1 of 2

কুকুরদল – ৪০

অধ্যায় ৪০

“বলতে চাইছো, এখনও কোথাও ঐ মেমরি কার্ডটা থেকে গেছে? তোফায়েলরা সেটা রিট্রিভ করতে পারেনি?”

“আমার তেমনটাই ধারণা।” মাথা দোলালো মুহিব, “আমি বলছি না একেবারেই শুন্যহাতে শামসভাই সেখানে গিয়েছিলেন। কিছু একটা তাকে দিতে হয়েছিলো অবশ্যই। নয়তো তোফায়েলরা তাকে আক্রমণ করতো না।”

“তোফায়েলরা তাকে মেমরি কার্ড পাওয়ার পরই বা কেন আক্রমণ করবে? সে যদি অন্য কোথাও আর কোনো কপি রাখে?”

শামীম একটা আঙুল তুললো, এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে আছে।

“যদি কার্ডের তথ্যটা তেমন সেন্সিটিভই হয়ে থাকে, যেমনটা হলে শামসভাই তার বেস্ট ফ্রেন্ডকেও জানাতে ভয় পান, তাহলে তিনি ওটার কপি করলেও অন্য কারও কাছে দেবেন না। দ্বিতীয় কেউ এই গোপন কথা জেনে গেলে তথ্যটার মূল্য আর কি রইলো? আর কাউকে তথ্যটা জানিয়ে বিশ্বাস করতে পারলে জাকি ভাইয়ের নাম সবার আগে আসবে। তাকেও তো তিনি তথ্যটা শেয়ার করেননি।”

মাথা দোলালো শিয়া। তাদের কথায় যুক্তি আছে। এধরণের তথ্য কেউ যখন হাতে পায় সে চেষ্টা করে নিজেকে এক ও অদ্বিতীয় সোর্স হিসেবে রাখতে। দুনিয়ার সবার কাছে যেটা চলে গেলো তা তো আর মূল্যবান কিছু নয়। তথ্যের জগতে তাই এরকম তথ্য সংগ্রাহকরা নিজের পেটে তথ্য নিয়ে বসে থাকেন। তবে এর একটা খারাপ দিক আছে, যার ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা সে তথ্যধারীকে খুন করে ফেললে তথ্যধারীর মুখের সাথে সাথে গোপনীয়তা ফাঁস হওয়ার সম্ভাবনাও বন্ধ হয়ে যায়।

তাই করেছে তোফায়েল আর রেদোয়ান। তারা একটা মেমরি কার্ড ফেরত নিয়ে কিভাবে নিশ্চিত হবে আর কোথাও কোনো কপি রাখেনি? শামস যখনই ঐ তথ্য নিয়ে নাড়াচাড়া করেছে, তখনই সে নিজের মৃত্যু পরোয়ানায় সাক্ষর করে ফেলেছে, অজান্তে। পুরো বিষয়টা ধামাচাপা দেওয়ার একটাই উপায় ছিল তোফায়েল গ্রুপের।

“কার্ডটা কোথায় থাকতে পারে? কোনো ওয়াইল্ড হাঞ্চ আছে?”

মাথা নাড়লো মুহিব, “তবে আমরা তোফায়েলকে ফোন করে এটা নিশ্চিত হতে পারি যে কার্ডটা তার কাছে নেই।”

“তাকে ফোন করলেই কি সে গড় গড় করে বলে দেবে?” শিয়া এখনও মুহিবের পরিকল্পনাটা ধরতে পারেনি।

“না। তবে ঠিক যেভাবে জাকির পেট থেকে সে সত্যটা বের করেছিলো, আমরাও করবো। তাকে এমন একটা প্রশ্ন করবো যার উত্তর হ্যাঁ হলেও বোঝা যাবে তার কাছে কার্ড নেই, না হলেও বোঝা যাবে তার কাছে কার্ড নেই। ঠিক যেভাবে মার্ডার কেসে তার উপস্থিতি তুমি নিশ্চিত হয়েছিলে।”

তোফায়েলকে ব্ল্যাকমেইল-কলিং বন্ধ করেছে ওরা। ঐ কাজের উদ্দেশ্য ছিল খুনিদের স্বীকারোক্তি আদায় করা। ওরা ভেবেছিলো নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দাবি করবে, এই উপলক্ষ্যে খুনিদের বের করে আনা হবে। তবে টাকা পয়সার অংশটুকু পরিকল্পনা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে করে খুনিদের চেয়ে বড় ঝুঁকি নিতে হবে মুহিবদের। শিয়ার পরামর্শ ছিল, সে বরং সরাসরি মেমরি কার্ডটাই চেয়ে বসবে। ফোনকলগুলোতে সে ওরকম কথাই বলেছে, প্রতিউত্তরে তোফায়েল একবারও বলেনি সে ‘কি বিষয়ে কথা হচ্ছে তা বুঝতে পারছে না। বরং সে জানতে চেয়েছিলো, শিয়া তার কাছে কি চাইছে? অর্থাৎ সে ঘটনাটা জানে, আর তা জানার উপায় একটাই। খুনিদের একজন হওয়া।

“আরেকটা ফোনকল?”

মাথা দোলালো মুহিব, “আরেকটা ফোনকল।”

“সেরাতে শোনা আরেকটা বাক্য আমাকে বলো।” টেবিলের পাশ থেকে একটা নোটবুক টেনে নিলো শিয়া।

“মাগির পুতে আর ঘোড়া ডিঙ্গাইতে পারবো না।” অন্যদিকে তাকিয়ে বলল মুহিব। শিয়া নিজেকে এখন যথেষ্ট সামলে নিয়েছে, নির্বিকার ভঙ্গিতে ভাইয়ের শেষ মুহূর্তে শোনা আরেকটা বাক্য তুললো সে। তারপর কফির কাপগুলো নিয়ে কিচেনের দিকে চলে গেলো, “ঐ শেষ ঘরটা ভাইয়ার। ওখানে চলে যাও। আমি আসছি।”

ওরা সেদিকে এগিয়ে গেলো। দরজায় গত ফুটবল ফিক্সচার ঝোলানো, তিন বছরেও নামানো হয়নি ওখান থেকে। ঘরের ভেতরটা পর্যবেক্ষণ করলো ওরা। সাড়ে তেরো বাই এগারো ফিট। বেশ বড় একটা ঘর। এই ঘরের দরকার এখন এই পরিবারের নেই। ঢাকার মধ্যে এতো বড় বাড়ি ভাড়া করে থাকায় কেমন খরচ সে ব্যাপারে ওদের সম্যক ধারণা আছে। মুহিবদের বাসা এই শহরেই। শামসভাইদের বাড়ি থেকে চল্লিশ মিনিটের দূরত্ব, জ্যাম না থাকলে পনেরো মিনিটের। অথচ এই ব্যয়বহুল বাড়িটা তারা ছাড়ছেন না। ছেলে যে আর কখনও ফিরে আসবে না সেটা হয়তো মানসিকভাবে মেনে নিতে পারেননি কেউ। এখনও পরিপাটি করে গোছানো খাট, তার পাশে টেবিল। দুয়ের মাঝে যত্ন করে দাঁড় করিয়ে রাখা শামসের ক্রিকেট ব্যাট,

মাটিতে ঠেস দিয়ে দাঁড় করানো আছে একটা হেলমেট। টেবিলের ওপর যত্ন করে সাজানো খুরমির থার্মোডায়নামিক্স, ক্রাউসের অটোমোটিভ ইঞ্জিনিয়ারিংসহ পাঁচ সেমিস্টারের বই। ষষ্ঠ সেমিস্টারটি এই স্টেট ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট সার্ভাইভ করতে পারেনি। ল্যাপটপটা বইগুলোর সামনে রাখা। কোথাও ধূলো জমে নেই, কেউ একজন নিয়মিত ঘরটা পরিস্কার করে।

“কি মনে হচ্ছে?” ওদের পেছন থেকে জানতে চাইলো শিয়া। প্রায় আঁতকে উঠেছিলো মুহিব। মেয়েটা একেবারে ভূতের মতো চলাফেরা করতে পারে।

“ল্যাপটপটা কি আমাদের হল থেকে আনানো?”

মাথা দোলালো শিয়া, “হ্যাঁ। ওরা ভাইয়ার সব জিনিস আমাদের ফেরত দিয়েছে। জাকি ভাই অবশ্য একটা শার্ট রেখে দিয়েছে নিজের কাছে, আমরা আপত্তি করিনি।”

“পাসওয়ার্ড জানো?”

মাথা দোলালো শিয়া। চেয়ার টেনে ভাইয়ের টেবিলে বসে পড়লো সে। ডালা খুলে অন করলো ল্যাপটপ।”তোমার থিওরি ঠিক থাকলে এখানে ভাইয়া সেইসব কন্টেন্ট রাখবে না। হল লাইফে নিজের পাসওয়ার্ড প্রটেক্টেড কম্পিউটারও যথেষ্ট নিরাপদ না। এই ঝুঁকি ভাইয়া নিয়েছিলো বলে মনে হয় না।”

শিয়ার সঙ্গে মুহিব সম্পূর্ণ একমত। তবুও বলল, “বিষয়টাকে নিশ্চিত করতে হলে আমাদের প্রতিটা ফোল্ডার খুঁড়ে দেখতে হবে।”

“সারাদিন লেগে যাবে…”

মাথা নাড়লো মুহিব, “তোফায়েলকে অ্যাটাক করার তারিখটা আমরা জানি। সেই দিন থেকে মার্ডারের দিন পর্যন্ত ডেট স্পেসিফিক সার্চ করো। প্রতিটা ফাইল নিজের চোখে দেখতে হবে। ফাইল নেম বা টাইপ দেখে কিছু বিশ্বাস করা যাবে না। এক্সটেনশন পাল্টে দেওয়া হতে পারে। ডট পিডিএফ আসলেই ডট পিডিএফ কি না দেখবে। দেখা গেলো ডট এমপিফোরকে পিডিএফ বানিয়ে রাখলো। এসব সাধারণ ট্রিকস, তবে কাজের। হিডেন ফাইল ধরার জন্য কিছু ফ্রি সফটওয়ার আছে। গুগলে গিয়ে আমাকে বলো, নামিয়ে দেবো।”

শামীম এর মধ্যে কেবিনেট ঘাঁটা শুরু করেছে। শুধু মেমরি কার্ড কিংবা ফাইল স্টোরিং ডিভাইস নয়, সংশ্লিষ্ট যে কোনো তথ্য পেলেই তার ছবি তুলে নেবে। সময় কোনদিক দিয়ে চলে যাচ্ছে তাদের খেয়াল রইলো না। সার্চ রেজাল্টে কম্পিউটারে জমা হয়েছে নয়শ ঊনত্রিশটা ফাইল। ওদিকে শামীম একটা নোটবুক নিয়ে পড়েছে। কলিংবেলটা তখনই পড়লো।

“আজকের মতো সার্চ পার্টির কাজ স্থগিত।” দ্রুত চেয়ার ছাড়লো শিয়া, “আব্বু-আম্মু যদি জানে ভাইয়ার ব্যাপারে আবারও খোঁড়াখুড়ি করছো, গ্যাঞ্জাম লেগে যাবে। ড্রইং রুমে গিয়ে বসে পড়ো, দ্রুত, দুইজনই।”

চোরের মতোই তড়িঘড়ি করে শামসভাইয়ের সব ব্যক্তিগত ফাইল গুছিয়ে রাখলো ওরা। পা টিপে টিপে চলে গেলো ড্রইংরুমে। দরজার বাইরে থেকে আংকেল আন্টি যেন হুটোপুটির শব্দ না পান। ভদ্র মেয়ের মতো একট ওড়না টেনে বুকে জড়িয়ে তবেই দরজা খুললো শিয়া।

“ডাক্তার ব্যাটারও কোনো কমন সেন্স নাই…” বলতে বলতে স্ত্রীকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বাবাটি, অতিথিদের চোখে পড়লো তখনই।

লালমাটিয়া কলেজের রিটায়ার্ড প্রফেসরকে গতবারের চেয়ে অনেকটাই ভালো দেখাচ্ছে। পুত্র হারানোর শোক নিশ্চয় কখনোও ভুলে যাবার মতো নয়। তবে মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়, বড় ধরণের ক্ষতি স্বীকার করেও বেঁচে থাকার নানা পথ আবিষ্কার করতে হয় তাদের। যেমনটা আবিষ্কার করেছেন শামসভাইয়ের মা। তিনি এখন ছেলের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে বেঁচে আছেন। যেন কোনো ছেলেই ছিল না তার কোনো কালে। শিয়া তার একমাত্র সন্তান!

শেষবার বাবাটির সাথে খুব ভালো করে আলাপ হয়নি। একরকম ক্ষেপেই গিয়েছিলেন ভদ্রলোক। শিয়ার মায়ের জন্য তাদের অনুরোধ করেছিলেন এ নিয়ে আর না ঘাঁটতে। ভয়ে ভয়ে তার দিকে তাকালো মুহিব, এই বুঝি ফেটে পড়লেন। আরও একবার এখানে আসার সাহস তারা কি করে দেখালো?

মুহিবের ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করতেই যেন উষ্ণ হাসিতে ভরে গেলো তার মুখ, “হ্যালো ইয়াংম্যান। মুহিব না তোমার নাম? কি খবর?”

ভদ্রলোকের সঙ্গে হাত মেলালো মুহিব। স্ত্রীকে ভেতরে পাঠিয়ে দিলেন শিয়ার বাবা। চা নাস্তা না করে ‘শিয়ার বন্ধুরা যেন কোনোমতেই পালিয়ে যেতে না পারে। মায়ের সাথে গেলো শিয়া নিজেও। ওরা দূর হতেই গলা নামিয়ে জানতে চাইলেন, “কোনো খবর আছে নাকি, বাবারা?”

খবর তো আছে অনেক কিছুই, তবে একজন বাবাকে এসব তো বুক ফুলিয়ে বলা যায় না। কাজেই মৃদু হাসতে হলো মুহিবকে, “না আংকেল। আমাদের এক ফ্রেন্ড খুব অসুস্থ। ওর জন্য ক্যাম্পেইন করছিলাম পান্থপথে। শিয়ার ক্যাম্পাস তো ওদিকেই, আমাদের দেখে চিনে ফেললো। ও বাসায় নিয়ে এলো আরকি।”

সোফায় বসে পড়লেন তিনি, “কি হয়েছে তোমার বন্ধুর?”

“ভাইরাল এনকেফেলাইটিস।”

“ডেডলি?”

মুখ কালো হয়ে গেলো মুহিব-শামীমের। এবার আর কোনো অভিনয় করতে হলো না ওদের। পরিস্থিতি বুঝে প্রসঙ্গটা পাল্টে ফেললেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। নিজের ছেলেবেলার গল্পে চলে গেলেন একেবারে। ছাত্রজীবনে এমন একটা ট্র্যাজেডিতে তাকেও পড়তে হয়েছিলো। রোগি অবশ্য বন্ধু ছিল না। জুনিয়র একটা ছেলের হলো ক্যান্সার। সে সময় ক্যান্সার মানেই সব শেষ।

“বাইরে নিয়ে যেতে হয়েছিলো ওকেও।” ভারি চশমাটা খুলে টি–টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বললেন তিনি, “আমরা টাকা তুলেছিলাম। সবখানে গিয়েছি। ইন্ডাস্ট্রিগুলোর লিংক ধরে ধরে একটা বড় অ্যামাউন্ট আদায়ের জন্য কি না করেছি।”

দুই মিনিটের দীর্ঘ একটা বিরতি নিলেন প্রৌঢ়। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “অজয় মারা গেছিলো আট মাস পর। এই আট মাস আমরা দুনিয়া তোলপাড় করে টাকা তুলেছি, রাস্তায় ঘুরেছি, পরিচিত সিনিয়রদের অফিসে গেছি। কি যে করি নাই…অথচ অজয়কে আমি জীবনে দেখিনি। খালি জানতাম একটা ছেলে আছে ওই ডিপার্টমেন্টে, অজয় নাম, অসুস্থ। এইটাই আমাদের জন্য যথেষ্ট ছিল।”

লিটুর কথা মনে পড়লো মুহিবের। এধরণের পরিণতি লিটুর হলে কি আর সহ্য করতে পারবে? গত কয়েক মাস ধরে যে ছোটাছুটি ওরা করেছে এতে করে একটা জিনিস তারা অনুভব করে। সৃষ্টিকর্তার প্রতি তাদের একটা অধিকার জন্মেছে যেন। ওরা সবাই সাধ্যের বাইরে গিয়ে চেষ্টা করেছে। এখন সৃষ্টিকর্তার উচিত লিটুকে ফিরিয়ে দেওয়া। এটা তাদের অধিকার।

শিয়ার বাবা বললেন, “অজয়কে সুস্থ অবস্থায় কোন দিন দেখিনি। আর দেখাও হবে না।”

কথাটার গভীরতা ওদের দু’জনকে ছুঁয়ে গেলো। লিটুর জন্যও এমন কতো মানুষ যে কাজ করছে। যারা তাকে কোনোদিন দেখেনি অথচ ওর অসুস্থতার খবর পেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এমন সব কাণ্ড করছে যেন লিটু তাদের আপন ভাই। এই মানুষগুলোর জন্যই হয়তো এখনও পৃথিবী সুন্দর।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *