1 of 2

কুকুরদল – ৯

অধ্যায় ৯

মাগির পুত।

অশ্লীল দুটো শব্দ গত তিন সপ্তাহ ধরে অর্জন করা শান্তির প্রতিটা কণাকে যেন চুরমার করে দিলো। ভয়ঙ্কর সেই রাত, ইতির প্রতি তীব্র এক বিতৃষ্ণা আর সিগারেটের পর সিগারেট টেনে যাওয়া। অবশেষে জীবনের প্রথমবারের মতো প্রত্যক্ষ করা এক হত্যাকাণ্ড। শামসভাই যখন মারা যাচ্ছিলেন, মাটিতে প্রবল যন্ত্রণায় ছুঁড়ছিলেন হাত পা। গনগনে আগুনের মতো আঁচ টের পেলো মুহিব, নিজের দু’কানে।

ক্রোধ।

“কোন দুনিয়ায় আছিস?” কানের পাশ থেকে বলে উঠলো শামীম।

সম্বিত ফিরে পেয়ে চারপাশে তাকালো মুহিব। ক্যাফেটেরিয়া এখন স্বাভাবিক গুঞ্জনে আচ্ছন্ন। ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত উচ্ছৃঙ্খল কমিটি বিদায় হয়েছে খানিক আগে। তার সঙ্গে পেরে ওঠা শাহরিয়ার ভাইয়ের কাজ ছিল না কখনও। টাকা সে নিয়েই তবে ছেড়েছে। অপমানে টকটকে লাল হয়ে আছেন শাহরিয়ার ভাই। চাঁদাবাজ বিদায় হতে টেবিলে ফিরে এসেছিলো মুহিব, তারপর ডুবে গিয়েছিলো ভাবনায়।

“সিগারেটটা দে।” শামীমকে অন্যমনস্কতার ব্যাখ্যা না দেওয়ার জন্যই চাইলো মুহিব। কিছুক্ষণ চুপচাপ ধূমপান করলো। কান পেতে বন্ধুদের আলোচনা শুনছে। এখনও দায়িত্বজ্ঞানহীন শিক্ষকদের নিয়েই কথা হচ্ছে। প্রশাসনের ওপর ছাত্রদের যতোটা না রাগ, তার থেকে বেশি শিক্ষকদের ওপর। এই রাগ একদিনে জন্ম নেয়নি। ক্যাফেটেরিয়ায় আলোচনার জন্য এর চেয়ে লাগসই প্রসঙ্গ আর হয় না।

“ন্যাংটাটার নাম জানিস? শাহরিয়ার ভাইয়ের সাথে গ্যাঞ্জাম করলো যেটা?” একটু আগের ঝামেলার ব্যাপারে সবার মনোযোগ নেওয়ার চেষ্টা করলো মুহিব। ভেবেছিলো ওটা নিয়ে কথা তেমন জমবে না, তবে শামীম এ প্রসঙ্গেও সমান আগ্রহি।

কোনো রকম প্রশ্ন না করেই উত্তর দিলো, “রেদোয়ান মাহফুজ। রেদোয়ান বলেই চেনে ক্যাম্পাসে। থার্ড ইয়ারের স্টুডেন্ট।”

“একেই তো মনে হয় বন্ধুরা র‍্যাড বলে ডাকে?”

অবাক হলো শামীম, “হ্যাঁ। তুই চিনিস নাকি কোনোভাবে?”

“নাম শুনেছিলাম। চোখে দেখলাম আজকে।” আসল ব্যাপারটা তাদের জানালো না মুহিব। এর আগে সে রাতের বর্ণনা দেওয়ার সময়ও খুনিদের কাউকে চেনার ব্যাপারটা সে বেমালুম চেপে গিয়েছিলো। বন্ধুরা জেনে ফেললে সাহায্য করার জন্য এতো আগ্রহ দেখাবে যে তাদের উপেক্ষা করা যাবে না। এই কাজটা বিপজ্জনক। মুহিব বন্ধুদের জড়িয়ে বিপদে ফেলতে চায় না।

চারপাশে তাকালো শামীম, কেউ শুনতে পায় কি না দেখে নিলো।

এই হারামজাদা, কি বলে ঘটি চোর পুরাই। মানে, ঘটি বাটি যা পাবে মেরে দেওয়া লোক। শেরে বাংলা হলে রুমে রুমে গিয়ে চাঁদাবাজি করে। খায় বিদেশি মাল, গাঁজা ছাড়া ঘণ্টাখানেকও টেকে না। ডেঞ্জারাস পাবলিক। টাকার জন্য পারে না এমন কোনো কাজ নাই।”

যেমন, একজন নিরস্ত্র মানুষের গলাটা ফাঁক করে দেওয়া! মনে মনেই বলল মুহিব। বাইরে ধরে রেখেছে শান্ত ভাব।

“এই হারামজাদাদের ধরে এনে পাছা মেরে দেওয়া উচিত—” লিটুর স্বভাববিরুদ্ধ গালি বেরিয়ে এলো প্রবল উত্তেজনার সাথেই, তবে মুহূর্তের মধ্যে লাল মুখ করে চুপ করে গেলো সে।

অবাক হয়ে এক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থাকলো মুহিব। তারপর লিটুর দৃষ্টি অনুসরণ করে পেছন দিকে ঘুরতেই রহস্য সমাধান হয়ে গেলো। শ্রাবন্তী এসে দাঁড়িয়েছে ইলোরার ঠিক পেছনে। ইটিই-র আলোচিত সুন্দরি। কমলা ফতুয়াতে তাকে রীতিমতো লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টারদের একজনই মনে হচ্ছে। লিটুর শেষ মন্তব্য তার কানে গিয়েছে কি না ঠিক বোঝা গেলো না। ইলোরার সাথে গুজগুজ করে কিছু আলাপ করলো সে। তারপর মুচকি একটা হাসি লিটুকে উপহার দিয়ে চলে গেলো ক্যাফের বাইরের দিকে।

“শিট।” বিড়বিড় করে বলল লিটু।

মুচকি হাসলো মুহিব আর শামীম। ইলোরার চোখের তারায় দুষ্টুমি।

“শ্রাবন্তী যদি জানে তুই পাছাটাই মারতে পছন্দ করিস–”

হাসি চেপে রাখতে পারলো না ওরা কেউ আর। এক মুহূর্তের জন্য রেদোয়ান দ্য র‍্যাডের চিন্তাই সরে গেলো মুহিবের মাথা থেকে। শ্রাবন্তীকে হৃদয় দিয়ে ফেলা ছেলেদের দলের মধ্যে খুঁজলে লিটুকে প্রথম সারিতেই পাওয়া যাবে।

“শিট ম্যান।” বিড়বিড় করে আরেকবার বলল লিটু। তার দিকে হাতের সিগারেটটা বাড়িয়ে দিলো শামীম। যেন সান্ত্বনা পুরষ্কার হাতে নিচ্ছে, এভাবে জিনিসটা তুলে নিলো লিটু।

পরবর্তি কয়েকটা দিন গতানুগতিকভাবেই কাটলো। মুহিব র‍্যাডকে নিয়ে আলোচনা করার জন্য ভেতর ভেতর মারা যাচ্ছিলো প্রতিটা সেকেন্ড। তবে নিজের নিরাপত্তার জন্যই কারও সঙ্গে আলোচনা করার সাহস হলো না তার। বাইরের কেউ জানে না শামস হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে আছে কারা। তবে যারা কাজটা করেছে তারা যদি জানতে পারে বেছে বেছে কেউ একজন তাদের ব্যাপারেই খোঁজ নিচ্ছে, দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে দেরি হবে না। জীবন তো আর কোনো অ্যাকশন মুভির দৃশ্যকল্প নয়।

সেদিন মেসের ঠিক বাইরে সিগারেট কিনতে নেমেই ছেলেটাকে দেখতে পেলো মুহিব। সামনের দোকানে দাঁড়িয়ে একটা কলা খাচ্ছে, ঝাঁকড়া চুল, ছ’ফিটের ওপর লম্বা দানবীয় দেহের সিভিলের আসাদ।

ছুরি খেয়ে সেলেব্রিটি!

সিগারেটটা কিনে তার দিকে একগাল হাসি নিয়ে এগিয়ে গেলো মুহিব, “কি খবর, দোস্ত?”

অমতের দৃষ্টিতে আর হাতের সিগারেটের দিকে তাকিয়ে থাকলো আসাদ, “কি যে পাও মিয়া তোমরা এইসব খাইয়া।”

“ইঞ্জিনিয়ারিং লাইফ, ম্যান। টু স্মোক অ্যান্ড টু গেট ফাকড।” হাতে হাত মেলালো ওরা, “তারপর, চলছে কেমন?”

“খারাপ না। যেমন চলে আরকি। ‘ইয়ে’-মারা অবস্থা।” আসাদ অবশ্য ‘ইয়ে’র পরিবর্তে অন্য একটি শব্দ ব্যবহার করলো। তবে সভ্য সমাজে তা উচ্চারণ নিষিদ্ধ।”তোর?”

কাঁধ ঝাঁকালো মুহিব, “পুরাই ‘ইয়ে’-মারা।” একই শব্দের সাহায্যে মনের ভাব প্রকাশ করলো মুহিব, “কেকেআর স্যার অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে রাখসে। ক্লাস টেস্টে পাঁচ নাম্বার কমিয়ে তিনশ পৃষ্ঠার অ্যাসাইনমেন্ট। ক্যালকুলেট কর। এক পৃষ্ঠার জন্য কয় নাম্বার?”

“কেকেআর মানে কলিমুল্লাহ স্যার না?”

কিছুক্ষণ চলমান বিশ্ববিদ্যালয় জীবন আর তাতে জীবন যাপন করতে তাদের কি ধরণের ‘ইয়ে’-মারা খেতে হচ্ছে তা নিয়ে আলাপ করলো ওরা। যে কোনো দুই প্রকৌশল বিদ্যা শিখতে থাকা ছাত্রই দেখা হলে এমনটা আলাপ করে। ব্রিটিশরা যেমন বলে থাকে, “আবহাওয়াটা আজ মেঘলা, কি বলুন?”

ইঞ্জিনিয়ারিং স্টুডেন্টের আবহাওয়া সব সময় ‘ইয়ে’ নির্ভর। ওই এক শব্দের অনুপস্থিতি তাদের পঙ্গু করেও দিতে পারতো। আসাদের সঙ্গে দশ মিনিটের কথোপকথনের মধ্যে শব্দটার গোটা পঞ্চাশেক ব্যবহার করে ফেললো মুহিব। তারপর পাড়লো আসল কথা।

“দোস্ত, রেদোয়ান ভাইকে চিনিস?”

সাথে সাথেই প্রবলবেগে মাথা দোলালো আসাদ, “পোঁদ-পাকা পোলাটার কথা জিগাইতেছো না? পলিটিক্স করে।”

“সেইটাই। তুই চেইতা আছস ক্যান?”

“কোন পোলা ওর ওপর চেইতা থাকবো না? ধইরা ব্যাটার ‘ইয়ে’টা একদিন মাইরা দেওয়া উচিত। কামটা কি করে নাই সে? ক্যাম্পাসের ভেতর যতোগুলো দোকান আছে সবগুলা থেকে সে টাকা নেয়। চান্দার নাম করে নেয় না, অন্য সব অজুহাত দেখায় আরকি। বিরাট সমাজ সেবক, বোঝো নাই? তারে নিয়ে কমিটির কোনো মাথাব্যথা নাই। বাইরের দোকানে কি করে তা আমারও মাথাব্যথা না। কিন্তু হলের ভেতর এই পোলা চান্দা তোলে, আমাদের পোলাপানদের থেইকা। সেন্ট্রালে এখনও জানে না মনে হয়। অথবা জাইনাও সাপোর্ট দেয়। কে জানে। চৌদ্দগুষ্টির সবাই রাজনীতি করে। তারে ঘাটাবে কে?”

মাথা দোলালো মুহিব। ঢোলের বাড়ি সে দিয়ে ফেলেছে। এখন যা বলার আসাদ নিজে থেকেই বলবে। ছুরি খাওয়ার পর থেকে তাবৎ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ওপর আসাদের ক্ষেপে থাকার কারণটা বোঝা কঠিন নয়।

“এই ছেলের ওপর আমার খিঁচ অবশ্য চাঁন্দাবাজি নিয়া না।” একটু সামনে ঝুঁকে এসে বলল আসাদ, গলার স্বর নামিয়ে ফেলেছে।”ঘটনা আরও আছে। মাইয়া নিয়া অনেক কেস আছে এই মাদারচোতের। শালবাগান বিশ্ববিদ্যালয়টা আছে না, প্রাইভেট? ঐখানের এক বিবিএর মেয়ের সাথে তার ভিডিও সে ইন্টারনেটে ছাড়ছে পর্যন্ত। কেসটা ছিল রেপের।”

“হোয়াট দ্য…! ঐ মেয়ে মামলা করেনি?”

মাথা নাড়লো আসাদ, “র‍্যাডের পাওয়ার জানোস? লোকাল পোলা সে, এখন ভার্সিটির পলিটিক্সে ঢুইকা গেছে। তার বাবা মূলধারার রাজনীতি করে, অনেক সিনিয়র পাবলিক। লোকমুখে শুনি বাপটা এতো ন্যাংটা না। কিন্তু তার নাম ভাঙায়ে যা করার করতেছে পোলায়। খালি বাপের কথা বইলা অবশ্য লাভ নাই, শালারা পলিটিকাল ফ্যামিলি। পরিবারের অনেকেই সিনিয়র নেতা। চাচা-ফাচা আরকি।”

“ইন্টারনেটের ওই ভিডিওটা…ওতে র‍্যাডের চেহারা বোঝা যায় নাই?” মাথা নাড়লো আসাদ, “এতো কাঁচা কামের লোক সে না। তারে তুই কোনো সলিড প্রমাণ দিয়া ধরতে পারবি না।” আরও সামনে ঝুঁকে এলো আসাদ, “আমার কি মনে হয় জানিস?”

স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলো মুহিব, “কি?”

“শামসভাইয়ের মার্ডারের সাথেও এই মাদারচোতের যোগসাগ আছে। পোঁদ চুলকে ঘা করতে এই শালার জুড়ি নাই।”

“এরকম একটা কাজ তো সে একা করবে বলে মনে হয় না। সাথে আরও কয়েকজন না নিয়ে যতো বড় হ্যাডমই হোক, এসব করা যায় না।” যেন কথার কথা বলছে এভাবে বলল মুহিব।

“তা ঠিক আছে।” একমত হলো আসাদ, “সাথে আর কারে নিবে? তোফায়েল ভাইরে তো চিনস? র‍্যাডের ক্লোজ ফ্রেন্ড। এই দুই মাদারচোত থাকলে একটা ক্যাম্পাসের পরিবেশ জাহান্নাম বানাইতে আর কিছু লাগে না।”

“তোফায়েল আর র‍্যাডের বন্ডিং তাহলে বেশ শক্ত।”

“হইবো না?” প্রশ্নটা শুনেই মহাখাপ্পা হয়ে গেলো আসাদ, “মাগিবাজ না দুইটাই? তারা যা কাজ করতেছে গত দুই বছর ধইরা, ভার্সিটির পোঁদ ফেটে দরজা।”

তোফায়েল আর রেদোয়ানকে নিয়ে আরও কিছুক্ষণ ভালো ভালো কথা বলল আসাদ। তারপর কলার বিলটা দিলেও সিগারেটের বিল দিতে নিতান্তই অপারগতা প্রকাশ করে বিদায় নিলো সে। চিন্তিত মুখে আরেকটা সিগারেট চেয়ে নিলো মুহিব। একটা কিছু করতে হবে, যতো দ্রুত সম্ভব। লোহা গরম থাকতেই পিটতে হয়।

ডান হাত পকেটে ভরে মোবাইলটা বের করলো সে। এই কাজ একাকি করা সম্ভব হবে না। শামীমের নাম্বারে ডায়াল করতে একবার রিং বাজার সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ হলো।

“বল।”

“নদীর ধারে আয়। কথা আছে। ঐ ব্যাপারটা নিয়ে। লিটু বা ইলোরাকে বলার দরকার নাই।”

দশ সেকেন্ড নীরবতা। বিষয়টার গুরুত্ব অনুধাবন করছে শামীম। তারপর জানতে চাইলো, “কি করতে চাইছিস?”

জানে, শামীম দেখতে পাবে না, তারপরও কাঁধ ঝাঁকালো মুহিব, “হাতি দিয়ে হাতি ধরবো।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *