।। পঁচিশ।।
নমিতা এই প্রথম লালবাজারে এল। মনসুর হক লালবাজারের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি কমিশনার অফ পুলিশ। বিশাল অফিস। কাচে ঢাকা ডেস্ক, সাইড ডেস্কে একটা কম্পিউটারের মনিটরের স্ক্রিন সেভারে সমুদ্রের নীল জলে জেলি ফিশ ধীরে ধীরে নামছে আবার উঠছে। পিছনের দেওয়ালে লালবাজারের বিশাল ল্যামিনেটেড ফটো। চেয়ারের ব্যাক রেস্ট সাদা ধবধবে তোয়ালে ঢাকা।
নমিতাদের দেখে ডেপুটি কমিশনার অফ পুলিশ উঠে দাঁড়িয়ে হেসে আপ্যায়ন করে ভিতরে আসতে বললেন। ডিসির টেবিলের উল্টোদিকে বসে একজন চওড়া গোঁফওয়ালা মাঝবয়সী লোক। নমিতারা চেয়ারে বসলে ডিসি নিজের গদি আঁটা চেয়ারে বসলেন।
মিস বসাক নমিতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এবার মনসুর হক সামনের ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন—‘ইনি মিঃ রামকুমার দুবে, কলকাতা পুলিশের পাব্লিক সার্ভেলেন্স ক্যামেরা সিস্টেমের কন্ট্রোল রুম সুপারভাইজার। তোর মেয়ের ড্রাঙ্কেন ড্রাইভিং কেসটা সম্বন্ধে তদন্তের জন্য আমি এনার সাহায্য চেয়েছি।’ তারপর মনসুর হক মিস বসাককে দেখিয়ে খুব সম্মানের সঙ্গে বলল, ‘দুবেজী, এঁর কথা আমি আপনাকে বলেছি। ইনি মিস বসাক। দিল্লি থেকে এসেছেন। খুব নামকরা উকিল। আমার সেন্ট জেভিয়ার্সের ক্লাস মেট। আমার বিশিষ্ট বন্ধু।’
দুবেজী নমস্কার করলেন। নমিতা আর মিস বসাক প্রতিনমস্কার করল। ‘দুবেজী, এবার আপনি এঁদের একটু ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলুন, মনসুর হক বললেন।
‘হ্যাঁ বলছি,’ দুবেজী বললেন। ‘ম্যাডাম, কলকাতায় ক্রাইম প্রিভেনশনের জন্য, আর মানুষ ও প্রপার্টির সিকিউরিটি আর প্রোটেকশনের জন্য শহরের বিভিন্ন জায়গায় হাজারখানেক পাব্লিক সার্ভেলেন্স ক্যামেরা বসানো আছে। রাজপথে ট্রাফিক-বিধি ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এবং আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য কলকাতা পুলিশের অস্ত্র হল এই নজরদার সিসি ক্যামেরা। এই সিসি ক্যামেরাগুলো হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের ছাতে, রাস্তার ইমপর্টেন্ট জংশনে ইলেকট্রিক পোলের মাথায় এবং আরো নানা জায়গায় বসানো আছে। এরা চব্বিশ ঘন্টা পথঘাটের চলাচল রেকর্ড করতে থাকে। আপনার মেয়ের অ্যাকসিডেন্টের লোকেশন আর ডেট সম্বন্ধে স্যার আমাকে বলেছেন। আমাদের সার্ভেলেন্স মনিটরিং সেন্টারে এই সমস্ত ক্যামেরার ভিডিও ও ডাটা সংগ্রহ করা হয়। আমি চেষ্টা করছি যদি ওই অ্যাক্সিডেন্টের রেকর্ডিং পাওয়া যায়।’
‘আচ্ছা!’ মিস বসাক আশাবাদী দৃষ্টিতে তাকালেন। ‘ওটা এতদিন পরও পাওয়া যেতে পারে?’
‘আমাদের পাব্লিক সার্ভেলেন্স ক্যামেরা সিস্টেমের কন্ট্রোল রুমের সার্ভারে এই ভিডিওগুলো ত্রিশ দিন পর্যন্ত স্টোর করা থাকে। যদি পুলিশ বা আদালত আমাদের কাছে রিপোর্ট চায়, আমরা সেই রেকর্ডিং পুলিশের হাতে রিলিজ করে দিই। যে লোকেশনে আপনার মেয়ের অ্যাকসিডেন্টটা হয়েছে, ফর্চুনেটলি সেখানকার রাস্তার ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণ আমাদের সেন্টার থেকে হয়। আপনার মেয়ের অ্যাক্সিডেন্টের সিনটা সেই ক্যামেরা নিশ্চয়ই রেকর্ড করেছে। আমি ওটা একবার নিজে খুঁজে দেখব।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ, দুবেজী,’ মিস বসাকের কণ্ঠস্বরে কৃতজ্ঞতা ঝরে পড়ছে।
‘ইউ আর ওয়েলকাম, ম্যাডাম,’ দুবেজী বললেন। তারপর মনসুর হককে দেখিয়ে দুবেজী বললেন, ‘স্যার যখন আছেন, তখন আপনাদের সাহায্য করতে কোনো অসুবিধা হবে না। আমি অবশ্যই আপনাদের হেল্প করব। তবে আমি এই কেসটার তদন্তে নেই।’
‘ও ব্যাপারটা আমি দেখে নেব,’ মনসুর হক বললেন। ‘অবিনাশ ভরদ্বাজ নামে একজন পুলিশ অফিসার এই কেসের ইনচার্জ। আমি অবিনাশ ভরদ্বাজকে বলে রাখব। দেখা যাক আমরা কতটা কী করতে পারি।’
‘স্যার, আমি তাহলে এখন আসি?’ দুবেজী বললেন।
‘থ্যাঙ্ক ইউ, দুবেজী, মনসুর হক বললেন।
‘থ্যাঙ্ক ইউ, দুবেজী, মিস বসাক কৃতজ্ঞতা জানালেন।
দুবেজী চলে গেলে মনসুর বললেন, ‘মাধবী, আমি বুঝতে পারছি, তুই টাফ টাইমের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিস, কিন্তু আমি জানি তুই খুব স্ট্রং মেয়ে। তুই ঠিক এই সিচুয়েশন থেকে বেরিয়ে আসবি। কলকাতা পুলিশ তোকে সব রকম সাহায্য করবে। তবে আমার মন বলছে এটা একটা বড় ক্রিমিন্যাল নেটওয়ার্কের কাজ। আমি তাই আরুষির সিকিউরিটির জন্য একজন ডিটেকটিভকে পাহারায় লাগাবো। আর নেক্সট ওয়ান উইক তোর কেসের সঙ্গে যারা ইনভলভড আছে বলে তুই আমায় কাল জানিয়েছিস আমি তাদেরও একটু চোখে চোখে রাখব। ইনক্লুডিং ইউ ড. স্যান্যাল। সাবধানের মার নেই। আর গগন ঢালিকে বলে দে শোভাবাজার পুলিশ স্টেশনে যেন অবশ্যই একটা এফ আই আর করায়, আমি বলে রাখব, কোনো অসুবিধা হবে না। চা খাবি তো?’
আজ থাক মনসুর,’ মিস বসাক হেসে বললেন। ‘তুই আমার জন্য যা করছিস তার জন্য আমি খুব কৃতজ্ঞ থাকব।
‘লজ্জা দিস না, মনসুর হক বললেন। তারপর নমিতার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ম্যাডাম, জানি না আপনাকে মাধবী বলেছে কিনা। আমার ব্লাড গ্রুপ ‘ও-নেগেটিভ’। আপনি জানেন যে খুব রেয়ার ব্লাড গ্রুপ। আমার মাথাটা ছোটবেলা থেকে একটু বেশিই গরম। কলেজে পড়ার সময় একবার নাইট- শোতে সিনেমার ব্ল্যাকারদের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে গেছিলাম। ওদের একজন পেটে চাকু চালিয়ে দিয়েছিল। খুব ব্লিডিং হয়েছিল। হয়তো মারাই যেতাম। আমার ক্লাস মেট এই ম্যাডাম—মনসুর হাতের তালু দিয়ে মিস বসাককে দেখালেন ‘আমার জন্য মাধবী সেই রাতে ‘ও-নেগেটিভ’ ব্লাড দিয়েছিল। মুসলিম আর হিন্দু ব্লাড যদি একবার মিলেমিশে যায় তবে এমন কামাল করে দেয় যে ভগবান আর আল্লা বেহেস্তে খুশি হয়ে হাই-ফাইভ করে। আমি একদম ভালোমানুষ হয়ে গেলাম ম্যাডাম। পড়াশোনায় নজর দিলাম, আর কখনো পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। আর আজ আমি এখানে।’
নমিতা মাধবী বসাকের দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকালো। উনি ধরা পড়ে যাওয়ার লজ্জিত হাসি হাসলেন। তারপর বললেন, ‘আজ উঠি রে মনসুর। অনেক কাজ বাকি। চা একদিন তোর বাড়ি গিয়ে খাবো।’
মিস বসাকের সঙ্গে নমিতা উঠে দাঁড়ালো। এই মহিলার যত পরিচয় পাচ্ছে, নমিতা তত এর ফ্যান হয়ে যাচ্ছে।
