1 of 2

বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৩১

।। একত্রিশ।।

সারারাত অন্ধকারে ডিঙাডুবিতে ঝিল্লিরব শুনে আর মশার উপদ্রব সহ্য করে ইংরেজদের সেপাইরা চন্দ্র সর্দার ও তার ডাকাত দলের জন্য বৃথা অপেক্ষা করে সকালে খবর পাঠালো ফোর্ট উইলিয়ামে। পরদিন জমিদার গোপীচরণ মল্লিককে ফোর্ট উইলিয়ামে ডেকে পাঠালো রবিন সাহেব।

জমিদার তার বেলেঘাটার জলটুঙ্গিতে পায়রা ওড়াচ্ছিল। সাহেবের তলব পেয়েই গোপীচরণ মল্লিক হন্তদন্ত হয়ে ছক্কর গাড়িতে ছুটল ফোর্ট উইলিয়ামে কেল্লার ভিতর চাঁদমারি মাঠে রবিন সাহেব বন্দুক নিয়ে নিশানা অনুশীলন করছিল। গোপীচরণ যেতেই সে বলল—‘মালিক, তোমার নিশানা কেমন?’

‘মন্দ নয়, সাহেব। তবে আপনার মতো কি আর অত নিখুঁত?’ গোপীচরণ তোষামোদের স্বরে বলল। ‘সেদিন ডিঙাডুবিতে উড়ন্ত পাখি মারলেন!’

‘ওই কাঠের মানুষটার মাথায় লাগাও দেখি,’ সাহেব বন্দুকটা গোপীচরণ মল্লিকের হাতে দিল।

গোপীচরণ মল্লিক বিস্ময়ে বন্দুক হাতে নিল। ও বুঝে উঠতে পারছে না যে কী হয়েছে? জিজ্ঞাসা করার সাহসও নেই। বন্দুক টিপ করে গুলি ছুঁড়তে গিয়ে হাতটা একটু কেঁপে গেল। বুলেট চাঁদমারির গলায় গিয়ে লাগল। গোপীচরণ মল্লিক লজ্জা পেয়ে অপ্রস্তুতের হাসি হাসল ‘মাথায় টিপ করেছিলাম, কিন্তু গলায় গিয়ে গুলি লাগল।’

‘ওতেই হবে। গলায় লাগলেও তো মরবে।’

‘কে মরবে সাহেব?’

‘তোমার দেওয়ান। হারামজাদাকে কাল এখানে এনে ওই জায়গাতে দাঁড় করিয়ে আমার সামনে ওকে গুলি করবে। চন্দ্র ডাকাতকে সাবধান করে দেওয়ার শাস্তি ওকে পেতে হবেই। পয়সা দিয়ে শুধু বাঁদর পুষছ। নাউ গেট আউট।’

‘সাহেব অমার্জনীয় অপরাধের জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী, আমি এই ত্রুটির তদন্ত করে আপনাকে শীঘ্রই জানাচ্ছি, অপমানে মুখ লাল করে ফোর্ট উইলিয়াম কেল্লা থেকে বেরিয়ে এল গোপীচরণ মল্লিক। বাড়ি ফিরে ওর ভোজপুরি লেঠেল সূর্যপ্রধানকে বলল- ‘এক্ষুনি ডিঙাডুবি রওনা দে। দেওয়ানজী আর সত্যঠাকুরকে ডেকে নিয়ে আয়।’

দেওয়ান দুর্লভচাঁদ আর সত্যাচার্য জমিদারের তলব পেয়ে যখন বেলেঘাটা পৌঁছোলো তখন গভীর রাত। দেউড়িতে দারোয়ান বলল জমিদারবাবু জেগে আছেন, ওনাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।

দেওয়ান বুঝতে পারল আবহাওয়া থমথমে। জমিদার তাকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করল—‘ডাকাতরা কেন ইংরেজদের খাজনা লুঠ করতে এল না?’

‘আমরা সব রকম চেষ্টা করেছিলাম, জমিদারবাবু।

‘তাহলে ওরা ডাকাতি করতে কেন জমিদারবাড়ি এল না?’ জমিদারের চোখ লাল। ‘আপনারা আমার মান মর্যাদা রবিন সাহেবের কাছে ধূলিসাৎ করে দিয়েছেন। ছি ছি

‘এর জন্য দোষী হল বেহুলা জ্যোতিষী, জমিদারবাবু,’ সত্যাচার্য সাফাই গাইল।

‘বেহুলা জ্যোতিষী?’

‘হ্যাঁ জমিদারবাবু। ওই মাগী ডাকাতদের মনে সন্দেহ ঢুকিয়ে দিয়েছিল,’ দেওয়ানও সত্যাচার্যকে সমর্থন করে বলল।

‘আমাকে পরে ডাকাতেরা এসে শাসিয়ে গেছে ওদের মিথ্যা বিধান দেওয়ার জন্য,’ সত্যাচার্য কুণ্ঠার সঙ্গে বলল।

জমিদার গোপীচরণ মল্লিক রাগে ফেটে পড়ল ‘আপনাদের জন্য আমার কতবড় লোকসান হয়ে গেল জানেন? ফোর্ট উইলিয়ামের উঁচু অফিসারদের কাছে রবিন সাহেবের নাকি নাক কাটা গেছে। ওঁরা আর রবিন সাহেবকে ভরসা করবে না। আর সব দোষ গিয়ে পড়েছে আমার ওপর। আমি কেন একা দোষী হব? আপনারা চলুন আমার সঙ্গে রবিন সাহেবের কাছে। আপনারাও সাহেবের রাগ-রাগিনী স্বকর্ণে শুনুন।’

পরদিন সকালে জমিদার গোপীচরণ ফোর্ট উইলিয়ামের মন্ত্রণাকক্ষে ঢোকার সময় আশঙ্কা করছিল এবার রবিন সাহেবের কটুবাক্যবর্ষণ চলতে থাকবে, কিন্তু জমিদার বিস্ময়ে দেখল রবিন সাহেব ধৈর্য সহকারে দেওয়ান ও সত্যঠাকুরের সব কথা শুনলো। তারপর শান্তভাবে বলল, ‘মালিক, ওই মেয়েটার সঙ্গে ডাকাতদের সংযোগ আছে, অতএব আইনত ওকে শাস্তি পেতেই হবে। গ্রামে গিয়ে সকলের সামনে মেয়েটার মাথায় গুলি করো।’

‘এমন কাজ অসম্ভব, আমাকে এমন আদেশ দেবেন না সাহেব,’ জমিদার কাতর অনুনয় করল।

‘কেন?’

‘ডিঙাডুবিতে লোকেরা সকলেই সন্দেহ করে যে বজ্র ডাকাতকে আমিই ধরিয়ে দিয়েছি। এবার যদি প্রকাশ্যে আমি এই মেয়েকে হত্যা করি তবে আমি আর কক্ষনো ডিঙাডুবিতে পা রাখতে পারব না।’

‘তাছাড়া বেহুলা জ্যোতিষীর প্রবল প্রতিপত্তি আশেপাশের গ্রামে,’ দেওয়ান দুর্লভচাঁদ বলল। ‘ওকে ঈশ্বরের মতো মানে সকলে। ওকে হত্যা করা তো দূরের কথা, সমাজচ্যুত করলেও গ্রামবাসীরা নবাবের কাছে গিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে নালিশ জানাবে।’

‘হুম,’ রবিন সাহেব কিছুক্ষণ ভাবল, তারপর আর্দালিকে ডেকে বলল, ‘খুনে ডেভিডকে কয়েদখানা থেকে এখানে নিয়ে এস।’

আর্দালি চলে গেলে রবিন সাহেব কুটিল হাসি হেসে বলল, ‘মালিক, তোমরা জমিদাররা যেমন লেঠেল পোষ, আমরা তেমনি এরকম খুনে পুষি।

‘খুনে পোষেন!’ জমিদার অবাক।

‘আমরা ইংলন্ডে এই ছেলেগুলোকে খুঁজে খুঁজে বের করি। এরা ইংলন্ডে উচ্ছৃঙ্খল জীবন কাটিয়ে এত ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে যে পাওনাদাররা এদের নামে আদালতে কেস করে। জেলের ঘানি টানার ভয়ে এই ছেলেগুলো কোম্পানির সেনাবাহিনীতে নাম লিখিয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। ডেভিডও সেরকমই একজন। নানা রকমের ফাটকাবাজিতে দেনার দায়ে গলা পর্যন্ত ডুবে আছে, পাওনাদাররা তাগাদা দিচ্ছে রোজ, তখন ভাগ্যান্বেষণে একজন ক্যাডেটের চাকরি নিয়ে এ দেশে আসে। কিন্তু স্বভাব কী এত সহজে যায়! এদেশে এসেও রোজ সন্ধ্যার পর থেকে মদ্যপান হৈ-হুল্লোড়! প্রচণ্ড মদের নেশা, কিন্তু পিস্তল চালাতে এর জুরি নেই। অব্যর্থ নিশানা।’

‘কিন্তু কয়েদখানায় কেন?’ জমিদার গোপীচরণ বলল।

‘একমাস আগে মদের নেশায় ডুয়েল লড়ে দারোগার শ্যালকের কপাল ফুটো করে দিয়েছে ডেভিড। নবাবের আদালতে মৃত্যুদণ্ড হতো, দারোগাও যে তার শ্যালকের ওপর একদম সন্তুষ্ট ছিল না, সে খবর আছে। ওর শ্যালক পাঁকের কীট। মরেছে বেশ হয়েছে। কিন্তু দারোগা এ সুযোগে কিছু হাতিয়ে নেওয়ার জন্য ক্ষতিপূরণ চেয়েছে। ঠিক হয়েছে দারোগাকে বিশ হাজার সিক্কা টাকা দিলে ওকে নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই দেওয়া হবে। আমরা বন্ড সই করেছি যে যতদিন টাকার জোগাড় না করতে পারি ততদিন আমরা আমাদের ফোর্ট উইলিয়ামের কয়েদখানায় ওকে বন্দী রাখব।’

‘যাক ছেলেটাকে তো আপনারা বাঁচিয়ে দিলেন।’

‘সে কৃতজ্ঞতা ওর থাকলে তো! ছেলেটার ব্যবহার রীতিমতো রূঢ়, দেখলেই বুঝতে পারবে।’

কিছুক্ষণ পর দু’হাতে হাতকড়া পরে একজন সাতাশ-আঠাশ বছরের যুবক কামরায় প্রবেশ করল।

‘ডেভিড বসো, রবিন সাহেব বলল।

যুবক বসল। গোপীচরণ দেখল ছেলেটার সুঠাম দেহ, মাথায় বাদামী চুল, লম্বা ঝুলফি, কিন্তু চোখের দৃষ্টি রুক্ষ।

‘ইনি জমিদার গোপীচরণ মল্লিক, রবিন সাহেব পরিচয় করিয়ে দিল। শহরের একজন বিখ্যাত ও প্রবল প্রতিপত্তিশালী ধনী ব্যক্তি। দাতা হিসেবে এনার অত্যন্ত সুনাম। ইনি তোমায় বিশ হাজার সিক্কা টাকা দান করতে রাজি হয়েছেন।’

‘কেন?’ যুবকের দৃষ্টিতে সন্দেহ। ‘অত সিক্কা টাকা দেবেন কেন? ইনি তো আমাকে চেনেনই না!’

গোপীচরণ দাতা কর্ণের মতো দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘রবিন সাহেবের অনুরোধ আমি কক্ষনো প্রত্যাখ্যান করতে পারি না।’

গোপীচরণের উত্তর যুবককে সন্তুষ্ট করল না। যুবক কপাল চুলকাতে চুলকাতে রবিন সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মতলবটা কী সেটা বলিবেন? উনি এতগুলো টাকা নিশ্চয়ই চ্যারিটি করিতেছেন না।’

‘আমি সব সময় তোমার বুদ্ধির ভূয়সী প্রশংসা করি ডেভিড। ইনিও খুব বিপদে পড়েছেন। প্রতিদানে ওনাকে কিছু হেল্প করতে হবে।’

‘সে আগেই বুঝিয়াছি। সোজাসুজি বলেই ফেলুন কী হেল্প করিতে হইবে?’

‘এঁর গ্রামে ডাকাতের উপদ্রব। ডাকাতেরা এক মেয়ে জ্যোতিষীর ইশারায় নেচে গ্রামবাসীদের ওপর লুঠ-তরাজ করে। ওরা আমাদের ডাক-গাড়ি থেকে খাজনাও অনেকবার লুঠ করেছে। নদীপথে, জঙ্গলের পথে পথিকদের লুঠ করে নির্মম ভাবে হত্যা করে। সেই নারী জ্যোতিষীর নাম বেহুলা।’

‘একজন বৃদ্ধা জ্যোতিষীকে শায়েস্তা করিতে আমাকে দরকার?’ ডেভিডের দৃষ্টিতে সন্দেহ

‘বেহুলা জ্যোতিষী বৃদ্ধা নয়। তার বয়স এখনও কুড়ি ছোঁয়নি। সে বিধবা, কিন্তু অতিশয় সুন্দরী, পূর্ণ যৌবনা। গ্রামবাসীদের ওপর ওর খুব প্রভাব, তাই ওকে গ্রেফতার করলে গ্রামবাসীরা বিদ্রোহ করবে, আর গ্রামে গ্রামে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়বে। তোমার কাজ হবে কিছুদিন গ্রামে থেকে সেই মেয়েকে প্রেমের বাঁধনে বেঁধে সেই ডাকাত দলের আস্তানার সন্ধান বের করা। তারপর সেই ডাকাতদের সর্দার চন্দ্র ডাকাতকে হত্যা করা। আর তারপর সেই নারীকে ভুলিয়ে কলিকাতায় এই জমিদারের কাছে বিচারের জন্য হাজির করা। তোমাকে ঈশ্বর এত রূপ এবং চেহারা দিয়েছেন। তুমি নিশ্চয়ই পারবে তাকে বশীভূত করে আমাদের এই গোপন উদ্দেশ্য হাসিল করতে। কী পারবে না?’

‘একটা বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করে প্রতারণা করে ইহাদের হাতে তুলিয়া দিব! আর ইউ ক্রেজি?’ ডেভিডের মুখ জুড়ে বিরক্তি। ‘ও কাজ আমার দ্বারা হইবে না। অসম্ভব! আমায় কারাগারেই ফিরিয়ে দিন।’

‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। তুমি ডাকাত সর্দারটাকে হত্যা কর তাহলেই হবে, রবিন সাহেব বলল।

‘ডাকাতদের আস্তানা কোথায়?’ ডেভিড বলল।

দেওয়ান গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, ‘গ্রামের পাশে জিভকাটির ঘন জঙ্গল আছে। সেখানেই ওদের আস্তানা। ওই বেহুলা জ্যোতিষী জানে ওদের আস্তানাটা ঠিক কোথায়।’

‘জঙ্গলে কোনো ভাঙা রাজবাড়ি বা পুরোনো ভাঙা মন্দির-টন্দির আছে?’

‘আছে,’ এবার সত্যাচার্য উৎসাহের সঙ্গে বলল। জিভকাটির মন্দির। আমার সন্দেহ ডাকাতরা ওই মন্দিরের ভিতরে লুকিয়ে থাকে। তাই আমি বারবার জমিদারবাবুকে আর্জি জানিয়েছি যে ওই মন্দির ভেঙে একদম ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া উচিত।’

‘ঠিক আছে, আমি একবার নিজে গিয়ে মন্দিরের জায়গাটা দেখিব।’

‘যাক আমি নিশ্চিন্ত। আমি জানি তোমাকে দায়িত্ব দিলে –’ রবিন সাহেব বলল। কিন্তু কথার মধ্যে ডেভিড বলল, ‘দারোগাকে কী বলিবেন? আপনি বন্ড সই করিয়াছেন। তাছাড়া শুয়ারটা যা রেগে আছে, আমাকে বাইরে দেখলে ও আমার ওপর গুলি চালিয়ে দেবে।’

‘সে আমার ওপর ছেড়ে দাও। টাকা পৌঁছে গেলেই মুখ বন্ধ হয়ে যাবে।’

‘আর ফোর্ট উইলিয়ামে আমাদের অন্য সৈনিকদের কী বলিবেন? ওদের তো নিশ্চয়ই এটা বলা যাবে না যে ডাকাত মারার চুক্তির বিনিময়ে বিশ হাজার সিক্কা টাকা ঘুষের ব্যবস্থা করে আমাকে জেল থেকে ছাড়ানো হইতেছে।

‘সে ভার আমার। লণ্ডনে আমাদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উপর মহল সন্দেহ করছে যে এদেশে আমাদের কর্মচারীরা ব্যাপক চুরি করছে। কোম্পানি ওদের বলে ইন্টারলোপার। ওরা বাদশাহী সহী ও মোহরযুক্ত কোম্পানির দস্তকী ছাড় ও নিশান ব্যবহার করে আর আড়ঙ্গের মোগল দারোগাদের উৎকোচ দিয়ে গোপনে মসলিন কাপড়, কাঁচা সুতো ও অন্যান্য মাল কিনে পর্তুগিজ, ডাচ, ফরাসিদের বিক্রি করে অসদুপায়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করছে। এদের গুপ্ত ব্যবসায়ে কোম্পানির খুব লোকসান হচ্ছে। কাপাসডাঙার হাটে এই সব চুরির মালপত্র কেনা-বেচা হয়। তোমাকে পাঠাচ্ছি এনার জমিদারির উপার্জন ও ট্যাক্সের কাগজপত্র খুঁটিয়ে দেখার জন্য। লণ্ডনে তো তুমি আয়-ব্যয়ের খাতা দেখার কাজ করতে তাই না?’

‘ওটা ফাটকাবাজি ছিল। ফাটকাবাজিটা ভালো ভাবে করতে পারলে এই নরকে আসার দরকার হতো না। ঋণের বোঝার জন্যই তো দেশ ছাড়িলাম।’

রবিন সাহেব আর কথা না বাড়াতে বলল, ‘তুমি তাহলে ডিঙাডুবি যাবার জন্য তৈরি হও।’

‘ডিঙাডুবি? ডিঙাডুবিটা কোথায়? নামই শুনিনি। আমাকে চক্রান্ত করে ফাঁসির বদলে ম্যালেরিয়া বা স্মলপক্সে মারিতে চান? তাহলে এখানেই সে কাজটা শেষ করে দিন।’

‘বাজে কথা বোলো না। কাল বিকালে আমি দারোগাকে এখানে ডাকছি। আমি তোমার সামনে দারোগাকে বিশ হাজার সিক্কা টাকা দেব। দারোগাকে প্রতিশ্রুতি দেব তুমি কাজ সেরে ফিরে এলে তোমাকে যথাশীঘ্র সম্ভব জাহাজে চড়িয়ে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এক মাস সময় চেয়ে নেব। যত তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করবে তত তাড়াতাড়ি তুমি মুক্তি পাবে। পরশু সকালে কোম্পানির নৌকায় মাঝি তোমায় ডিঙাডুবি ছেড়ে আসবে।’

‘ওই সব অজানা জঙ্গলের দেশে আমি থাকিব কোথায়? খাব কী? আমি রান্না করিতে পারি না।’

‘ডিঙাডুবিতে আমাদের ছোট একটা কুঠি আছে। আমি সেখানে নিজে গিয়ে ছিলাম, তুমিও থাকতে পারবে। হাফিজ নামে একজন নেটিভ তোমার সঙ্গে যাবে। ওই তোমার নোকর খিদমতগার খানসামা সব। ও কিন্তু এসবের কিছু জানবে না। আর সাবধান, ওখানে মাথা গরম করে আবার এমন কিছু কোরো না যাতে আবার এমন বিপদে পড়তে হয়। আর পালাবার চেষ্টা করবে না। পাশের ঘাটে প্রতাপপুরে ফাঁড়িদারকে বলা থাকবে।’

‘দু’চেস্ট ইংলিশ ক্ল্যারেট চাই।’

‘হোয়াট!’ রবিন সাহেব তারপর নিজেকে সংযত করে বলল, ‘ঠিক আছে। আয়ারল্যান্ড থেকে জাহাজে আমার জন্য আজ দু-চেস্ট ইংলিশ ক্ল্যারেট নিয়ে এসেছে। তোমাকে একটা চেস্ট দেব।’

‘এক চেস্ট মাত্র? অলরাইট, বাকিটা সস্তার ডাচ ক্ল্যারেট দিয়েই কাজ চালিয়ে দেব।’

‘ঠিক আছে, তুমি তাহলে যাত্রার প্রস্তুতি শুরু কর।’

কিন্তু গ্রামের মেয়েরা গোরা সাহেবদের ভয় পায়। পথে সাহেব দেখিলেই মেয়েরা লুকিয়ে পড়ে। আমি এই বেহুলার সঙ্গে আলাপ করিব কীভাবে? ‘

রবিন সাহেব জমিদার গোপীচরণের দিকে তাকাল, জমিদার তার দেওয়ান দুর্লভচাঁদের দিকে তাকাল। দুর্লভচাঁদের মাথা চলে খুব, সে বলল, ‘বেহুলা জ্যোতিষীর কাছে দূর-দূরান্তরের গ্রাম থেকে লোকেরা কোষ্ঠী দেখাতে আসে। সাহেব, আপনি যদি আপনার একটা কোষ্ঠী নিয়ে ওর কাছে যান তবে—’

‘কী নিয়ে যাব?’ ডেভিডের ভ্রূ-যুগলে বিরক্তির কুঞ্চন।

‘হরোস্কোপ,’ গোপীচরণ বলল।

‘আমি ওসব বুজরুকিতে একদম বিশ্বাস করি না। আর তাছাড়া হরোস্কোপ কোথায় পাইব?’

‘সত্যঠাকুর বানিয়ে দেবেন,’ জমিদার বলল।

সত্যাচার্য মুশকিলে পড়ল। আমতা আমতা করে বলল, ‘কিন্তু সাহেবের জন্ম স্থান, দেশ-কালের দ্রাঘিমা, অক্ষাংশ অনেক কিছু চাই কোষ্ঠী বানাতে—’

‘আরে ধুস,’ জমিদার বিরক্ত হয়ে বলল। ‘সত্যঠাকুর, আপনিও যেমন। ডেভিড সাহেবের এমন একটা কোষ্ঠী বানিয়ে দিন যেটাতে ওর সম্বন্ধে প্রচুর ভালো ভালো কথা লেখা থাকে।’

‘গুড ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট,’ রবিন সাহেব হেসে বলল।

‘ইয়েস। ডেভিড সাহেব সেটা দেখাতে বেহুলা জ্যোতিষীর কাছে যাবে। এমন কোষ্ঠী বানাও সত্যঠাকুর যাতে সেই কোষ্ঠী দেখেই বেহুলা ডেভিড সাহেবের প্রেমে পড়ে যায়।’

‘আপনার কৃপার শেষ নাই, আমি তাহলে এখন যাই, ডেভিড উঠে দাঁড়াল। ‘ঠিক আছে, এসো, রবিন সাহেব অনুমতি দিল। ডেভিড লম্বা লম্বা পা ফেলে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল।

‘বাপরে, একে বাইরে থেকে দেখলে তো একদম গোবেচারা শান্তশিষ্ট ভদ্র বিনয়ী লাগে,’ জমিদার বলল। কিন্তু একদম বারুদ!’

‘ব্যবহারটা দেখলে কেমন রুক্ষ। ওর উপকার করছি আমি, আর আমার ওপর তড়পাচ্ছে। আসলে ওর বাপ ব্যারনের থেকে আমি অনেক উপকার পেয়েছি, অন্য কেউ এরকম ব্যবহার করলে আমিই তার পেটে বেয়নেট ঢুকিয়ে দিতাম।’ রবিন সাহেব এক নাগাড়ে রাগের বিষ উগরে চুপ হল। ‘এর আসল পরিচয় যেন গ্রামের কেউ না জানে। ডাকাতেরা এতটুকু সন্দেহ করলে—’

‘সে চিন্তা করবেন না সাহেব। আমরা সেটা বুঝি,’ জমিদার গোপীচরণ রবিন সাহেবকে আশ্বাস দিল। ‘কিন্তু সাহেব, এ তো অনেক টাকা! বিশ হাজার সিক্কা টাকা মানে প্রায় পঁচিশ-শ’ পাউন্ড স্টার্লিং! কোথা থেকে দেবেন?’

‘সেটা তোমার চিন্তা মালিক,’ রবিন সাহেব কুটিল হাসি হাসল। লেঠেল পুষতে তোমরা টাকা খরচা কর, ধরে নাও এটা একজন ইংলিশম্যান লেঠেল তোমার কাজ করতে যাচ্ছে। ওর তো দাম লাগবেই।’ তারপর সাহেব গম্ভীর গলায় বলল, ‘তোমার আর তোমার এই দুই অপদার্থ শাগরেদের ওপর ভরসা করে আমি উপরমহলে বুক বাজিয়ে বলে এসেছিলাম যে চন্দ্র ডাকাতকে মেরে আমি জঙ্গল ডাকাত-শূন্য করে দেব। আমার একদম নাক-কান কাটা গেছে। তার তো একটা কম্পেনসেশন লাগবে। তাই না?’

গোপীচরণ নিরুত্তর, ওর ইচ্ছা করছিল এক্ষুনি জুতো খুলে দেওয়ানকে পেটাতে। এতগুলো টাকা গচ্চা যাচ্ছে, ভাবা যায়!

এবার সাহেব সান্ত্বনা দিল, ‘ভেবো না মালিক, তোমায় আমি আফিমের ঠিকাদারি পাইয়ে দেব। জর্জ সাহেব আফিমের ঠিকাদারি করে অল্পদিনের মধ্যেই পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড কামিয়ে ইংলন্ডে ফিরে যাচ্ছেন, ওটা তোমার জন্য আমি সুপারিশ করে তোমায় পাইয়ে দেব।’

‘সাহেব ব্ল্যাক-জমিদারিটা –’ গোপীচরণ হাত কচলে বলল।

‘ভাবছি আমি সে ব্যাপারেও,’ সাহেব বলল। ‘কিন্তু আগে ওই মেয়েছেলেটার শাস্তি হওয়া উচিত। ও ডাকাতদের সাবধান করেছে। ওকে ফোর্ট উইলিয়ামে নিয়ে আসতে পারলে সব থেকে ভালো হয়। তারপর ওর ব্যবস্থা আমি করব।’

ঠিক। ওই মাগীর শাস্তি হওয়া উচিত,’ গোপীচরণ মল্লিক গালি দিল। ‘তবে দেশে মোগল নবাবের আইন আছে। যা কিছু অন্যায় করতে হবে আইন বাঁচিয়েই করতে হবে। নতুবা ঘুষখোর ফাঁড়িদার আমাদের ছিঁড়ে খাবে।’ সাহেবকে ক্ষোভ দেখালেও গোপীচরণ মনে মনে ক্রূর হাসি হাসল। এত মূর্খ আমি ন‍ই, ওই মেয়ের জন্য তোমার লোভ আছে তা আমি জানি সাহেব। কিন্তু ওই মেয়েকে তুমি পাবে না। ওর জন্য আমার অন্য ব্যবস্থা ভেবে রাখা আছে।

ফোর্ট উইলিয়াম থেকে জমিদার গোপীচরণ মল্লিক, দেওয়ান দুর্লভচাঁদ আর সত্যঠাকুরকে নিয়ে রাগে গজগজ করতে করতে বেলেঘাটা ফিরে এল। দেওয়ান খুঁতখুঁতে গলায় বলল, ‘জমিদারবাবু, আপনার এই রবিন সাহেব এক ঢিলে তিন পাখি মারতে যাচ্ছে না তো?’

‘কী বলতে চাও, খুলে বল,’ জমিদার রুষ্টস্বরে বলল।

‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হিসাব পরীক্ষক আমাদের খাতা সত্যি সত্যি যদি খুঁটিয়ে দেখে তবে—’

গোপীচরণ খুশি হল। এই লোকটার খুলির ভিতর শিয়ালের মস্তিষ্ক। ‘হিসেবের খাতা আপনি আপনার মতো করে ঠিকমতো তৈরি রাখবেন। দেশ খরচা, শাদী খরচ, মাথুট, বিট্টি বিরত্তি খাতের খরচ কিছু দেখাবেন না। আর আমাদের ওই বিশেষ ব্যবসার খাতা যেন কিছুতেই এই ডেভিড সাহেবের নজরে না আসে।’

আপনি চিন্তা করবেন না, জমিদারবাবু, আমার সেসব খাতা আলাদা।’

‘খাজনার ক্ষেত্রে শুধু রায়তদের চিট্টা ও রসিদ দেখাবেন। উনি কিন্তু রায়তদের এবং এতেমামদারদের সমস্ত কাগজ, মাসিক চিট্টা আর সকল রসিদ মিলিয়ে মিলিয়ে দেখবেন। দেখবেন যেন কোনো অমিল ধরা না পড়ে। আমি জানি আপনি এ কাজ বহু দিন ধরে করছেন, তবু খুব সাবধানে থাকবেন এবং ডেভিড সাহেব যেন কোনো রায়তের সঙ্গে কথা বলে বিরূপ তথ্য জোগাড় না করতে পারে সে বিষয়ে আপনি সতর্ক থাকবেন। রবিন সাহেবকে আমি এতটুকু বিশ্বাস করি না।’

দেওয়ান হাসিমুখে বলল, ‘জমিদারবাবুর ইচ্ছা আমার কাছে আদেশ। সব হয়ে যাবে। আমাদের মুৎসুদ্দী খুবই চতুর। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না।’

‘কাল আপনি সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ুন।’

‘ঠিক আছে, আমি ব্যবস্থা করব। আদেশ করুন আমরা তাহলে উঠি।’ দেওয়ান তার কটিবন্ধের গ্রন্থি কষে বাঁধল।

গোপীচরণ মল্লিক মনে মনে ভাবতে লাগল দুর্লভচাঁদ তো এখন যাবে তার রক্ষিতার কাছে। কিন্তু এই সত্যঠাকুরও? মানবচরিত্র বোঝাই কঠিন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *