।। ছেচল্লিশ।।
বিকালে দেওয়ান দুর্লভচাঁদ উদ্বিগ্ন মুখে হাজির হল সত্যাচার্যের গৃহে—‘খুব বড় সমস্যা, সত্যঠাকুর!’
সত্যাচার্য জানে সমস্যা গুরুতর না হলে দেওয়ান এত হন্তদন্ত হয়ে আসত না। ‘কী হয়েছে দেওয়ানজী?’
‘আমাদের মেয়ে বিক্রির খবরটা আর গোপন নেই। মেয়েগুলোকে কোথায় আটকে রাখা হয় সেটাও কেউ দেখে ফেলেছে।’
‘কী বলছেন কী?’
‘কাল রাতের অন্ধকারে কেউ একজন এসেছিল পর্তুগিজ কেল্লায়।’
‘তাই?’ সত্যাচার্য অবাক। ‘কীভাবে জানলেন?’
‘কাদার ছোপ লাগানো জুতোর ছাপ আমাদের ওই বন্দীঘর পর্যন্ত গেছে।’
‘জুতোর ছাপ!’ সত্যঠাকুর অবাক। ‘এ গ্রামে জুতো কে পরে?’
‘আমার লেঠেলরা চারদিক খুঁজে কেল্লার ছাদে এটা পেয়েছে। তাই আপনার কাছে নিয়ে এলাম।’
একটা পোড়া কাগজ। কিছুটা অংশ ভেজা, কালি ধেবড়ে গেছে। বাকি অংশে যেটুকু দেখা যাচ্ছে তাতে বেশ বোঝা যাচ্ছে ওটা একটা কোষ্ঠী। সত্যঠাকুর কৌতূহলে কাগজের ছকের দিকে তাকাল—রাহু, কেতু, শনির অবস্থান আগুনে পোড়ে নি। সত্যঠাকুর কেঁপে উঠল।
জমিদারবাবুর ছক!
‘এই ছক তো সাধারণ লোকের হাতে পড়ার কথা না! এতো জমিদারবাবুর ছক!’ সত্যাচার্য বলল।
‘জমিদারবাবুর ছকের কথা আর কারোর তো জানার কথা না,’ দেওয়ান বলল। ‘সত্যঠাকুর, এই ছক ওখানে কীভাবে গেল?’
সত্যঠাকুর নিরুত্তর।
‘ঠাকুর, আপনার অভিপ্রায় আমার থেকে কিছু গোপন করা হলে আমি আর জিজ্ঞাসা করব না।’
‘না না দেওয়ানজী, আপনার থেকে আমি কিছুই গোপন করি না। আমি এই ছক ডেভিড সাহেবকে দিয়েছিলাম।’
‘ডেভিড সাহেবকে?’ দেওয়ান অবাক। ‘কেন?’
‘জমিদারবাবুর আয়ুর ব্যাপারে কিছু দুশ্চিন্তার বিষয় আছে। বেহুলা জ্যোতিষীকে একবার দেখিয়ে নিয়ে—’
‘বুঝেছি,’ দেওয়ান বলল। ‘তার মানে ডেভিড সাহেব সব জেনে গেছে। সম্ভবত বেহুলা জ্যোতিষীও হয়তো জানতে পেরে গেছে।’
‘এখন উপায়?’
‘আজ রাতে ফিরিঙ্গি কুঠিতে গিয়ে ডেভিড সাহেবকে ধমকে আসতে হবে। ও যদি আমাদের কথা ঘুণাক্ষরেও কারোর কাছে প্রকাশ করে তবে ওর কপালে কত যে দুঃখ আছে সেটা ওকে বুঝিয়ে দিতে হবে,’ দেওয়ান আধপোড়া কাগজটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো।
