1 of 2

বিদ্বান বনাম বিদুষী – ২৮

।। আঠাশ।।

দেওয়ান দুর্লভচাঁদ গ্রামে ফিরে ঢেঁড়া সরাবতে গ্রামবাসীদের জানিয়ে দিল যে জমিদারবাবু গ্রামে ক’দিন এসে থাকবেন, সঙ্গে আসবেন তাঁর বিশিষ্ট বন্ধু ফোর্ট- উইলিয়ামের খুব বড় ইংরেজ অফিসার রবিন সাহেব। জমিদারি থেকে গ্রামবাসীদের পিরান- ধুতি আর মেয়েদের পাছাপাড়ের ভোগা তুলোর মোটা কাপড় দেওয়া হল, আর বলা হল জমিদারবাড়িতে তলব হলে যেন এই পরিষ্কার পোশাক পরে আসা হয়।

গ্রামে সাজো সাজো রব। ভাঙা খেয়াঘাটের মেরামত হল, রাস্তায় পাথরের নুড়ি ঢালা হল, গ্রামের এঁদো আন্ধাপুকুরগুলো সংস্কার করা হল, জমিদারবাড়িতে অনেক মেরামত সাজসজ্জা করা হল। দুপুর থেকে ডিঙাডুবির ঘাটে ভিড়। দেওয়ান দুর্লভচাঁদ পাশের নবাবগঞ্জের সাহেবদের কুঠিতে গিয়ে কুঠিয়ালদের দুটো হাতির একটাকে রবিন সাহেবের জন্য নিয়ে এসেছে। অঙ্কুশ হাতে কুর্তি- পাগড়ি পরে মাহুত হাতির পিঠে সজ্জিত হাওদার সামনে বসে নদীপথের দিকে তাকিয়ে জমিদারের বজরার আগমনের অপেক্ষায়। দুটো ঘোড়াকে সাজিয়ে আনা হয়েছে। দুর্লভচাঁদ জমিদারের জন্য একটা রূপোর পাত মোড়া পালকি, ও দুটো অন্য সুসজ্জিত পালকি ঘাটে তৈরি রেখেছে। বেহারাদের প্রত্যেকের পরনে আজ পরিষ্কার পিরান আর হাঁটু অবধি খাটো ধুতি। দেওয়ান নিজে পায়চারী করতে করতে শ্রান্ত হয়ে একটা কুর্শিতে উপবেশন করে মাথার থেকে কেতাদুরস্থ পাগড়িটা খুলে কোলে রাখল। রোদ্দুর থেকে দেওয়ানের মূল্যবান মস্তক রক্ষা করতে একজন চামরদার দেওয়ানের মস্তকের পিছনে চামর ধরল। এলাহী ব্যবস্থা হয়েছে বড় সাহেবের জন্য। সাহেব ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কালেক্টর!

জমিদারের নিজস্ব একটি সুসজ্জিত বজরা ছিল গঙ্গায় বেড়াবার জন্য। বিলাস ব্যসনের উপাদান সব কিছু মজুত তাতে। চল্লিশ হাত নৌকা, কিন্তু খুব দ্রুতগামী। বারোজন দাঁড়ি ও দু’জন মাঝি জমিদারের সুসজ্জিত বজরা বেয়ে নিয়ে এল বিকালে ডিঙাডুবির ঘাটে। এছাড়া কাল এসে পৌঁছেছে বাবুর্চি-খানসামা-ভৃত্যদের নৌকা। ঘাটের দু’পাশে সেই ভৃত্যরা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে। সিঁড়ির প্রারম্ভেই রবিন সাহেবকে পুষ্পমাল্যে বিভূষিত করে দেওয়ান স্বাগত জানাল। সাহেব যখন ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে তখন ভৃত্যরা সাহেবকে দেশি কায়দায় অভিবাদন করতে লাগল। দেওয়ান বাজনদারদের ইঙ্গিত করল এবং বাজনদাররা সানাই, ঢোল, কাঁসি বাজাতে লাগল। জলযাত্রায় অনভ্যস্ত রবিন সাহেবের বিবমিষা এসব হট্টগোল সহ্য করতে পারল না। রবিন সাহেব ‘স্টপ দিস নয়েজ!’ বলতেই জমিদার গোপীচরণ মল্লিক ইঙ্গিত করল। সঙ্গে সঙ্গে সব চুপ। রবিন সাহেব হাতি ঘোড়া ইত্যাদির দিকে তাকিয়ে পালকিতে গিয়ে বসল। জমিদারবাবু তার নিজস্ব পালকিতে। বেহারারা পালকি কাঁধে তুলে নিল। পালকি চলতে লাগল। পিছে পিছে শ্রেণীবদ্ধভাবে বাজনদাররা তাদের বাজনা সাজ সরঞ্জাম নিয়ে নীরবে জমিদার বাড়ি পর্যন্ত এসে থেমে গেল। অতিথির সঙ্গে জমিদার ঢুকলেন জমিদারবাড়িতে।

জমিদার বাড়ির সামনের মাঠে এক বিরাট ছাউনি লাগানো হয়েছে। উর্দি পরা খানসামা, লোক-লস্কর ছাউনির ভিতর-বাহিরে ব্যস্ত হয়ে কাজকর্ম করছে। সাহেব আর সঙ্গে প্রায় বিশজন দেশি সৈন্য ছাউনির বাইরে দাঁড়িয়ে। এবার সৈন্যদের একত্রে বন্দুকের আওয়াজ ঘোষণা করল যে সূর্য অস্ত গেল, সঙ্গে সঙ্গে ড্রাম, বিউগল, ট্রাম্পেট বেজে উঠল। ঠিক যেন যুদ্ধের দামামা বাজছে। গ্রামবাসীদের ভিড়ের মধ্যে ছদ্মবেশে ডাকাতদের চরেরা বুঝে গেল এখন কিছুদিন চুপচাপ গা ঢাকা দিয়ে থাকার সময় হয়েছে।

সন্ধ্যাবেলা জমিদারবাড়ি বেলোয়ারি ঝাড়বাতির আলোকমালায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল। লখনউ থেকে বিখ্যাত আতশবাজদের আনা হয়েছে আতশবাজির উৎসবের জন্য। সামনের প্রাঙ্গণে অতিথি সাহেবের সম্মানার্থে মহাতাপ, সীতাহার পোড়ানো শুরু হল। কিন্তু রবিন সাহেব ক্লান্ত ও অসুস্থপ্রায় ছিলেন তাই সত্বর শয্যাগ্রহণ করলেন।

পরদিন বিকালেও একই রকম খাতিরদারি হল। ডিঙাডুবির গ্রামের মানুষজন কখনো এরকম এলাহি ব্যাপার দেখেনি। যারা দেখল তারা রঙ চড়িয়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে গল্প বলতে লাগল। ডিঙাডুবির একঘেয়ে গতানুগতিক জীবনে এ এক বিশাল কাণ্ডকারখানা। বচনপিসি সব শুনে বেহুলাকে বলল কাল আমরাও যাই চল, চুপটি করে দেখে আসি।

দু’দিন ধরে সন্ধ্যায় এই বন্দুকের আওয়াজ শুনে কৌতূহল হয়েছিল বেহুলার, তারপর বচনপিসি বলল এদের এলাহি ব্যাপার-স্যাপারের কথা। বেহুলার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল গিয়ে দ্যাখে, কিন্তু এই যুদ্ধবাজ গোরা সাহেবদের সম্বন্ধে গল্প শুনে শৈশব থেকেই বেহুলার মনে গেঁথে রয়েছে যে এদের থেকে দূরে থাকাই মঙ্গল। তাই বেহুলা কিন্তু কিন্তু করছিল। বচনপিসি বলল, ‘আমরা অনেক দূর থেকে দেখে ফিরে আসব।’ বচনপিসির জোরাজোরিতে বেহুলা রাজি হল।

পরদিন গোরা সৈনিকের বন্দুকবাজী আর তারপর আতশবাজির রংমশাল দেখতে গেল বেহুলা আর বচনপিসি। কাপাসডাঙার মাঠের শেষে একটা পাকুড় গাছের নীচে দাঁড়িয়ে দূর থেকে দেখা যাচ্ছে। বড় তাঁবু খাটানো হয়েছে। গরমে যাতে হাওয়া চলাচল করতে পারে তার জন্য তাঁবুর কানাত খুলে ফেলা হয়েছে। দূর থেকে ভিতরে দেখা যাচ্ছে বেলোয়ারি আলো। টেবিল সাজানো হয়েছে। একটা বড় রূপার গামলায় হাত ধুয়ে সাহেব এবং জমিদারবাবু এখন ভোজনে বসল, তাদের কেদারার পিছনে একজন উর্দি পরা খানসামা দাঁড়িয়ে, সাহেবের অঙ্গুলি হেলনের সঙ্গে সঙ্গে সাহেবের হুকুম তামিল করে রেকাব নিয়ে ছুটে আসছে।

দেখতে দেখতে দিনের আলো একদম আকাশ থেকে মুছে এল। বচনপিসি তাড়া দিল, ‘এবার চল বেহুলা। সন্ধ্যাতারা উঠে গেছে আকাশে অথচ ভিটের তুলসীতলায় প্রদীপ পড়েনি। ঘর বাসি দোর বাসি, গিন্নী করেন পঞ্চগ্রাসী।’

বেহুলা পাচনবাড়ি হাতে বচনপিসির সঙ্গে কাপাসডাঙার মাঠের দিকে এগোলো। অন্ধকার হওয়ার আগে বাড়ি পৌঁছে যাবে। মাঠের ধারে ধারে শিরীষ গাছে গোছা গোছা হালকা হলুদ ফুল উগ্র গন্ধ ছড়াচ্ছে। মাঠের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে বেহুলা ঠিক করল কক্ষনো আসবে না এই সাহেবদের ত্রিসীমানায়। এদের জীবনযাত্রা দেখলে মনে কেমন অস্বস্তি আর ভয় হয়। এদের থেকে যত দূরে থাকা যায় ততই মঙ্গল।

কিন্তু তখন কী আর সে জানত তার কোষ্ঠীর ফাঁক-ফোকরে কোথাও লেখা আছে যে শীঘ্রই তার দেখা হয়ে যাবে এক সাহেবের সঙ্গে, যে মানুষটা তার জীবনের সঙ্গে ওতঃপ্রোত ভাবে জড়িয়ে যাবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *