1 of 2

বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৪৮

।। আটচল্লিশ ।।

বেহুলা ছুটতে ছুটতে ফিরিঙ্গি কুঠিতে এল। কুঠির সদর দরজা খোলা। বেহুলা ভিতরে ঢুকল। ডেভিড সাহেব ওর জামা কাপড় ছুঁড়ে ছুঁড়ে বাক্সে ঢোকাচ্ছিল। চলে যাওয়ার প্রস্তুতি। বেহুলা মুখোমুখি এসে দাঁড়াল।

বেহুলা কান্নাভেজা গলায় জিজ্ঞাসা করল—‘সাহেব, দেওয়ান যা বলছে সেসব কি সত্যি? আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই। দোহাই সাহেব, আজ আমাকে কিছু লুকিও না। তুমি একজন বেশ্যাকে খুন করেছিলে?’

ডেভিড সাহেব একটু সময় নিল। যেন মনে মনে সাজিয়ে নিল কীভাবে সব বলবে। তারপর বলল, ‘ডিহি কলিকাতায় হুগলি নদীর পাড়ে অনেকগুলো নোংরা, কুৎসিত সরাইখানা আছে। ওখানে নাবিকরা রাতে ফূর্তি করতে যায়। তবে ওদের রান্না চমৎকার তাই আমরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যাচেলার সৈন্যরা সস্তায় তোফা খানা খেতে প্রতি সপ্তাহের শেষ দিনে যেতাম। নদীর মাছ, মুরগি, ডিম, বেকন, উৎকৃষ্ট রুটি আর আকণ্ঠ মদ গিলে অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা মেরে রাতে বাড়ি ফিরতাম। পরদেশে একাকীত্ব এক অভিশাপ। আমি একাকীত্ব কাটাতে ওখানে নাবিকদের পাল্লায় পড়ে শ্যাম্পেন ও ক্ল্যারেট খুব বেশি মাত্রায় পান করিতে শুরু করিলাম। অত্যধিক মদ্যপানের কুফলে মাঝে মাঝে বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত হয়ে সরাইতে ঘুমিয়ে পড়তাম। আমাদের সেনাবাহিনীর কড়া নিয়ম ছিল রাতে ব্যারাকে ফিরে আসতেই হবে, না হলে শাস্তি। সেদিন খুব নেশা হয়েছিল। মদ্যপান করে সরাইতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেল, সবাই ফিরে গেছে, আমাকে একলা ব্যারাকে ফিরতেই হবে। তাই তাড়াতাড়ি সরাই থেকে বেরিয়ে অন্ধকারে একা একাই গলির পথে বাড়ি ফিরছিলাম। হঠাৎ একজন নারীর চিৎকার শুনলাম। দেখলাম একটা মেয়ে রাস্তার অন্ধকারে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আসছে আর পিছনে ধাওয়া করেছে দু’জন যুবক। মেয়েটা আমার পায়ে ধরে বলল আমায় বাঁচাও, বদমাশগুলো আমার ওপর অত্যাচার করবে, আমায় আশ্রয় দাও। আমি পিস্তল বের করলাম। যুবক দুটোও মদ্যপ ছিল। আমায় ধন্যবাদ দিয়ে বলল, ওরা মেয়েটাকে বেশ্যাবাড়িতে ডেলিভারি দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু মেয়েটা ওদের হাত ছাড়িয়ে টমটম থেকে লাফ মেরে দৌড় লাগিয়েছে। মেয়েটা কেঁদে বলল যে ওকে ওর গ্রাম থেকে নৌকায় তুলে এনেছে এই বদমাশগুলো। মদ্যপ শুয়ারদুটো হা হা করে হেসে বলল তোর মামা তোকে আমাদের কাছে ন’টাকায় বেচে দিয়েছে। তুই এখন আমাদের মাল। আমরা তোকে যেখানে ইচ্ছা বিক্রি করব। আমি বুঝলাম এটা ক্রীতদাস ব্যবসার দল। এরা বিপজ্জনক হয়। কিন্তু মেয়েটার কাতর আর্তি দেখে আমার দয়া হল। আমি বললাম এই মেয়েকে আমি পুলিশের হাতে দেব। মদ্যপ যুবক দুটো তখন নেশায় টলছে। ওদের একজন আমাকে শাসাল যে এক্ষুনি যদি আমি মেয়েটাকে ওদের হাতে তুলে না দিই তবে আমায় গুলি করবে। যুবক পিস্তল বের করল। আমারও হাতে পিস্তল। যুবক রেগে অগ্নিশর্মা। আমায় ডুয়েল লড়ার জন্য চ্যালেঞ্জ করল। কলিকাতায় চ্যালেঞ্জ বলতে ডুয়েলই বোঝায়। আমি দেখলাম আর কোনো বিকল্প নেই। আমি রাজি হলাম। অন্ধকার গলিতে মেয়েটা ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। আমরা দু’জনে পিস্তল হাতে নিয়ে দু’জনে দু’জনের দিকে পিছন ফিরে বারো পা গিয়ে ঘুরে একে অপরকে গুলি করব এমনটাই নিয়ম। যুবকের বন্ধু গুণতে লাগল এক—দুই—তিন হঠাৎ গুলির আওয়াজ। পিছন ফিরে দেখি মদ্যপ যুবক মেয়েটাকে গুলি করেছে, মেয়েটা কাটা গাছের মতো রাস্তায় পড়ে গেল। আমি কিছু বোঝার আগেই ও আমাকে গুলি করল, কিন্তু ওর নেশার জন্যই বোধহয় গুলি আমার মাথার পরিবর্তে কান স্পর্শ করে বেরিয়ে গেল। আমি দেরি না করে ফায়ার করলাম। সোজা ওর কপালে। ছেলেটা পড়ে যেতেই ওর বন্ধু ভয় পেয়ে দৌড়ে অন্ধকার গলিতে হারিয়ে গেল। পরদিন আমাকে দারোগা গ্রেপ্তার করল। যাকে মেরেছি সেই ছেলেটা দারোগার শালা ছিল, আমি নাকি একটা বেশ্যা নিয়ে রাতের অন্ধকারে ফূর্তি করছিলাম। দারোগার শালা আমাকে বাধা দিতে আমি মদের নেশায় দারোগার শালাকে গুলি করে মেরেছি। বেশ্যাটা যাতে সাক্ষী না দিতে পারে সেজন্য বেশ্যাটাকেও গুলি করে মেরেছি। অন্য যুবক নাকি সাক্ষী দিয়েছে সে পথচারী ছিল, আমাকে অন্ধকারে দেখেছে।’

‘তারপর?’

‘আমি ব্রিটিশ সেনাবিভাগে ইঞ্জিনিয়ার বাহিনীর সাবঅল্টার্ন হয়ে এদেশে এসেছিলাম। দারোগারা ব্রিটিশ সৈন্যদের ঘাঁটাতে সাহস পায় না। তাই আমার মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে বিশ হাজার সিক্কা টাকা জরিমানা করল। জরিমানা না দিতে পারলে নবাবের কাছে নালিশ, তার অর্থ মৃত্যুদণ্ড। আমি সাধারণ সৈন্য অত পাউন্ড কোথায় পাব, তখন জমিদার গোপীচরণ আমার দণ্ডিত অর্থ চুকিয়ে দেবার জন্য রাজি হন। তার বদলে আমায় চন্দ্র ডাকাতকে ধরিয়ে দিতে হবে আর তুমি নাকি ডাকাতদের দলেরই লোক, তাই তোমাকেও কলকাতা নিয়ে যেতে হবে। আমি তোমাদের এখানে এলাম। তোমার সঙ্গে দেখা হল, কিন্তু তুমি আমার প্রাণ বাঁচালে। আমি অকৃতজ্ঞ নই। আমি প্রতিজ্ঞা করিলাম যে তোমার কোনো ক্ষতি হতে দেব না। তোমার সঙ্গে মেলামেশা বাড়ল। আমি ধীরে ধীরে তোমার প্রেমে পড়ে গেলাম। বাকিটা তুমি সব জানো। আসলে এরা সকলে দাস ব্যবসায়ী। বেহুলা, আমার মন এই অন্যায় সহ্য করতে না পেরে ক্রমেই ইংলন্ডমুখী হয়ে উঠেছে। ইংলন্ডের শৈশবের কত স্মৃতি বারবার মনে জেগে উঠছে। আমি এই ঝঞ্ঝাট থেকে মুক্ত হলে দেশে ফিরে যাব। আমি দোষী। আমি তোমার থেকে ক্ষমা চাইছি। আমি ফিরে যাবই দেশে। আমার এই ভারতবর্ষ আর ভালো লাগছে না।’

‘আমাকেও না?’ বেহুলা বলল।

‘আমি তোমার উপযুক্ত নই, বেহুলা –’ সাহেব বাকি কথা শেষ করতে পারল না, তার আগেই বেহুলার দুই কোমল বাহু সাহেবের গলায় উড়ানি হয়ে জড়িয়ে গেল। বেহুলার সহসা এই আলিঙ্গনে অপ্রস্তুত ডেভিড থরথর করে কেঁপে উঠল। কিন্তু তারপরই বেহুলার ওষ্ঠাধরের উষ্ণতার আবেশে ডেভিডের দু’চোখ বুজে গেল। ডেভিডের মনে হলো তার মনের সব ক্লেদ এক নির্ঝরিণী এসে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এক নরম অগ্নিস্নানে পুড়ে যাচ্ছে মনের সমস্ত কলুষতা। এক গাঢ় পরিতৃপ্তিতে ডেভিড বেহুলাকে জড়িয়ে ধরে সেই আলিঙ্গনপাশ আরো দৃঢ় করে বেহুলার শরীর তার নিজের শরীরে তুলে নিল। বেহুলার বুকের ভিতর এক ভালোলাগার নাগরদোলার ঘূর্ণন শুরু হল। এক অদ্ভুত নেশা। বেহুলার সারা শরীর বিবশ হয়ে গেল। বেহুলা যেন ডেভিডের শরীরের উত্তাপে ডেভিডের শরীরের ভিতর মোমের মতো গলে গেল।

স্বল্পক্ষণ পর, বেহুলা ওর মুখ ঢেকে থাকা ঘর্মাক্ত আলুলায়িত কেশ পিঠে সরিয়ে দিয়ে স্খলিত শাড়ি পূর্বাবস্থায় আনতে আনতে বলল—‘তুমি চলে যেও না, সাহেব।’

‘আমি এখানে থাকতে পারবো না বেহুলা। এখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে।’

‘তাহলে আমার কী হবে সাহেব? এরা তো আমায় শেষ করে দেবে।’

‘তুমি আমার সঙ্গে চলো বেহুলা।’

‘কোন পরিচয়ে?’

‘পরিচয়? একটু দাঁড়াও,’ সাহেব দ্রুতপায়ে পাশের ঘরে চলে গেল, যখন ফিরে এল হাতে একটা কড়ির ঝাঁপি। ‘এখানে একশো টাকা আছে। তোমাদের প্রথার বধূপণ।’ সাহেব বেহুলার সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসল—‘এবার আমাদের দেশের একটা প্রথা। পুরুষকে নারীর সামনে এভাবে ঝুঁকে প্রণয় জানাতে হয় কাপাসডাঙার বিদুষী জ্যোতিষী বেহুলা, তুমি কি ইংলন্ডের অবাধ্য সৈনিক ডেভিড স্মিথকে বিবাহ করিবে?’

‘হ্যাঁ করব,’ বেহুলার চোখে-মুখে আনন্দের ঝলকমিশ্রিত পূর্ণাহুতির সম্মতি। হঠাৎ বেহুলার খেয়াল হল বচনপিসি অনেকক্ষণ বাইরে অপেক্ষা করছে। বেহুলা তাড়াতাড়ি ফিরিঙ্গি কুঠির থেকে বাইরে বেরিয়ে এল। বচনপিসি পাশের বটগাছের শিকড়ের ওপর পা ছড়িয়ে বসে ছিল। বেহুলা মিনমিন করে বলল, ‘কথা বলতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল।’

বচনপিসি একগাল হেসে বলল

‘পিরীতি কী তা জানি
উপোস ভাঙে রানি।’

বেহুলা লজ্জায় মুখ নামিয়ে নিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *