1 of 2

বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৪০

।। চল্লিশ।।

আজকে আবার সকাল থেকে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়েই চলেছে। এই বাদলায় বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কেউ জ্যোতিষ-মন্দিরে আসেনি। বেহুলা ধীরে ধীরে সকালে বাড়ির কাজ-কম্মো সারছে। জিভকাটির মন্দিরে বুধনদার ওখানে আজ খাবার নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। দুপুরে আজও জমিদার বাড়ি যাওয়া হবে না। ডেভিড সাহেবের সঙ্গে দু’দিন হয়ে গেল দেখা হয়নি। খালি খালি লাগছে। লোকটাও কেমন যেন। কখনো ভীষণ গম্ভীর, কখনো অনেক গল্প করে, আবার কোনো দিন অন্যমনস্ক। কী যেন ভাবে সারাক্ষণ। বেহুলার কথা যেন শুনতেই পায়নি এমন ভাব। সাহেবের কথা আর ভাববে না, বেহুলা ভাবল। লোকটা তো ওদের বাড়ি চেনে, একবার নিজেও তো আসতে পারত। সাহেবকে মন থেকে ঝেড়ে ফেলে বেহুলা ঠিক করল আজ গণককাকার জ্যোতিষ-মন্দিরে গিয়ে ললাটরেখাগুলো ভালোভাবে এঁকে ফেলা যাক। দুপুরে মাথাল মাথায় দিয়ে এক ছুটে জ্যোতিষ-মন্দিরে গিয়ে ঢুকল বেহুলা।

বৃষ্টি পড়েই চলেছে। বেহুলা জ্যোতিষের আঁকিবুকিতে হারিয়ে গেছিল। হঠাৎ বাইরে পায়ের ছপ-ছপ শব্দ। বাইরে পুরুষ কণ্ঠ—‘বেহুলা!’

বেহুলার বুকের ভিতর খুশি যেন উনানের ফুটন্ত দুধের মতো উপছে পড়ল। এ গলার স্বর সে খুব চেনে। তাড়াতাড়ি আগড় খুলে দিল বেহুলা। বাইরে দাঁড়িয়ে ডেভিড সাহেব। মাথায় একটা ঢাউস ছাতা, কিন্তু ছাতা এই ঝোড়ো হাওয়াকে শাসন করতে পারেনি। ডেভিড সাহেবের পোশাক একেবারে ভিজে চুবুচুবু হয়ে গেছে।

‘সাহেব, তুমি এখানে?’ বেহুলার খুব আনন্দ হচ্ছিল। সাহেবকে দেখলেই বেহুলার প্রাণে এক অদ্ভুত আনন্দের তরঙ্গ জেগে ওঠে। কিন্তু ওই পর্যন্তই। পর মুহূর্তেই তার আনন্দোল্লাসের মোহঘোর কাটিয়ে দেয় ওর বৈধব্যের সাদা শাড়ি। বেহুলা খসে যাওয়া ঘোমটা মাথার ওপর তুলে ধরল।

‘টুমি আসছ না জমিদারবাড়িতে, আমার খুব খালি খালি লাগছিল। তাই আমিই চলে এলাম। বিরক্ত করিলাম না তো?’

‘না না বিরক্ত কিসের! সাহেব, তুমি ভিতরে এসো, বেহুলা সাহেবকে ভিতরে ঢুকিয়ে আগড় বন্ধ করে দিল। সাহেব ঠাণ্ডায় কাঁপছে। ‘এ বাবা, তুমি তো একদম ভিজে গেছ সাহেব। জ্বর-জারি না বাঁধাও। তোমাকে শুকনো কাপড় পরতে হবে, দাঁড়াও আমি এক্ষুনি আসছি।’

বেহুলা মাথাল মাথায় দিয়ে এক ছুটে বাড়িতে এল। পাখমারা গণকের ধুতি, পিরান, আর চাদর নিয়ে ফিরে এল জ্যোতিষ-মন্দিরে। সাহেব এক্কেবারে ভিজে গেছে। ঠাণ্ডায় ঠকঠক করে কাঁপছে।

‘শিঘ্রী পোশাক পাল্টে নাও সাহেব,’ বেহুলা কাপড়গুলো দিল। তারপর খেয়াল হলো এখানে ওর সামনে সাহেব পোশাক পাল্টাবে কীভাবে? একটাই তো মাত্র ঘর! ‘তুমি পোশাক পাল্টাও, আমি আসছি—’

কিন্তু সাহেবের কোনো লজ্জা শরম নেই। সাহেব ভেজা জুতো খুলতে খুলতে বলল, ‘টোমায় কোথাও যেতে হবে না। টুমি চোখ বন্ধ করে ওদিক ফিরিয়া দাঁড়াও, আমি এক্ষুনি পোশাক পাল্টে ফেলছি।’

সাহেবের কথা শুনে বেহুলা একদম লজ্জায় রাঙা। তা কখনো হয় নাকি? পরপুরুষ তার সামনে পোশাক বদলাবে!

তবু সাহেবের কথায় এমন এক সততা থাকে যে বেহুলা না বলতে পারে না। বেহুলা পিছন ফিরে দাঁড়াল। দু’হাতের তালু দিয়ে চোখ-মুখ ঢাকল। বেহুলার ভয় হচ্ছিল, পিছনে সাহেব পোশাক ছাড়ছে, এখন যদি গাঁয়ের কেউ এসে যায়! তাহলে উলঙ্গ সাহেবকে এখানে দেখলে গাঁয়ে ঢি ঢি পড়ে যাবে।

‘ড্যাম!’ সাহেবের কণ্ঠস্বরে হতাশা। ‘পারছি না, বেহুলা। প্লিজ হেল্প।’

বেহুলা পিছন ফিরে তাকাল আর চোখ ফেরাতে পারল না। বাঙালির ধুতিতে সাহেবকে খুব কাছের মানুষ মনে হচ্ছে। সাহেবের শরীরের উপরিভাগ আদুল, সাহেব ধুতিটা পরার চেষ্টা করে নাজেহাল। ধুতি ঠিকমতো পরতে পারেনি। চটের বস্তার মতো নিম্নাঙ্গ ঘিরে রেখেছে, ব্যাস।

বেহুলা খিলখিল করে হেসে ফেলল।

‘আমার দুর্দশা দেখিয়া তুমি আনন্দ পাইতেছ?’ সাহেব বিব্রত মুখে বলল।

‘ভাগ্যিস কেউ দেখেনি তোমায় সাহেব,’ বেহুলার হাসি থামতে চায় না। ‘তুমি তো ধুতিতে গিঁট দাওইনি।’

‘তাহলে তুমি পরিয়ে দাও,’ সাহেব বলল। সাহেব কোঁচার খুঁট বেহুলার দিকে এগিয়ে দিল।

বেহুলা লজ্জায় রাঙা। সাহেব বলে কী? ও মেয়েমানুষ হয়ে পরপুরুষের ধুতির গিঁট কীভাবে বাঁধবে?

সাহেব বুঝল বেহুলার লজ্জা। সাহেব বলল, ‘তাহলে আমি ভিজা কাপড়েই ফিরিয়া যাই?’

‘না না সাহেব, তোমার জামা কাপড় আমায় দাও। আমি হেঁসেলে উনুনের ওপর ঝুলিয়ে রাখব, কিছুটা শুকিয়ে যাক।’

‘তাহলে আগে ধুতিটা ঠিকমতো পরিয়ে দাও।’

বেহুলা এবার সাহেবের পিছনে এসে ধুতির দু’প্রান্ত ধরে দু’হাতে পিছন থেকে সাহেবকে বেষ্টন করে সাহেবের নাভির কাছে একটা গিঁট বাঁধতে গিয়ে সাহেবের ভেজা শরীরের স্পর্শ পেল। আদুল গায়ের পেশীবহুল পুরুষ মানুষের স্পর্শ।। বেহুলার সর্বাঙ্গে শিহরণ হল। শরীর হঠাৎ অবশ হয়ে গেল। ওর মনে হলো আঙুলগুলোতে একদম সাড় নেই, ধুতিতে গিঁট বাঁধবে কী!

‘কী হল, পারিতেছ না?’ সাহেবের কথায় বেহুলার সম্বিত ফিরে এল। ও তাড়াতাড়ি গিঁট দিয়ে বলল, ‘এভাবে, সাহেব, এবার ধুতিটা কোমরে ভালোভাবে জড়িয়ে নাও।’

বেহুলা এবার পায়ের শব্দ শুনে দরজার দিকে ফিরতেই চমকে উঠল। দরজায় দাঁড়িয়ে পাখমারা গণকঠাকুর। বেহুলার দু’হাতের বেষ্টনীর ভিতর সাহেবের উন্মুক্ত শরীরের দিকে তাকিয়ে তাঁর চোখে বিস্মিত দৃষ্টি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *