।। তেইশ।।
কথায় বলে অনাথার দৈব সখা। বিদ্যাধরীর খাতের জলের নীচ থেকে জটা পাগলার তুলে আনা পেটরা আবার পাখমারা গণকের রুজি রোজগার শুরু করিয়ে দিল। আর এই ঘটনা বেহুলাকে রাতারাতি বিখ্যাত করে দিল। বিভিন্ন গ্রামে এই খবর ছড়িয়ে গেল যে বারাণসীর বিখ্যাত সত্যাচার্য যে জ্যোতিষবচনের রহস্য ভেদ করতে পারেনি সেই রহস্য কত সহজে পাখমারা গণকের ভাইঝি ভেদ করে তার অর্থ বলে দিয়েছে। ক্রমশ পাখমারা গণকের জ্যোতিষ-মন্দিরে লোকের ভিড় বাড়তে লাগল।
গ্রামবাসীরা বেশির ভাগই গরীব। কোষ্ঠী করার জন্য সকলে কড়ি দিতে পারত না। তাই কেউ কোঁচড়ে করে অনেকটা শিম দিয়ে বলতো, ‘আমাদের জমির আলতাপাতি, খুব মিষ্টি। পরের বার যখন আসব শুকনো বিচি দিয়ে যাব।’ বেহুলা প্রসন্ন মনে তা নিয়ে নিত। কেউ বা আবার কলসির মুখে কাপড় বাঁধা কিছু সরাগুড় দিয়ে গেল, কেউ চাল, আইরি, আঁদোসা, মুড়ি, খই যে যা দিত বেহুলা হাসিমুখে নিয়ে নিত। বেহুলার খ্যাতি এত ছড়িয়ে গেল যে দর্শনপ্রার্থীরা বেহুলার একবারটি দর্শন পেলে নিজেদের ধন্য বলে মনে করতে লাগল। বেহুলার মধ্যে এমন এক ঐন্দ্রজালিক আকর্ষণ ছিল যে শুধু ওর কথা গ্রামবাসীরা জ্যোতিষ-মন্দিরের সামনের মাঠে বসে মুগ্ধ হয়ে শুনত। দেখতে দেখতে বেহুলার প্রতি গ্রামবাসীদের বিশ্বাস এমন বেড়ে গেল যে সকলে ভাবতে লাগল যে বেহুলার সংস্পর্শে থাকলে তাদের কোনো ক্ষতি হবে না। একজন বৃদ্ধা বেহুলাকে বলল, ‘মা, পীরবাবা বলে গেছে যে এ গ্রাম একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। সেই ধ্বংসের দিন আমরা কী করব তা ভাবলেই ভয়ে গা শিউরে ওঠে
বেহুলা হেসে আশ্বাস দেয়, ‘সেদিন তোমরা আমার কাছে সবাই ছুটে এস। আমি তোমাদের বাঁচাব।’ সকলে তখন বেহুলার জয়ধ্বনি করে ওঠে। শান্তিতে তারা বাড়ি ফিরে যায়।
এভাবেই ডিঙাডুবিতে দিন কেটে যায়। একদিন সত্যাচার্য নিজের জ্যোতিষ- আশ্রমের সামনে এসে দেখল আজ কোষ্ঠী দেখাবার জন্য মাত্র দু’তিনজন গ্রামবাসী জড়ো হয়েছে। সত্যাচার্য বিস্মিত হলেও মনের ভাব মুখে প্রকাশ করল না। একজন বৃদ্ধ তার পত্নীর সঙ্গে কোষ্ঠী হাতে নিয়ে বসেছিল সত্যাচার্য তাদের কাছে ডাকল। বৃদ্ধ-বৃদ্ধা উঠে সত্যাচার্যের নিকটে এলে সত্যাচার্য জিজ্ঞাসা করল, ‘আজ লোক এত কম কেন বলতে পারেন?’
বৃদ্ধ ইতস্তত করছিল, কিন্তু বৃদ্ধা বলল, ‘আজকাল সকলে তো বেহুলা মা’র কাছে কোষ্ঠী দেখায়।’
সত্যাচার্যের অহংকারে আঘাত লাগল। সে রুষ্ট হয়ে বলল, ‘তাহলে তোমরা কেন আমার কাছে এসেছ? তোমরাও ওখানেই যাও। তোমাদের বেহুলা মা’র কাছে।’
এবার বুড়ো বিষণ্ণ গলায় বলল, ‘পারলে কি আর যেতাম না? ওখানে প্রচুর ভিড়। আমরা কি আর এ’বয়সে সারাদিন অপেক্ষা করতে পারি? বেশিক্ষণ বসে থাকলে কোমরে খুব ব্যথা হয় যে। তোমার এখানে তো খালি, তাই তোমার এখানেই আসি।’ বৃদ্ধ ভাবল বোধহয় সে জ্যোতিষ-ঠাকুরকে রুষ্ট করল। তাই সামলাতে গিয়ে বলল, ‘তোমার জ্ঞানও তো বাবা কিছু কম না। একী তুমি উঠে পড়লে কেন?’
‘আমার শরীর ভালো লাগছে না,’ সত্যাচার্য বলল। ‘আজ আমি কোষ্ঠী দেখতে পারব না।’
সত্যাচার্য গৃহমধ্যে প্রবেশ করল। মন বড় অপ্রসন্ন। সে খিড়কি দরজা খুলে বাইরে তাকাল। কাপাসডাঙার মাঠে সারি সারি লোক চলেছে। সত্যাচার্য জানে তারা কোথায় চলেছে। হিংসায় রাগে সত্যাচার্যের এবার সত্যি শরীর খারাপ লাগতে শুরু করল।
‘এ মেয়েকে থামাতেই হবে!’ সত্যাচার্য সজোরে দরজা বন্ধ করে দিল। ‘এই মেয়ের খ্যাতি বাড়তে থাকলে আকাশচুম্বী হয়ে একসময় কালবৈশাখী ঝড় হয়ে আমারই ঘরের মাথার ওপরের চালা উড়িয়ে নিয়ে যাবে। তাই যত শীঘ্র সম্ভব এর খ্যাতিকে শ্বাসরুদ্ধ করতে হবে,’ সত্যাচার্য নিজের মনে বিড়বিড় করে বলল।
কিন্তু কীভাবে?
মাথায় বুদ্ধি আসছে না। দেওয়ানের পরামর্শ চাই। দেওয়ানের মাথা বদ বুদ্ধিতে ঠাসা। সত্যাচার্য জমিদারবাড়ির দিকে রওনা দিলো।
দেওয়ান দুর্লভচাঁদের মাথায় সত্যি শয়তানি বুদ্ধি খেলে খুব। সত্যাচার্যের কথা শুনে দেওয়ান দু’হাতের তালু ঘষতে ঘষতে অন্যমনস্ক হয়ে ভাবতে লাগল।
‘বেহুলাকে গ্রাম থেকে বের করে দেওয়া যায় না?’ সত্যাচার্য বলল।
‘পাগল!’ দেওয়ান মাথা নাড়ালো। ওর কত ভক্ত জানেন?’ দেওয়ান মাথা থেকে পাগড়ি খুলে মাথায় হাত ঘষতে থাকল, তারপর পাগড়ি পরতে পরতে বলল, ‘আমি একটা বুদ্ধি দিই। হাওয়া দিয়ে আগুন নেভাতে গেলে অনেক সময় আগুন চারদিকে ছড়িয়ে যায়। আগুন নেভাবার আরেকটা উপায় হল আগুনকে কম্বল দিয়ে জড়িয়ে ধরা। এ মেয়েকে একদম সেভাবে দমবন্ধ করে ওর আগুন নিভিয়ে দিতে হবে।’
দেওয়ানের জটিল ইঙ্গিত সত্যাচার্য বুঝতে না পেরে বলল, ‘কী করব আমি?’
‘আপনি দারপরিগ্রহ করুন।’
‘দারপরিগ্রহ! কাকে?’
‘বেহুলাকে।’
‘এ আপনি কী রসিকতা করছেন দেওয়ানজী?’
‘রসিকতা নয়, এতে আপনার সব সমস্যার অবসান হয়ে যাবে।’
‘এ মেয়ে তো বিধবা!’
‘তাতে অসুবিধা কিসের? বিবাহের পর স্বামীর আদেশ পত্নীর শিরোধার্য। দাসী বানিয়ে বাড়ির এক কোণায় রেখে দেবেন। অনেক হিন্দু কুলীনদের তো কত পত্নী থাকে তা তাদের নিজেদেরই মনে থাকে না। বেহুলা আপনার পত্নী হলে ওর যত যজমান আছে সকলে আবার আপনার কাছেই ফিরে আসবে।’
‘কথাটা ভাববার বটে,’ সত্যাচার্য এভাবে কখনো ভেবে দেখেনি। এজন্যই বুদ্ধিমানদের সঙ্গে শলা-পরামর্শ করতে হয়। ‘আর ও যদি আমায় বিবাহ করতে সম্মত না হয় তবে?’
‘তবে একটাই উপায়—বেহুলাকে বাজি রেখে তর্কযুদ্ধ।’
‘বেহুলার সঙ্গে?’ সত্যাচার্য ভরসা পেল না যে বেহুলার মতো জ্ঞানী মেয়ের সঙ্গে তর্কযুদ্ধ তার পক্ষে হিতকর হবে।
‘না না, বেহুলার সঙ্গে তর্কযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কথা ভুলেও চিন্তা করবেন না। তর্কযুদ্ধ করবেন ওই বুড়ো ভাম পাখমারা গণকের সঙ্গে। ওকে আপনি অনায়াসে হারিয়ে দেবেন। তর্কযুদ্ধের পুরস্কার হবে বেহুলা।’
সত্যাচার্য বাকি পরিকল্পনাও দেওয়ানের সঙ্গে ছকে ফেলল। ‘কী হল আমাকে জানিয়ে যাবেন ঠাকুর, দেওয়ান ক্রূর হাসি হেসে বলল। ‘আমি উদ্বেগে থাকব।’
এক সপ্তাহ পর, সত্যাচার্য শুভ দিনক্ষণ দেখে চলল কাপাসডাঙার মাঠ পেরিয়ে পাখমারা গণকের জ্যোতিষ-মন্দিরে। সত্যাচার্য জ্যোতিষ-মন্দিরে পৌঁছোতেই তাকে অভ্যর্থনা করে বসিয়ে পাখমারা গণক হুঁকো এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘আপনি নিশ্চয়ই শ্রান্ত, কিঞ্চিৎ জলপানের ব্যবস্থা করছি আপনার জন্য। ততক্ষণ এই তামাকু সেবন করুন।’
সত্যাচার্যের এতটুকু ইচ্ছা করছিল না শুদ্র পাখমারা গণকের বাটীতে তামাকু সেবন করার, তবুও ত্যাগীর মতো প্রসন্ন হেসে বলল, ‘আমি একটি বিশেষ কাজে আপনার কাছে এসেছি। যদি অনুমতি করেন তবে তা বলি।’
পাখমারা গণক বলল, ‘আপনি মহান জ্যোতিষী, আমাদের জ্যোতিষ- মন্দিরদ্বারে এসেছেন এতে আমার জ্যোতিষ-মন্দির ধন্য। আপনি আদেশ করুন।’
বেহুলা ঘরের ভিতর ছিল, জ্যোতিষ-মন্দিরে অনেকক্ষণ ধরে পুরুষকণ্ঠের আলোচনার আওয়াজ পেয়ে ও ভাবল গণককাকা তো চুপচাপ থাকার মানুষ। আজ কার সাথে এতক্ষণ কথা বলছে গণককাকা? বেহুলা বেরিয়ে জ্যোতিষ- মন্দিরের দ্বারে এসেই ভয়ে কেঁপে উঠল। আর পর মুহূর্তেই মাথায় যেন পরশুরামের রাগ জেগে উঠল। তবু বেহুলা ভদ্রতাবশত দু’হাত জোড় করে বুকের কাছে এনে সত্যাচার্যকে প্রণাম করল। সত্যাচার্য তাকে আশীর্বাদ করে পাখমারা গণককে বলল, ‘আমি বেহুলার জ্ঞানের পরিধি দেখে বিস্মিত। আমি ওকে বরাহমিহিরের ফলিত জ্যোতিষশাস্ত্রে পারদর্শী করে তুলব। আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রী বেহুলাকে আমি বিবাহ করতে চাই। আপনি অনুমতি দিলে আমি শীঘ্রই—’
‘অসম্ভব!’ বেহুলার অজান্তেই ওর মুখ থেকে সজোরে প্রতিবাদ উচ্চারিত হল।
সত্যাচার্যের বিস্মিত দৃষ্টিতে প্রত্যাখ্যানের হতাশা।
বেহুলা এবার রোষে বলল, ‘আপনারা পুরুষেরা মেয়েদের কী ভাবেন ঠাকুর? আমি জানি আপনি কেন আমার মতো একজন বিধবাকে বিবাহ করতে চান। আপনি আসলে চান যেন-তেন-প্রকারেণ আমি যেন গ্রামবাসীদের কোষ্ঠী দেখা বন্ধ করি। আমি জানি আজকাল আমাদের কাছে যত মানুষ আসে কোষ্ঠী বানাতে আপনার কাছে তার অল্পভাগও যায় না। একজন মেয়েমানুষ কীভাবে একজন পণ্ডিত পুরুষের চেয়ে বেশী খ্যাতি পায় এটা আপনি হজম করতে পারছেন না। যেমন বরাহমিহির খনার অত খ্যাতি সহ্য করতে পারেননি। তাই এখানে এসেছেন ছলে-বলে-কৌশলে আমার মুখ বন্ধ করতে। আপনি চান আমি আপনার আজ্ঞানুবর্তিনী হয়ে থাকি। আপনার উদ্দেশ্য আমি বেশ বুঝতে পারছি ঠাকুর। আপনি এখন আসতে পারেন, আপনাকে আমি বিবাহ করব না। আর জমিদারবাবু আমাদের অনুমতি দিয়েছেন, সুতরাং কোষ্ঠী আমি দেখবই।’ বেহুলা বড় বড় পা ফেলে জ্যোতিষ-মন্দিরের বাইরের বকুল তলায় গিয়ে দাঁড়াল।
অপ্রস্তুত পাখমারা গণক বলল, ‘ঠাকুর, এই মেয়ের কথায় ক্রুদ্ধ হবেন না। বেহুলা এমনই। ওর মেষরাশিতে মঙ্গল গ্রহ। অকস্মাৎ রেগে যায় আবার অকস্মাৎ শান্ত হয়ে যায়।’
অপমানে সত্যাচার্যের মুখমণ্ডল কালিমায় ছেয়ে গেল। অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেও ক্রোধ প্রকাশ না করে সত্যাচার্য কটিবন্ধ শক্ত করে বেঁধে দৃঢ়কণ্ঠে বলল, ‘বেশ! আমার পত্নী হওয়ার প্রীতিপূর্ণ অনুরোধ যখন বেহুলা প্রত্যাখ্যান করল, তখন আমি বেহুলাকে আমার কুটিরের দাসী হিসেবে নিয়ে যাব। আমি এমুহূর্তে পাখমারা গণক, আপনাকে জ্যোতিষ তর্কযুদ্ধে আহ্বান করছি। এই তর্কযুদ্ধের শর্ত থাকবে বেহুলা।’
‘আমি বেহুলাকে শর্ত রেখে তর্কযুদ্ধ করতে সম্মত নই। আমি আপনার শর্তে রাজি নই।’
‘শর্ত ব্যতীত কোনো তর্কযুদ্ধ হয় না। বেশ, আপনি যদি তর্কে পরাজিত হন তবে আপনার জ্যোতিষ-মন্দির বন্ধ করে দিতে হবে। আর যদি আমি পরাজিত হই তবে আমার জ্যোতিষ-মন্দির বন্ধ করে দেব। আপনি পরাজিত হলে আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রী আমার জ্যোতিষ-মন্দিরে আমার অধীনে থেকে কাজ করবে, আর আমি যদি তর্কে পরাজিত হই তবে আমি আপনার জ্যোতিষ-মন্দিরে আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রীর অধীনে থেকে জ্যোতিষের সেবা করব।’
সত্যাচার্যের সেদিনের অপমান বেহুলা ভুলতে পারেনি। সে আবার এখানে ওদের অপমান করতে এসেছে। আজ একে আমি উচিত সাজা দেব, বেহুলা আবার জ্যোতিষ-মন্দিরের চৌকাঠে ফিরে এল—‘ঠাকুর, আমাকে আপনার গৃহে আপনার দাসী হিসেবে নিয়ে যেতে গেলে গণককাকাকে নয়, আমাকে তর্কযুদ্ধে পরাজিত করতে হবে। দ্রৌপদীকে পাশাখেলার শর্ত হিসেবে ব্যবহার করে পাণ্ডবেরা চিরকালের জন্য অপযশ মাথায় নিয়ে চলেছে। আমার কাকা আমাকে কক্ষনো সেভাবে ব্যবহার করবেন না। তবে আমারও একটা শর্ত আছে ঠাকুর। যদি তুমি হেরে যাও, তবে জমিদারবাবুকে বলে আমাকে খনাবাক্যের পুঁথিটা পড়তে দিতে হবে।
সত্যাচার্য জানে এই মেয়ে অত্যন্ত বিদুষী। দেওয়ান দুর্লভচাঁদ তাকে পই পই করে বারণ করে দিয়েছে এই মেয়ের সঙ্গে তর্কযুদ্ধ না করতে। কিন্তু ক্রোধে তার হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেয়েছে। একজন ‘মেয়েমানুষ’ তাকে তর্কযুদ্ধে আহ্বান করছে এ তার দম্ভে আঘাত করল। সত্যাচার্য বলল, ‘বেশ। আমি রাজি কে প্রথম প্রশ্ন করবে?’
বেহুলা বলল, ‘আমি সাজিয়ে আনা প্রশ্ন দিয়ে জ্ঞান যাচাই করি না। দূরে কয়েকজন গ্রামবাসী এসে বসে আছে তাদের কোষ্ঠী বিচারের জন্য। আপনি তাদের একজনকে বেছে নিন। সে একই প্রশ্ন করবে আমাদের দু’জনকে। আমাদের মধ্যে কে উত্তর দিতে পারবে তারই পরীক্ষা হবে।
‘উত্তম,’ সত্যাচার্য বলল। তারপর গ্রামবাসীদের দিকে তাকিয়ে এক অশীতিপর বৃদ্ধাকে দেখিয়ে দিলো।
বেহুলা বৃদ্ধাকে কাছে ডাকল। বৃদ্ধাকে বলল, ‘তুমি কী চাও ঠাম্মা?’
বৃদ্ধা বলল, ‘আমার নাতনির কুষ্ঠীটা পাওয়া যাচ্ছে না। তোমরা কেউ কি গুণে বলতে পারবে কোথায় আছে কুষ্ঠী?’
সত্যাচার্য বলল, ‘গোটা বাড়ি ভালোভাবে খুঁজে দেখ, পেয়ে যাবে। না পেলে বুঝবে চোরে চুরি করে নিয়েছে।’
বেহুলা বলল, ‘না দাঁড়াও ঠাম্মা। তোমার নাতনির কত বয়স হল?’
‘পাঁচ। গতবার বিদ্যেধরীতে যে বান ডেকেছিল সে রাতেই তো ওর জন্ম হল। বাপরে কী যমে মানুষে টানাটানি সে রাতে। যম জিতল বটে, ওর মাকে নিয়ে গেল, কিন্তু অভাগী শিশু বেঁচে গেল।’
বেহুলা চক-খড়ি নিয়ে মন্দিরের মেঝেতেই আঁকিবুকি কাটতে লাগল। সত্যাচার্যের মুখে বিরক্তি। এ কী ছেলে খেলা হচ্ছে! বেহুলা এবার বুড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমার নাতনির কোষ্ঠী চোর নেয়নি। ঘরের মানুষই সরিয়েছে। তোমার বাড়িতে কে কে থাকে?’
বুড়ি বলল, ‘আমার ছেলে আর মা মরা নাতনি।’
‘ছেলের আপত্তি ছিল তোমার নাতনির কোষ্ঠী করাবার জন্য?’
‘হ্যাঁ।’
‘নাতনির কোষ্ঠী তোমার ছেলে সরিয়েছে। বাড়ির কাছে কোনো বড় গাছ আছে?’
‘হ্যাঁ। নিম গাছ আছে।’
‘ওই নিম গাছের গোড়ায় খুঁড়ে দেখ। কলসির মধ্যে পেয়ে যাবে।’
এবার বুড়ি পাশের যুবককে জিজ্ঞাসা করল, ‘ভাদু, বেহুলা মা যা বলছে তা কি ঠিক?
‘হ্যাঁ,’ যুবক কাচুমাচু মুখে স্বীকার করল। ‘আমি তোমায় পইপই করে বলেছি ওই মা-খাগী মেয়ের কুষ্ঠী করিও না। তুমি আমার কথা শোনোনি—তাই,’
এবার বৃদ্ধার মুখ খুশিতে ভরে গেল। বিব্রত সত্যাচার্য বলল, ‘এটা কী ভাবে পারলে?’
বেহুলা বলল, ‘ঠাকুর, আপনি যদি খনার বচন পড়তেন তবে আপনিও বলতে পারতেন। খনার বচনে নষ্টকোষ্ঠী উদ্ধারের শ্লোক আছে–
অথ নষ্ট উদ্ধার
রবি মঙ্গল বেদে যার, তার নষ্ট নালা পার।
লগ্নে থাকে কানা যার, উচ্চ স্থানে নষ্ট তার।
খনা বলে শূন্য ঘরে, নিকট নিকট নয় দূরে।
চন্দ্র থাকে যুগ্ম ঘরে, শনি রবি দৃষ্টি করে।
তার নষ্ট না নেয় পরে, আপন লোকে চুরি করে।
বৃক্ষ মূলে রেখে যায়, তালাসেতে পাওয়া যায়।
খনা বলে গ্রহ বলে, থাকে নষ্ট গাছের তলে।
মকরে মঙ্গল থাকে যার, তার নষ্ট পাওয়া ভার।
চন্দ্র থাকে ষষ্ঠ ঘরে, বুধ যদি দৃষ্টি করে।
করিয়া চুরি যায় দূরে, দুই তিন নদীর পারে।
রাহুর ঘরে চন্দ্র যার, তাহার নষ্ট গর্ভের পার।
বর্ণ রাঙ্গা মুখ ছোট, দীর্ঘ নয় হবে খাট।
মৃত্তিকার ভাণ্ড ডাগর পেট, খনা বলে কলসি কি ঘট।
লগ্ন বলে বুঝা যায়, ঘরে থাকে বাহিরে নয়।
তুমি সুত ধরণিপতি, কুস্তে চন্দ্র থাকে যদি।
ছয় নষ্ট না নেয় চোরে, মুষিকে পাইয়া হরে তারে।
আমি শুধু ওর জন্ম সময়কাল গণনা করে বের করলাম ওর চন্দ্র থাকে যুগ্ম ঘরে, শনি রবি দৃষ্টি করে। বাকিটা খনার কৃতিত্ব। তার নষ্ট না নেয় পরে, আপন লোকে চুরি করে। বৃক্ষ মূলে রেখে যায়, তালাসেতে পাওয়া যায়।’
বুড়ি এবার জয়ধ্বনি দিয়ে বলল, ‘জয় খনার জয়!’
‘এ তো কোতোয়ালের কাজ করা হল। এখানে জ্যোতিষ কোথায়?’ সত্যাচার্য একে পরাজয় বলে স্বীকার করতে সম্মত হলো না। ‘আমি একে জ্যোতিষের তর্ক বলে মানি না।’
পাখমারা গণক বলল, ‘ঠাকুর, আমাদের মতো সামান্য মানুষের সঙ্গে আপনার তর্কযুদ্ধ শোভা দেয় না।’
সত্যাচার্য তির্যক হেসে বলল, ‘আজ যেভাবে খনার বাক্য উদ্ধৃত করে আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রী তর্ক জিতল, আপনি একজন জ্যোতিষী হয়ে বলুন এটা কি শুদ্ধ জ্যোতিষ?’
পাখমারা গণক বলল, ‘সত্য বলতে কী খনাবাক্যের অনেকাংশ সাংকেতিক ভাষায় লেখা। আমি তার অনেকটাই বুঝতে পারি না। তাই আমি খনাবাক্য প্রয়োগও করি না। কিন্তু খনা অসম্ভব বাস্তববাদী। উনি জ্যোতিষের সঙ্গে বাস্তব জীবনযাত্রাকে মিশিয়ে খনাবাক্য লিখেছেন। তা শুদ্ধ জ্যোতিষ না হতে পারে, কিন্তু ফল দেয়। যেমন এই নষ্টকোষ্ঠীর কথা ধরুন। খনা জানে যে এসব গ্রামের মানুষ সাধারণত দরিদ্র। এদের বাড়িতে আসবাবপত্র এমন কিছু থাকে না যে কোষ্ঠী হারিয়ে যাবে। তাই কোষ্ঠী নিশ্চয়ই কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে সরিয়েছে। হয় সে নিজের পরিবারের কেউ অথবা বাইরের চোর। বেহুলা এক্ষেত্রে ব্যবহারিক বুদ্ধি প্রয়োগ করেছে। ওই বৃদ্ধার গায়ে পরা আছে শতছিন্ন ধোকড়, অত গরীবের বাড়িতে কি চোর আসবে? কক্ষনো না। তাহলে বাড়ির মানুষই নিয়েছে। ও জিজ্ঞাসা করল যে কে কে আছে বাড়িতে। বুঝল বাপেই সরিয়েছে। গ্রামবাসীরা জ্যোতিষীর কাছে গিয়ে শুধু ছেলেদের কোষ্ঠী করিয়ে আনে। মেয়েদের কোষ্ঠী করায় না। ছেলেদের জন্য দশ হাত লম্বা হলদে পুরু খসখসে মোটা তুলট কাগজে নকশা কেটে গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান বসিয়ে আধা সংস্কৃত আধা বাংলায় জাতকের কোষ্ঠী বানিয়ে নেয়। আর মেয়েদের বেলায় শুধু একটা ছোট কাগজের টুকরোতে তাদের জন্মের সময়, তারিখ আর গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান লিখে রাখা হয় আর সেগুলো বিয়ের সময় যোটক কিনা তা মেলাতে ব্যবহার করা হয়। বুড়ি হয়তো জেদ ধরে নাতনির কোষ্ঠী বানিয়েছিল, বাপ সেটা লুকিয়ে রেখেছে। অত দরিদ্রের ঘরে আসবাবপত্রও থাকেনা। তাই ঘরে লোকানো সহজ না। ধাতব বস্তু হলে পুকুরের জলের নীচে লুকিয়ে রাখত, কিন্তু তুলট কাগজ কোথায় রাখবে? খনা বলে গাছের শিকড়ের নীচে দেখ। বেহুলা সেইমতো পরামর্শ দিল, সেটা কাজে লেগেও গেল।’
‘এটা জ্যোতিষের নামে অন্যায়,’ সত্যাচার্য ক্রোধের সঙ্গে বলল। ‘এজন্য ব্রাহ্মণদের শেখানো হয় শুদ্রদের সঙ্গে অযথা শাস্ত্রচর্চা না করতে,’ সত্যাচার্য উত্তরীয় কাঁধে ফেলে উঠে দাঁড়াল।
হেঁসেলে ভাত চড়িয়ে উঠোন থেকে সব কথা কানে আসছিল বচনপিসির। সত্যাচার্যের কথা শুনে মাথায় রক্ত উঠে গেল। এবার শাড়ির আঁচল গাছকোমরে বেঁধে বেরিয়ে এসে মুখঝামটা দিল ‘ঠাকুর, তুমি তো বড় ঊনপাঁজুরে লোক হে! আমাদের রুজি-রোজগার তোমার জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। তাতেও মন ভরেনি? এখন অকালের বাদলা হয়ে এয়েছ বাড়ি বয়ে অপমান করতে?’
‘আমি এই শুদ্রাণীকে অযাচিত সম্মান প্রদান করতে চেয়েছিলাম সেটা আমার এজন্মের সবচেয়ে বড় পাপ।’
‘বে’ করার অতই যদি ইচ্ছে জাগে মনে তবে যাও না নিজের জাতের বামুন
মেয়ে দেখে বে’ করো না কেন? আমরা শুভ্র একথা আমরা তো কক্ষনো গোপন করি না, এজন্য আমাদের লজ্জাও নেই। কিন্তু ঠাকুর, একটা সত্য কথা শুনে যাও, বেহুলা শুদ্র নয়, বেহুলা বামুন। তার জ্যোতিষ জ্ঞানের কথা তো বললামই না। তবে তোমার যখন এত গুমোর, আমাদের গরীবের ঘরে কেন ভিক্ষা চাইতে এসেছ? গণক যদি গণে ঠিক, তবে কেন মাগে ভিক?’
সত্যাচার্য ক্রোধে অন্ধ। কোনো কথা তার কর্ণকুহরে প্রবেশ করছে না। তার মনে শুধু প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে এ সর্পিনীর বিষদাঁত ভাঙতেই হবে। সত্যাচার্য হনহন করে হাঁটতে লাগল কাপাসডাঙার মাঠ পেরিয়ে তার গৃহ অভিমুখে।
পাখমারা গণক অপ্রস্তুত, কিন্তু বেহুলা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসতে হাসতে বলল, ‘পিসি, তোমার এই রণংদেহী রূপ কক্ষনো দেখিনি। সত্যঠাকুরের কানে তুমি যা বচনবর্ষণ করলে
‘মৌচাকে মধু খেতে এসেছে, মৌমাছি কি একটুও হুল ফোঁটাবে না?’ বচনপিসির রোষ সম্পূর্ণরূপে প্রশমিত হয়নি। ‘জ্যোতিষী এয়েছেন, সারা কপাল জুড়ে চন্দনের আলপনা আঁকা যেন ছিরিখণ্ডী পিঁড়ি। যোগী যদি অলস, কমণ্ডলু কলস। বড় সাধকের কখনো কলসীর মতো বিশাল কমণ্ডলু দেখাবার দরকার পরে না। গো-হারা হারলি তো! বিটলে এসে আবার রাগ দেখায়। তাই দিলুম ওর রাগের অনলে ঠাণ্ডা জল ঢেলে। আর আসবে না তোকে বিরক্ত করতে। কিন্তু দাদা, তোমার বাড়িতে এসে তোমার আপনার জনকে অপমান করে গেল অথচ তুমি ওকে কিছু বললে না? এটা তোমার বড় অন্যায়।’
পাখমারা গণক স্মিত হেসে বলল, ‘কয়েক দিনের জন্য এই পৃথিবীতে আসা, এখানে আবার কোথায় আমার বাড়ি, তোমার বাড়ি। আমরা তো পথিক মাত্র, পথ চলেছি, এই আবাস আমাদের পান্থশালা।’
‘তাই বলে আপন পর বোধ থাকবে না?’ বচনপিসি অত গভীর তত্ত্বকথায় প্রবেশ না করে নিজের মনের কথা বলল।
পাখমারা গণক এবার বেহুলার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার গুরু বলেছিল ঈশ্বর ভিন্ন কেউ আপন নয়, আর কেউ আমার পর নয়।’
বেহুলার সর্বাঙ্গে যেন এক অদ্ভুত শান্তির স্রোত বয়ে গেল। বেহুলা পাখমারা গণকের সামনে এসে হাঁটু মুড়ে বসে বলল, ‘ঈশ্বর কি আমাদের আপন ভাবেন?’ পাখমারা গণকের ওষ্ঠ থেকে স্মিত হাসি মিলিয়ে যায়নি। সে বলল, ‘তুমি
যখন রাতের অন্ধকারে ধুলসা গ্রাম থেকে পালাবার জন্য বেহুলার ভেলা ভাসালে, তখন নদীতে তোমার জন্য জোয়ার এসেছিল। ওই জোয়ার না এলে তুমি একা নৌকা চালিয়ে অতদূর আসতে পারতে?’
‘না।’
‘একজন একান্ত আপন তোমাকে সাহায্য করল নদীর জলের মাধ্যমে। তাই বলে নদীর জোয়ার কি তোমার আপন হয়ে গেল?’
‘না। আমি নৌকা থেকে নেমে জোয়ারের কথা আর ভাবিইনি।’
‘তাহলে? কখনো জোয়ার, কখনো বিশ্বনাথ বহুরূপী, কখনো এই বচনপিসি, কখনো আমি আমরা সবাই তোমার যাত্রা পথে আসছি, তোমায় সাহায্য করছি। এদের আপনজন ভেবে কক্ষনো আঁকড়ে থেকো না, জোয়ারকে যেমন পিছনে ফেলে এসেছ, সেরকম আমরাও তরঙ্গের মতো আসবো, মিলিয়ে যাব। আঁকড়ে থাকো সেই আপনজন ঈশ্বরকে যিনি অলক্ষ্যে থেকে তোমার ঢেঁকিতে ধানের অভাব না থাকার জন্য রাশের যোগান দিয়ে যাচ্ছেন। আমরা তোমার অবলম্বন নই, তিনিই তোমার অবলম্বন।
‘তাহলে আমি যে এখানে এলাম এটা কি বিধিলিপি হয়ে আছে?’
ওষ্ঠাধারে হাসি ধরে রেখে পাখমারা গণক বলল, ‘হ্যাঁ। তাঁর ইচ্ছায় পাখমারা ব্যাধও গণক হয়ে যায়। তাই বললাম ঈশ্বর ভিন্ন আর কেউ আপন নেই।’
‘কিন্তু আপনারা আমার আপন নন, অথচ আপনি বলছেন কেউ আমার পর নয়। আপনারা আপনও নন অথচ পরও নন? এ কীভাবে সম্ভব?’
‘এসব জন্মান্তরবাদের গভীর তত্ত্ব।’
বচনপিসি হঠাৎ নাক টেনে বলল, ‘এইরে! ভাত বোধহয় পুড়ে গেছে এতক্ষণে।’ বচনপিসি পরিমরি করে হেঁসেলের দিকে ছুটল।
পাখমারা গণক বলল, ‘দেখলে তো মজাটা। কে কাকে কতটা শিক্ষা দেবে সব তিনি ঠিক করে রেখেছেন। তাই কারুকে ধুলসা থেকে কাপাসডাঙায় নিয়ে আসেন, আবার যে কাপাসডাঙায় থাকে তাকে ঈশ্বর সেই পাঠ না শেখাতে চাইলে তিনি ভাত উথলে যাওয়ার আছিলায় তাকে দূরে সরিয়ে দেন।’
বেহুলা এক ঘোরের মধ্যে থেকে বলল, ‘আমাকে এখানে ঈশ্বর কেন এনেছেন?’
‘আমরা সকলে পথিক। এক জন্ম পথ চলে, সেখান থেকে মৃত্যুর দরজা খুলে অন্য জন্মে ঢোকার সময় পিছনের সেই দরজা বন্ধ করে দিই। তাই আমাদের পূর্বজন্মের স্মৃতি আমাদের সঙ্গে থাকে না। তারপর আমরা আবার পরজন্মে পথ চলি। গত জন্মের আত্মীয় সঙ্গী সাথীরা সকলে সেই তোমার ফোল আসা জোয়ারের মতো পিছনে পড়ে থাকে। তাকে আমরা আর মনে রাখি না। তারাও মৃত্যুর পর নতুন রূপে আসে পরজন্মে। কিন্তু এই পথ চলতে চলতে আমরা কিছু ভালো কাজ করলে পুণ্য সঞ্চয় করি, সেই পুণ্য বা পাপ কিন্তু আমাদের সঙ্গে সঙ্গে পরজন্মেও চলে। একে আমরা বলি প্রারব্ধ। এই প্রারব্ধ ক্ষয় হয় পরজন্মে। এক জন্মে কারোর খুব ক্ষতি করলে, এই জন্মের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সামনের জন্মে প্রতিশোধ নেবার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। আর প্রকৃতি তাকে সাহায্য করে।’
বেহুলা হাঁ করে পাখমারা গণকের দিকে তাকিয়ে। কিছু বুঝছে কিন্তু বেশির ভাগই রহস্যে ঢাকা কথা।
পাখমারা গণক বলে চলল, ‘আমি কাপাসডাঙায় আসার আগে একটা গাঁয়ে থাকতাম সেখানে জমিদারের স্ত্রী তার শিশু ছেলেকে রোজ নিষ্ঠুর ভাবে মারতো। একদিন এমন মারল যে সেই শিশুর গায়ে চাকা চাকা দাগ বসিয়ে দিল। জমিদারের স্ত্রী নিজেই এতে এত দুঃখ পেল যে সে অনুতপ্ত হয়ে আমার কাছে লোক পাঠালো জমিদারবাড়িতে গিয়ে তার ছেলের কোষ্ঠী দেখার জন্য। আমি গেলাম, আমি গণনা করে বললাম যে ওই জমিদারের শিশুপুত্রটি গতজন্মে একজন লম্পট জমিদার ছিল, আর তার ওই মা ছিল সেই জমিদার বাড়ির দাসী। জমিদার সেই দাসীকে বলাৎকার করে তাকে হত্যা করে মৃতদেহ জ্বালিয়ে দেয়। সেই দাসী এজন্মে তার মা হয়ে তার পূর্বজন্মের অকথ্য অত্যাচারের প্রতিশোধ নিচ্ছে। পূর্বজন্মের কথা তার মনে নেই, কিন্তু মনের গভীরে এক প্রবৃত্তি গেঁথে আছে যে পূর্বজন্মের অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে হবে।’
‘তাই শুনে সেই রানী মা কী বলল?’
‘সত্যবচনে আমার কপালে দুর্ভোগ নেমে এল, পাখমারা জ্যোতিষ হাসল। ‘জমিদার আমার গণনা শুনে ক্রুদ্ধ হয়ে আমায় বলল অবিলম্বে তার গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে। তাই চলে এলাম এই কাপাসডাঙায়। আমরা ভাবি যে ঈশ্বর নিষ্ঠুর, কিন্তু তাঁর একটা বিধান আছে যা আমরা বুঝতে পারি না।’
‘সত্যিই তো, জমিদারের দুধের শিশুর কী দোষ? ওর ওপর ওর মা এত অত্যাচার করে চলেছে, কিন্তু ঈশ্বর সেই মাকে শাস্তি দিচ্ছে না, ঈশ্বরের এ কেমন বিচার?’ বেহুলা বলল।
‘আসলে এভাবেই সেই লম্পট জমিদারের গতজন্মের সঞ্চিত প্রারব্ধ ক্ষয় হচ্ছে। জানি না কতজন্ম চলবে এই প্রারব্ধ ক্ষয়ের খেলা।’
‘কিন্তু ঈশ্বর তাহলে আমাদের পূর্বজন্মের স্মৃতি মুছে দেন কেন?’
‘ঈশ্বর আমাদের প্রারন্ধের জমা খরচের খাতা আমাদের দেখাতে চান না। ওই পুত্র যদি তার অতীত দেখতে পেত যে সে গতজন্মে তার মাকে বলাৎকার করেছে, তবে সে এই পৃথিবীতে আর টিকে থাকতেই পারত না।’
‘তাহলে কি আমার সঙ্গে সত্যঠাকুরের কোনো সম্পর্ক আছে? আমি কেন লোকটাকে সহ্য করতে পারি না? ওকে দেখলে আমার ভয় হয়, খুব রাগ হয়, ও আমার কোনো ক্ষতি না করলেও আমি ওকে সকলের সামনে অপদস্থ করার জন্য মুখিয়ে থাকি। কেন?’
‘অনেক প্রশ্ন মনে জেগে আছে, যার উত্তর অতীতে হারিয়ে গেছে,’ পাখমারা গণক বলল। ‘সত্যঠাকুর কেন তার বারাণসী ছেড়ে এই জিভকাটির বন-বাদাড়ে এসে পড়ে আছে? কেন সত্যঠাকুর এই খনার মন্দির ভেঙে ফেলতে চায়? কেন সত্যঠাকুর তার জ্যোতিষ-মন্দিরের নাম বরাহমিহিরের নামে রাখল? কেন তুমি তোমার শ্বশুরবাড়িতে খনার পুঁথি খুঁজে বেড়াতে? কেন তুমি সেদিন জমিদার বাড়িতে সত্যঠাকুরের সঙ্গে দেখা করতে গেলে? কেন সত্যঠাকুর তোমায় বিয়ে করতে চাইল? কেন তুমি তাকে তৎক্ষণাৎ প্রত্যাখ্যান করলে? অনেক প্রশ্ন।’
বেহুলা মাথা টিপে ধরল। বিধিলিপি! মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে। ওর তো সতীদাহ থেকে বাঁচার কথা না? প্রকৃতি কেন ওকে বাঁচাল? এত জায়গা থাকতে প্ৰকৃতি ওকে কেন এই ডিঙাডুবিতে নিয়ে এল? ওর এখন মনে হচ্ছে এই সত্যঠাকুর অতীতে ওর ওপর অকথ্য অত্যাচার করেছিল, ওর জন্ম হয়েছে সেই অত্যাচারের প্রতিশোধ নেবার জন্য। হঠাৎ বেহুলার মাথায় বজ্রপাত হল। সত্যঠাকুর বরাহমিহির ছিল না তো? আর সে খনা?
‘অল্পের জন্য হাঁড়ির তলা ধরে যায়নি,’ বচনপিসি খুশি মুখে ঢুকল। ‘তোমাদের জ্যোতিষচর্চা এবার বন্ধ করে দু-গরাস মুখে দাও তো বাপু। আমার তো পেট চোঁ চোঁ করছে।’
***
পাখমারা গণকের বাড়িতে অপমানিত হয়ে সত্যাচার্য দ্রুতপদে বাড়ির পথে চলতে চলতে অকস্মাৎ থমকে দাঁড়াল—বেহুলা ব্ৰাহ্মণ!
কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব?
শুদ্রের ভ্রাতুষ্পুত্রী ব্রাহ্মণ!
তবে কি বেহুলার অন্য কোনো পরিচয় আছে যা সে গোপন করে রেখেছে?
সত্যাচার্য জমিদারবাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। দুর্লভচাঁদকে দিয়ে দূর দূরান্তরের গ্রামে অনুসন্ধান করতে হবে কেউ কোনো নিখোঁজ অষ্টাদশী সুন্দরী বিধবা ব্রাহ্মণ কন্যার কথা শুনেছে কিনা। বেহুলাকে নরকে না পাঠিয়ে কিছুতেই মনে শান্তি আসবে না।
