।। চব্বিশ।।
১২ আগস্ট, ২০১৯
‘সরি আয়্যাম লেট!’
দুপুরে ধুপধুপ করে শব্দ করে অ্যাডভোকেট বসাক ঢুকলেন, হাতে একটা বড় বাক্স। ‘দিল্লি থেকে আমার একটা টিমকে এখানে আনছি, তার জন্য একটা কনফারেন্স কলে অনেকক্ষণ সময় লেগে গেল।’ বাক্সটা বিদ্যাদির ডেস্কে নামিয়ে রাখলেন মিস বসাক।
‘এটা কী?’ বিদ্যাদি বলল।
‘খুলেই দেখুন,’ মিস বসাক মিটিমিটি হাসলেন।
বিদ্যাদি বাক্সটা খুলল। নমিতা দেখল বাক্স ভর্তি পেন্সিল, ইরেজার, ক্রেয়ন এর রঙ পেন্সিল, খাতা।
‘আপনার স্কুলের বাচ্চাদের জন্য।’
বিদ্যাদির দু’চোখে কৃতজ্ঞতা ঝরে পড়ছে—‘এটা দিয়ে তো এদের কয়েকমাস চলে যাবে, মিস বসাক!’
‘আমি আবার পাঠাব। কী সুন্দর ছবি আঁকে বাচ্চাগুলো।’ দেওয়ালে সাঁটা ছবিগুলো দেখিয়ে বললেন মিস বসাক। ‘এখন চলুন তাড়াতাড়ি যাওয়া যাক। দেরি হলে মেয়ে আবার বিগড়ে না যায়।’
‘আপনারা গাড়িতে যান, আমি রূপাকে একটু বুঝিয়ে দিয়ে এক্ষুনি নিচে আসছি, বিদ্যাদি বলল।
সিঁড়িতে নামতে নামতে মিস বসাক বললেন, ‘পড়ছেন ‘বেহুলার খনা’?’
‘হ্যাঁ,’ নমিতা বলল। ‘তবে কপালের লিখন দেখে ভবিষ্যৎ বলা, ললাট-চিহ্ন,
প্রারব্ধ এসব কুসংস্কারগুলো মেনে নেওয়া যাচ্ছে না।’
‘আপনি দু-তিনশো বছরের আগেকার শিক্ষাকে আজকের তারিখে নামিয়ে এনে বিচার করছেন, তাই এমনটি লাগছে। নিজেকে দু-তিনশো বছর পিছিয়ে নিয়ে যান, দেখবেন স্বাভাবিক লাগবে।’
নমিতা মিস বসাকের দিকে তাকালো। এই মহিলা খুব দামি একটা কথা বললেন। বেহুলাকে আজকের জ্ঞানের দাঁড়িপাল্লায় বসিয়ে মাপতে গেলে ওঁর ওপর অবিচার করা হবে।
.
আজ আরুষিকে অনেক শান্ত লাগল। আরুষির বিছানার পায়ের পাশে একটা ডেস্ক আনা হয়েছে, তার অপর দিকে তিনটে চেয়ার পাতা। সেই চেয়ারগুলোতে নমিতারা বসল। আরুষির বিছানার পায়ের কাছে আরেকটা চেয়ার। সেখানে সুব্রত মিশ্র বসলেন। আরুষি পা স্লিংয়ে ঝুলিয়ে পিঠের কাছে দুটো ফোলাফোলা বালিশ লাগিয়ে বসে। মিস বসাক ওঁর ডায়েরি খুলে আরুষিকে বলতে লাগলেন . ‘আমরা তোমাদের কোম্পানি সুশ্রুতকে দু’ভাবে প্রোটেক্ট করার চেষ্টা করতে পারি প্রথমত বলতে পারি যে দু’জনের প্রোডাক্ট আলাদা তাই পেটেন্ট ইনফ্রিঞ্জমেন্ট করা হয়নি। আর দ্বিতীয় উপায় হল কোর্টকে বলব যে প্লেনটিফ’স পেটেন্ট ইটসেলফ ইজ রঙ্গলি গ্র্যান্টেড অ্যাণ্ড ইজ ইনভ্যালিড। পেটেন্টটাই অ্যামফার্মার পাওয়া উচিত না। এই প্রোডাক্ট সম্বন্ধে জ্ঞান বহুদিন ধরে আমাদের দেশে প্রচলিত। পেটেন্টের ভাষায় দিস পেটেন্ট ল্যাকস নভেলটি।’
‘প্রথম পথ ওয়ার্কেবল না,’ আরুষি মিস বসাককে থামিয়ে দিল। ‘অ্যামফার্মার রিপোর্ট অনুযায়ী দু’জনের ফর্মুলা সেম। ওরা তিনটে দেশের ইন্ডিপেন্ডেন্ট ল্যাবরেটরি থেকে কেমিক্যাল কম্পোজিশন অ্যানালিসিস রিপোর্ট সাবমিট করেছে।’
‘ওরা যদি প্রোডাক্ট একদম সেম বলে তাহলে কিন্তু ওরা বিপদে পড়বে। তোমাদের ফার্মের কাছে এই প্রোডাক্টের দশ বছরের বিক্রির প্রমাণ আছে।’
‘মেহেতা এতদিন এই যুক্তি দেখিয়েছে। কিন্তু ওরা বলছে যে দশ বছর ধরে আমরা যে প্রোডাক্ট বিক্রি করেছি তা অন্য ফর্মুলার প্রোডাক্ট হতে পারে। আমরা সেম ব্র্যান্ড নেম রেখে প্রোডাক্ট কম্পোজিশন পালটে দিয়েছি।’
‘পুরোনো প্রোডাক্ট থার্ড পার্টি ল্যাবে টেস্ট করানো যায় না?’
‘আমি রিসেন্টলি আমাদের প্রোডাক্টের কিছু কম্পোজিশন চেঞ্জ করিয়েছিলাম। তাতে ওদের সুবিধা হয়ে গেছে। ওরা আমাদের চার বছর আগের ওষুধের সঙ্গে এখনকার ওষুধের তুলনা করিয়েছে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ল্যাবে—’
‘বুঝেছি,’ মিস বসাক বললেন। ‘আর নতুন ফর্মুলাটা তথাগত জানতো?’
‘হ্যাঁ, ওই ফর্মুলাটাই তথাগত নিয়ে গেছে।’
‘ওকে, তাহলে আমাদের সেকেন্ড রুটটা নিতে হবে। আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে প্লেন্টিফের পেটেন্ট ল্যাকস নভেলটি।’
‘নভেলটি ব্যাপারটা কী?’ নমিতা প্রশ্ন করল।
মিস বসাক বললেন, ‘পেটেন্ট ক্লেমের জন্য নভেলটি হল একটা ইমপর্টেন্ট পেটেন্টিবিলিটি রিকোয়ারমেন্ট। জনসাধারণের জানা জ্ঞানের ওপর পেটেন্ট ক্লেম করলে যাতে পেটেন্ট না দেওয়া হয় তার জন্য নভেলটি চেক করা হয়। এক্ষেত্রে যে হার্বস ব্যবহার করে ওষুধ বানানো হয়েছে সেই হার্বসের কথা আমাদের দেশের লোককথা যেমন খনার বচন ইত্যাদিতে লেখা আছে। তাই ওদের পেটেন্ট অ্যাপ্লিকেশন সুড ল্যাকস নভেলটি যা পেটেন্ট কমিটি বিচার করেনি। সেম পুরোনো নলেজকে ব্যবহার করে তোমাদের কোম্পানিও ওষুধ বানিয়েছে, তাই এটা কখনোই বলা যাবে না যে তোমরা ওদের পেটেন্ট ইনফ্রিঞ্জ করেছ।’
‘কিন্তু ওরা এই ‘বেহুলার খনা’র পাব্লিকেশন ডেট দেখিয়ে বলছে যে এটা রিসেন্টলি ছাপানো হয়েছে।’ আরুষি বলল।
‘রিসেন্টলি ছাপানো হয়েছে সেটা সত্যি,’ মিস বসাক বললেন। কিন্তু মিস দাসের কাছে প্রমাণ আছে যে এর ম্যানুস্ক্রিপ্ট অন্তত তিরিশ বছর আগে লেখা। আমরা সেই ডকুমেন্টস কোর্টে সাবমিট করব।’
‘আশ্চর্য! আমার ল’ইয়ার আদিত্য মেহেতা বলেছিল পাব্লিকেশনের ডেটের ব্যাপারে আহুজার যুক্তি কাটা যাবে না। তাই ওই বই আর কোর্টে না আনাই ভালো। মেহেতা বলেছিল এই কেসে আমার জেতার কোনো সম্ভাবনাই নেই।’
‘আমি বলছি না যে এই কেস আমরা জিতবই, কেননা ওরা পাব্লিকেশনের ডেট ছাড়াও আরেকটা ভয়ংকর যুক্তি দিচ্ছে যে এই বইয়ের কাহিনি অবিশ্বাস্য, যাকে স্ল্যাং ভাষায় বলা হয় ‘গাঁজাখুরি’। সুতরাং এই ওষুধের কথাও বেহুলার মস্তিষ্কপ্রসূত মাত্র, এই ওষুধ কখনোই ছিল না এদেশে। আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে বেহুলার বক্তব্য মোটেই গাঁজাখুরি নয়।’
‘ওকে,’ আরুষি বলল।
‘অ্যামফার্মার জন্য তোমাদের বিজনেস ইকোনোমিক হার্ডশিপ সাফার করেছে। লসের জন্য আমরা একটা কাউন্টার ক্লেম ফাইল করব। আমার অডিটিং টিম এসে তোমাদের রেভিনিউ কম্পেয়ার করে লস ক্যালকুলেট করে ফেলবে। অডিটররা লস অব বিজনেস ক্যালকুলেট করার জন্য তোমাদের অ্যাকাউন্ট্যান্টের সঙ্গে মিটিং করবে। সুনার দ্য বেটার। ওরা কাল সকালের ফ্লাইটে দিল্লি থেকে আসছে।’
‘আমি অ্যাকাউন্ট্যান্টকে জানিয়ে রাখব, সুব্রত মিশ্র বললেন।
‘গুড থ্যাঙ্ক ইউ, আজ এই পর্যন্ত,’ মিস বসাক উঠে দাঁড়ালেন।
নমিতাও চেয়ার পিছনে ঠেলে উঠে দাঁড়াল।
ফেরার সময় গাড়িতে উঠে মিস বসাক বললেন, ‘কেসটা জেতা সহজ হবে না। আহুজা আমাদের ডিঙিবৃষ্টি নিয়ে মাথা খারাপ করে ছাড়বে। আমাদের ওয়ার্ড বাই ওয়ার্ড পড়ে দেখাতে হবে যে বেহুলার গল্পে কোনো অসংগতি নেই।’
নমিতা মাথা নাড়লো, ‘আমি মন দিয়ে পড়ছি ‘বেহুলার খনা’।
‘মনসুরের ফোন এসেছিল, মিস বসাক বললেন। ‘আজ বিকেলে লালবাজারে ডেকেছে। আপনারা আমার সঙ্গে আসবেন?’
‘হ্যাঁ, কোনো দিন যাইনি লালবাজার। চলুন তাহলে এই তীর্থক্ষেত্রেও একবার মাথা ঠেকিয়ে আসি,’ নমিতা হেসে বলল। ‘বিদ্যাদি, তুমি আসবে?’
‘হ্যাঁ, আমার কোনো অসুবিধা নেই, বিদ্যাদি বলল।
‘থ্যাঙ্কস,’ মিস বসাকের চোখের দৃষ্টি এবার কঠোর হয়ে উঠল–‘আমার মেয়ের যে এই অবস্থা করেছে, তাকে তো আমি এত সহজে ছেড়ে দেব না।’
বিদ্যাদির মোবাইল ফোন বাজল। নমিতা দেখল বিদ্যাদি তাড়াতাড়ি ফোন অফ করে দিল।
‘কিছু দরকারি ফোন বিদ্যাদি?’ নমিতা বলল। ‘গাড়ি থামাব?’
‘হ্যাঁ, একটু দরকারি ফোন, বিদ্যাদি বলল। ‘আমায় একটু নামিয়ে দেবে?’
নমিতা রাস্তার ধারে গাড়ি দাঁড় করালো। ‘তুমি কথা বলে নাও, বিদ্যাদি, নমিতা বলল। ‘তারপর আমরা লালবাজার যাব।’
‘ঠিক আছে,’ বিদ্যাদি নেমে গেল। নমিতা গাড়ির ভিতর থেকে দেখল বিদ্যাদি পাশের ফুটপাথে কারোর সঙ্গে হাত-পা নেড়ে উত্তেজিত ভাবে কথা বলছে। বোঝা যাচ্ছে বিদ্যাদি রেগে গেছে। কিছুক্ষণ পর বিদ্যাদি ফিরে এল। বিদ্যাদিকে দেখে মনে হচ্ছে টেনশনে আছে। বিদ্যাদি আর গাড়িতে ঢুকল না। গাড়ির জানলায় মুখ নামিয়ে বাইরে থেকে বলল, ‘তোমরা লালবাজার যাও, নমিতা। আমার একটা খুব দরকারি কাজ এসে গেছে। আমি আজ যেতে পারব না।’
বিদ্যাদির মুখের দিকে তাকিয়ে নমিতা আর কিছু জিজ্ঞাসা করল না। মিস বসাক বললেন, ‘আপনাকে নামিয়ে দিই কোথাও?’
‘না না, আমি চলে যাব। আপনারা চলে যান,’ বিদ্যাদি যেন জোর করেই ওদের চলে যেতে বলল।
নমিতা গাড়ি স্টার্ট করল। কিন্তু ওর মন বলছে ডিস্টার্বিং কিছু একটা ঘটেছে এখন। কী হল হঠাৎ বিদ্যাদির?
