।। তেতাল্লিশ।।
পরদিন দুপুরে বেহুলা আবার লুকিয়ে ডেভিড সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে এল। কিছু খনাবাক্য, কিছু গল্প, হাসির উচ্ছ্বাসের মাঝে পর্তুগিজ কেল্লায় সময় দ্রুত ছুটে চলল। বেহুলা বলল, ‘সাহেব, আমাকে এবার যেতে হবে।’
‘আরো কিছুক্ষণ থাকা কি সম্ভব না?’ সাহেবের দৃষ্টিতে অনুরোধ। ‘একজন ইংরেজ পুরুষ আর একজন গ্রামের বিধবা যুবতীর সঙ্গে এই মেলামেশা গ্রামবাসীরা দেখতে পেলে নিন্দা করবে, সাহেব।’
‘তাহার ওপর সেই যুবতী আবার সুন্দরী,’ সাহেব কপট গাম্ভীর্যের সঙ্গে বলল। বেহুলা লজ্জায় রাঙা। সাহেব বেহুলার অস্বস্তি বুঝে সঙ্গে সঙ্গে কথা ঘুরিয়ে বলল, ‘খনা কি খুব সুন্দরী ছিল?’
‘তা তো জানি না।’
‘মনে একটা প্রশ্ন জাগে আমার
বরাহমিহির তো আমার মতো আউটসাইডার। মানে বাংলার বাহির থেকে আসিয়াছিল। কী ভাবে ওদের বিয়ে হল তা জানো?’
‘খনার বিয়ের সম্বন্ধে একটা সুন্দর গল্প আছে,’ বেহুলা বলল। ‘আমি অবশ্য বিশ্বাস করি না।’
‘কী গল্প?’
‘জ্যোতির্বিদ্যায় অসাধারণ পণ্ডিত অটনাচার্য্য। অটনাচার্য্যের কন্যা খনা পিতার থেকে জ্যোতিষশাস্ত্র শিখে একজন বিদুষী। অটনাচার্য্য কন্যা খনার বিবাহের জন্য এক শর্ত রাখেন। যে ব্যক্তি খনাকে গণনায় পরাজিত করবে তাঁর সঙ্গে নিজের কন্যার বিবাহ দেবেন। গণনার বিষয় হল খনার শরীরের এক গোপন স্থানে একটি তিল আছে। গণনাবিদ্যার মাধ্যমে সেই স্থান বলতে হবে। বরাহমিহির এই বিবাহের শর্তের কথা শোনেন এবং বরাহমিহির এই গণনা করতে রাজি হন। ওনার গণনা সঠিক হয় এবং অটনাচার্য্য বরাহমিহিরকে তার কন্যা দান করলেন। খনা ও বরাহমিহিরের বিবাহ হয়ে গেল।’
‘একটা মেয়ের শরীরের গোপন তিল গণনা করে বলে দিল?’ ডেভিড সাহেব অবাক। ‘বেহুলা, টুমি কি সেই গণনা কীভাবে করতে হয় তা জানো?’
‘কেন?’
‘আমি শিখে নিতাম,’ ডেভিড দুষ্টুমির হাসি হাসল।
‘শিখে কী লাভ?’
‘কে জানে কবে কোথায় কাজে লেগে যাবে।
‘সাহেব, মেয়েদের শরীরের গোপন স্থানের তিল দেখার এতই ইচ্ছা?’ বেহুলা কপট গাম্ভীর্যের সঙ্গে বলল।
‘কী করব বলো, এমন ভাগ্য তো আর হল না যে কোনো মেয়ে তার শরীরের তিল নিজে থেকেই দেখাবে,’ ডেভিড বলল। তারপর হঠাৎ কিছু মনে পড়ল। ‘দাঁড়াও, দাঁড়াও। খনা নিজেই বরাহমিহিরকে আগে থেকে চুপিচুপি বলে দেয়নি তো তিল কোথায় আছে?’
‘কিন্তু খনা কেন বরাহমিহিরকে বিয়ে করতে যাবে? তার বাপ তো বিখ্যাত দৈবজ্ঞ অটনাচাৰ্য্য—’
‘কে জানে? খনা হয়তো বরাহমিহিরের সুদর্শন চেহারা দেখে প্রেমে পড়ে গেছিল—’
‘বরাহমিহির অত্যন্ত সুন্দর দেখতে ছিলেন, সেটা অবশ্য ঠিক।’
‘টুমি কীভাবে জানলে? অতকাল আগের মানুষ বরাহমিহিরের কোনো আঁকা ছবি-টবি তো নিশ্চয়ই নেই।’
‘বরাহমিহির নিজেই বৃহৎসংহিতাতে লিখেছেন একজন জ্যোতিষীর কেমন দেখতে হওয়া উচিত তত্র সাংবৎসরোহভিজাতঃ প্রিয়দর্শনো বিনীতবেষঃ সত্যবাগনসূয়কঃ। জ্যোতিষী হতে হবে অভিজাত, প্রিয়দর্শন। উনি বলছেন, সুসংহিতোপচিতগাত্রসন্ধিরবিকলশ্চারুকরচরণনখ—’
‘ব্যাস, ব্যাস,’ ডেভিড দু’হাত দিয়ে মাথার চুল টেনে ধরল। ‘আমি বিশ্বাস করিতেছি। প্লিজ, আর বোলো না, আমার মাথা ধরিয়া গিয়াছে।’
বেহুলা হাসল। ‘ঠিক আছে এর মানেটা বলে দিচ্ছি—হাত, পা, নখ, চোখ, চিবুক, কান, নাক সব সুন্দর হলে তবেই জ্যোতিষী হতে পারবে। এর থেকে অন্তত এটা প্রমাণিত হয় যে বরাহমিহির দেখতে সুদর্শন ছিলেন। অতএব তিনি যখন অটনাচার্য্যের কাছে ফলিত জ্যোতিষ শিখতে যান তখন তার মেয়ে খনা বরাহমিহিরের রূপে মুগ্ধ হয়ে প্রেমে পড়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।’
‘বুঝলাম। তাহলে যারা সুন্দর দেখতে না তাদের জ্যোতিষী হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই?’
বেহুলা মৃদু হাসল।
‘আমি কি জ্যোতিষী হতে পারতাম?’
‘নাঃ।’
‘কেন?’
‘বরাহমিহির বলেছে একমাত্র সুন্দররাই—’
‘আমি তো এতদিন লন্ডনে মেয়েমহলে শুনে এসেছি আমি দেখতে খুব সুন্দর।’ ডেভিড বেহুলাকে ঈর্ষা জাগাবার জন্য বলল।
‘তুমি বুঝি অনেক মেয়েদের সঙ্গে মিশতে?’
‘কী করব বল, মেয়েরা আমায় দেখলেই আমার সঙ্গলাভের জন্য ছুটে আসত। আমি আর কত নিজেকে সংযত রাখব?’
‘মিথ্যুক!’
‘তাহলে টুমিই বল আমি সুন্দর কিনা।’
বেহুলা লজ্জা পেল। সাহেব হেসে বলল, ‘আচ্ছা, বরাহমিহির কি খনার সঙ্গে বসে আমাদের মতো পাঁজিপুঁথি নিয়েই আলোচনা করত, নাকি প্ৰেম-ট্রেম ও করত?’
‘প্রেম নিশ্চয়ই করত,’ বেহুলা হেসে বলল। ‘একজন পুরুষ আর নারী একলা কোনো নীরব স্থানে থাকলে প্রেম করবে না তো আর কী করবে?’
‘আমরাও তো একলা এখানে। কই আমরা কি প্রেম করছি?’ ডেভিড সাহেব সুন্দর দাঁত বের করে হাসল।
বেহুলা লজ্জায় লাল। এই সাহেবের মতো নির্লজ্জের সঙ্গে কথা বলাই মুশকিল। বেহুলা বলল, ‘সকলের সঙ্গে প্রেম করা যায় না। প্রেমিক হতে হয়।’
‘প্রেমিক কেমন হয়?’
‘বরাহমিহির বৃহৎসংহিতার কান্দর্পিকে প্রেমিকের বর্ণনা করেছেন—‘হৰ্ম্মপৃষ্ঠ চন্দ্ররশ্মি উৎপলম মধু মদালসা প্রিয়া—’ডেভিডের দিকে তাকিয়ে বেহুলা হেসে ফেলল। ডেভিড মাথায় হাত দিয়ে করুণ চোখে তাকিয়ে। ‘ঠিক আছে আমি বাংলায় বুঝিয়ে দিচ্ছি—হৰ্ম্মপৃষ্ঠ মানে অট্টালিকার ছাদে গোপনে চাঁদের আলোয় মদিরাতে পদ্মপাপড়ি ভাসছে, পাশে মাল্যভূষিতা নেশাবিষ্টা প্রিয়া বীণা বাজাচ্ছে কিংবা প্রেমের কথা বলছে,’ বেহুলা হেসে ফেলল। ডেভিড সাহেব গোলগোল চোখে তাকিয়ে।
‘তোমার স্বামী নিশ্চয়ই তোমার সঙ্গে এরকম প্রেম করত? তোমাদের চার বৎসরের বিবাহিত জীবন—’
‘বিবাহিত জীবন!’ বেহুলার অধরে ম্লান হাসির রেখা জেগে উঠল। বেহুলা অন্যমনস্ক হয়ে বলল, ‘আমার যখন বিয়ে হয়েছিল আমার বয়স তখন সবে চোদ্দ। প্রেম, যৌবন এসব বুঝতামই না। গ্রামের মেয়েরা খুব সরল হয়, আমার নিতান্তই বালিকার স্বভাব ছিল। সে বয়সে শারীরিক বা মানসিক ভাবে প্রস্তুতই ছিলাম না, প্রেমের জন্য। স্বামী খুব গম্ভীর ছিল, খুব ভয় পেতাম। তারপর অর্ধেক সময় তো সে বাইরে বাইরেই কাটাতো। আর যখন ফিরে আসতো, তখন তাঁতঘর ছিল ওর অষ্টপ্রহরের সঙ্গিনী। আমাদের মনের মিল হওয়ার সুযোগ হোলো কোথায়।’
বেহুলার মুখের বেদনার আভাস ডেভিডের নজর এড়াল না। ডেভিড কথা ঘুরিয়ে প্রসঙ্গ হালকা করল—‘তাহলে প্রেমিক হতে গেলে মদিরা পান করিতে হয়? যার ওপর পদ্মফুলের পাপড়ি ভাসছে?’
‘আমি মদ্যপ মানুষদের ঘোর অপছন্দ করি,’ বেহুলার চোখে বিরক্তি। ‘সাহেব তুমি কী মদ্য পান কর?’
‘কেন বলতো? এমন ভাবে বলছ যেন আমি মদ্যপান না করলে টুমি আমার সঙ্গে প্রেম করিবে।’
‘মদ্যপান না করলে ভেবে দেখতে পারি, বেহুলা লাজুক দৃষ্টিতে তাকাল। ‘আমি মদ্যপান করি না,’ ডেভিড সাহেব দৃঢ়তার সঙ্গে বলল। ‘আমায় ছুঁয়ে বল,’ বেহুলা হাত বাড়িয়ে দিল।
‘আমি প্রেমিকা ছাড়া অন্য কোনো নারীর দেহ স্পর্শ করি না,’ ডেভিড কৃত্রিম গাম্ভীর্যের সঙ্গে বলল।
বেহুলা হেসে ফেলল। এই সাহেবের মধ্যে একটা ছেলেমানুষ লুকিয়ে আছে সেটাই তার সবচেয়ে ভালো লাগে। ‘সাহেব, তুমি বরং আমাদের বাংলার কোনো মেয়েকে বিয়ে কর। এখানে চাষ-বাস করবে, সুখে থাকবে। কাজ নেই তোমার দেশে ফিরে গিয়ে।’
সাহেব আকাশের দিকে তাকিয়ে কৃত্রিম ভঙ্গিতে চিন্তা করে বলল, ‘ঠিক আছে আমি রাজি। কিন্তু আমি পত্নী কোথায় পাইব?’
‘সে আমি জোগাড় করে দেব,’ বেহুলা হাসি চাপতে চাপতে বলল। ‘সত্যি?’
‘আইপোমিস,’ বেহুলা বলল। ‘কিন্তু তুমি পণ দিতে পারবে তো?’
‘পণ? সেটা কী বস্তু?’
‘আমাদের বাংলায় বিয়ের জন্য পাত্রকে পাত্রীর বাবাকে টাকা দিতে হয়।’
‘আচ্ছা ডাউরি? আমাদের দেশেও তো আছে। কিন্তু আমাদের দেশে উল্টো নিয়ম। আমাদের দেশে পাত্রকে বিবাহের জন্য পাত্রীপক্ষ অনেক টাকা দেয়। নাঃ, আমি তাহলে ইংলন্ডেই বিয়ে করব।’ ডেভিড হেসে বেহুলার মুখের অভিব্যক্তি দেখল। এই সরল গ্রামের মেয়ে মনের ভাব লুকোতে জানে না। বেহুলার মুখে বিষণ্ণতার চকিত আবির্ভাব দেখে ডেভিড বলল, ‘না না, আমি এই বাংলাতেই বিবাহ করব। কিন্তু কত টাকা পণ দিতে হয়।’
‘একেক জনের একেক রকম।’
‘তোমার বিবাহের সময় তোমার পতি কত টাকা পণ দিয়েছিল?’
‘একশো টাকা।’
‘কিন্তু আমার কাছে একটি টাকাও নেই যে। তাহলে?’
‘কেন ইংরেজ সরকার তোমায় মায়না দেয় না?’ বেহুলা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল।
হঠাৎ ডেভিডের মনে পড়ল কথাটা। ডেভিড জিভ কাটলো ‘এটার কথা একদম ভুলে গেছিলাম!’ ডেভিড ওর পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে ভাঁজ খুলতে লাগল।
‘এটা কী সাহেব?’
‘সত্যঠাকুর এসেছিল আমাদের কুঠিতে।’
সত্যঠাকুরের নাম শুনলেই বেহুলার অস্বস্তি হয়। এই কাগজের সঙ্গে সত্যঠাকুরের নাম জড়িত হওয়ায় বেহুলা যুগপৎ কৌতূহলে ও বিরক্তির সঙ্গে কাগজের দিকে তাকাল। ডেভিড সাহেব কাগজটা খুলল। একটা ছক।
‘এটা তো কারোর কোষ্ঠী?’
‘হ্যাঁ, বলতো কার?’ ডেভিড সাহেবের মুখে রহস্যময় হাসি।
‘আমি কী জানি?’ বেহুলা অবহেলার সঙ্গে বলল। সত্যঠাকুরের কোনো কিছুর সঙ্গেই সে জড়িত হতে চায় না।
‘জমিদারবাবুর।’
‘জমিদারবাবুর ছক!’ বেহুলা অবাক। ‘এটা সত্যঠাকুর তোমাকে কেন দিল?’
‘সত্যঠাকুর তোমার কাছে আসতে সাহস পায় না। আমাকে বলল একবার তোমাকে দেখিয়ে নিতে। জমিদার প্রশ্ন করেছে ব্ল্যাক-জমিদারিটা কবে পাবে।’
জমিদারের ব্ল্যাক-জমিদারি নিয়ে বেহুলার বিন্দুমাত্র মাথা ব্যথা নেই, তবু জমিদারের ছকটা দেখতে কৌতূহল হল। ‘দেখি একবার কী আছে জমিদারের ভাগ্যে।’ বেহুলা ছকটা খুলে ছাদের মেঝেতে বসে পড়ল।
জমিদারের ছক দেখতে দেখতে বেহুলার কপালে ভাঁজ।
‘কী হল?’ ডেভিড বেহুলার উদ্বেগ বুঝতে পারল। ‘ব্ল্যাক-জমিদারিটা পেতে কোনো অসুবিধা আছে?’
‘জমিদারের চন্দ্র পাপগ্রহ শনির সঙ্গে যুক্ত হয়ে অষ্টমে রয়েছে, দশমে পাপগ্রহ রাহু এবং দ্বাদশে পাপগ্রহ কেতু—এই জাতকের অপমৃত্যু হয়।’ তারপর বেহুলা একটা বড় শ্বাস নিয়ে বলল ‘জমিদারের অবিলম্বে জমিদারি ছেড়ে ধর্ম-কর্মে মন দেওয়া উচিত।’
‘কেন একথা বলছ?’
‘জমিদার তার প্রজা দ্বারা নিহত হবে। জমিদারের মৃত্যুদশা শুরু হয়ে গেছে।’
‘এখন বুঝিতে পারিতেছি সত্যঠাকুর কেন জমিদারের ছক তোমাকে দিয়ে দেখিয়ে নিতে চেয়েছে,’ ডেভিড সাহেব বলল। ‘সত্যঠাকুর ছকে একই ভবিষ্যৎ দেখেছে। ও তোমাকে দেখিয়ে নিশ্চিত হতে চেয়েছে। তারপর ডেভিড সাহেব বলল, ‘কিন্তু জমিদারকে এই সাবধানবাণী পৌঁছে দেবার মতো বুকের পাটা সত্যঠাকুরের নেই। তাই সম্ভবত আমাকে ব্যবহার করতে চায়।’
‘তাহলে তো চিন্তার কথা,’ বেহুলা ছক দেখতে দেখতে বলল।
বেহুলাকে চিন্তিত দেখতে ডেভিড সাহেবের ভালো লাগল না। মেয়েটার নিজের জীবনেই কতশত দুশ্চিন্তা ভরে রয়েছে, সেই বোঝার ওপর ওর জন্য দুশ্চিন্তা চাপাতে সাহেবের ইচ্ছা হল না। সাহেব কথা ঘুরিয়ে বলল, ‘याह তোমায় একটা অদ্ভুত জিনিস দেখাব বেহুলা।’
‘কী জিনিস সাহেব?’
‘আজ আমি চকমকি ছাড়াই আগুন জ্বালাবো।’
‘যাঃ, তা কখনো হয়?’
‘আমি যদি বলি হয়,’ সাহেবের ঠোঁটে হাসি।
‘তুমি বললেই তো আর হবে না।’
‘আচ্ছা আমি যদি করে দেখাতে পারি তবে তুমি কী দেবে?’
‘আমি গরীব বিধবা, সাহেব, তোমাকে দেবার মতো আমার কাছে কিছুই নেই।’
‘ঠিক আছে, কী আছে কী নেই তা পরে দেখা যাবে। আগে আমি আগুন তো জ্বালিয়ে দেখাই,’ ডেভিড সাহেব পকেট থেকে একটা কাচ বের করল।
‘এটা কী সাহেব? আরশি?’
‘না একে বলে আতশ কাচ, ভোজবাজিটা দেখাবার জন্য একটা কাগজ দরকার,’ সাহেব কেল্লার ছাদের চারদিকে তাকাল একটা কাগজ খুঁজতে, কিন্তু ছাদে কোথাও কাগজ নেই।
‘সাহেব, এটা নাও,’ বেহুলা জমিদারের ছক আঁকা কাগজটা এগিয়ে দিল। ‘জমিদারবাবুর কোষ্ঠী! এটা জ্বালালে আবার পাব কীভাবে?’
‘আমার মনে গেঁথে আছে সব। আমি আবার আঁক কষতে পারব,’ বেহুলা আশ্বাস দিল।
ডেভিড সাহেব কাগজটা মেঝেতে পেতে রেখে তার ওপর আতশ কাচটা ধরল। কিছুক্ষণের মধ্যে বেহুলা অতীব বিস্ময়ে দেখল যে কাগজ থেকে ধোঁয়া বেরাচ্ছে, আর দেখতে দেখতে কাগজে কালো ফুটো হয়ে আগুন জ্বলে উঠল।
বেহুলা জ্বলন্ত কাগজটা নিয়ে উঠে দাঁড়াল, বেহুলার দু’চোখে বিস্ময় সাহেবের মুখের হাসির ভাষায় প্রশ্ন ‘বিশ্বাস হল?’
‘তোমার কথা আমি কখনো অবিশ্বাস করি না সাহেব। তোমাকে বিশ্বাস করি বলেই তো একা একা এই জনমানুষহীন কেল্লায় তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসি।’ জ্বলন্ত কাগজটার আগুন বেহুলার হাত স্পর্শ করার আগে বেহুলা ছাদের কোণায় জমে থাকা জলে কাগজটা ফেলল, কাগজের আগুন নিভে গেল। হঠাৎ বেহুলা দূরের দিকে তাকিয়ে বলল—‘আশ্চর্য!’ বেহুলার দু’চোখে বিস্ময়।
বেহুলার বিস্মিত দৃষ্টি অনুসরণ করে সাহেব নদীর দিকে তাকাল—নদীতে কেল্লার পরিত্যক্ত ভাঙা ঘাটে একটা ভাউলিয়া এসে নোঙর করেছে।
‘আশ্চর্য!’ সাহেব বলল। ‘এখানে নৌকা! ঠিক সুবিধার মনে হচ্ছে না,’ সাহেব বেহুলাকে ইশারা করল মাথা নীচু করতে। বেহুলাও সাহেবের পাশে বসে পড়ল। দু’জনে মাথা স্বল্প উঁচু করে দেখতে লাগল কারা নামে ভাউলিয়া থেকে।
ভাউলিয়া থেকে দু’জন শক্ত-সমর্থ লোক নামল। দু’জনের কাঁধে কিছু ওজন। ‘ওদের কাঁধে ওটা কী?’ বেহুলা বলল।
‘মানুষ!’ ডেভিড সাহেব উত্তেজিত। ‘দু’জন বালিকা! অজ্ঞান!’
লোকদুটো কাঁধে বালিকাদের চাপিয়ে কেল্লার কোণার পাথুরে দেওয়ালের বন্দীঘরের সামনে এসে সেখানে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকল। বেহুলা এবার ভালোভাবে দেখল। সাহেব ঠিক বলছে। ‘ওরা কি ঘুমন্ত?’
‘মনে হচ্ছে আফিম খাইয়ে গভীর ঘুমে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে। নাউ আই আন্ডারস্ট্যান্ড হোয়াট ইজ দিস মেস। এরা দাস ব্যবসায়ী। এরাই তাহলে ঢাকা থেকে শিশুদের কিনে ভাউলিয়ার খোলে পুরে নিয়ে আসে!’
‘কিন্তু এখানে কী করছে?’
‘এই পুরোনো পর্তুগিজের কেল্লার বন্দীঘরে ওরা মেয়েগুলোকে লুকিয়ে রাখে। তারপর ওদের পাচার করে দেয় নবাবের হারেমে, কিংবা কলকাতার গণিকালয়ে। ক’দিন আগে ঢাকা থেকে আসছিল এরকমই এক নৌকা, তাতে আঠারো জন শিশু ছিল। দারোগা মাঝপথে নদীতে ওদের অ্যারেস্ট করে। বাচ্চাগুলো এত ছোট যে ওরা ওদের গ্রামের নামও বলতে পারছিল না।’
আরো দুটো ষণ্ডা লোক নেমে এল বাচ্চা কাঁধে নিয়ে। চারজন বেশ কয়েকবার আসা যাওয়া করল। বেহুলা গুনল ষোলটা মেয়ে। একজন বয়সে বেহুলার সমবয়স্কা হবে। ওকে দু’জনে মিলে চ্যাংদোলা করে ভিতরে তুলল।
‘আমি দেওয়ান দুর্লভচাঁদকে ব্যাপারটা জানাব,’ ডেভিড সাহেব ফিসফিস করে বলল। ‘রবিন সাহেবকে খবর পাঠাব। ওদের ওপর নজর রাখিতে হইবে।’ হঠাৎ দূরে মাঠের মধ্যে থেকে পালকি বাহকের গলার আওয়াজ ভেসে এল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল বেহুলা। গ্রামের দিকে থেকে দুটো পালকি আসছে। চারজন করে বেহারা পালকি বয়ে আনছে।
‘একদম নোড়ো না,’ ডেভিড সাহেব বেহুলাকে ফিসফিস করে বলল।
পালকি দুটো বেহুলাদের নীচে এসে পর্তুগিজ কেল্লার সামনে থামল।
একটা পালকি থেকে নামল দুর্লভচাঁদ, অন্য পালকি থেকে নামল সত্যাচার্য।
