1 of 2

বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৩২

।। বত্রিশ।।

ডিঙাডুবিতে দিন ধীরগতিতে এগিয়ে চলল। সেদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে বেহুলার মনে পড়ল গণককাকার পুজোর গঙ্গাজল শেষ। কয়েক ফোঁটা মাত্র আছে ঘটে। গঙ্গার সঙ্গে বিদ্যাধরী নদীর সংযোগ আছে তাই গ্রামের লোকেরা গঙ্গাজলে বিদ্যাধরীর জল মিশিয়ে দিয়ে গঙ্গাজল মনে করে পুজো-আচ্চা করে। বেহুলা ঠিক করল গণককাকা ওঠার আগেই নদী থেকে জল নিয়ে ফিরে আসবে। বেহুলা মাটির কলসিটা কাঁখে তুলে বেরিয়ে নদীর দিকে চলল।

এত সকালে নদীর পাড়ে কোনো মানুষজন নেই। নদীর কাছাকাছি এসে বেহুলা দেখল আঘাটায় একটা নৌকা এসে লাগল, আর নৌকা থেকে ধরাধরি করে দু’জন ষণ্ডামতো লোক একটা বাঁশের খাটিয়া নৌকা থেকে নামাচ্ছে। নৌকাটাকে পাটনি গলুই এর কাছে ধরে রেখেছে। খাটিয়ায় একটা দেহ।

বেহুলা জানে এরা কী জন্য এখানে এসেছে। খাটিয়ায় নিশ্চয়ই কোনো মৃত্যুপথ যাত্রী বুড়ো কি বুড়ি হবে, তাকে অন্তর্জলী করতে এখানে এনেছে।

হিন্দুদের এই রীতিটা বেহুলার একদম সহ্য হয় না। মানুষটা প্রায় মরতে চলেছে, কোথায় বাড়িতে রেখে তার শেষ সময়ে একটু সেবা শুশ্রুষা কর, তা না গঙ্গাপ্রাপ্তির নামে তাকে নদীর পাড়ে এভাবে ছেড়ে যাওয়া অমানুষিক অন্যায়। পায়ে পায়ে বেহুলা নদীর উঁচু পাড় ধরে এগিয়ে গেল। নীচে নদীর একদম পাশেই জলের ধারে লঙ্কাসিরে, বনঝামার ঝোপগুলোর পাশে লোকদুটো খাটিয়াটা রাখল। এত নীচু খাটিয়া যে নদীর জল বাড়লে খাটিয়ার উপর পর্যন্ত জল উঠে আসবে। তারপর লোকদুটো কিছুক্ষণ জলের ধারে বসে একটা নারকোলের মালায় কিছুটা নদীর জল ভরে তাতে কলকে বসিয়ে তামাক ধরাল।

এত ভোরে আশেপাশে আর কোনো লোকজন নেই। নদীর উঁচু পাড়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল বেহুলা, খাটিয়ার মানুষটা একটা বুড়ি। শরীরটা হাড় সর্বস্ব, দেহটা খাটিয়ায় পাতা চাদরে মিশে গেছে। একে এভাবে সারাদিন শুইয়ে রাখলে রোদের তাপেই বুড়ির গঙ্গাপ্রাপ্তি হবে। এবার তামাকের কলকে রেখে একজন একটা ঘটে নদীর ঘোলা জল ভরে বুড়ির মুখ হাঁ করিয়ে বুড়ির গলায় ঢালার চেষ্টা করল। বুড়ি বেদম বিষম খেল। লোকটা বিরক্ত হয়ে ঘটের কাদাজল নদীর কাদায় ছুঁড়ে ফেলল। তারপর তার সঙ্গীর কাছে গিয়ে বসে তার হাত থেকে ছিলিমটা নিয়ে টানতে লাগল।

পাড় থেকে কাদায় নেমে নদীর জলে নেমে এল বেহুলা। কলসি ভরার আগে নদীতে ডুব দিয়ে স্নান সেরে নেবার বাসনা ছিল, কিন্তু লোকগুলো এখানে মনে হচ্ছে আজ অনেকক্ষণ থাকবে, তাই বেহুলা ভেসে আসা পানা সরিয়ে জল কলসিতে ভরতে লাগল। আর তখন সে দেখল দৃশ্যটা।

লোকদুটো এবার ছিলিম রেখে উঠে দাঁড়াল। ওরা খাটিয়ার কাছে এগিয়ে গেল। তারপর খাটিয়া তুলে নৌকার কাছে এগিয়ে গেল। বেহুলা ভাবল ওরা বাড়ি ফিরে যাচ্ছে, কাল আবার আসবে। কিন্তু লোকদুটো নৌকায় না উঠে নদীতে নেমে পড়ল। কোমর জলে পৌঁছে লোকদুটো খাটিয়া নদীর জলের ভিতর নামিয়ে দিল। খাটিয়ার ভিতর শয়ান বুড়িকে জলের ভিতর একবার চুবিয়ে আবার তুলে আনল।

‘কী করছটা কী তোমরা?’ বেহুলা চেঁচিয়ে উঠল।

লোকদুটো কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না, কিন্তু নৌকায় বসা মাঝি বলল, ‘অন্তর্জলী।’

‘মানুষটা জলে ডুবে মরে যাবে যে!’ বেহুলা প্রতিবাদ করল। তারপর আদেশের ভঙ্গীতে বলল, ‘ওকে উপরে নিয়ে এস।’

লোকদুটো বেহুলার কথায় কর্ণপাত না করে আবার খাটিয়া সমেত বুড়িকে জলে চুবিয়ে উঠিয়ে আনল।

বেহুলা এবার হাঁটুজল ঠেলে ঠেলে লোকদুটোর কাছে পৌঁছাল। তারপর খাটিয়াটা ধরে বলল, ‘তোমরা যদি একে মারতে চাও তবে তোমাদের নিজেদের ঘাটে নিয়ে যাও। অন্তর্জলীর নামে এভাবে খুন করতে দেব না আমি।’

একজন ষণ্ডা লোক বেহুলার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এই মেয়ে, বিরক্ত করিস না তো! এই বুড়ির কইমাছের প্রাণ। কিছুতেই মরে না। চোখে ছানি, কানে শোনে না কে এর প্রতিদিন সেবা শুশ্রূষা করবে? তাই অন্তর্জলীতে এনেছি।

‘ওর পেটে এত ঘোলা জল গেছে ও তো মরে যাবে! আমি কিছুতেই এটা হতে দেব না।’ বেহুলা খাটিয়ার একটা পায়া চেপে ধরল।

পাশের লোকটার বোধহয় ধৈর্য খুবই কম। ও বেহুলাকে এক ধাক্কা দিল। বেহুলা জলে কোনোরকমে টাল সামলাতে লোকটার পিরান খামচে ধরল। লোকটা এবার ক্রোধে বেহুলার চুল ধরে টানল। বেহুলা যন্ত্রণায় চেঁচিয়ে উঠল। আর তখন নদীর পাড় থেকে ভেসে এল গুলির শব্দ।

বেহুলা তাকিয়ে দেখল একজন ফিরিঙ্গি সাহেব আকাশের দিকে পিস্তল উঁচু করে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে। সাহেব এবার পিস্তল লোকগুলোর দিকে তাক করল।

লোকদুটো বুঝল বেগতিক। ওরা ক্ষিপ্রহস্তে বুড়ি শুদ্ধ খাটিয়া নৌকায় তুলল। তিনজনে মিলে দ্রুত নৌকাটাকে জলে ঠেলে নামিয়ে সত্বর দাঁড় বেয়ে নৌকাটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সাহেবের দৃষ্টির বাইরে নিয়ে যাবার চেষ্টা করতে লাগল।

আজ স্নান আর হল না। কলসিতে জল ভরে কাঁখে তুলে বেহুলা গুটি গুটি পায়ে উপরে পাড়ে উঠে এল। কাদার ওপর কাঁচা রাস্তা সাহেবের পাশ দিয়েই গেছে। অবনত মস্তকে সাহেবের পাশ দিয়ে যাবার সময় বেহুলার কানে সাহেবের গম্ভীর গলা, ‘টুমি খুব সাহসী মেয়ে।’

সাহেবের মুখে ভাঙা ভাঙা বাংলা শুনে বেহুলা অবাক। বেহুলা সাহেবের দিকে তাকাল। সাহেব একদম অল্পবয়সী, কটা চোখ, মাথায় বাদামী চুল, পায়ে হাঁটু পর্যন্ত তোলা জুতো, কোমরে পিস্তলের খাপ একজন সুন্দরকান্ত সুপুরুষ। বেহুলা বলল, ‘সাহেব, তুমি না এসে পড়লে আজ ওরা বুড়িকে এখানেই মেরে ফেলত।’

‘দিস ইজ মার্ডার ইন দ্য নেম অব রিলিজিয়ন,’ সাহেব রুষ্টস্বরে বলতে বলতে পিস্তলটা খাপে গুঁজল। সাহেব কী বলল বেহুলা কিছুই বুঝল না। তবে লোকটাকে দেখে খারাপ মনে হলো না।

‘তুমি বাংলা জানো সাহেব?’

‘ক্যালকাটায় চার বছর আছি। অল্প অল্প বলটে পারি। ধীরে কথা বললে, বুঝটেও পারি,’ সাহেব গম্ভীর মুখে বলল।

‘তুমি আমাদের গ্রামে নতুন এসেছ?’

‘হ্যাঁ। কাল এসেছি।’ তারপর সাহেব নদীর দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘ওই ওয়ারগুলো কী করছিল এই সকালে?’

‘অন্তর্জলী যাত্রা,’ বেহুলা বলল। ‘মরার আগে মানুষকে নদীর পাড়ে নিয়ে ফেলে রাখে। এতে নাকি স্বর্গপ্রাপ্তি হয়। এটা আমাদের হিন্দুদের কুসংস্কার।’

‘ক্রেজি!’ সাহেব রাগতস্বরে বলল। ‘তোমাদের হিন্ধুদের অনেক পাগলামি আছে। এসব আমার ঘোর অপছন্দ! সেদিন দেখিলাম কয়েকজন লুনাটিক সন্ন্যাসী পিঠে, কপালে, জিভে লোহার শলাকা গাঁথিয়া একটা উঁচু বাঁশে ঝুলিয়া বনবন করিয়া ঘুরিতেছিল।’

সাহেবের ভাঙা বাংলা শুনে বেহুলার হাসি পেল। কিন্তু সাহেব রেগে যাবে তাই হাসি চেপে বলল। ‘চৈত্রসংক্রান্তির চড়কপুজো।’

‘হোয়াট?’

‘হ্যাঁ, চড়কগাছে পিঠে বাণ ফুঁড়ে কত ভক্ত দে-পাক দে-পাক বলতে বলতে পাক খেতে থাকে। তারপর ঘুরতে ঘুরতে নীচে লাফ মারে লোহার শলাকার বিছানায় কিংবা আগুনের কয়লার ওপর।’

ইডিয়েটস! বুদ্ধিনাশ না হলে কেউ এসব করে? দে শুড বি অ্যারেস্টেড।’ সাহেবের ইংরাজি মেশানো বাংলা বেহুলার বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল, কিন্তু রাগী গলার স্বর শুনে বেশ বুঝতে পারছিল যে লোকটার মাথাটা খুবই গরম। তাছাড়া, এই ভোরে সকলে ধ্যান-ট্যান বা ভগবানের নাম করে। আর সাহেব দুম করে হাওয়ায় গুলি ছুঁড়ে দিল! কিন্তু লোকটা ওর উপকার করেছে, তাই সাহেবের পক্ষ নিল বেহুলা ‘আমাদের আরো অনেক কুসংস্কার ঘেরা প্রথা আছে সাহেব,’ বেহুলা বলল। ‘হিন্দু মায়েরা বেশি বয়স পর্যন্ত সন্তান না হলে গঙ্গায় মানত করত যে প্রথম সন্তান গঙ্গাসাগরে গিয়ে বিসর্জন দেবে।’

‘ইয়েস, আই নো দ্যাট। আর সতীদাহ? টুমি কখনো সতীদাহ দেখিয়াছ?’

‘না। কপাল ভালো ছিল তাই অল্পের জন্য দেখা হয়নি,’ বেহুলা বিড়বিড় করে বলল। বেহুলা এবার কথা ঘুরিয়ে বলল, ‘সাহেব, তুমি এত সকালে এখানে?’

‘অনেকদিন পর মুক্তি পাইয়া বিশুদ্ধ বায়ুসেবন করিতেছি,’ তারপর বেহুলার বিস্মিত দৃষ্টি দেখে সাহেব তাড়াতাড়ি বলল ‘শহরে এত মুক্ত বাতাস নাই।’

সাহেবের সাধু-চলিত মেশানো গুরুচণ্ডালী বাংলা ভাঙা উচ্চারণে শুনে বেহুলা এবার হেসে ফেলল—‘আমি শুনেছিলাম যে তোমরা শহরে ফিরে গেছ?’

‘আমার বড় সাহেবের কলেরা হয়ে গেছিল। তাই উনি ফিরিয়া গেছেন, আমাকে পাঠিয়েছেন কাজকম্মো দেখিতে। হাসিতেছ কেন? টোমার নাম কী?’

‘বেহুলা।’

‘বেহুলা! ও মাই গুডনেস! টুমিই বেহুলা!’ সাহেবের চোখ দেখে মনে হলো সাহেবের যেন অপ্রত্যাশিত কিছু প্রাপ্তি হয়েছে।

‘কেন? তুমি আমার নাম শুনেছ?’ বেহুলা ভ্রূকুটিতে তাকাল।

সাহেব একটু থতমত খেয়ে গেল। তারপর বলল, ‘টোমার নাম তো কত দূরের মানুষ জানে। টুমি একজন বিখ্যাত জ্যোতিষী? তাই না?’

‘আমি জ্যোতিষচর্চা করি।’

‘আমার সৌভাগ্য,’ সাহেব টুপি খুলে বলল। ‘আমি ডেভিড স্মিথ।’

‘তুমি আমার অনেক উপকার করলে আজকে সাহেব,’ বেহুলা বলল।

টোমার উপকার করিবার জন্যই তো আমাকে মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচিয়ে এখানে পাঠানো হয়েছে, সাহেব মনে মনে ইংরেজিতে বলল, আর মুখে বলল, ‘টুমি কোথায় থাক?’

‘কাপাসডাঙা মাঠের ওপারে, ওই ওদিকে।’ বেহুলা তর্জনী তুলে দেখাল। বেহুলার মনে বদ্ধমূল ধারণা যে গোরা সাহেবেরা ভালো লোক হয় না। এই লোকটার কথাবার্তাও রুক্ষ। ‘আমি চলি,’ বেহুলা এবার কলসি নিয়ে কাপাসডাঙার পথ ধরল।

‘বেহুলা!’

পিছন থেকে সাহেবের গলার স্বরে থামল বেহুলা। ‘আমার কাছে একটা হরোস্কোপ—মানে আমার একটা কোষ্ঠী আছে। ওটা কি টুমি একটু দেখে দিয়ে বলিতে পারিবে যে আমার সামনে কোনো বাধা-বিপট্টি আছে কিনা?’

বেহুলা এক মুহূর্ত চিন্তা করল, তারপর বলল, ‘আমার বাড়ির জ্যোতিষ- মন্দিরে লোকেরা কোষ্ঠী দেখাতে আসে। ওখানে নিয়ে এলে আমি দেখে দেব।’

‘ধন্যবাদ,’ সাহেব বলল। ‘নিয়ে আসিবো। এখানে জিভকাটির মন্দিরটা কোনদিকে?’

‘জিভকাটির মন্দির ওই জঙ্গলে,’ বেহুলা দূরের জঙ্গল দেখাল। ‘কিন্তু ওখানে ভুলেও যেও না।’

‘কেন বলিতেছ এমন কথা?’ ডেভিডের দৃষ্টিতে সন্দেহ।

‘ওখানে প্রচুর সাপ আছে।’

‘শুধু তাই?’ সাহেবের দৃষ্টির সন্দেহ মুছল না। ‘নাকি অন্য কিছুও আছে?’ বেহুলা দেখল দূরে দুর্লভচাঁদ দেওয়ানজী হনহন করে হেঁটে আসছে। বেহুল এই লোকটাকে বড্ড ভয় পায়। বড্ড খিটখিটে স্বভাব, আর তার ওপর মন্দ- রিপুর চাহনি। ‘আমি চলি’ বেহুলা কাপাসডাঙার মেঠো বিসর্পিল পথ ধরল। বেহুলা লক্ষ করল না যে সাহেবের মুখে এক ক্রূর কুটিল হাসি খেলে গেল এত সত্বর যে তার শিকারের এত কাছাকাছি আসতে পারবে তা বোধহয় ডেভিড সাহেব ভাবতেও পারেনি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *