1 of 2

বিদ্বান বনাম বিদুষী – ২২

।। বাইশ।।

বিদ্যাধরী নদীর খাত থেকে পিতলের সিন্দুক উদ্ধারের খবর কাপাসডাঙার মাঠ পেরিয়ে মরা তাঁতিপাড়ায় পাখমারা গণকের গৃহেও পৌঁছে গেল। শিউলি গাছের পাতা থেকে টুপ-টাপ কয়েকটা শুঁয়োপোকা উঠোনে পড়ে এদিক ওদিক গুটিগুটি পায়ে চলেছে। খালি পায়ে শুঁয়ো লাগলে খুব জ্বালা করে, তাই বচনপিসি পা বাঁচিয়ে একটা শলাঝাঁটা দিয়ে উঠোনের পুরোনো ফুল, পাতা, শুঁয়োপোকা সমেত ঝাঁট দিতে দিতে বেহুলাকে বলল, ‘তাহলে মোষখাগীর পীরের কথা সত্যি হল!’

‘পীরের কোন কথা?’

‘পীর নাকি বলেছিল এই ডিঙাডুবির মাটির নীচ থেকে একদিন এমন রত্ন পাওয়া যাবে যার জন্য আমাদের গোটা বাঙালি জাতি গর্বে বুক চাপড়ে বেরাবে।’

‘কিন্তু কী থাকতে পারে ওই সিন্দুকে?’

‘জানিনে। দেখা যাক কী বেরোয়, বচনপিসি ঝাঁট দেওয়া শেষ করে উঠোনে রোদ্দুরে কাঁথা মেলতে মেলতে বলল।

পাখমারা গণক দাওয়ায় মোড়ায় বসে ছিল, এবার ধীরস্বরে বলল, ‘তবে প্রাচীন উপকথাটা সত্যি কিনা সেটাও এবার বোঝা যাবে।’

‘কাকা, কী উপকথা গো?’

‘ডিঙাডুবির উপকথা এই যে এই জঙ্গলেই খনার জিভ কেটে খনাকে হত্যা করে মন্দিরের ভিতরেই মাটির নীচে চাপা দেওয়া হয়েছিল। তাই এই জঙ্গলের নাম জিভকাটির জঙ্গল আর এই মন্দির হল জিভকাটির মন্দির। এই মন্দির অনেক পুরোনো কালের। পরবর্তীকালে, এই মন্দিরে নাকি খনার লেখা ফলিত- জ্যোতিষের অনেক পুঁথি রাখা ছিল। বাংলার কয়েকজন গ্রহবিপ্র সেই পুঁথির অনুবাদ করে লিপিবদ্ধ করে এই মন্দিরে সংরক্ষণ করে রেখেছিল। বারাণসী থেকে একবার একদল সন্ন্যাসী কোন এক রাজার অনেক লোক-লস্কর নিয়ে খনার এই মন্দির ধ্বংস করতে এসেছিল। যারা ভিতরে ছিল তাদের প্রায় সকলকেই হত্যা করা হয়েছিল। তখন মন্দিরের প্রধান পুরোহিত নাকি ধাতব তোরঙ্গের মধ্যে সংরক্ষিত খনার পুঁথি নিয়ে নদীপথে পালাতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই গ্রহবিপ্রকে ধাওয়া করে বারাণসীর জ্যোতিষীরা বিদ্যাধরীর জলে নৌকা নিয়ে গ্রহবিপ্রের সেই ডিঙা ঘিরে ফেলে। মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী জেনে সেই গ্রহবি নাকি ধাতব তোরঙ্গ বিদ্যাধরীর জলে বিসর্জন দেয়।’

‘তারপর? গ্রহবিপ্রের কী হল?’

‘শয়তানগুলো গ্রহবিপ্রকে মেরে সেই ডিঙা বিদ্যাধরীতে ডুবিয়ে দিয়েছিল। সেই থেকেই তো এ জায়গার নাম হয়েছিল ডিঙাডুবি।’

‘মানুষ এত নিষ্ঠুর হতে পারে? শুধু খনাবাক্য ধ্বংস করার জন্য হত্যা করল?’

‘নিষ্ঠুর না হলে খনার জিভ কেটে ফেলতে পারে? তারই বংশধরেরা হয়তো খনার সমস্ত চিহ্নই মুছে ফেলতে চেয়েছিল যাতে বরাহঠাকুরের চরিত্রে এতটুকু কালিমা না থাকে।’

‘তাহলে জিভকাটির মন্দির কেন ওরা ধ্বংস করল না?’

‘কিছুটা ভেঙে ফেলেছিল ওরা। কিন্তু সে সময় সর্পদংশনে নাকি কিছু সন্ন্যাসীর মৃত্যু হয়। তাতে বাকি সন্ন্যাসীরা জায়গাটা অভিশপ্ত বলে ডিঙাডুবি ছেড়ে পালায়।’ পাখমারা গণক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বেহুলাকে অন্যমনস্ক দেখে বলল, ‘কী ভাবছিস? মন খারাপ হয়ে গেল তাই না?’

‘তুমি ঠিক জানো কাকা? ওটা খনার পুঁথি?’

‘ওসব তো গল্পকথাও হতে পারে। যা শুনেছি তাই বললাম। তবে কাল জমিদারবাবুর সামনে পেটরা খুললেই সব রহস্যের সমাধান হয়ে যাবে।’

তারপর সারাদিন ধরে বেহুলার মনে হলো যেন কাপাসডাঙার বাতাস শিরশির করে উঠোনের শিউলি গাছের পাতায় শিরশিরানি জাগিয়ে ওকে বলছে –যা বেহুলা, তুইও একবারটি যা বেহুলা। দেখে আয়। বেহুলা বুঝতে পারছে না ওকে কেন যেতে হবে, কিন্তু এটা অনুভব করতে পারছে যে প্রকৃতি চায় যে সে ওখানে যাক। এক অদ্ভুত অস্বস্তি তার মনকে অশান্ত করে রেখেছে।

রাতের বেলা খেতে বসে বেহুলা বচনপিসিকে বলল, ‘চল পিসি, আমরাও কাল দেখে আসি ওই তোরঙ্গের ভিতর কী আছে?’

‘না না,’ বচনপিসি আপত্তি করল। ‘অনেকে আসবে ওই তামাশা দেখতে। যদি তোদের ধুলসার লেঠেলদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় তবে?’

‘আমি বেধবার কাপড়ের আঁচলের ঘোমটা টেনে যাব। আমার খুব যেতে ইচ্ছা করছে। চল না, দু’জনে যাই।’

বেহুলার পীড়াপীড়ির কাছে হার মানল বচনপিসি–‘ঠিক আছে, চল। একবার দেখাও হয়ে যাবে ওই সত্যাচার্য ঠাকুরের মুখশ্রী। লোকটা আমাদের অনেক ক্ষতি করেছে।’

পরদিন দুপুরে বচনপিসির সঙ্গে বেহুলা গেল ডিঙাডুবির জমিদার বাড়িতে। জমিদারবাড়ির কাছাকাছি গিয়ে চমকে উঠল বেহুলা। যেন মেলা বসে গেছে। গিজগিজ করছে মানুষের ভিড়। কাছে দূরে সকল গ্রাম থেকে প্রচুর মানুষ এসেছে এই সিন্দুকের ভিতর কী আছে তা জানতে। এমনকী পথ চলতে অসমর্থ মানুষজন ডুলি, পালকিতে ঔৎসুক্য নিবৃত্তির জন্য এসেছে। গলায় রোহিত মাছের বিশাল চারকোণা আঁশ হাঁসুলীতে বাঁধা পিলে বাড়া একটা শিশুর পাশে লাঠি হাতে এক কুঁজো বুড়ি দাঁড়িয়ে ছিল, তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল বচনপিসি। বেহুলা শাড়ির আঁচলের ঘোমটা সামান্য তুলে এক নজরে চারদিকে সন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে দেখল এই ভিড়ে ধুলসার কোনো মানুষ আছে কিনা। চেনামুখ নজরে না আসায় বেহুলা নিশ্চিন্ত হল। কুঁজো বুড়ি খুবই মুখরা। বচনপিসিকে বকবক করে বলতে লাগল– ‘ছেলেটা থাকলে ওকেই এই তামাশা দেখতে পাঠাতুম এখানে। ভিটেতে বসেই খপর পেয়ে যেতাম সব।’

‘দামু কোথায় গেছে রে শান্তি?’ বচনপিসির গ্রাম্য কৌতূহল।

‘এই দেওয়ান দুর্লভচাঁদ গ্রামের সব জোয়ানদের ধরে ধরে পাঠাচ্ছে কলকাতা। এখানে তো কোনো রোজগারই নেই, শহরে নাকি অনেক কাজ। কত রাজাদের মহল তৈরি হচ্ছে সেথা। বলেছে জন-মজুরের কাজে খাওয়া-পরা দেয়, ভালোই কড়ি নাকি রোজগার হয়। তবে বাড়ির ছেলে বাড়ি থাকবে না এটা কেমন লাগে বল? কিন্তু এত ধার হয়ে গেছে মহাজনের দাদনে, দামু বলে গেছে পয়সা-কড়ি একটু কামিয়ে তবে বাড়ি ফিরে আসবে।’

‘বেশ করেছে,’ বচনপিসি বলল। ‘কথায় আছে অগ্নি, ব্যাধি, ঋণ, তিনেরে রেখো না চিন।’

‘তোর বিশেটাকেও শহরে জন-মজুরের কাজে লেগে যেতে বল, বচন। বেচারা মুখে রং মেখে সং সেজে কত কষ্টই না করে তোদের দুমুঠো ভাতের জন্য।’

বচনপিসি মাথা নাড়িয়ে সায় দিল। শান্তি বুড়ি এবার সমব্যথী পেয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘রাজার গোরু বাচ্চা বিয়োবে তো চাষার কী? আমাদের কি গাইয়ের দুধ খাওয়াবে? আমরা শুধু শুধু সব কাজ ছেড়ে এসে সময় নষ্ট করছি। তোরঙ্গ খোল রে বাবা, এই রস-বাতের ব্যথা নিয়ে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না!’

জমিদার বাড়ির ফটক দিয়ে ঢুকে বাঁদিকে কাছারি বাড়ি ও ডান দিকে দালান বাড়ি, মাঝে বড় উঠোনে ক্যাম্বিসের চন্দ্রাতপ বাঁধা হয়েছে। দালানবাড়ির উঁচু চাতালে একটা সিংহাসন পাতা হয়েছে, সেখানে জমিদারবাবু বসে। জমিদারের পরনে মখমলের কোট, তাতে জরির কাপড় মোড়া হাড়ের বোতাম, জমিদার বসে লম্বা নলের গড়গড়া টানছে, গড়গড়ার নলের মুখ রূপো দিয়ে বাঁধানো। অম্বুরি তামাকের গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে দালানে। কাছারিবাড়ির দিকে বারান্দায় এক মখমলমোড়া কৌচের পাশে দাঁড়িয়ে দেওয়ান দুর্লভচাঁদ, তার পাশে একটি উচ্চ কাষ্ঠাসনে কুশাসন পেতে যে লোকটা বসে আছে তাকে দেখা মাত্রই বেহুলার সারা শরীরে অস্বস্তি ছেয়ে গেল। হাতের তালু ঘামতে শুরু করল, গায়ে যেন শত বোলতা হুল ফোটাচ্ছে এমন যন্ত্রণা। বেহুলা কুলকুল করে ঘামতে শুরু করল—‘ওই লোকটা কে গো পিসি?’ বেহুলা খুব অস্বস্তির সঙ্গে বলল।

‘ওটাই সত্যঠাকুর,’ কুঁজো বুড়ি বলল। ‘খুব বড় গণক।’

বচনপিসি বেহুলার দিকে তাকাল। ‘কি রে তোর কপাল ঘামছে কেন? শরীর খারাপ লাগছে?’

‘না না, আমি ঠিক আছি,’ বেহুলা বলল বটে কিন্তু সে বুঝল সে মোটেই ঠিক নেই। এখন ওর মাথায় হঠাৎ রাগের আগুন জ্বলে উঠেছে। যেন কত জন্মের পুষে রাখা রাগ আজ দাবানল হয়ে মুক্ত হয়ে ছড়িয়ে যেতে চাইছে। শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখের ঘাম মুছল বেহুলা।

জমিদারের পিছনে একজন ভৃত্য আড়ানি দুলিয়ে জমিদারের মাথায় হাওয়া করে চলেছে। জমিদারের পাশে কয়েকজন গোমস্তা, মোসাহেব ইত্যাদিরা দাঁড়িয়ে। গ্রামবাসীরা জড়ো হয়েছে উঠোনে। জমিদারবাড়ি আসবে বলে অনেকেই আজ আদুল গায়ে পিরান গলিয়ে এসেছে। জমিদার এবার গড়গড়ার নল ধরা হাত নিজের কাঁধের পাশ দিয়ে পিছনে নিয়ে গেল। দণ্ডায়মান হুঁকাবরদার গড়গড়ার নল হাতে নিয়ে নিল। জমিদার বলল, ‘এবার সিন্দুক খোলা হোক।’

মুহূর্তের মধ্যে গ্রামবাসীদের গুঞ্জন থেমে গেল। জমিদার বলল, ‘সুবল, ঢাকনা কেটে ফেল। দেখা যাক ভিতর কী আছে।’

বেহুলার মনে টানটান উত্তেজনা। সুবল স্যাকরা ওর ধাতু কাটার কাঁচি নিয়ে এসে তৎপরতার সঙ্গে পিতলের সিন্দুকের ঢাকনা কেটে ফেলল এবং ভিতরে হাত ঢোকালো। উপস্থিত সকলের কৌতূহল চরমে। ভিতরে কী আছে? সুবল স্যাকরা বের করে আনল লাল শালুতে মোড়া কিছু। শালুর মোড়ক খুলল সুবল, বেরিয়ে এল একটা তালপাতার পুঁথি। ‘একটা পুঁথি হুজুর, সুবল পুঁথিটা তুলে বলল।

‘পুঁথি!’ জমিদার হতাশ। ‘ওটা এদিকে নিয়ে আয়। আমার হাতে দে ওটা!’ জমিদার গোপীচরণ মল্লিক দালানবাড়ি থেকে চেঁচিয়ে হুকুম দিল। ‘সত্যঠাকুর, দেওয়ানজী আপনারাও অনুগ্রহ করে এদিকে আসুন।’

সুবল উঠোনে নেমে ‘সরো, সরো,’ বলতে বলতে সত্যঠাকুর ও দেওয়ানকে ভিড়ের ভিতর দিয়ে পথ করে দিতে দিতে আঙিনা পার হয়ে দালানবাড়িতে উঠে পুঁথিটা সযত্নে জমিদারের হাতে দিল।

জমিদার পুঁথিটা নেড়েচেড়ে দেখল। জমিদারের কাছাকাছি এসে পুঁথির দিকে তাকিয়েই সত্যাচার্য বুঝল এই সেই নরকের ডাইনীর মন্ত্র যা তার গুরুকুল ঘৃণার চোখে দেখে এসেছে।

‘এ অশুভ!’ ক্রুদ্ধ সত্যাচার্য বলল। ‘এই পুঁথি এখুনি জ্বালিয়ে দেওয়া হোক। সমস্ত দর্শক কৌতূহলী—পুঁথিতে এমন কী লেখা থাকতে পারে যে পুঁথিটাকে অশুভ বলছেন সত্যঠাকুর? দেওয়ান নিজেও কৌতূহলে উদগ্রীব। জমিদার বলল, ‘তবু কী লেখা আছে তা আমরা শুনতে চাই। হোক খারাপ, তবু আপনি অনুগ্রহ করে আমাদের একবার বলুন।’ জমিদার পুঁথিটা সত্যাচার্যের হাতে সমর্পণ করল।

‘বেশ,’ সত্যাচার্য ধীরে ধীরে সামনের পাতার একটা অংশ পড়ল

‘শয়ন উত্থান পাশমোড়া
তার মধ্যে ভীম ছোঁড়া
দুই ছেলের জন্ম তিথি
অষ্টমী নবমী দুটি।
পাগলার চোদ্দ পাগলীর আট
এই নিয়ে কাল কাট
ইহাও যদি না করিতে পারিস
ভগার খাতে ডুবে মরিস।’

‘এর মানে কী?’ জমিদারের কণ্ঠস্বরে অস্বস্তি।

‘এই সাংকেতিক কথার অর্থ আমার জানা নেই,’ সত্যাচার্যের বিরক্ত উত্তর।

‘ঠাকুর, আপনি গ্রহবিপ্র। ত্রিকালদর্শী। আপনি অনুগ্রহ করে বলুন এর কী অর্থ হতে পারে?’ জমিদার গোপীচরণ মল্লিক সত্যাচার্যকে অতি বিনীতভাবে বলল।

‘আমি জানি নে,’ জ্যোতিষী অপ্রসন্ন বদনে বলল। ‘আমি বাংলা পড়তে লিখতে শিখেছি মাত্র, কিন্তু বাংলায় অত পারদর্শী নই যে পুরোনো বাংলা পুঁথির এসব জটিল ধাঁধা বুঝব।’

বেহুলা মৃদুস্বরে বচনপিসিকে বলল ‘এর মানে তো খুবই সোজা।’

বচনপিসি ঠিকমতো শুনতে না পেলেও পাশে দাঁড়ানো শাস্তি বুড়ির কানে কথাটা গেল। বুড়ি তৎক্ষণাৎ ভিড়ের মধ্যে থেকে চেঁচিয়ে বলল, ‘এই যে, এই মেয়ে বলছে এর মানে নাকি খুবই সোজা।’

সকলের দৃষ্টি ভিড়ের মধ্যে বেহুলার দিকে নিবদ্ধ হল। বেহুলা তাড়াতাড়ি বড় করে ঘোমটাটা টেনে রাখল যাতে মুখ এতটুকু দেখা না যায়।

সত্যাচার্য বিস্মিত হয়ে বলল ‘এর অর্থ সহজ?’

বেহুলা এবার ঘোমটার পিছনে অল্প অল্প মাথা নাড়লো। তারপর বলল, ‘যারা উপোস-টুপোস করে, তাদের কাছে চেনা লাগবে।’

‘এখানে উপোস কোথায় দেখছ?’ সত্যাচার্য তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল। জমিদার বলল, ‘তুমি এখানে এস। আমাদের বোঝাও এর অর্থ ‘

বেহুলা আড়ষ্ট হয়ে ধীর পায়ে দালানবাড়ির দিকে এগোল। সকলে ভিড়ের মধ্যে সরে গিয়ে বেহুলার জন্য পথ করে দিল। ঘোমটা শক্ত করে ধরে বেহুলা দালানবাড়ির সিঁড়ি দিয়ে দালানে উঠল, মনে ভয় ধুলসার কেউ যদি এসে থাকে তবে ও আজ ধরা পড়ে যাবে।

‘এটা খনার লেখা, বেহুলা জমিদারের কাছে গিয়ে বলল। ‘এর পুরোটাই তো উপোস। শয়ন উত্থান পাশমোড়া—শয়ন, মানে হরিশয়নী একাদশী যেদিন প্রভু নারায়ণ অনন্ত শয়নে প্রবেশ করেছিলেন, অর্থাৎ আষাঢ় মাসের শুক্ল একাদশী। সেদিন উপবাস করা উচিত। উত্থান, মানে দেবউত্থান বা প্রবোধিনী একাদশী যেদিন প্রভু নারায়ণের অনন্ত শয়ন সমাপ্ত হয়েছিল। অর্থাৎ কার্তিক মাসের শুক্ল একাদশী। ভাদ্র মাসের শুরু একাদশীতে প্রভু নারায়ণ অনন্ত শয়নে পাশ ফেরেন, মানে পাশমোড়া। সেদিন পার্শ্ব একাদশী। তার মধ্যে ভীমছোঁড়া। সেটা হল ভীম একাদশী, জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্ল একাদশী। খনা বলেন এসব দিনে উপবাস করা খুব মঙ্গলজনক। ‘অষ্টমী নবমী দুটি’ মানে হল শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি জন্মাষ্টমী ও শ্রীরামের জন্মতিথি রামনবমীতে উপবাস করলে ভালো হয়। ‘পাগলার চোদ্দ পাগলীর আট’ এর অর্থ—শিবের জন্য শিবচতুর্দশী আর মা দুর্গার মহাষ্টমী তিথিতেও উপবাস করা উচিত। আর ভগার খাত মানে ভাগিরথী নদী সরে গিয়ে যে গভীর খাত সৃষ্টি হয়েছে সেখানে।’

সত্যাচার্যের দৃষ্টিতে অস্বস্তি। চারদিকে এক নজর তাকাতে তার মনে হলো চারপাশের মানুষের চোখের দৃষ্টিতে তার পারদর্শিতা নিয়ে প্রশ্ন জেগেছে। সে তাড়াতাড়ি লোকের মনোযোগ অন্যত্র ঘুরিয়ে দিতে পুঁথির পরের পাতা পড়ে বলল—‘এটাতে শুধু লেখা আছে–

তিনদশ শেষভাগ, সাত চৌদ্দ কালার আগ।
ধলার শেষ এগার চার, আট পনর আগে মার।।’

তারপর নিজেকে বাঁচাবার জন্য বেহুলাকে বলল, ‘তাহলে এটাও ব্যাখ্যা করে যাও।’

‘আমি কি পুঁথিটা একবার হাতে নিয়ে দেখতে পারি?’ বেহুলা বলল।

সত্যাচার্য্য জমিদারের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল যে জমিদারের আপত্তি নেই। সত্যাচাৰ্য্য পুঁথিটা বেহুলার হাতে দিতে গিয়ে তার হাত বেহুলার হাত স্পর্শ করল, আর বেহুলা যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হল। বেহুলা কেঁপে উঠল, বেহুলার মাথা থেকে ঘোমটা খসে গেল। বেহুলা বিস্ময়ে দেখল জমিদার তার দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। পুরুষের লুব্ধ দৃষ্টি মেয়েরা বুঝতে পারে। বেহুলা তৎক্ষণাৎ ঘোমটা আবার মাথায় তুলে নিয়ে পুঁথিতে চোখ রাখল।

‘এটাও খনা,’ গ্রামবাসীদের আবার বিস্মিত করে বেহুলা বলল। ‘এটা বিষ্টিভদ্রা।’

‘আচ্ছা!’ বিদ্রুপের স্বরে বলল সত্যাচার্য। ‘আট পনেরো তিন সাত এত সব গণিতের ভড়ং দেখিয়ে তোমার খনা বলে দেবে কবে বৃষ্টি হবে আর কবে হবে না? ভণ্ডামির একটা সীমা থাকা উচিত।’ তারপর জমিদারের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কিছু মনে করবেন না জমিদারবাবু, এসব দেখেশুনে খনার জ্ঞান-শিক্ষা সম্বন্ধে আমি সত্যিই বীতশ্রদ্ধ।’

‘বিষ্টিভদ্রা বৃষ্টি না। ওটা তিথির করণ,’ বেহুলা বলল। ‘খনার জ্ঞানের গভীরতা যে কত, তা জানার মতো জ্ঞান আমাদের অনেকেরই নেই। এই সামান্য দুটো পঙ্ক্তি। কিন্তু তার অর্থ কত গভীর। তৃতীয়া ও দশমীর শেষার্দ্ধ বিষ্টিকরণ এবং পূর্ণিমা ও শুক্লপক্ষীয় অষ্টমীর পূর্বার্দ্ধ এবং চতুর্থী ও একাদশীর পরার্দ্ধ বিষ্টিসংজ্ঞক। একেই পুঁথিকাররা কঠিন ভাষায় বলে

তৃতীয়া দশমী শেষে পূর্বে সপ্তচতুর্দশী
পূর্বে পূর্ণাষ্টমী শুক্লে চতুর্থৈকাদশী পরে

দেওয়ান এবার সত্যাচার্যের পক্ষ নিয়ে বলল, ‘এসবের মানে কী? বৃষ্টি আর বিষ্টি তো একই জানতাম এতদিন।’

বেহুলা সহ্য করতে পারছিল না সত্যাচার্যের নৈকট্য। লোকটার চোখে চোখ পড়লেই মনে হচ্ছিল শ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। মন চাইছে এক ছুটে সে এখান থেকে বেরিয়ে যায়। কিন্তু দেওয়ান প্রশ্নের উত্তরের জন্য তাকিয়ে আছে। বেহুলা বলল, ‘পুরাকালে দেবগণ অসুরের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে শিবের কাছে প্রার্থনারত হলে শিব সব শুনে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। ক্রোধে তখন শিবের শরীর থেকে গর্দভের ন্যায় মুখ, তিনটি পদ ও পুচ্ছধারিনী নারীর সৃষ্টি হয়। সেই নারী সপ্তভূজা, স্থূলোদরী, সিংহের ন্যায় তার গলদেশ। তিনি প্রেতের ন্যায় শরীর ধারণ করে বিষ্টিভদ্রা নাম নিয়ে অসুরগণকে পরাজিত করেন। তখন দেবতারা পরিতুষ্ট হয়ে সেই নারীকে তিথি হিসেবে করণের প্রান্তভাগে নিযুক্ত করে দিলেন।’

এসব শুনে জমিদার আর দেওয়ান দুর্লভচাঁদের মাথা ঘুরে গেল। একটা আটপৌরে গাঁয়ের মেয়ে অং বং চং করে সংস্কৃত বলে গেল! ‘এত সব তুমি জানলে কীভাবে?’ দেওয়ান বিস্ময় ঢেকে কঠিন স্বরে জিজ্ঞাসা করল।

‘আমি জ্যোতিষশাস্ত্র অধ্যয়ন করেছি।’

‘তুমি কোথায় থাক? তোমার পরিচয় কী?’

এবার বেহুলা নিরুত্তর। সত্য পরিচয় দেওয়া বিপজ্জনক, অথচ এত লোকের সামনে মিথ্যা পরিচয় দেওয়া সমীচীন হবে না।

‘পাখমারা গণকঠাকুরের ভাইঝি গো,’ এবার জটা পাগলা ভিড়ের মধ্যে থেকে চেঁচিয়ে বলল।

‘পাখমারা গণকঠাকুরের ভাইঝি!’ ভীড়ের মধ্যে গুঞ্জন জেগে উঠল। একজন বলল, ‘তাই এত জ্যোতিষ জানে।’

‘আমার নাম বেহুলা,’ বেহুলা নিরুপায় হয়ে পরিচয় দিল। ঘোমটার দিকে বেহুলা এত মগ্ন যে ও খেয়াল করল না ওর কাপড়ের ফাঁক দিয়ে ওর বাহু বাইরে বেরিয়ে এসেছে আর জমিদারের দৃষ্টি তার অনাবৃত বাহুমূলের দিকে নিবদ্ধ।

বচনপিসি দেখল এই সুযোগ। ও বলল, ‘জমিদারবাবু, আপনি যদি দয়া করে অনুমতি দেন তবে বেহুলাই এখন থেকে পাখমারা গণকের জ্যোতিষ-আশ্রমে বসে লোকের কোষ্ঠী দেখতে পারে।’

জমিদারবাবু নিরুপায় হয়ে বলল, ‘আচ্ছা, আমি ভেবে দেখছি ব্যাপারটা।’

এবার সত্যাচার্য ক্রোধে তার কাঁধে উড়ানি তুলে বলল, ‘এসব অর্ধশিক্ষিত জ্যোতিষীরাই জ্যোতিষশাস্ত্রকে তিলে তিলে হত্যা করেছে। বাংলার জ্যোতিষশাস্ত্র বরাহমিহিরের বৃহৎজাতককে অতিক্রম করে নিজেদের ভ্রমে ভরা গণনা জ্যোতিষশাস্ত্রে প্রবেশ করিয়েছে। আর তার ফলস্বরূপ জ্যোতিষশাস্ত্রের ওপর আজ সাধারণ মানুষের ভরসা নেই। লোকে জ্যোতিষীদের উপহাস করে। এ আমি বেঁচে থাকতে হতে দেব না। জমিদারবাবু, দয়া করে এ মুহূর্তে এই ভণ্ড খনাবাক্যের পুঁথি আগুনে প্রজ্জ্বলিত করার অনুমতি দিন দিন। বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্রকে আমি কিছুতেই কলুষিত হতে দেব না।’

উপস্থিত দর্শকের মধ্যে এক হতাশ গুঞ্জন জেগে উঠল। জমিদার বুঝল ব্যাপারটা তার প্রজাদের মনঃপূত হল না। কেউ প্রতিবাদ করছে না কারণ তার হুকুমনামা আছে ডিঙাডুবিতে সত্যাচার্যের কথাই শেষ কথা। যেখানে জমিদার নিজে উপস্থিত সেখানে তারা প্রতিবাদ করে কীভাবে? তাছাড়া সকলেই জানে যে সত্যাচার্য অসীম গুণের অধিকারী। ইনি ভবিষ্যৎ দেখতে পান। সকলে এর কাছে আসে উপকার পাওয়ার জন্য। সেই লাভ থেকে কেউই বঞ্চিত হতে চায় না।

কিন্তু বেহুলা কিছুতেই এই সত্যঠাকুরকে সহ্য করতে পারছে না। সে একা প্রতিবাদ করল–‘আপনি আমাদের বাংলার জ্যোতিষশাস্ত্র পড়েননি। খনা, ষষ্ঠীদাস যদি পড়তেন—’

‘আমি এপ্রসঙ্গে আর একটি কথাও বলতে চাই না,’ হুঙ্কার দিল সত্যাচার্য। ‘বেশ তাহলে এই পুঁথি আমায় দিয়ে দিন, আমি একে সযত্নে নিয়ে যাব আমার গণককাকার জ্যোতিষ-মন্দিরে।’

‘অসম্ভব!’ সত্যাচার্য কঠিন স্বরে বলল। তারপর সুবলকে বলল, ‘মন্দির থেকে প্রজ্জ্বলিত সমিধ নিয়ে এস। এখনি।’

দেওয়ান দুর্লভচাঁদ জমিদারের কানে কানে বলল, ‘জমিদারবাবু, ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। খনার বচন গ্রামের কৈবর্তরা লক্ষ্মীর পাঁচালির উপদেশের মতো মানে, অনেকে খনার যাত্রার উপদেশ ‘বুধে পা’ মেনেই যাত্রা করে। এভাবে বোধহয় খনাকে অপমান করা গ্রামবাসীরা ভালো চোখে নেবে না।’

কিন্তু জমিদারের মাথায় তখন অন্য মতলব পাক খাচ্ছে। এই মেয়েটা পুঁথিটাকে যত ভালোবাসে, জমিদার এই মেয়েকে প্রথম দর্শনেই ততটাই ভালোবেসে ফেলেছে। এত সুন্দরী বিধবা! নাঃ, এ বড় অন্যায় হয়ে যাচ্ছে তার জমিদারিতে। একে শরীরের খুব কাছে আনতেই হবে। এই পুঁথিই তার সহজ মাধ্যম।

জমিদার গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, ‘হয়তো সকল পুঁথি খনার লেখা নাও হতে পারে। আচার্য, এই পুঁথি আমার এই জমিদারবাড়িতেই থাকবে। আমার আদেশ এই তোরঙ্গ কাছারিবাড়ির বাইরে কখনো যাবে না।’

বেহুলা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। রাগে, অপমানে ওর কান ঝাঁ ঝাঁ

করছে। এত লোকের সামনে খনাকে ভণ্ড বলল! এত অহংকার! আমাদের বাংলার জ্যোতিষশাস্ত্র পরাশর, ভৃগুর জ্যোতিষকে মানে না? এত বড় কথাটা বলল কীভাবে? বেহুলা জমিদারকে নমস্কার করে দালানবাড়ি থেকে নেমে এল। মৃদুকণ্ঠে পিসিকে বলল, ‘পিসি, চল বাড়ি যাই।’

ভিড়ের মধ্যে দিয়ে বেরানো খুব সহজ হল না। কে একজন চিৎকার করে উঠল জয় বেহুলা মাতার জয়। ভিড়ে সেই জয়ধ্বনি বারবার জেগে উঠল। জয় বেহুলা মাতার জয়, জয় খনার জয়। ভিড় ঠেলে জমিদারবাড়ি থেকে বেরিয়ে এল বেহুলা। কয়েকজন বেহুলার পিছন পিছন আসতে লাগল। বচনপিসির সঙ্গে বেহুলা কাপাসডাঙার মাঠের দিকে রওনা দিল। বাড়ি পৌঁছে বেহুলা স্বস্তির শ্বাস ফেলল। জালা থেকে ঘটিতে জল নিয়ে ঢকঢক করে গলায় ঢালল। কিন্তু বাইরে থেকে কেউ সদর দরজা ধাক্কালো।

‘দরজা খোলো গো।’

উচ্চস্বর শুনে বেহুলা দাওয়া থেকে নেমে উঠোন পেরিয়ে দরজা খুলল। তেলাবাঁশ হাতে একজন পাইক দাঁড়িয়ে—‘জমিদারবাবু তোমায় ডাকছেন।’

‘আমাকে ডাকছেন?’ বেহুলা বিস্মিত।

‘কেন ডাকছেন?’ এবার বচনপিসি দরজায় এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করল।

‘তা জানিনে। তবে শুনলাম কিছু পুরস্কার-ইনাম দেবেন।’

বচনপিসিকে সঙ্গে নিয়ে বেহুলা আবার জমিদারবাড়ির দিকে রওনা দিল। এখন আঙিনা প্রায় খালি। জমিদার তখনও দালানে রাখা সিংহাসনে বসে গড়গড়া টানছিল। উচ্চাসন পাশে আনা হয়েছে সেখানে সত্যাচাৰ্য বসে, আর দেওয়ান দাঁড়িয়ে। বেহুলার মনে হলো সত্যাচার্যের উপস্থিতি তার অন্তরাত্মা সহ্য করতে পারছে না। কেন? বেহুলা ভাবল, লোকটা তো আমার কোনো ক্ষতি করেনি, তবে?

জমিদার বেহুলাকে দেখে গাম্ভীর্যপূর্ণ কণ্ঠে বলল—‘তুমি জ্যোতিষী?’

বেহুলা বলল, ‘আমি জ্যোতিষ জানি।’

‘আমার হাতটা একবার দেখে দাও তো,’ জমিদার থাবার মতো বড় তালু ছড়িয়ে ডান হাত এগিয়ে দিল বেহুলার দিকে।

‘আমি সামুদ্রিক বিদ্যা শিখিনি,’ বেহুলা বলল। ‘তবে আপনার কোষ্ঠী বিচার করে বলতে পারি।’

‘কোষ্ঠীতো আমার কাছে নেই। ঠাকুরমশাই, আপনার আমার জন্ম ছক মনে আছে?’

‘মনে আছে জমিদারবাবু,’ সত্যাচার্য বলল।

‘এই মেয়েকে আমার জন্ম সময়টা লিখে দেবেন তো। দেখি ও কী কী বলে।’ জমিদার এবার বেহুলাকে বলল, ‘একদিন জমিদারবাড়িতে তোমার সঙ্গে আমার ভাগ্য নিয়ে আলোচনা করব।’

কিন্তু সে অধিকার তো আমাদের নেই জমিদারবাবু, বেহুলা বলল।

‘একথার অর্থ?’

‘আপনি এগ্রামে জ্যোতিষচর্চার অধিকার একমাত্র সত্যঠাকুরকেই দিয়েছেন।’

জমিদার হেসে বলল,’ তুমি অত্যন্ত বুদ্ধিমতী মেয়ে।’ তারপর বলল, ঠিক আছে আজ থেকে অন্য জ্যোতিষীরাও এগ্রামে জ্যোতিষচর্চা করতে পারবে। এবার খুশি তো?’

বেহুলা মুচকি হেসে মাথা নাড়লো।

‘কাছে এসো।’

বেহুলা পায়ে পায়ে সসঙ্কোচে জমিদারবাবুর দিকে এগিয়ে গেল। জমিদার এবার উঠে দাঁড়িয়ে মসলিনের উত্তরীয় গলা থেকে খুলে বেহুলাকে পরিয়ে দিয়ে বলল, ‘এটা তোমার পুরস্কার। আমি যোগ্যতার সম্মান করি।’

জমিদার বেহুলাকে উত্তরীয় পরাবার সময় বেহুলা সত্যঠাকুরের দু’চোখে ঈর্ষামিশ্রিত ক্রোধ দেখতে পেল। কিন্তু বেহুলার নারীপ্রবৃত্তি কাঁধে একটু অস্বস্তিকর স্পর্শের সন্দেহে বেহুলাকে সাবধান করে দিল। জমিদারবাবু বলল, ‘এই শ্বেত উত্তরীয়তে একে ভালো মানিয়েছে।’ বেহুলা তার অন্তরের সাবধানতাকে অগ্রাহ্য করে বলল, ‘জমিদারবাবু, আমায় যদি কৃপাপরবশ হয়ে ওই পুঁথি দেখার সুযোগ করে দেন, তবে আমি খনা সম্বন্ধে—’

‘পুঁথি এই বাড়ি থেকে আর কখনো বাইরে যাবে না, এ আমি গ্রামবাসীদের সামনে সত্যঠাকুরকে কথা দিয়েছি। তবে তোমার যদি ইচ্ছা হয় তুমি এখানে এসে পুঁথি পড়ে যেতে পার। দেওয়ানজী তোমার জন্য পুঁথি কাছারিবাড়িতে এনে রাখবেন। তুমি যতক্ষণ চাও অধ্যয়ন করতে পার। আশাকরি, সত্যঠাকুরের তাতে কোনো আপত্তি হবে না।’ জমিদার সত্যঠাকুরের দিকে তাকাল। সত্যঠাকুর কথা না বলে শুধু মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে বোঝাল যে সে উপরোধে ঢেঁকি গিলছে। জমিদার বেহুলাকে বলল, ‘আমি মাঝে মাঝে আসব গ্রামে। আমি এলে তোমায় ডেকে পাঠাব। তোমায় শহরেও নিয়ে যাব। ইংরেজদের দেখাতে চাই আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্য। তোমার অনেক সাহায্য দরকার পড়বে আমার।’

বেহুলা যেন পালাতে পারলে বাঁচে। জমিদারকে হাত জোড় করে নমস্কার করে বচনপিসির সঙ্গে দেউড়ি পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কাপাসডাঙার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বচনপিসি বেহুলাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘তুই হাত দেখতে জানিস নে?’

‘জানি,’ বেহুলা বলল। ‘শুধু হাত কেন আমি ললাটলিখনও পড়তে জানি। মানুষের কপাল দেখেও মানুষের চরিত্র সম্বন্ধে বলতে পারি।’

‘তবে জমিদারবাবুর কাছে মিছে কথা বললি যে?’

লোকটা ভালো না। ও আমার শরীর ছোঁওয়ার জন্য হাত দেখাচ্ছিল। কিন্তু লোকটা হারবে না কিছুতেই। সেই শরীর ছুঁলই।’

‘ঠিক ধরেছিস তুই। লোকটা খুব খারাপ। আমাদের ডিঙাডুবির এই জলা- বাদাড়ে শ’য়ে শ’য়ে পাখি আসে। ঢাটাং, বাঁশকুরাল, গাড়াপোলা, শ্যামখোল, কুকরোবাটা—এরা জলে সারাদিন ধরে ছোট ছোট মাছ শিকার করে। দেওয়ান, গোমস্তা এরা সব হল সেরকম মাছখেকো পাখি। গ্রামে থেকে আশেপাশের মানুষকে ঠোকরাবার তালে সারাদিন ফন্দি ভেজে চলে। আর জমিদার গোপীচরণ মল্লিক হল পাখির রাজা ভীমবাজ। বহুদূর থেকে নজর রাখে জলাশয়ে। রূপোলী বড় শিকার দেখলে ঝাপটা দিয়ে নেমে আসে। অব্যর্থ লক্ষ্য। ছোঁ মেরে শিকার তুলে নিয়ে তাকে নিজের পছন্দ মতো জায়গায় ভক্ষণ করে।’

বেহুলা বিস্মিত দৃষ্টিতে বচনপিসির দিকে তাকাল।

‘ওই যে জটা পাগলা? ও সারাদিন নদীর পাড়ে মাটি কাটে কেন জানিস?’

‘চাঁদ সদাগরের ধনের লোভে।’

‘জটার সুন্দরী মেয়েটা ছিল এই কাদাজলে রূপোলী মাছ। ঠিক নজর পড়ল জমিদারের। বিদ্যেধরীতে চান করতে গেছিল। ছোঁ মেরে তুলে নিল নিজের বজরাতে। রটে গেল কুমির নাকি টেনে নিয়ে গেছে মেয়েটাকে।’

‘আর পাওয়া গেল না?’

‘শকুন-বাজ এরা শিকারের এতটুকু ফেলে রাখে না। কেউ জানতেই পারতো না যদি না কানু লেঠেল উর্দুরীতে মরার আগে প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য জটাকে কানে কানে বলে যেত মেয়েটাকে অত্যাচার করে তারপর খাতে পুঁতে তার ওপর উলটো ডিঙি চাপা দিয়ে দিয়েছে গোপীচরণ মল্লিক। এখন এত বড় খাত। কোথায় সেই মেয়ে? জটা তাই মাটি খুঁড়েই চলে। ওসব থাক। কপাল দেখে তুইও দাদার মতো মানুষ বুঝতে পারিস?’

‘হ্যাঁ,’ বেহুলা বলল। ‘ললাটক্ষেত্রে মানুষের মনের ছবি আরশির মতো ভেসে ওঠে। জমিদারবাবুর ললাটে উঁচুনীচু অর্ধচন্দ্র। এই ধরণের মানুষ প্রতারক, প্রবঞ্চক, উচ্চাভিলাষী হয়। এরা লোকের কাছে বিনয়নম্র আর সদালাপী হয়। লোকটার কপালের নীচের দিকে মাংসল, দুই চোখের পাতা নীচের দিকে অবনত হয়ে থাকে এই ধরণের লোকেরা বিশ্বাসঘাতক, নিষ্ঠুর আর অতিশয় নির্দয় হয়।

‘একদম ঠিক বলেছিস রে বেহুলা। জমিদার লোকটা নাকি নিদয়, মিথ্যাবাদী, অনেকের সঙ্গে প্রবঞ্চনা করেছে। কোনো কারণে কোনো প্রজার ওপরে কুপিত হলে ওই প্রজাকে সর্বস্বান্ত করে ছাড়ে।’

‘উটের কুঁজের মতো বক্র হয়ে উঠেছে জমিদারবাবুর কপালের বৃহস্পতিরেখার মধ্যভাগ। এ মানুষের ধনসম্পত্তি প্রচুর কিন্তু এই ধনলাভ সদুপায়ে হয়নি, প্রবঞ্চনা করে বা বলপ্রয়োগ করে ওই ধনলাভ হয়েছে।’

‘লোকটা ডাকাত পোষে। কিন্তু এত প্রবঞ্চক যে নিজের পোষ্য বজ্র ডাকাতকে নাকি ওই ধরিয়ে দিয়েছে। জমিদারের ওই দেওয়ানটাও কিন্তু মহা ফেরেববাজ।’

‘দেওয়ানটা তো মাথায় পাগড়ি পরে ‘ঙ’ হয়ে কপাল ঢেকে দাঁড়িয়েছিল, তাই বুঝতে পারিনি। আরেকদিন লক্ষ করতে হবে।

‘কীভাবে রেখা পড়িস তুই?’

‘খুব সহজ। তোমায় শিখিয়ে দেব

কপালে প্রথমে দেখি উঁচুতে বৃহস্পতি রেখা, তার নীচে মঙ্গল রেখা, তারপর সূর্য, তার নীচে শুক্র, ষষ্ঠ রেখা হল বুধ, আর—’

‘থাক থাক। আমার খেয়ে দেয়ে কাজ নেই এই বুড়ি বয়সে ললাটলিখন শিখতে বসব? তালপুকুরে খাবি খায়, সমুদ্র পার হতে চায়। চল পা চালা,’ বচনপিসি বলল।

দু’জনে কথা বলতে বলতে কাপাসডাঙার মাঠে চলে এল। ঝাঁকড়া অশ্বথ গাছের নীচে জটা পাগলা দু-পা ছড়িয়ে নিরাশ হয়ে বসেছিল। সুবল স্যাকরা তোরঙ্গ থেকে সোনা-রূপোর বদলে পুঁথি বের করে জটার সমস্ত উৎসাহে জল ঢেলে দিয়েছে। বচনপিসি বলল, ‘জটা কিছু খেয়েছ?’

জটা রুষ্টস্বরে বলল, ‘হ্যাঁ, হাওয়া খেয়েছি।’

‘তোমায় কিছু পুরস্কার দিল না জমিদার?’

‘জমিদার ভেবেছিল মাটির নীচে ওটা পাতালপুরীর গুপ্তধন, কিন্তু পেয়েছে আদাড়ের কচু। আমার কথা ভাবতে ওদের বয়েই গেছে,’ জটা ঠোঁট উল্টালো।

‘কচুই বটে,’ বচনপিসি মন্তব্য করল। ‘জিভে তুলতেই সত্যঠাকুরের গলায় কুটকুট করতে লাগল।’

বেহুলা জটার কাছে এসে মাটিতে বসল। কোঁচড় থেকে বের করল একমুঠ বাতাসা। ‘খেয়ে নিও,’ বেহুলা উঠে দাঁড়াল। ‘তোমার গামছা একদম ছিঁড়ে গেছে জটাকাকা, ধুতিটা এবার ছিঁড়বে। আমি তোমার জন্য হাট থেকে কিনে আনব।’

জটার মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। বাতাসা চিবোতে চিবোতে বলল, ‘তুই বড় ভালো মেয়ে রে। তুই কী সুন্দর দেখতে রে! ঠিক যেন পরী। আমার মেয়েটাও ঠিক তোর মতো সুন্দর ছিল রে। আর ঠিক এমন ভালো মন। ওকে বাঁচাতে পারিনি, কিন্তু কারুকে তোর কোনো ক্ষতি আমি করতে দেব না দেখিস। তোরা এবার বাড়ি যা। গণকঠাকুর একলা আছে।’

বেহুলা বাড়ির দিকে রওনা দিল। পথে যেতে যেতে বচনপিসি বলল, ‘ওই জমিদার, দেওয়ান, আর সত্যঠাকুর এই তিন মূর্তির থেকে শত হস্ত দূরে থাকবি বেহুলা। ওরাই আসল কচু। যতই চিনির রসে ফেলে রাখ, জিভে ঠেকালেই গলা চুলকাবে। কথায় বলে ওল, মূখী, মান—তিনই সমান।’

.

সত্যাচার্য অপমানে লাল। বেহুলা চলে যেতে ও বলল, ‘জমিদারবাবু, আমার গণনায় যদি আপনি বিশ্বাস রাখেন, তবে আপনি এই নারীকে সর্বৈবভাবে এড়িয়ে চলুন। এ আপনার পতনের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বরাহমুনি বলেছেন, যে রমণীর নেত্র পিঙ্গলবর্ণা এবং চঞ্চল এবং সামান্য হাস্যকালেও গণ্ডদ্বয়ে কূপ হয়, সেই রমণী নিশ্চয়ই বন্ধকী। তাকে এড়িয়ে চলবেন।’

‘বন্ধকী?’ দেওয়ান দুর্লভচাঁদ পুঁথির ভাষায় বিজ্ঞ না, কিন্তু তার মনে হলো এই কেচ্ছার ব্যাপারটা জেনে নিলে মন্দ হয় না।

‘বেশ্যা,’ সত্যঠাকুর বলল। ‘এই মেয়ে এত পুরুষের সম্মুখে কীভাবে নিজেকে প্রকাশ করল! আর তাছাড়া এর গুহ্যস্থান বামাবর্ত—সত্যঠাকুর উত্তেজনা প্রশমন করতে অক্ষম ‘এই মেয়ের ললাটে বুধের ক্ষেত্রে তিনটির অধিক রেখা।’ সত্যঠাকুর থামল।

‘তার অর্থ?’ জমিদার গড়গড়া টানতে টানতে অন্যমনস্ক হয়ে বলল। ওর মনের চিত্রপটে এক চিত্রকর সেই নারীর মোহিনী রূপ এঁকে দিয়ে গেছে।

‘সেই নারী অসতী, ডাকিনী, মুখরা হয়। একে এড়িয়ে চলাই কাম্য।’

জমিদার ক্লান্ত। অন্যমনস্ক বিরক্ত কণ্ঠে বলল—‘ঠাকুরমশাই, আপনি ক্লান্ত। আপনি এবার বাড়ি যান। আমি দেওয়ানজীর সঙ্গে জমিদারি বিষয় আশয় নিয়ে কিছু আলোচনা করে ফিরে যাব।’

ক্লান্ত সত্যাচার্য জমিদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিজের ভিটের দিকে ধীরপদে অগ্রসর হল। মন অপ্রসন্ন। যে কার্যের জন্য সে ডিঙাডুবিতে এসেছে, সেই কার্য কিছুতেই সার্থক হচ্ছে না। সুযোগ বুঝে এই খনাবাক্যের পুঁথি না জ্বালালে মনে শান্তি নেই। তবু একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত যে এই পুঁথি আর কখনো বাইরের সূর্যের আলো দেখবে না সে আশ্বাস সে আদায় করে নিয়েছে। কিন্তু আসল কাজ খনার মন্দির মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া। তাহলে তার বনবাস শেষ হবে। সে তখন নিশ্চিন্তে বারাণসীতে ফিরে যেতে পারবে।

কিন্তু মেয়েটির কাছে পরাজয় তার মনে কাঁটার মতো খচখচ করে বিধতে লাগল। জমিদার বেহুলাকে উত্তরীয় দিলেন! তার সামনে! এ তার শিক্ষার পরাজয় নয় কি? সত্যাচার্য শুধু ভাবতে লাগল ভগবান বরাহমিহির হলে কী এই পরাজয়কে মেনে নিতেন? একজন সামানা বালিকার কাছে পরাজয়! ছিঃ! নিজেকে বারবার ধিক্কার দিতে লাগল সত্যাচার্য।

বেলেঘাটা ফেরার সময় গোপীচরণ মল্লিক ভাবতে লাগল ওই মেয়েটা সতাঠাকুরকে থামিয়ে দিল! মেয়েটার তেজ আছে খুব। মেয়েটা সুন্দরী, আর শরীরের ভাঁজে ভাঁজে অদম্য যৌবনের আকর্ষণ। ওর চাঁপাকলির মতো আঙ্গুলের স্পর্শে যে কোনো পুরুষের শরীরে কামাগ্নি জ্বালিয়ে দেবে। কিন্তু মেয়েটার এই অজ গ্রামে জ্যোতিষ-ট্যোতিষ নিয়ে থাকাটা প্রকৃতির এক অন্যায় অপচয়। এই শরীরে বারাঙ্গনাদের বস্ত্র আর অলংকার চড়লেই এর সত্যিকারের রূপ ফেটে পড়বে। গোপীচরণ মল্লিক গুণী জহুরী, খাঁটি রত্ন এক নজর দেখেই চিনতে পারে। এরকম অপরূপা নিতম্বিনী সুন্দরী লাস্যময়ীর স্থান হওয়া উচিত নবাবদের হারেমে। নতুবা কমলাবাঈয়ের কোঠাতে। গোপীচরণ মল্লিক মনে মনে হিসেব কষতে লাগল এই কামিনীর বিনিময়ে কত কাঞ্চন আদায় করা উচিত। নাকি তার নিজের বেলেঘাটার জলটুঙ্গির খাঁচায় এই ময়না পাখিকে পুষে রেখে মাঝে মাঝে ফূর্তির রাতে জ্যোতিষের ভোজবাজী দেখিয়ে গোরা সাহেবদের তাক লাগিয়ে দেবে?

আজ মেয়েটার সামনে গোপীচরণ হামাগুড়ি দিয়েছে, কিন্তু ও মেয়ে জানেনা ক্ষুধার্ত বাঘ তার শিকারের ওপর লাফ দেওয়ার আগে হামাগুড়ি দেয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *