1 of 2

বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৩৪

।। চৌত্রিশ।।

পরদিন হাটবার। মাসে দু’বার এই কাপাসডাঙার মাঠে হাট বসে। বেহুলা জটাকাকার জন্য আজ একটা পিরান, একটা গামছা আর ধুতি কিনবে বলে হাটে যখন পৌঁছলো তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। হাট বেশ জমে উঠেছে তন্তুবায়দের তাঁতের কাপড়, তুলো, সুতোই এখানে প্রধানত বেচা-কেনা হলেও অন্যান্য বৃত্তির ব্যবসায়ীরা যেমন গন্ধবণিক, কুম্ভকার, কাংস্যকার, শঙ্খকার, বারুজীবী, মোদক, মালাকার, ধীবর, শৌণ্ডিক, আরো কতরকমের পেশার মানুষ এখানে মুনাফা লাভের জন্য আসে। নানা আকারের মাটির হাঁড়ি, জালা, কলসি থেকে শুরু করে মশলাপাতি, ধান, চাল, শাক-সব্জী, লাঙলের ফলা, কোদাল, কাস্তে, কড়ি, তামাক, মিঠাই কত কী নিয়ে বসে ব্যাপারীরা। অসাধু ব্যবসায়ীরা শরৎকালের ফুটী কাপাসকে বসন্তের ফুটী কাপাস বলে দাম হাঁকছে। ঝানু খদ্দেররা জানে শরৎকালের ফুটী কাপাস দিয়ে অতি সুক্ষ্ণ মসলিন বয়ন কিছুতেই সম্ভব না। ওরাও দরদাম করছে। চেঁচামেচি হট্টগোলে হাট সরগরম। ভাঙা হাটের সময় দোকানিরা অনেক কম দামে জিনিস বিক্রি করে, তাই অনেক হাটুরে শুধু গল্পে মত্ত হয়ে অপেক্ষা করছে বিকেল হওয়ার। বেহুলা তাঁতিদের কাছ থেকে একটা পিরান, গামছা, একটা ধুতি কিনে, একটা মাটির কলসি কেনার জন্য কুমোরের দোকানের দিকে চলল। ওর নজরে এল হাটে বসা জ্যোতিষীর খড়ের চালার সামনে জটলা। কৌতূহলে বেহুলা কাছে এগিয়ে গেল। দেখল সত্যাচার্য ঠাকুর গ্রাম্য জ্যোতিষীকে খুব বকাঝকা করছে। গণক বেচারা জানে সত্যাচার্যের এ গ্রামে কেমন প্রতিপত্তি তাই মুখ চুন করে গালাগালি খাচ্ছে।

বেহুলা ফিসফিস করে পাশের হাটুরেকে জিজ্ঞাসা করল, ‘সত্যঠাকুর এত রেগে গেছে কেন?’

‘সত্যঠাকুর ধরে ফেলেছে গণক ঠকাচ্ছে,’ হাটুরে বলল। ‘ওই মাঝি বেদগ্রামে ছেলের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখে এসে সেই মেয়ের কোষ্ঠী আর তার নিজের ছেলের কোষ্ঠী নিয়ে গণক ঠাকুরের কাছে এসেছে কোষ্ঠী মেলাতে। গণক ঠাকুর কোষ্ঠী দেখে বলে কিনা দু’জনের একদম রাজযোটক। সত্যঠাকুর এমন সময় ভাগ্যিস এসে পড়েছিল। কোষ্ঠীদুটো দেখে এবার গণককে এই মারে কি সেই মারে।’

‘বিয়ের জন্য ছেলের কোষ্ঠী মিলছে কিনা তা দেখাতে ওই মাঝি এই হাটে এসেছে!’ বেহুলা অবাক। ‘সাধারণত এসব কাজ ভালো চেনা জ্যোতিষীর আশ্রমে গিয়ে সময় নিয়ে দেখানো হয়। তাছাড়া মেয়ের কোষ্ঠী বানিয়েছে!’

ভিড়ের মধ্যে থেকে বেহুলা সামনে উঁকি মেরে দেখল মাঠে গড়াগড়ি দিচ্ছে দুটো পাকানো হলদে তুলোট কাগজ, ভিতরে কোষ্ঠীর আঁক। সত্যঠাকুর চেঁচিয়ে বলছে, ‘ভণ্ড গণক! তোকে এই হাটে আর কক্ষনো ঢুকতে দেব না। তুই মেয়ের কোষ্ঠী দেখে বলছিস যে মেয়ে এত নির্মলমূর্তি, সুশীলা। বদমাস! মেয়ের বাপ ক’কড়ি দিয়েছে তোকে? যে মেয়ের লগ্ন থেকে সপ্তমে দুটো পাপ গ্রহ অবস্থান করে, জানিস নে সেই নারী কামাতুরা, বিধবা, কুলনাশিনী হয়? সংস্কৃত তো পড়িসনি তোরা কামার্তা বিধবা কুলক্ষয়কারী পাপদ্বয়েচাস্তগে তোরা শুধু আওড়াস খনা। এই মেয়ের কোষ্ঠীতে আছে সপ্তমে শুক্র আর কেতু। এ মেয়ে তার পতিকে খাবে। আমি বেশ দেখতে পারছি এই মেয়ের অকালবৈধব্য। এই খনাই তোদের পতন আনবে।’

বেহুলা সত্যঠাকুরের ছায়াও মাড়ায় না, লোকটার নাম শুনলেই মাথায় আগুন জ্বলে। তাই সত্বর এই বাক-বিতণ্ডার স্থান ত্যাগ করছিল সে, কিন্তু সত্যঠাকুরের পরুষ বচন শুনে হঠাৎ থেমে গেল। সত্যঠাকুর পেয়েছেটা কী? লোকটা হাটে এত মানুষের সামনে খনার নিন্দে করছে? একবার দেখি তো কোষ্ঠীটা। বেহুলা সামনে এগিয়ে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে মাটিতে খোলা পড়ে থাকা কোষ্ঠীটা হাতে তুলে নিল। বেশ পাকা হাতের কাজ। নক্ষত্রের অবস্থান, গ্রহের বক্রগতি সব লেখা আছে। বেহুলা এবার গম্ভীর হয়ে মাঝিকে বলল, ‘তুমি মেয়ে দেখে এসেছ?’

‘হ্যাঁ।’

‘নিজের চোখে?’

‘হ্যাঁ। গত পরশু গিয়ে দেখে এসেছি।’

‘মিথ্যা কথা!’ বেহুলা কোষ্ঠীতে চোখ রেখে বলল।

এবার সত্যাচার্য অগ্রসর হয়ে এসে বলল, ‘অ্যাই মেয়ে, তুই যা এখান থেকে। সর্বত্র মাতব্বরি করা তোর স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে।’

বেহুলা সত্যাচার্যের দিকে না তাকিয়ে মাঝিকে বলল, ‘মেয়ের এই কোষ্ঠী তোমায় কে দিয়েছে?’

মাঝি এবার থতমত খেয়ে গেল, তারপর বলল, ‘মেয়ের বাপ।’

এবার বেহুলা কোষ্ঠীতে চোখ রেখে বলল, ‘সত্যঠাকুর, তোমার গণনা ভুল। এ মেয়ে কখনো বিধবা হতেই পারে না। কেননা এ মেয়ের সাত বছর বয়সে মৃত্যু হয়েছে।’

হাটের অনেকেই বেহুলাকে চেনে। তারা বেহুলার কর্মকাণ্ড দেখার জন্য ভিড় করেছিল। এবার ভিড়ের মধ্যে গুঞ্জন উঠল—‘সত্যঠাকুরের গণনা ভুল?’

বেহুলা বলল, ‘খনা বলে গেছে—

একে উণ শাকে দুন তিথি নক্ষত্র দিয়া গুণ
অষ্টোত্তরশতে হরিলে রহে যে আয়ুঃ—’

‘চুপ কর!’ সত্যঠাকুর বেহুলাকে থামিয়ে দিল।

বেহুলা এবার মাঝিকে চেপে ধরল, ‘কেন মিছিমিছি গণকঠাকুরকে ভণ্ড প্ৰমাণ করার জন্য এসব খেলা খেলছ? কে তোমায় লাগিয়েছে এই নোংরা কাজে?’

মাঝি মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

‘কী হল? বল?’ বেহুলা চেঁচিয়ে বলল।

এবার সত্যাচার্য বেহুলার দিকে তেড়ে এল। বেহুলার দিকে সক্রোধ লোচনে সত্যাচার্য বলল, ‘কোষ্ঠী দেখে মেয়ের পরমায়ু গুণে দিলি? এত সোজা পরমায়ু বের করা? স্বয়ং বরাহমিহির তার পুত্রের পরমায়ু গণনা করতে পারেন নি।’ সত্যাচার্য বেহুলার হাত থেকে কোষ্ঠীটা ছিনিয়ে নিয়ে কুটি কুটি করে ছিঁড়ে ফেলল। তারপর বেহুলার দিকে অগ্নিদৃষ্টি হেনে স্থান ত্যাগ করল। এই মেয়ে আমার মান মর্যাদা যেখানে সেখানে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে, ডেভিড সাহেব একে না থামাতে পারলে আমাকে নিজেকেই শীঘ্রই কোনো ব্যবস্থা নিতে হবে, বিড়বিড় করে বলতে বলতে সত্যাচার্য উড়ানী কাঁধে তুলে স্থানত্যাগ করল।

বেহুলা উত্তেজনায় লক্ষ করেনি ডেভিড সাহেব কখন ভিড়ের মধ্যে এসে দাঁড়িয়ে সব দেখছে। সত্যাচার্য স্থান ত্যাগ করার পর বেহুলা জটাকাকার পিরান, গামছা, ধুতি নিয়ে পিছন ফিরতেই সাহেবের সঙ্গে চোখাচোখি হল। বেহুলা ভাবল সাহেবের কোষ্ঠীর কথাটা সাহেবকে বলবে? নাঃ, এত লোকের সামনে ওসব না বলাই ভালো। বেহুলা তাড়াতাড়ি কুমোরের দোকান থেকে কলসি কিনে বাড়ির পথ ধরল। অল্প কয়েক পা অগ্রসর হয়ে বেহুলা শুনতে পেল পিছনে সাহেবের গলা—‘বেহুলা!’

হাটের এত লোকের সামনে সাহেব ডাকছে? বেহুলা লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়ে পিছন ফিরে তাকাল।

সাহেব এগিয়ে এসে বলল—‘টুমি কীভাবে বললে মেয়েটা সাত বছর বয়সে মরে গেছিল?’

বেহুলা বলল, ‘সাহেব, আমাদের পরমায়ু কীভাবে বুঝতে হয় খনা তা বলে গেছে।’

‘কী বলেছে?’

বেহুলা ভেঙে বলল, শাকে মানে যে শকাব্দে জন্ম হয়েছে তার থেকে এক বিয়োগ করে তাকে দুনা মানে দুই দিয়ে গুণ করে তার সঙ্গে নক্ষত্রের সংখ্যা-’ সাহেব হতাশায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘এই নক্ষত্রের গণনা কীভাবে করে?’

বেহুলা আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘নক্ষত্র সংখ্যা এক হল বিশাখা, দুই হল অনুরাধা, তিন–,’ সাহেবের গোলগোল চোখ দেখে বেহুলা বুবঝল অযথা এভাবে বোঝানো অসম্ভব। ‘সাহেব এ আমাদের দেশের জ্যোতিষশাস্ত্র। খনার এই জ্যোতিষ গণনা শিখতে তোমার অনেক দিন সময় লাগবে।’

‘হু ইজ খনা? খনা কে?’

‘খনা একজন বিখ্যাত জ্যোতিষী ছিল,’ বেহুলা আর বিশদে গেল না।

‘টুমি খনার পুঁথিতে কী কী লেখা সেটা আমাকে পড়ে বুঝাইয়া দিবে? আমি ইংলন্ডের একটা খবরের কাগজের এডিটরকে চিনি। আমি খনার লেখাগুলো ইংরাজিতে ট্রান্সলেট করে বিলাতে নিউজপেপারে ছাপাইব। ইন্ডিয়ান অ্যাস্ট্রোলজির এইসব হিডেন শ্লোক সকলের সামনে আসা উচিত। টুমি আমাকে উহার অর্থ শিখাইয়া দিবে?’

বেহুলা বলল–‘সাহেব, জ্যোতিষশাস্ত্র হল সমুদ্র। তোমায় কীভাবে আমি এত অল্প সময়ে এত সব শেখাব। তবে হ্যাঁ আমি তোমায় খনা কী লিখেছে আর সেটার মানে কী তা বলে দিতে পারি।’

‘এক্সিলেন্ট!’ কথাটা ডেভিড সাহেবের পছন্দ হল। ‘তাহলে টুমি খনার পুস্তক কাল থেকে আমাকে পড়াইবে?’

‘কিন্তু সে পুস্তক তো আমার কাছে নেই।’

‘নেই! কোথায় পাবো সেই পুঁথি?’

‘জমিদারবাড়িতে রাখা আছে সেই পুঁথি।’

‘জমিদারবাবুর পুঁথি?’

‘খনার পুঁথি নদীর খাত থেকে খুঁড়ে পেয়েছে জটাকাকা। কিন্তু সেই পুঁথি জমিদারবাবুর কোষাখানায় ফেলে রাখা হয়েছে। ওটা বাইরে আনা যাবে না।’

‘কেন?’

বেহুলা নিরুত্তর। সত্যাচার্যের নামে নালিশ করে লাভ নেই।

‘ঠিক আছে। আমি দেওয়ানজীকে অনুরোধ করিব টোমায় সেই পুঁথিটা দিতে আর টুমি আমায় ওখানে যা যা লেখা আছে তাহার অর্থ বুঝাইবে। ঠিক আছে?’

‘ঠিক আছে সাহেব,’ বেহুলা খুশিতে বলল।

‘দিস ইজ আ ডিসকভারি। আমি আজই দেওয়ান দুর্লভচাঁদের সঙ্গে কথা বলিব।’

সাহেব চলে গেল, বেহুলার মন আনন্দে নেচে উঠল যে খনার পুঁথি হাতে পাওয়ার একটা সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *