1 of 2

কুকুরদল – ৪

অধ্যায় ৪

ওরা চলে যাওয়ার পরও দুটো মিনিট একটুও নড়তে পারলো না মুহিব। কাঁপতে কাঁপতে উঠে বসলো সে। বিজ বিজ ধরণের একটা শব্দ হচ্ছে বিশ গজ দূর থেকে। সদ্য জবাই করা প্রাণির গলার কাছে রক্তের নড়াচড়ায় এমন এক শব্দ মাঝে মাঝে হয়। মুহিবের শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে।

ত্রিশটা সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে থাকলো ও। নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে। তারপর উঠে দাঁড়ালো শান্ত পায়ে। খানিক আগের অস্থির মুহিবকে আর দেখা যাচ্ছে না। যদিও হাতজোড়া কাঁপছে এখনও।

হাঁটুগেড়ে মাটিতে বসে পড়লো মুহিব। হাতড়ে হাতড়ে সিগারেটের ফিল্টার তুলছে। ছয়টা ফিল্টার পেলো অন্ধকারেই। ওগুলোকে যত্নের সাথে প্যাকেটে তুলে রাখলো সে, ভেতরের পাঁচটা গোটা সিগারেটের সাথে। আতঙ্ক ধীরে ধীরে ফিরে আসছে, টের পায় মুহিব। এক প্যাকেটে সিগারেট থাকে বিশটা। প্যাকেটের ভেতর থেকে গেছে পাঁচটা গোল্ডলিফ। ফিল্টার কুড়িয়েছে ছ’টার। মোট এগারোটা হলো।

আর নয়টা ফিল্টার গেলো কোথায়?

মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালাবে কি? জ্বালাবে ফ্ল্যাশ?

যদি কালিগোলা অন্ধকার এই মাঠের শেষ প্রান্তে ফ্ল্যাশ জ্বালালে দূর থেকে সেটা স্টেডিয়ামের ফ্লাডলাইটের মতো দেখায়? যদি কারও চোখে লাশটা পড়ে যায়? কাছে দাঁড়িয়ে থাকা একমাত্র মানুষ হিসেবে মুহিব কি ফেঁসে যাবে না? যদি খুনিরা ফিরে আসে কোনো কারণে। দূর থেকে লাশের কাছে আলো জ্বলতে দেখে ব্যাপারটা খতিয়ে দেখতে আসে?

সর্বনাশ!

মাটিতে পাগলের মতো হাতড়াচ্ছে মুহিব। এতোক্ষণ ধরে খাওয়া সিগারেটগুলোর অবশিষ্ট ফিল্টার খুঁজছে। গেলো কোথায় ওরা? গেলো কোথায়?

“ফাক! ফাক!” বিড়বিড় করতে করতে আর দুটো ফিল্টার পেয়ে গেলো ও, “তেরো। আনলাকি। আনলাকি। আর সাতটা কই?”

বাকি ছয়টাকে পাওয়া গেলো একটু অন্যপাশে। গাছের গোড়ার সিমেন্টের বেদিতে শুয়ে পড়ার পর হাতটা লম্বভাবে মেলে ধরে বেদির বাইরে ছাই ফেলছিলো তখন। সিগারেট শেষ হতেই গোড়াটা আলতো করে ছেড়ে দিলে খসে পড়ে বাইরে-ওখানেই ফেলেছিলো ছ’টা সিগারেট ফিল্টার। অন্ধকারে হাতড়ে তাদের দ্রুত প্যাকেটে ভরে ফেললো মুহিব।

আর একটা কোথায় গেলো?

আশেপাশের মাটি আঁতিপাতি করে স্পর্শ করেও অবশিষ্ট সিগারেটের গোড়াটা খুঁজে পেলো না মুহিব। সর্বনাশ!

মনের পর্দায় স্পষ্ট দেখতে পেলো তদন্তকারী অফিসারের ছবি। ঝকঝকে দিনের আলোয় একটা লাশের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। ভুত দেখার উপযোগি ঘোর অমাবস্যায় মুহিব লাশ থেকে মাত্র ছয় ইঞ্চি দূরে যে সিগারেটের ফিল্টারটা খুঁজে পায়নি, তা তিনি কড়া রোদের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পেলেন। ফরেনসিক অনায়াসে বলে দেবে এই সিগারেট খাওয়ার সময়কাল খুনটা হওয়ার সামান্য আগে।

তারপর?

ফিল্টারে থাকবে স্যালিভা। সোজা বাংলায় লালা। মুহিব ফিল্টার ভেজানো ছেলে না। তবে যতো সামান্য পরিমাণেই থাকুক না কেন, তা ধরা পড়বে ফরেনসিক রিপোর্টে। আঙুলের ছাপ তো বোনাস। কয়েকদিন আগে ভোটার আইডি কার্ড করে ফেলেছে মুহিব, একবার সার্চ দিলেই আঙুলের ছাপ স্পষ্ট খুঁজে পাওয়া যাবে ডাটাবেজে। তারপরের দৃশ্যগুলো খুব দ্রুত দেখতে পাবে পুলিশ।

খুনের একটু আগে অপেক্ষমান খুনি সিগারেট খেয়েছে।

অর্থাৎ খুনি জানতো এখানে ভিক্টিম আসবে। তার জন্য অপেক্ষার সময়টা সিগারেট খেয়ে পার করেছে সে। এবং খুনি ভিক্টিমকে পাওয়ার পর খানিক আলাপ করেছে। মতের অমিল হওয়ায় ছুরি মেরে গলা কেটে ফেলেছে ভিক্টিমের।

খুনি হিসেবে মুহিবকে আইডেন্টিফাই করে ফেলার পর কি ঘটবে তাও হাল্কা পাতলা বুঝতে পারছে ও। তার ব্যাকগ্রাউন্ড খতিয়ে দেখা হবে। ঢাকার মিরপুরে যে কলেজে সে পড়াশোনা করেছে সেখানে লোক যাবে। শাহ আলী থানা থেকে রিপোর্ট রেডি করতে গিয়ে তাদের আক্কেল গুড়ুম হয়ে যাবে।

মুহিবের কলেজের বন্ধুদের মধ্যে অন্তত তিনজন মিরপুর দুই নম্বরের টপ টেরর। বন্ধুদের সুবাদে ছুরি মারামারির ঘটনা খুব দূরের কিছু ছিল না ওর জন্য। আড্ডায় আলাপে উঠে আসতো কিভাবে কোন গ্যাং মেম্বার কোন ভুলের কারণে ছুরি খেয়েছে। কার পেট কোন কাজের জন্য আজ সকালে ফাঁড়া হয়েছে টিন মেরে। কোন ধরণের বেয়াদবী করে ফেলায় গজারি মেরে মাথা ফাটানো হয়েছে মণিপুরের গ্যাং মেম্বারের। পুরোটা কলেজ লাইফ এসবের মধ্যেই তো আড্ডা জমতো। পরবর্তিতে সবাই তো আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি। টেন্ডারবাজিতে হাত পাকিয়ে ফেলেছে ওদের সার্কেলেরই এক বন্ধু। রিভলভারের প্রকোপে তার সাথে আড্ডা দেওয়াই কঠিন হয়ে গেছে এখন। পুলিশের মামলা ঝুলছে অন্তত চৌদ্দটা।

এরকম এক ফ্রেন্ড সার্কেল থেকে সরাসরি ভদ্র-সভ্যদের জগৎ ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে ঢুকে পড়ে তো মুহিব আর ফেরেশতা হয়ে যায়নি। অন্তত এমনটাই ধরে নেবে তদন্তকারী অফিসার। আর এতে করে মুহিব এমন একটা খুন করতে পারে তা দিনের আলোর মতোই প্রমাণ হয়ে যাবে। আদালতে টিকতেই পারবে না মুহিব।

একটা সিগারেটের ফিল্টারের জন্য!

মোবাইলটা কাঁপা হাতে বের করলো ও। আলো দরকার ওর। আলো দরকার অনেক। একটা ফিল্টারের জন্য এমন এক অপরাধে ফেঁসে যেতে পারে না যেটা করেইনি সে।

ফ্ল্যাশ না জ্বালিয়ে ডিসপ্লে অন করলো মুহিব। মৃদু আলোয় আঁতিপাতি খুঁজছে ওর চোখজোড়া।

“বেশিক্ষণ আলো জ্বালানো যাবে না। মারা খেয়ে যাবো, ম্যান। আই অ্যাম সো ফাকড!” বিড়বিড় করে নিজের সঙ্গেই যেন কথা বলছে মুহিব। চেষ্টা করছে অটোসাজেশন দিয়ে নিজেকে শান্ত রাখতে। পারছে না।

অবশেষে জিনিসটাকে দেখতে পেলো মুহিব। আলো নেভাতে ভুলে গেলো রাতারাতি।

পড়ে থাকা লাশটার চেহারা আলো-আঁধারিতে স্পষ্ট নয়। তবে ভীতিকর চিত্রকল্পটা যথেষ্ট বার্তা পৌছে দিচ্ছে মুহিবের মস্তিষ্কে। সামান্য বাঁয়ে কাত হয়ে শুয়ে থাকা একটা লাশ। রক্ত ছড়িয়ে গেছে খানিকটা দূর পর্যন্ত। তবে ইংরেজি চলচ্চিত্রে যেমনটা দেখা যায়, অনেকটা দূর পর্যন্ত গলার রক্ত ছড়ানো, অতোটা নয়। গলার ক্ষতের দেড় ফুট ব্যাসের মধ্যেই রক্তের বিস্তৃতি শেষ। সম্ভবত মাটি শুষে নেওয়ার কারণে বেশিদূর ছড়ায়নি আঠালো তরল।

রক্তের ছোপ যেখানে শেষ, সেখানেই পড়ে আছে সিগারেটের শেষ ফিল্টারটা।

*

গত আধ ঘণ্টা ধরে মেসের বাথরুমে সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে হাত ধুচ্ছে মুহিব। ঘষতে ঘষতে হাতের চামড়া তুলে ফেলার যোগাড়, তারপরও থামার লক্ষণ নেই তার মধ্যে। ঘিন ঘিন করছে হাত, খুন হয়ে যাওয়া মানুষটার রক্ত ওর হাতে মেখে গিয়েছিলো।

শেষ সিগারেটের ফিল্টারটা কোনদিকে ফেলেছিলো তা মনে করতেই ফিল্টারের সম্ভাব্য হদিস পেয়ে গেছিলো মুহিব। ফিল্মি স্টাইলে টোকা মারা মুহিব কোনোদিনই শিখতে পারেনি। ফিল্টারের তলে নিখুঁত এক টোকা দিয়ে ফিল্টারকে কয়েক গজ দূরে ফেলার এই শিক্ষা কলেজে থাকতে টপ টেরর বন্ধু থেকে শুরু করে ক্লাসের ফার্স্ট বয় পর্যন্ত ওকে শেখানোর চেষ্টা করেছিলো। কাজটা করতে গিয়ে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে পুরো দুটো বছর। তবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ঢোকার পর শামীমের প্যাঁদানি খেয়ে শিখে নিতে হয়েছে জিনিসটা।

টোকা-বিদ্যার প্রয়োগ করে একটা ফিল্টারকে বেশ খানিকটা দূরে ফেলেছিলো কালিগোলা মাঠে। ইতির কথা ভাবতে ভাবতে টোকাটা দারুণ হয়েছিলো। আক্রোশ মেটাতে ফিল্টার টোকা মেরে দূরে পাঠানোর চেয়ে চমৎকার কিছু হতে পারে না। কিন্তু খানিক বাদেই ওই ফিল্টারের চারপাশে এতো কাণ্ড হয়ে যাবে কে ভাবতে পেরেছিলো!

মুহিবের এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না। সাবান মেখে কচলাতে থাকা হাতজোড়ার দিকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। মনে হচ্ছে, ফেনাগুলোকে ধুয়ে ফেললেই বেরিয়ে পড়বে তর্জনীর পাশের আঁচড় রাঙা রক্তের ছোপ!

হাত ধুয়ে ফেললো মুহিব। ফেরার পথে তাকালো তিনশ’ চৌদ্দের দরজার দিকে। বন্ধ, বড় একটা তালা ঝুলছে লিটুর দরজায়। শালাকে ভূত দেখার জন্য স্পন্সর করেছিলো শামীম আর ও। ফুটবল টিমের পরিবারে তো আর ভুত দেখার বিলাসীতা মানায় না। টাকা সে বাসায় চাইতে পারতো না। এতো বিভ্রান্তির মধ্যেই মুচকি একটা হাসি ফুটলো মুহিবের মুখে। লিটু এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো আছে অন্তত।

বেয়াল্লিশ বর্গফুটের ঘরে ঢুকে দরজাটা দ্রুত লাগিয়ে দিলো ও। ওপর আর নিচের ছিটকিনি তুলে দিয়েছে। হাতটা ধুয়ে এসেছে বটে, তবে ঝামেলা এখনই শেষ হয়নি। ঘরের মধ্যে মুহিবের খুনের ঘটনাস্থলে থাকার প্রমাণ কিছু রয়ে গেছে।

সিগারেটের একটা ফিল্টার, গোড়ায় খুন হয়ে যাওয়া একজন মানুষের টাটকা রক্ত। সিগারেটের প্যাকেটের অভ্যন্তরভাগ, যেখানে সিগারেটের রক্তমাখা ফিল্টার ফেলতে গিয়ে ওই রক্ত নানা জায়গায় মাখিয়ে ফেলেছে মুহিবই।

“ট্রেস অ্যামাউন্ট!” বিড়বিড় করে নিজেকেই বলল মুহিব।

ফরেনসিকের জন্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র নমুনাও যথেষ্ট। ট্রেস অ্যামাউন্ট রক্তের

ছোপের কারণে মুহিবের ফাঁসি পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের আইনশৃংঙ্খলা বাহিনি অতো তৎপর না হয়তো, কিন্তু সম্ভাবনাটা উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়।

ট্রেস অ্যামাউন্ট। অর্থাৎ শার্ট আর প্যান্টটাও ধ্বংস করতে হবে। কে জানে বিন্দু বিসর্গ রক্ত লেগে গিয়েছে কি না! সাবধানের মার নেই।

ঘরের চারপাশে তাকালো মুহিব। প্রথম দিনের মতোই, আরেকটা আন্ডারওয়ার টেবিলের নিচ থেকে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। দ্রুত চোখ সরিয়ে দরজার দিকে দেখতেই মনে পড়লো।

স্যান্ডেলজোড়া। সবচেয়ে বেশি রক্তের ট্রেস থাকার সম্ভাবনা ওদের মধ্যে। তলে হয়তো ওভাবে পাওয়া যাবে না। ভিসির বাসার সামনের মাঠ থেকে এই মেস পর্যন্ত দূরত্ব দুই কিলোমিটারের কাছাকাছি। লুকিয়ে এলাকা ত্যাগ করার লক্ষ্যে আরও বড় একটা জায়গা পার হতে হয়েছে তাকে। তলার সঙ্গে ঘষা খেয়েছে দীর্ঘ পথ। তবে এক মুভিতে জেনেছিলো জুতোর ক্ষেত্রে সুখতলার চাইতে বেশি এভিডেন্স ধারণ করে গোড়ার সঙ্গে লম্বভাবে উঠে যাওয়া সোলের শক্ত অংশ। আর সেটাই এখন ভাবাচ্ছে মুহিবকে।

স্যান্ডেলজোড়াও বিসর্জন দিতে হবে। তবে এমনভাবে নয়, যেন আবার কোথাও আবিষ্কৃত হয়ে যায়! কম্পিউটারের মনিটরের ওপর দুটো হাত রাখলো ও। হাল্কা কাঁপছে হাতজোড়া। তারপর বেশ ভালো মতো কাঁপা শুরু হলো।

আজকে আরেকটু হলেই ও নিজেও জবাই হয়ে যেতে পারতো!

“ফাক, ম্যান!” নিজে থেকেই উচ্চারণ করলো ও শব্দ দুটো। এভিডেন্স সিগারেট প্যাক থেকে অবশিষ্ট পাঁচ সিগারেটের একটা বের করে ধরিয়ে ফেললো তারপর।

মনোযোগ অন্য কোনোদিকে সরাতে হবে। এখন জামাকাপড় অথবা স্যান্ডেল ধ্বংস করার উপযুক্ত সময় না। সম্ভবত খুনের ব্যাপারটা এখনও জানাজানি হয়নি, তাহলে হইহট্টগোল কিছু শোনা যেতো–তবে হয়ে যাবে যে কোনো সময়। আজ রাতের ঘন অমাবস্যায় কেউ ওদিকে যদি নাও যায়, আগামিকাল সকালে লাশ পাওয়া যাবে নিঃসন্দেহে। লাশ আবিষ্কার হওয়ার পর যদি কেউ মুখ ফস্কেও বলে ফেলে, “মুহিব ব্যাটাকে তো ঘটনার রাতে কিছু পোড়াতে দেখলাম!”

আর এটা বলা হবে তা নিশ্চিত। আজ হলরুমে গন্ধযুক্ত বায়ুত্যাগও তাকে ক্যাম্পাসের ফেসবুক-গোয়েন্দাদের চোখে আসামী বানিয়ে ফেলতে পারে। তারা সব কিছু নিয়ে ব্যবচ্ছেদ করবে। রাতারাতি গোয়েন্দা বনে যাবে অনেকেই। তারা জামা-কাপড় পোড়ানোর মতো একটা ঘটনা ঘোষণা করে বেড়াতে থাকলে নিঃসন্দেহে সেটা কর্তব্যরত অফিসারের কানেও আসবে। তারপর ফাঁসির দড়ি।

না, আজ রাতে অস্বাভাবিক কিছুই করা যাবে না। সেজন্য ওকে দেখতে হবে মুভি। অন্তত ফেসবুকে এমন একটা স্ট্যাটাস দিয়ে রাখাটা হয়তো ভালো হবে। ডেস্কটপ অন করে দ্রুত নিজের টাইমলাইনে চলে গেলো মুহিব। স্ট্যাটাস দিলো : Watching Sully (2016)

এতোক্ষণে খেয়াল করলো ধরানো সিগারেটটা ফিল্টারে চলে এসেছে। দরজা বরাবর ছুঁড়ে মারতে গিয়েও থমকে গেলো মুহিব। এটাও ছিল অবশিষ্ট রক্তমাখা ফিল্টারের সঙ্গে। ট্রেস অ্যামাউন্ট রক্ত এখানে নেই কে বলতে পারে? এভিডেন্স প্যাকেটের মধ্যেই চাপ দিয়ে আগুনটা নেভালো মুহিব। তারপর ধরালো আরেকটা।

হোমপেজে এসে ভুতবাবা সুমনের পোস্ট দেখতে পেলো, “অপারেশন সাকসেসফুল!”

মাথা দোলালো মুহিব। এটা একটা সেমি-অ্যালিবাই হতে পারে। এভিডেন্স প্যাকেট পকেটে নিয়ে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। রুমে তালা দিয়ে চাবি ক্যাচ ধরতে ধরতে রওনা দিলো নিচের দিকে। চারতলা নামার পুরোটা সময় ঠোঁটে থাকলো গেম অব থ্রোনসের থিম মিউজিকের সুর। মোস্ট সিনিয়র বেলায়েত ভাইয়ের সামনে পড়ে একবার থামলো, সালাম দিলো বিনয়ের সাথে। বিরস মুখে সেটা গ্রহণ করতে করতে ওপরের দিকে রওনা হলেন তিনি। সিগারেটখোরের আবার সালাম!

নিচে নেমে বাচ্চুদাকে কোথাও দেখতে পেলো না ও। হয়তো জরিমানা করছেন আর কাউকে, নামকরণের সার্থকতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে তো। খোলা দরজা দিয়ে মেসের বাইরে বের হয়ে এলো মুহিব। পাশেই একটা বিরাট পুকুর। এখানে দিনের বেলা হাঁসেরা ঘুরে বেড়ায়। সবুজ রঙের পানি এই পুকুরে, গাঢ় সবুজ। বিকেলের দিকে এখানে দাঁড়াতেই মন ভালো হয়ে যায়। সবুজ রঙের পানির কারণ হিসেবে কৃতিত্ব দিতে হবে চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোকে। তারাই প্রতিফলিত হয়, সবুজ ছড়ায় পানিতে। তবে মেসের ছাত্ররা বলে ভিন্ন কথা। তাদের মতে সাততলা মেসের প্রতিটা টয়লেটের কমন আউটিং এই পুকুর। নুরুল্লাহকে সেদিন এই পুকুরে গোসল করতে দেখে বাকিরা ব্যঙ্গ করেছিলো খুব, “কি রে, গুয়ের পানি দিয়া গোসল করে আসলি!”

গুয়ের পানি টলটল করছে। পাড়ে কেউ নেই। রাত হয়ে গেলে এখানে কেউ আসে না তেমন। পুকুর পাড়ে বসার সুবন্দোবস্ত নেই বলেই সম্ভবত, নয়তো আড্ডার জন্য দারুণ একটা জায়গা। রাতের অন্ধকারে পুকুরের পানি অবশ্য সবুজ দেখাচ্ছে না। গাঢ় কালো রঙা পানি, প্রতিফলিত হচ্ছে চাঁদ।

অপচয়কারী শয়তানের ভাই। এভিডেন্স তো কি হয়েছে? অবশিষ্ট সিগারেটের প্যাকেট থেকে আরেকটা সিগারেট বের করে নিলো মুহিব। তারপর ফোন দিলো শামীমকে। ফোনটা ধরলো ইলোরা।

“কি রে? আসলেই কাপল হয়ে গেছিস নাকি?” হাসি হাসি গলায় জানতে চাইলো মুহিব, “বাসে যে রোমান্টিক ছবি দেখলাম! তারপর আবার এর ফোন ও রিসিভ করছিস। দারুণ ব্যাপার স্যাপার।”

হাসলো মেয়েটা, “এটুকু তো কিছুই না। আমরা একসাথে রাতও কাটিয়েছি গত তিন দিন।

“সাবাশ। সেই রাত কাটানোর রসালো বর্ণনা শুনতেই ফোন করেছিলাম শামীমকে। তুই-ও বলতে পারিস। ছিলি তো একসাথেই।” জানে একয়দিন সারারাত জেগে ভৌতিক আলামত রেকর্ড করেছে ওরা।

“তা ছিলাম। আজকে রাতটা ভালোভাবে শুরু হয়েছে। মাঝের ঘরের ছাত ধ্বসে পড়েছে আটটার দিকে। ফ্যান্টাস্টিক!”

“তোরা ঠিক আছিস তো?” চিন্তিত কণ্ঠে জানতে চাইলো মুহিব।

“তা আছি। কিন্তু আমাদের একটা ক্যামেরা গেছে। একেবারে ভেঙে চুরচর। গোটা বাড়িতেই ক্যামেরা সেট করেছিলাম তো। হিউজ লস খেয়ে গেলো ভুতবাবা।”

“সাবধানে থাকিস। মানুষের শয়তানিও হতে পারে সব। তেমন হলে তোদের সেফটি কিন্তু কম্প্রোমাইজড।”

“মানুষের কারসাজি হলে ওই শালার ব্যাটাকে ধরেই ক্যাম্পাসে ফিরবো। ক্যামেরার দাম জানে মাদারসান? ভাঙলো যে খুব!”

“ধরতে পারলে জানাস। একসাথে থাকিস। বিপদে পড়িস না।”

“ওকে, বস।” কৌতুকময় কণ্ঠে বলল ইলোরা, “বিপদে পড়বো না। তোর কি হয়েছে? মন খারাপ কেন?”

দুই সেকেন্ড কথাই বলতে পারলো না মুহিব।

“তুই কি ম্যাজিশিয়ান?”

“না। তোর মন বিশেষ ভালো না। তবে সেটা আমাদের ভুত দেখা নিয়ে না। কি ঘটেছে বল্ তো?”

“বলবো। লং স্টোরি। তোরা ফিরে আয়।”

“ওকে।”

এক সেকেন্ড চুপ থাকলো ওরা। একটু ইতস্তত করে জানতে চাইলো মুহিব, “তুই কিভাবে মানুষের মনের অবস্থা বুঝিস?”

খিলখিল করে হাসলো ইলোরা। চেহারার মতো ওর হাসিটাও সুন্দর।”আরে গাধা, মেয়েরা অনেক কিছু বুঝতে পারে। রাখি তাহলে। ক্যাম্পাসে ফিরে কথা হবে।

“চলে আসছিস তাহলে?”

“হুম, আর দুই দিন। এরপর তো এমনিতেও ক্লাস শুরু।”

“ওকে। টাটা।”

বালখিল্য বিদায় সম্ভাষণে অবাক হয় না ইলোরা। মুহিব-শামীম এটা নিয়মিত করে, “টাটা।”

ফোনটা রেখে সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা একটা করে ফিল্টার বের করলো মুহিব। টোকা-বিদ্যা কাজে লাগিয়ে পুকুরের যতোদূর সম্ভব ভেতরের দিকে ফেললো তাদের। একটা একটা করে সবগুলো ফেলতে ফেলতে হাতে ধরা সিগারেটটাও শেষ হয়ে গেলো। ওটাকেও টোকা মেরে পুকুরের মাঝে পাঠালো মুহিব। সবশেষে তিনটা অবশিষ্ট সিগারেট বের করে শার্টের পকেটে রাখলো ও, ভেতর থেকে ফয়েল পেপারটা বের করে কুঁচি কুঁচি করে ছিড়তে শুরু করলো। সাবধানে কাজটা করলো যেন একটা কুচিও বাইরে না পড়ে। তারপর সবগুলোকে ভাসিয়ে দিলো পুকুরে।

পানি আলামত ধ্বংস করে!

সবশেষে গেলো সিগারেটের প্যাকেটটা। ভাঁজ আর আঠাগুলো খুলে সমান একটা কাগজে রূপান্তরিত করলো ওটাকে, তারপর ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করলো। ফয়েলের পথেই গেলো ওরা। কাজগুলো করতে করতে দুটো সিগারেট শেষ করেছে মুহিব। সর্বশেষ সিগারেটটা ধরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফিরে এলো মেসের ভেতর। চারতলা পৌছাতে পৌছাতে শেষের পথে চলে আসে সেটাও।

বাথরুমের পাশে করিডোরের একটা জানালা। নিচের দিকে তাকালে স্পষ্ট দেখা যায় মেসের রান্নাঘরের ছাদ। জানালা বরাবর সেই ছাদের ওপর সর্বশেষ ফিল্টারটা ছুঁড়ে মারলো মুহিব।

এতোক্ষণে নিশ্চিন্ত!

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *