।। তেত্রিশ।।
পরদিনই ঘটল ঘটনাটা।
আকাশে আলোর ছিটে লেগেছে। বেহুলা প্রাতঃকৃত্য সেরে এসে উঠোন, আঁচঘর ঝাঁট দিয়ে ময়লা কানাচে ফেলতে বেরিয়েছে, হঠাৎ নজর গেল দূরে জঙ্গলের দিকে।
আরে! জিভকাটির জঙ্গলের দিকে ওটা কে যাচ্ছে? কালকের ওই সাহেব না? সাহেব জঙ্গলের দিকে চলেছে!
সব্বোনাশ! বেহুলা ভাবল। ওখানে যে গোখরোর গর্ত আছে! কেউ যায়ই না ওদিকে। সাহেবকে বললাম অত করে, তবু শুনল না!
সাহেবকে থামাতেই হবে। না হলে সাপের কামড়ে মরবে যে!
ভাঙা ত্রিশূল হাতে তুলে নিয়ে বেহুলা ছুট লাগাল জঙ্গলের দিকে। সাহেব অনেক দূর চলে গেছে। প্রায় জঙ্গলের কাছাকাছি। বেহুলা এবার চেঁচিয়ে উঠল –‘সাহেব, ওদিকে যেও না।’
বেহুলার গলার আওয়াজ সাহেবের কানে গেল। সাহেব পিছন ফিরে তাকাল। বেহুলা হাত তুলে দূর থেকে ইশারায় ওকে থামতে বলল, কিন্তু নিজে ছুটতে লাগল। সাহেব থামল। বেহুলা সাহেবের কাছে পৌঁছে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, ‘কোথায় যাচ্ছ, সাহেব?’
‘জিভকাটির মন্দিরে,’ সাহেব বলল।
‘তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে! বললাম ওখানে বিষধর সাপের বাসা।’
‘আমি ভয় পাই না। আমার কাছে বন্দুক আছে।’
‘বন্দুক! ওখানে জলায় সাপ কিলবিল করছে। না সাহেব, আমি তোমাকে কিছুতেই যেতে দেব না,’ বেহুলা দু’হাত দু’দিকে তুলে সাহেবের পথ আটকে দাঁড়াল।
‘পথ ছাড়ো!’ সাহেব বিরক্ত।
‘সাহেব, এই জঙ্গলে সাপের কামড়ে যে কত মানুষ মরেছে তা আমি শুনেছি। তুমি নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে যাচ্ছ। আর আমি তা জেনে তোমাকে সেদিকে যেতে দিতে পারি না।’
‘বলছি তো কিচ্ছু হবে না। পথ ছাড়ো।’
‘তুমি বড্ড জেদি সাহেব!’ বেহুলা হতাশ। ‘ঠিক আছে, তবে আমিও তোমার সঙ্গে যাব।’
‘টুমি যাবে?’ সাহেব অবাক।
‘আর কী করব! তুমি এত অবাধ্য! চল তাহলে। মা মনসার মন্ত্র জানো?’
‘মা মনসা আবার কে?’ সাহেবের কণ্ঠস্বর রুক্ষ।
‘সাপের দেবী। ওর মন্ত্র পড়তে পড়তে এই ত্রিশূল জোরে জোরে মাটিতে ঠুকতে ঠুকতে চললে সাপেরা কাছে আসবে না।’
‘আমি কোনো মন্ত্র-টন্ত্র জানি না। ওসবে বিশ্বাসও করি না।’
‘ঠিক আছে আমি মন্ত্র পড়ছি, তুমি শুধু ওর ছেলে আস্তিকমুনির নাম জপতে থাক। মা তাহলেই সন্তুষ্ট হবেন।’
‘তারপর বেহুলা আগে আগে ত্রিশূল মাটিতে জোর শব্দ করে করে ঠুকতে লাগল আর মনসাদেবীর মন্ত্র পড়তে লাগল। আর সাহেব ‘অ্যাস্টিকমুনি অ্যাস্টিকমুনি’ বলতে বলতে বেহুলার পিছনে পিছনে আসতে লাগল। প্ৰদক্ষিণ করতে করতে হঠাৎ সাহেব থেমে গেল। বেহুলা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।
জায়গাটাতে আলো আঁধারি। আঁধারই বেশি। পিছন থেকে ফোঁস করে আওয়াজে অন্ধকার যেন নড়ে উঠে স্থির হয়ে গেল। গ্রামের মেয়ে বেহুলা, সে এটুকু জানে যে মৃত্যুদূত সাহেবের একদম পাশে। সাহেব নড়লেই এক বিশাল ছোবল খাবে। ওঝা ডেকে আনার আগেই বিষ মাথায় উঠে যাবে।
বেহুলা শ্বাস বন্ধ করে ঘাড় ফিরিয়ে সাহেবকে চোখের ইশারায় বলল একদম না নড়তে। সাহেব স্থির পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সাপও ফনা মেলে একদম স্থির। বেহুলা চোখ বুজে মা মনসার নাম করে অতর্কিতভাবে এক নিমেষে ত্রিশূল দিয়ে সাপের ফনায় আঘাত করল। সাপটা চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল শুকনো পাতার ওপর। তারপর সড়সড় করে ঝরাপাতার ভিতর দিয়ে জঙ্গলের ভিতরের দিকে দ্রুত মিলিয়ে গেল। এবার ডেভিড সাহেবের হাতে পিস্তল উঠে এসেছে। ডেভিড সাহেব সাপের দিকে পিস্তল তাক করতেই বেহুলা বারণ করল, ‘সাহেব, ওকে মেরো না। ও নিজের গর্তে ফিরে যাচ্ছে। এদিকে আরও সাপ আছে। তাড়াতাড়ি এই জঙ্গল থেকে বাইরে চল,’ বেহুলা এবার ডেভিড সাহেবের হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে জঙ্গলের বাইরে বেরিয়ে এল।
‘সাপটাকে যেতে দেওয়া উচিত হয়নি,’ সাহেবের হাতে তখনো পিস্তল ধরা।
‘এটা তো ওদেরই বাসা সাহেব। আমাদেরই তো ওদের শান্তিভঙ্গ করতে আসা উচিত হয়নি,’ জঙ্গলের বাইরে এসে বেহুলা হাত জোড় করে মা মনসাকে প্রণাম জানিয়ে সাহেবকে বলল, ‘আর কক্ষনো এখানে একা আসবে না। ওটা কী সাপ তুমি জানো?’
‘ইয়েস, কিং কোবরা,’ সাহেব গম্ভীর মুখে বলল। ‘এক ছোবলেই সব শেষ।’
‘না কোবরা না, ওর নাম পদ্মগোখরো,’ বেহুলার ইংরাজি জানা নেই, কিন্তু সাপ চেনে।
‘টোমার কথা না শুনে জঙ্গলে একলা ঢুকিলে আজ আমার নিশ্চিত মৃত্যু ছিল, ‘ সাহেব লম্বা শ্বাস টেনে বলল। ‘থ্যাঙ্ক ইউ! কিন্তু টুমি আমার প্রাণ বাঁচাইবার জন্য নিজের প্রাণের এত বড় ঝুঁকি নিলে?’
‘আমি তোমায় বারণ করেছিলাম,’ বেহুলা তখনো উত্তেজনায় হাঁফাচ্ছে। ‘তুমি অবাধ্য বলে তো তোমায় আমি মরতে যেতে দিতে পারি না সাহেব। অনেক হয়েছে। এখন ঘরে যাও।’ বিরক্ত বেহুলা ত্রিশূল হাতে হনহন করে ভিটের দিকে রওনা দিল। এই অবাধ্য সাহেবের জন্য অনেকটা সময় নষ্ট হল।
সাহেব বেহুলার পিছনে চলতে চলতে অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘টুমি আমায় বাঁচাইলে বেহুলা?’
‘সেটাই তো মানুষের ধর্ম সাহেব,’ বেহুলা আগে হাঁটতে হাঁটতে থেমে পিছন ফিরে বলল। ‘আমি বিপদে পড়লে কি তুমি আমাকে বাঁচাবার জন্য হাত বাড়িয়ে দিতে না?’
‘টুমি বিপদে পড়লে
সাহেব বিড়বিড় করে নিজের মনে কিছু বলল।
‘আমি যদি টোমার শত্রু হতাম তবে?’
‘শত্রু মিত্র বুঝি না আমি সাহেব। তোমাকে যদি আমি আবার বিপদের মুখে যেতে দেখি, আমি তোমায় বাঁচাব, এটুকু বলতে পারি।’
‘ঠিক বলছ?’
‘আমি একজন সামান্য গ্রামের মেয়ে সাহেব। আমার ক্ষমতা আর কতটুকু। কিন্তু চোখের সামনে কাউকে বিপদের মধ্যে ফেলে আমি কক্ষনো পালাবো না।’ কথায় কথায় দু’জনে বেহুলার বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে। বেহুলা বলল, ‘সাহেব, এটা আমার বাড়ি।’
‘টোমাদের বাড়ি এখানে? আশেপাশে তো কোনো ঘরবাড়ি নেই—শুধু মাঠ। ডাকাতরা তোমাদের কোনো ক্ষতি করে না?’
‘ডাকাতরা শুধু শুধু আমাদের ক্ষতি করতে যাবে কেন?’
‘টুমি এত নিশ্চিত হইতেছ কীভাবে? ডাকাতদের চেনো বুঝি?’
‘চিনতে যাব কোন দুঃখে? সাহেব, আমি যাই।’
বেহুলা আঁচঘরে ঢুকে গেল। সাহেব দ্রুতপদে কাপাসডাঙার মাঠের দিকে রওনা দিল। বেহুলা ভাবতে লাগল লোকটা ভীষণ একগুঁয়ে, পাগল। তারপর সে ভাবল, লোকটার দৃষ্টিতে একটা অদ্ভুত বেদনা আছে। কিন্তু ওকে আজ সাপে কাটতই কাটত। লোকটা কোষ্ঠী দেখাতে চেয়েছিল। ওর কোষ্ঠীটা তাহলে একবার দেখেই নেওয়া যাক? ওকে তাহলে সাবধান করে দেওয়া যাবে। বেহুলা বেরিয়ে এসে চেঁচিয়ে ডাকল ‘সাহেব!’ সাহেব শুনতে পেয়ে ঘুরে দাঁড়াল। বেহুলা হাতের ইশারায় দাঁড়াতে বলল। তারপর কাছে পৌঁছে বলল, ‘তোমার আজ একটা বড় ফাঁড়া গেল। চল, তোমার কোষ্ঠীটা তোমাদের কুঠি থেকে নিয়ে আসি। ওটা আমি দেখতে চাই।’
‘কোষ্ঠী দেখবে? এখন?’ সাহেবের গলার স্বরে অস্বাচ্ছন্দ্য। ‘টোমাকে আসিতে হবে না। আমি অন্য কোনোদিন টোমায় এসে দেখিয়ে যাবো।’
‘অত কষ্ট করতে হবে না। তোমরা ব্যস্ত মানুষ, আমি যাব আর কোষ্ঠাটা নিয়ে চলে আসব। আমার খুব কৌতূহল হচ্ছে তোমার কোষ্ঠী দেখার। চলো চলো দেরি কোরো না।’
বেহুলার তাড়া খেয়ে সাহেব আর কথা বাড়ালো না। সারাটা পথ সাহেব কোনো কথা বলল না। লোকটা অন্যমনস্ক হয়ে কিছু ভাবতে ভাবতে চলেছে।
‘সাহেব কিছু ভাবছো?’
‘অ্যাঁ, না না, কিছু ভাবছি না। হ্যাঁ ভাবছি। অত বড় সাপটা ছোবল দিলে-’
‘ওসব ভেবো না। কপালে মৃত্যু না লেখা থাকলে সাপ-বাঘ-সিঙ্গি কেউ তোমায় মারতে পারবে না। দেখ তিনি কী সুন্দর তোমার সঙ্গে আমায় জুটিয়ে দিলেন তোমার মরণ আটকাতে।’
সাহেব একটা শ্বাস ছাড়ল। ফিরিঙ্গি কুঠির সামনে এসে সাহেব বলল, ‘ভিতরে আসিবে?’
‘না, আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।’
‘ভয় নেই। ডেভিড স্মিথ থাকতে তোমার কোনো ক্ষতি হবে না।’
বেহুলা কোনোদিন ফিরিঙ্গি কুঠি দেখেনি। ওর ভয় হচ্ছিল কিন্তু একই সঙ্গে প্রবল কৌতূহলও হচ্ছিল। কী আসবাব থাকে এদের কুঠিতে? বেহুলার কৌতূহলই জিতল। বেহুলা সাহেবের সঙ্গে ভিতরে ঢুকল। ‘টুমি এখানে থাকো, আমি ভিতরের ঘর থেকে নিয়ে আসছি। বেহুলাকে বৈঠকখানায় দাঁড় করিয়ে সাহেব ভিতরের ঘরে গেল। বেহুলা দেখল অত্যন্ত অগোছাল ঘর। দেওয়ালের গায়ে অনেকগুলো আলমারি, কাগজপত্তর ঠাসা। ঘরে অনেকগুলো কাঠের বাকু রাখা। বোধহয় এগুলো সাহেবের সঙ্গেই এসেছে। সাহেব বেরিয়ে এল। বেহুলা বাক্সগুলোর দিকে দেখিয়ে বলল, ‘এগুলোতে কী আছে সাহেব?’
‘আমার পড়ার বই।’
‘তুমি এত বই পড়? বাব্বা! একটা বাক্স খুলে দেখাবে?’
‘ন-না, আজ না,’ সাহেব শশব্যস্ত হয়ে নিষেধ করল। ‘আরেকদিন দেখাব এই যে কোষ্ঠী।’ সাহেব একটা মোড়ানো তুলট কাগজ বেহুলার হাতে দিল বেহুলা সাহেবের কোষ্ঠীটা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে যেতে সাহেব দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল
বই! সিন্দুক খুললেই বেহুলা মদের বোতলগুলো দেখতে পেয়ে যেত। আজকের দিনটা ভয়াবহ বিপদের থেকে বারবার অল্পের জন্য ওকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে।
