1 of 2

বিদ্বান বনাম বিদুষী – ১১

।। এগারো।।

৯ আগস্ট, ২০১৯

ব্রেকফাস্টের পর নমিতা দু’তিনবার বিদ্যাদিকে ফোন করতে গিয়েও ফোন করতে পারল না। কী করবে তাই ভাবছিল, তখনই বিদ্যাদির ফোনটা এল। বিদ্যাদি খুব ধীরে ধীরে বলল, ‘নমিতা, আমি কাল অনেক রাত পর্যন্ত শুয়ে শুয়ে ভেবেছি। ঘুম আসছিল না। তথাগতের ছোটবেলার কত গল্প মনে পড়ছিল। ওকে আমি পড়াতাম। ও আমাকে এই পৃথিবীতে সব চেয়ে বেশি ভরসা করত। সারা রাত ভেবেছি কীভাবে আমি ওর বিরুদ্ধে যাব?’

নমিতা বুঝতে পারছে বিদ্যাদির দ্বিধা। মানুষের বিশ্বাস কক্ষনো ভাঙতে নেই। নিজের মধ্যেই এত পাপবোধ। নমিতা আর কী বলবে? নমিতা চুপচাপ বিদ্যাদিকে কথা বলতে দিল।

‘আমি আজ সকালে উঠে দাদার সঙ্গে কথা বললাম। দাদা বলল আমি বাবলুর বাবা, কিন্তু তাও বলব যে নিজের মনের কথা শোনো, আর দেখো যে তোমার অপত্যস্নেহ যেন স্নেহান্ধ ধৃতরাষ্ট্রের মতো অন্য মানুষের ক্ষতি না করে।’ বিদ্যাদি অল্প থেমে রইল। তারপর বলল, ‘আমি আরুষির পক্ষ হয়ে লড়ব।’

নমিতা মনে মনে আনন্দে ফেটে পড়ল। মিস বসাক এই কথা শুনলে কতটা খুশি হবে ও তা ভাবতে লাগল। এবার বিদ্যাদি বলল, ‘তুমি কি ডিসার্টেশনটা পেয়েছ?’

‘তোমায় আমি ফোন করতাম বিদ্যাদি। ডিসার্টেশন ইউনিভার্সিটিতে নেই। তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি।’

‘সে কি?’

‘কাল গেছিলাম ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরির জার্নাল সেকশনে। ওরা ওদের ইলেকট্রনিক রেজিস্টার চেক করে বলল তোমার সাবমিট করা খনার সম্বন্ধে কোনো ডকুমেন্টই ওদের আর্কাইভের রেকর্ডেও নেই।

‘আশ্চর্য! আমি তো প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ ডিসার্টেশন চার কপি জমা করেছিলাম। আমাদের সময় এক কপি গাইডের কাছে, দু’কপি এক্সটারনাল একজামিনারের কাছে পাঠানো হতো, এক কপি ইউনিভার্সিটির জার্নাল সেকশনে থাকতো—’

‘কিচ্ছু নেই বিদ্যাদি। তোমার কাছে কি একটা কপি হবে?’

‘হ্যাঁ আমার কপিটা আছে বাড়িতে।’

‘ওখানে কোনো তারিখ দেওয়া আছে?’

‘ছণী। ডিসার্টেশন সাবমিশনের ডেট আর অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রারের সই আছে।’

‘ওটা আমাকে একবার দেখাতে পারবে? বিদ্যাদি, মনে হচ্ছে একটা বিরাট চক্রান্ত চলছে আমাদের চারপাশে। তুমি জানো এবারের বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির ডি-লিটটা কে পাচ্ছে?’

‘কে?’

‘ড. পৃথুযশ ভৌমিক।’

বিদ্যাদি নিরুত্তর।

‘এখনো অ্যানাউন্সমেন্ট হয়নি অবশ্য, তবে খবরটা পাক্কা। আমাকে গোপন রাখতে বলেছে। রাজ্যপালের সিগনেচারের জন্য গেছে। ওটা ফর্মালিটি মাত্র।’

ফোনের অপরদিকে নীরবতা।

‘বিদ্যাদি, উনি ডি-লিট পেলে পলিটিক্যাল কারণে আমি একই ইউনিভার্সিটির ডিন হয়ে ওঁর বিরুদ্ধে কোর্টে লড়তে পারি না। ভিসি আমাকে কিছুতেই পারমিশন দেবেন না। তাই –’ নমিতা একটু চুপ করে রইল।

‘তাই কী?’

‘মিস বসাক কোর্টে পৃথুযশকে কাউন্টার অ্যাটাক করার জন্য আমাকে চাইছেন। আমার জায়গায় তুমি কি যেতে পারবে?’

বিদ্যাদি চুপ থেকে বলল, ‘এ সময় মিস বসাককে সাহায্য না করাটা অন্যায় হবে। মিস বসাকের মনের অবস্থা আমার চেয়ে আর কে ভালো বুঝতে পারবে, নমিতা? আমি তো ভুক্তভোগী।’

নমিতার গলায় একবুক অপরাধবোধ রিফ্লাক্সের মতো ঠেলে উপরে উঠে এল। কোনো রকমে প্রায়শ্চিত্ত করার মতো করে বলল, ‘বিদ্যাদি, আমি সরি। তোমার ওপর যে অন্যায় হয়েছিল তা শুধরোবার জন্য এখন যদি আরেকবার একটা সুযোগ পেতাম—’

‘ভাগ্যিস পাওনি। তাহলে হয়ত আমিই স্ট্যানফোর্ড বা হার্ভার্ডের ডিপার্টমেন্ট চেয়ার হয়ে বসে যেতাম, আর এই ভিখারিদের প্ল্যাটফর্মে পড়াবার জন্য টিচারই

পাওয়া যেত না।’

এবার নমিতা ওর ফয়সলা শোনাল, ‘ঠিক আছে বিদ্যাদি, আমিই কোর্টে যাব। কাল আমি ভিসির কাছে পারমিশন চাইব। ভিসি রাজি না হলে আমি রিজাইন করব। কিন্তু, পৃথুযশকে হারাবই।’

‘তুমি রিজাইন করবে?’ বিদ্যাদি বলল।

‘আমি জানি ভিসি রাজি হবেন না। আমার ওপর প্রেসার দেবেন অনেক। আমি পারব তুমি দেখো। তুমি শুধু মাঝে মাঝে আমাকে অর্জুনের মেন্টর শ্রীকৃষ্ণের মতো গাইড করে যেও। তুমি পৃথুযশকে ভালোভাবে জানতে। পৃথুযশের উইকনেসগুলো আমায় একটু বলে দিও।

‘দুপুরে বৌবাজারে আমাদের অফিসে এসো। আমি বাড়ি থেকে প্রেমচাঁদ রায়চদি ডিসার্টেশনের আমার কপিটা নিয়ে যাব। বিদ্যাপি শান্ত গলায় বলল। ঠিক আছে তুমি লড়ো। আমি তোমার সঙ্গে আছি। আর যে মুহূর্তে তোমার মনে হবে এই লড়াইয়ের জন্য তোমায় চাকরি থেকে রিজাইন করতে হচ্ছে, তখন রিলে রেসের ব্যাটনটা আমার হাতে তুলে দিও। তোমার দৌড় আমি শেষ করব।’

ফোন নামিয়ে নমিতা কিছুক্ষণ চোখ বুজে বসে রইল। তারপর নমিতা মিস বসাককে ফোন করল—‘খুব ভালো খবর! বিদ্যাদি রাজি হয়েছে আমাদের হয়ে তে।’

‘কী বলছেন আপনি ড. স্যান্যাল!’ মিস বসাক গলায় উচ্ছ্বাস ধরে রাখতে পারছেন না। ‘আমি তো ভাবতেই পারছি না। আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আমি মনে যে কতটা জোর পেলাম তা বলে বোঝাতে পারব না।’

‘বিদ্যাদি দুপুরে দেখা করতে বলেছে। আপনি কোথায়?’

‘আমি মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। তারপর আসছি। কোথায় দেখা করব?’

‘আমি লাঞ্চের পর ইউনিভার্সিটিতে থাকব। আপনি এলে তাহলে একসঙ্গে যাব বৌবাজার।’

‘সাউন্ডস গুড!’ মিস বসাক ফোন ছেড়ে দিলেন।

ফোন রেখে আরেক কাপ চা বানাতে কিচেনে ঢুকলো নমিতা। কাল সন্ধ্যা থেকে পৃথু্যুশের ডি-লিটের খবরটা মনে অ্যাকিউট ইনডাইজেশন করে রেখেছে। কিছুতেই মানা যাচ্ছে না। বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি এর বদলে নর্থ কোরিয়ার কিম জং উনকে ডি-লিট দিলেও বোধহয় এত কষ্ট হোতো না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *