।। চুয়াল্লিশ।।
পরদিন খুব ভোরে বেহুলা বুধনের খাবার আর পিঠের ক্ষতের ভেষজ নিয়ে জিভকাটির জঙ্গলে গেল। জিভকাটির মন্দিরের ঢোকার মুখে ঢিপির কাদামাটিতে অনেকগুলো পায়ের ছাপ। বেহুলার বুক ধড়াস করে উঠল। তবে কি দারোগার পাইকেরা বুধনের খোঁজ পেয়ে বুধনকে ধরে নিয়ে গেছে!
মন্দিরের ভিতর থেকে মানুষের গলার আওয়াজ আসছে। বেহুলা সাবধানে ফাটল দিয়ে উঁকি মারতেই একজন পাইক বেহুলার গলায় বল্লম ঠেকিয়ে ধরল।
এরা ডাকাত! বেহুলা বুঝতে পারল। বুধনের দাদা চন্দ্র সর্দারের দল?
ডাকাতটা বেহুলার গলায় বল্লম ঠেকিয়ে ওকে ভিতরে নিয়ে গেল। ভিতরে মশাল জ্বলছে। চাতালের ওপর বসে বুধন। ওর মুখোমুখি বসে চার-পাঁচজন লোক, তাদের পাশে রাখা বল্লম। ওদের একজনকে চিনতে পারলো বেহুলা। সেই বৃদ্ধ ডাকাত যে তার ছেলের কোষ্ঠী দেখাতে এসেছিল বেহুলার কাছে
বুড়োটা বেহুলাকে দেখেই উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘জয় বেহুলা মা’র জয়। তারপর ডাকাতটাকে ধমক দিয়ে বলল, ‘বল্লম সরা। বেহুলা মাকে চিনিস না!’
বুধন বেহুলাকে দেখে উঠে দাঁড়াল। বুধন বলল, ‘বেহুলা, চন্দ্রদাদা জানতে পেরেছে আমি এখানে। এদের পাঠিয়েছে। আমাকে সাগরদ্বীপে পৌঁছে দেবে।’
সেই বৃদ্ধ বলল, ‘তিনদিন পর হাট। হাটে অনেক নৌকা মাল বোঝাই করে আসে। আমরা সেরকম এক নৌকায় ওকে লুকিয়ে পাঠাবার ব্যবস্থা করছি।
বেহুলা বলল, ‘বুধনদাদা, যা করবে ভেবেচিন্তে কোরো। এরা মানুষ খুন করে। তুমি এদের দলে নাম লিখিও না।’ বেহুলা মন্দির থেকে বেরিয়ে এল।
জিভকাটি মন্দির থেকে ফিরে কুঁড়ের বেড়ার বাইরে থেকে শুনতে পেল ভিতরে অনর্গল কথা বলার আওয়াজ। বেহুলা কণ্ঠস্বর চিনল। বচনপিসির সই শান্তিপিসি এসেছে। বেহুলা ভিতরে ঢুকতেই শান্তিপিসি বলল—‘এই যে গণক- ঠাকুরান এসে গেছে। আমার দামুর কোষ্ঠীটা একবার দেখে দে না মা। দামুটার জন্য বড় চিন্তা হয় রে। আজ ভোররাতে খুব খারাপ একটা স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেল, জলদেবতাকে তিনবার ছুঁয়ে বললাম জলদেবতা এই স্বপ্ন যেন সত্যি না হয়। তবু মায়ের মন কি আর মানে? তাই সকালবেলা তোমার কাছে ছুটে এলুম বাছা, আমার দামুর ছকটা একটু দেখে দিবি মা?’
বেহুলা কুয়োর পাড়ে গিয়ে পা ধুলো। তারপর দাওয়ায় ঝোলানো গামছায় পা মুছে দাওয়ায় শান্তিপিসির পাশে বসল। পাশে বচনপিসি নোংরা মাটি মাখা তুলোর বস্তা থেকে তুলো ছালায় ফেলে বোয়াল মাছের চোয়ালির দাঁতের চিরুনি সেই কাপাস তুলোর ওপর খুব ধীরে ধীরে চালিয়ে তুলোর সঙ্গে মিশে থাকা পাতা, ডাঁটা, মাটি বের করছিল। এবার শান্তিপিসি তাকে বলল, ‘আমার কাছে একটা মাত্র কড়ি আছে। লক্ষ্মীর ঘটের থেকে তুলে এনেছি। আর আমার কিছু দেওয়ার মতো সামর্থ্য নেই।’
বেহুলা বলল, ‘পিসি, তোমায় কিছুই দিতে হবে না। তুমি কড়ি রেখে দাও।’ শান্তিপিসি বলল, ‘না রে বাবা, গণকরা বলে বিনিপয়সার কোষ্ঠী, জষ্টিমাসের মোষটি। না বাবা আমি তেষ্টা নিয়ে মরতে পারব না।’
‘তুই আমার কাপাস তুলো বেছে দে, শান্তি। তাহলেই হবে,’ বচনপিসি বলল। শান্তিপিসি খুশি মনে বেহুলাকে বলল, ‘হবে?’
বেহুলা হেসে বলল, ‘হ্যাঁ খুব হবে।’
শান্তিপিসি বোয়াল চিরুনি নিয়ে তুলো বাছতে বসল। আর বেহুলা দামুর ছকটা ভালোভাবে পড়তে লাগল। কিছুক্ষণ পড়ে বেহুলা বলল, ‘খনা বলেছে—’
পঞ্চগ্রহযুতে লগ্নে তৎস্থে চ সুরপুঙ্গবে।
জীবক্ষেত্রগতে লগ্নে বারানস্যাং মৃতিভবেৎ।।’
শান্তিপিসির বোয়াল-চিরুনি থেমে গেল—‘আমি তো কিছুই বুঝলুম না।’ বেহুলা হেসে বলল—‘খনাবাক্য হল
চন্দ্রে বুধ শুক্র থাকে ঘরে, শিশুকাল হ’লে পুণ্য করে।
যদি গুরু কর্কটে স্থির, কাশীলাভ পুণ্য শরীর।
পিসি তোমার ছেলের খুব ভালো ছক। ওর কোনো ক্ষতি হবে না। ওর কাশীতে মরণ হবে। ওর ছক বলছে ও মাতার বিপদত্রাতা হবে। তুমি যদি খুব বিপদে পড় তবে তোমার ছেলে তোমায় কাঁধে তুলে সেই বিপদ থেকে রক্ষা করবে।’
‘বলছিস!’ শান্তিপিসির দু’চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল ঝরতে লাগল। আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বলল, ‘আমি ওদের মুখে নোড়া মেরে এসেছি।’
‘কাদের মুখে নোড়া মারতে গেলি তুই শান্তি?’ বচনপিসি জিজ্ঞাসা করল। ‘আমাদের গাঁয়ের মাগীদের মুখে। বলে কিনা পর্তুগিজ কেল্লায় বেহুলা নাকি সাহেবের সঙ্গে ফস্টিনস্টি করতে যায়!’ পিসি বলল, ‘সাহেবরা হেগে জলশৌচ করে না তো তোদের বাপের কী? আমি তো বলে এসেছি বেহুলা হল পবিত্র গঙ্গাজল। তাকে কমণ্ডলুতেই রাখো বা জলশৌচের পাত্রে রাখো, সে কক্ষনো অপবিত্র হতে পারে না। এই বয়সের মেয়ে কোথায় অলকা তিলকা স্বাদ আহ্লাদ করবে, তা না ভগবান বেধবা বানিয়ে সাদা থান পরিয়ে দিল!’
শান্তিপিসি চলে যেতেই বেহুলা আর বচনপিসি একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। বচনপিসি কপাল চাপড়ে বলল—‘এক গাঁয়ে ঢেঁকি পড়ে, আর গাঁয়ে মাথা ধরে। সব্বোনাশ!’
