠলো। তেজস্বিনীর পুরো ব্যক্তিত্ব টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে গেছে। সে মুখ ঢেকে কাঁদছে। মাথা নাড়ছে আর তুমুল কাঁদছে।

অর্জুন উঠে দাঁড়িয়েছিল। সে জোর গলায় বলে উঠল— ঠাকুমা আপনার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে। শোক দুঃখ সবই মানছি। তাই বলে এইভাবে বিনা কারণে জিনির মতো একজন আনফর্চুনেট মেয়েকে…ছি। ছি!

ধিক্কার দিচ্ছো অর্জুন? রাজেশ্বরী বললেন— ধিক্কার আমিও দিতে পারি। রঞ্জনের ডেডবডি আমাকে দেখালে না কেন? তড়িঘড়ি পুড়িয়ে দিলে! রঞ্জনের বউয়ের কাছে সে খবর পাঁচ দিন পর পৌঁছলো কেন? প্রত্যেককে অন্ধকারে রাখতে চেয়েছো। তুমি কী ভাবে জানতে পারলে আমার অর্ধেক সম্পত্তি আমি রঞ্জনের জন্য রেখে যাচ্ছি? কীভাবে জানলে এখন সেই অর্ধেক যাবে রঞ্জনের স্ত্রী-কন্যার কাছে। কে সুমনার ঘরে সাপ ছেড়ে এসেছিল? জিনির ঈর্ষা থাকতে পারে, কিন্তু সাপুড়েদের সঙ্গে কারবার তো তোমারই!

রাখী ফুঁসে উঠল এবার— য়ু ওল্ড হ্যাগ। এইভাবে আমার স্বামীকে অপমান করবার…. তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করার সাহস তোমার কী করে হয়! অর্জুন আমি বরাবর বলে আসছি দিস ওল্ড লেডি ইজ ম্যাড। বদ্ধ উন্মাদ…

রাজেশ্বরী গলার মধ্যে হাসলেন— সো সো বউ রাখীও তোমার সঙ্গে আছে? রাখী জানে না। রঞ্জন জিনিকে রিফিউজ করে চলে যাবার পর অর্জুনের খুব আশা হয়েছিল ও-ই জিনিকে পাবে। কার্টেসি ঠাকুমা। নয় অর্জুন? তার জায়গায় সৌভিক বাধ্য, ভদ্র, সংযত সৌভিক পেল জিনিকে। আর তুমি পেলে একটা রঙচঙে পুতুল!

অর্জুন বললো— আপনি সত্যিই একেবারে পাগল হয়ে গেছেন ঠাকুমা। রাখী চলে এসো।

অর্জুন মোটামুটি শান্ত, কিন্তু রাখী চলে গেল তাকে শাসাতে শাসাতে। বাবাকে বলে সে এর শোধ নেবে।

উঠে দাঁড়ালো শর্মিষ্ঠা ও প্রবীরও।

তোমরাও সন্দেহের ঊর্ধ্বে নও মাই ফার্স্ট গ্র্যান্ড ডটার ইন ল অ্যান্ড হার হাসব্যান্ড। তথাকথিত আভিজাত্যের আড়ালে তোমার ক্রুর, কুটিল মনের পরিচয় আমি পেয়েছি শর্মিষ্ঠা। তোমার স্ত্রৈণ স্বামীটিকে দিয়ে তুমি যা খুশি করাতে পারো, তাও আমি জানি। তবে জেনে রেখো। এখন আর কিছু করার নেই। উইলটা আমার করা হয়ে গেছে। একেবাবে পরিষ্কার লীগ্যাল ডকুমেন্ট, আমার সলিসিটরের ঘরে।

শর্মিষ্ঠা ক্রুদ্ধ ভয়ংকর গলায় বললো— আপনার ব্লাস্টেড সম্পত্তি আপনারই থাক। উই আর নট ইনটরেস্টেড, প্রদীপ লেটস গো-ও!

প্রদীপ এগিয়ে এসে জিনির কাঁধে হাত রাখলো, ভিজে গলায় বললো— জিনি, শান্ত হও, প্লি–জ কাম ডাউন। তুমি তো সবাইকেই জানো। কত বুদ্ধিমতী, কত ভালো মেয়ে তুমি, শর্মি তুমি ওকে একটু হেলপ্ করো।

চুলে মুখ প্রায় ঢাকা সর্বাঙ্গে কাঁপুনি তেজস্বিনী প্রদীপ ও শর্মিষ্ঠার সঙ্গে টলতে টলতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

সুমনা একেবারে স্তম্ভিত হয়ে বসে আছে। কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল সে কিছুই বুঝতে পারছে না। হঠাৎ একটা ধূর্ত হাসির শব্দে তাকিয়ে দেখল রাজেশ্বরীর মেজাজ সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। কোথায় সেই রাগ। ধিক্কার, অভিযোগ! বললেন— কী সুমনা, এইজন্যেই তো এসেছো! স্বামীর অপঘাত রহস্যের কিনারা করতে! নাউ উই আর ইন ইট টুগেদার। আই লাইক ইয়োর গাটস। কোনও ন্যাকামি নেই, ভান ভড়ং, ভেরি ইনটেলিজেন্ট। তোমাকে কালো পোশাকে দেখাচ্ছে ঠিক রঞ্জনের বিধবাকে যেমন দেখানো উচিত। ওদের কেমন ভয় পাইয়ে ঘেঁটে দিলাম দেখলে তো? এইবার খেল শুরু। দেখো কী হয়।

সুমনা নিজের গলার আওয়াজই খুঁজে পাচ্ছিল না। অনেক চেষ্টায় বললো— আপনি যে দুজনকে সোজাসুজি অ্যাকিউজ করলেন সত্যিই কি ওদেরই কেউ?

রাজেশ্বরী বললেন— মাই গার্ল। সন্দেহ থেকে আমি কাউকে বাদ দিচ্ছি না। এদের সবারই সুযোগ ছিল, মোটিভ ছিল। আজ যেমন আমার জন্মদিন, তেমন রঞ্জনেরও মৃত্যুদিন…

তিন বছর আগে এই দিনেই…। অ্যান্ড ইটস গডস টুথ আমি তোমাকে রঞ্জনের সঙ্গে ডেকে পাঠিয়েছি। এখানে তোমার অভ্যর্থনার সব ব্যবস্থা আমি করেছিলাম।

সুমনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো— এটা যে আপনার জন্মদিনও আমি জানতাম না।

স্ট্রেঞ্জ। আমার জন্মদিনটা রঞ্জন তোমাকে বলে নি?

এই সময়ে হঠাৎ বাইরে একটা প্রচণ্ড গোলমাল উঠলো।

গীতা ছুটতে ছুটতে এসে বললো— একজন উটকো লোক দ্বীপে নেমেছে, কখন জানি না। শাকম্ভরীর মন্দিরে লুকিয়ে ছিল। রাতে বাইরে বেরোতে গার্ডরা ধরে এনেছে।

যাকে নিয়ে বেশ কয়েকজন লোক ঢুকলো সে আর কেউ নয়, সরিৎ।

সুমনা বলে উঠলো— সরিৎদা! এ কী! তুমি?—সে আশ্চর্য হয়ে গেছে।

সরিৎ বললো— হ্যাঁ গতকালই আমি বৃষ্টির মধ্যে পৌঁছেছি।

কেন?

কেন? য়ু আর ইন গ্রেভ ডেঞ্জার সুমনা!

রাজেশ্বরী কর্কশ গলায় বললেন— কে তুমি? তোমার সাহস হয় কী করে আমার অনুমতি ছাড়া দ্বীপে ঢোকার? আমার নাতবৌকে ভয় দেখাবার তুমি কে? গ্রেভ ডেঞ্জার! হুঁঃ!

সরিৎ শান্ত গলায় বললো— আপনার নাতিরা প্রদীপদা, অর্জুন সবাই আমায় চেনে। আমরা এক স্কুল কলেজে পড়েছি। আমি রঞ্জনের ক্লাসমেট, বন্ধু।

রাজেশ্বরী বললেন— গীতা! হরিহর, প্রদীপ, অর্জুনবাবুকে ডাকো শিগগিরই।

সুমনা বললো— এটা তুমি ঠিক করো নি সরিৎদা। বলিনি আমার ওপর ভরসা রাখো।

সরিৎ বললো— কথা ছিল, একদিন বড় জোর দুদিনের। তোমার আশা-মতো কোনও লঞ্চও ক্যানিং-এ ছিল না। এতটা ঝুঁকি নেওয়ার জেদ করলে— আমারই বা কী উপায়?

এই সময়ে প্রদীপ ও অর্জুন ঢুকলো। প্রদীপ বলে উঠলেন— আরে সরিৎ না? সরিৎ বিশ্বাস?

যাক প্রদীপদা আমাকে চিনতে পেরেছেন— ম্যাডাম এই আমার আইডেনটিটি কার্ড পেশ করছি। অর্জুন এসে তার কাঁধে থাবড়া মেরে বললে তুমি কখন এলে সরিৎদা?

সরিৎ বললো— প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড অর্জুন, তোমাদের ফ্যামিলি থেকে এই মেয়েটির জীবনে এত দুঃখ, দুর্দৈব এসেছে যে আমি ওকে একা ছেড়ে দিতে সাহস পাইনি। মেনল্যান্ডেই ছিলাম। কাল ধুন্ধুমার বৃষ্টি দেখে ভাবলাম আর দেরি করা ঠিক না একটা লঞ্চকে প্রচুর জপালাম, নামিয়ে তো দিল!

রাজেশ্বরী ডাকলেন— গীতা!

গীতা এলে হুকুম দিলেন— এক্ষুনি যেন এই ভদ্রলোককে গেস্টরুমে নিয়ে যাওয়া হয়। তার যেন কোনও অযত্ন না হয়।

সরিৎ বললো— আ অ্যাম স্টার্ভিং…ম্যাডাম। কিছু খাবার দাবারের হুকুম করুন।

সরিৎ গীতার পেছন পেছন চলে গেল। অর্জুনও কথা বলতে বলতে গেল, পেছনে প্রদীপ। সবাই চলে গেলে রাজেশ্বরী সুমনার দিকে ঘুরলেন।

এই ছেলেটি কে?

শুনলেন তো রঞ্জনের ছোটবেলার বন্ধু।

তোমার সঙ্গে কী সম্পর্ক?

ওই! রঞ্জনের বন্ধু। ফ্যামিলি ফ্রেন্ড। এক জায়গায় কাজ করি আমরা।

রাজেশ্বরী সন্ধানী দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন। গম্ভীরভাবে বললেন— গুড নাইট!

.

সুমনা নিজের ঘরে চলে এসেছে বেশ কিছুক্ষণ। কিন্তু সে এখনও শোবার জন্যে প্রস্তুত নয়। আজকের তুমুল সব ঘটনায় সে বিভ্রান্ত, বিধ্বস্ত। ঘরে কৌচের ওপর এলিয়ে বসে রয়েছে। চোখের দৃষ্টি শূন্য। ঘড়ির টিকটিক শব্দ শোনা যাচ্ছে। বাইরে ঝিঁঝির ডাক। জোনাকি জ্বলছে, নিবছে। একটা প্যাঁচা বিশ্রী চিৎকার করে ডাকতে ডাকতে উড়ে গেল। কাকেদের আর্তনাদ। অজানা কোনও রাত পাখির ডাক। এক একটা আওয়াজ হচ্ছে আর সুমনা শিউরে শিউরে উঠছে। দরজায় টোকা পড়ল। সে কাঠ হয়ে গেল। আবার টোকা। দরজার কাছে গিয়ে সুমনা বললো— কে?

আমি প্রদীপদা সুমনা! একটু খুলবে?

সুমনা আস্তে আস্তে দরজাটা একটু ফাঁক করলো। প্রবীর ঢুকে এলো। বললো— এইটাই তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম।

কী!

এই, অচেনা জায়গা তো! হঠাৎ, বিশেষত রাতে, দরজা টরজা খুলবে না। আর একটা কথা। তোমার ঠিক নিচের ঘরে সরিৎ আছে, বুঝলে? ধরো দরকার— টরকার পড়লো…সে কেমন একরকম অপ্রতিভ হাসি হাসলো— দেখো, এই যে জানলায় জাল দেখছো। এটা একটা কাঠের ফ্রেমের মধ্যে। ফ্রেমটা খুলে নেওয়া যায় এমনি করে।

সে এগিয়ে গিয়ে জানলার কাঠের ফ্রেমটা খুলে আবার বসিয়ে দিল। বললো— খুব চওড়া কার্নিশ আমাদের বুঝলে?

–কেন? এসব কী বলছেন?

— ভাবছো ঠাকুমার মতো প্রদীপদারও মাথায় ছিট আছে, না? স্নেহের হাসি হাসল প্রদীপ। সুমনার মাথায় একটা হাত রাখলো — কী জানো সুমনা, সব বাড়িরই নিজস্ব কিছু সেফটি-মেজার থাকে, যেমন বড় বড় হলে, হোটেলে এরোপ্লেনে। এটা থাকা ভালো। ফ্রেম খুলবে। জানলা খোলা, তলায় কার্নিশ। কোনও ব্যাপারই না নিশ্চয়ই কেউ তোমায় দেখিয়ে দেয়নি। আচ্ছা ভাই চলি। গুডনাইট। আমি তোমায় সবসময়ে আশীর্বাদ করবো ভাই, কেমন!

সুমনা কিছু বলবার আগেই প্রদীপ বেরিয়ে গেল। সুমনা কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ যেন তার সাড় এলো। তাড়াতাড়ি খাটের তলা, বাথরুম সব আলো জ্বেলে দেখে নিল। তারপর হুড়মুড় করে গিয়ে জানলাটা বন্ধ করে দিল।

একজন বলে যাচ্ছে দরজা খুলে রেখো না। একজন বলছে জানলা খুলে রেখো। সরিৎদা বললো— গ্রেভ ডেঞ্জার। সরিৎদাকে দেখে যেন তার ধড়ে প্রাণ এল। সে যেন একটা ভৌতিক জগতে বাস করছিল। মানুষের পৃথিবী থেকে একটা মানুষ এইমাত্র এসে পৌঁছেছে। রাজেশ্বরী দেবীকে সবাই উন্মাদ বলছে। সে দেখেছে উনি কেমন অনায়াসে চেহারা বদল করেন। উনি কি সত্যিই ইনভ্যালিড। না সেজে থাকেন? নাঃ আজ আর ঘুম আসবে না।

বললো বটে। কিন্তু কোন একসময়ে সুমনা ঘুমিয়েই পড়েছে। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখছে, লালচে মায়াবি আলো। এক পা এক পা করে মুণ্ডহীন শাকম্ভরীর মূর্তিটা তার দিকে এগিয়ে আসছে। দুপদাপ করে কারা পালাচ্ছে। তার ঘুম ভেঙে গেল। বুক ঢিপঢিপ করছে। জানলায় তো সত্যিই দুপদাপ আওয়াজ।— সুমনা! সুমনা! জানলা খোলো। শিগগির জানলা খোলো! আমি সরিৎ। জানলা খোলো।

সুমনা দড়াম করে জানলা খুলল। ফ্রেমের ওপারে অস্পষ্টভাবে সরিৎকে দেখা যাচ্ছে। সে কষ্ট করে ফ্রেমটা খুলে ফেলল। কোথা থেকে ধোঁয়া আসছে। চিৎকার উঠছে আগুন! আগুন!

সুমনা চট করে নেমে এসো। সরিৎ গলায় খুব তাড়া নিয়ে বললো।

আলসেয় নেমে দাঁড়ালে সুমনা। তার বুক ঢিপঢিপ করছে। এই কি সেই বিপদ যার কথা সরিৎ বলেছিল? নিচের তলার জানলার চওড়া সানশেডে লাফিয়ে নামলো সে। তারপর তলায় চওড়া আলসেয়। অতঃপর লাফিয়ে নামতেই জঙ্গল। ছুট ছুট ছুট। —নদীর দিকে ছুটে চলো সুমনা— তার পাশাপাশি ছুটতে ছুটতে বললো— সরিৎ।

আগুন! আগুন! জল! জল! আগুন— চতুর্দিক থেকে তখন চিৎকার উঠছে।

সরিৎ হঠাৎ সুমনাকে ছেড়ে বাড়ির দিকে ছুটে গেল।

— সরিৎদা— আ— সুমনা চেঁচাচ্ছে। সরিৎ চেঁচিয়ে বললো— নদীর দিকে যাও— ভয় নেই, আমি আসছি। ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে অর্জুন হুইলচেয়ারে করে রাজেশ্বরীকে ঠেলে আনছে। সরিৎকে দেখেই সে ভেতরে ছুটলো। সরিৎ বললো— সুমনা ম্যাডামকে দেখো। সেও লাফ দিয়ে ভেতরে ছুটে গেল। সুমনা চেয়ার ঠেলতে ঠেলতে নদীর কাছাকাছি এসে থামল। এমন সময়ে সে দেখল দুটো অ্যালসেশিয়ান ডাকতে ডাকতে ছুটে আসছে। পেছনে তেজস্বিনীর হাত ধরে সরিৎ। বাড়ির লোকেরা দারোয়ানেরা পাইপে করে জল দিচ্ছে। কাশতে কাশতে রাখীকে কোলে করে টলতে টলতে বেরিয়ে এল অর্জুন। মাটির ওপর শুইয়ে দিল। তার মুখখানা যেন আঁচে ঝলসে গেছে।

সরিৎ ছুটে যাচ্ছে আবার। অর্জুন বললো— আর লাভ নেই সরিৎ সে হঠাৎ হাহাকার করে উঠলো— দাদাকে বাঁচাতে পারলাম না। ওহ, দাদা-বউদি শেষ হয়ে গেল। বাঁচাতে পারলাম না। ঠাকুমা আই ফেইলড্। এত দিনের চেষ্টা, সব শেষ হয়ে গেল। বুঝতে পারছিলাম এইরকম কিছু একটা হতে যাচ্ছে। দাদা আর পারছিল না। সইতে পারছিল না। কী করলেন ঠাকুমা, এ কী করলেন!

তখন সূর্য উঠছে। প্রচুর নৌকো ভুটভুটি এগিয়ে আসছে। শাকম্ভরীর দ্বীপে আগুন লেগেছে। রানিমার এস্টেটে। দূর-দূরান্ত থেকে প্রজারা ছুটে আসছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *