।। পঁয়ত্রিশ।।
পরদিন বেলা বাড়তে বাড়তে দুপুর গড়িয়ে গেল। আজ যজমানদের ভিড় অনেক ছিল। বেহুলা এবার জ্যোতিষ-মন্দিরের মাদুর গুটাচ্ছিল, এমন সময় বাইরে পুরুষকণ্ঠ। বেহুলা দেখল দাঁড়িয়ে সেই ডেভিড সাহেব ‘ভিতরে আসিতে পারি?’ সাহেব তার মাথার টুপি খুলে বলল।
‘আরে সাহেব এসো এসো,’ বেহুলার মন খুশিতে ভরে গেল। বেহুলা তাড়াতাড়ি আবার মাদুর পেতে দিল। সাহেব বসল।
‘খনার পুঁথির বিষয়ে দেওয়ানজীর সঙ্গে কথা হল?’ বেহুলা বলল।
‘বলিতেছি। তাহার আগে বল আমার কোষ্ঠীটা কেমন দেখিলে?’ সাহেব জিজ্ঞাসা করল।
‘দেখলাম, বেহুলা গম্ভীর গলায় বলল। ‘এই তো আমার হাতের কাছেই রাখা।’ বেহুলা চালের বাতার থেকে কোষ্ঠীটা নামিয়ে মোড়ক খুলে কোষ্ঠীটা মেঝেতে পেতে দেখাল–
‘এই কোষ্ঠীর বাঁদিকের কোণায় লং দেখছ ওটা জন্ম লগ্ন। লগ্ন থেকে চতুর্থ স্থান বন্ধুস্থান। সাহেব তোমার বন্ধুস্থানে আছে রবি। আর রবি সগৃহস্থ। সেটা অত্যন্ত ভালো লক্ষণ। কোনো প্রবল প্রতাপশালী রাজা, নবাব বা জমিদার ইত্যাদিদের তোমার বন্ধু হিসেবে পাবে।’
‘হ্যাঁ, আমার এক জমিদার বন্ধু আছে বটে যে আমার দরকারে বিশ হাজার সিক্কা টাকা বের করে দিতে পারে,’ ডেভিড সাহেব বলল। ‘কিন্তু আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করিব যদি টুমিও আমার বন্ধু হও।’
বেহুলা লজ্জায় রাঙা হয়ে গেল, কিন্তু মনের ভাব বুঝতে না দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, ‘সাহেব, তোমাকে আমি ভাগ্যবান বলতাম, কিন্তু তোমার পিতৃকারক রবির ওপর মকরস্থ মঙ্গল পূর্ণদৃষ্টি দিচ্ছে আর এই যে তোমার লগ্ন থেকে সপ্তমঘরে অবস্থিত রাহু তোমার মাতৃকারক চন্দ্রের ওপর পূর্ণদৃষ্টি দিচ্ছে। তোমার জন্মের সময় তোমার মা-বাবা কি জেলখানায় ছিলেন?’
‘আমার বাবা কোথায় ছিল তা জানি না, কারণ আমার বাবা কে তাই জানি না।’ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তবে আমার মা জেলখানায় ছিলেন না।’ হঠাৎ সাহেবের মুখমণ্ডলে যেন ঘন মেঘের কালিমা নেমে এল।
‘সাহেব, তোমার বাবাকে তুমি দেখনি? তিনি কি তোমার শৈশবে মারা গেছেন?’
ডেভিড সাহেব বেহুলার করুণামাখা দৃষ্টির দিকে তাকাল। তারপর খুব ধীর শান্তস্বরে বলল, ‘টুমি অত্যন্ত কোমলহৃদয়া মানুষ বেহুলা। আমার জন্য ডুক্ষিটো হইও না। আমার মা এক ব্যারনের রক্ষিতা ছিলেন, সেই ব্যারন তার রক্ষিতার যথেষ্ট খেয়াল রাখিয়াছিলেন এবং লোকসমাজে স্বীকার না করিলেও তিনিই আমার বাবা,’ কথাটা বলতে বলতে এবার ডেভিডের মুখ রক্তবর্ণ হয়ে গেল।
‘কিন্তু এই ছকের সহিত আমার লাইফের কিছুই মিলিতেছে না।’
‘মেলার তো কথা না। সাহেব, কে বানিয়েছে তোমার এই কোষ্ঠী? যেই বানাক, সে তোমাকে ঠকিয়েছে। কারণ এটা তো ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ছক : শ্রীকৃষ্ণের বন্ধুস্থান এত ভালো ছিল যে তিনি পঞ্চপাণ্ডবকে বন্ধু হিসেবে পেয়েছিলেন। অর্জুন তার প্রিয়সখা। শ্রীকৃষ্ণের জন্মের সময় তার মা-বাবা দু’জনেই কারাগারে ছিল। তারপর এটা দেখ, বেহুলা দেখাল ‘শ্রীকৃষ্ণের সপ্তমাধিপতি মঙ্গল তুঙ্গী হয়ে কোণস্থ হওয়ায় বহুবিবাহ সূচিত করছে।
‘কিন্তু গড শ্রীকৃষ্ণের জন্ম তারিখ কোথা থেকে পেলে?’
বেহুলা বলল, ‘আমি জানি না সত্যি কবে তাঁর জন্ম। তবে শ্লোক বলে
উচ্চস্থাশনিভৌমচান্দ্রিশনয়ো লগ্নং বৃষো লাভগো জীবঃ
সিংহ তুলানিষু ক্রমবশাৎ পুষোশনো রাহবঃ—
‘আমার মাথা ঝিমঝিম করছে,’ ডেভিড সাহেব বলল। ‘তোমাদের বাংলা ভাষা তাড়াতাড়ি বলিলে আমি বুঝিটে পারি না।’
‘এটা সংস্কৃত, বেহুলা হেসে বলল, ‘এর মানে ভগবান কৃষ্ণের জন্মের সময় বুধ, শনি, মঙ্গল, চন্দ্র এই চারটি গ্রহ তুঙ্গে ছিল আর তাছাড়া রবি, চন্দ্র আর বৃহস্পতি স্বগৃহে ছিল—এরূপ যোগে একমাত্র অবতারই জন্ম নিতে পারে।’
আমি ফিরে গিয়ে ওই জ্যোতিষীর মাথা ভাঙিব! আমাকে এত ঠকালো!’ ডেভিড সাহেব রেগে লাল। ‘আমি ডুম্ফিটো, টোমার এত অসুবিধা করিলাম।’
‘তোমার দুঃখিত হওয়ার কিছু নেই সাহেব, বেহুলা বলল। ‘জ্যোতিষশাস্ত্র ভালোভাবে অধ্যয়ন না করেই চারদিক শঠ জ্যোতিষীতে ভরে গেছে। তোমার জন্ম তারিখ আর জন্মস্থান বলে দিও আমি তোমার কোষ্ঠী বানিয়ে দেব।’ বেহুলা ডেভিডের কোষ্ঠীর তুলোটটা গুটিয়ে কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম করে ডেভিডকে ফেরত দিল, ‘সাহেব, এবার বল দেওয়ানজী কি পুঁথি দিতে রাজি হয়েছেন?’
‘জমিদারবাবুর নাকি হুকুম আছে ওই পুঁথি বাইরে বের না করার,’ ডেভিড সাহেব বলল।
‘হ্যাঁ, তা তো জানি, বেহুলা বিমর্ষ স্বরে বলল।
‘কিন্তু দেওয়ানজী বলিল যে জমিদারবাবু টোমায় নাকি অনুমতি দিয়েছেন টুমি ওই পুঁথি জমিদারবাড়িতে এসে দেখিতে পার।’
বেহুলা মাথা নাড়লো—‘হ্যাঁ।’
‘তবে?’ সাহেবের দৃষ্টিতে বিস্ময়। ‘হোয়াটস দ্য প্রবলেম? সমস্যাটি কোথায়?’
‘আমি গ্রামের সামান্য মেয়ে। জমিদারবাড়ি যেতে আমার সংকোচ হয়।’
‘সঙ্কোচ না ভয়?’ ডেভিড বেহুলার দীঘল মায়াময় চোখে চোখ রাখল। বেহুলা মাটির দিকে দৃষ্টি নামিয়ে নিল।
‘বুঝিলাম,’ সাহেব বলল। ‘চিন্তা করিও না, আমি কাছারিঘরে রোজ দ্বিপ্রহরে জমিদারির হিসেবের খাতা পরীক্ষা করিব। টুমি আমার পাশে বসে বসে পুঁথি নকল করে নাও। আমি টোমায় কথা দিলাম কেউ টোমার অঙ্গ স্পর্শ করিতে আসিলে আমি তাহার মাথা উড়াইয়া দিব, সাহেব চামড়ার কটিবন্ধে সংযুক্ত পিস্তলে হাত দিল। ‘টুমি আমায় বিশ্বাস করিতে পার। যেশাস ক্রাইস্টের দিব্যি।’
বেহুলা এক লহমা ভাবল—ঝুঁকি নেওয়া হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এর চেয়ে অনেক বড় ঝুঁকি নিয়ে ও রাতের অন্ধকারে সালতি চালিয়ে পালিয়ে এসেছে। কী হবে? মেরে ফেলবে? ও তো মরে গেছিলই। দেখাই যাক না—‘ঠিক আছে সাহেব, তুমি যদি ওখানে থাকো তবে আমি কাল যাব।’
‘গুড। কাল দেখা হইবে,’ সাহেব উঠে পড়ল।
সাহেব চলে যেতেই বচনপিসি হাজির। ‘এই সাহেব কে রে? গাঙ সাঁতরে এত চরা থাকতে আমাদের বাড়ি কেন এয়েচে?’
অনেক কিছু বলতে হয়, তাই বেহুলা আর পূর্ব-পরিচয়ে গেল না। ‘সাহেবের কাছে আমি হাটে আর্জি জানিয়ে বলেছিলাম জটাকাকার পাওয়া খনার পুঁথিটা আমি পড়তে চাই। সাহেব বলে গেল যে খনার পুঁথি পড়তে আমি জমিদারবাড়ি গেলে সাহেব ওখানে কাছারিতে থাকবে।’
‘তোর মাথা খারাপ হয়েছে বেহুলা? এঁটোকুড়ের পাত কখনো স্বর্গে যায়! একদম ওমুখো হবি নে। আর এই সব গোরাদের একদম বিশ্বাস করবি না।’
‘কিন্তু সাহেব যে যেতে বলে গেল। সাহেব অপেক্ষা করবে। লোকটাকে ভালোই মনে হচ্ছে পিসি।’
‘ঠিক আছে, তাহলে আমিও যাব তোর সঙ্গে। তোর ভালোমন্দ কিছু একটা হয়ে গেলে বিশে আমাকে খেয়ে ফেলে দেবে,’ বচনপিসি বেহুলার সঙ্গে মাদুর গোটাতে লাগল। তারপর বিড়বিড় করে বলল, ‘ফিরিঙ্গি হলেও, ছেলেটা তো আমাদের বাড়িতে প্রথমবার এল, দুটো বাতাসা আর জল তো এনে দিবি বেহুলা, তোর যে কবে আক্কেল হবে!’
.
পরদিন দুপুরে বেহুলা আর বচনপিসি জমিদারবাড়ি গেল। কাছারিতে অনেক নারী-পুরুষের ভিড়। দালানে দেওয়ান দুর্লভচাঁদ কয়েকজন কর্মচারীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে চাল আর কম্বল দান করছে। মুনিষ-মজুররা তাদের পরিবার নিয়ে সারি দিয়ে এক এক করে সেই চাল-কম্বল নিচ্ছে আর জোর গলায় বলে উঠছে জয় জমিদারবাবুর জয়। দালানে ডেভিড সাহেবকেও দেখা গেল।
সারির একদম শেষে শান্তিবুড়ি, রস-বাতের বেদনায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগোচ্ছে। বচনপিসি ওর পিছনে গিয়ে দাঁড়াল—‘কিসের দানছত্র চলছে রে আজ এখানে শান্তি?’
শান্তি বুড়ি বচনপিসির অজ্ঞতায় অবাক—‘তুই কোন গাঁয়ে থাকিস রে বচন? এটা ভুলে গেছিস আজ তো জমিদার গিন্নীর মৃত্যুবার্ষিকী। তাই তো দেওয়ান সকলকে কম্বল আর চাল দিচ্ছে।’ তারপর শান্তি বুড়ি বলল, ‘সব কপাল! দামুটা যদি পয়সা-কড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরে আসত তবে এত কষ্ট করে এই দান-ভিক্ষার জন্য আসতে হতো?’
বচনপিসির মনে পড়ল—‘হ্যাঁ, হ্যাঁ ভুলেই গেছিলাম জমিদার এদিন চাল- কম্বল দান করে। অলপ্পেয়ে বৌয়ের প্রতি কত ভালোবাসা!’
বচনপিসির কথায় শান্তি বুড়ি ফিসফিস করে বলল, ‘অন্দরমহলের খপর গলায় শাড়ি বেঁধে আড়কাঠে ঝুলে পড়েছিল জমিদার গিন্নী। এসব খপর কি আর চেপে রাখা যায়?’
‘হুঃ,’ বচনপিসির গলায় প্রচ্ছন্ন শ্লেষ—থাকতে পুতে বাপ ডাকে না, মরলে করবে দানসাগর!’
ডেভিড সাহেব বেহুলাকে দেখে দালান থেকেই হাত নেড়ে ডাকল। বেহুলা বচনপিসির সঙ্গে দালানের কাছে যেতেই চমক। দেওয়ান বেহুলাকে খুব খাতির করে দালানে উঠে আসতে বলল। দেওয়ান এত খাতির করছে? বেহুলা অবাক হয়ে গেল। আড়ষ্ট হয়ে দালানে উঠল বেহুলা। এবার দেওয়ান উঁচু গলায় গ্রামবাসীদের বলল–‘আমাদের বড় ভাগ্য যে আমরা এই গ্রামে সত্যাচার্য এবং বেহুলার মতো গ্রহবিপ্র পেয়েছি। জমিদারবাবুর ইচ্ছা অনুযায়ী বেহুলা গণক এখন থেকে রোজ জমিদারবাড়ি এসে খনার পুঁথির অর্থ উদ্ধার করবে। জমিদারবাবু একাজের জন্য যা কিছু সাহায্য লাগবে তা দিতে প্রস্তুত এ কথাও জানিয়েছেন। আর আমাদের বাঙলার এই মূল্যবান জ্যোতিষের কথা যাতে বিলেতে ছড়িয়ে পড়ে সেজন্য জমিদারবাবু ডেভিড সাহেবকে অনুরোধ করেছেন বেহুলার সঙ্গে রোজ এই শাস্ত্র অধ্যয়ন করে বিলেতের কাগজে লিখতে।’
ডাঁহা মিথ্যা কথা, বেহুলা ভাবল, কিন্তু মন্তব্য করল না। ওর পক্ষে এটা ভালোই হল, না হলে রোজ রোজ এ বয়সী মেয়ে জমিদার বাড়িতে আসলে গাঁয়ে ঢি ঢি পড়ে যাবে।
বেহুলা হাত জোড় করে নমস্কার করল। বেহুলা শান্তিপিসির চোখের দিকে তাকাল। শান্তি বুড়ির দৃষ্টিতে ঘোর অবিশ্বাস। তারপর ডেভিড সাহেব বেহুলাকে নিয়ে কাছারিঘরে ঢুকে গেল। বচনপিসিও বেহুলার পিছনে পিছনে কাছারিতে ঢুকল। কাছারিঘরে একগাদা লাল শালুর খেরো খাতা। কাগজের স্তূপের পাশে ডেস্ক-চেয়ার। ডেস্কে পুঁথিটা রাখা। ‘এই নাও খনার পুঁথি,’ সাহেব বেহুলার হাতে পুঁথিটা দিল।
বেহুলা একনজরে পুঁথির পাতা উল্টালো। কিছু পড়া যাচ্ছে, কিছু যাচ্ছে না। বেহুলা একটা অংশ ধীরে ধীরে পড়ল
‘লগ্নের চতুর্থে সপ্তমে পাপ। মারে জননী পীড়ে বাপ।।
লগ্নে শনি করে অঙ্গহীন। লগ্নে রবি ক্ৰোধ প্ৰবীণ।।
যদি গুরু থাকে সঙ্গে। আয়ুর্লক্ষ্মী হয় রঙ্গে।।
চন্দ্রে সুন্দর বুধে চিরায়ু। শুক্রে ধনবান বৃদ্ধি পরমায়ু।।
লগ্নে রাহু করে রোগ। কেতু লগ্নে সহজে শোক।।’
বেহুলা চোখ তুলল। ডেভিড সাহেব উৎসুক হয়ে বেহুলার দিকে তাকিয়ে। চোখাচোখি হতেই ডেভিড সাহেব জিজ্ঞাসা করল–‘ইহার অর্থ বুঝিতে পারিয়াছ?’
‘হ্যাঁ,’ বেহুলা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ালো। ‘খনাবাক্য।’
ডেভিড সাহেবের দু’চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল—‘কী বলিয়াছে খনা?’
‘পাপ মানে পাপ গ্রহ। পাপগ্রহ হল মঙ্গল, শনি আর রাহু। চতুর্থ ঘরে পাপগ্রহ। চতুর্থ ঘরে মঙ্গল সাধারণত একটা অশুভ যোগ। জাতকের পিতামাতার দিক থেকে খুবই দুঃখ কষ্ট আসে এবং তাদের সঙ্গে বিচ্ছেদ হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। খনা সেকথাই সংক্ষেপে বলেছে—মারে জননী পীড়ে বাপ। মানে জননী মারধোর করে আর বাপ পীড়া দেয়।’
‘ব্রিলিয়ান্ট!’ ডেভিড সাহেবের দৃষ্টিতে প্রশংসা।
বেহুলা সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘খনা লিখেছে পাপগ্রহগুলি সপ্তমে থাকাও ভালো না। সপ্তমঘর হল পত্নী, বিবাহ ইত্যাদির ঘর। সপ্তমে রাহু থাকলে বউয়ের ব্যাপারে অনেক ঝামেলা হতে পারে, অনেক সময় বিয়ে ভেঙে যেতে পারে, বিবাহিত জীবনে তার পত্নীর সঙ্গে বনিবনা হয় না। সপ্তমে শনি থাকলে জাতকের দাম্পত্যজীবন দুঃখময় হয়, সপ্তমে মঙ্গল থাকলে স্ত্রী প্রচণ্ড ঝগড়াটে হয়, স্ত্রীর মৃত্যুও হতে পারে, দাম্পত্য জীবন কখনো সুখের হয় না। আমাদের মহাপ্রভু চৈতন্যদেবের সপ্তমঘরে পাপগ্রহ রাহু আর তার সঙ্গে পত্নীকারক শুক্র যোগ ছিল, তাতে পত্নীহানি-যোগ সূচিত করে।’
‘ইজ ইট সো ইজি টু প্রেডিক্ট?’ ডেভিড পুঁথির পাতার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল। তারপর বেহুলার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এত সহজ?’
বেহুলা বলল, ‘ভীষণ কঠিন এই জ্যোতিষশাস্ত্র, সাহেব। তোমাকে তো আমি সহজ কথায় বলছি। কিন্তু এসব নির্ভর করে আরো অনেক কিছুর ওপর– গ্রহ উচ্চস্থ অবস্থায় না নীচস্থ অবস্থায়, আর কোন কোন গ্রহ সেই ঘরে দৃষ্টি দিচ্ছে, সে মিত্র গ্রহ না শত্রু গ্রহ, ঘরের সপ্তমে কোন গ্রহ, আরো কতকিছু।’
সাহেব এবার উৎসাহের সঙ্গে বলল, ‘আমি এসব শিখিতে চাই। ইন্ডিয়ান অ্যাস্ট্রোলজির এত রিচ হেরিটেজ! আমাদের ওয়েস্টার্ন ওয়ার্লড এবিষয়ে গভীরে অধ্যয়ন না করেই, কিছু না জেনেই মূর্খের মতো একে ইন্ডিয়ান সুপারস্টিশন বলে। আমি শিখে নিজের বিদ্যা বুদ্ধি দিয়ে বুঝিতে চাই। তোমাদের ডিঙাডুবিতে না আসিলে আমি তো কখনো জানিতামই না এ বিষয়টি এত গভীর।’
বেহুলা সাহেবের কথা কিছু বুঝল কিছু বুঝল না। ও বলল, ‘সাহেব আমি দেখছি কী করতে পারি। তুমি কাল প্রথমবার আমাদের বাড়িতে এলে অথচ তুমি খালিমুখে চলে গেলে। তাই বচনপিসি তোমার জন্য একটু বাতাসা এনেছে। এটা খাও নাহলে আমাদের অকল্যাণ হবে।’
বচনপিসি হেসে গদগদ হয়ে একটা শালপাতায় মুড়িয়ে রাখা বাতাসা সাহেবকে দিল। সাহেব পরিতোষ সহকারে কুড়মুড় করে বাতাসা খেতে খেতে হাসি মুখে বলল, ‘খুব সুস্বাদু ক্যান্ডি।’ তারপর সাহেব পাশের ঘটিতে চুমুক দিয়ে জল খেয়ে ঘটি নামিয়ে বলল, ‘পিপাসা পেয়েছিল খুব। লেটস স্টার্ট দা নেক্সট লাইন। পরের পঙ্ক্তিতে কী আছে সেটা পড়া যাক?’
বেহুলা এবার পুঁথির হাতের লেখার সঙ্গে অনেকটা সড়গড় হয়ে গেছে। ও গড়গড় করে পড়ে গেল—লগ্নে শনি করে অঙ্গহীন। লগ্নে রবি ক্রোধ প্রবীণ।। যদি শুরু থাকে সঙ্গে। আয়ুর্লক্ষ্মী হয় রঙ্গে।। চন্দ্রে সুন্দর বুধে চিরায়ু। শুক্রে ধনবান বৃদ্ধি পরমায়ু।। লগ্নে রাহু করে রোগ। কেতু লগ্নে সহজে শোক।।’ তারপর ডেভিডের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সাহেব, খনা এবার লিখেছে জন্মলগ্নে কোন গ্রহ থাকলে তার কী প্রভাব হয়। জন্ম লগ্ন মানে প্রথম ঘর। সেই ঘর হল রূপ, স্বাস্থ্য, সুখ এসব দেখে। লগ্নে শনি খুব শুভ যোগ নয়, জাতককে অনেক বাধাবিপত্তি, দুঃখকষ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। লগ্নে রবি থাকলে প্রচুর জীবনীশক্তি, সুন্দর স্বাস্থ্য পায়, জাতক উচ্চ এবং দায়িত্বপূর্ণ পদের যোগ্য হয়। খনা হয়তো তাকেই প্রবীণ বলেছেন। গুরু মানে বৃহস্পতি। লগ্নে বৃহস্পতি অত্যন্ত শুভ যোগ। সৌভাগ্যের সূচক। খনা তাকেই বলেছেন আয়ুলক্ষ্মী হয় রঙ্গে। বাকিটা এভাবেই বলতে পারি। কিন্তু তুমি বলেছিলে তুমি লিখে নেবে।’
‘আমি রেডি। তুমি যা বলিবে লিখতে আমি লিখে নেব,’ ডেভিড সাহেব হাসল। বেহুলা দেখল সাহেবের এই গম্ভীর মুখে হাসিতে সাহেবকে খুব সুন্দর লাগে। সাহেব বলল, ‘একটা কথা। দেওয়ানজী বলিলেন সত্যাচার্য গেছে জমিদারের সঙ্গে ফোর্ট উইলিয়ামের অফিসারদের অ্যাস্ট্রোলজি করিতে। তিন দিন পর ফিরিয়া আসিবে। দুর্লভচাঁদ আমাকে দিয়ে প্রমিস করিয়ে নিল যে তিন দিনের মধ্যে এই কাজ সমাপ্ত করিতে হইবে, কারণ ইহা সত্যাচার্যের ঘোর অপছন্দ,’ সাহেব পুঁথি ওল্টালো। ‘অনেক মোটা পুঁথি। তোমাকে তাহলে আমার সঙ্গে রোজ অনেকক্ষণ এখানে থাকিতে হইবে।’
জমিদারবাড়ি থেকে ফেরার সময় বচনপিসি বলল, ‘বাপরে, এটা তো মস্ত মোটা পুঁথিরে বেহুলা। আজ তো এতক্ষণ ধরে পড়েও পুথির আটখানার পাটখানাও শেষ হল না। তোদের কদ্দিন লাগবে বাকিটা শেষ করতে?’
বেহুলার সেদিকে মন নেই, ওর শুধু মনে হলো সাহেব বারবার ওর শাড়ির দিকে তাকাচ্ছিল। বেহুলার জীবনে এখন কোনো স্বাদ-আহ্লাদ নেই। অনেক দিন শাড়ি ক্ষার দিয়ে কাচা হয় না, শুধু জল-কাচা করে শুকিয়ে গায়ে জড়িয়ে নেয়। বেহুলার মনে হলো শ্বশুর বাড়িতে সে বরাবর কাচা কাপড় পরত। বাড়ি ফিরে বেহুলা তাড়াতাড়ি আঁচঘর থেকে সরু সরু চেলা করা সুঁদুরী কাঠ তুলে আঁচঘরের পিছনে গর্তে ফেলে বড় হাঁড়িতে জল, কলাগাছের ছাই আর ঘরের কোণায় রাখা কয়েকটা রিঠাফল দিয়ে দুটো কাপড় ফোটাতে দিল। কাল কাপড় ধবধবে সাদা দেখবে সাহেব। কাপড় ফুটে গেলে কাপড় ধুয়ে এবার বেহুলা রোদ্দুরে মেলে দিল। বেহুলার হঠাৎ মনে হলো সে তো বিধবা, তার জীবনে তো স্বাদ-আহ্লাদ থাকা উচিত না। তাহলে সে কেন এরকম পাগলামি করছে?
