।। একুশ।।
সেদিন প্রাতঃকালে গ্রহবিপ্র সত্যাচার্য তার জ্যোতিষ-মন্দিরে জাতকদের কোষ্ঠীগণনা শুরু করেছে, আশেপাশে প্রচুর ভাগ্যান্বেষীদের ভিড় হয়েছে, এমন সময় দূর থেকে জটা পাগলার চিৎকার!
‘স্বর্ণসিন্দুক! স্বর্ণসিন্দুক!’
সকলে অবাক। জটা পাগলা উত্তেজিত হয়ে চেঁচাতে চেঁচাতে টলমল করে টলতে টলতে ছুটে আসছে, মাথায় একটা ছোটখাট ধাতব পেটরা।
‘স্বর্ণসিন্দুক, নদীর খাত থেকে পেয়েছি!’ জটা পাগলা হাঁফাচ্ছে। ‘চাঁদ সদাগরের ধন।’ জটা পেটরাটা মাথায় নিয়ে টলোমলো ভাবে ছুটতে ছুটতে এসে উপস্থিত হল। ‘হয়তো আরো অনেক আছে। চলো সবাই আমার সঙ্গে। পীরের ভবিষ্যৎবাণী সত্যি হল। আমি জানতাম। ঠাকুর, তুমি এটা রাখো। আমি ফিরে এলে খুলো।’ পেটরাটা জ্যোতিষ-মন্দিরের চৌকাঠে নামিয়ে রেখে জটা হাঁফাতে হাঁফাতে আবার ছুটল নদীর দিকে।
স্বর্ণসিন্দুক শুনে জটার পিছনে পিছনে অনেকে ছুটল নদীর দিকে। জটা নদীর খাতের এক হাঁটু ঘোলা জলে নেমে পড়ল। ধনরত্নের লোভে কয়েকজন উৎসাহী গ্রামবাসী খাতে নেমে পড়ে ঘোলা জলে হাঁটু মুড়ে বসে হাতড়ে হাতড়ে খুঁজতে লাগল। কিন্তু কিছু না পেয়ে ওরা ছুটতে ছুটতে আবার মন্দিরে এসে হাজির হল দেখতে যে এই পেটরার ভিতরে কী আছে? মন্দিরের চারপাশে ভিড় বেশ বেড়ে গেল। দেওয়ান দুর্লভচাঁদের কাছে খবরটা উড়তে উড়তে গিয়ে পৌঁছাল। স্বর্ণসিন্দুকের নাম শুনে দুর্লভচাঁদ দ্রুতপায়ে এসে হাজির হলো সত্যাচার্যের আশ্রমে। দুর্লভচাঁদ দাপটের সঙ্গে বলল, ‘এই সিন্দুক জমিদারবাবুর সম্পত্তি। আমি জমিদারবাবুকে এক্ষুনি খবর পাঠাচ্ছি। জমিদারবাবুর সামনে এই সিন্দুক খোলা হবে।’
ভিতরে কী আছে তা বোঝার উপায় নেই কারণ পেটরার চারপাশ ধাতব রাং ঝালাই করে বন্ধ করা। স্বর্ণসিন্দুক—স্বর্ণসিন্দুক—গুঞ্জন ভিড়ের মধ্যে ছড়িয়ে গেল। হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে থেকে মুখ বাড়িয়ে সুবল স্যাকরা সকলের উৎসাহে জল ঢেলে বেজার মুখে বলল, ‘কোথায় স্বর্ণসিন্দুক? এতো পেতলের পেটরা!’
পেতল! হলই বা পিতল, তবু সিন্দুক তো। দেওয়ান দুর্লভচাঁদের কৌতূহল চরমে। জমিদারবাবু নেশা করে গড়গড়া টানতে টানতে কতবার বলেছেন যে রাজা বল্লাল সেন তাঁর পিতৃপুরুষকে গোটা দক্ষিণ বাংলা নাকি লিখে দিয়েছিলেন এবং সেই সনন্দ নাকি জলে ডুবে গেছে নতুবা আজ গোপীচরণ মল্লিক বাংলার নবাব হতো তাহলে একথা মিথো নয়! নায়েব ভালোভাবে দেখল সেই পিতলের পেটিকা। পেটিকার গায়ে সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র সব আঁকা। সেসময় হুগলির কাঁসারিদের পিতলের কাজের জন্য বিভিন্ন স্থানে প্রসিদ্ধি ছিল। কুমারগঞ্জ, বৈঁচি, খোলসারা, বংশবাটী, মেরারহাট, মাহেশের পিতলের বাসন নানা দেশে রপ্তানি হতো। চাঁপাডাঙার পানদানি বড় বড় জমিদারদের অন্দরমহলে ব্যবহৃত হতো। দুর্লভচাঁদ বলল, ‘আমি এই সিন্দুক জমিদারবাড়ির কোষাখানায় নিয়ে যাচ্ছি। জমিদারবাবুর কাছে আজই হরকরা পাঠাচ্ছি। আগামী পরশু জমিদারবাবুর সামনেই এই সিন্দুক খোলা হবে।’
চারদিকের গ্রামে এই খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। সকলের কৌতূহল ক্রমশ বাড়তে লাগল—কী আছে এই সিন্দুকের মধ্যে?
কিন্তু সত্যাচার্য প্রমাদ গুনল। এই সেই সিন্দুক না তো? তাহলে একে তো ধ্বংস করতেই হবে।
