।। ত্রিশ।।
রবিন সাহেব ও জমিদারবাবুকে বজরায় তুলে দেওয়ান অপেক্ষা করল তাদের প্রস্থানের। বজরা নদীর বাঁকে অদৃশ্য হয়ে যেতে দেওয়ান ফিরে এল সত্যাচার্যের আশ্রমে। দেওয়ান চিন্তিত মুখে সত্যাচার্যকে বলল, ‘সত্যঠাকুর, কাজটা কিন্তু খুবই বিপজ্জনক।’
‘কথায় বলে জলে থাকতে গেলে কুমিরের সঙ্গে শত্রুতা করে থাকা যায় না। আমি যদি সাহায্য না করি তবে রবিন সাহেব ডাকাত দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অপরাধে দারোগা ডেকে আমায় গ্রেফতার করিয়ে ছাড়বে।’
‘আর চন্দ্র ডাকাতের দল যদি জানতে পারে তবে?’
সত্যাচার্য চিন্তিত মুখে বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি কাজটা অতি সাবধানে সারতে হবে।’
ক’দিন কেটে গেল। ইংরেজদের ডাকগাড়ির ডিঙাডুবিতে আসা শুরু হল। বাক্স, সিন্দুক, পেটিকা ইত্যাদি জমিদারবাড়িতে ঢুকতে লাগল। গ্রামবাসীরা ফিসফিস করে বলাবলি করতে লাগল যে চুপি চুপি খাজনা আসছে। ওরা সব জানে।
সেদিন গভীর রাতে সত্যাচার্যের খিড়কি দরজায় মৃদু টোকা। সত্যাচার্য প্রদীপ উজ্জ্বল করে খিড়কি দ্বার খুলল। মুখে কালিঝুলি মাখা বল্লম হাতে ছ’জন ডাকাত অন্ধকারে দাঁড়িয়ে। আজ সত্যাচার্যের মনে অস্থিরতা। খুব বিপজ্জনক আজকের কাজ। ডাকাতরা ভিতরে ঢুকল।
‘ঠাকুরমশাই, এবারের কাজ খুব কঠিন। এবার খুব ভালো ভাবে আঁক কষে বলতে হবে।’
‘কাজটা কী?’
‘ইংরেজদের ডাকগাড়ি এসে অনেক সোনা, রূপো আজ জমিদারের কোষাখানায় ঢুকিয়েছে। আমাদের কাছে খবর এসেছে এই মঙ্গলবার আরো দুই সিন্দুক ভরা টাকাকড়ি নিয়ে ডাকগাড়ি আসছে। রাতে ডাকাতের ভয়ে খাজনা ভরা ডাকগাড়ি চলে না। ওরা জমিদারের কোষাখানায় সিন্দুক রেখে রাতটা কাটিয়ে আবার সকাল হলে রওনা দেবে।’
‘কিন্তু ওদের সঙ্গে তো বন্দুকধারী সেপাই থাকে!’
‘হ্যাঁ, বড় কাজে একটু বেশি ঝুঁকি নিতেই হয়। আমাদের কাছে খবর আছে ওদের সঙ্গে পাঁচজন সিপাই, দশ জন বরকন্দাজ, বাইশজন পিয়ন পাহারায় থাকবে। কিন্তু আমরাই বা কম কী? আমাদের সঙ্গে পঞ্চাশ জন লোক আছে,’ ডাকাতটা বলল। ‘সর্দার জিজ্ঞাসা করেছে, আপনি দয়া করে বলে দিন সামনের মঙ্গলবার শুভ দিন কিনা?’
সত্যাচার্য এবার প্রদীপের আলোয় একটা তুলোট কাগজে অনেক আঁকিবুকি করে বলল, ‘সামনের মঙ্গলবার খুবই শুভ দিন।’
ডাকাতদের চোখ লোভে চকচক করে উঠল। ‘আমরা সর্দারকে আপনার গণনার কথা বলব,’ ডাকাতরা সত্যাচার্যকে প্রণাম করল।
‘দীর্ঘজীবী হও,’ আশীর্বাদ করার সময় সত্যাচার্যের হাত কেঁপে গেল।
খঞ্জর হাতে একজন ডাকাত বলল, ‘ঠাকুরমশাই, আমরা আপনাকে ঈশ্বরের মতো বিশ্বাস করি। এরকম সুযোগ খুব কমই আসে। একে কাজে লাগাতে পারলে আমরা এক বছরের জন্য নিশ্চিন্ত।’
ডাকাতরা খিড়কির পথে বেরিয়ে বাইরের ঘন অন্ধকারে মিশে গেল আর সত্যাচার্য পাছদুয়ার বন্ধ করে দরজায় শিকল তুলে দিয়ে কপালের ঘাম মুছল।
* * *
পরদিন বেহুলার জ্যোতিষ-মন্দিরে একজন বৃদ্ধ এল কোষ্ঠী দেখাতে। বৃদ্ধ বলল, ‘মা এগাঁয়ে আর ভিক্ষা পাওয়া যায় না। আমি ভাবছি মঙ্গলবার উত্তরের দেশ মুর্শিদাবাদে চলে যাব। দিনটা কি শুভ?’
বেহুলা বলল, ‘খনার বচন আছে—’
শনি সোম পূবে বারে, বুধ বৃহস্পতি দক্ষিণে মারে।
রবি শুক্র পশ্চিমে শূল, উত্তরে মঙ্গল করে নির্মূল।
শুকাদিত্য পূর্ব্বে সিদ্ধি, বুধ বৃহস্পতি উত্তরে নিধি।
শনি সম পশ্চিমে কাজ, দক্ষিণে মঙ্গল ভূজে রাজ।।
উত্তরে মঙ্গলবার যেও না, বুধবার যাও।’
‘কিন্তু আমায় যে মা মঙ্গলবারেই যেতে হবে। আমি গাড়োয়ানের সঙ্গে কথা বলে রেখেছি।’
‘দেখ, আমি ওসব জানি না, তবে উত্তরে যাত্রার জন্য মঙ্গলবার ভালো দিন
না,’ বেহুলা বলল।
‘শনিসোমদিনে প্রাচীং দক্ষিণাং বুধজীবয়োঃ।
প্রতীচীং রবিশুক্রাহে গচ্ছেৎভৌমে ন চোত্তরাম।।
শনি ও সোমবারে পূৰ্ব্বদিকে গমন নিষেধ হয়, এইরূপ বুধ ও বৃহস্পতিবারে দক্ষিণদিকে, রবি ও শুক্রবারে পশ্চিমদিকে এবং ভৌম মানে মঙ্গলের বারে উত্তরদিকে গমন নিষিদ্ধ হয়ে থাকে। একান্ত যেতেই হলে খুব সাবধানে যেও। ঊষাকালে যাত্রা কোরো, ঊষায় অমঙ্গল কেটে যায়।’
‘তোমার মঙ্গল হোক মা, আমার ছেলের এই কোষ্ঠীটা একবার দেখে দেবে মা?’ বৃদ্ধ হলদে কাগজে লেখা কোষ্ঠীটা বেহুলাকে দিল।’
কোষ্ঠী দেখে বেহুলার ভ্রূ-যুগলে কুঞ্চন জেগে উঠল। ‘তোমার ছেলে?’
‘হ্যাঁ মা। ভুগছে ক’দিন ধরে।’
‘কেতু চতুর্থে, তার ওপর মঙ্গল দৃষ্টি দিচ্ছে। খুবই অশুভ যোগ। এই যোগের জাতক সাধারণত চোর ডাকাত হয়। পোড়োবাড়ি, জঙ্গল এসব জায়গায় থাকতে হয়।’ তারপর বাকি কোষ্ঠী দেখে বলল, ‘তুমি আর কক্ষনো আমার এখানে আসবে না।’
‘কেন মা, কী হল?’
‘তুমি ভালোই জান যে কী হল। তুমি এক্ষুনি চলে যাও।’
‘ছেলের ওপর এত রুষ্ট হলে চলে মা?’
‘তোমরা ডাকাত, মানুষ খুন করতে তোমাদের হাত কাঁপে না। তোমরা আমার ছেলে নও। তোমরা আর কক্ষনো আমার বাড়িতে পা রাখবে না। যদি তোমাদের আর কক্ষনো এদিকে দেখি তবে আমি দারোগাকে খবর দেব,’ বেহুলা এবার দৃঢ়স্বরে বলল।
বৃদ্ধ এবার সত্যি দ্বিধাগ্রস্ত। এ জ্যোতিষীর কাছে কিছুই গোপন থাকে না। আর কথা না বাড়িয়ে সে গাত্রোত্থান করল। নদীর পারে মাঝি নৌকা নিয়ে যাত্রীর জন্য বসেছিল। বৃদ্ধ তার নৌকায় উঠে মাঝিকে বলল, ‘কোনো খবর আছে?’
মাঝি বলল, ‘সামনের মঙ্গলবারে কাজীগ্রাম থেকে এখানে ইংরেজদের খাজনার যে ডাকগাড়ি আসছে তাতে খাজনা থাকবে না।’
‘বলিস কী রে?’ বৃদ্ধ হতবাক। ‘তবে ডাকগাড়ি আসছে কেন?’
‘ইংরেজরা রটিয়ে দিয়েছে যে অনেক টাকাকড়ি আসছে। কাজীগ্রামের সংবাদ যে ডাকগাড়িতে শুধু বন্দুকধারী সেপাই থাকবে। টাকাকড়ি কিচ্ছুটি থাকবে না। এটা তোমাদের জন্য টোপ ফেলেছে ইংরেজরা। তোমরা মঙ্গলবার খাজনা লুটতে এলেই দু’পল্টন সেনার মুখোমুখি হবে। কিছু সেনা ইতিমধ্যেই মজুত করে ফেলেছে ডিঙাডুবির জমিদারবাড়িতে।’
‘চন্দ্র সর্দারকে খবরটা তাড়াতাড়ি জানাতে হবে,’ বৃদ্ধ বলল। তারপর বৃদ্ধ পাখমারা গণকের বাড়ির উদ্দেশ্যে কপালে জোড়-হাত করে প্রণাম করে বলল, ‘জয় খনা মা’র জয়, জয় মা বেহুলার জয়!’
