1 of 2

বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৫

।। পাঁচ।।

৭ আগস্ট, ২০১১

আহিরীটোলায় একটু আগে আগেই পৌঁছে গেল নমিতা। অনেক বছর পর এল এই এলাকায়। গঙ্গার গা ঘেঁষা রাস্তার ধারে একটু ফাঁকা দেখে গাড়িটা পার্ক করল। রাস্তাটা সরু না, কিন্তু ঘিঞ্জি। গিজগিজ করছে ভিখারি, ঘাট-কাজে আসা মৃত মানুষের নিকটবর্তী আত্মীয়স্বজন, পুরোহিতরা এদিক-ওদিক চলে ফিরে বেড়াচ্ছে, নাপিতরা ক্ষৌরি করছে, মাথা মুণ্ডনের পর চুলের দলা পাশে পড়ে রয়েছে। এ জায়গাটাতে খুবই অস্বস্তি লাগে নমিতার। রাস্তার ধারে ধারে ভিখারির দল বসে গেছে কলাই করা বাসন নিয়ে, পুণ্যার্থীরা ওদের থালায় থালায় ভোগপ্রসাদ, সুজি, লাড্ডু, ফল, খুচরো পয়সা এসব দিতে দিতে এগিয়ে চলেছে। প্রসাদ শেষ হয়ে গেলে যে পাচ্ছে না সে দাতার পিছনে গিয়ে ঘ্যান ঘ্যান করছে। নমিতার পাগল পাগল লাগছিল।

নমিতা নদীর দিকে এগিয়ে গেল। ঘাটের চওড়া সিঁড়ির ধাপের জায়গায় জায়গায় ফাটা। নদীতে এখন ভাটা, তাই পাড়ে কাদা মেখে ছড়িয়ে রয়েছে ব্যবহৃত ফুলের মালা, ধুপকাঠির বাক্স, কলাপাতায় মাখা চাল-তিলের পিণ্ড, ভাঙা হাঁড়ি-পাতিল, এক কোণে ডাই করা ফেলে রাখা ছাড়া অশৌচের সাদা থান। কুকুর চালের পিও শুঁকছে। নমিতা ঘড়ি দেখল, এখনো ওকে পনেরো মিনিট কাটাতে হবে।

রাস্তা এগিয়ে লেভেল ক্রসিং পার হয়ে ওপাশে চলে গেছে। ওদিকে ভীড় অপেক্ষাকৃত কম, নমিতা লেভেল ক্রসিং পার হওয়ার সময় দেখল রেল লাইনের দু’পাশে সারি সারি বস্তি। খুপরির মতো ছোট ছোট চালাঘর। কারোর মাথায় নীল প্লাস্টিকের চাদরের ছাদ, কারোর ছাদে তেরপল। রেল লাইনের ফিশপ্লেটের ওপর বসে বসে কোনো মা তার মেয়ের উকুন বেছে দিচ্ছে। কেউ বা লাইনের ফিশপ্লেটের ওপর বসে নিম দাঁতন করছে। এখান দিয়ে ট্রেন যায় কীভাবে? নমিতা ভাবতে ভাবতে অন্যদিকে তাকাল। সেদিকে একটা প্ল্যাটফর্ম। প্ল্যাটফর্মের লাগোয়া রেললাইনে কাগজের প্লেট, কাগজের চায়ের কাপ, পলিথিনের ফাটা প্যাকেট ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে। রেললাইনের ওপাশে লাল ইটের একটা পুরোনো বিল্ডিং, তার নীচে নুড়ি পাথরের ওপর ভেরেণ্ডা গাছ বাড়ছে। স্টেশনের নাম পড়ল নমিতা—শোভাবাজার আহিরীটোলা। প্ল্যাটফর্মে শেডের নীচে লম্বা লোহার বেঞ্চে কিছু যাত্রী বসে অপেক্ষা করছে ট্রেনের। প্ল্যাটফর্মে দেওয়ালের গায়ে মেঝেতে বসে গোটা দশেক অল্পবয়সী ভিখারি মেয়ে। তাদের সামনে একটা লোহার ট্রাঙ্ক রাখা, ট্রাঙ্কের ওপর বসে একজন মহিলা। তার পরনে ময়লা শাড়ি। মহিলার মুখ পাশ থেকে দেখা যাচ্ছে।

‘আপনি কতক্ষণ?’ পিছন থেকে অ্যাডভোকেট মাধবী বসাকের গলা। ‘একটু আগেই এসেছি।’

‘গগনের সঙ্গে ফোনে কথা হল। ওর আসতে একটু দেরি হবে বলল, ‘ মিস বসাকের মুখে বিরক্তি। ‘এসব লোকের টাইমের কোনো গ্যারান্টি নেই। আমি নার্সিংহোমে আরো কিছুক্ষণ থাকতে পারতাম।’

‘কেমন আছে মেয়ে?’

‘বেটার, মিস বসাক বললেন। ‘আজ রুমে দিয়ে দেবে। কাছে যেতে সাহস হল না। তবু খবরটা যে পেলাম এতেই নিশ্চিন্ত। সব মায়ের তো আর সমান ভাগ্য হয় না! বইটা পড়লেন?’

লজ্জা পেল নমিতা। ‘কাল এত মাথা ধরেছিল যে বইটা খোলা হয়নি। আজ পড়ে ফেলব।’ তারপর কথা ঘোরাতে নমিতা বলল, ‘ওদিকটা দেখছেন, নমিতা প্ল্যাটফর্মের দিকে দেখাল।

‘প্ল্যাটফর্মে স্কুল!’ মিস বসাক বললেন।

‘পথশিশুদের পড়াশোনা শেখাবার এরকম চেষ্টা অনেক জায়গায় চলছে,’ নমিতা বলল। ‘চলুন একবার কাছে যাবেন নাকি? দেখে আসি?’

‘পথশিশু!’ মিস বসাক বললেন। ‘আচ্ছা বুঝেছি। হাতে সময় আছে। চলুন ওদিকেই যাই। এদিকটা এত নোংরা, গা ঘিনঘিন করছে। বাপরে এত ভিখারি!’

দু’জনে পায়ে পায়ে পড়ুয়া ভিখারিদের কাছে এসে উপস্থিত হল। দিদিমণির সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চারা সুর করে করে নামতা জাতীয় কিছু বলছিল। ওরা কাছে যেতেই বাচ্চারা নামা বলা বন্ধ করে দিল। এবার মহিলার মুখ দেখতে পেল নমিতা। শীর্ণ শরীর, মাথার চুলে অল্প পাক ধরেছে, কিন্তু চোখ দুটো জ্বলজ্বলে। মহিলা নমিতার বয়সী হবে, কিন্তু অপুষ্টিতে বয়স বেশি মনে হচ্ছে। নমিতারা একদম কাছে এসে উপস্থিত হতেই সেই মহিলা ট্রাঙ্কের ওপর বসে বসেই মাথা তুলে বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকাল।

‘বিদ্যাদি!’

নমিতার মুখ থেকে অজান্তেই শব্দটা বেরিয়ে এল।

মহিলা এক মুহূর্ত থমকে গেল। নমিতার দিকে বিরক্তির চাহনি ছুঁড়ে বলল, ‘একটু ব্যস্ত আছি।’ মহিলা দৃষ্টি সরিয়ে পড়ুয়াদের দিকে তাকাল।

নমিতা তাড়াতাড়ি অ্যাডভোকেট বসাককে টেনে সরিয়ে নিয়ে গেল।

‘খুব রুড তো! আপনি চেনেন ওঁকে?’ মিস বসাক পিছন ফিরে পাঠশালার দিকে তাকালেন।

চিনি মানে! বিদ্যাধরী দাস! প্রেসিডেন্সি কলেজ কাঁপাতেন এক সময়! অসম্ভব জিনিয়াস! ওঁর আজ এই অবস্থা!’

‘কী বলছেন!’ অ্যাডভোকেট বসাক অবাক। মিস বসাকের সেলফোন ঝমঝম করে উঠল। ফোনটা বের করে অ্যাডভোকেটের চোখে খুশি। ‘গগনের ফোন,’ ফোনটা কানে ঠেকাতে ঠেকাতে ইশারায় ফিসফিস করে বললেন, ‘চলুন এখান থেকে।’

‘মিস বসাক, ড. পৃথুযশ ভৌমিককে যদি কেউ হারাবার ক্ষমতা রাখে সে হল ইনি। বিদ্যাদি। বিদ্যাধরী দাস।’

‘হোয়াট!’ অ্যাডভোকেট বসাক ফোনের স্পিকার তালুতে চেপে দাঁড়িয়ে গেলেন। তারপর গগনকে তাড়াহুড়ো করে বললেন, ‘গগন, আমরা শোভাবাজার প্ল্যাটফর্মে আছি। আপনি কি এখানে আসতে পারবেন? ওকে গুড গুড। আসুন।’ তারপর ফোনটা পকেটে রেখে বিস্ময়ে কণ্ঠস্বর নীচু করে বললেন, ‘ড. স্যান্যাল, কী বলছেন আপনি? এই ভিখারিদের দিদিমণি!’ অ্যাডভোকেটের বিস্মিত দৃষ্টি। ‘কোথায় ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, আর কোথায় এই বস্তির ভিখারিদের স্কুলের টিচার? আপনি শিওর?’

‘বিদ্যাদি আর পৃথুযশ ভৌমিক এক ব্যাচের। বিএ আর এমএ-তে পৃথুযশ সেকেন্ড হয়েছিল, বিদ্যাদি দু’বারই ফার্স্ট। এত জিনিয়াস স্টুডেন্ট ছিল এই বিদ্যাদি। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ডিবেটে বিদ্যাদি পৃথুযশ ভৌমিককে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছিল।’

‘হোলি শি—’ বিস্ময়ে মিস বসাকের মুখ থেকে শব্দটা বেরোল না। ‘আপনার কোনো ভুল হচ্ছে না তো?’

‘ভুল!’ নমিতার বুকের মধ্যে অনুশোচনার দগদগে ঘা-টা আবার জেগে উঠল। চোখের সামনে এখনও বত্রিশ বছর আগের সেই সকালটা টাটকা স্মৃতি হয়ে জ্বলজ্বল করছে—’

***

বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির কলেজ স্ট্রিট ক্যাম্পাসের দ্বারভাঙ্গা হলে আজ টানটান উত্তেজনা। গিজগিজ করছে হল। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ডিবেট। বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির সবচেয়ে এলিট কম্পিটিশন। এই হলে এই ডিবেট প্রতি বছরই হয়, কিন্তু আজ যে দু’জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে তারা একপ্রকার সেলিব্রিটি। বিদ্যাধরী দাস বনাম পৃথুযশ ভৌমিক। প্রথম জন বিএ, এমএ-তে প্রথম। বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিতে বন্ধুরা আদর করে ওকে সুকুমারী বলে। বিদ্যাধরী যদি সুকুমারী ভট্টাচার্য হয় তবে পৃথুযশ হল সুকুমার সেনের যোগ্য উত্তরসূরি। একদম লিভিং এনসাইক্লোপিডিয়া। মাত্র কয়েক নম্বরের জন্য ইউনিভার্সিটির পরীক্ষায় বিদ্যাধরীকে ছুঁতে পারেনি। দু’জনের মধ্যে একটা ঠাণ্ডা লড়াই চলে এটা গোটা ইউনিভার্সিটি জানে। আজকের ডিবেটের বিষয় হল এক অনবদ্য কঠিন টপিক—খনা লোককথা না বাস্তব। বিদ্যাধরী বাস্তবের পক্ষে আর পৃথুযশ লোককথা।

দ্বারভাঙা হলে শতাধিক চেয়ারের অর্ধেক দখল করে বসে আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসররা। আজকের ডিবেটের বিচারক দু’জন স্বনামধন্য আমেরিকান ইন্ডোলজিস্ট ড. হেনরি গ্যালাগার এবং বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির বাংলা বিভাগের প্রধান ড. প্রমথেশ বক্সী।

স্বাভাবিকভাবেই ছাত্র-ছাত্রীদের সকলের বসার আসন মেলেনি। তারা দেওয়ালের গায়ে বিশাল বিশাল অয়েল পেইন্টিংগুলির সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে ডিবেট শুরু হওয়ার। নমিতারও চেয়ারে স্থান মেলেনি। সে দাঁড়িয়ে আছে দেওয়াল ঘেঁষে প্রেমচাঁদ রায়চাঁদের বিশাল তৈলচিত্রের সামনে। মনে মনে সে বিদ্যাদির টিমে। পৃথুযশকে নমিতা ইন্টার ইউনিভার্সিটি ডিবেটে দেখেছে। ছেলেটা জ্ঞানের ভাণ্ডার, অদম্য কনফিডেন্স, ডিবেটে ড্রামাকিং হয়ে মাথা ঘুরিয়ে দেয় বিচারকদের, প্রচুর হোমওয়ার্ক করে আসে। বিদ্যাদি হলে ঢুকেছে একটু আগে। প্রতি পদক্ষেপে আত্মবিশ্বাস ঝরে পড়ছে। গট গট করে হেঁটে এল। নমিতা জানে যে যথেষ্ট তৈরি বিদ্যাদিও। নার্সিসিস্টটার মাথা খারাপ করে দেবে। জ্যোতিষ মানে না নমিতা, কিন্তু এটা ভালো লাগছিল যে নিজে একজন মেয়ে হয়ে খনা নামে একটা অত্যাচারিত মেয়ের পক্ষ নিয়ে লড়াই করতে এসেছে বিদ্যাদি।

শুরু হল ডিবেট। পৃথু্যুশের ডিবেটের স্টাইলের সঙ্গে খুবই পরিচিত নমিতা। অ্যাগ্রেসিভ বক্সারদের মতো রিং-য়ে ঢুকেই পেটাতে শুরু করে। শুরুতেই একদম নক আউট করে দেবার প্রচেষ্টা। আজও পৃথুযশ শুরু করল আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে—‘খনা যদি বরাহমিহিরের পুত্রবধূ হয় তাহলে প্রশ্ন আসে যে খনার বচনগুলো এত আধুনিক বাংলা ভাষায় কীভাবে লেখা হল? বরাহমিহির ছিলেন ৫০৫ খ্রিস্টাব্দে, তখন তো বাংলা ভাষার জন্মই হয়নি। অথচ খনা পড়লে মনে হয় যেন এই সেদিন লেখা হয়েছে। আসলে খনা বলে কেউ ছিল না। খনার নাম করে বাঙালি হাতুড়ে কবি বা জ্যোতিষীরা খনার বচন লিখে গেছেন। আর আমরা সেই সব বচনের লেখিকা হিসেবে এক কাল্পনিক খনার নাম নিই। ‘ যুক্তির একের পর এক পাহাড় প্রমাণ ঢেউ এনে পৃথুযশ বলে চলল ‘একটা প্রমাণ আমি দেখাই। খনার বচনে আছে—’

তামাক বুনে গুঁড়িয়ে মাটী।
বীজ পোঁত গুটি গুটি।
ঘন ঘন পুত না।
পোষের অধিক রেখো না।

খনার বচনে তামাক! হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়ের মতো পণ্ডিতের চোখেও এটা বিসদৃশ লেগেছে। উনি বলেছেন এই তামাক তো ভারতে বেশি দিন আসেনি। সত্যি, রামায়ণে বা মহাভারতে আমরা পাইনি যে বৃদ্ধ দশরথ বা পিতামহ ভীষ্ম তামাকের গড়গড়া টানছে। বুদ্ধের সময়ও তামাক ছিলই না। যতদূর জানা যায় যে তামাকে এসেছিল ভারতে আকবরের রাজত্বের শেষ দিকে। পর্তুগিজরা আকবরকে তামাকের গড়গড়া উপহার দিয়ে বলেছিল- জাঁহাপনা, একবার এর মৌতাত উপভোগ করুন। আকবর গড়গড়াতে টান দিতে যাবেন, তখন ওঁর হাকিম এসে নিষেধ করে বলেছিল—জাঁহাপনা, নিষিদ্ধ বস্তু খাবেন না। তারপর জাহাঙ্গীরের সময় তো জাহাঙ্গীর আইন করে তামাক খাওয়া নিষেধ করে দিয়েছিলেন। জাহাঙ্গীরের পরে আবার তামাক চাষ শুরু হয়। তাহলে খনা তামাক চাষ সম্বন্ধে এত কিছু জানলেন কীভাবে? আকবর জন্মেছেন ১৫৪২ খ্রিষ্টাব্দে, জাহাঙ্গীর ১৫৬৯ খ্রিস্টাব্দে, অতএব খনা মোটেই গুপ্তযুগের মানে ৫০০ খ্রিস্টাব্দের সময়কার মেয়ে হবেই না।’ তারপর পৃথু্যুশ একের পর এক ধারালো যুক্তি আনতে থাকল। অবশেষে বলল, ‘প্রাচীনকালের প্রচুর মানুষ এই বচনের ঝুলিতে নিজের পদ্য খনার নামে লিখে গেছে। অতএব প্রাথমিক ভাবে এটাই প্রমাণিত হয় যে খনা নামে কেউ বরাহমিহিরের সময়ে ছিল না। আর খনা যে বিদুষী ছিলেন তার প্রমাণ আমরা সেভাবে পাই না। কতদূরে কলাগাছ পুঁতবে, কিংবা মঙ্গলের ঊষা বুধে পা, যথা ইচ্ছা তথা যা এসব কুসংস্কারাচ্ছন্ন বচন শুনেই কাউকে বিদুষী বলা যায় কি?’

পৃথুযশ প্রসন্ন মুখে আসন গ্রহণ করল। মুখের অভিব্যক্তি যেন নিঃশব্দে বলছে—আগে এটা সামলাক, তারপর পরের ডোজ দেবে।

কিন্তু পৃথুযশ ভৌমিকের ধারণাই ছিল না বিদ্যাধরী দাসের প্রস্তুতি কী সাংঘাতিক রকম সুপার ক্লাসের—

***

মিস বসাকের ফোনটা বাজল। ‘হ্যাঁ গগন, আপনি এসে গেছেন? আমি রেল লাইনের পাশে একটা সাদা সুজুকি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, তার পাশে দাঁড়িয়ে আছি—দেখতে পেয়েছেন—গুড,’ কথা বলতে বলতে সামনে তাকালেন মিস বসাক। সামনে যে লোকটা হাতটা তুলে নাড়ালো তাকে দেখে মিস বসাক হতভম্ব—‘আপনি গগন ঢালি?’

‘হ্যাঁ ম্যাডাম,’ লোকটা রুমাল দিয়ে মুখ চেপে আছে।

‘একী! আপনার এরকম দশা কীভাবে হল?’

নমিতাও অবাক। লোকটার জামার বোতামগুলো ছেঁড়া, ডান চোখটা ফুলে প্রায় বন্ধ, চোখের নীচে আঘাতের চিহ্ন।

‘তিনজন ছিল ওরা। ভদ্রলোকের পোশাক। স্টেশনের আগে একটা বড় ফ্ল্যাট বাড়ি তৈরি হচ্ছে—ওর নীচ থেকে আমায় ডাকল। আমাকে ওখানে ডেকে নিয়ে গিয়ে গগলস পরা একটা ছেলে হিন্দি আর ভাঙা বাংলা মিশিয়ে বলল, ‘গগন ভাই, আমাদের হয়ে হাইকোর্টে একটা সাক্ষী দিতে হবে।’ আমি বললাম,

‘সাক্ষী! কে আপনারা? আপনাদের তো আমি চিনিই না। কী সাক্ষী দেব?’ লোকটার হাতে মোড়ানো ছিল আমার ‘বেহুলার খনা’ বইটা। লোকটা সেটা দেখিয়ে বলল, ‘তুমি কোর্টে গিয়ে বলবে এই সব খনার বচন তোমার লেখা। ব্যাস, এটুকু বললেই তোমায় আমরা পাঁচ হাজার টাকা দেব।’ আমি বললাম, এগুলো আমি লিখিনি। কেন মিথ্যা কথা বলব? আমায় মাফ করবেন, আমি মিথ্যা সাক্ষী দিতে পারব না। বেঁটে মতো তাগড়া ছেলেটা রগচটা। সে এগিয়ে এসে আমার কলার খামচে ধরে বলল, ‘এই শালা, তুই সাক্ষী দিবি।’ আমার মাথায় রাগ চেপে গেল আমি বললাম—‘আমি দেব না। কলার ছাড়।’ তখন ছেলেটা আমার গালে জোরে এক থাপ্পড় মেরে বলল, ‘তুই দিবি না, তোর বাপ সাক্ষী দেবে।’ আমি চোখে অন্ধকার দেখলাম। অন্য ছেলেটা এবার আমাকে জোরে এক ঘুষি মারল, বলল ‘বল সাক্ষী দিবি কিনা?’ তাতেও আমাকে রাজি করাতে পারল না যখন, তখন আমার জামা খামচে হিড়হিড় করে টানতে টানতে দেওয়ালে ছুঁড়ে মারল আমায়। বেঁটে তাগড়া গুণ্ডাটা আমার কাঁধের ঝোলা ছিনিয়ে নিয়ে খনার সব কটা বই ছিঁড়তে লাগল। তারপর আমাকে হুমকি দিয়ে বলল, ‘আর যদি কক্ষনো এই খনার বই বিক্রি করতে দেখি তবে তোকে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেব। আর যদি অন্য কারোর জন্য সাক্ষী দিতে কোর্টের ধারে কাছে যাস তোর গলা কেটে ফেলব,’ গগন হাঁফাচ্ছে। ‘এজন্য আমার আসতে দেরি হয়ে গেল। আপনারা ঘাবড়ে যাবেন তাই ফোনে বলিনি।’

‘আপনি এক্ষুনি ডাক্তার দেখান,’ নমিতা বলল। ‘ইন্টারনাল হ্যামারেজ হয়েছে মনে হচ্ছে।’

‘না না ম্যাডাম। আগে কাজটা শেষ করে নিই। আমি ওদের ছাড়ব না। আমি আমার মা’র ব্রোঞ্জের চুড়ি বন্ধক রেখে এই বই ছেপেছি। কতগুলো বই ছিঁড়ে ফেলল! ঠিক আছে, দেখা যাক কার কত দম।’ তারপর গগন হকার ভিখারিদের স্কুলের দিকে দেখাল। ‘ওনার সঙ্গে দেখা করাবার জন্যই আপনাদের এখানে ডেকেছি। ওই ম্যাডামই আমাকে ‘বেহুলার খনা’ বইটার পাণ্ডুলিপি দিয়েছেন।’

‘বিদ্যাদি দিয়েছে!’ নমিতা অবাক। ‘ওঁর নাম কি বিদ্যাধরী দাস?’

‘হ্যাঁ, আপনি চেনেন ওনাকে?’

‘অনেক দিন আগে চিনতাম, আপনি ওঁকে কীভাবে চিনলেন?’

‘ওনার বড়দা ধন্বন্তরি কবিরাজ আমার বাবার বয়সী। ওনার সঙ্গে আমার লোকাল ট্রেনে আলাপ হয়। তারপর ঈশ্বরের ইচ্ছা সব। চলুন কথা বলে আসি। তবে ওনাকে কিন্তু বলবেন না যে আমাকে কেউ মেরেছে।’

‘কেন?’

‘উনি মেন্টাল পেশেন্ট ছিলেন। অনেক কষ্টে সে অবস্থা থেকে উঠে এসেছেন, কিন্তু এখনো ব্রেনে বেশি চাপ নিতে পারেন না।’

‘বুঝেছি,’ নমিতা বলল। ‘আমরা কিছু বলব না। যা বলার আপনিই বলবেন। কিন্তু, উনি তো বাচ্চাদের ক্লাস নিচ্ছেন, ব্যস্ত।’

‘তাহলে আমরা একটু দাঁড়িয়ে যাই।’

‘উনি রোজ এখানে আসেন?’ অ্যাডভোকেট বসাক কৌতূহলী।

‘রোববার বাদ দিয়ে রোজ।’

হঠাৎ প্ল্যাটফর্মে ভিখারি বাচ্চাদের হৈ হুল্লোড় জেগে উঠল। ভিখারী পড়ুয়াদের স্কুল ছুটি। নমিতা দেখল বিদ্যাদি ট্রাঙ্কের ওপর রাখা ওঁর শান্তিনিকেতনী ঝোলা ব্যাগ ফাঁক করে একটা করে কলা ধরিয়ে দিল ছাত্রীদের হাতে। আনন্দে বাচ্চাগুলো হুল্লোড় করে ছুট লাগাল বস্তির দিকে। বিদ্যাদি ওদের খাতাগুলো লোহার ট্রাঙ্কে এমন ভাবে ঢুকিয়ে রাখল যেন কত মহার্ঘ্য্য বস্তু সামলে রাখছে। তারপর তালার চাবি পুরোনো ঝোলায় ঢোকাল। বিদ্যাদির ঝোলা ওর শাড়ির মতোই মলিন। দৃষ্টিতে বিদুষী নারীর স্নিগ্ধতা আছে, কিন্তু সেদিনের সেই দীপ্তি ওঁর চোখে নেই। সেদিন কী তেজ ছিল বিদ্যাদির! এখনো চোখে ভাসছে নমিতার। ইউনিভার্সিটির গেট দিয়ে বিদ্যাদি একদম সুচিত্রা সেনের মতো কনফিডেন্সে ভিতরে ঢুকত আর ছেলেদের দু’চোখে প্রেম উথলে পড়ত।

বিদ্যাদি এবার নমিতাদের দিকে এগিয়ে এল, তারপর গগনের দিকে দৃষ্টি পড়ল ওর—‘একি! এটা কীভাবে হল?’

‘ও কিছু না দিদি,’ গগন তাড়াতাড়ি বলে উঠল। ‘একটা স্কুটার ধাক্কা মেরে গেছে, রাস্তায় পড়ে গিয়ে এই হাত-টাত কেটে গেছে। আপনাদের কথা শেষ হলেই আমি ডাক্তারখানায় যাব।’

বিদ্যাদির চোখে ব্যথার দৃষ্টি। মিস বসাকের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার একটু তাড়া আছে।’

নমিতার ঘোর তখনও কাটেনি—‘বিদ্যাদি, আমায় চিনতে পারছ না? আমি নমিতা। তুমি প্রেসিডেন্সিতে আমাদের সিনিয়ার ছিলে।’

অ্যাডভোকেট বসাকের বোধহয় নমিতার এতটা মডেস্টি পছন্দ হল না। উনি বললেন, ‘নমস্কার, আমার নাম মাধবী বসাক, দিল্লি হাইকোর্টের অ্যাটর্নি। আর ইনি ড. নমিতা স্যান্যাল। বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির ডিন অব আর্টস ফ্যাকাল্টি।’

নমিতার অস্বস্তি হলো। এই মহিলার কাছে তার এসব পজিশন গর্ব করে বলার মতো মোটেই কিছু না। নমিতা আবার বলল, ‘আমাকে তোমার মনে আছে বিদ্যাদি?’

বিদ্যাধরী মাথা নেড়ে ধীর গলায় বললেন, ‘হ্যাঁ।’

‘তুমি এদের পড়াও?’

বিদ্যাদি চুপচাপ মাথা নাড়ালো।

নমিতার মনে হচ্ছিল কেন এই মহিলার সঙ্গে দেখা হল? এ তো হারিয়েই গেছিল, কেন এ আবার ওর জীবন পথে সামনে এসে ওর বিবেকে দংশনের জ্বালা জাগালো। বিদ্যাদি এবার মিস বসাকের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘গগন আপনাদের কথা বলেছে। বলুন কী প্রশ্ন আছে।’

অ্যাডভোকেট বসাক তৈরি হয়েই এসেছিলেন। ব্যাগ থেকে ‘বেহুলার খনা’ বের করে বললেন, ‘এই বইটা। গগন বলেছে এই বইয়ের ম্যানুস্ক্রিপ্ট আপনার থেকে পেয়েছে। আপনি কি আমাদের বলতে পারবেন এই বইয়ের প্রাচীন পাণ্ডুলিপি কোথায় পাব?’

‘প্রাচীন পাণ্ডুলিপি? আমি এশিয়াটিক সোসাইটি, বঙ্গীয় সংসদ, ন্যাশনাল লাইব্রেরি—সব খুঁজেছি, কিন্তু কোথাও পাইনি।’

‘আপনি তাহলে এটা পেলেন কোথা থেকে?’ মিসেস বসাক হতাশ।

ছোটবেলায় মা ওই ‘বেহুলার খনা’য় লেখা প্রত্যেকটা খনাবাক্য মুখস্থ করিয়েছিল। মার থেকে শোনা সেই গল্পই লিখে এই বইটার ম্যানুস্ক্রিপ্ট আমি গগনকে দিয়েছি।’ বিদ্যাদি কবজি ঘুরিয়ে ঘড়ি দেখল।

‘আচ্ছা,’ অ্যাডভোকেট বসাক বললেন। ‘আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, ম্যাডাম। আরেকটা দরকার ছিল, সোজাসুজিই বলি। একটা বিশেষ দরকারে আপনার একটু সময় চাই। আজ আপনি ব্যস্ত। কাল আসব?’

‘দেখুন এখানে আর আসবেন না প্লিজ। বাচ্চাগুলোকে পড়াতে বসাতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। ওই যে দেখছেন প্ল্যাটফর্মে আঁকা চু-কিৎ-কিৎ-ধাঁ এর ছক, ওখানেও লাফিয়ে লাফিয়ে এদের সঙ্গে খেলতে হয় যাতে ওরা ভাবে যে আমি ওদেরই একজন। আপনাদের এত দামি পোশাক, রোদ-চশমা, পার্স এসব দেখে ওরা ঘাবড়ে যায়। আমি আপনাদের সঙ্গে কথা বলছি দেখে আমার ওপর বিশ্বাস একদম হারিয়ে ফেলবে। অনেক কষ্টে এদের এক জায়গায় এনে লেখাপড়া শেখাচ্ছি।’

‘কিন্তু আমরা আপনার সাহায্য চাই, বিদ্যাধরী দেবী। আপনার এরকম ইনটেলিজেন্সকে দেশের জন্য –’ অ্যাডভোকেট বসাক আরেকটু চেষ্টা করলেন।

‘প্লিজ!’ বিদ্যাধরী হাত জোড় করল। ‘আমার কাছে আপনারা আর আসবেন না। আমি খুব ক্লান্ত।’

নমিতা খুব লজ্জা পেল। বিদ্যাদি ওর দিকে তাকাচ্ছে না। অ্যাডভোকেটকে বলল, ‘না না, ঠিক আছে। আমরা বিরক্ত করব না ওঁকে। মিস বসাক চলুন।’

মিস বসাক আর গগন হকারের সঙ্গে নমিতা প্ল্যাটফর্ম থেকে নেমে এল। ‘উনি একদম কোনো জটিলতা ব্রেনে নিতে পারেন না, গগন হকার বলল। গগন মাঝে মাঝে নাক হালকা করে চেপে ধরছে। ‘আমি একটা কথা বলি?’ গগন হকার ইতস্তত করে বলল। ‘দিদির বড়দা ধন্বন্তরি কবিরাজের কাছে গিয়ে আপনাদের সব কথা একবার বলুন। দিদি ওনাকে খুব মানেন।’

‘কোথায় পাব ওঁকে?’

আমাদের বজবজ লাইনে সন্তোষপুর স্টেশনের কাছে ওনার বাড়ি। আপনাদের যদি অন্য কোনো কাজ না থাকে তবে আমি একবার ফোনে কথা বলে দেখি?’

‘অন্য কাজ! আমার কাছে এটা জীবনের সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট কাজ। এভরিথিং এলস ক্যান ওয়েট,’ মিস বসাক বললেন। তারপর গগনের নাকের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘নট এভরিথিং, আপনার ইনজুরিটা আগে ডাক্তারকে দেখিয়ে নিই।’

‘ওটা কবিরাজমশাইয়ের কাছে গিয়ে ওষুধ নিয়ে নেব। বিদ্যাদি বাড়ি ফিরে যাওয়ার আগেই ওনাকে ধরতে হবে।’

‘সেটা কি উচিত হবে?’ নমিতা বলল। ‘বিদ্যাদি তা শুনে যদি অসন্তুষ্ট হন?’

কিন্তু যদি ওঁর দাদা ওঁকে রাজি করাতে পারেন, তাহলে ভাবুন ব্যাপারটা, বিদ্যাদেবী আর পৃথুযশ মুখোমুখি লড়ছে। জানি চান্স কম, তবু একটা অ্যাটেম্পট নেওয়া তো যেতে পারে। গগন ভাই, আপনি একবার ফোন করে দেখুনই না।’

‘দেখছি,’ গগন ফোন লাগাল। তারপর এদিক ওদিক পায়চারি করে অনেক কিছু বুঝিয়ে ফোন যখন রাখল তখন গগনের কালো মুখ উজ্জ্বল—‘ওনাকে রাজি করিয়েছি আপনাদের সঙ্গে দেখা করার জন্য। মানুষটা আসলে কারোর সঙ্গে মিশতেই চায় না। আমার ভাগ্য খুব ভালো যে– চলুন চলুন। আপনারা গাড়ি এনেছেন? না হলে অটোতে—’

‘আমার গাড়িটা পার্ক করা আছে ওদিকে রাস্তার ধারে,’ নমিতা বলল। ‘চলুন একবার যাওয়াই যাক সন্তোষপুরে। কিন্তু বিদ্যাদি যখন অলরেডি বলেই দিয়েছেন যে উনি রাজি নন, তখন ওঁর দাদা কি রাজি হবেন বিদ্যাদিকে বোঝাতে?’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *