উবিক – ফিলিপ কে. ডিক
ভূমিকা
মৃত্যু, চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি, যেটাকে আমরা জীবন বলি তার এক অনিবার্য এবং যা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া যায় না এমন এক ধ্রুব সত্য। কিন্তু আসলেই কি তাই? যদি এমন হয় যে মৃত্যুর পরেও সীমিত সময়ের জন্য এবং সীমিত এক রূপে আপনি আবার ফিরে আসতে পারেন প্রিয়জনের সাথে দেখা করার জন্য, একইসাথে এমন এক অনস্বীকার্য অভিজ্ঞতাও অর্জন হয় যা কিনা স্বতন্ত্র মানব চেতনা থেকে পুরোপুরি মুক্ত এবং অন্য ভুবনের বিদ্যমান অস্তিত্ব আর অস্তিত্বহীনতার চিরাচরিত দ্বন্দ্বের স্বরূপ উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। ফিলিপ কে ডিকের আঁকা অদ্ভুত এক দর্শন, যেখানে বেঁচে থাকা মানুষগুলো সেই সব মানুষের সাথে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য যোগাযোগ করতে পারে যারা ইতোমধ্যেই জীবনের সকল লেনদেনের সমাপ্তি টেনেছে; যদিও তাদের সেই যোগাযোগ সীমাবদ্ধ থাকে এক বিশেষ ধরনের সমাধি ভবনে যেখানে এই বিদেহ আত্মাদের উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু এই তথাকথিত অর্ধ-জীবন—এরও একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা পার হয়ে গেলে এই বিদেহ আত্মারা সম্পূর্ণরূপে মৃত্যুবরণ করে।
ফিলিপ কে ডিকের গল্প উপন্যাসগুলো দুটো ধারায় বিভক্ত করা যায়। প্রথম ধারাটি হলো যেখানে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির একটি মাত্র উপাদান ব্যবহার করে সমসাময়িক বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে লেখা হয়। যেমন, দ্য ম্যান ইন দ্য হাই ক্যাসল এবং টাইম আউট অব জয়েন্ট। অন্য ধারাটি হলো যেখানে দূর ভবিষ্যতকে বেছে নেওয়া হয়, সেই সাথে থাকে অসংখ্য কারিগরি অথবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির বর্ণনা। যেমন, ডু অ্যান্ড্রয়েডস ড্রিম অব ইলেক্ট্রিক শিপ অথবা মাইনরিটি রিপোর্ট। নিঃসন্দেহে, উবিক শেষোক্ত ধারাটির অন্তর্ভুক্ত; ভবিষ্যতের এক বাস্তবতা, সেই সাথে ভবিষ্যতের অসংখ্য প্রযুক্তির বর্ণনা, টেলিপ্যাথি এবং প্রিকগনিশন, এমন এক ভবিষ্যৎ যেখানে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মৃত্যুকেও জয় করা যায়।
ফিলিপ কে ডিকের উবিক উপন্যাসটি লেখা হয় ১৯৬৯ সালে যেখানে তিনি ভবিষ্যতের ১৯৯২ সালের এক বিষন্ন এবং ব্যঙ্গাত্মক চিত্র তুলে ধরেছেন। এই উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় আত্মজ্ঞানবাদ যা কেবল নিজের মনের অস্তিত্ব স্বীকার করে। আমরা কীভাবে নিশ্চিত হবো যে কোনটা বাস্তব, আর কোনটা নয়? আমরা কীভাবে নিশ্চিত হতে পারি যে আমাদের মনের বাইরে আমরা যা উপলব্ধি করি সেটাই বাস্তবতা? আসলে আমরা যা অনুভব করছি সেগুলো কি স্রেফ স্বপ্নে দেখছি নাকি আমরা আসলে অন্য কারো স্বপ্নে সৃষ্ট উপাদান? ধর্মীয় কিছু উপাদানও এখানে দেখা যায়, কিন্তু পিকেডি তার স্বভাবসুলভ লেখনি দ্বারা নিজে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার ছেড়ে দেন পাঠকের উপর।
উবিক ফিলিপ কে ডিকের সেরা উপন্যাস। তালগোল পাকানো বাস্তবতা, দৃষ্টিভঙ্গি পালটে দেওয়ার মতো দ্রুত গতির উপন্যাস যেখানে প্রায় বিদ্রুপের ছলেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে। অনেক সাহিত্যবিশারদ আর সমালোচকদের মতে উবিক বিজ্ঞান কল্পকাহিনি নয়, বরং মূল ধারার সাহিত্যেরই একটি মাইলফলক। ২০০৯ সালে টাইম ম্যাগাজিন ১৯২৩ সালের পর প্রকাশিত সেরা ১০০টি উপন্যাসের তালিকায় উবিক উপন্যাসটি অন্তর্ভুক্ত করে।
ফিলিপ কে ডিকের লেখার ধরন অনেক জটিল এবং উবিক উপন্যাসে সেই জটিলতা যেন নিজেকেও ছাড়িয়ে গেছে। অনুবাদের কাজটা আমার জন্য সত্যিকার অর্থেই কঠিন ছিলো। জনাব খালেদ খান এবং জনাব আশরাফুল সুমনের দক্ষ সম্পাদনার জন্য তাদের দুজনকে অসংখ্য ধন্যবাদ। অসাধারণ প্রচ্ছদের জন্য ধন্যবাদ দিতে চাই জনাব সুলতান আহমেদ সজলকে। সর্বোপরি বিশেষ ধন্যবাদের দাবিদার প্রকাশক জনাব তন্ময় আহমেদ, এই জটিল উপন্যাসটি যথাযথ অনুমতি নিয়ে বাংলা ভাষায় প্ৰকাশ করার আগ্রহের জন্য। পেপার ভয়েজার প্রকাশনির সকলকে এবং এই বই প্রকাশের সাথে জড়িত সকলকে ধন্যবাদ।
সম্ভবত উবিক উপন্যাসের অনুবাদ প্রকাশের মাধ্যমে বাংলা ভাষায় অভিষেক হতে যাচ্ছে ফিলিপ কে ডিকের। অনুবাদটি পাঠযোগ্য এবং উপভোগ্য করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। কতটুকু সফল হয়েছি সেটা পাঠকরাই বলবেন।
আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে। ধন্যবাদ।
নাজমুছ ছাকিব ৩০ জুলাই, ২০২১


Leave a Reply