২০
আজ থিয়েটার রোডের ফ্ল্যাটে সুমনাকে নিয়ে সরিৎ বিশ্বাসের যাবার কথা। কিন্তু সরিৎ এখনও আসছে না। অবশেষে সুমনা তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ল। এবং মোড়ের মাথায় ঘ্যাঁচ করে সরিতের গাড়িটা থামল। সরিৎ দরজা খুলে দিল। সুমনা নীরবে উঠে বসল।
তুমি তাহলে যাবেই? স্টিয়ারিং-এ হাত সরিৎ তার দিকে আড়চোখে তাকালো।
হ্যাঁ?
কেন? ছেড়ে দাও না এসব।
সুমনা সংক্ষেপে বললো— পবিত্র দায়। তুমি বুঝবে না।
দরজা খুলে দিল অর্জুন। তার অশৌচের সাজ। দাড়ি কামানো নেই। চুল বেড়ে গেছে। খালি গায়ে চাদর জড়ানো। কোরা ধুতি। অদ্ভুত দেখাচ্ছে। অদূরে কৌচে বসা তেজস্বিনীরও পরনে নীল পাড় শাদা শাড়ি। চুল হাওয়ায় উড়ছে, মুখ শুকনো। আর রাজেশ্বরীদেবীকে তো চেনাই যাচ্ছে না। কী রকম ভেঙে চুরে গেছেন। খোলা পাকা চুল উড়ছে। প্রসাধন নেই, পারিপাট্য নেই। হঠাৎই যেন রাজেশ্বরী বৃদ্ধা হয়ে গেছেন।
বিষণ্ণ চোখ তুলে বললেন— এসো সুমনা, আমার পাশে বসো। সরিৎ তুমি আমার দুই নাতবউকে বাঁচিয়েছো, আমাকেও। তোমাকে কী বলে ধন্যবাদ দেবো? ভাষা নেই বাবা!
সরিৎ কোনও জবাব দিল না। অর্জুন বসেছিল কার্পেটের ওপর। সে সেইখানে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল।
রাজেশ্বরী ভাঙা গলায় বললেন— সো! ইয়েট অ্যানাদার অ্যাকসিডেন্ট! অর্জুন তুমিই তাহলে এখন আমার একমাত্র জীবিত নাতি! এসো আমার কাছে এসো, আমি তোমাকে একটু ছুঁয়ে দেখি।
অর্জুন আস্তে উঠে গিয়ে রাজেশ্বরীর পায়ের কাছে কার্পেটের ওপর বসল।
তেজস্বিনী মাই ডিয়ার গার্ল। তুমি আমার নিজের নাতনিরও বাড়া, তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। আমায় মাফ করো বাবা।
তেজস্বিনীর চোখের তলায় কালি। উদ্ভ্রান্ত মুখ। অশৌচের সাজে এই আপাদমস্তক মেমসাহেব মেয়েটিকে একেবারে অন্যরকম দেখাচ্ছে। সুমনা নিজেও কালো শাড়ি পরে এসেছিল। তার হঠাৎ মনে হল, এই শাদা এই রুক্ষতা এটাই বোধহয় শোকের আসল চেহারা। এক মুহূর্তে সব ধূসর হয়ে যাষ। প্রদীপনারায়ণের জন্য তার একটা অদ্ভুত কষ্ট হচ্ছিল। যেন একজন সত্যিকারের প্রিয়জনকে হারিয়েছে। আশীর্বাদ করেছিলেন তাকে।
কেড়ে নিয়ে গেলে? শেষ পর্যন্ত আমার সবচেয়ে বুঝদার, স্নেহশীল, পুণ্যাত্মা বড় নাতিটিকেও না নিলে তোমার শান্তি হচ্ছিল না। ওপরের দিকে মুখ করে বললেন— রাজেশ্বরী! শর্মিষ্ঠা, রাখী…সব, সবাই! কী জবাব দেবো আমি ওদের মা বাবাদের। আগুন! শেষ পর্যন্ত আগুন? জল, আগুন, আকাশ, কিছুই কি আমাদের পক্ষে নিরাপদ নয়।… সুমনা মাই ব্রেভ গার্ল। জিনি, তোমরা দুজনেই আমার রঞ্জনকে ভালোবেসেছো। কী বলে তোমাদের সান্ত্বনা দেবো জানি না। অর্জুন তুমি শক্ত হও। তুমি এত ভেঙে পড়লে আমি একজন বৃদ্ধা কী করবো? অ্যাকসিডেন্ট! ভাই, ছেলে, বউ, নাতি, নাতবৌ— এ কেমন নিয়তি! কেমন!
সমস্ত কথাগুলোই উনি বলছিলেন থেমে থেমে। অনেকক্ষণ বিরতি দিয়ে দিয়ে। কাঁদছেন না। কিন্তু কান্নার চেয়েও শোকার্ত, ভাঙা গলা।
হঠাৎ সরিৎ একটু গলা ঝেড়ে নিয়ে খুব কেজো গলায় বললো— অর্জুন! বলো! চুপ করে আছো কেন? ম্যাডাম…প্রদীপদার মৃত্যুটা কিন্তু অ্যাকসিডেন্ট নয়। আত্মহত্যা।
আ…ত্ম….হ…ত্যা! কীরকম বিহ্বল হয়ে বললেন বৃদ্ধা। সে কী! কে বললে! অর্জুন ও কী বলছে?
অর্জুন শুকনো চোখে চেয়ে বললো— হ্যাঁ ঠাকুমা, দাদা আর সইতে পারছিল না। আমি বুঝতে পারছিলাম ও কিছু একটা ঘটাবে। আপনি যখন…আমাদের সকলকে ওভাবে অ্যাকিউজ করলেন দাদা আর চুপ করে থাকতে পারেনি। দ্যাট গ্রেট সোল। কতটুকুই বা বড়, তবু দাদাই তো ছিল আমাদের বাবা…মা…আমরা অনাথ চার ভাই, দাদাই আগলে ছিল। চিরকাল!
কেন? প্রদীপ কেন আত্মহত্যা করবে? কী বলছো অর্জুন খুলে বল। আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
বলা খুব শক্ত। অর্জুন বললো— তবু বলবো, বলতেই হবে। দাদার মান রাখতে সত্য আমাকে প্রকাশ করতেই হবে।— অর্জুন মুখ নিচু করে নিজের আঙুলগুলো দেখছে।
সত্যি কথা বলবে, তো তার জন্যে এত ভূমিকা কেন অর্জুন। বলো!— বলছেন কিন্তু অজানা আশঙ্কায় রাজেশ্বরীর গলা কাঁপছে।
অনেক মিথ ভেঙে যাবে ঠাকুমা, কিন্তু আপনাকে সইতে হবে।
কিসের…মিথ? কেন সইতে হবে? কত? কত আর?
— যেটাকে সুইসাইড মনে করছেন, সৌভিকেরটা সেটা হয় অ্যাকসিডেন্ট নয়… খুন… কোনটা জিনি হয়তো বলতে পারবে।— অর্জুন বললো— অর্জুন বললো— আর যেটা অ্যাকসিডেন্ট মনে করছেন…দাদারটা সেটা একটা মরিয়া আত্মহত্যা। যেটাকে এতদিন খুন বলে মনে করে আসছেন সেটা একটা আনফর্চুনেট অ্যাকসিডেন্ট— রঞ্জনেরটা। আর প্রত্যেকটারই মূলে আছে রঞ্জন একমাত্র রঞ্জন। ঠাকুমা ভুল বুঝবেন না। তাকে আমি অ্যাডমায়ার করতাম, ভালো তো বাসতামই। কিন্তু আজ আর সত্য গোপন করার কোনও অর্থ নেই। তিন তিনটে মৃত্যু ঘটে গেছে। ঠাকুমা রঞ্জন ছিল একেবারে দুশ্চরিত্র লম্পট, নিষ্ঠুর, স্বার্থপর…
— চুপ করো চুপ করো…একটা মৃত মানুষের নামে অপবাদ দিতে তোমার লজ্জা করছে না। সে কি প্রতিবাদ করতে পারবে? ছিঃ।
–সরিৎ এই সময়ে শান্ত কিন্তু দৃঢ় ও ভরাট গলায় বলে উঠলো— অর্জুন ঠিকই বলেছে ম্যাডাম। রঞ্জন স্বভাবে চরিত্রে যেমন অস্থির, নিষ্ঠুর ছিল তেমনই ছিল যাকে বলে লম্পট। মেয়েদের নিয়ে খেলা ছিল ওর সবচেয়ে প্রিয় নেশা। আমি ওকে ছোটবেলা থেকে দেখছি। জানি।
সে সুমনার দিকে তাকাচ্ছিল না। তাকিয়েছিল রাজেশ্বরীর দিকে। সোজা।
কী প্রমাণ? প্রমাণ কী এসব কথার?
অর্জুন বললো— প্রমাণ? আপনার মতো অভিজ্ঞ বৃদ্ধাই হোন, আর সুমনার মতো নিষ্পাপ ডাউন-টু-আর্থ মেয়েই হোক সকলকার মাথা ঘুরিয়ে দেবার ক্ষমতা ছিল রঞ্জনের। ও সেটাই ব্যবহার করতো। এমন কি… বউদি বা রাখীকেও…
— কী কী বললে? বউদি…রাখী…আবার বলো।
–আবার বলার শক্তি আমার নেই। জিনি! জিনি তো জেনেশুনেও মোহ কাটাতে পারেনি। কী নিয়ে তোমাদের ঝগড়া জিনি বলো। চুপ করে আছো কেন? এখনও চুপ করে থাকবে?
তেজস্বিনী প্রায় শোনা যায় না এমন গলায় বললো— এইজন্যেই। ওর ফ্লাটিং আর ওর অ্যাফেয়ার আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছিল, তাই রাগারাগি করেছিলাম, এসব চলবে না। তাতেই য়ু গো টু হেল বলে আমাকে ছুঁড়ে ফেলে চলে গেল।
ভাবুন। সব জেনেশুনেও যে মেয়েটা ওকে এতটা দিয়েছিল তাকে ও এককথায় নিষ্ঠুর ভাবে রিফিউজ করে চলে গেল। এবং যে-ই আপনি সৌভিকের সঙ্গে জিনির বিয়ে দিলেন, স্রেফ রাগের মাথায় দম্ভে পাগল হয়ে সুমনাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে বিয়ে করে নিল। পাছে সরিৎ কিছু বলে দেয় তাই সরিৎকে একেবারে বুঝতে না দিয়ে কাজটা করলো।
সরিৎ আস্তে বললো— বোঝালেও, বললেও কেউ বুঝতো না অর্জুন। রঞ্জন হ্যাড দ্যাট স্ট্রেঞ্জ ডায়াবলিক পাওয়ার ওভার উইমেন।
আমাদের রঞ্জন সম্পর্কে একটু ডাউট থাকলেও আমি দাদা দুজনেই এতে খুশি হয়েছিলাম সরিৎ, বিশেষত সুমনাকে দেখে। এরকম একটি মেয়ের কাছে ও যদি বাঁধা পড়ে… অর্জুন বললো— কিন্তু তা হবার নয়।— সে মাথা নাড়তে লাগল।
বিহ্বল হয়ে একবার এর দিকে একবার ওর দিকে তাকাচ্ছেন রাজেশ্বরী — জলি। খামখেয়ালি, ঠিকই! বাট চার্মিং হি ওয়াজ ডমিনেটিং লাইক মি মে বি বাট দিস…অল…দিস…
অর্জুন খুব নিচু গলায় বললো— ও কি তাহলে মেজর লক্ষ্মীনারায়ণ মুখার্জির মতো ছিল ঠাকুমা? আপনি সেদিন বলছিলেন….
রাজেশ্বরীর মুখের মধ্যে সাড় ফিরে আসে, যেন কিছু মনে করার চেষ্টা করছেন। বোঝবার চেষ্টা করছেন। বুঝতে শুরু করে ছেন…আলগা আলগা করে বললেন— হি ওয়াজ আ ডেভল, স্বয়ং শয়তান…বাইরের লোকে বুঝতে পারত না। কঠিন, প্রচণ্ড টেম্পার, অ্যান্ড অ্যাউইমেন…উইমেন…মোর উইমেন….
সরিৎ বললো আমি আন্দাজ করেছিলাম ও সৌভিকের ফ্ল্যাটে যাচ্ছে। তেজস্বিনী, আ অ্যাম সরি, ও সৌভিকের অনুপস্থিতিতে তোমার কাছে যেত।
ইজ দ্যাট টু? রাজেশ্বরী ঝুঁকে পড়ে বললেন— জিনি সে নো। ডু সে নো।
জিনি মুখ ঢেকে ফেলল। বললো— ঠাকুমা আপনি কি জানেন না আমি রঞ্জনকে ফেরাতে পারি না! জানেন না সে আমার কী ছিল!
তাহলে? অসহায়ের মতো বেরিয়ে এল তাঁর গলা দিয়ে।
সরিৎ বললো— একদিন সৌভিক এসে পড়ে। ন্যাচারালি প্রচণ্ড রেগে রঞ্জনকে আক্রমণ করে। ধ্বস্তাধ্বস্তি করতে করতে ওই খোলা জানালার কাছে চলে যায় ওরা। সৌভিক প্যারাপেট টপকে নিচে পড়ে যায়। রঞ্জন নিজেই আমাকে এ কথা বলেছে। প্রথমে ডিনাই করেছিল। পরে বলেছে।
চারদিক চুপচাপ।
রাজেশ্বরী বললেন— বলো জিনি, ও ইচ্ছে করে সৌভিককে ফেলে দিয়েছিল কিনা! বলো…
জিনি কাঁদতে কাঁদতে বললো— জানি না, আমি সত্যি জানি না …
সরিৎ নিশ্বাস ফেলে বললো— যাই হয়ে থাক ফলাফল একই। ভেবে লাভ কী! কেউই আর বেঁচে নেই।
ঘরময় নিস্তব্ধতা। নিঃশ্বাসের শব্দ আর ঘড়ির শব্দ। সবাই আছে। খালি সুমনা যেন ওখানে থেকেও নেই। তার আপাদমস্তক ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। কেউ দেখছে না সে আস্তে আস্তে কুঁকড়ে যাচ্ছে।
রাজেশ্বরী বললেন— সো, ঠাকুর্দার মতো বদমেজাজি, স্বেচ্ছাচারী লম্পট, তার ওপর খুনী। রঞ্জন? হে ঈশ্বর। এ-ও আমায় শুনতে হল? ফিঃ প্রদীপ? প্রদীপ কেন…অর্জুন বলো। চুপ করে আছো কেন?
ঠাকুমা জিনি তখন আপনার কাছে সেক্রেটারি। রঞ্জন গেল।
—আমি তো সুমনাকেও আনতে লিখেছিলাম। প্রতিবার লিখতাম। জি কিছু কারসাজি কর নি?
তেজস্বিনী জোরে জোরে মাথা নাড়ল। এবারে করেছিলাম। কিন্তু তখন, নে। নেভার।
সরিৎ বললো— — ও আসলে কখনও চিঠিগুলো সুমনাকে দেখাত না। মুখে বলত— আপনি কী ভয়ানক কুটিল, নিষ্ঠুর, কিছুতেই সুমনাকে অ্যাকসেপ্ট করবেন না। এবং সুমনাও কোনদিন সে চিঠি জোর করে দেখতে চায়নি। অন্ধের মতো সব বিশ্বাস করে নিয়েছে।
অর্জুন বললো— আইল্যান্ডে ফিরে রঞ্জন জিনির সঙ্গে আগেকার সম্পর্কে ফিরে গেল ঠাকুমা। সবার চোখের সামনে। আপনারও। কেন বুঝতে পারেন নি জানি না।
রাজেশ্বরী বললেন ছোট থেকে একসঙ্গে বড় হয়েছে। পিকনিকে যাচ্ছে, গল্প করছে, বার্ড ওয়াচিং। আমায় ফুল এনে দিত….আমি তো কোনদিন…
আমরা বুঝতাম। দাদা ওকে সর্বক্ষণ বোঝাতো। রঞ্জন তোমার অত সুন্দর স্ত্রী তোমাকে কত বিশ্বাস করে, তোমার বাচ্চা হয়ে গেছে। যা করেছ করেছ এবার নিজেকে পাল্টাও।— ও কানে নিত না।
অর্জুন তেজস্বিন।র দিকে তাকালো, বললো— জিনি উপায় নেই আমাকে বলতেই হবে।— তেজস্বিনী যেমন বসেছিল বসেই রইল। মুখ নিচু। হাত কোলের ওপর এলিয়ে পড়ে রয়েছে।
অর্জুন বললো— রঞ্জন ডিভোর্স পেপার্স তৈরি করে ফেলেছিল। ভালুকটিলায় সেই পেপার্স নিয়ে গোপনে আলোচনা করছিল রাতে। দাদা ওদিকে গিয়েছিল…ওদের ফলো করে… সব শুনতে পেয়ে যায়। রঞ্জন বলছিল— সরিতের সঙ্গে ওকে ঝুলিয়ে দেবো, বুঝলে! এক্কেবারে ক্লিয়ার কেস।
জিনি তারপর বাড়ি ফিরে আসে। রঞ্জন টেলিস্কোপ ফিট করছে তারা দেখবে বলে। এই সময়ে দাদা গিয়ে সোজাসুজি ওকে চ্যালেঞ্জ করে, বলে ডিভোর্স পেপার্সগুলো আমাকে দিয়ে দাও। অনেক অন্যায় অনেক বদমায়েশি করেছো আর করতে দেবো না। শয়তানি পেয়েছো! ও মেয়েটি তোমাকে দেবতার চোখে দেখে একটা ফুটফুটে মেয়ে তোমার…রঞ্জন বলে তা বেশ তো তুমিই ওর দেবতার স্থান নাও না। তখনই দাদা ওকে একটা চড় মারে। এটা ও এক্সপেক্ট করেনি। দাদা জীবনে কখনও কারো গায়ে হাত তোলেনি। ও ফিরে দাদাকে একটা ধাক্কা দেয়। দাদাও পড়ে যেতে যেতে ওকে একটা ধাক্কা দেয়। ইতিমধ্যে পেপার্সগুলো দাদা নিয়ে কুচিকুচি করে ছিঁড়ে ফেলেছিল। ধাক্কা খেয়ে দাদা ভালুকটিলা দিয়ে গড়াতে গড়াতে পড়ে যায়। কোনমতে উঠে বাড়ি গিয়ে আমার কাছ থেকে ফার্স্ট এইড নিয়ে শুয়ে পড়ে। আমরা দুজনেই তখন গজরাচ্ছি যে রঞ্জন আসুক। কাল সকালেই ওর সব কীর্তি আমরা ঠাকুমার কাছে ফাঁস করবো। কিন্তু রঞ্জন আর এল না। আসলে ও দাড়িয়েছিল নদীর দিকে পিঠ করে, দাদার সামান্য ধাক্কাতেই বোধহয় ওখানকার ভিজে মাটি ধসে গিয়েছিল। পরের দিন গিয়ে সেই ধসা মাটি আমরা দেখতে পাই। ও জলে পড়ে এবং নিশ্চয় কুমিরটা…
–প্লিজ স্টপ ইট, প্লিজ…
সুমনা ফিসফিস করে বললো— সে খুব দুর্বলভাবে একটা পা ভাঙা পুতুলের মতো উঠে দাঁড়ালো এবং পরক্ষণেই পড়ে যেতে লাগলো, চোখ বোজা, হাত পা ঠাণ্ডা।
একদিক থেকে অর্জুন আরেকদিক থেকে সরিৎ লাফিয়ে এসে তাকে ধরে ফেললো।
.
এখন মানুষের জগৎ। এখানে পৃথিবী স্বাভাবিক। কোথাও কোনও ভূত নেই, দুঃস্বপ্ন নেই বাঘ বা মুণ্ডহীন মূর্তির। ফার্ন রোডের ছোট ফ্ল্যাটে নির্ভেজাল বাস্তব। যা দেখা যাচ্ছে তাই-ই সত্য। হিরণ্ময় মিথ্যা দিয়ে কিছু ঢাকা নেই। বিছানায় এলিয়ে শুয়ে আছে সুমনা। দুধের সঙ্গে ব্র্যান্ডি মিশিয়ে তাকে খাওয়াচ্ছে সরিৎ। একটু দূরে মিনতির হাত ছাড়িয়ে মায়ের কাছে আসবার জন্যে ছটফট করছে টুকটুক। কী হয়েছে মায়ের? কী হয়েছে? তার চোখে ভয়, কান্না।
খাওয়ানো শেষ করে সরিৎ বললো— এখন একটু ভালো লাগছে তো? আয় টুকটুক এক ছুটে মায়ের কাছে চলে আয় তো! সে মিনতির দিকে চেয়ে বললো— এই কাপটাপগুলো নিয়ে যাও। আর দিদি যেন আজ একেবারে না ওঠে। কিছু করতে দেবে না। খাবার টাবার এখানেই এনে দেবে।
মিনতি চলে যেতে সরিৎ বললো— চুপচাপ শুয়ে থাকো, একটু গান টান শোনো। কালই দেখবে ঠিক হয়ে গেছে। এবার আমি চলি!
কিন্তু যেতে গিয়ে দেখল তার পাঞ্জাবির কোণ সুমনার হাতের মুঠোয়।
যদি সবই জানতে কোনদিন আমাকে বলোনি কেন? –খুব আস্তে থেমে থেমে শক্তিহীন গলায় সুমনা জিজ্ঞেস করলো।
সরিৎ এখন কী বলবে? সে কি বলবে সে বারবার ইঙ্গিত দিয়েছে বারবার বলবার চেষ্টা করেছে, প্রাণপণ বাধা দিয়েছে যাতে সুমনা শাকম্ভরীর দ্বীপে কিম্বা থিয়েটার রোডের অন্তিম শুনানিতে না যায়। কেননা তাহলেই ভেঙে পড়বে তার স্বপ্ন, তার প্রতিমা, সরিৎ তো ভাঙতে চায়নি! সুমনার এত দুঃখ সে কী করে বরদাস্ত করবে? কিন্তু সুমনা বোঝেনি, শোনেনি, তারও বেশি। ভুল বুঝেছে, অনেক কঠিন কঠিন তিরস্কার সে করেছে সরিৎদাকে। জেলাস, আউটসাইডার, ইনটারফিয়ারিং। স্টিকার দিয়ে সে সব আটকানো আছে সরিতের বুকে।
সরিৎ এসব কিছুই বললো না। একটু হেসে সুমনার হাতে বন্দী তার পাঞ্জাবির প্রান্তটার দিকে তাকিয়ে বললো— কী জানি সুমনা, বোধহয় সে-ও ছিল এক পবিত্ৰ দায়।
.
সমাপ্ত
.
(কিশোরবেলায় পড়া এক বিদেশি গল্পের থেকে মূল বিষয়টি অংশত নেওয়া দুঃখের বিষয় লেখকের নাম, গল্পের নাম মনে নেই।)
