।। ঊনচল্লিশ।।
সকাল থেকে একটা কানা মেঘ বিদ্যাধরী নদীর ওপারে আকাশের নৈঋত কোণ জুড়ে বসেছিল। দুপুর থেকে হাওয়ার বেগ বাড়ল, মেঘটা এসে সূর্যকে এমন ভাবে ঢাকল যেন রাহুগ্রাসের গ্রহণ লেগেছে। শন-শন করে হাওয়ার বেগ বাড়তে লাগল। দেখতে দেখতে চরাচর যেন ঘনঘটায় আবৃত হয়ে গেল, তারপর শুরু হল তুমুল বৃষ্টি। বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই। আজ আর জমিদারবাড়ি যাবার কোনো সম্ভাবনাই নেই। খনার পুঁথি পড়া হবে না। ডেভিড সাহেবের সঙ্গে গল্প করাও হবে না। বেহুলার মনটা কেমন খালি খালি লাগছে।
বিকেল কেটে সন্ধ্যা হল। অঝোরে বৃষ্টি ঝরেই চলেছে। সদরের খিল দেওয়ার জন্য বেহুলা মাথায় মাথাল চাপিয়ে এক ছুটে উঠোন পেরিয়ে সদরে পৌঁছে দরজা টেনে বন্ধ করতে গিয়ে থেমে গেল। ঝোড়ো হাওয়া, সামনে ঘন অন্ধকার। কিন্তু ওটা কী? বেহুলা থেমে গেল।
দূরে জিভকাটির জঙ্গলে মন্দিরের ঢিপির ওখানে মশালের আলো!
বেহুলা ভালোভাবে দেখল। কে এই দুর্যোগের রাতে ওই জঙ্গলে যাবে? চোখের ভুল নাতো? নাঃ! মশালের আলো কেঁপে কেঁপে উঠছে। ডাকাত! বেহুলা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। অল্প সময়ের মধ্যে মশালের আলো অন্ধকারে হারিয়ে গেল। আবার ঘুটঘুটে অন্ধকার। বেহুলা সদরের দরজা বন্ধ করে ঘরে ঢুকে পড়ল। মাথার মধ্যে প্রশ্ন ঘুরছে কে হতে পারে?
বেহুলা ওর প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেল পরের দিন সকালে। সাত-সকালে বাইরে ধুপ-ধুপ শব্দ। কারা যেন ছোটাছুটি করছে। বেহুলা দরজা খুলে বাইরে এল। কোতোয়ালির পাগড়ি পরা বরকন্দাজের একটা দল হাতে বন্দুক নিয়ে মরা তাঁতিপাড়ায় কিছু খুঁজছে। ওরা তাঁতিপাড়ায় যে ভাঙা বাড়িটার ভিতর ঢুকে আনাচ-কানাচে অনুসন্ধান করতে লাগল সেটা বিশ্বনাথদা বলেছিল ওখানে ওর বন্ধু বুধনরা থাকতো।
থানাদার কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল, তারপর পাইক এসে বেহুলাদের দরজা ধাক্কাল। পাখমারা গণক দরজা খুলল। কোতোয়াল বলল, ‘বুধন চোর আর চন্দ্রচূড় ডাকাতকে এদিকে দেখেছ?’ কোতোয়াল একটা অশ্লীল গালি দিল।
‘বুধন তো শুনেছি মোগল দারোগার তাঁতঘরে!’ পাখমারা গণক বলল। ‘ওকে চোর বলছো কেন?’
‘দারোগার তাঁতঘর থেকে বুধন বদমাশটা এক গাঁটরি ‘সরকার আলি’ মসলিন কাপড় চুরি করে পালিয়েছে।’
‘সরকার আলি?’ পাখমারা গণক অবাক।
‘হ্যাঁ ভাবতে পার?’ ফাঁড়িদার বলল। ‘নবাবের আদেশে ‘সরকার আলি’ মসলিন কেবলমাত্র মোগল বেগমরাই পরতে পারে। আর কারোর অধিকার নেই। ওই গাঁটরি নবাবের জন্য আলাদা করে রাখা হয়েছিল। মুর্শিদ-কুলি-খাঁ ওই মসলিন দিল্লিতে মোগল বাদশাদের কাছে নজরানা পাঠায়। এখন জানি না কী হবে? ওকে ধরতে পারলে নবাব ফাঁসি তো দেবেই। আমাদের কাছে সংবাদ আছে বদমাশটা কাল এদিকেই এসেছে। তোমরা যদি দেখতে পাও তবে তৎক্ষণাৎ কোতোয়ালিতে খবর দেবে।’ ফাঁড়িদার চলে যেতে যেতেও ফিরে তাকাল ‘আর হ্যাঁ কেউ ভুলেও ওকে আশ্রয় দিতে যেও না। নবাব তাহলে ওর সঙ্গে তোমাদেরও ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে দেবে।’
কিছুক্ষণ পর কোতোয়ালরা চলে গেল। বেহুলা বুঝতে পারল কে ওই জিভকাটির জঙ্গলে ঢিপির কাছে লুকিয়ে।
‘ভগবান যে আর কত দুঃখ দেবেন বুধনদের,’ বচনপিসি বেহুলার পাশে এল। ‘বুধনের মা কেমন সুন্দর জামদানীতে নানা রঙের রেশমের সুতোয় ফুল আঁকতো, নকশা তুলতো। ওলাওঠায় বুধনের মা বমি করতে করতে মরে গেল। অন্যদের মতো ওর বাপও দাদনীবণিকদের দাদন শোধ করতে পারল না। তখন গোমস্তার লেঠেল এসে বুধনকে আর ওর বাপকে ধরে নিয়ে গেল। বুধনের দাদাকেও ধরত, কিন্তু চন্দ্রচূড় পালালো।’
‘ধরে নিয়ে গেল? কোথায়?’
‘মোগল দারোগার তাঁতঘরে,’ বচনপিসি বলল। ‘সেখানে ওদের ক্রীতদাসের মতো খাটাতো। ওর বাপ প্রতিবাদ করল, তাতে দারোগা রেগে গিয়ে ওর বাপকে হাত পা টানা দিয়ে গাছে বেঁধে রেখে এমন বেত মারল যে মানুষটা ওখানেই জ্ঞান হারাল। তারপর পাইক দিয়ে আধমরা মানুষটাকে তুলে বাড়িতে মরবার জন্য ফেলে গেল। গায়ে খুব জ্বর আর সারা গায়ে বিছের মতো লাল দাগ। সেই জ্বর আর সারল না। শরীরে ক্ষত পেকে টসটসে পুঁজ হয়ে গেল। তারপর লোকটা জ্বরের ঘোরেই মারা গেল। জঙ্গলে লুকিয়ে ছিল চন্দ্রচূড়, বাড়ি এসে বাপের চিতায় আগুন দিল, তারপর সে ডাকাত দলে যোগ দিল।
বেহুলা জঙ্গলের দিকে তাকাল। বিশ্বনাথদাদা বলেছিল ঢিপির উত্তর-পশ্চিম দিকে যে মন্দিরের ভিতরে ঢোকার পথ আছে সেটা বুধন জানে। আর ঢিপির পুব দিকে গোখরোর বাসা। বুধন নিশ্চয়ই মন্দিরের ভিতর লুকিয়েছে। কিন্তু ওখানে ও কতক্ষণ আত্মগোপন করে থাকবে? খাবার-দাবার, জল এসব আনতে বাইরে গ্রামে এলেই ওকে ধরবে। ও কি জানে যে ওর খোঁজে দারোগার পল্টন এ-গাঁয়ে ঘোরাঘুরি করছে? হয়তো দারোগার লোক ছদ্মবেশে অপেক্ষা করবে নদীর ঘাটে, কাপাসডাঙার হাটে। নাঃ, বুধনকে সাহায্য করতেই হবে। যদিও খুব ঝুঁকি নেওয়া হয়ে যাবে, কিন্তু আর কোনো উপায় নেই।
দুপুরে সকলের খাওয়া হলে বেহুলা মোটা চালের ভাত আর সঙ্গে নটে শাকের ঘন্ট মালসায় রেখে কলাপাতা মুড়ে গামছায় বেঁধে ফেলল। একটা ঘটিতে জল নিল বেহুলা। চারদিকে একবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল বেহুলা। কাছাকাছি মানুষজন নেই। পাঁচনবাড়ি হাতে আর গামছার পুঁটলি কাঁধে নিয়ে বেহুলা হেঁটে চলল জিভকাটির জঙ্গলের দিকে।
কাপাসডাঙার মাঠ অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। মাঠ পার হতে হাঁফ ধরে যায়। মাঠের শেষপ্রান্তে এসে অল্প জিরিয়ে নিল বেহুলা, তারপর জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে কাঁটা ঝোপের মধ্য দিয়ে ক্ষিপ্রপদে হেঁটে ঢিপি পর্যন্ত গিয়ে থামল। মানুষটা কি ভিতরে আছে? ওর কাছে অস্ত্র-টস্ত্র নেই তো? যদি বিশ্বনাথ দাদার বন্ধু বুধন না হয়ে অন্য কোনো ডাকাত হয় তবে? এখন পিছিয়ে যাওয়ার মানে হয় না। দেখা তো যাক। ঢিপির উত্তর-পশ্চিম দিকে পৌঁছাল বেহুলা। এখানে ঝোপ খুবই ঘন। জায়গাটাতে আলো-আঁধারি। আঁধারই বেশি। ভয়ে বুক ঢিপ ঢিপ করছে বেহুলার। পা টিপে টিপে এগোচ্ছিল ঝোপের ভিতর দিয়ে, হঠাৎ উপর থেকে শিসের আওয়াজ। বেহুলা বিস্ময়ে মাথা তুলে তাকাল। বিশ্বনাথদাদার বয়সীই হবে ছেলেটা। তাগড়া চেহারা। দু’পায়ে গামছা বেঁধে সে গাছুড়ে বসে আছে নারকেল গাছে। ছেলেটা এবার তরতর করে নেমে এল। মাথায় ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল, কানে মাকড়ি, পরনে পিরান আর হাঁটু পর্যন্ত তোলা আট হাতি ধুতি।
‘কে তুমি?’ ছেলেটা জিজ্ঞাসা করল। ‘আমি বেহুলা।’
‘বেহুলা! এগাঁয়ে তো কোনো বেহুলা শুনিনি!’
‘তুমি এ গাঁয়ে থাকলে তো শুনবে,’ বেহুলা বলল। ‘তোমার বন্ধু বিশ্বনাথদাদা আমার প্রাণ বাঁচিয়েছে। ওকে আমি দাদা বলি। আমি ওদের বাড়িতেই থাকি। আমি জানি তোমার নাম বুধন। পুলিশ তোমায় খুঁজতে আজ সকালে তোমার বাড়ি এসেছিল। তুমি কি কাল রাতে মন্দিরে এখানে মশাল জ্বালিয়েছিলে?’
‘হ্যাঁ। আঁধারে কিছু ঠাহর হচ্ছিল না, তাই বুঁদি জ্বালিয়েছিলাম। সারা রাত মন্দিরের ভিতরে ছিলাম এখন খিদে আর পিপাসা মেটাতে ডাব পাড়তে গাছে উঠেছি।’
‘কিন্তু আশ্চর্য এখানে সাপের আড্ডা। তোমায় ছোবল মারেনি?’
‘আমি মন্দিরের ভিতরে যাওয়ার পথ জানি। মন্দিরের ভিতর প্রচুর এবড়ো- খেবড়ো ভাঙা নুড়ি-পাথর। সাপ নুড়ি পাথরের এবড়ো-খেবড়ো জমিকে এড়িয়ে চলে। তাই মন্দিরের ভিতরেই ছিলাম রাতে।’
‘তুমি আসছ কোথা থেকে?’
‘জঙ্গলের ওপাশ থেকে।’
‘কেন জঙ্গলে ঢুকেছিলে তুমি? মরতে?’
‘না বাঁচতে।’
‘মানে?’
‘দারোগা আমায় ধরতে পারলে জীবন্ত পুঁতে ফেলত।’
‘কোতোয়াল বলল তুমি ওদের মসলিন চুরি করে পালিয়েছ।’
‘তুমি এখানে কেন এসেছ? আমায় ধরিয়ে দিতে?’
‘তোমার জন্য খাবার এনেছি,’ বেহুলা গামছার পুঁটলিটা এগিয়ে দিল বুধনের দিকে।
‘ভিতরে চল,’ বুধন এবার ঝোপে ঠাসবুনোট হাত দিয়ে সরিয়ে সরিয়ে ঢিপির ওপর চড়তে লাগল। বেহুলা ওর পিছনে। উপরে একটা জায়গায় আগাছা জড়ানো ইটের ফাটা দেওয়াল। এই পথেই বিশ্বনাথদার সঙ্গে বেহুলা মন্দিরে ঢুকেছিল। ফাটল দিয়ে বুধন ভিতরে ঢুকে গেল। বেহুলা এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে ভাবল ঢোকা উচিত হবে কিনা। ভিতর থেকে বুধনের গলা
‘ভিতরে চলে এস। বড্ড খিদে পেয়েছে। আগে খেয়ে নিই। তারপর সব বলছি।’
ভিতরে সূচীভেদ্য অন্ধকার। বুধন এবার চকমকি ঘষে একটা মশাল জ্বালাল। সামনের বিশাল উঁচু চাতালটাতে অনেকগুলো নারকেল আধমালা হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। একটা বেদির ওপর একটা কাঁথা পড়ে আছে, পাশে একটা পুঁটলি। অন্ধকারে আবার সেই দেওয়াল চিত্রগুলো আবছা জেগে উঠল। বেহুলা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল। এত চেনা? ওকি তবে কখনো স্বপ্নে এই জায়গা দেখেছে?
‘কী দেখছ ওদিকে? খাবার দাও, খুব খিদে পেয়েছে,’ বুধনের কথায় বেহুলা লজ্জা পেল। ‘সকালে এই নারকেলগুলো এনে জল পিপাসা মিটিয়েছি। শাঁস দিয়ে খিদেও কিছুটা মিটেছে,’ বুধন বলল। ‘কিন্তু খিদে পেয়েছে খুব। বুধন মাটিতে বসে গামছা খুলে কলাপাতার মোড়ক খুলে মালসায় রাখা ভাত, নটে শাক গপাগপ গোগ্রাসে গিলতে লাগল। বুধন পরিতোষ সহকারে খাবার শেষ করে ঢক ঢক করে জল খেয়ে তৃপ্তির সঙ্গে বলল, ‘আঃ!’
‘এবার বল, মসলিনের গাঁটরি কোথায়?’ বেহুলা বলল।
‘ওটা দারোগা সরিয়েছে। দারোগাটাই চোর।’
‘আচ্ছা!’
‘হ্যাঁ। মোগল তাঁতখানায় উদয়াস্ত খাটায় তাঁতিদের। ওখানে একজন মুকীম সব সময় আমাদের পাহারা দেয় যাতে কেউ কাজে ফাঁকি না দিতে পারে। কেউ প্রতিবাদ করলে দারোগা তার ওপর খুব অত্যাচার করে যাতে তা দেখে অন্য তাঁতিরা ভয় পেয়ে কিছু না বলে। আমার বাবাকে ওই দারোগা মেরেই ফেলল।’
‘এই দারোগারা তাহলে নবাবের কাছে কাপড় পাঠাবার দায়িত্বে থাকে?’
‘দারোগাই সব। লোকগুলো পাক্কা বদমাশ। ওরা গোপনে বিদেশিদের কাছে কাপড় বিক্রি করে অনেক টাকা কামায়। এই বিদেশি বণিকরাও দারোগাদের খুশি করার জন্য অনেক সালামি দেয়। একদিন আমি তা দেখে ফেলি।’
‘কী দেখেছ?’
‘সুলতানের কড়া আদেশ আছে বিদেশি বণিকদের মলবুস খাস বিক্রি করা চলবে না। আর ‘সরকার আলি’ কেউ বাজারে বিক্রি করেছে জানতে পারলে মোগল বাদশাহ তাকে তৎক্ষণাৎ কোতল করে দেবে। একদিন সকালে আমি আমাদের দারোগা সিরাজ-উদ-দীন মহম্মদের ঘরে গেছিলাম ছুটির আর্জি জানাতে। দারোগা তখন কামরায় ছিল না। হঠাৎ দেখি দু’জন ইংরেজ সাহেব আর একজন দেশি গোমস্তার সঙ্গে দারোগা আর মুকীম আসছে। আমাকে খালি ঘরে দেখলে মারবে এই ভয়ে আমি ঘরের কোণায় রাখা কাপড়ের গাঁটরির পিছনে লুকিয়ে পড়ি। দেখলাম দু’জন ইংরেজ সাহেব দারোগাকে খুব খাতির করছে। দারোগা গম্ভীর। ইংরেজরা দারোগাকে থলি থেকে অনেক টাকা আর একটা সোনার হার দিল। এবার দারোগার মুখে হাসি ফুটল। একটা ছোট গাঁটরি তৈরি করে রাখা হয়েছিল নবাবের কাছে মলবুস খাস আর সরকার আলি পাঠাবার জন্য। দারোগা ইঙ্গিত করল আর মুকীম সেই গাঁটরি থেকে কয়েকটা কাপড় আর অন্য গাঁটরি থেকে কিছু ‘নয়নসুখ’ কাপড় নিয়ে আরেকটা গাঁটরি বাঁধল। তারপর আমি যে গাঁটরির পিছনে লুকিয়ে ছিলাম মুকীম সেদিকে এগিয়ে এল। আর তখন ও আমাকে দেখতে পেয়ে গেল।’
‘তারপর?’
‘তারপর দারোগা আমাকে চোর বলে প্রচুর মারল। বলল আমি নাকি মূল্যবান মলবুস খাস আর সরকার আলি চুরি করেছি। আসলে নিজেদের চুরি আমার ওপর দিয়ে চালাবার অভিসন্ধি করল। আমাকে বেত মেরে মেরে তারপর তাঁতঘরে তালাবন্ধ করে রাখল। কিছু খেতে দিল না। রাতে আমার সারা গায়ে জ্বর। আমি বুঝলাম এরা কাল এসে আবার অত্যাচার করবে। মলবুস ব ইংরেজদের কাছে বিক্রি করা সম্রাটের আদেশ বিরুদ্ধ কাজ। সম্রাট জানতে পারলে দারোগাকে কোতল করবে। আমি ওদের চুরি দেখে ফেলেছি তাই ওই নির্দয় দারোগা নিজেকে বাঁচাতে আমায় মেরে ফেলবে। কে জানে বাবাও হয়তে দারোগার এসব চুরির কথা জানতে পেরে গেছিল, তাই বাবাকে চাবকে মেরেই ফেলেছিল। আমি রাতে তাঁতঘরের উপরের জানলা ভেঙে পালালাম। আমি এখন ওদের কাছে এক বিপজ্জনক মানুষ। তাই ওরা আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। ধরতে পারলেই মেরে ফেলবে।’ বুধন পিরান তুলে দেখাল।
‘ইস্!’ বেহুলা শিউরে উঠল। পিঠে চাবুকের দাগ, কেটে রস গড়াচ্ছে। ‘অম কাল কেশরাজের পাতা বেঁটে নিয়ে আসব।
‘আমি আজ রাতেই পালাবো এখান থেকে।’
‘একদম না। তোমায় ওরা হন্যে হয়ে খুঁজছে। তোমাদের বাড়িতে ফাঁড়ির বরকন্দাজ নিয়ে গেছিল সকালে। এখন ক’টা দিন বাইরে যেও না। আমি রোজ লুকিয়ে তোমার খাবার এনে দেব। পালাবার সুবিধা হলে তোমায় জানাব বেহুলা উঠে দাঁড়াল। ‘আজ আসি।’
বুধন বেহুলাকে ঢিপির বাইরে পৌঁছে দিল। ‘সাবধানে।’
‘হ্যাঁ তুমিও সাবধানে থেকো।’
বেহুলা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে বাড়ির পথ ধরল। সারাটা পথ মনে মনে ভাবতে লাগল এই জিভকাটির মন্দির ওর কেন এত চেনা লাগে?
পরদিন আবার দুপুরে বেহুলা এল জিভকাটির জঙ্গলে। জঙ্গলে ঢোকার মুখে একটা পাথরের আড়ালে বুধন অপেক্ষা করছিল বেহুলার। জঙ্গলে ঢুকে বুধনকে ভাতের মালসা দিল বেহুলা। কেশরাজের পাতা বেঁটে এনেছিল বেহুলা। বুধনের পিঠে, পায়ে ভালোভাবে লাগিয়ে দিয়ে বলল, ‘দু’দিন লাগালেই সব ঘা শুকিয়ে যাবে।’ তারপর আরেকটা গামছায় মোড়া মুড়ি, চারটে কলা, আর এক চাকা
গুড় দিয়ে বলল, ‘রাতে খিদে পাবে, তখন এটা খেও। বচনপিসি বলছিল তোমার মা নাকি কাপড়ে সুতো দিয়ে খুব সুন্দর কাজ তুলতো?’
গরাস মুখে চিবোতে চিবোতে মাথা নাড়লো বুধন। তারপর মুখ খালি হলে বলল, ‘মা খুব জামদানীতে নানা রঙের রেশমের সুতোয় সুন্দর সুন্দর ফুল আঁকত, নকশা তুলত। আর কত রকমের কাজ করত মসলিনে—আগরদানা, গুলবদন, তঞ্জাব, সুরবর্তী। এছাড়াও কত রকম জামদানী মসলিনে মা সুতোর কাজ করত। পান্না বজার, গোলবাতান, দুবলীজাল, আনারকলি, বদনখাসা আমাকে মা কাজ শিখিয়েছিল।’
‘বচনপিসি বলছিল তুমিও নাকি খুব ভালো কাজ শিখেছিলে।’
‘তন্তুবায়দের রক্ত আমার শিরা-ধমনীতে। মা’র মুখে শুনেছি যে রাজা লক্ষ্মণ সেন ঢাকা ধামরাই থেকে নিপুণ তাঁতি আর ওস্তাগর নবদ্বীপ-শান্তিপুরে এনেছিলেন।’
‘ওস্তাগর কী?’
‘দর্জি।’
‘তার আগে শান্তিপুরের তাঁতিরা মোটা সুতোর কাপড় বানাতো। আমার মায়ের পূর্ব-পুরুষরা দারুণ ভালো মসলিন কাপড়ে রিপু করত, ধোওয়া কাপড়ে কাঁটা দিয়ে সুতো টেনে এমন ভাবে ফাঁক বুজিয়ে দিত যে কেউ ধরতেই পারত না। তাছাড়া কালি দিয়ে পাড় রাঙাতো এসব ছিল ওদের কাজ। তাঁদের বংশধররা এই কাজ শেখে এবং খুবই দক্ষতা অর্জন করে। আমার মা’ও শিখেছিল এই সূক্ষ্ণ সুতোর কাজ। খুব ভালো হয়েছে এই বিউলির ডালটা। কে বানিয়েছে বচনপিসি?’
‘না আমি।’
‘বচনপিসিও খুব ভালো বিউলির ডাল বানাতো। আমি ভালো খাই তাই আমার জন্য আমাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিত। কী সুন্দর সেই দিনগুলো ছিল, আর সব কী হয়ে গেল,’ বুধন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল
‘এখান থেকে বের হয়ে কোথায় যাবে ভেবেছ?’
‘পশ্চিমে যতদূর যাওয়া যায় চলে যাব। গুজরাটে চলে যাব। ওখান থেকে ইরান।’
‘ইরানে কী করবে?’
‘আমি নিজের তাঁতঘর খুলব। সেই তাঁতঘরে মলবুস খাস কাপড় বুনব।’
‘দারোগা টের পেলে?’
‘দারোগা এখন নিশ্চয়ই চারদিকে পাইক পাঠিয়েছে আমাকে খুঁজতে। নদীর ঘাটে, বড় রাস্তার মোড়ে, মন্দিরে, পান্থশালায় আমাকে খুঁজে বেড়াবে। এখন আমাকে কিছুদিন আত্মগোপন করে থাকতে হবে।’
‘আমি তোমার পালাবার ব্যবস্থা করে দেব বুধনদা।’
‘তুমি! তুমি কীভাবে আমার পালাবার ব্যবস্থা করবে?’
‘আমি জানি কীভাবে করব। তবে একটু সময় লাগবে। তবে বারবার এখানে এলে ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। আমি একবারে অনেকটা খাবার দিয়ে যাব। তবে এখানে তোমার খাবার জলের একটা ব্যবস্থা করতে হবে। বড় কলসি নিয়ে আসা সম্ভব না।’
‘ঠিক,’ বুধন সহমত। ‘তবে এই মন্দিরের ভিতরে অনেকটা যাওয়া যায়। আমি কাল মশাল নিয়ে ওই দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে ভিতরে গেছিলাম। ওখানে একটা বিশাল কুয়ো দেখেছি।’
‘কুয়ো! জল আছে কুয়োয়?’
‘এত গভীর আর ভিতরে এত অন্ধকার যে বোঝাই যায় না জল আছে কিনা, ‘ বুধন বলল। ‘দেখবে?’
দু’জনে দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে ভিতরে অন্য কক্ষের ভিতর দিয়ে একট প্রশস্ত জায়গায় এসে উপস্থিত হল। সেখানে মাঝখানে একটা কুয়ো। অদ্ভুত চৌকো আকারের কুয়ো। কুয়োটা দেখেই বেহুলার শরীরে এক অদ্ভুত অস্বস্তি জেগে উঠল। কুয়োর পাশে এসে বুধন মশাল এগিয়ে ধরল। কিন্তু কুয়ো এত গভীর যে নীচ পর্যন্ত আলো পৌঁছায় না। বুধন গামছাটা খুলে ধরল। বেহুলা টের পেল অস্বস্তিতে ওর সারা শরীর লোহার মতো শক্ত হয়ে উঠেছে। বুধন নিজের মশালের আগুন থেকে গামছায় আগুন জ্বালাল, আর তারপর কুয়োর সামনে ঝুঁকে সেই জ্বলন্ত গামছা কুয়োর মধ্যে ছুঁড়ে দিল। গামছার আগুন কুয়োর অন্ধকারকে আলোকিত করতে করতে নীচে নামতে লাগল আর বেহুলার মনে হলো যেন তার শরীরে কেউ আগুন জ্বালিয়ে ওকে সেই কুয়োতে ছুঁড়ে দিয়েছে বেহুলা কত রাতে ঠিক এই দুঃস্বপ্নটা দেখে ভয়ে জেগে উঠেছে। ও ভয়ে আর্তনাদ করে উঠল। বেহুলা বুধনের হাত এত জোরে চেপে ধরল যে বুধন অবাক হয়ে বলল—‘ঠিক আছে, চল আমরা এখান থেকে সরে যাই।’
বেহুলা দ্রুতপায়ে মন্দিরের চাতালে ফিরে এসে বসে হাঁফাতে লাগল। ও এবার স্থির নিশ্চিত যে জিভকাটির মন্দিরের সঙ্গে ওর অতীত জড়িত। আগুনকে কি এজন্যই সে এত ভয় পায়? এজন্যই কি সে সহমরণের চিতার আগুন থেকে পালাতে চেয়েছিল?
