১৮
মেঘ কেটে রোদ উঠছে। গাছের ফাঁক ফোকর দিয়ে নানান ভঙ্গিতে রোদ এসে পড়েছে বনভূমির ওপর। গাছের পাতায় এখনও টলটল করছে জল। টুপটাপ ঝরে পড়ছে। সুমনা চোখ রগড়াতে রগড়াতে উঠে বসলো। সে কি স্বপ্ন দেখেছিল? ভৌতিক বারান্দা! ঘরে ঘরে সরোদ। পিয়ানো অরগ্যান….অর্জুন…সাপ? না ওই তো ক্যাম্প খাট। বাকি রাত গীতাদি শুয়েছিল। কে তার ঘরে সাপ ছেড়ে দিল? রাজেশ্বরী? উনি তো পিয়ানো বাজাচ্ছিলেন! তাতে কি। ওঁর হুকুমও তো হতে পারে। কিন্তু তাহলে অত ভালো ব্যবহার করলেন কেন? মানুষটাকে চেনাই যাচ্ছিল না। যেন অন্য রাজেশ্বরী! অভিনয়? হঠাৎ সে ঘুরে দাঁড়ালো— অর্জুন অতরাত্রে কী করছিল করিডরে? তার ঘরের দিক থেকেই তো আসছিল। টুকটুক ওদের একমাত্র বংশধর। তবে কি ওরা তাকেই মারতে চাইছে? তাকে মারলেই টুকটুক ওদের হাতের মুঠোয় চলে আসবে। চেঁচিয়ে সে বলে উঠলো— না! না!
দরজা খুলে তেজস্বিনী ঢুকলো।
ঠিক আছো তো? চিৎকার শুনলাম যেন! তার গলা খুব নরম।
হ্যাঁ ঠিক আছি।
জঙ্গুলে জায়গা তো!— একটু ইতস্তত করে তেজস্বিনী বললো— সাপ খোপ, বিছে, জোঁক এসব আছেই। তার ওপর কাল অত বৃষ্টি। সাপ দেখলে কিন্তু ওরকম রি-অ্যাক্ট করতে নেই। একদম স্থির হয়ে যেতে হয়। হয়ত মিউজিক শুনে চলে এসেছিল। কাল ঠাকুমা পিয়ানোয় বসেছিলেন। দাদাও …
সুমনা কঠিন গলায় বললো— সাপের কান নেই, আমি জানি।
তেজস্বিনী বললো— মিউজিক শুনলে তো অনেক সময়েই….
— ওরা মুভমেন্ট দেখে আবছা, শব্দ শুনতে পায় না।
— হতে পারে। তাই বোধহয় নড়াচড়া করতে বারণ করে। তুমি কি দরজা একেবারে খুলে রেখে বাইরে বেরিয়েছিলে?
— হ্যাঁ, খুব ভালো বাজাচ্ছিলেন কেউ। আমার জ্ঞান ছিল না। পিয়ানো ছাড়াও শুনলাম, সরোদ আর অরগ্যান…
তেজস্বিনী শুকনো মুখে বললো— স্যরি ফর অল দা ট্রাবল। ভাগ্যে সাপটা তোমার নাগাল পায়নি! হলে যে কী হত। অর্জুন ছাড়া কেউ সাপের মোকাবিলা করতে পারে না।
অর্জুন কি সাপুড়ে?
বলতে পারো। ও সাপ ধরতে পারে। আচ্ছা আমি যাচ্ছি, ব্রেকফাস্ট আসছে দশ মিনিট।
সুমনা বললো— আমি এখন চান করতে ঢুকবো। আধঘণ্টা অন্তত লাগবে।
— ঠিক আছে। তেজস্বিনী দরজা বন্ধ করে দিয়ে চলে গেল।
সুমনা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বললো— ও, তাহলে তুমি ভেবেছ সাপ মিউজিক শুনলে আসে, সেইসব অফিস-টুসের রূপকথা শুনিয়ে আমাকে ভোলাবে। আর আমি বোকা, ভুলে যাবো। যতই বাজাও। যতই দরজার ভেতরে থাকো। তুমিও পারো, তোমারও স্বার্থ আছে।
ক্রমশ আকাশ পরিষ্কার। ব্রেকফাস্ট খাচ্ছে সুমনা। ঘরের দরজা খোলা, পর্দা টানা আছে। শর্মিষ্ঠা, রাখী একসঙ্গে ঢুকলো।
গুড মর্নিং। ঠিক আছো তো?
হ্যাঁ ঠিক আছি। থ্যাংকিউ। সুমনা বললো।
শর্মিষ্ঠা একটা চেয়ারে বসে বললো— বাব্বা, আমরা এত ভয় পেয়ে গেছিলাম। কী ভাগ্য সাপটা ছোবল না দিয়ে পালিয়ে গেল। তুমি যা চিৎকার করেছিলে! সুমনা বললো— সাপে শুনতে পায় না।
রাখী বললো— তাই বুঝি? সে যাই হোক, খুব বেঁচে গেছ। অর্জুন বলছিল চন্দ্রবোড়া। আমরা এতদিন এখানে আশা যাওয়া করছি, বাড়ির ভেতর কখনও সাপ দেখিনি। জোঁক বিছে অঢেল, কিন্তু সাপ! কাল রাত থেকে খুব কার্বলিক অ্যাসিড দেওয়া হচ্ছে।
শমিষ্ঠা বললো— যাক, যে জন্য আসা। ঠাকুমার আজ জন্মদিন। উইশ করেছো?
–না।
— করো, বুড়ি মারাত্মক হার্ট হবে।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ওরা চলে যায়। সুমনা মনে মনে বলে— ঘরে কখনও সাপ দেখো নি! দেখবে কী করে? কেউ ছেড়ে গেলে তবে তো দেখবে? সবাই মিলে এই ষড়যন্ত্র করছো কিনা তাই বা জানবো কী করে? তবে যেই হও তুমি বা তোমরা আমি নিশ্চিত যে তুমি বা তারাই রঞ্জনকে খুন করেছো। খুব সম্ভব সম্পত্তির জন্যে। ঠাকুমার সম্পত্তির মেজর শেয়ার যদি রঞ্জন পেয়ে যায়? অথচ-অথচ…সম্পত্তির জন্য রঞ্জনের কোনও লালসা ছিল না। শেষের দিকে একটা ভীষণ বিপন্নতা বোধ জেগেছিল। ও তো কখনও ওভাবে থাকেনি। কী করবে, নিজের অভ্যেসের হাতে নিরুপায়। ও বলতো, জাত-ধর্ম, অনাথ-টনাথ আমি মানি না। তোমাকে ভালোবাসি, তোমাকেই বিয়ে করেছি। তবে তোমার আর টুকুটুকের হক, তোমাদের সম্মান আমি ছিনিয়ে আনবোই।
চান করতে করতে সে বলে, সরিৎদা! ইউ ওয়ার অ্যাবসল্যুটলি রাইট। আমি কেন এখানে মরতে এলাম? টাকার লোভে নয় তো? বা বংশমর্যাদার লোভে? আমার মেয়ে শাকম্ভরীর মুখার্জি বংশের সন্তান! যদি লোভই হয়? আমি টুকটুকের বংশের দোহাই-ই তো দিয়েছিলাম। সরিৎদা কত বারণ করেছিল। ইশশ, সুমনা, তুমি শেষ পর্যন্ত লোভের চোরা ফাঁদে পড়ে গেলে?
হাউজকোটটা গলাচ্ছে। দরজায় আবার টোকা। বিরক্ত হয়ে সে বললো— কে?
–আমি তেজস্বিনী।
সুমনা দরজা খুলে দেয়। তেজস্বিনী একটা বড় বাকস্ রাখে বিছানার ওপর–স্যরি টু ডিসটার্ব য়ু। এর মধ্যে তোমার ড্রেস আছে। গয়না। ঠাকুমা পাঠিয়েছেন।
সুমনা কিছু বলতে যাচ্ছিল। তেজস্বিনী বললো— শুধু তোমাকে নয়। আমাদের প্রত্যেককে নিজের জন্মদিনে উনি গিফট্ দ্যান। ওঁর প্রজাদের খাওয়ান, যার যা প্রয়োজন শোনেন। লঞ্চ ওঁকে নিয়ে চলে গেছে। এরাও সঙ্গে গেছে। আমি, রাখী আর শর্মিষ্ঠা এবার চলে যাবো। রতনলাল তোমার কাছে রইল। হরিহরও আছে। ভয় পেও না। যখন যা দরকার হবে বলবে। যদি বাজাতে চাও তো ওঁর ঘরের চাবি রেখে গেছেন, পিয়ানোয় বসতে পারো। রাত ন’টায় ডিনার। তার আগে হয়ত আর দেখা হবে না।
তেজস্বিনীর জুতোর শব্দ মিলিয়ে গেলে সে দরজা বন্ধ করে দিল! বাক্সটা খুলল ঝলমল করে উঠলো জরি-চুমকি-পাথর বসানো লেহেঙ্গা চোলি, ওড়না। নীল ভেলভেটের বাক্সে নিখাদ হীরের গয়না।
