।। একচল্লিশ।।
গণকঠাকুর সঙ্গে সঙ্গে পিছন ফিরে নেমে দ্রুতপায়ে তার ঘরের দিকে চলে গেল। বেহুলা লজ্জায় মাটিতে মিশে যাচ্ছিল। ছিঃ ছিঃ, গণককাকা কী ভাবল? ডেভিড সাহেব বুঝতে পেরেছে কী অঘটন ঘটে গেল। তাড়াতাড়ি গণককাকার পিরান পরে নিল। গণককাকার পিরান সাহেবের শরীরে এঁটে বসেছে, উদ্বেগে কষ্টেসৃষ্টে তাই শরীরে ধারণ করেছে সাহেব।
সাহেবের ভেজা জামা প্যান্ট হাতে নিয়ে এক মুহূর্ত কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল বেহুলা। এগুলো উনানের ওপরের বাতায় মেলতে হবে শুকানোর জন্য, কিন্তু বেহুলার শরীরে শক্তি নেই গণককাকার মুখোমুখি হওয়ার
এ সময় বচনপিসি বেহুলার উদ্ধারকর্তা হয়ে জ্যোতিষ-মন্দিরের দরজায় এসে দাঁড়াল—‘দাদা বলছে সাহেব একদম ভিজে গেছে,’ তারপর বেহুলার হাতে দলা করা জামা কাপড়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যা এগুলো আঁচঘরের উনুনের ওপরের আড়ায় মেলে দে। উনুনে দুটো কাঠ গুঁজে দিস। আমি ততক্ষণ সাহেবের সঙ্গে কথা বলি।’
বচনপিসি জ্যোতিষ-মন্দিরের কোণে রাখা চরকার দিকে এগিয়ে গেল। বেহুলা রান্নাঘরে গিয়ে উনানে কাঠ গুঁজে আগুন খুঁচিয়ে বাড়িয়ে দিল, উনানের ওপরের চালের বাতায় সাহেবের জামা-প্যান্ট মেলে দিল। জুতা শুকোনোর উপায় নেই, ওটা রান্নাঘরে আনা যাবে না। তাই জুতো আনেনি বেহুলা।
জামাকাপড় মেলে দেবার পর উনানের সামনে উবু হয়ে বসে রইল বেহুলা—ছিঃ ছিঃ! গণককাকা কী ভাবল? আগুনে কাঠ চড়চড় করে পুড়ছে, বেহুলা আগুনের দিকে অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল।
জ্যোতিষ-মন্দিরে ফিরে এল বেহুলা। ঢুকতে ঢুকতে বেহুলা শুনল বচনপিসির গলা, ‘সাহেব তুমি একদম অগা, তোমার দ্বারা হবে না।’ ভিতরে ঢুকে বেহুলা দেখে ডেভিড সাহেব মাদুরে আসনপিঁড়ি হয়ে বসে। বচনপিসি ডেভিড সাহেবকে চরকা থেকে সুতো বানানো শেখাচ্ছে। ডেভিড সাহেব মনোযোগী ছাত্রের মতো বচনপিসির হাতের কাজ দেখে আবার নিজে চেষ্টা করল চরকা ঘুরিয়ে সুতো কাটতে, কিন্তু সুতো ছিঁড়ে যেতে লাগল। যতবার সুতো ছিঁড়ে যায় ডেভিড সাহেব তত জেদ নিয়ে আবার সুতো কাটতে যায়, কিন্তু আবার সুতো ছিঁড়ে যায়। এবার বচনপিসি স্নেহসিক্ত কণ্ঠে বলল, ‘সুতো কাটুনি, চরকা মেয়েদের হাতে ভালো হয়। শান্ত স্বভাব আর ধৈর্য দরকার। পুরুষ মানুষের এত ধৈর্য কোথায়?’
বাঙালির পোশাকে সাহেবকে চরকা কাটতে দেখে বেহুলার মনে হলো এ মানুষটা তাদের খুব আপনজন। আর বচনপিসিও অনেকদিন পর সুবোধ ছাত্র পেয়ে জ্ঞান দিয়ে চলেছে—‘এই কাজে শরীরের শক্তি খুব অল্পই দরকার। আমাদের বাংলার মেয়েদের দুর্বল হাতের চামড়ায় স্পর্শের ক্ষমতা খুব বেশি। দু’আঙুলের ফাঁকে সুতো যখন চলে তখন সুতো এতটুকু মোটা বা ভারি হলেই মেয়েরা তা অনুভব করতে পারে। এটা ছেলেদের কম্মো নয়। হাজার বছর ধরে চরকা চালিয়ে চালিয়ে বাঙালি তাঁতি সুতো কাটুনি মেয়েদের এই কৌশল মজ্জাগত হয়েছে। আর সেজন্যই বাঙালি মলবুস খাসের জন্য এত মিহি সুতো তৈরি করতে পারে।’
‘ঠিক বলেছ পিসি,’ সাহেব লক্ষ করেছে বেহুলা বচনপিসিকে পিসি ডাকে। তাই সেও পিসি ডাকা শুরু করেছে। ‘চরকাকাটুনি সব দেশেই ছিল। মেয়েরাই সুতো কাটে ভালো। ইংলন্ডে মানে আমাদের দেশেও কুমারী মেয়েরাই চরকা স্পিন করে সুতো কাটিত। স্পিন থেকেই তো আমাদের দেশের কুমারী মেয়েদের স্পিনিস্টার বলে।’ সাহেব বেহুলা আর পিসির চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝল ওরা কিছুই বুঝল না। সাহেব তখন সেসব ঝেড়ে ফেলে বলল, ‘চরকা এত জনপ্রিয় যে তোমাদের এখানে শুনিয়াছি লোকে বলে চাঁদেও নাকি একটা বুড়ি চরকা কাটে,’ সাহেব হা হা করে হেসে ফেলল। সেই হাসি দেখে বেহুলার মনে হলো এই মানুষটা নিষ্পাপ, তা না হলে এত বড় ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরেও এরকম হেসে গল্প জমাতে পারে? সাহেব বলল, ‘এসব তো গল্পকথা তোমাদের সুতোর গল্প আমরা শৈশব থেকে শুনিয়াছি আমাদের দেশের নাবিকদের থেকে। মলবুস খাসের রূপকথা আমি কত শুনিয়াছি। এসব গল্প সত্যি বলে মনে হতো। শাঁখের ভিতর বিশ হাত শাড়ি, বিশ্বাসই হয় না।’
‘একটু বোসো,’ বেহুলা জ্যোতিষ-মন্দির থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে গেল, সেখান থেকে নিয়ে এল বাঁশের ছোট চোঙটা। তারপর আঙ্গুল ঢুকিয়ে বের করে ছড়িয়ে দিল মন্দিরের মেঝেতে রূপকথার শাড়ি মলবুস খাস—‘আমার বিয়েতে আমাকে আমার স্বামী উপহার দিয়েছিল। ও নিজে বুনেছিল এই মলবুস খাস।’
মলবুস খাস হাতে নিয়ে ডেভিড সাহেব হতভম্ব। ‘মাই গুডনেস! এ কাপড় ম্যাঞ্চেস্টারের বাজারে হৈ চৈ ফেলে দেবে,’ সাহেব উত্তেজিত। ‘তুমি কি আমাকে এই মলবুস খাস কাপড়টি দিতে পারিবে? ইংলন্ডে ফিরে গিয়ে ওখানকার এক্সিবিশনে আমি মলবুস খাস দেখাব। দেখাব তোমাদের তাঁতিদের হাতের ম্যাজিক।’
বেহুলার বারবার মনে হচ্ছিল যে গণককাকা ব্যাপারটাকে সুনজরে দেখল না। মনে অস্থিরতা। সাহেব বোধহয় বুঝতে পারল বেহুলার মানসিক দ্বন্দ্ব। সাহেব বলল—‘আমার একটি দরকারি কাজ মনে পড়ে গেল। আমাকে এখনি যেতে হইবে। আমার জামা কাপড় নিয়ে আসিবে? আমি ভেজা কাপড়ে অনভ্যস্ত নই।’
সাহেব এরপর তাড়াতাড়িই ফিরে গেল। সাহেব চলে যাওয়ার পর বচনপিসি বিকেলে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলল, ‘সাহেবের সঙ্গে এভাবে মেলামেশা দাদা পছন্দ করছে না। বলছে সাহেব ম্লেচ্ছ। একজন ম্লেচ্ছকে জ্যোতিষ শেখাবার কী হয়েছে?’
বেহুলা বলল, ‘বরাহমিহির যে পাঁচখানি সিদ্ধান্তের আশ্রয় করে পঞ্চসিদ্ধান্তিকা রচনা করেছিলেন তার দুটো হল যবন বা ম্লেছদের লেখা। পৌলিশ আর রোমক। উনি নিজেই বলেছিলেন যবনদের সিদ্ধান্তকে সম্মান করতে। আর এই যবন আমাকে খনার পুঁথি এনে দিয়েছে, একে খাতির করব না তো কি যে ব্ৰাহ্মণ খনার পুঁথি পোড়াতে চায় তাকে সম্মান করব?’
‘আমার ভয় হয় দাদাই কখন রেগে গিয়ে ওকে বকাবকি না করে দেয়। আমি চাই না সাহেব দাদার কাছাকাছি আসুক। তুই সাহেবকে আমাদের এখানে আসতে বারণই করে দিস। আমি আমার দাদাকে খুব ভালো করে চিনি তাই তোকে সাবধান করে দিলাম।’
‘বেশ, আমি সাহেবকে বারণ করে দেব,’ বেহুলা রুষ্টস্বরে বলল।
বচনপিসি কোনো উত্তর দিল না।
সারাটা বিকেল বাইরের আকাশের ঘনঘটা বেহুলার মনের ভিতর জুড়ে রইল। কীভাবে সাহেবকে ও আসতে বারণ করবে? সাহেবের সঙ্গে ওর জীবন কিছুটা আনন্দে কাটছিল। তাও শেষ হয়ে গেল। রাতে বচনপিসি ফিসফিস করে বলল—‘বেহুলা ঘুমুলি?’
‘না।’
‘কী ভাবছিস?’
‘কিছু না।’
‘আমি জানি তুই কী ভাবছিস?’
‘কী?’
‘সাহেবের কথা। সাহেবকে কাল মানা করে দিবি, তাই তোর মন খারাপ। ‘তুমিও গণনা শিখে নিয়েছ নাকি? আমি কী ভাবছি তা এই অন্ধকার ঘরে শুয়ে শুয়ে তুমি বলে দিলে,’ বেহুলা একটু রুষ্টভাবে মৃদুস্বরে বলল।
বচনপিসি হাসল। ‘এর জন্য গণনার দরকার পড়ে না। মেয়েরা মেয়েদের মন পড়তে পারে। আমি একটা কথা বলি?’
‘বল।’
‘এই ডেভিড সাহেব ছেলেটা কিন্তু খুব ভালো। অন্য ফিরিঙ্গিদের মতো না। এর মধ্যে স্নেহ, মায়া, মমতা আছে।’
‘তাই! আমার তো তা মনে হয় না। বড্ড বেশি গম্ভীর।’
‘বেচারা মা-বাপ-পরিবার ছেড়ে এই জঙ্গলে এসে পড়ে রয়েছে। এদের ক কঠিন জীবন। কিন্তু শিশুর মতো হাসি।’
বেহুলা কথা বলল না।
‘দ্যাখ বেহুলা, তুই তোর গণককাকাকে সম্মান করে বললি যে তুই সাহেবকে কাল থেকে আসতে বারণ করে দিবি, এটা তোর উঁচু মনের পরিচয়। কিন্তু, তুই তো আঠারো বছরের একটা মেয়ে। তোর জীবনের সাধ আহ্লাদের এভাবে গলা টিপে ধরা কি এত সোজা?’
বেহুলা নিরুত্তর।
‘কী রে কোনো কিছুই যে বলছিস না! মুখে ওলপ এঁটেছিস নাকি?’
‘কী বলব, পিসি? আমি বিধবা। বিধবাদের আবার সাধ-আহ্লাদ কী!’
‘বাহ্, বিধবাদের সাধ-আহ্লাদ থাকবে না!’ পিসি অন্ধকারে উঠে বসল। ‘দাখ, দাদাও এটা বোঝে। কিন্তু সমাজের ভয় আছে। তাই দাদা এত কঠিন ব্যবহার করছে। আমি বলি কি, তুই সাহেবকে বারণ করিস না।’
‘বারণ করব না! তাহলে গণককাকার কথা ‘
‘সাহেব আমাদের ভিটেতে না এলেই তো হল। তুই চুপিচুপি বাইরে সাহেবের সঙ্গে দেখা কর।’
‘বাইরে? চুপিচুপি!’
‘দেখ বেহুলা, আমি জানি তোর মনে কোনো পাপ নেই। সমাজে অনেক ময়লা মনের লোকের বাস। তাদের শান্ত করার জন্য কেন নিজের আনন্দকে বলি দিবি? সমাজ তোকে তো পারলে সোয়ামীর চিতায় জ্বালিয়ে দিত। ঠিক কিনা?’
‘বাইরে তো আর খনাবাক্য নিয়ে লেখাপড়া করা যাবে না।’
‘শোন বেহুলা, আমি একটা ভালো জায়গা জানি। ওখানে কেউ যায় না। কেউ টেরও পাবে না। তোরাও শান্তিতে পড়াশোনা করতে পারবি।’
‘কোথায়?’
‘পর্তুগিজের কেল্লার ছাদে। আমাকে যখন বিয়ের জন্য লোকেরা একের পর এক দেখতে এসে মানা করে দিয়ে যেত, তখন আমার ভীষণ মন খারাপ হতো। আমি একছুটে পর্তুগিজ কেল্লার ছাদে গিয়ে একলা একলা কাঁদতাম। ঠাকুরকে বলতাম ঠাকুর আমার মুখের মায়ের দয়ার দাগের জন্য আমার কী অপরাধ?’ বচনপিসি মৌন হয়ে গেল। বোধহয় কান্নাটা অন্ধকারে লুকিয়ে ফেলল। তারপর শান্তভাবে বলল, ‘পর্তুগিজ কেল্লা জায়গাটা বেশ, জানিস। মন খুব ভালো হয়ে যায়।’
‘কেউ তোমার মনের ভিতরের সুন্দর দিকটা দেখল না পিসি?’
‘জানিস, আমার বাপের টোল ছিল। সত্মা আর সৎবোন নিয়ে পরিবার। সত্মা আমায় পড়াশোনা করায় নি, কিন্তু বোন যেত বাপের টোলে। বাপ আমার বিয়ে ঠিক করল। পাত্র টোলে অস্থিতপঞ্চক পর্যন্ত অঙ্ক কষা শিখেছে এবং মুগ্ধবোধ ব্যাকরণ পাঠ শেষ হলে নিজে টোল খুলবে এরকম ইচ্ছা। আমার বাবা সেই টোলের চারচালা বানিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আমি তো জানি না যে আমার মায়ের মনে কী অভিসন্ধি ছিল। ছেলে যেদিন আমায় দেখতে এল সেদিন আমার সৎমা আমার সৎবোনকে পাত্রপক্ষের কাছে এগিয়ে দিল। সে পাত্রপক্ষের সামনে টোলে শেখা এত ছড়া আর প্রবচন বলল যে পাত্র আমায় বলল তুমিও এরকম কিছু প্রবচন শোনাও। আমি কীভাবে বলব, আমি তো গো- মুখ্যু। আমি বললাম আমি পড়াশোনা শিখিনি। তখন আমার সৎবোন ছড়া কাটল—
পণ্ডিত বউ মূৰ্খ ঠুঁটো
কমণ্ডলুর তলায় ফুটো
ব্যাস, ছেলে বেঁকে বসল, তার মূর্খ মেয়ে চাই না। টুলো পণ্ডিতের মূর্খ স্ত্রী মানে কমণ্ডলুতে শতছিদ্র। কোনো মান মর্যাদা থাকে না। এদিকে পণ্ডিতের টোলের চারচালার লোভও আছে। অতএব, আমার বোনের সঙ্গেই সেই ছেলের বিয়ে পাকা হয়ে গেল। প্রত্যাখ্যানের বেদনায় আমি সারারাত চুপচাপ কাঁদলাম। সকাল হলে বাপকে আমি জেদ ধরে বললাম আমিও পুঁথি পড়ব। সৎমা এমন রেগে গেল—তাহলে ঘর ঝাঁট, রান্না, বাসন-কাপড় ধোওয়া এসব কে করবে? বাপ প্রতিবাদ করতে পারল না। তারপর হল আমার এই মায়ের দয়া। বসন্তের গুটি মুখে এমন হেগে গেল যে এই কুৎসিত মুখের বৌ কেউ চায় না। বাপও তখন অরক্ষণীয়া মেয়েকে সহ্য করতে পারত না। একা একা কাঁদতাম। আমার তখন মনে জেদ চেপে গেছে আমি পুঁথি পড়বই। একদিন বোনের পুঁথি নিয়ে খেয়ায় উঠে বসলাম। নামলুম এই কাপাসডাঙায়। কাপাসডাঙায় তখন প্রচুর তাঁতির বাসা। প্রচুর পোয়াতি। সুরমা দাই তখন হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। আমাকে ও আশ্রয় দিল। দাইয়ের কাজ শিখে নিলাম। সুরমা দাই কিছু লেখাপড়া জানতো। যে ছড়া প্রবচনের জন্য আমার বিয়ে ভেঙে গেল, সেই প্রবচন শিখতে শুরু করলাম সুরমা দাইয়ের কাছে। রোজ। মনে হতো এই প্রবচন আমার শত্তুর, একে আমি জয় করে ফেলব। তারপর এমন শিখে ফেললাম যে লোকে আমায় প্রবচনী দাই বলে ডাকত। বাপের দেওয়া নামটা মুছেই গেল। প্রথমে সুরমা দাই, তারপর তোর গণককাকা আমার বিয়ের জন্য অনেক চেষ্টা করল, কিন্তু এই পোড়ামুখ দেখে কেউ রাজিই হয় না। এত প্রবচন শিখলাম, কিন্তু শোনাবার সুযোগই পেলাম না।’
‘তোমার মন এত সুন্দর। যারা এটা চায় না, তাদের বিয়ে না করাই ভালো।’
‘ঠিক বলছিস। আমার কথা থাক। তুই একদিন তো সাহেবকে নিয়ে যা।’
‘কোথায়?’
‘এই যে এতক্ষণ ধরে বকবক করলুম! পর্তুগিজ কেল্লায়!’
‘লোকে দেখে ফেললে?’
‘কেউ দেখতে পাবে না। আমি একটা পথ জানি। তুই সোজা পথে যাস না। কাপাসডাঙার মাঠের এ’পাশ দিয়ে জঙ্গলে ঢুকে যা। জিভকাটির জঙ্গলের ভিতর দিয়ে যে সুঁড়িপথটা পর্তুগিজ কেল্লার দিকে গেছে, ওদিকে কিছুদূর গিয়ে একটা খাত পাবি। খাতের গায়ে কাঁচা পথ আছে। সেই পথে যা, কেউ জানতেও পারবে না।’
‘বাপরে! এত কষ্ট করতে হবে সাহেবের সঙ্গে দেখা করার জন্য? আমি পারব না।’
‘খুব পারবি। নদীর পাড়ে মোহনবাঁশি, থাকবে ঘরে রাধা দাসী? শ্রীরাধা কত কষ্টই না করত কেষ্ট ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করার জন্য।’
‘সাহেব অন্য কিছু ভাবলে?’
‘সাহেব যদি অন্য কিছু ভাবেও, ছেলেটা খুব ভালো। আমি তোদের মতো কপালের রেখা পড়তে পারি না, কিন্তু মেয়েমানুষ তো, পুরুষের চোখের চাহনি পড়তে পারি। মানুষটা তোকে ভালোবেসে ফেলেছে।’
‘যাঃ কী যে বল, পিসি!’ বেহুলা লজ্জায় কুঁকড়ে গেল। ‘তোমার আফিমের নেশা আজ খুব চড়ে গেছে। এখন ঘুমোও তো।’
পিসি খুকখুক করে হেসে বলল ‘ওলো আমার কলমি লতা, জল শুকোলে রইবি কোথা। ঠিক আছে। আমি মনের কথা বলে হালকা হলাম। তবে আমি তোর মনের ব্যথা বুঝব না। বাঁজা কি প্রসব বেদনা বোঝে? এবার তুই কী করবি তা তোর বিচার।’ বচনপিসি শুয়ে পড়ে শরীরে কাঁথা টেনে নিল। আর কয়েক মুহূর্ত পরে অঘোরে ঘুমিয়ে নাক ডাকতে লাগল।
বেহুলা শুয়ে শুয়ে আকাশ পাতাল ভাবতে লাগল। তারপর মনে মনে একটা যুক্তি খাড়া করল সাহেবের খনার খাতাটা পেলে সে নিজে দেখে নেবে, কিন্তু সাহেবকে শেখাতে গেলে সাহেবের সঙ্গে রোজ দেখা হওয়াটা দরকার। বেহুলা স্থির করল সে সাহেবের সঙ্গে পর্তুগিজ কেল্লাতেই দেখা করবে।
.
পরদিন ডেভিড সাহেব এল পাখমারা গণকের চতুষ্পাঠীতে। মাদুরে বসে লাল খেরো খুলে খাতা বের করল। পরের পাতা বের করে ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে পড়ল—
ছোট চান্দা বড় চান্দা
কী হবে তোর দড়ি বান্ধা
বৃথা গেল সাপের ফনা
বাঁচল নকুল কহে খনা।।
বেহুলা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ডেভিড সাহেব বেহুলার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল– ‘কী ভাবছ বেহুলা? টুমি কি এর অর্থ বুঝিতে পারিতেছ না?’
‘আমার স্বামীর কথা মনে পড়ে গেল। তার সর্পাঘাতে মৃত্যু হয়েছিল।’
‘আশ্চর্য! তা সত্ত্বেও তোমার সাপের ওপর কোনো প্রতিহিংসা নেই! টুমি সেদিন আমায় জঙ্গলে সাপটাকে মারতে দিলে না?’
‘ওদের কী আর মানুষের মতো বুদ্ধিসুদ্ধি আছে। ভয় পেলেই ওরা ছোবল মারে। আমার স্বামীই হয়তো তুলোর বীজ বুনতে গিয়ে ওদের বাসায় হাত ঢুকিয়ে দিয়েছিল।’
বেহুলা হাঁটুতে চিবুক রেখে মৌনভাবে বসে রইল। ডেভিড সাহেবও বেহুলাকে প্রশ্ন করা সমীচীন বোধ না করে মৌন রইল। বেহুলা নীরবতা ভাঙল, ‘সাহেব, তুমি সেদিন হিন্দুদের কু-প্রথার কথা বলতে গিয়ে আমায় জিজ্ঞাসা করেছিলে আমি সতীদাহ কখনো দেখেছি কিনা, আমি সতীদাহের চিতা থেকে বেঁচে পালিয়ে এসেছি।’
‘রিয়্যালি! এই পরিবার তাহলে তোমার কাকার বাড়ি নয়?’
‘না সাহেব,’ বেহুলার মুখে করুণ হাসি। ‘এই বাড়ির ছেলে বিশ্বনাথ বহুরূপী আমায় করিমগঞ্জ থেকে বাঁচিয়ে এনেছে। এক মিথ্যা পরিচয়ে আমি এদের বাড়িতে আছি যাতে সমাজ আমার ওপর প্রশ্ন না তোলে। আমায় চিনতে পারলে ওরা জোর করে আমায় ফেরত নিয়ে গিয়ে চিতায় তুলে দেবে।’
‘কে সেই নিষ্ঠুর লোক?’
‘একদিন বলব সাহেব। তবে এখানে আর না। দেখ এটা তো আমার নিজের বাড়ি নয়। আর আমার গণককাকা সমাজের ভয়ে চাইছে না যে তুমি এখানে রোজ রোজ আমার সঙ্গে দেখা কর। এঁরা আমার আশ্রয়দাতা। এদের দুঃখ দেওয়া খুব অন্যায় কাজ হবে, সাহেব।’
‘কিন্তু আমি তো শিক্ষালাভের জন্য এখানে আসি। আমার উদ্দেশ্য –’ তারপর সাহেব বলল, ‘আজ তোমাদের এই গৃহে প্রবেশ করিবার সময় আমি তোমার গণককাকাকে দরজায় দেখিয়া নমস্কার করিলাম, উনি ভদ্রতাবশত নমস্কার করিলেন, কিন্তু ওনার মুখ দেখিয়া মনে হলো উনি মনে মনে আমাকে স্বাগত জানাইলেন না। এখন বুঝিতে পারিতেছি। আমার এখানে আসা তোমার কাকার অপছন্দ।’
‘সাহেব, গণককাকা খুব ভালোমানুষ। কিন্তু গ্রামের সমাজের ভয় আছে তো তাই। বাধ্য হয়েই এঁরা। তুমি গ্রামের পরিবেশ বুঝবে না, সাহেব।’
‘আমি বুঝিতে পারিতেছি। কিন্তু তাহলে তো জটিল সমস্যার উদয় হইল। কী করিবে তাহলে? তাহলে কি আমরা আর দেখা করিব না? এখানে আমার একমাত্র বন্ধু তো বেহুলা টুমি,’ সাহেবের ব্যথিত চোখ। ‘কিন্তু তোমাদের এতটুকু অসুবিধা হোক সেটা আমি চাই না। বেহুলা, টুমি কি আমাদের কুঠিতে আসিতে পারিবে? আমি তোমায় আশ্বাস দিচ্ছি, ওখানে তোমার সম্পূর্ণ সুরক্ষার দায়িত্ব আমার।’
বেহুলা তখন প্রায় এক নিশ্বাসে বচনপিসির প্রস্তাবটা সাহেবকে দিল কিন্তু বেহুলা লজ্জায় মরে যাচ্ছিল। বেহুলা দু’চোখের পাতা জোরে চেপে রাখল। কিছুক্ষণের নিস্তব্ধতা। সাহেব ভাবছে। ছিঃ ছিঃ! বেহুলা ভাবল। সাহেব ওকে ভুল বোঝেনি তো? এবার সাহেব বলল, ‘ঠিক আছে বেহুলা। তাই হবে। আমি নিজে পর্তুগিজ কেল্লাটা একদিন গিয়ে দেখেছি। ওটা ভালো জায়গা। ওখানেই তোমার সঙ্গে কাল আমার দেখা হবে। আমি এখন আসি। তোমার গণককাকাকে আমার নমস্কার জানিও।’ ডেভিড সাহেব আর কথা না বলে জ্যোতিষ-মন্দির থেকে বেরিয়ে গেল।
পরদিন অপরাহ্নে পাখমারা গণক মধ্যাহ্নভোজ সেরে দিবানিদ্রার জন্য নিজের বিছানায় শরীর ছেড়ে দিল। কিছুক্ষণ পর বচনপিসি দাদার ঘরে ঢুকে বেরিয়ে এল। বেহুলাকে ফিসফিস করে বলল—যা, তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস।’
‘আমার ভয় করছে পিসি। গণককাকা জানতে পারলে কী ভাববে!’
‘দাদা জানতে পারলে তো! দাদা ঘুম থেকে উঠে জিজ্ঞাসা করলে আমি বলব নদীতে জল আনতে গেছিস।’
বেহুলা ক্ষিপ্রপদে বাইরে বেরিয়ে গেল। বচনপিসি এবার সদরের দরজা বন্ধ করে পাখমারা গণকের বিছানার কাছে গেল, গণক চোখ বুজে শুয়ে ছিল।
‘দাদা,’ বচনপিসি ধীর গলায় বলল।
‘বেহুলা গেছে?’
‘হ্যাঁ দাদা, এই তো বেরোলো। অনেক বুঝিয়ে রাজি করাতে হয়েছে।’
‘বেশ করেছিস,’ পাখমারা গণক বিছানায় উঠে বসে বলল। ‘তুই পাশে বসে বসে চরকা ঘোরালে কি আর ওদের ঘনিষ্ঠতা বাড়বে? লোকচক্ষুর আড়ালে একলা দেখা করা ওদের দরকার,’ পাখমারা গণকের ঠোঁটে হাসি জেগে উঠল।
‘ঠিক বলেছ দাদা,’ বচনপিসি হাসল। ‘চালের ছনও থাক, রাজার মনও থাক। এখন আগুনে ঘি যদি উনায় তবেই শান্তি!’
