1 of 2

বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৩৬

।। ছত্রিশ।।

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই বেহুলার মনে হলো খুশির একটা গোটা রামধনু যেন কাল বুকের ভিতর ঢুকে গেছে, আর তার নানা রঙের আলো মনের আনাচে কানাচে যত দুঃখের মেঘলা অন্ধকার জমা হয়ে ছিল সব কাটিয়ে মনকে ঝলমল করে তুলেছে। আজ আবার সে খনার পুঁথি দেখতে পাবে। কত কিছু খনাবাক্য নিজের চোখে দেখবে, শিখবে সে। বেহুলা বিছানায় উঠে বসল। সকালের আলো জানলা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করেনি এখনো, কিন্তু বাইরের আকাশে আলো লেগেছে।

বেহুলা তাড়াতাড়ি মুখ-হাত ধুয়ে উঠোন ঝাঁট দিতে দিতে ভাবল সাহেব ওর জন্য এত কিছু করছে, সাহেবের জন্য কিছু খাবার বানিয়ে নিয়ে গেলে কেমন হয়? রাখাল গরুর এক ঘটি দুধ দিয়ে গেল। বচনপিসি বেহুলার জন্য রোজ এক পোয়া করে বেশি দুধ নিচ্ছিল। দুধ নিয়ে বেহুলা হেঁসেলে এল। ভাঁড়ার ঘরের টুকিটাকি কাজ শেষ করে আঁচঘরে উনুন ধরাল। ধোঁয়ায় বচনপিসির ঘুম ভেঙে গেল।

‘এই সাত সকালে উনুন ধরাচ্ছিস?’ বচনপিসির নিদ্রিত কণ্ঠে বিরক্তি। একটু আগেই ভাঁড়ারের তৈজসের খুট-খাট আওয়াজে ওর ঘুম ভেঙে গেছে। কাল সন্ধ্যা থেকে বচনপিসির আচরণে এটা স্পষ্ট যে সে বেহুলার জমিদার বাড়িতে যাওয়া একদম পছন্দ করছে না। বচনপিসির দোষ নেই, ভাবে বেহুলা। ও জানে একজন মেয়ের এভাবে জমিদারবাড়ি যাওয়াটা ভয়ের। কখন কোথায় কী অনর্থ হয়ে যায়। বচনপিসি বলে, যতটা সম্ভব জমিদারবাড়ি থেকে দূরে থাকাটাই মেয়ে মানুষের পক্ষে মঙ্গল।

‘সাহেবের জন্য একটু পায়েস বানাচ্ছি পিসি, বেহুলা ওর স্বামীর শ্রাদ্ধের সময় কেনা ভাঁড়ারে জমিয়ে রাখা সুগন্ধী চাল কলস থেকে বের করল। তারপর বেহুলার হঠাৎ মনে হলো তাই বলে এত সকালে? ওর কি বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পেল নাকি? বেহুলা লজ্জা পেয়ে গেল। কিন্তু উনুনে একবার আগুন ধরে গেলে এত সহজে কি নেভে?

বেহুলা আজ গোবর গোলা মাটির জলে ন্যাতা দিয়ে সকাল সকাল জ্যোতিষ- মন্দিরের মাটির মেঝে নিকিয়ে স্নান-টান সেরে সত্বর জাতকদের কোষ্ঠী দেখে নিল। যজমানরা এলে তাড়াতাড়ি তাদের ভবিষ্যৎ আউড়ে বিদায় করে বচনপিসিকে বলল, ‘পিসি তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও, জমিদার বাড়ি যেতে হবে না?’ বিরক্তি সত্ত্বেও পিসিকে বেহুলার সঙ্গে যেতে হল জমিদার বাড়ি। সাহেবেরও স্নান-টান সারা, চুল আঁচড়ানো, পায়ে হাঁটু পর্যন্ত পরা জুতো, প্যান্টের বকলেস দু’কাঁধে আটকানো। সাহেবের হাতে ওর খেরোর খাতা। কিন্তু সাহেবের দু’চোখ রক্তবর্ণ। মনে হচ্ছে রাতে ঘুম হয়নি। বেহুলা মনে মনে উদ্বিগ্ন হল। ‘সাহেব, তোমার শরীর ঠিক আছে তো?’

ডেভিড মাথা নাড়লো–‘দেওয়ানজী বুঝিতে পারিয়াছে যে ব্যাপারটা সত্যাচার্যের থেকে গোপন করা সম্ভব নয়। তাই আমাকে বলিয়াছে দ্রুত এই খনার লেখাপড়ার কাজ শেষ করিতে। তাই আমি দুর্লভচাঁদের সেরেস্তার পাটোয়ারীর এই খাতায় কাল সারারাত ওই পুঁথি থেকে দেখে দেখে অক্ষরগুলিকে এখানে ছবির মতো আঁকিয়াছি। কিন্তু আমার আরো তিন চারদিন লাগিবে গোটা পুঁথি নকল করিতে। দেখ তো ইহা দেখিয়া বুঝিতে পার কিনা?’ ডেভিড সাহেব বেহুলাকে খাতা এগিয়ে দিল।

বেহুলার মন খুঁত খুঁত করছিল। সাহেব কি ঠিক মতো লিখেছে? তারপর খাতা খুলে বেহুলার মনে এক আকাশ বিস্ময়—ঠিক যেন পুঁথির হস্তাক্ষর। সাহেব লিখে পুঁথি নকল করেনি, সাহেব পুঁথির শব্দগুলোকে এঁকেছে।

লগ্নের পাশে থাকে অর্কা, তাহাকে অগ্নি করিবে শঙ্কা।
যদি মঙ্গল সপ্তমে দেখে, মেঘের নাদে পাড়ে তাকে।
লগ্নে রবি ক্রোধ প্রবীণ, দ্বিতীয়ে শনি না থাকে ঋণ।
সাতে আটে রাহুর মিলন, জন্মিলে হয় মায়ের মরণ।
লগ্নে কুজা হয় ক্ষিপ্র, মিথ্যাবাদী দূরাদৃষ্ট।
যদি মঙ্গল সপ্তমঘরে, বজ্রাঘাত মাথার উপরে।

‘বাপরে, এত সুন্দর করে নকল করেছো?’ বেহুলা বিস্মিত।

‘যাক, আমি নিশ্চিন্ত,’ সাহেব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ‘আমার উদ্বেগ হইতেছিল, তুমি এটা পড়িতে পারিবে কিনা? থ্যাঙ্ক গড। এবার অর্থ বোঝাও।’

বেহুলা বলল, ‘অর্কা হলো অর্ক, মানে সূর্য অর্থাৎ জ্যোতিষ মতে রবি। লগ্ন হল প্রথম ঘর, তার পাশে মানে হয় দ্বিতীয় ঘর নতুবা দ্বাদশ ঘর। রবি যদি দ্বাদশ ঘরে থাকে তবে জাতকের জীবনের একটা বড় অংশ খুব দুঃখকষ্টে কাটে। জীবনে প্রচুর ঝঞ্ঝাট ও অশান্তির সৃষ্টি হয়, নানারকম নিন্দা হয়, রাজদণ্ডে অর্থনাশ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অগ্নির শঙ্কা বলতে বোধহয় খনা এটাই বুঝিয়েছেন।

সাহেব ডেস্কে কাগজ আর দোয়াত নিয়ে খনার কথা লিখতে শুরু করল। ‘কুজা মানে মঙ্গল গ্রহ। পরের অনেকটা জায়গা খনা মঙ্গল নিয়ে লিখেছে। মঙ্গল লগ্নে থাকলে জাতক নির্ভীক, শক্তিমান, দূরদৃষ্ট ও অহঙ্কারী হয়। খনা

বলেছেন মঙ্গল সপ্তমে থাকলে মাথায় বজ্রাঘাত। মঙ্গল সপ্তমে থাকা অশুভ ইঙ্গিত। প্রচুর শত্রু হয় এবং শত্রুরা ক্ষতি করার চেষ্টা করে। তাছাড়া পত্নীবিয়োগের সম্ভাবনা থাকে। একেই বোধহয় খনা মাথায় বজ্রাঘাত বলেছেন।’

সাহেব কলমটা কাগজের ওপর ফেলে হতাশার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

‘কী হল সাহেব?’

‘আমি কনফিউসড।’

‘কোন ফু?’ বেহুলার কুঞ্চিত ভ্রূ-যুগল।

‘কনফিউসড মানে -’ সাহেব মনের বাংলা শব্দভাণ্ডার হাতড়াল। ‘বিভ্রাটো।’ বেহুলা হেসে বলল, ‘এর চেয়ে কোন ফু টা সোজা।’

‘আমি কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। টুমি আমায় জ্যোতিষশাস্ত্রটা শিখিয়ে দাও, আমি টোমায় ইংলিশ শিখিয়ে দেব।’

‘সত্যি?’

‘সত্যি! আই প্রমিস। মানে আমি কথা দিলাম।’

বেহুলা চোখ গোলগোল করে শুনল। সাহেব জিজ্ঞাসা করল, ‘শেখাবে?’

বেহুলা এবার সাহেবের মতো গম্ভীর গলা করে বলল, ‘আইপোমিস!’

এবার দু’জনে হেসে ফেলল।

বচনপিসি মাটিতে বসে গোলগোল চোখে দু’জনের কাণ্ডকারখানা দেখছিল। বেহুলা এবার উঠে বচনপিসির আঁচল ঢাকা পায়েসের বাটি নিয়ে এসে সাহেবকে দিয়ে বলল, ‘খাও সাহেব।’

‘কী এটা?’

‘পায়েস। বেহুলা বানিয়েছে,’ বচনপিসি উত্তর দিল।

বেহুলা লজ্জা পেল, বচনপিসির এত আদিখ্যেতা করে আগবাড়িয়ে বেহুলা বানিয়েছে একথাটা বলার কী দরকার ছিল?

সাহেব বাটি ধরে এক চুমুক লাগিয়ে বলল, ‘বাহ্! খুব সুস্বাদু!’ সাহেব আরেক চুমুক লাগিয়ে বাটি খালি করে বলল, ‘তোমরা এই সুস্বাদু খাবার রোজ খাও?’

বেহুলা হেসে বলল, ‘না না সাহেব। শুধু কোনো পার্বণে বা উৎসবে আমাদের বাড়িতে পায়েস হয়।’

‘উত্সব! মানে ফেস্টিভ্যাল?’ সাহেব ভ্রু কুঁচকে বলল। ‘আজ তোমাদের বাড়িতে কী উত্সব?’

‘না না, আজ তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসছিলাম তাই বানিয়েছি।’

‘আমার সঙ্গে দেখা করিতে আসাটা তোমার কাছে উত্সব?’ সাহেব অবাক।

‘হ্যাঁ,’ বেহুলা হেসে বলল। মনে মনে বলল, মনে হচ্ছে এই ‘আইপোমিস’ সাহেব আমাকে আরো জ্বালাবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *