উবিক – ১১

অধ্যায় ১১

নির্দেশনা অনুযায়ী সেবন করুন, উবিক আপনাকে দিচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন এবং আরামদায়ক নিদ্রার নিশ্চয়তা, জেগে ওঠার পর বিরক্তিকর তন্দ্রাচ্ছন্নতা থেকে চিরমুক্তি। আপনি জেগে উঠবেন পুরোপুরি সতেজ আর তরতাজা হয়ে, দিনের প্রতিটি সমস্যা মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হয়ে। নির্দেশিত সেবনমাত্রার চেয়ে অতিরিক্ত প্রয়োগ করবেন না।

.

‘এই যে, আপনার হাতের ঐ বোতলটা,’ জেসপারসেন বললো। গাড়ির ভেতরে উঁকি দিলো সে, তার কণ্ঠস্বরে একটা অদ্ভুত ভাব। ‘আমি দেখতে পারি?’

কোনো কথা না বলে জো চীপ এলিক্সার অব ইউবিকের চ্যাপটা বোতলটা বিমান চালকের হাতে তুলে দিলো।

‘আমার দাদি প্রায়ই এটার কথা বলতো,’ জেসপারসেন বললো, বোতলটা সে আলোর দিকে তুলে ধরেছে। ‘আপনি এটা কোথায় পেয়েছেন? গৃহযুদ্ধের পর থেকে ওরা এই জিনিস আর কখনো বানায়নি।’

‘আমি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি,’ বললো জো।

‘নিঃসন্দেহে। হ্যাঁ, হাতে তৈরি এই কাচের বোতলগুলো আপনি এখন আর কোথাও পাবেন না। প্রথমত, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ব্যাপক হারে এটা প্রস্তুত করেনি। আনুমানিক ১৮৫০ সালের দিকে সান ফ্রান্সিসকোতে এই ঔষধ আবিষ্কৃত হয়। কখনো কোনো দোকানে বিক্রয় করা হয়নি, ক্রেতাকে সব সময়ই ক্রয়াদেশ দিয়ে এটা সংগ্রহ করতে হতো। এটা তিন ধরনের ছিল। আপনার এই বোতলে যেটা আছে, তিন ধরনের মধ্যে এটাই সবচেয়ে শক্তিশালী।’ জোয়ের দিকে তাকালো সে। ‘আপনি কি জানেন এটাতে কী আছে?’

‘নিশ্চয়ই,’ জো বললো। ‘গোলমরিচের তেল, দস্তা, সোডিয়াম সাইট্রেট, কাঠকয়লা—’

‘বাদ দিন,’ জোকে মাঝপথে থামিয়ে দিলো জেসপারসেন। তার ভ্রু কুঁচকানো। স্পষ্টতই, দ্রুত গতিতে কিছু একটা ভাবছে সে। অবশেষে তার অভিব্যক্তির পরিবর্তন হলো। একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে সে। ‘এলিক্সার অব ইউবিকের এই বোতলের বিনিময়ে আমি বিমানে করে আপনাকে ডি মোয়েন পৌঁছে দেবো। চলুন যাওয়া যাক। দিনের আলোতে যত বেশি সম্ভব উড়তে চাই আমি।’ হালকা পদক্ষেপে ’২৯ ফোর্ডের কাছ থেকে সরে গেল সে, বোতলটা তার হাতে ধরা।

দশ মিনিট পরে কার্টিস-রাইট বাইপ্লেনে জ্বালানি বোঝাই করে বিশাল প্রপেলার হাত দিয়ে ঘুরিয়ে চালু করা হলো। তারপর ঢালু রানওয়ে ধরে এলোমেলোভাবে ছুটতে শুরু করলো জো চীপ আর জেসপারসেনকে নিয়ে বাতাসে সামান্য ভেসেই আবার ঝাঁকুনি দিয়ে নেমে এলো মাটিতে। দাঁতে দাঁত চেপে ঝুলে রইলো জো।

‘অনেক বেশি ওজন বহন করছি আমরা,’ কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে বললো জেসপারসেন; তাকে মোটেও বিচলিত মনে হচ্ছে না। অবশেষে রানওয়ের মায়া ত্যাগ করে বিমানটা আকাশে ভাসলো প্রচণ্ড শব্দ করে। আশেপাশের নিচু ভবনগুলোর ছাদের উপর দিয়ে উড়ে গেল পশ্চিম দিকে।

জো চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলো, ‘ওখানে পৌঁছাতে কতক্ষণ লাগতে পারে?’

‘নির্ভর করছে কী পরিমাণ অনুকূল বাতাস আমরা পাবো তার উপর। বলা কঠিন। ভাগ্য ভালো থাকলে সম্ভবত আগামীকাল দুপুরের মধ্যে পৌঁছাতে পারি।’

‘আপনি কি এখন আমাকে বলবেন,’ আবারও চিৎকার করলো জো, ‘ঐ বোতলে আসলে কী আছে?’

‘খনিজ তেলের মিশ্রণে ভেসে থাকা স্বর্ণ কণিকা,’ পালটা চিৎকার করে জবাব দিলো বিমান চালক।

‘কী পরিমাণ স্বর্ণ? অনেক?’

জেসপারসেন মাথা ঘুরিয়ে কোনো জবাব না দিয়ে কেবল দাঁত বের করে হাসলো। তার কিছু বলার দরকার নেই। জবাবটা স্পষ্ট। পুরোনো কার্টিস-রাইট বাইপ্লেন ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে এগিয়ে চললো আইওয়ার দিকে।

***

পরদিন বেলা তিনটায় ডি মোয়েন এয়ারফিল্ডে পৌঁছালো ওরা। বিমান অবতরণের পরপরই চালক কোন দিকে যেন চলে গেল। স্বর্ণ কণিকাভরতি বোতলটা নিয়ে গেল সাথে করে। গিঁটে গিঁটে ব্যথা আর আড়ষ্ট শরীর নিয়ে বিমান থেকে নামলো জো। ডলে ডলে অসাড় পাদুটোতে সাড়া ফিরিয়ে আনার জন্য দাঁড়ালো কিছুক্ষণ। তারপর হাঁটতে শুরু করলো বিমানবন্দরের অফিসের দিকে। যদিও ওটা ছোট একটা ঘর ছাড়া আর কিছু নয়।

‘আমি কি আপনার ফোনটা একটু ব্যবহার করতে পারি?’ বয়স্ক আর গ্রাম্য চেহারার এক কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করলো সে। লোকটা একটা আবহওয়া মানচিত্রের উপর ঝুঁকে বসে আছে। নিজের কাজে পুরোপুরি মগ্ন।

‘যদি আপনার কাছে একটা নিকেল থাকে,’ বললো কর্মকর্তা, এরপর গরুর পশমের মতো চুলভরতি মাথা নেড়ে পাবলিক ফোনের দিকে ইশারা করলো।

পকেট থেকে সবগুলো কয়েন বের করে আনলো জো। প্রতিটাতেই রানসাইটারের মুখচ্ছবি খোদাই করা। তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগলো সে। অবশেষে ঐ যুগে প্রচলিত ষাঁড়ের মাথা অঙ্কিত বৈধ একটা মুদ্রা পেয়ে বয়স্ক কর্মকর্তার সামনে রাখলো।

‘ঠিক আছে,’ মাথা না তুলেই সম্মতি দিলো কর্মকর্তা।

স্থানীয় ফোন বুক খুঁজে বের করে সিম্পল শেফার্ড মরচুয়াবিব নাম্বার বের করলো। অপারেটরকে দিলো নাম্বারটা। ঐ প্রান্তে সাড়া পাওয়া গেল প্রায় সাথে সাথেই।

‘সিম্পল শেফার্ড মরচুয়াবি। মি. ব্লিস বলছি।’

‘আমি গ্লেন রানসাইটারের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে এসেছি,’ বললো জো। ‘আমি কি খুব বেশি দেরি করে ফেলেছি?’ মনে মনে প্রার্থনা করতে লাগলো দেরিটা যেন বেশি না হয়।

‘মি. রানসাইটারের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা এখনো চলছে,’ বললো মি. ব্লিস। ‘আপনি এখন কোথায় আছেন, স্যার? আপনাকে নিয়ে আসার জন্য আমরা কি গাড়ি পাঠাবো?’ যদিও তার কণ্ঠ শুনে বোঝা গেল যে গাড়ি পাঠাতে মোটেও আগ্রহী নয় সে।

‘আমি বিমানবন্দরে আছি,’ জো বললো।

‘আপনার আরো আগেই পৌঁছানো উচিত ছিল,’ মি. ব্লিসের কণ্ঠে তিরস্কার। ‘আপনি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কোনো আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিতে পারবেন কি না আমার সন্দেহ হচ্ছে। যাই হোক, মি. রানসাইটারের মরদেহ আগামীকাল সকাল পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য যথাযোগ্য মর্যাদায় উন্মুক্ত রাখা হবে। আমাদের পাঠানো গাড়ির জন্য চোখ খোলা রাখবেন, মিস্টার…’

‘চীপ,’ বললো জো।

‘হ্যাঁ, আপনাকে আমরা আশা করছিলাম। শোকাহত অনেকেই আমাদের অনুরোধ করেছেন যেন চোখ-কান খোলা রাখি আপনার জন্য, সেই সাথে মি. হ্যামন্ড আর—’ একটু বিরতি নিলো সে—‘মিস রাইট নামের একজনের জন্য। ঐ দুজন কি আপনার সাথে আছে?’

‘না,’ বললো জো। ফোন রেখে দিলো সে, তারপর অর্ধবৃত্তাকার কাঠের একটা চেয়ারে বসলো যাতে বিমানবন্দরে আগত গাড়িগুলোর উপর নজর রাখতে পারে। যাই হোক, নিজেকে প্রবোধ দিলো সে, দলের বাকি সবার সাথে যোগ দেওয়ার জন্য আমি সময়মতোই এখানে আসতে পেরেছি। ওরা এখনো শহর ছেড়ে চলে যায়নি, আর এটাই হচ্ছে আসল কথা।

বয়স্ক কর্মকর্তা ডাক দিলো তাকে। ‘শুনছেন, এখানে একটু আসতে হবে।’ ওয়েটিং রুম পেরিয়ে লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো জো। ‘কী ব্যাপার?’

‘আপনি আমাকে এই মুদ্রাটা দিয়েছেন?’ কর্মকর্তা এতক্ষণ ওটাই খুঁটিয়ে দেখছিল।

‘এটা ষাঁড়ের মাথা অঙ্কিত মুদ্রা,’ বললো জো। ‘বর্তমান সময়ের প্রচলিত বৈধ মুদ্রা, তাই না?’

‘এই নিকেলটাতে লেখা আছে ১৯৪০ সাল।’ অপলক দৃষ্টিতে কর্মকর্তা তার দিকে তাকিয়ে রইলো।

বিরক্তির একটা শব্দ করে বাকি কয়েনগুলো বের করে আনলো জো। আবার ওগুলোর মধ্যে খুঁজতে লাগলো। অবশেষে ১৯৩৮ সালের একটা নিকেল খুঁজে পেল সে এবং কর্মকর্তার সামনে নামিয়ে রাখলো। ‘দুটোই রেখে দিন,’ সে বললো। তারপর আবার গিয়ে বসলো পালিশ করা, অর্ধবৃত্তাকার বেঞ্চে।

‘আমরা প্রায়ই জাল মুদ্রা পাই,’ কর্মকর্তা বললো।

জো কিছু বললো না; তার মনোযোগ এখন ওয়েটিং রুমের এককোণে নিজে নিজেই বেজে চলা সেমি-হাই-বয় অডিওলা রেডিওর দিকে। ঘোষক একটা টুথপেস্টের গুনকীর্তণ করছে যেটার নাম ইপানা। বুঝতে পারছি না আমাকে কতক্ষণ এখানে অপেক্ষা করতে হবে, নিজেকেই প্রশ্ন করলো জো। ভাবনাটা তাকে শঙ্কিত করে তুললো, যেহেতু সে এখন সশরীরে ইনার্শিয়ালদের কাছাকাছি চলে এসেছে। এত দূর কষ্ট করে এলাম, ভাবছে সে, আর মাত্র কয়েক মাইল…কিন্তু এখন যদি—ঠিক ঐ মুহূর্তেই সব ভাবনাচিন্তা থামিয়ে স্রেফ একভাবে ওখানেই বসে রইলো জো।

আধঘণ্টা পর একটা ১৯৩০ উইলিস-নাইট ৮৭ ভটভট করে এয়ারফিল্ডের পার্কিং লটে এসে থামলো। কালো রঙের স্যুট পরা গাঁট্টাগোট্টা এক লোক নামলো গাড়ি থেকে। হাত দিয়ে প্রখর সূর্যের আলো থেকে চোখ আড়াল করে ওয়েটিং রুমের ভেতরটা দেখার চেষ্টা করলো।

লোকটার দিকে এগিয়ে গেল জো। ‘আপনি মি. ব্লিস?’ জিজ্ঞেস করলো সে।

‘নিশ্চয়ই, ঠিকই ধরেছেন।’ হালকাভাবে জোয়ের সাথে করমর্দন করে বললো সে। নিঃশ্বাসে ঐ সময়ের মাউথ ফ্রেশনার সেন-সেন-এর তীব্র গন্ধ। তৎক্ষণাৎ উইলিস-নাইটে আবার ফিরে এসে মোটর চালু করলো সে।

‘চলে আসুন, মি. চীপ। দয়া করে একটু তাড়াতাড়ি করুন। আমরা হয়তো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতার কিছু অংশে যোগ দিতে পারবো। এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে ফাদার এবারনাথি সাধারণত দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে থাকেন।’

সামনের আসনে মি. ব্লিসের পাশে উঠে বসলো জো। প্রধান সড়ক ধরে ডি মোয়েনের কেন্দ্রস্থলের দিকে চলতে শুরু করলো গাড়িটা। গতি খুব বেশি হলে ঘণ্টায় চল্লিশ মাইল। ‘আপনি মি. রানসাইটারের একজন কর্মচারী?’ মি. ব্লিস জিজ্ঞেস করলো।

‘ঠিক,’ জো বললো।

‘অদ্ভুত এক ব্যবসা করতেন মি. রানসাইটার। ব্যবসার ধরনটা আমি পুরোপুরি বুঝতে পেরেছি তা বলা যাবে না।’ অ্যাসফাল্টের ফুটপাথ ছেড়ে রাস্তা পেরোতে উদ্যত একটা সেটার জাতীয় কুকুরকে থামাতে কর্কশ হর্ন বাজালো ব্লিস। কুকুরটা পিছু হটে উইলিস-নাইটকে নিজের পথে বিজয়ীর বেশে এগোনোর সুযোগ করে দিলো।

‘আমাকে বলতে পারবেন সিওনিক অর্থ কী? মি. রানসাইটারের প্রায় সকল কর্মচারী এই শব্দটা ব্যবহার করে।’

‘প্যারাসাইকোলজিক্যাল পাওয়ার,’ জো বললো। ‘এক ধরনের মেন্টাল ফোর্স যা সরাসরি কাজ করে, অন্য কোনো বাহ্যিক মাধ্যম ছাড়া।

‘আপনি বলতে চাচ্ছেন, অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা? এই যেমন আগাম ভবিষ্যৎ জানতে পারা? আমি জানতে চাইছি কারণ আপনাদের অনেককেই ভবিষ্যৎ নিয়ে এমনভাবে কথা বলতে শুনেছি যেন তা এই মুহূর্তেই বিদ্যমান। আমার সাথে কখনো আলোচনা করেনি, তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে, কিন্তু আমি শুনে ফেলেছি—নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। আপনারা একটা মাধ্যম, তাই না?’

‘ঠিক সেরকমই কিছু একটা বলা যায়।’

‘ইউরোপের যুদ্ধের ব্যাপারে আপনারা অগ্রিম কী ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছেন?’

‘জার্মানি আর জাপান এই যুদ্ধে পরাজিত হবে। ইউনাইটেড স্টেটস এই যুদ্ধে যোগ দেবে ১৯৪১ সালের ৭ই ডিসেম্বর।’ তারপর নীরবতায় ডুবে গেল সে, বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করার কোনো আগ্রহ বোধ করছে না। চিন্তাভাবনা করার জন্য তার নিজেরই হাজারটা সমস্যা আছে।

‘আমি নিজে একজন শ্রাইনার,’ ব্লিস বললো।

দলের বাকিরা কি অনুভব করছে এই বাস্তবতা? অবাক হয়ে ভাবলো জো। ১৯৩৯ সালের ইউনাইটেড স্টেটস? অথবা আমি যখন তাদের সাথে আবার যোগ দেবো, আমার এই সময়ের উলটো দিকে ফিরে চলা কি আবার বিপরীতমুখী হবে, আমাকে নিয়ে যাবে আরো দূরের অন্য কোনো সময়ে? ভালো প্রশ্ন। কারণ তাদের সবাইকে একত্রে তেপ্পান্ন বছর সামনে যাওয়ার একটা পথ খুঁজে পেতে হবে, সামঞ্জস্যপূর্ণ যৌক্তিক আর সঠিক আকৃতিতে, সঠিক উপাদানসংবলিত সমসাময়িক, অবিকৃত সময়ে। যদি দলের সবাই একত্রে ঠিক একই পরিমাণ পশ্চাদগমন অনুভব করে, যে পরিমাণ সে নিজে অনুভব করছে, সেই ক্ষেত্রে দলের সাথে তার যোগ দেওয়াটা তাদের বা তার নিজের তেমন কোনো উপকারে আসবে না। শুধু একটা ক্ষেত্র ছাড়া; সে হয়তো বিশ্বের আরো পশ্চাদগমনের অগ্নিপরীক্ষা থেকে মুক্তি পাবে। সত্যি বলতে কী, ১৯৩৯ সালের এই বাস্তবতা অনেকটাই স্থিতিশীল মনে হচ্ছে। গত চব্বিশ ঘণ্টায় প্রতিটি উপাদান আপাতদৃষ্টিতে অপরিবর্তিতই রয়েছে। তার এটাও মনে হলো, হয়তো দলের বাকি সবার অনেক কাছাকাছি চলে আসায় এমনটা হয়েছে।

অন্যদিকে, ১৯৩৯ সালের উবিক কিডনি এবং লিভার মলমের স্প্রে ক্যান আকস্মিকভাবে একলাফে আশি বছর পেছনে ফিরে গেছে। মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে স্প্রে ক্যান থেকে কাচের বয়াম এবং তারপর কাঠের ছাঁচে বানানো অস্বচ্ছ বোতল। ঠিক ১৯০৮ সালের খাঁচার মতো এলিভেটর, যা শুধু আল একাই দেখতে পেয়েছিল।

কিন্তু এই ক্ষেত্রে তো তা হয়নি। বেঁটে, মোটা বিমান চালক, স্যান্ডি জেসপারসেনও কাঠের ছাঁচে বানানো অস্বচ্ছ বোতলটা দেখতে পেয়েছে—দ্য এলিক্সার অব ইউবিক, ডাকে আসা বস্তুটা চূড়ান্তভাবে এই উপাদানেই পরিণত হয়েছিল। ওটা তার ব্যক্তিগত কোনো কল্পনা ছিল না। প্রকৃতপক্ষে, ঐ বস্তুডাই তাকে এই ডি মোয়েন নিয়ে এসেছে। তাছাড়া, বিমান চালক লেসাল গাড়ির বিপরীত বিবর্তনও প্রত্যক্ষ করেছে। বোঝাই যাচ্ছে, আলের উপর সম্পূর্ণ রূপে অন্য কোনো উপাদান প্রভাব বিস্তার করেছিল। সে অন্তত তাই আশা করলো। প্রার্থনা করলো, যেন তাই হয়।

ধরা যাক, মনে মনে বললো সে, অতীতের দিকে আমাদের ফিরে যাওয়াটা আমরা কোনোভাবেই আর উলটো দিকে চালিত করতে পারলাম না। ধরা যাক বাকি জীবনটা আমাদেরকে এই রূপান্তরিত বর্তমানেই থাকতে হবে। সেটা কি খুব বেশি খারাপ হবে? আমরা নাইন-টিউব স্ক্রিন-গ্রিড হাইবয় ফিলকো রেডিওতে অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারি। যদিও তার কোনো প্রয়োজন হবে না। কারণ সুপারহেটেরোডাইন সার্কিট ইতোমধ্যেই আবিষ্কৃত হয়েছে—যদ্রিও এখন পর্যন্ত একটাও আমার চোখে পড়েনি। আমরা আমেরিকান অস্টিন মোটর গাড়ি চালানো শিখতে পারি, যেগুলো ৪৪৫ ডলারে বিক্রি হয়। মূল্যমানটা হঠাৎ মাথায় এলেও সে নিশ্চিত ওটাই সঠিক মূল্য। যখন আমরা চাকরি করতে শুরু করবো আর এই বতর্মানের অর্থ আয় শুরু করবো, নিজেকেই বললো সে, তখন আমাদের আর সেকেলে কার্টিস-রাইট বাইপ্লেনে ভ্রমণ করতে হবে না। যত যাই হোক, চার বছর আগে, ১৯৩৫ সালে, চায়নার চার ইঞ্জিনের দ্রুতগামী আন্তঃপ্রশান্ত মহাসাগরীয় বিমান যোগাযোগ চালু হয়েছে। এই ১৯৩৯ সালেই ফোর্ডের ট্রাইমোটর এগারো বছরের পুরোনো হয়ে গেছে। এই সময়ের মানুষদের কাছেও ওটা প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তু। যে বাইপ্লেনে আমি এখানে এসেছি সেটাও এমনকি এই সময়ের মানুষদের কাছেও জাদুঘরে রাখার বস্তু। তবে ঐ লেসালটা, বিপরীত দিকে বিবর্তিত হওয়ার আগে ওটা ছিল গাড়ির মতো গাড়ি। ওটা চালিয়ে আমি সত্যিকারের আনন্দ পেয়েছি।

‘রাশিয়ার কী অবস্থা?’ মি. ব্লিস জিজ্ঞেস করলো। ‘আমি বলতে চাইছি, এই যুদ্ধে তাদের কী অবস্থা হবে? আমরা কি ঐ লাল টুপিদের নিশ্চিহ্ন করতে পেরেছি? আপনারা কি অতদূর ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছেন?’

‘ইউএসএ আর রাশিয়া কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করবে,’ জবাব দিলো জো। এই পৃথিবীর সকল বস্তু, সত্তা আর নিদর্শনের ভাবনাগুলো তালগোল পাকিয়ে গেল তার মাথায়। ঔষধ হচ্ছে এই সময়ের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা। হয়তো এই মুহূর্তে এরা সবাই সালফা ড্রাগস ব্যবহার করছে। আমরা অসুস্থ হলে এটা একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। আর দাঁতের চিকিৎসাও খুব একটা আনন্দের কিছু হবে না। এখনো তারা হট ড্রিলস আর নভোকেইন দিয়ে চিকিৎসা করছে। ফ্লোরাইড টুথপেস্ট এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। সেটা ভবিষ্যতের, আরো বিশ বছর পরের কথা।

‘আমাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করবে?’ ঘৃণাভরে বললো ব্লিস। ‘কমিউনিস্টরা? অসম্ভব, নাৎসিদের সাথে ওদের চুক্তি হয়েছে।’

‘জার্মানি ঐ চুক্তি ভঙ্গ করবে,’ বললো জো। ‘হিটলার ১৯৪১ সালের জুন মাসে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করবে।’

‘সেই সাথে ওদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে, আমি সেটাই আশা করি।’

নিজের গভীর ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে অবাক হয়ে জো ঘুরে বসলো। তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো মি. ব্লিসের দিকে, যে তার নয় বছরের পুরোনো উইলিস-নাইট চালাচ্ছে।

ব্লিস বলে চলেছে, ‘জার্মানরা নয়, কমিউনিস্টরাই আসল বিপদ। ইহুদিদের কথাই ধরুন। আপনি জানেন, এটা থেকে সবচেয়ে বেশি ফায়দা লুটছে কারা? এই দেশের ইহুদিরা। তাদের অধিকাংশই এই দেশের নাগরিক নয় বরং উদ্বাস্তু। যারা জনগণের দেওয়া সাহায্য খেয়ে-পরে বেঁচে আছে। আমি মনে করি ইহুদিদের সাথে নাৎসিরা যা করছে সেটা কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে বাড়াবাড়ি। কিন্তু সত্যি বলতে কী, ইহুদিদের নিয়ে আলোচনা চলছে অনেক দিন ধরেই। কিছু একটা করা অবশ্যই উচিত ছিল, তবে হ্যাঁ, কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের মতো নিষ্ঠুর আর ভয়াবহ কিছু না অবশ্য। ঠিক একই সমস্যা আমাদের এই ইউনাইটেড স্টেটসেও আছে, ইহুদি আর নিগ্রো, দুটোকে নিয়েই। নিঃসন্দেহে এই দুই জাতি নিয়ে আমাদের কিছু একটা করতে হবে।’

‘আমি আসলে কখনো নিগ্রো শব্দটা ব্যবহার করতে শুনিনি,’ জো বললো। আর সহসাই এই যুগটাকে ভিন্ন দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করতে শুরু করলো সে। হঠাৎই উপলব্ধি করলো, বিষয়টা আসলে সে ভুলেই গিয়েছিল।

‘একমাত্র লিন্ডবার্গই জার্মানির বিষয়টা সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছেন,’ ব্লিস বললো। ‘আপনি তার বক্তৃতা কখনো শুনেছেন? পত্রিকায় যা লেখা হয় আমি সেগুলোর কথা বলছি না, বলছি সামনাসামনি কখনো শুনেছেন—’ সেমফোর-স্টাইল স্টপ সিগন্যাল দেখে গাড়ির গতি কমালো সে। ‘এই ধরুন সিনেটর বোরাহ আর সিনেটর নাইয়ি। এই দুজন যদি সাহায্য না করতো, রুজভেল্টকে বৃটিশদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করতে হতো, আর আমাদেরকে এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতো যেটা মোটেও আমাদের যুদ্ধ না। রুজভেল্ট নিরপেক্ষতা বিল থেকে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ধারা বাতিল করতে অনেক বেশি আগ্রহী। সে চায় আমরা এই যুদ্ধে জড়াই। আমেরিকার জনগণ তাকে সমর্থন করবে না। আমেরিকার জনগণ বৃটিশদের বা অন্য কারো যুদ্ধ করতে মোটেও আগ্রহী নয়।’ সিগন্যাল পালটে একটা সবুজ প্রতীক বেরিয়ে এলো। ব্লিস লো-গিয়ার দিতেই উইলিস-নাইট হোঁচট খেয়ে সামনে এগোল। মিশে গেল ডি মোয়েনের কেন্দ্রস্থলে মধ্য দুপুরের ট্রাফিকের সাথে।

‘আগামী পাঁচ বছরে যা ঘটবে সেটা আপনি মোটেও পছন্দ করবেন না,’ জো বললো।

‘কেন? আমি যা বিশ্বাস করি পুরো আইওয়া অঙ্গরাজ্য তাতে সমর্থন দেবে। আপনারা যারা মি. রানসাইটারের কর্মচারী, তাদের সম্পর্কে আমি কী ভাবি জানেন? আপনি যা বলেছেন এবং অন্যরা যা বলেছে, যা আমি ঘটনাচক্রে শুনে ফেলেছি, তাতে আমার মনে হয়েছে আপনি পেশাদার গুজব সৃষ্টিকারী।’ চোখে আনন্দের ঝলক নিয়ে গর্বিত দৃষ্টিতে জোয়ের দিকে তাকালো ব্লিস।

কিছু বললো না জো। দেখছে পুরোনো আমলের ইট-কাঠ-পাথরের তৈরি দালানগুলো একে একে পার হয়ে যাচ্ছে। অদ্ভুত সব গাড়ি দেখছে—যার অধিকাংশই মনে হয় কালো রঙের আর অবাক হয়ে ভাবছে, দলের মধ্যে সে-ই কি একমাত্র ব্যক্তি যে ১৯৩৯ সালের এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলোর মুখোমুখি হয়েছে? নিউ ইয়র্কে সবকিছু অন্য রকম হবে, নিজেকে আশ্বস্ত করলো সে। এই অংশটা হচ্ছে বাইবেল বেল্ট, নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকা মধ্য পশ্চিম অংশ। আমরা এখানে বাস করবো না। আমরা যাবো পূর্ব উপকূলের দিকে অথবা পশ্চিমে।

কিন্তু সহজাতভাবেই উপলব্ধি করলো যে বড় একটা সমস্যা ঠিক এই মুহূর্তে তাদের সামনে এসে হাজির হয়েছে। বুঝতে পারছে, অনেক বেশি জেনে যাওয়ার কারণে সময়ের এই খণ্ডিত অংশে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে না। যদি আমরা বিশ অথবা ত্রিশ বছর পেছনে ফিরে আসতাম, তাহলে হয়তো আরো সহজে মানসিকভাবে খাপ খাওয়ানো সম্ভব হতো। হয়তো জেমিনির স্পেসওয়াক অথবা অ্যাপোলোর প্রথম উড্ডয়নের মধ্যে আবার বেঁচে থাকা অতটা আকর্ষণীয় হতো না, তবে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু সময়ের ঠিক এই বিন্দুতে—

তারা এখনো দশ ইঞ্চি ৭৮ আরপিএম রেকর্ডে টু ব্ল্যাক ক্রোজ শোনে। সেই সাথে শোনে জো পেনারের কমেডি আর রেডিও ধারাবাহিক মার্ট অ্যান্ড মার্জ। মহামন্দা এখনো চলছে। আমাদের সময়ে আমরা মঙ্গলে বসতি স্থাপন করেছি, বসতি স্থাপন করেছি চাঁদে। একটা যুগোপযোগী আন্তঃমহাজাগতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করেছি আমরা। আর এই মানুষগুলো ওকলাহোমার ভয়াবহ খরা মোকাবেলা করতেও অক্ষম।

এই পৃথিবীটা বাস করছে উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ানের বক্তৃতার জমানায়। দি স্টেট অব টেনেসি বনাম জন থমাস স্কোপস-এর চাঞ্চল্যকর মামলা, যা স্কোপের মাংকি ট্রায়াল নামে পরিচিত, তা এখানে নির্মম বাস্তবতা। তাদের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে মানিয়ে নেওয়ার কোনো উপায় নেই আমাদের, ভাবছে জো। তাদের আদর্শ, রাজনৈতিক চিন্তাধারা, সামাজিক আবহ কোনো কিছুর সাথেই না। ওদের কাছে আমরা পেশাদার নৈরাজ্যবাদী, নাৎসিদের চেয়ে অনেক বেশি উদ্ভট। সম্ভবত কমিউনিস্ট পার্টির চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। ব্লিস একদম ঠিক কথা বলেছে, আমরা হচ্ছি সবচেয়ে বিপজ্জনক নৈরাজ্যবাদী, সময়ের এই ছিন্ন অংশ এখনো যার মুখোমুখি হয়নি।

‘আপনারা কোন অঞ্চল থেকে এসেছেন?’ ব্লিস জানতে চাইলো। ‘ইউনাইটেড স্টেটসের কোনো অংশ থেকে নয় নিশ্চয়ই, আমি কি ঠিক বলেছি?’

‘ঠিকই বলেছেন আপনি,’ জো বললো। ‘আমরা এসেছি উত্তর আমেরিকা কনফেডারেশন থেকে।’ পকেট থেকে একটা রানসাইটার কোয়ার্টার বের করে ব্লিসের হাতে দিলো সে। ‘ভালো করে দেখুন,’ বললো সে।

মুদ্রাটার দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ের একটা ধাক্কা খেলো ব্লিস। ‘মুদ্রার পিঠে অঙ্কিত মুখচ্ছবিটা ঐ মৃত ব্যক্তির! এটা মি. রানসাইটারের মুখচ্ছবি!’ আরেকটু ভালো করে লক্ষ করেই তার চেহারা পাণ্ডুবর্ণ ধারণ করলো। ‘সালটা ১৯৯০!’

‘পুরো বিস্ময় এক জায়গাতেই খরচ করে ফেলবেন না যেন,’ জো বললো।

***

ওরা যখন সিম্পল শেফার্ড মরচুয়াবিতে পৌঁছালো, ততক্ষণে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সকল আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্ত হয়েছে। কাঠের তৈরি দ্বিতল ভবনের প্রশস্ত সাদা কাঠের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছে অনেকগুলো মানুষ। তাদের সকলকেই চিনতে পারলো জো। শেষ পর্যন্ত ওদের কাছে আসতে পেরেছে: এডি ডর্ন, টিপি জ্যাকসন, জন ইড, ফ্র্যান্সি স্প্যানিস, টিটো অ্যাপাস্তাস, ডন ড্যানি, স্যামি মুন্ডো, ফ্রেড জাফস্কি এবং প্যাট—আমার স্ত্রী, কথাটা নিজেকেই বললো সে। আরো একবার অভিভূত হলো তাকে দেখে। তার ঘন কালো চুল, গাঢ় বর্ণের ত্বক আর চোখ। সৌন্দর্য আর ব্যক্তিত্বের অদ্ভুত মিশেলে প্রচণ্ড ক্ষমতার স্ফুরণ ঘটছে তাকে ঘিরে।

‘না,’ পার্ক করা গাড়ি থেকে নামার সময় সশব্দে কথাগুলো বললো জো। ‘ও আমার স্ত্রী না, ঐ অংশটুকু সে মুছে দিয়েছে।’ কিন্তু তার মনে পড়লো, আংটিটা নিজের কাছে রেখেছে প্যাট। পেটানো রুপা আর জেড পাথর দিয়ে তৈরি চমৎকার এক বিয়ের আংটি, যেটা সে আর আমি মিলে বাছাই করেছিলাম…শুধু এইটুকু স্মৃতিই বেঁচে আছে। কিন্তু তাকে আবার দেখাটা কি বিস্ময়কর? যেন তাকে মনে করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই স্রেফ এক মুহূর্তের জন্য এমন এক ভূতুড়ে বিয়ের স্মৃতির চাদর তাকে ঘিরে ধরলো যা অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সত্যি বলতে কী, ঐ বিয়ের কোনো অস্তিত্বই ছিল না—শুধু আংটিটা ছাড়া। আর যখনই মেয়েটার ইচ্ছা হবে, সে আংটির স্মৃতিও মুছে দিতে পারবে।

‘হাই, জো চীপ,’ প্যাট তার স্বভাবসুলভ শীতল আর প্রায় উপহাসের সুরে জিজ্ঞেস করলো। তার প্রগাঢ় চোখদুটোতে প্রশংসা।

‘হ্যালো,’ বিব্রত ভঙ্গিতে জবাব দিলো সে। অন্যরাও তাকে সম্ভাষণ জানালো, কিন্তু সেটাকে আর গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে না। প্যাট তার সব মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে।

‘আল হ্যামন্ড আসেনি?’ ডন ড্যানি জিজ্ঞেস করলো।

‘আল মারা গেছে,’ জো বললো। ‘ওয়েন্ডি রাইটও মারা গেছে।’

‘ওয়েন্ডির কথা আমরা জানি,’ অবিচল ভঙ্গিতে বললো প্যাট।

‘না, আমরা জানতাম না,’ ডন ড্যানি বললো। ‘আমরা অনুমান করেছিলাম কিন্তু নিশ্চিত ছিলাম না।’ এরপর জোকে উদ্দেশ্য করে বললো, ‘ওদের কী হয়েছিল? কীভাবে মারা গেল?’

‘ওরা পুরোপুরি ক্ষয় হয়ে গেছে,’ বললো জো।

‘কেন?’ টিটো অ্যাপাস্তাস কঠিন সুরে জিজ্ঞেস করলো। জোকে ঘিরে থাকা বাকি সকলের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে সে।

‘তুমি আমাদেরকে শেষ যে কথাগুলো বলেছিলে, জো চীপ,’ প্যাট কনলি বললো, ‘নিউ ইয়র্কে, হ্যামন্ডকে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে—’

‘আমি জানি আমি কী বলেছিলাম,’ বললো জো।

প্যাট বলতেই লাগলো, ‘তুমি বছরগুলো নিয়ে কিছু একটা বলেছিলে। অনেক দেরি হয়ে গেছে, তুমি বলেছিলে। তোমার এই কথার অর্থ কী? সময় নিয়ে কিছু একটা বোঝাতে চেয়েছিলে তুমি।’

‘মি. চীপ,’ উত্তেজিত হয়ে বললো এডি ডর্ন, ‘আমরা এখানে আসার পর থেকেই এই শহরের ক্রমাগত রূপান্তর হচ্ছে। আমরা কেউই বিষয়টা বুঝতে পারছি না। আমরা যা দেখছি, আপনিও কি ঠিক তাই দেখছেন?’ হাতের ইশারায় মেয়েটা প্রথমে মরচুয়াবি ভবনটা দেখালো, তারপর রাস্তা আর অন্যান্য ভবন।

‘আমি নিশ্চিত না,’ জো বললো। ‘তুমি কী দেখতে পাচ্ছো?’

‘ভণিতা কোরো না, জো,’ রাগত সুরে বললো টিটো অ্যাপাস্তাস। কথা ঘোরানোর চেষ্টা কোরো না। ঈশ্বরের দোহাই, আমাদের শুধু বলো এই জায়গাটা তোমার কাছে কীসের মতো লাগছে। ঐ বাহনটা—’ উইলিস-নাইটের দিকে ইশারা করলো সে—‘ওটাতে করেই তুমি এখানে এসেছ। ওটা কী সেটা আমাদেরকে বলো। আমাদেরকে বলো কীসে চড়ে তুমি এখানে এসেছ।’

ওরা সবাই অপেক্ষা করছে, একাগ্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জোয়ের দিকে।

‘মি. চীপ,’ স্যামি মুন্ডো তোতলাতে তোতলাতে বললো, ‘ওটা সত্যিকারের পুরোনো একটা অটোমোবাইল, ঠিক বলেছি আমি?’ মুখ টিপে হাসলো সে। ‘ঠিক কত পুরোনো ওটা?’

একটু বিরতি নিয়ে জো বললো, ‘বাষট্টি বছরের পুরোনো।’

‘তার মানে এখন ১৯৩০ সাল,’ ডন ড্যানির উদ্দেশে টিপি জ্যাকসন বললো। ‘আমরা যা হিসাব করেছিলাম তার একেবারেই কাছাকাছি।’

‘আমরা অনুমান করেছিলাম ১৯৩৯ সাল,’ জোয়ের উদ্দেশে নিরাবেগ কণ্ঠে বললো ডন ড্যানি। তার কণ্ঠস্বর পরিমিত, আবেগহীন, পরিপক্ক, পুরুষালি। তাতে ছিল না কোনো ভাবাবেগ, এমনকি এই কঠিন পরিস্থিতিতেও। ‘সেটা অনুমান করা অবশ্য খুব একটা কঠিন কিছু ছিল না। নিউ ইয়র্কে আমার কোন-অ্যাপ্টে একটা খবরের কাগজে আমি সেটা দেখেছি। সেপ্টেম্বরের ১২ তারিখ। তার মানে আজ ১৩ তারিখ, ১৯৩৯ সাল। ফরাসিরা ভাবছে যে তারা সিগফ্রিড লাইন অতিক্রম করতে পেরেছে।’

‘সত্যি বলতে কী,’ জন ইড বললো, ‘এটাই ছিল সবচেয়ে হাস্যকর সংবাদ।’

‘আমি এমনটাই অনুমান করেছিলাম,’ জো বললো, ‘যে তোমরা সমষ্টিগতভাবে আরো দূরবর্তী বাস্তবতা উপলব্ধি করছো। বেশ, দেখা যাচ্ছে আমরা একই সময়সীমার মধ্যে আছি।’

‘যদি এটা ১৯৩৯ সাল হয় তাহলে ১৯৩৯ সালই,’ ফ্রেড জাফস্কি অস্থির, কর্কশ কণ্ঠে বললো। ‘স্বাভাবিকভাবেই, আমরা সবাই এটা একত্রে উপলব্ধি করছি। আর কী করতে পারতাম আমরা?’ আগ্রহের সাথে নিজের বিশাল দুটো হাত দুপাশে ছড়িয়ে দিলো সে। দৃষ্টিতে তার মন্তব্যে সমর্থন দেওয়ার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ।

‘থামো, জাফস্কি,’ বিরক্ত সুরে বললো টিটো অ্যাপাস্তাস।

প্যাটকে উদ্দেশ্য করে জো বললো, ‘এই বিষয়ে তোমার কী অভিমত?’ এড়িয়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে কাঁধ নাড়লো মেয়েটা।

‘ব্যাপারটাকে হালকাভাবে নিও না,’ জো বললো। ‘জবাব দাও।’

‘আমরা অতীতে চলে এসেছি,’ প্যাট জবাব দিলো।

‘মোটেও না,’ জো বললো।

‘তাহলে আমরা কী করেছি?’ জিজ্ঞেস করলো প্যাট। ‘ভবিষ্যতে চলে গেছি, সেটাই বলতে চাইছো?’

‘আমরা কোথাও যাইনি,’ জো বললো। ‘আমরা যেখানে ছিলাম ঠিক সেখানেই আছি। কিন্তু কিছু কারণে—অনেকগুলো সম্ভাব্য কারণের কোনো এক কারণে—বাস্তবতা পেছন দিকে যেতে শুরু করেছে। বাস্তবতার অন্তর্নিহিত ভিত্তি নড়বড়ে হওয়ার কারণে সেটি ভেসে ভেসে চলে এসেছে পূর্ববর্তী আকৃতিতে। যে আকৃতিটা তার ছিল তেপ্পান্ন বছর আগে। এটি আরো পেছনে ফিরে যেতে পারে। আমি বরং জানতে বেশি আগ্রহী, অন্তত এই মুহূর্তে, যে রানসাইটার নিজেকে তোমাদের কাছে আত্মপ্রকাশ করেছিল কি না।’

‘রানসাইটার এই ভবনের অভ্যন্তরে নিজের কফিনে শুয়ে আছে,’ ডন ড্যানি বললো, এবার তার কণ্ঠে অস্বাভাবিক ভাবাবেগ ধরা পড়লো। ‘আমাদের কাছে এটাই তার একমাত্র আত্মপ্রকাশ।’

‘মি. চীপ, উবিক শব্দটা কি আপনার কাছে কোনো অর্থ বহন করে?’ ফ্রান্সেসকা স্প্যানিশ জিজ্ঞেস করলো।

মেয়েটা যা বলেছে সেটা হজম করতে কিছুটা সময় লাগলো জোয়ের। ‘হায় যিশু,’ সে বললো। ‘তোমরা কি পার্থক্যটা ধরতে পারছো না—’

‘ফ্র্যান্সি স্বপ্নে দেখেছে,’ টিপি জ্যাকসন বললো। ‘অবশ্য, সব সময়ই স্বপ্ন দেখে সে। তোমার উবিক স্বপ্নের কথা বলো, ফ্র্যান্সি।’ জোয়ের উদ্দেশে সে বললো, ‘ফ্র্যান্সি এখন তার উবিক স্বপ্নের কথা বলবে। স্বপ্নটাকে এই নামই দিয়েছে সে। গতকাল দেখেছে।’

‘আমি এই নাম দিয়েছি কারণ আসলে এটা ঠিক তাই,’ রাগত কণ্ঠে বললো ফ্রান্সেসকা স্প্যানিশ। উত্তেজনার বশে হাতদুটো পরস্পরের সাথে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরলো। ‘শুনুন, মি. চীপ, এই স্বপ্নটা আমি আগে যত স্বপ্ন দেখেছি সেগুলোর কোনোটার মতো নয় একেবারেই। আকাশ থেকে সুবিশাল এক হাত নেমে আসে, যেন স্বয়ং ঈশ্বরের হাত আর বাহু। প্রকাণ্ড, ঠিক একটা পাহাড়ের সমান। আর আমি ঐ মুহূর্তে ঠিকই জানতাম এটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। হাতটা ছিল বন্ধ, ঠিক যেন বিশাল পাথরের সমান মুষ্টি এবং আমি ঠিক ঠিক জানতাম ঐ মুষ্টিতে মূল্যবান এমন একটা কিছু আছে যে এটার উপর আমার নিজের এবং পৃথিবীর সমগ্র মানব জাতির বাঁচা-মরা নির্ভর করছে। মুষ্টি খোলার অপেক্ষা করছিলাম আমি। অবশেষে তা উন্মুক্ত হলো, আর আমি দেখলাম সেখানে কী আছে।’

‘এরোসলের একটা স্প্রে ক্যান,’ শুকনো গলায় বললো ডন ড্যানি।

‘স্প্রে ক্যানে একটাই মাত্র শব্দ লেখা, চোখ ধাঁধানো স্বর্ণালী বর্ণ ঝলমল করছিল,’ ফ্রান্সেসকা স্প্যানিশ তার বর্ণনা চালিয়ে যাচ্ছে। ‘স্বর্ণালী আগুনের মতো করে লেখা: উবিক। আর কিছু না। শুধু অদ্ভুত শব্দটা ছাড়া। তারপর হাতটা স্প্রে ক্যানটাকে আবার মুষ্টিবদ্ধ করে নেয় এবং হাত আর বাহু অদৃশ্য হয়ে যায় ধূসর এক মেঘপুঞ্জের মাঝে। আজকে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হওয়ার আগে আমি অভিধান খুঁজে দেখি এবং গ্রন্থাগারের সাথে যোগাযোগ করি। কিন্তু এই শব্দটা কোন ভাষার সেটাই কেউ বলতে পারেনি এবং এটা অভিধানেও নেই। ইংরেজি শব্দ নয় এটা, গ্রন্থাগারিক আমাকে জানায়। এটার খুব কাছাকাছি একটা ল্যাটিন শব্দ আছে: ইউবিক, এবং এটার অর্থ—’

‘সর্বত্র,’ বললো জো।

সম্মতির ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো ফ্রান্সেসকা স্প্যানিশ। ‘শব্দটার অর্থ ঠিক তাই। কিন্তু উবিক বলে কোনো শব্দ নেই, অথচ স্বপ্নে বানানটা ঠিক এমনই ছিল।’

‘দুটো একই শব্দ,’ জো বললো। ‘শুধু বানানটা ভিন্ন।’

‘তুমি কীভাবে জানলে?’ বাঁকা সুরে জিজ্ঞেস করলো প্যাট কনলি।

‘গতকাল রানসাইটার আত্মপ্রকাশ করেছে আমার সামনে,’ জো বললো। ‘রেকর্ড করে রাখা টিভি বিজ্ঞাপনে, যা মৃত্যুর আগে তৈরি করেছিল সে।’ বিস্তারিত ব্যাখ্যা করলো না। ব্যাখ্যা করাটা তার কাছে বেশ জটিল মনে হচ্ছে, বিশেষ করে এই সময়ে।

‘তুমি একটা বোকার হদ্দ,’ প্যাট কনলি বললো তাকে।

‘কেন?’

‘এ-ই হলো তোমার সেই আত্মপ্রকাশ? একজন মৃত ব্যক্তির সরাসরি আত্মপ্রকাশ? মৃত্যুর আগে তার লেখা চিঠিগুলোকে হয়তো তুমি আত্মপ্রকাশ বলতে পারো। অথবা বছরের পর বছর অফিসে বসে বসে যে সকল মেমো লিখেছিল সেগুলো। এমনকি—’

‘আমি যাই, রানসাইটারকে শেষবারের মতো একবার দেখে আসি,’ জো বললো। ওদের সবাইকে ওখানে দাঁড় করিয়ে রেখে দল থেকে আলাদা হয়ে গেল সে। প্রশস্ত সিঁড়িগুলো বেয়ে অন্ধকার, ঠান্ডা মরচুয়াবিব অভ্যন্তরে প্রবেশ করলো।

***

ভেতরটা পুরোপুরি ফাঁকা। কেউ নেই। শুধু বিশাল একটি কক্ষ জুড়ে রয়েছে গির্জায় প্রার্থনা করতে আসা লোকদের বসার জন্য যেরকম ঘেরা আসন থাকে, সেরকম সারি সারি আসন এবং একেবারে শেষ মাথায় ফুলে ফুলে আচ্ছাদিত একটা কফিন। পাশের ছোট আর উন্মুক্ত কামরায় একটা পুরোনো আমলের রিড পাম্প অর্গান এবং ভাঁজ করা কিছু কাঠের চেয়ার। পুরো মরচুয়াবি জুড়ে ফুল আর ধুলোর গন্ধ। মিষ্টি আর বাসি গন্ধের অদ্ভুত মিশ্রণে দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইলো তার। আইওয়ায় যারা বসবাস করে তাদের কথা চিন্তা করে দেখো, সে ভাবলো, যারা এই বিষাদগ্রস্ত কামরায় মৃত্যুপরবর্তী অনন্ত যাত্রাকে আলিঙ্গন করেছে। সুসজ্জিত মেঝে, রুমাল, উলের তৈরি ভারী আর কালো স্যুট…সবকিছুই আছে, শুধু মৃতের দুই চোখে দুটো মুদ্রা ছাড়া। আর বাদ্যযন্ত্র থেকে অবিরাম একসুরে বেজে চলা স্তবগান।

কফিনের কাছে পৌঁছালো সে, একটু ইতস্তত করে তাকালো দেখার জন্য। কালো, শুকিয়ে যাওয়া হাড়ের একটা স্তূপ পড়ে আছে কফিনের একপাশে। শুকনো কাগজের মতো পলকা একটা খুলি যেন ব্যঙ্গ করছে তাকে, চোখদুটো যেন শুকনো আঙুর। পোশাকের ছেঁড়া টুকরো শক্ত পশমের মতো ক্ষুদ্র দেহটার কাছে জড়ো হয়ে আছে, মনে হলো যেন দমকা বাতাস উড়িয়ে এনেছে সেগুলোকে। যেন এই দেহ নিঃশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছিল, আর নিঃশ্বাস নেওয়ার দুর্বল আর কষ্টকর প্রচেষ্টার সময় ওগুলোর সাথে জড়িয়ে যায়। তারপর শ্বাস নেওয়ার সেই প্রাণান্ত প্রচেষ্টা থেমে যায় পুরোপুরি। এখন কোনো স্পন্দন নেই। রহস্যময় পরিবর্তন, যা ওয়েন্ডি রাইট আর আলকেও এভাবে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল। আর সেই পরিবর্তন প্রক্রিয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল অনেক দিন আগে—না, ওয়েন্ডির কথা ভাবলো সে, অনেক বছর আগে।

দলের বাকি সবাই কি এটা দেখেছে? নাকি এই পরিবর্তন ঘটেছে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা চলার সময়? হাত বাড়িয়ে ওক কাঠের কফিনের ডালাটা নামিয়ে দিলো জো। কাঠের সাথে কাঠের সংঘর্ষে যে শব্দ হলো তার প্রতিধ্বনি ছুটে গেল শূন্য মরচুয়াবিব এক মাথা থেকে আরেক মাথায়, কিন্তু কেউ শুনতে পেল না। কেউ এলো না দেখার জন্য।

চোখ ভর্তি জল আর আতঙ্কে চোখে অন্ধকার দেখছে জো, ধূলিধূসরিত, নিঃশব্দ কামরা পেরিয়ে ফিরতি পথ ধরলো সে। বেরিয়ে এলো পড়ন্ত বিকেলের ম্লান আলোয়।

‘কী হয়েছে?’ দলের সাথে যোগ দিতেই ডন ড্যানি তাকে জিজ্ঞেস করলো।

‘কিছু না,’ জো বললো।

‘দেখে তো মনে হচ্ছে ভয়ে আধমরা হয়ে গেছ,’ তীক্ষ্ণ সুরে বললো প্যাট কনলি।

‘কিছু না!’ প্যাটের দিকে সে অন্তর্ভেদী, হিংস্র দৃষ্টিতে তাকালো।

‘তুমি যখন ওখানে ছিলে, এডি ডর্নকে কি দেখেছ?’ টিপি জ্যাকসন জিজ্ঞেস করলো।

‘ওকে খুঁজে পাচ্ছি না,’ জন ইড ব্যাখ্যা করার ভঙ্গিতে বললো।

‘কিন্তু ও তো এইমাত্র এখানেই ছিল তোমাদের সাথে,’ প্রতিবাদ জানালো জো।

‘সারাটা দিন সে বলছিল যে তার খুব ঠান্ডা লাগছে আর সে ভীষণ ক্লান্ত,’ ডন ড্যানি বললো। ‘হয়তো হোটেলে ফিরে গেছে। অনেক আগেই এমন কিছু একটা বলেছিল যে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষ হওয়ামাত্রই সে কিছুক্ষণ ঘুমাতে চায়। হয়তো সে ভালোই আছে।’

‘হয়তো এতক্ষণে সে মারা গেছে,’ জো বললো। ‘আমি ভেবেছিলাম তোমরা সবাই ব্যপারটা বুঝতে পেরেছো। যদি আমাদের কেউ দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, সে আর বেঁচে থাকবে না। ওয়েন্ডি, আল আর রানসাইটারের যা হয়েছে—’ গলার কাছে কিছু একটা দলা পাকিয়ে ওঠায় আর কিছু বলতে পারলো না সে।

‘রানসাইটার বিস্ফোরণে মারা গেছে,’ ডন ড্যানি বললো।

‘বিস্ফোরণে আমরা সবাই মারা গেছি,’ জো বললো। ‘আমি জানি কারণ রানসাইটার নিজে আমাকে বলেছে। আমাদের নিউ ইয়র্ক অফিসের পুরুষ শৌচাগারের দেয়ালে ও সেটা লিখে রেখেছিল, আর আমি প্রায় একই রকম আরেকটা লেখা আবার দেখি—’

‘তুমি যা বলছো তার সবই উদ্ভট আর অর্থহীন,’ ওকে বাধা দিয়ে ধারালো কণ্ঠে বললো প্যাট কনলি। ‘রানসাইটার কি মারা গেছে নাকি মারা যায়নি? আমরা কি মারা গেছি নাকি মারা যাইনি? প্রথমে এক কথা বলছো, পরক্ষণেই বলছো আরেক কথা। তুমি যা বলার তা স্পষ্ট করে বলতে পারছো না কেন?’

‘স্পষ্ট করে বলো,’ মাঝখান থেকে জন ইড বললো। উদ্বেগে সবার মুখে শুকনো, অসংখ্য ভাঁজ ফুটে উঠেছে চেহারায়। নীরব সম্মতিতে মাথা নাড়লো অন্যরা।

‘দেয়ালের গ্রাফিতিতে কী ছিল আমি সেটা বলতে পারি,’ জো বললো। ‘বলতে পারি জরাজীর্ণ টেপ রেকর্ডারে কী ছিল, ওটাতে যে নির্দেশনা ছিল কী লেখা ছিল ওখানে। রানসাইটারের টিভি বিজ্ঞাপনে কী ছিল সেটা বলতে পারি, বাল্টিমোরের শপিংমলে সিগারেটের কার্টনে যা লেখা ছিল, এলিক্সার অব ইউবিক বোতলের লেবেলে যা লেখা ছিল, বলতে পারি সেগুলোর কথাও। কিন্তু এগুলোর পরস্পরের সাথে কী যোগসূত্র সেটা বলতে পারবো না। যাই হোক, আমাদেরকে এখন দ্রুত হোটেলে ফিরতে হবে, যেন এডি ডর্ন ধুলোয় মিশে যাওয়ার এবং পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার আগেই তার কাছে পৌঁছাতে পারি। ট্যাক্সি পাওয়া যাবে কোথায়?’

‘আমাদের ব্যবহারের জন্য মরচুয়াবি একটা গাড়ি দিয়েছে,’ ডন ড্যানি বললো। ‘ঐ যে পিয়ার্স-অ্যারোটা।’ হাতের ইশারায় দেখালো সে। দ্রুত গাড়িটার দিকে এগোল সবাই।

‘এটাতে সবার জায়গা হবে না,’ ডন ড্যানি নিখাদ লোহার তৈরি দরজাটা টান দিয়ে খুলে ভেতরে ঢুকে বসতেই টিপি জ্যাকসন বললো।

‘ব্লিসকে জিজ্ঞেস করো উইলিস-নাইটটা আমরা নিতে পারবো কি না,’ জো বললো। পিয়ার্স অ্যারোর ইঞ্জিন চালু করলো সে এবং যে কয়জন উঠতে পারে তারা উঠে বসতেই ডি মোয়েনের ব্যস্ত সড়ক ধরে চলতে শুরু করলো। একেবারে পেছন থেকেই অনুসরণ করছে উইলিস-নাইট। হর্নের প্রচণ্ড শব্দ জোকে জানিয়ে দিলো যে ওটা তার সঙ্গেই আছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *