1 of 2

বিদ্বান বনাম বিদুষী – ২৬

।। ছাব্বিশ।।

১৩ আগস্ট, ২০১৯

নমিতা বেলা করে ঘুম থেকে উঠল। পারফেক্ট ভেকেশন। তবে আজকাল বিদ্যাদির দিকে ওর মন যেন সব সময় গ্র্যাভিটেট করে। ব্রেকফাস্ট করে মনে হলো যাই বিদ্যাদির সঙ্গে দেখা করে আসি। লালবাজারের কথাটা বলতে হবে। বিদ্যাদিকে ফোন করল নমিতা। বিদ্যাদি বলল, ‘আজ শোভাবাজারের প্ল্যাটফর্মের স্কুলের পর একটু কাজ আছে।’

‘দুপুরে বৌবাজারে আসি?’

‘না, আজ ওখানে বেশিক্ষণ থাকবো না। ওখানে এসো না।’

নমিতার মনে হল বিদ্যাদি কেমন যেন ওকে এড়িয়ে যেতে চাইছে। নমিতা নাছোড়—‘আমি বিকেলে তোমার বাড়ি যাচ্ছি, বিদ্যাদি। অনেক কথা আছে।’

‘আচ্ছা এসো, এখন রাখি? আমি ক্লাসের মধ্যে আছি।’ বিদ্যাদি ফোন রেখে দিল।

বিকেলে সন্তোষপুরে পৌঁছাল নমিতা। বিদ্যাদিদের সদর দরজা আজ অল্প খোলা ছিল। ফাঁক দিয়ে ঘরের ভিতরটা দেখা যাচ্ছে। কড়া ফিনাইলের গন্ধ নাকে এল। ফিনাইল জলে ভেজা ন্যাতা দিয়ে বিদ্যাদি ঘর মুছছে। সে দিকে তাকিয়ে কান্না পেল নমিতার। দরজায় টোকা শুনে বালতিতে ন্যাতাটা ডুবিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে দরজায় এল বিদ্যাদি।

‘এসো,’ বিদ্যাদি বলল। নমিতা ভিতরে ঢুকল।

এবার ধন্বন্তরি কবিরাজ ভিতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। বিদ্যাদি বলল, ‘তোমরা গল্প কর, আমি তাড়াতাড়ি গা ধুয়ে আসছি।’

ধন্বন্তরি কবিরাজ চেয়ারে বসলেন ‘চা খাবে? আমি বানিয়ে আনতে পারি।’

‘না না আপনি ব্যস্ত হবেন না, আপনি বসুন,’ নমিতা বলল।

ধম্বন্তরি কবিরাজ বসলেন।

‘আজকাল বেহুলা জ্যোতিষীর গল্প পড়ছি। সত্যি কথা বলতে কী আমি জ্যোতিষশাস্ত্রের ছক-টকে একদম বিশ্বাস করি না। আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগে যে খনা যদি সত্যি মেধাবী হতো তবে ও এত বিষয় ছেড়ে জ্যোতিষ নিয়ে পড়াশোনা কেন করতে গেল?’

‘এখনকার সময় যেমন ছেলে-মেয়েরা ছোটে ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার পড়তে, তেমন একটা সময় ছিল যখন আমাদের বাংলায় চিকিৎসা, জ্যোতিষ আর তন্ত্রবিদ্যাকে সর্বোচ্চ শিক্ষা হিসেবে গণ্য করা হতো। যত মেধাবী ছাত্র এই সব বিদ্যাশিক্ষার দিকেই ছুটত।

অন্যান্যশাস্ত্রেষু বিনোদমাত্রং
ন তেষু কিঞ্চিডুবি দৃষ্টমস্তি।
চিকিৎসিতজ্যোতিষতন্ত্রবাদাঃ
পদে পদে প্রত্যমাবহন্তি।।

যে সময়ের যা প্রবাহ সেদিকেই তো মেধাবীরা ছোটে। এখন যেমন দেখছ না সবাই কম্পিউটারের পিছনে ছুটছে। খনার সময় কম্পিউটার থাকলে খনাও হয়তো জ্যোতিষ ফেলে কম্পিউটারের পিছনে ছুটত।’ তারপর কবিরাজ নমিতাকে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি জ্যোতিষে বিশ্বাস কর না কেন? তুমি কি জ্যোতিষ শাস্ত্র পড়েছ?’

‘নাঃ। আমার সন্দেহ জাগে যে অতদূর থেকে এই আকাশের তারা বা গ্রহ কীভাবে মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে?’

‘গ্রহ তারা মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে না।’

‘করে না?’ নমিতা অবাক। ‘তাহলে জ্যোতিষের ছক-টকে যে গ্রহ নক্ষত্র আঁকা থাকে -?’

‘ছক আসলে কী? জন্ম মুহূর্তে জন্মস্থান থেকে আকাশের দিকে তাকালে আকাশের যা চিত্র তার ছবিই আঁকা থাকে ছকে। সেসময় আকাশে কোন গ্ৰহ নক্ষত্র কত ডিগ্রী অ্যাঙ্গেলে আছে তা যদি দেখতে পেতে, তা আঁকা থাকে ছকে।’

‘কিন্তু ছক তাহলে ভবিষ্যৎ বলে কীভাবে?’

আমি কী বিশ্বাস করি তা বলব?’ কবিরাজ ইতস্তত করে বললেন।

‘হ্যাঁ হ্যাঁ বলুন না।’

‘সহজ ভাবে বোঝাতে গেলে বলব যে ধরে নাও অসংখ্য নদীর স্রোত দেশের বিভিন্ন জায়গায় বয়ে চলেছে। কোনো নদীতে স্রোত খুব বেশি, আবার কোনো নদীতে স্রোত খুবই কম। এখন একটা নদীর স্রোতে একটা পাতা টপ করে এসে পড়ল। যে নদীর স্রোত খুব দ্রুত সেই নদীতে খসে পড়া পাতা দ্রুত এগিয়ে যাবে, আর অনেক দূর যাবে। আর যার স্রোত খুব কম, সেই নদীর পাতা হয়তো অধিক দূর যাবে না। এই পাতা হল আমাদের জীবন। কোন নদীতে সেই জীবন-পত্র এসে যাত্রা শুরু করবে তা গ্রহ-নক্ষত্র নির্ণয় করে দেয় না। গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান থেকে আমরা জানতে পারি যে কোন নদীর স্রোতে এসে জীবন-পত্র পড়েছে এবং সেই জীবন-নদীর গতিপথ মানুষটাকে কোন দিকে নিয়ে যাবে। আমরা যেমন ম্যাপ দেখে বুঝি কোন পথ কোথায় গেছে, সেরকম জন্মকুণ্ডলীটা হল একটা ম্যাপ যে বলে দেয় তোমার জীবন-নদীর গতিপথ তোমাকে কোথায় নিয়ে গিয়ে ফেলবে। এখন কোনো জ্যোতিষী সেই ম্যাপ বানাতে ভুল করে, কোনো জ্যোতিষী হয়তো সেই ম্যাপ দেখতেই জানে না, তাই ভুল ব্যাখ্যা দেয়, সেটা জ্যোতিষীদের দোষ। জ্যোতিষশাস্ত্রের দোষ নয়। বোঝাতে পারলাম কি?’

‘না ঠিক বুঝলাম না,’ ইতস্তত করে বলল নমিতা। ‘ছকে রাহু আর কেতু নামে দুটো গ্রহ থাকে, যেগুলো ফিজিকালি এক্সিস্টই করে না। যাদের কোনো ফিজিকাল এক্সিস্টেন্সই নেই তারা কীভাবে মানবজীবনকে প্রভাবিত করবে?’

এবার পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকল বিদ্যাদি। চটপট চান সেরে এসেছে। বিদ্যাদি বলল, ‘কিন্তু ফিজিকালি একজিস্ট না করা সত্ত্বেও কেউ কেউ মানবজীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।’

‘তা কখনো সম্ভব?’ নমিতা অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।

‘জিরো।’

‘মানে?’

‘শূন্য কি ফিজিকালি এক্সিস্ট করে?’

‘না, করে না।’

‘শূন্য ফিজিকালি এক্সিস্ট করে না, অথচ শূন্যের প্রভাব আমাদের জীবনে অপরিসীম। ইন ফ্যাক্ট শূন্য ছাড়া ম্যাথেমেটিক্স অচল, সায়েন্স অচল। যাক, এসব বাদানুবাদে কাজ নেই,’ বিদ্যাদি বলল।

‘ঠিক, আসলে আমাদের চোখে পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের চশমা এমন ভাবে এঁটে বসেছে যে আমরা প্রাচ্যের দর্শনকেই অবহেলা করি, যদিও শূন্য এই প্রাচ্যেরই আবিষ্কার।’ ধন্বন্তরি কবিরাজ উঠে দাঁড়ালেন। ‘তোমরা কথা বল। আমি ভিতরে যাই,’ ধন্বন্তরি কবিরাজ ভিতরে চলে গেলেন।

বিদ্যাদি মোড়ায় বসল।

‘তোমার দুটো ছবি আমার অ্যালবামে ছিল, খুলে নিয়ে এসেছি। আমাদের ডায়মন্ডহারবারে পিকনিকের ছবি।’ নমিতা পার্স থেকে ফটোদুটো বের করে দেখাল। ‘তুমি কী সুন্দর দেখতে ছিলে বিদ্যাদি। একদম সুচিত্রা সেন।’

ফটো দুটো ভালোভাবে দেখে বিদ্যাদি কফি টেবলে রাখল। ‘অনেক দিন হয়ে গেল। ইউনিভার্সিটির সকলের মুখ খুব ঝাপসা হয়ে গেছে। আসলে আমি নিজেই অতীতকে ভুলতে চেয়েছি। ভালো খারাপ সব স্মৃতি। তবে তোমার চেহারা খুব পালটে গেছে। তুমি তখন খুব ছিপছিপে ছিলে। কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্রনেত্রী, কথায় কথায় বিপ্লব, শোষণ, সংস্কৃতি এসব বলতে। এখন একটু মোটা হয়ে গেছ, গাল ভারি হয়ে গেছে। তুমি খুব ভালো বক্তৃতা দিতে, আর খুব সুন্দর প্রবচন বাগধারা দিয়ে উদাহরণ দিতে।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ’ নমিতা হাসল। ‘সেসব একটা দিন ছিল বটে। মনে হতো একাই পৃথিবীর যত অন্যায় সব উপড়ে ছুঁড়ে ফেলব। কী উদ্দীপনা! ভ্যালু সিস্টেমগুলো কী দ্রুত পাল্টাতে লাগল!’

‘তখন আমেরিকাকে কথায় কথায় খুব গালাগালি দিতে।’

‘হ্যাঁ, এখন আমার মেয়েই আমেরিকাতে টেক্সাস অস্টিনে মাস্টার্স করছে,’ নমিতা অপ্রস্তুতের হাসি হাসল। ‘রাশিয়ায় আবার যেন জারের রাজত্ব ফিরে এসেছে। কোনটা যে ঠিক আর কোনটা যে ভুল তাই বুঝে উঠতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। যাক, ছাড়ো ওসব। তুমি আমাদের আইডল ছিলে বিদ্যাদি। তুমি আমাদের প্রফেসরদের গর্ব ছিলে।’

‘গর্বই বটে,’ মলিন হাসল বিদ্যাদি। ‘কতগুলো বছর কেটে গেল। কিন্তু মনে হয় এই সেদিন। আমাকে রেজিস্ট্রার ওঁর অফিসে ডেকে পাঠালেন। গিয়ে দেখি অফিসের ভিতর কয়েকজন প্রফেসর। সকলের মুখেই অসন্তোষের ছাপ। আমাকে দেখে ড. বক্সী তির্যকস্বরে বললেন—কনগ্র্যাচুলেশনস বিদ্যাধরী! তুমি নিজের নাম নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোসের সঙ্গে জড়িয়ে ফেললে। ড. বক্সীর মুখে বিদ্রুপের হাসি। আমি বুঝতে পারছি যে ক্ষয়ক্ষতি অনেক হবে, কিন্তু এতবড় ক্ষতি করবে তা বুঝতে পারিনি। রেজিস্ট্রার এবার বললেন সুভাষ বোস প্রেসিডেন্সিতে ওটেন সাহেবকে মেরেছিলেন, সেটা আমাদের গর্বের ব্যাপার। আর তুমি ড. বক্সীকে চড় মেরেছ সেটা আমাদের ইউনিভার্সিটির কাছে লজ্জার ব্যাপার। আমরা ব্যাপারটা ডিসিপ্লিনারি কমিটির কাছে পেশ করেছিলাম। কমিটি তোমার আউটস্ট্যান্ডিং অ্যাকাডেমিক রেকর্ডস বিবেচনা করেছে। কিন্তু, আমি খুব দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে কমিটির রেকমেন্ডেশন অনুযায়ী তোমাকে রাস্টিকেট করা হয়েছে।’ বিদ্যাদি কিছুক্ষণ মৌন রইল। তারপর বলল, ‘নমিতা, জানো, আমাকে দোষী সাব্যস্ত করে আসল ব্যাপারটাই ওরা চাপা দিয়ে দিল। যাক ছাড়ো ওসব। চা খাবে?’

নমিতা বুঝল এই সেন্সিটিভ আলোচনা এখানেই বন্ধ করা সমীচীন হবে। ও বলল–‘হ্যাঁ।’

বিদ্যাদি ভিতরে রান্নাঘরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর এক কাপ চা নিয়ে এল, প্লেটে দুটো ব্রিটানিয়া বিস্কিট ‘ঘরে একটা ডিম থাকলে তোমায় ওমলেট বানিয়ে দিতাম।’

‘আরে না না, তুমি ব্যস্ত হয়ো না। তোমার চা?’

‘আমি সকালে এক কাপ খাই। বেশি খেলে রাতে ঘুমের অসুবিধা হয়।’ বিদ্যাদি বসল। ‘এখন তো তোমার অনেক দায়িত্ব,’ বিদ্যাদি প্রশংসা করল। যোগ্য লোকের হাতেই অ্যাডমিনিস্ট্রেশন গেছে। ইউনিভার্সিটির নিশ্চয়ই আমূল পরিবর্তন করে চলেছ, ঠিক যেমনটি চেয়েছিলে তোমরা।’

নমিতার লজ্জা করছিল। ও প্রসঙ্গ পালটে বলল, ‘তুমি তো হারিয়েই গেছিলে। তোমায় আবার ফিরে পেয়ে যে কী আনন্দ পেয়েছি আর অবাক হয়েছি বলে বোঝাতে পারব না। আজ জোর করে চলে এসে তোমাকে বিরক্ত করলাম না তো?’

‘না না। বিরক্ত কিসের? আমার তো লোকজনের সঙ্গে মেশামেশি নেই। তোমার সঙ্গে কথা বলতে ভালোই লাগছে।’

‘তোমার বন্ধুরা?’

‘কেউ নেই। মানসিক রোগ আমাদের সমাজে বোধহয় ছোঁয়াচে বলে মনে করা হয়। সবাই এড়িয়ে এড়িয়ে গেছে। তারপর থেকে আমি একদম একা।’

‘আমারও বিশেষ বন্ধু-টন্ধু নেই,’ নমিতা তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ পাল্টাল। ‘সারা সপ্তাহ খাটাখাটনি। তবে ছুটির দিনে আমি কাজ একদম ভুলে বইটই পড়ে সময় কাটাই।’

‘আমার তো ছুটির দিনগুলোকেই বেশি ভয় হয়। প্রত্যেক রোববার মনে হয় সোমবার প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দেখতে পাব তো মেয়েগুলোকে?

‘মানে?’

বিদ্যাদি কিছুক্ষণ চুপ হয়ে রইল। তারপর বলল, ‘বৌবাজারে আমার ওখানে তোমরা যে মেয়েটাকে দেখলে, ও রূপা। মাত্র একুশ বছর বয়স। ওর একটা তিন মাসের বাচ্চা। আড়াই মাস আগে ওকে প্রথম দেখি। প্ল্যাটফর্মে ভিক্ষাপাত্র নিয়ে বসে বাচ্চাটাকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে। এত গরিব যে পরনের ছেঁড়া কাপড়টা সদ্যপ্রসবার দুগ্ধথলি ঢাকতে অসমর্থ। ওর থেকে নজর সরাতে গিয়েও নজর এক জায়গায় আটকে গেল, নমিতা। পাশে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সাফারি পরা একটা লম্বা লোক ওর দিকে তাকিয়ে। লজ্জায় আমি দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম। তারপর আবার তাকালাম। মেয়েটার নোংরা কাপড় চোপড় ছাপিয়ে বেরিয়ে আসছে ওর যৌবন। ফুটপাথের লোকটা বারবার মেয়েটার দিকে তাকাচ্ছে। লোকটা মাঝে মাঝেই দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে আশেপাশে দেখছে কেউ দেখছে কিনা। তারপর এবার মেয়েটির দিকে নির্লজ্জ অসভ্যের মতো তাকিয়ে রইল। কান্না পেয়ে গেল। আমি মেয়েটার কাছে গিয়ে বললাম আমার কাছে পড়বি? আমি তোর বাচ্চার খাওয়ার খরচ দেব। সেই মেয়েটা দু ঘন্টার জন্য বস্তির আরেকটি মেয়ের কাছে বাচ্চাকে রেখে আমার কাছে প্ল্যাটফর্মে পড়তে আসে। তারপর ওর মেয়েকে নিয়ে আমার সঙ্গে যায় বৌবাজারে ‘অনিকেত’এ। বিকেল পর্যন্ত থাকে, অল্প মায়না পায় যাতে ভিক্ষা না করতে হয়। রূপা বলেছিল এই দালালগুলোই মেয়েদের তুলে নিয়ে যায়।’ বিদ্যাদি একটু চুপ থেকে বলল, ‘আমি চাই মেয়েটা রোজ আমার কাছে আসুক। পড়াশোনা শিখুক। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। তোমাদের এত বড় সব দায়িত্ব সামলাতে হয়। আমার দায়িত্ব সে তুলনায় কিছুই না। কিন্তু যতই ছোট হোক, আমি এই স্কুলে একদিন না গেলে মনে ভয় হয়। যে কোনো দিন ওদের যা কিছু হয়ে যেতে পারে।’

স্তম্ভিত হয়ে গেল নমিতা। সপাটে যেন এক থাপ্পড় কষিয়ে দিল বিদ্যাদি। যে বিদ্বান লোকটা বিদেশের ইউনিভার্সিটির কিছু প্রিভিলেজড ছাত্র-ছাত্রীকে পড়াচ্ছে, তাকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ডি-লিটে সম্মানিত করছে, আর যে বিদুষী মহিলাকে আমাদের এক ইউনিভার্সিটি রাস্টিকেট করে দিয়েছিল সে সমাজের একদম আস্তাকুঁড়ের অন্ধকারে শিক্ষার আলোর প্রদীপ নিয়ে ঢুকছে।

‘আমি সরি, বিদ্যাদি।’

‘বাকি যে বাচ্চা মেয়েগুলো ওখানে পড়ে, ওদের কারোর হয় মা নেই,

নতুবা মা-বাবা দু’জনেই নেই। আমি ওদের মায়ের জায়গাটা নিয়েছি। অন্তত দিনের কিছুটা সময়ের জন্য। সেদিন ওদের বস্তিতে একটা মেয়ের মা মারা গেল। এত ছোট মেয়ে বুঝতে পারে না ব্যাপারটা কী। চারপাশে বস্তির প্রতিবেশীদের ভিড়। ও জানে মা মরে গেছে, কিন্তু মরে গেছে ব্যাপারটা কী তা অনুভব করার মতো বয়সই হয়নি ওর। অনুভব করে রাতে, যখন দেখে বিছানায় পাশে শোওয়ার সময় মা পাশে নেই। মেয়েটা সারারাত কেঁদেছে। সকালে আমার কাছে নিয়ে এল ওই বড় মেয়েটা। মেয়েটা তখনো ফোঁপাচ্ছে। আমি বাচ্চাটাকে কোলে জড়িয়ে ধরে আমার শরীর দিয়ে ওকে ঢেকে দিলাম। বাচ্চাটা ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ল।’ বিদ্যাদি থেমে গেল। ঠোঁট বন্ধ, এখন শুধু চোখের দৃষ্টি নীরবে কথা বলছে। যন্ত্রণার কথা। নমিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ‘আমাকে তোমার সঙ্গে নেবে বিদ্যাদি?’

‘বড় কঠিন এই যাত্রা, নমিতা।’ বিদ্যাদি এবার পৃথুযশের থিসিসের ফাইলটা আর ‘বেহুলার খনা’ বইটা তাক থেকে নামাল।

‘কিছু পেলে এখানে?’

‘অনেক কিছু, বিদ্যাদি বলল। ‘একদম একপেশে গবেষণা। আমার এভিডেন্স মেটিরিয়াল নিয়ে পৃথুযশ প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে যে ষষ্ঠীদাসই খনা। কিন্তু ইচ্ছা করে কিছু অংশ এড়িয়ে গেছে। এরকম থিসিস পৃথুযশ লিখতে পারে আমার বিশ্বাসই হয় না। তোমায় একটা উদাহরণ দেখাই,’ বিদ্যাদি পৃথযশের ফাইলের পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে বলল, ‘ডিসঅনেস্ট, ম্যানিপুলেটর।’

‘মেজর গণ্ডগোল?’

‘এটা পড়,’ বিদ্যাদি বলল। ‘ষষ্ঠীদাসই যে খনা, সেটা প্রমাণ করতে গিয়ে পৃথুযশ এইটা উল্লেখ করেছে

যেই দ্ৰেক্কাণে প্রশ্ন হয়। সেই দ্রেক্কাণে অর্ধেক লয়।
পূর্বার্দ্ধ পর মাস। অপরার্দ্ধ শেষ মাস।।
মাসে রাশ্যে যত পাবে। পাঁচ পুরিলে যত হবে।।
পাঁচ ঘুচিলে যত রয়। আধা তিথি ষষ্ঠী কয়।।
মাসে রাশ্যে দেখি ছয়। তবে তিথি শুরু হয়।।
তার উর্দ্ধে কৃষ্ণ পক্ষ। বলে ষষ্ঠী ফল এক্য।।

পৃথুযশ ষষ্ঠীটা বোল্ড আর আন্ডারলাইন করেছে। পৃথুযশ লিখেছে এটা পড়লে মনে হয় খনাই লিখেছে,’ বিদ্যাদি বলল। ‘আমার থিসিস থেকে টুকেছে, কিন্তু পুরোটা টোকেনি।’

‘কেন?’

‘তাহলে যে ওর থিওরিটা গুবলেট হয়ে যেত।’

‘কীভাবে?’

‘ষষ্ঠীদাসের লেখা এর ঠিক পরের লাইনগুলো তোমাকে দেখাচ্ছি। ওগুলো আমি ‘বেহুলার খনা’ বইতে ছেপেছি,’ বিদ্যাদি এবার গগন হকারের ছাপা ‘বেহুলার খনা’ বইটা খুলে পড়তে লাগল

‘মাসে রাশ্যে দেখি ছয়। তবে তিথি শুরু হয়।।
তার উর্দ্ধে কৃষ্ণ পক্ষ। বলে ষষ্ঠী ফল এক্য ॥
মাস নখতা তিথিযুতা। ভ (২৭) দিয়া হররে
পুতা আন্ধারে দশ আলোতে এগার। ইহা দিয়া নক্ষত্র সারো।।
তিথি মাস করিয়া বস। সিতে রুদ্র অসিতে দশ।।
সাতাইসে হরিলে থাকে যে। রাশিনক্ষত্ৰ হয় সে।
যথা থাকে তিমিরবিনাশী। সপ্তদ্বাদশে উদয়স্থিতি নিশি।।
সপ্তদশ চতুর্বিংশতি জান। কহে খনা জন্মলগ্ন বেদ প্ৰমাণ।।
যেই ঘরে রবিস্থান। অমাবস্যাতিথি জান ।।
অমা আদি বার ঠাঁই। দুই তিন করিয়া গণিয়া যাই।।
যেই ঘরে তিথির থানা। সেই রাশি বলে খনা।

ষষ্ঠীনাম-এ ষষ্ঠীদাস যদি কিছু শ্লোকে নিজের নাম দেয় তবে বাকি শ্লোকে কেন খনার নাম দেবে? এখানেও নিজের নাম দিতে পারতো? আসলে ষষ্ঠীদাস যেখানে নিজের শ্লোক ব্যবহার করেছে সেখানে নিজের নাম দিয়েছে, যেখানে খনার শ্লোক ব্যবহার করেছে সেখানে খনার নাম দিয়েছে। লক্ষ করে দেখ ওখানে ডাকের বচন থেকেও ষষ্ঠীদাস নিয়েছে এবং সেখানে ডাকের নামও দিয়েছে। কিন্তু আবার বলছি এটা পৃথু্যুশের লেখা থিসিস সেটা বিশ্বাসই হয় না। মনে হচ্ছে খুব তাড়াহুড়োতে এই থিসিস লেখা হয়েছে, কোনোরকমে জোর করে একটা পিএইচডি দিয়ে দেওয়ার জন্য।’

নমিতা বিদ্যাদির মেধাকে মনে মনে প্রণাম করল। নমিতা এবার আচমকা প্রশ্নটা করল, ‘বিদ্যাদি, তুমি তোমার পিএইচডিটা কমপ্লিট করবে?’

‘আমি?’ বিদ্যাদি অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকাল। ‘আমাকে কে পিএইচডি করতে নেবে?’

‘আমি,’ নমিতা বলল। ‘আমি ডিন অব আর্টস ফ্যাকাল্টি। আমি তোমার পিএইচডি গাইড হব।’

‘কোন টপিকে?’

‘তোমার পুরোনো টপিক–খনা।’

‘আমার আর সে শক্তি নেই,’ বিদ্যাদি ক্লান্ত। ‘আমি আর পারব না।’

‘কেন পারবে না? পৃথুযশ ভৌমিকের মতো লোককে তুমি একসময় ডিবেটে নাচিয়ে ছেড়েছ। আমি নিজে তার প্রত্যক্ষদর্শী। তুমি—’

‘জীবনের যুদ্ধে পৃথুযশ তো আমায় হারিয়ে চলে গেল।’

‘তোমার ভাগ্যে সেই যুদ্ধ আবার ফিরে এসেছে। তুমি লড়বে? আরেকবার? তোমার প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ ডিসার্টেশন যে প্লেজারিজম করে পৃথুযশ ভৌমিক পিএইচডি পেয়েছে এটাও আমি এডুকেশন কমিটির কাছে আনবো। পারবে না তুমি পৃথুযশকে আরেকবার হারাতে?’

‘আজকাল হাত কাঁপে। আমি বহুদিন লেখাপড়ার জগতের বাইরে। যে বিদ্যাদিকে তুমি চিনতে সে মানসিক অবসাদের ওষুধ খেতে খেতে অর্ধমৃত। এখন বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। পা থরথর করে কাঁপে। কিছু পড়বার জন্য মনঃসংযোগ করতে পারি না। বই হাতে ধরলে হাত ঘামে—বিদ্যাদি শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ মুছল। ‘আমাকে ভাবতে হবে। একটু সময় চাই। জানি না এই উত্তেজনা আমার শরীর নিতে পারবে কিনা।’ তারপর বিদ্যাদি বলল, ভিতরে চল তোমায় একটা জিনিস দেখাব।’

বিদ্যাদি নমিতাকে ওর নিজের ঘরে নিয়ে গেল। নমিতা ত্রিশ বছর আগেকার অতীতে ফিরে গেল। দেওয়ালে বিদ্যাদি অনেক ফটো টাঙিয়ে রেখেছে। এই বিদ্যাদিকে খুবই চেনা লাগল নমিতার। গ্র্যাজুয়েশনের ফটো, রাজ্যপালের থেকে গোল্ড মেডেল নিচ্ছে বিদ্যাদি, বন্ধুদের সঙ্গে তোলা ফটো। ‘এই মেয়েটাকে চিনতে পারো?’ বিদ্যাদি একটা গ্রুপ ফটো দেখাল।

নমিতা ভালোভাবে তাকিয়ে দেখল, তারপর হেসে ফেলল–‘আমার ফটো তোমার গ্রুপে?’

‘কফি হাউসে কেউ একজন তুলেছিল,’ বিদ্যাদি বলল। ‘এগুলো সব এই ট্রাঙ্কে এতদিন ঢোকানো ছিল। আজ সব এক এক করে বের করে আবার দেওয়ালে টাঙালাম।’

খুশিতে মন ভরে গেল নমিতার—‘প্লিজ বিদ্যাদি, তুমি পিএইচডিটা কমপ্লিট কর। আমি জানি এটা তোমার কাছে জলভাত।’

‘তুমি গাইড হলে মনে হচ্ছে পেরে যাব। তাহলে তোমাকে এবার থেকে ম্যাডাম আর আপনি বলে ডাকতে হবে।’

নমিতার চোখে মুখে খুশির রংমশাল।

‘তোমাকে খুব খুশি দেখাচ্ছে নমিতা, বিদ্যাদি হেসে ফেলল।

‘খুশি!’ বিদ্যাদিকে আনন্দে জড়িয়ে ধরল নমিতা। ‘আমার অবস্থা যাকে বলে মূকাস্বাদনবৎ। বোবা মিষ্টি খেয়ে আনন্দের আস্বাদ বলে বোঝাতে পারছে না।’ নমিতা যেন বত্রিশ বছর পিছনে ফিরে গেছে। তখন তার আইডল তার দিকে একটু হাসি ছুঁড়ে দিলে সে ধন্য হয়ে যেত। আজ তাঁর গবেষণায় নমিতা নিজেকে যুক্ত করবে!

বিদ্যাদি টপিকে চলে এল, ‘জানো নমিতা, ষষ্ঠীদাসের সম্বন্ধে আমি আরো অনেকটা লিখেছিলাম যেটা পৃথুযশ ওর সুবিধার জন্য একদম হেঁটে দিয়েছে। ডিসার্টেশনের এই পাতাগুলো দেখ’

বিদ্যাদি কয়েকটা টাইপ করা হলদেটে পৃষ্ঠা বের করে নমিতাকে দেখালো। নমিতা পড়ল বিদ্যাদি লিখেছে-

‘ষষ্ঠীদাস যেখান থেকে সংকলন করেছেন তার একটা রেফারেন্স দিয়ে গেছেন। যেমন–

হোরায়াং। লগ্নে চ্যুতিৰ্ব্বিজানীয়াচ্চতুর্থে বৃদ্ধিং নির্দ্দিশেৎ। প্রবাসে দশমস্থান সপ্তমে চ নিবর্ত্তন্নগ।। ২৫।।
ভট্টোৎপলে। রাজ্যহানিশ্চরে পাপে স্থিরে বৃদ্ধিতে শুভে। দ্বিশরীরে দ্বিধাভাব ফলমের শুভাশুভঃ।। ৬১।।
মাসজ্ঞানং। জন্মতিথিং পরিত্যজ্য চান্তে ঋক্ষসমাযুতঃ। সো মাসঃ কৃষ্ণপক্ষস্য শুক্রে সপ্তম সংজ্ঞকঃ।। ৬২।।
খনা। তিথির তিথি ফেলিয়া, নক্ষত্র করিয়া মেলা। শুক্লপক্ষে সপ্তম ঘর কৃষ্ণপক্ষে সারা।। ৬৩

ষষ্ঠীদাসের রেফারেন্সে আমরা দেখি হোরা, ভট্রোৎপল, ষষ্ঠী, সেরকম খনা। অতএব খনা নিশ্চিত একটি আকর গ্রন্থ ছিল। ষষ্ঠীদাসের এই গ্রন্থে মাসজ্ঞানং সংস্কৃতে লেখা এবং নীচে তার বাংলা অনুবাদে লেখা খনা। তবে কি কেউ খনাবাক্যের সংস্কৃত থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছে? কোথায় গেল সেই গ্রন্থ? কেউ কি ধ্বংস করে দিয়েছে?’

‘কিন্তু কেন ধ্বংস করবে?’ নমিতা বলল।

বিদ্যাদি নমিতার চোখে চোখ রেখে বলল, ‘বেহুলা ওর পুঁথিতে খনার মৃত্যুর বিষয়ে লিখেছে যে পুরুষ চিরকাল নারীকে দমিয়ে রাখতে চেয়েছে। নারী তার পায়ের নীচে থাকুক। নারী যখন শিক্ষায় পুরুষকে ছাপিয়ে গেছে সেটা পুরুষের অহংবোধকে আঘাত করেছে এবং নারীর কণ্ঠরোধ করা হয়েছে। আর যুগে যুগে পুরুষ শাসিত সমাজ তাতে সমর্থন যুগিয়েছে। বরাহমিহিরকে শাস্তি না দিয়ে আমরা কী করেছি? পুরুষ ভেবেছে খনাকে শুধু মারলে হবে না। খনার যত পাণ্ডিত্যের ছাপ আছে তাকে সুপরিকল্পিত ভাবে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে হবে। খনার লেখা যত পুঁথি আছে সব ধ্বংস করতে হবে। এসব খুব বড় পরিকল্পনা। পুরুষ ভেবেছে খনার জীবনীতে এমন কিছু গল্প মিশিয়ে দিতে হবে যাতে ভাবী প্রজন্ম ভাবে এসব কখনো সত্যি হতে পারে নাকি? যত্তসব গালগল্প। যেমন খনার জিভ টিকটিকি খেয়ে ফেলল, মিহির কলসিতে ভাসতে ভাসতে সমুদ্র পেরিয়ে শ্রীলঙ্কা দেশে চলে গেল এসব। তারপর কয়েকটা কলা -পান-কচু গাছের ফলন কীভাবে বাড়বে এসব জ্ঞান বিতরণ করে খনার আসল প্রতিভাকে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ আসলে কখনো চায়নি খনার সত্যিকারের জ্যোতিষের প্রতিভা লোকসমক্ষে আনতে। কিন্তু কেন? খনা যদি পুরুষ হতো তবে এটা কক্ষনো হোতো না। সরল মনে ভাবলে মনে হয় এতে খনার জ্ঞানের গুণগান করা হচ্ছে, আসলে এর পিছনে এক কুটিল ক্রূর পরিকল্পনা কাজ করছে। একটা হত্যাকাণ্ড যে হয়েছিল সেটা চাপা দেওয়া। আরেক কাপ চা খাবে?’

‘হ্যাঁ, নমিতার মনটা হঠাৎ ভালো হয়ে গেছে। বিদ্যাদি যে আবার পিএইচডি করবে এটা ভাবলেই ওর মনে খুশি ছড়িয়ে পড়ছে।

‘আমি চায়ের জলটা চাপিয়ে আসছি।’ বিদ্যাদি উঠে রান্নাঘরে গেল।

নমিতা উঠে দাঁড়িয়ে বিদ্যাদির পুরোনো ফটোগুলো দেখতে দেখতে ওর মোবাইল ফোনটা বাজল। মিস বসাক।

‘ড. স্যান্যাল, আমি মাধবী বলছি।’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ বলুন।’

‘মনসুর ফোন করেছিল।’

‘আচ্ছা! কী বলল?’

‘ড. স্যান্যাল, মনসুরের ডিটেকটিভ জানিয়েছে দুটো ছেলে মোটর সাইকেল নিয়ে আপনাকে ফলো করে চলেছে।’

‘আমাকে!’

‘ছেলে দুটো আপনার পিছনে পিছনে ঘুরে চলেছে। আপনি এখন মিস দাসের বাড়িতে, তাই না?’

‘হ্যাঁ,’ নমিতার নার্ভাস লাগছিল।

‘গলির উলটো দিকে দেখবেন একটা সেলুন আছে আর তার পাশে একটা চায়ের দোকান। মনসুর বলল ছেলে দুটো চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে চা খাচ্ছে। পাশে একটা লাল মোটরসাইকেল দাঁড় করানো।’

‘কী বলছেন!’ মিস বসাকের কথা শুনে নমিতার সুষুম্না দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল। নমিতা কেঁপে উঠল।

‘ভয়ের কিছু নেই। ওরা যেন বুঝতে না পারে আপনি জেনে গেছেন। মনসুর জানতে চায় ওদের মাথাটা কে। তবে আপনি সাবধানে থাকবেন। রাতে শোবার সময় দরজা জানলা ভালোভাবে দেখে শোবেন। মিস দাসকে এসব বলার দরকার নেই, উনি খুব ভয় পেয়ে যাবেন। চিন্তা নেই মনসুর নজর রাখছে।’ মিস বসাক ফোন রেখে দিল।

বিদ্যাদি রান্না ঘরে চায়ের জল চাপিয়ে ফিরে এল।

‘বিদ্যাদি, একটা দরকারি কাজ এসে গেছে। আমাকে এক্ষুনি যেতে হবে গো, নমিতা উঠে দাঁড়াল।

‘চা খেয়ে যাবে না?’

‘না বিদ্যাদি, আর্জেন্ট কাজ। আমি আরেকদিন আসব।’ নমিতা বাইরে বেরিয়ে এল। চায়ের দোকানের সামনে লাল বাইকটা দাঁড় করানো। নমিতা গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে ঠিক করল লাইব্রেরিতে জার্নাল সেকশনে গিয়ে পৃথু্যুশের পিএইচডি থিসিসের হার্ড কপিটা তুলে ফেলতেই হবে। তারপর মনে হলো আজ ছেলেগুলো ওকে ফলো করবে। কাল ফার্স্ট আওয়ারে ঠিক থাকবে? না, দেরি হয়ে যেতে পারে। নমিতা ইউনিভার্সিটির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।

ইউনিভার্সিটির জার্নাল সেকশনে পৃথু্যুশের বাঁধানো থিসিস পেতে বেশি সময় লাগল না নমিতার। লাইব্রেরির ক্লার্ক ডকুমেন্ট ইস্যু করে দিল। নমিতা একবার খুলে ভিতরের তারিখটা দেখল। একদম ঠিক আছে। এখন বাড়ি ফিরে যাওয়া যাক। ডকুমেন্টটা কি বাড়ি নিয়ে যাবে? নাকি এখানে নিজের ড্রয়ারে তালা-চাবি দিয়ে যাবে? একবার ভাবল নমিতা। নাঃ, নিজের কাছেই থাক।

নীচে গাড়ির কাছে নেমে এসে চারদিক তাকাল নমিতা। ছেলে দুটোকে দেখা যাচ্ছে না। কে জানে হয়তো তেনারা অন্য কোনো অবতারের রূপে তার ওপর নজর রাখছেন। নমিতা দেরি না করে গাড়িতে উঠে পড়ল।

বাড়ি ফিরে খুব ক্লান্ত লাগছিল নমিতার। ভয় ওর অবসাদ বাড়িয়ে দিয়েছে। সব ক’টা ঘরের আলো জ্বালিয়ে খাটের তলা, ক্লজেট সব ভালো করে দেখল নমিতা। শরীর যেন আর সেভাবে সঙ্গ দিচ্ছে না। বেশি ধকল যেন শরীরে জাঁকিয়ে বসে। ‘বেহুলার খনা’ বইটা পড়তে হবে। মিস বসাক বলেছেন কোনো অসম্ভব কিছু নজরে এলে নোট করে রাখতে এবং আলোচনা করতে যাতে কোর্টে মিস বসাক পৃথুযশের সম্ভাব্য আক্রমণের থেকে নিজেকে বাঁচাবার জন্য প্রস্তুত থাকতে পারেন। তাড়াতাড়ি ডিনার করে নিল নমিতা। তারপর ঠাণ্ডা জলের বোতলটা ফ্রিজ থেকে বের করে সোফায় পা ছড়িয়ে দিল নমিতা। হাতের কাছে আধখোলা অবস্থায় রাখা ‘বেহুলার খনা’। একটা আটপৌরে বই বাঘা বাঘা উচ্চকোটির মানুষকে নাচিয়ে ছাড়ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *