।। পঁয়তাল্লিশ।।
সকাল থেকে নদীর পাড়ে আঘাটায় এক নির্জন স্থানে একটা বড় পাথরের ওপর অনেকক্ষণ একলা বসে জলের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবছিল ডেভিড। এই মেয়ে বিক্রি তাহলে জমিদার গোপীচরণের ব্যবসা! আর সেই গোপীচরণের দেওয়া সিক্কা টাকা আমি নিচ্ছি! এই মেয়ে-বিক্রির টাকা থেকে আসছে আমার মুক্তিপণ? ছিঃ! ডেভিড একটা নুড়ি সজোরে নদীর জলে ছুঁড়ল। নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছা করছে ডেভিডের। কলকাতায় সেদিন রাতে সেও যদি সেই অসহায় মেয়েটাকে ওই নরখাদকের হাতে ছেড়ে দিত, তাহলে তো এসবের দরকারই পড়ত না। বেহুলাকে জমিদারের হাতে তুলে দিলে জমিদার ওকেও বিক্রি করে দেবে কোথাও। কিন্তু এই জমিদারগুলো এত মেরুদণ্ডহীন, নির্বীজ! আর একে ও দয়ালু ভেবেছিল! ডেভিডের চোয়াল দৃঢ় হয়ে গেল। এখন ও কী করবে? যদি ব্যর্থ হয়ে ফোর্ট উইলিয়ামে ফিরে যায় তাহলে ওর কপালে যথেষ্ট দুর্ভোগ আছে, আর বেহুলাকেও তাহলে সম্ভবত রক্ষা করা যাবে না। আর অন্য পথ হল বেহুলাকে জমিদারের হাতে তুলে দেওয়া। যে বেহুলা তাকে নিশ্চিত মৃত্যুর থেকে বাঁচাবার জন্য নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সাপের ছোবলের সামনে এসেছে, তার সে এত বড় ক্ষতি করবে? অসম্ভব। বেহুলা রূপে গুণে অতুলনীয়া। বেহুলার চাপা দিয়ে রাখা শরীরের আকর্ষণ যে কোনো পুরুষকে মাতাল বানিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখে, কিন্তু বেহুলার কথা মনে পড়লেই প্রথমে ডেভিডের মনে বেহুলার শরীর আসে না। আসে বেহুলার দু’চোখের চাহনি। এক পৃথিবী ভালোবাসা মাখা চাহনি। মেয়েটা এমন সুন্দরভাবে তাকায় যে ডেভিডের মনে হয় সে এক আনন্দের বৃষ্টিতে ভিজছে। তৃষ্ণার্ত চাতকের মত ডেভিডের মন চায় সেই বৃষ্টিস্নান যেন কখনো শেষ না হয়।
কে ভালো কে খারাপ তা বুঝতে ওর বিলম্ব হয়েছে, কিন্তু এখন ডেভিড জানে ওর কী করা উচিত। কিন্তু কীভাবে সে বেহুলাকে রক্ষা করবে সেটা খুব ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে হবে।
দুপুরে বেহুলার জ্যোতিষ-মন্দিরে এল ডেভিড। বেহুলার শান্ত দৃষ্টি দেখে ডেভিডের মন থেকে আবার সমস্ত বিষাদ যেন দূর হয়ে গেল। এই মেয়েটা যেন বুনোফুলের সুবাস যার আঘ্রাণ দূর থেকেই সারা শরীর অবশ করে দেয়। ডেভিড কাজের কথাটা বলল ‘আর কক্ষনো ওই পর্তুগিজ কেল্লার কাছাকাছি যেও না বেহুলা।’
‘কাল যা দেখলাম তা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, সাহেব,’ বেহুলা বলল।
‘জানো বেহুলা, লণ্ডনে কয়েক মাস আগে নালিশ গেছে যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কিছু বড় অফিসার এদেশে দাস ব্যবসা করে অর্থ উপার্জন করছে। আমাদের কাছে প্রচুর তথ্য জমা হয়েছে। দাস ব্যবসা বাংলার সর্বত্র চলে, কিন্তু এত গোপনে হয় কেউ টেরটি পায় না। সকলে ভালোমানুষের মুখোশ পরে আছে। কিন্তু মুখোশের নীচে শয়তান।’
‘তুমি কীভাবে জানলে সাহেব?’
‘গতমাসে শ্রীহট্টে দুটো মেয়েকে ব্যবসায়ীরা চালান দিল নদীয়ায়। বলল ব্রাহ্মণ, আসলে কৈবর্ত। তাতে ক্রেতা বিক্রেতার মধ্যে খুব কলহ হল। প্রায় খুনোখুনি হবার উপক্রম। নিজেদের মধ্যেকার এই ঝগড়াঝাঁটি থেকেই এসব খবর বাইরে বেরিয়ে আসে। জমিদার গোপীচরণ মল্লিক আর দেওয়ান দুর্লভচাঁদ এই গ্রামে এরকম মেয়ে বিক্রির খোঁয়াড় বানিয়েছে ওই পর্তুগিজ কেল্লায়।
‘কিন্তু শুধু মেয়ে কেন?’
‘ছেলেদের বেচে যা পাওয়া যায় মেয়েদের তার তিনগুণ দাম পাওয়া যায়। পঞ্চাশ থেকে শুরু করে শুনেছি একশো পঁচিশ টাকা পর্যন্ত দাম ওঠে।’
‘মোগল বাদশারা এদের শাস্তি দেয় না?’
‘মোগল বাদশা! হুঃ! দাস ব্যবসা থেকে মোগল বাদশাদের কত উপার্জন জানো?’ ডেভিড বলল। ‘ডাচরা মোগলদের সঙ্গে একটা চুক্তি করেছে। ডাচ কোম্পানি প্রত্যেক ‘মুর’ বা ভারতীয় ক্রীতদাসকে বিদেশে রপ্তানি করার জন্য মোগলদের বারো শতাংশ কর দেয়।’
‘কী বলছ সাহেব?’ বেহুলা স্তম্ভিত।
‘এই কিছুদিন আগে একটা ফরাসি জাহাজ সতেরজন মেয়েকে কলকাতা থেকে পণ্ডিচেরি পাচার করে। এদের বয়স সাত থেকে সতের। ভাবা যায়?’
বেহুলার মুখে কথা সরে না। এসব নোংরা কাজ যে হয় সেটা ও বিশ্বাসই করতে পারছে না। ‘এখন তুমি কী করতে চাও সাহেব?’
‘আমি পর্তুগিজ কেল্লার এই মেয়েগুলোকে বাঁচাতে চাই।’
‘কিন্তু কীভাবে? এর সঙ্গে গ্রামের দেওয়ান যুক্ত। ও জানতে পারলে ওর লেঠেলরা তোমায় তো মেরে ফেলবে!’ বেহুলা উদ্বিগ্ন I
‘সেটা আমি জানি। দেখি আমি কী করতে পারি। তবে আমি রবিন সাহেবকে সব জানাব। ফোর্ট উইলিয়ামে খবর দেব। আর লণ্ডনে আমাদের কোম্পানির কাছে খবর পাঠাব,’ ডেভিড উঠল। ‘আমি আমার খানসামার হাতে পত্র পাঠাব রবিন সাহেবের জন্য। ও কাল ফোর্ট উইলিয়াম যাবে। আজ আসি বেহুলা। টুমি সাবধানে থেকো।’
সাহেব চলে যাচ্ছিল। বেহুলা সাহেবের গমন পথের দিকে চেয়ে রইল। ডেভিড সাহেবের মধ্যে দ্বৈতসত্তা মিলেমিশে আছে। একদিকে লোকটা সিংহপ্রতিম নির্ভীক, কঠোর স্বভাববিশিষ্ট, অন্যদিকে হৃদয় যেন ফুলের মতো কোমল। ডেভিড সাহেবকে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না বেহুলা, কিন্তু এই ক’দিনের মেলামেশায় তার মনে এই প্রতীতি জন্মেছে যে এই মানুষটাকে নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করা যায়। বেহুলা বুঝতে পারল তার অজান্তে কখন যেন তার মনে এই মানুষটার জন্য তীব্র অনুরাগ সৃষ্টি হয়ে গেছে। সে এখন তার নিজের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে। সে ডেভিড সাহেবকে ভালোবেসে ফেলেছে। বেহুলা ডাকল—‘সাহেব।’
ডেভিড ফিরে এল—‘কী হল?’
‘কিছু না,’ বেহুলার ঠোঁটে দুষ্টুমির হাসি।
‘টুমি কিছু বলতে গিয়েও বলছ না,’ সাহেব ভ্রূ কুঁচকে বলল।
‘হ্যাঁ।’
‘কী বলবে ভাবছিলে?’
‘টুমি না বলে বল তুমি,’ বেহুলার ঠোঁটে হাসি রয়ে গেছে।
‘টুমি।’
‘তুমি—তু-উ-মি।’
‘তুমি।
‘এবার হয়েছে,’ বেহুলা বলল। ‘যাও এবার বাড়ি যাও।’
সাহেব গোলগোল চোখে বেহুলার দিকে তাকিয়ে বাড়ির পথ ধরল আর বিড়বিড় করে অনুশীলন করতে লাগল—তু-উ-মি, তু-উ-মি। তুমি।
