1 of 2

বিদ্বান বনাম বিদুষী – ২৭

।। সাতাশ।।

জমিদার গোপীচরণ মল্লিক তার বেলেঘাটার জলটুঙ্গিতে দেওয়ান দুর্লভচাঁদকে জরুরি তলব করল একটি বিশেষ বিষয়ে শলা পরামর্শের জন্য। ডিঙাডুবি থেকে দুর্লভচাঁদ ছুটল বেলেঘাটা। আজ জমিদার সন্ধ্যায় বারাঙ্গনাদের কোঠাতে না গিয়ে অপেক্ষা করছিল দেওয়ানের জন্য। দুর্লভচাঁদ এলে জমিদার ভৃত্যদের বলল মন্ত্রণা-ঘরে কাউকে আসতে না দিতে।

‘কী ব্যাপার জমিদারবাবু? খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যাপার?’

‘তা না হলে আপনাকে এত ক্লেশ দিয়ে ডিঙাডুবি থেকে ডেকে পাঠাই?’

‘আপনার আদেশ শিরোধার্য। যে কোনো ক্লেশ আমি সহ্য করতে প্রস্তুত।’

প্রসন্ন হলো গোপীচরণ মল্লিক। ‘এবারের কাজ ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।’ গলা নামিয়ে বলল, ‘রবিন সাহেব শিকারে যাবেন ডিঙাডুবি। আমিও সঙ্গে যাব। আপনাকে সাহেবের জন্য খুব ভালো বন্দোবস্ত করতে হবে। যদিও উনি ফিরিঙ্গি কুঠিতে থাকবেন বলছেন, কিন্তু প্রথম দুয়েকদিন আমাদের জমিদারবাড়ির আতিথ্য গ্রহণ করতে উনি রাজি হয়েছেন।’

‘শিকারে ডিঙাডুবি?’ দেওয়ান দুর্লভচাঁদ অবাক। ‘আপনার এই বেলেঘাটা থেকে চৌরঙ্গীর মধ্যে এত বড় জলা আর বাদাভূমিতে বিস্তর হাঁস, চখা, টিলা আসে, গোরা সাহেবেরা তো এখানেই দেখি পাখি শিকার করতে আসে। আর তাতেও না মন ভরলে দমদমা কাছেই আছে। ওখানে অত পাখি পাওয়া যায়।’

‘সাহেব হয়তো বড় কিছু শিকার করতে চায়,’ গোপীচরণ মল্লিক রহস্যময় হাসি হাসলো।

‘কলকাতার জঙ্গলগুলোতেই হরিণ, বুনো-শুয়োর, এমনকী বাঘও চলে আসে। অতদূর যাওয়ার কী প্রয়োজন? সাহেবের নিশ্চয়ই অন্য অভিসন্ধি আছে জমিদারবাবু। আপনি ওনার সঙ্গে খোলাখুলি একবার কথা বলুন।’

‘এজন্যই তো আপনাকে আমি এত পছন্দ করি দেওয়ানজী। আপনার মাথা খুব ভালো কাজ করে।’

দেওয়ান দুর্লভচাঁদের চিন্তাক্লিষ্ট মুখের ওপর সামান্য আত্মতুষ্টির রেখা জেগে উঠে মিলিয়ে গেল ‘জমিদারবাবু, দয়া করে সাহেবকে বুঝিয়ে বলুন যে কলকাতা শহর থেকে ডিঙাডুবির রাস্তা অত্যন্ত বিপদসঙ্কুল। ডাকাতের দল পথিকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সব লুটপাট করে হত্যা করে। ওরা খুব নির্মম।’

‘সেসব কী আর সাহেব জানেন না। ইংরেজদের কাছে সব খবর থাকে। আসল কথাটা হল টাকা-কড়ি নিয়ে ইংরেজদের ডাকগাড়ি আসার পথে জঙ্গলে ডাকাতের দল লুটপাট করে নিচ্ছে। বজ্র ডাকাতকে হত্যা করেও তাদের সুরক্ষার আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। আমাদের এলাকার এখন সবচেয়ে কুখ্যাত ডাকাত হল চন্দ্ৰ সর্দার। সাহেব আমার সাহায্য চেয়েছে তাকে ধরিয়ে দেবার। চন্দ্র সর্দারকে ফাঁসি দিলে অন্য ছোটখাট ডাকাতরা ভয় পেয়ে যাবে। তাতে নবাবের কাছে ইংরেজদের মান বাড়বে, বিনিময়ে উনি আমাকে নবাবের কাছে পুরস্কারের জন্য সুপারিশ করবেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চায় কলকাতা আসার পথে কয়েকটি কোষাখানাকে প্রচুর সুরক্ষিত করতে যাতে ইংরেজদের উপার্জিত অর্থ সেখানে রাখা যায়। আমাদের ডিঙাডুবি পুব থেকে কলকাতা আসার পথে পড়ে। রবিন সাহেব এবার থেকে কলকাতা আসার পথে রাতের আশ্রয় হিসেবে আমাদের ডিঙাডুবির রাজবাড়ির কোষাখানাতে ইংরেজদের খাজনা রাখতে চান। সেই উদ্দেশ্যে তিনি আমাদের ডিঙাডুবির কোষাখানা পরিদর্শন করতে চান এবং সেই কোষাখানা তাদের পাইক পাঠিয়ে সুরক্ষিত করতে চান।’

‘উত্তম,’ দেওয়ান দুর্লভচাঁদ বলল। ‘কিন্তু তাতে আপনার লাভ?’

‘রবিন সাহেব আমাকে তার ব্ল্যাক জমিদারের পদ দেওয়ার ব্যাপারে চিন্তা করবেন বলেছেন। কালেক্টরের ব্ল্যাক জমিদারের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি কেমন তা আপনি ভালোই জানেন দেওয়ানজী। তাছাড়া আমাদের ওই বিশেষ ব্যবসাটার জন্য সাহেবের সঙ্গে বিশেষ খাতির রাখা খুবই দরকারি এটা আপনি বুঝতেই পারছেন।’

‘হুম,’ দেওয়ান দুর্লভচাঁদ ভাবতে লাগল।

‘কী ভাবছেন?’

‘আগামী সপ্তাহে ঢাকা থেকে পনেরো জন বালিকা পাঠাচ্ছে। ভাবছি রবিন সাহেবের জন্য বন্দোবস্ত করতে গেলে কোথায় রাখব ওদের?’

‘ওদের এখন পাঠাতে নিষেধ করে দিন, বলুন নিজেদের কাছে ওদের সামলে রাখতে। এক মাস পর ওদের আমরা নেব।’

‘কেউ রাজি হবে না জমিদারবাবু। এসব ব্যবসায়ে পদে পদে পুলিশের ভয়। অতদিন কেউ কখনো বিপদ নিজের ঘাড়ে রাখে?’

‘তাহলে? আমাদের গুমঘরে কিন্তু ভুলেও ওদের ঢোকাবেন না।

‘কিছুদিন আগে নদীর পাড়ের পুরোনো পর্তুগিজের কেল্লাটার বন্দীঘর সংস্কার করিয়েছি। ভেবে রেখেছি এবার থেকে ওর ভিতর ওদের ঢুকিয়ে রাখব।’

‘আর ওরা চেঁচামেচি করলে?’

‘সে আমি ভেবে রেখেছি। চড়া মাত্রায় আফিম খাইয়ে রাখব। আর তাছাড়া ওই ভাঙা কেল্লার শুকনো মজা পরিখা পার হয়ে কেল্লার ত্রিসীমানায় জনমানুষ যায় না। আপনি চিন্তা করবেন না, সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। সাহেব কবে যাবেন?’ দেওয়ান বলল।

‘আমি পনেরো দিন সময় চেয়েছি।’

‘তার মানে হাতে একদমই সময় নেই। ঠিক আছে আমি ব্যবস্থা করব। অনেক কাজ। আমি তাহলে উঠি। এখনি ফিরে যাব। আমাকে আদেশ করুন।

গোপীচরণ মল্লিক মনে মনে হাসল। দুর্লভচাঁদ এখন যাবে তার রক্ষিতার কাছে। আজ গোটা রাতটা সেখানে গাত্রমার্জন করিয়ে তারপর ডিঙাডুবি ফিরবে কিন্তু এ লোকটার চরিত্রদোষের সমালোচনা করার কোনো অর্থ হয় না, প্রায় প্রত্যেক ইউরোপীয় সৈনিকেরই কলকাতায় অন্তত একজন করে আধা-পরিবার রাখা আছে। কলকাতার অনেক সাহেবই বাড়ি ভাড়া করে ‘ফর পার্সোনাল ইউজ’ মেয়ে রাখে। সকলের পক্ষে তো আর নবাবের মতো হারেম রাখা সম্ভবপর হয় না। আর সত্যি কথা বলতে কী পুরুষ মানুষের এই চারিত্রিক গুণাবলীর জন্যই তার ক্রীতদাসী বিক্রির গোপন ব্যবসার এত রমরমা। এই দেওয়ানকে ছাড়া তার ওই ব্যবসা একদম অচল। তাই মাঝেসাঝে চোখ বন্ধ রাখতেই হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *