অধ্যায় ১৪
খাবারের স্বাদ আর গুণগত মান বজায় রাখতে কেবল একটা ব্যাগই যথেষ্ট নয়। তার জন্য প্রয়োজন উবিক প্লাস্টিক মোড়ক—যার প্রতিটি মোড়কে রয়েছে চারটি স্তর। খাবারের তরতাজা ভাব ভেতরে ধরে রাখে, বাতাস এবং আর্দ্রতাকে রাখে বাইরে। এই সিমুলেটেড পরীক্ষণটি দেখুন।
.
‘সিগারেট আছে তোমার কাছে?’ জিজ্ঞেস করলো জো। তার গলা কাঁপছে। তবে তা ক্লান্তি বা ঠান্ডার কারণে না। ঐ দুটোর কোনোটাই আর নেই। আমি উদ্বিগ্ন, নিজেকে আশ্বস্ত করলো সে। কিন্তু আমি মারা যাচ্ছি না। উবিক স্প্রের মাধ্যমে ঐ প্রক্রিয়াটি থামানো হয়েছে।
রানসাইটার যেমন বলেছিলেন যে এটা কাজ করবে। টিভিতে প্রচারিত বিজ্ঞাপনের কথা মনে পড়লো তার। যদি আমি এটা খুঁজে পাই, তাহলে আমি বিপদমুক্ত, রানসাইটার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরক্ষণেই বিষণ্ণ মনে ভাবলো, এটা খুঁজে পেতে দীর্ঘ একটা সময় লেগেছে, আর আমারও প্রায় হাতের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছিলো।
‘ফিল্টার টিপস নেই,’ রানসাইটার বললেন। ‘অতীতের এই অনুন্নত সময়ে তাদের কাছে সিগারেটের ফিল্টার তৈরির প্রযুক্তি ছিলো না।’ একটা ক্যামেল-এর প্যাকেট জোয়ের দিকে বাড়িয়ে ধরলেন তিনি। ‘আমি ধরিয়ে দিচ্ছি।’ একটা ম্যাচের কাঠি জ্বেলে জোয়ের মুখের সামনে ধরলেন।
‘একেবারে টাটকা,’ জো বললো।
‘ওহ, হ্যাঁ। ঈশ্বর! এইমাত্র নিচের দোকান থেকে কিনেছি আমি। আমরা ইতোমধ্যেই অনেকদূর চলে এসেছি। জমাট দুধ আর বাসি সিগারেটের ভেতর নেই আর।’ দাঁত বের করে হাসলেন তিনি। তার চোখদুটোতে দৃঢ় প্রত্যয় আর বিষণ্ণতার মিশেল। কোনো আলো প্রতিফলিত হচ্ছে না সেখান থেকে। ‘যদিও এখনো সবকিছুর ভেতরেই আছি,’ তিনি বললেন, ‘বাইরে না। দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে।’ নিজের জন্যও একটা সিগারেট ধরালেন তিনি। পেছনে হেলান দিয়ে ধূমপান করতে লাগলেন নিঃশব্দে। তার অভিব্যক্তিতে এখনো একধরনের কাঠিন্য ফুটে আছে।
জো উপসংহারে পৌঁছালো; রানসাইটার ক্লান্ত ঠিকই, তবে সে নিজে যে ভয়াবহ ক্লান্তি পার হয়ে এসেছে সেরকম নয়। জিজ্ঞেস করলো, ‘দলের বাকি সবাইকে তুমি সাহায্য করতে পারবে না?’
‘আমার কাছে মাত্র এক ক্যান উবিক ছিলো। তার বেশিরভাগটাই তোমার উপর প্রয়োগ করতে হয়েছে।’ অসন্তোষের সাথে ইশারা করলেন তিনি। নিষ্ফল ক্রোধে আঙুলগুলো কাঁপছে তার। ‘এখানে বাস্তবতা পরিবর্তন করার ক্ষমতা আমার সীমিত। যা করতে পারতাম তার সবই করেছি।’ মুখ তুলে কঠোর দৃষ্টিতে জোয়ের দিকে তাকানোর সময় তার মাথা একটা ঝাঁকি খেলো। ‘তোমাদের কাছে পৌঁছাতে পেরেছি আমি—তোমাদের সবার কাছে—যখনই সুযোগ পেয়েছি, যেভাবে পেরেছি। আমার পক্ষে যা কিছু করা সম্ভব ছিলো তার সবই করেছি। যদিও তা খুবই নগণ্য। একেবারে কিছু না করার মতোই।’ ধোঁয়ার মাঝে এক বিষণ্ণ নীরবতায় হারিয়ে গেলেন তিনি।
‘শৌচাগারের দেয়ালে অঙ্কিত গ্রাফিটিতে তুমি লিখেছিলে, আমরা সবাই মারা গেছি আর তুমি বেঁচে আছো।’
‘আমি বেঁচে আছি,’ কর্কশ কণ্ঠে বললেন রানসাইটার।
‘আমরা মারা গেছি, আমরা সবাই?’
দীর্ঘ নীরবতার পর রানসাইটার বললেন, ‘হ্যাঁ।’
‘কিন্তু রেকর্ড করা টিভি বিজ্ঞাপনে—’
‘ওটা ছিলো তোমাকে উজ্জীবিত করার জন্য, যেন লড়াই চালিয়ে যাও। যেন উবিক খুঁজে বের করো। আর ওদিক থেকে আমি চেষ্টা করতে থাকি ওটা তোমার কাছে পৌঁছানোর জন্য। কিন্তু তুমি জানো ভুলটা কোথায় হয়েছে। প্যাট সবাইকে অতীত থেকে আরো অতীতে নিয়ে যেতে থাকে। তার সেই বিশেষ ট্যালেন্ট আমাদের সবার উপর প্রয়োগ করতে থাকে। বারবার সে সময়কে পশ্চাদমুখী করে আমাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়।’ একটু বিরতি নিয়ে রানসাইটার আবার বললেন, ‘শুধু টুকরো টুকরো কিছু নোট, যেগুলো আমি বিচ্ছিন্নভাবে তোমার কাছে পাঠাতে পেরেছিলাম, সেগুলো বাদে।’ ঝট করে তিনি তার ভারী, দৃঢ় আঙুল জোয়ের দিকে তুললেন। ‘বুঝতে পারছো কীসের বিরুদ্ধে লড়াই করছি আমি। সেই একই বস্তুর সাথে, যেটা তোমাদের সবাইকে ফাঁদে ফেলেছে। তোমাদের হত্যা করেছে একে একে। খোলাখুলিই বলছি, আমার পক্ষে যা করা সম্ভব ছিলো তার সবকিছুই করতে পেরেছি দেখে আমি নিজেই অবাক হয়েছি।’
‘কী ঘটতে যাচ্ছে সেটা তুমি কখন জানতে পারলে?’ জো জিজ্ঞেস করলো। ‘তুমি কি আগে থেকেই জানতে? একেবারে শুরু থেকে?’
‘শুরু,’ তিক্ত সুরে প্রতিধ্বনি করলেন রানসাইটার। ‘এর অর্থ কী? এটা শুরু হয়েছে কয়েক মাস আগে বা সম্ভবত কয়েক বছর আগে। ঈশ্বর জানেন হোলিস, মিক, প্যাট কনলি, এস. ডোল মেলিপন এবং জি. জি. অ্যাশউড কতদিন ধরে এই পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। বারবার এটা নিয়ে কাজ করেছে ঠিক ময়দা মাখানোর মতো করে। আমি বলছি আসলে কী হয়েছিল। চাঁদে যাওয়ার জন্য আমরা একটা ফাঁদে পা দেই। প্যাট কনলিকে আমাদের সাথে যাওয়ার সুযোগ দেই, অথচ মেয়েটাকে আমরা ভালো করে চিনতাম না। এমন এক ট্যালেন্ট যা বোঝা ছিলো আমাদের সাধ্যের বাইরে। সম্ভবত হোলিস নিজেও ঠিকমতো বুঝতে পারেনি। এমন এক ক্ষমতা যা কোনো না কোনোভাবে সময়ের পশ্চাদগামিতার সাথে যুক্ত। না, সঠিকভাবে বলতে গেলে, এটা আসলে তার সময় পরিভ্রমণ ক্ষমতা নয়… যেমন, সে ভবিষ্যতে যেতে পারে না। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, সে আসলে অতীতেও যেতে পারে না। সে যেটা করতে পারে, আমি যতদূর বুঝেছি, তা হলো সে একটা বিপরীত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্থান-কালের অন্তর্নিহিত আপেক্ষিক অবস্থার ঠিক পূর্ববর্তী পর্যায় উন্মোচন করে। তুমি সেটা জানো। তুমি আর আল নিজের বুদ্ধিতেই সেটা আবিষ্কার করেছিলে।’ অক্ষম ক্রোধে দাঁত কিড়মিড় করলেন তিনি। ‘আল হ্যামন্ড—কত বড় একটা ক্ষতি হয়ে গেল। কিন্তু আমি কিছুই করতে পারিনি। এখন যেভাবে অনুপ্রবেশ করতে পেরেছি তখন সেটা পারিনি।’
‘এখন কেন পারছো?’ জো জিজ্ঞেস করলো।
রানসাইটার বললেন, ‘কারণ সে আমাদেরকে যতটুকু অতীতে নিয়ে আসতে পারতো ততটুকুই নিয়ে এসেছে। স্বাভাবিক অগ্রগতির প্রক্রিয়া আবার শুরু হয়েছে। আমরা আবার অতীত থেকে বর্তমানে এবং বর্তমান থেকে ভবিষ্যতে প্রবাহিত হচ্ছি। কোনো সন্দেহ নেই যে মেয়েটা তার ক্ষমতার সর্বোচ্চটাই প্রয়োগ করেছে। ১৯৩৯, এটাই তার সর্বোচ্চ সীমা। সে যা করেছে তাতে তার ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে গেছে। হবে নাই বা কেন? আমাদের ক্ষতি করার যে দায়িত্ব দিয়ে রে হোলিস তাকে পাঠিয়েছিলো, সেটা সে নিখুঁতভাবে পালন করেছে।’
‘কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?’
‘শুধু আমরাই, যারা চাঁদের ঐ ভূগর্ভস্থ কামরায় ছিলাম। এমনকি জো ওয়ির্টেরও কিছু হয়নি। প্যাট তার তৈরি ক্ষেত্রের পরিসীমা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারে। আর পৃথিবীর সবাই যেটা জানে সেটা হলো চাঁদে একটা দুর্ঘটনাজনিত কারণে আমাদের মৃত্যু হয়, এরপর স্ট্যান্টন মিকের একান্ত প্রচেষ্টায় আমাদের কোল্ড-প্যাকে স্থাপন করা হয়, কিন্তু তাৎক্ষণিক কোনো যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি—কারণ ওরা সময়মতো আমাদের উদ্ধার করতে পারেনি।’
‘বোমা বিস্ফোরণটাই কি যথেষ্ট ছিলো না?’ জো জিজ্ঞেস করলো।
একটা ভ্রু উঁচু করে রানসাইটার তাকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতে লাগলেন। ‘প্যাট কনলিকে ব্যবহার করার প্রয়োজন হলো কেন?’ জো বললো। সে বুঝতে পারছিলো, এমনকি তার ক্লান্ত-বিধ্বস্ত অবস্থাতেও, যে কোথাও একটা বড় ধরনের ভুল হয়েছে। ‘পশ্চাদগামী কলাকৌশলের কোনো প্রয়োজনই ছিলো না, অথবা প্রয়োজন ছিলো না ক্রমাগত পশ্চাদগামী হতে থাকা ১৯৩৯ সালের এই সময় স্রোতে আমাদের ডুবিয়ে দেওয়ার। এটার কোনো অর্থ খুঁজে পাচ্ছি না।’
‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা পয়েন্ট,’ রানসাইটার বললেন। মাথা নাড়ছেন ধীরে ধীরে। তার বলিরেখাপূর্ণ পাথুরে মুখে চিন্তার ভাঁজ। ‘এটা নিয়ে আমাকে ভাবতে হবে। একটু সময় দাও।’ হেঁটে জানালার কাছে গিয়ে রাস্তার অপর পাশের দোকানগুলো দেখতে লাগলেন।
‘আমার মনে হচ্ছে,’ জো বললো, ‘আপাতদৃষ্টিতে আমরা যে পরিস্থিতির মুখোমুখি, সেটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে কেউ আমাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করছে তা নয়, বরং তার চেয়েও মারাত্মক কিছু। ব্যাপারটা এমন না যে কেউ আমাদের হত্যা করার চেষ্টা করছে, অথবা চেষ্টা করছে নিষ্ক্রিয় করার, কিংবা প্রুডেন্স অর্গানাইজেশন হিসেবে আমাদের সকল কার্যকলাপ বন্ধ করার, বরং—’ ভাবছে সে; প্রায় ধরেই ফেলেছিলো। ‘কাণ্ডজ্ঞানহীন কেউ একজন আমাদের সাথে এই নিষ্ঠুর খেলাটা উপভোগ করছে। যেভাবে সে আমাদের একজন একজন করে হত্যা করছে তাতে তাই বোঝায়। এত দীর্ঘায়িত করার কোনো প্রয়োজন ছিলো না। এর পেছনে রে হোলিসের হাত আছে, আমার তা মনে হয় না। সে নিষ্ঠুর, ঠান্ডা মাথার খুনি। এবং স্ট্যান্টন মিক সম্পর্কে আমি যা জানি—’
‘প্যাট নিজে,’ রূঢ়ভাবে মাঝখানে বাধা দিলেন রানসাইটার, জানালা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ‘মেয়েটার মানসিকতাই বিকৃত। মাছির ডানা ছিঁড়ে ফেলার মতো বিকৃত। সেভাবেই আমাদের সাথে খেলছে ও।’ জোয়ের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য তাকিয়ে রইলেন তিনি।
‘উঁহু, পুরো ঘটনাটা আমার কাছে অনেক বেশি শিশুসুলভ মনে হচ্ছে,’ জো বললো।
‘কিন্তু প্যাট কনলির অবস্থা চিন্তা করে দেখো। সে ঈর্ষাকাতর আর হিংসুটে। শুধু হিংসার বশেই ওয়েন্ডি রাইটকে সে হত্যা করেছে সবার আগে। এই কিছুক্ষণ আগেই সে তোমার সাথে সাথে তিন তলা পর্যন্ত উঠে আসে, শুধু তোমার যন্ত্রণা উপভোগ করার জন্য। সত্যি বলতে কী, সে লোলুপনেত্রে তোমার মৃত্যু দেখছিলো।’
‘তুমি কীভাবে জানলে?’ জো বললো। তুমি এই কামরায় অপেক্ষা করছিলে, আপনমনে বললো সে। আমার সাথে কী হয়েছে সেটা তো তোমার দেখার কথা না। আর… আমি যে ঠিক এই কামরাতেই আসবো সেটা তুমি কীভাবে জানলে?
ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে রানসাইটার বললেন, ‘আমি এখনো তোমাকে সব কথা বলিনি। সত্যি বলতে কী…’ থামলেন তিনি, প্রচণ্ড জোরে কামড়ে ধরেছেন নিচের ঠোঁট, তারপর আচমকাই আবার শুরু করলেন, ‘আমি তোমাকে যা বলেছি তা পুরোপুরি সত্য না। এই পশ্চাদগামী পৃথিবীর সাথে তোমাদের সবার যে সম্পর্ক আমার সাথে তেমন সম্পর্ক না। তুমি একেবারে ঠিক কথা বলেছ: আমি অনেক বেশি জানি। তার কারণ, আমি এই ঘটনাপ্রবাহে প্রবেশ করেছি বাইরে থেকে, জো।’
‘তোমার ঐ আত্মপ্রকাশগুলোর মাধ্যমে,’ মন্তব্য করলো সে।
‘হ্যাঁ। এই অনুপ্রবেশ করা, এখানে-সেখানে। কৌশলগত স্থান এবং সময়ে। যেমন ট্রাফিক পুলিশের দেওয়া বার্তা। যেমন আর্চারের—’
‘টিভির বিজ্ঞাপন আগে থেকে তুমি রেকর্ড করে রাখোনি,’ জো বললো। ‘ওটা ছিলো সরাসরি সম্প্রচার।’
রানসাইটার অনিচ্ছা সত্ত্বেও সম্মতির ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন।
‘কেন এই পার্থক্য,’ জো বললো, ‘তোমার অবস্থা এবং আমাদের অবস্থার মধ্যে?’
‘তুমি জানতে চাও?’
‘হ্যাঁ,’ তিক্ত সত্যটা শোনার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে নিলো সে। যদিও জানে জবাবটা কী হবে।
‘আমি মারা যাইনি, জো। গ্রাফিটি সত্যি কথাই বলেছে। তোমরা সবাই আছো কোল্ড-প্যাকে, আর আমি—’ কথাগুলো বলতে অস্বস্তি বোধ করছেন রানসাইটার, জোয়ের দিকে সরাসরি তাকাতে পারছেন না। ‘আমি এই মুহূর্তে বসে আছি বিলাভেড ব্রেদরেন মোরাটোরিয়ামের কনসাল্টেশন লাউঞ্জে। আমার নির্দেশে তোমাদের সবাইকে একসাথে যুক্ত করে রাখা হয়েছে, একটা দল হিসেবে। আমি এখান থেকে তোমাদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছি। সেজন্যই বলেছিলাম যে আমি বাইরে আছি; সেজন্যই আত্মপ্রকাশগুলোর প্রয়োজন হয়েছিল—তুমি ওগুলোকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছ। এক সপ্তাহ ধরে আমি চেষ্টা করছি তোমাদের সবাইকে অর্ধজীবনে ক্রিয়াশীল করে তোলার জন্য। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। তোমরা একে একে বিলীন হয়ে যাচ্ছো।’
খানিক বিরতির পর জো জিজ্ঞেস করলো, ‘প্যাট কনলির কী ব্যবস্থা করেছ?’
‘হ্যাঁ, সে তোমাদের সাথেই আছে, অর্ধ-জীবনে, দলের বাকি সবার সাথে যুক্ত।’
‘পশ্চাদগামিতা কি তার ট্যালেন্টের কারণেই হয়েছে? নাকি এটা অর্ধজীবনের স্বাভাবিক ক্ষয়?’ জো উত্তেজনায় টানটান হয়ে আছে রানসাইটারের জবাবের জন্য। বুঝতে পারছে সবকিছু নির্ভর করছে এই একটি মাত্র প্রশ্নের উপর।
রানসাইটার নাক দিয়ে ঘোঁত জাতীয় একটা শব্দ করলেন। মুখ বাঁকিয়ে কর্কশ কণ্ঠে বললেন, ‘অর্ধ-জীবনের স্বাভাবিক ক্ষয়। ইলার এই অভিজ্ঞতা হয়েছে। অর্ধ-জীবনে যারা প্রবেশ করে, তাদের সবারই এই অভিজ্ঞতা হয়।’
‘তুমি মিথ্যে কথা বলছো,’ জো বললো। মনে হলো একটা ছুরি তার বুক এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছে।
তার দিকে তাকিয়ে রানসাইটার বললেন, ‘হায় ঈশ্বর! জো, আমি তোমাকে বাঁচালাম; সবকিছু করলাম তোমাকে সম্পূর্ণ ক্রিয়াশীল অর্ধ-জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য। এখন তুমি হয়তো অনির্দিষ্ট কালের জন্য এভাবেই চলতে পারবে। যখন তুমি এই ঘরে হামাগুড়ি দিয়ে প্রবেশ করেছিলে, আমি যদি এখানে অপেক্ষা না করতাম কী অবস্থা হতো, বলো? দেখো, আবোল-তাবোল কথা বাদ দাও। তুমি এতক্ষণে ঐ ছাতাপড়া বিছানায় মরে শুকিয়ে থাকতে, যদি আমি না থাকতাম। আমি গ্লেন রানসাইটার। আমি তোমাদের অধিকর্তা, আর একমাত্র আমিই তোমাদের বাঁচানোর জন্য লড়াই করছি। বাস্তব পৃথিবীতে একমাত্র আমিই আছি তোমাদের সাহায্য করার জন্য।’ যুগপৎ বিস্ময় আর ক্রোধান্বিত দৃষ্টিতে জোয়ের দিকে তাকিয়েই রইলেন তিনি। কিছুটা হতভম্ব, যেন তিনি এখন আর বুঝতে পারছেন না আসলে কী ঘটছে। ‘ঐ মেয়েটা,’ রানসাইটার বললেন, ‘প্যাট কনলি, সে তোমাকেও খুন করতো, যেভাবে সে—’ বাক্যটা শেষ না করেই থেমে গেলেন তিনি।
‘ঠিক যেভাবে সে ওয়েন্ডি এবং আলকে খুন করেছে। এডি ডন, ফ্রেড জাফস্কি আর হয়তো এতক্ষণে টিটো অ্যাপাস্তাসকেও,’ বললো জো।
নিচু এবং নিয়ন্ত্রিত কণ্ঠে রানসাইটার বললেন, ‘পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল, জো। এখানে সহজ জবাব দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
‘উত্তরগুলো তোমার জানা নেই,’ জো বললো। ‘আর সেটাই হলো সমস্যা। উত্তরগুলো তোমাকে তৈরি করে নিতে হচ্ছে। এখানে তোমার সকল উপস্থিতি আর তথাকথিত আত্মপ্রকাশ ব্যাখ্যা করার জন্য।’
‘আমি এই শব্দটা ব্যবহার করছি না। তুমি আর আল এই শব্দটা তৈরি করেছ। তোমরা যা করেছ তার জন্য আমাকে দোষারোপ করতে পারো না—’
‘আমি যতটুকু জানি, তুমি তার চেয়ে বেশি কিছু জানো না,’ জো বললো। ‘আমাদের কী হচ্ছে, এবং কে আমাদের উপর হামলা করছে। গ্লেন, তুমি বলতে পারবে না কে বা কারা আমাদের প্রতিপক্ষ। কারণ তুমি জানো না।’
‘আমি জানি কারণ আমি বেঁচে আছি,’ রানসাইটার বললেন। ‘আমি জানি আমি এই মুহূর্তে বসে আছি মোরাটোরিয়ামের কনসাল্টেশন লাউঞ্জে।’
‘তোমার দেহ পড়ে আছে কফিনে,’ জো বললো। ‘এখানে, সিম্পল শেফার্ড মরচুয়ারিতে। তুমি কি দেখেছ?’
‘না,’ রানসাইটার বললেন। ‘কিন্তু সেটা আসলে—’
‘কালের ব্যবধানে শুকিয়ে মিশে গেছে মাটির সাথে,’ জো বললো। ‘ওয়েন্ডি, আল আর এডির মতোই আকৃতিহীন, এবং কিছুক্ষণ পরে একই অবস্থা হবে আমার। তোমার জন্যও একই ভাগ্য অপেক্ষা করছে। এর চেয়ে ভালোও না, মন্দও না।’
‘কিন্তু তোমার জন্য আমার কাছে আছে উবিক—’ আবারও মাঝপথে থেমে গেলেন রানসাইটার। বোঝা কঠিন এমন এক অভিব্যক্তি তার মুখে; সম্ভবত অন্তর্দৃষ্টি আর ভয়ের একটা সংমিশ্রণ, জো ঠিক বলতে পারবে না। ‘তোমার জন্য উবিক এনেছি আমি,’ কথা শেষ করলেন তিনি।
‘উবিক কী?’ জো জিজ্ঞেস করলো। রানসাইটারের কাছ থেকে কোনো উত্তর নেই।
‘এটার উত্তরও তোমার জানা নেই,’ জো বললো। ‘তুমি জানো না এটা কী এবং কেন কাজ করছে। এমনকি তুমি এটাও জানো না যে উবিক এসেছে কোত্থেকে।’
দীর্ঘ যন্ত্রণাদায়ক বিরতির পর রানসাইটার বললেন, ‘ঠিকই বলেছ তুমি, জো। পুরোপুরি ঠিক।’ কাঁপা কাঁপা হাতে আরেকটা সিগারেট ধরালেন তিনি। ‘কিন্তু আমি তোমার জীবন বাঁচাতে চেয়েছিলাম। ঐ অংশে কোনো খাদ নেই। ওহ, আমি তোমাদের সবার জীবন বাঁচাতে চেয়েছিলাম।’ সিগারেটটা পিছলে গেল আঙুলের ফাঁক দিয়ে। গড়িয়ে গেল মেঝের একদিকে। অনেক কষ্টে সেটা তোলার জন্য সামনে ঝুঁকলেন রানসাইটার। চরম হতাশা আর দুঃখের ছাপ তার চেহারায়।
‘আমরা আছি এর ভেতরে,’ জো বললো, ‘আর তুমি ওখানে বাইরে, লাউঞ্জে বসে আছো। তুমি কিছুই করতে পারলে না। আমরা যে পরিস্থিতির শিকার হয়েছি সেটা থামাতে পারলে না তুমি।’
‘ঠিক,’ একমত হলেন রানসাইটার।
‘এটা আসলেই কোল্ড-প্যাক,’ জো বললো। ‘কিন্তু এখানে অন্য কিছু একটা আছে যা অর্ধ-জীবনে থাকা মানুষগুলোর জন্য মোটেও স্বাভাবিক না। দুটো শক্তি কাজ করছে এখানে। আল সেটা অনুমান করেছিলো, একটা শক্তি আমাদের সাহায্য করছে, আর অন্যটা আমাদের ধ্বংস করে দিচ্ছে। তুমি সেই শক্তি অথবা সত্তা অথবা ব্যক্তির সাথে কাজ করছো যেটা আমাদের সাহায্য করার চেষ্টা করছে। ওদের কাছ থেকেই তুমি উবিক পেয়েছ।’
‘হ্যাঁ।’
‘তার মানে আমরা কেউই এখনো জানি না সে কে যে আমাদের ধ্বংস করার চেষ্টা করছে, এবং সে কে যে আমাদের রক্ষা করার চেষ্টা করছে। তুমি বাইরে থেকে জানো না, আর আমরা ভেতরে থেকেও জানি না। হতে পারে এটা প্যাট।’
‘আমার তাই মনে হয়,’ রানসাইটার বললেন। ‘আমার মনে হয় প্যাটই তোমাদের শত্রু।’
‘হতে পারে,’ জো বললো। ‘কিন্তু আমার তা মনে হয় না।’ আমার মনে হয় না যে আমরা আমাদের বন্ধু অথবা শত্রুর চেহারা এখনো দেখতে পেয়েছি। কিন্তু আমার ধারণা, তাদের সাথে দেখা হবেই, সে ভাবলো। খুব শীঘ্রই আমরা উভয়ের পরিচয় জানতে পারবো।
‘তুমি কি নিশ্চিত,’ রানসাইটারকে জিজ্ঞেস করলো সে, ‘পুরোপুরি নিশ্চিত যে বিস্ফোরণ থেকে একমাত্র তুমিই বেঁচে আছো? ভেবেচিন্তে উত্তর দেবে।’
‘আগেই বলেছি, জোয়ি ওয়ির্ট—’
‘আমাদের দলের লোকদের কথা বলছি,’ জো বললো। ‘ঐ মহিলা সময়ের এই বিচ্ছিন্ন অংশে আমাদের সাথে নেই। আমাদের লোকদের কথা বলো… যেমন প্যাট কনলি।’
‘প্যাট কনলির পাঁজর ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। বিস্ফোরণের ধাক্কা আর ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্ত ফুসফুসের কারণে মারা যায় সে। সেই সাথে ছিলো একাধিক অভ্যন্তরীণ জখম। তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিলো ক্ষতিগ্রস্ত যকৃত আর ভাঙা পা, যা তিন জায়গায় ভেঙেছিল। এই মুহূর্তে প্যাট তোমার থেকে মাত্র চার ফুট দূরে, বলতে চাইছি, তার শরীর।’
‘বাকি সবার অবস্থাই একই রকম? তারা সবাই এখানে কোল্ড-প্যাকে আছে, এই বিলাভেড ব্রেদরেন মোরাটোরিয়ামে?’
‘শুধু একটা ব্যতিক্রম বাদে,’ রানসাইটার বললেন। ‘স্যামি মুন্ডো। তার মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কোমায় চলে যায়। চিকিৎসকদের মতে ওখান থেকে সে আর কখনো ফিরে আসতে পারবে না। তার মস্তিষ্কের বহিরাবরণ—’
‘তাহলে সে বেঁচে আছে। সে কোল্ড-প্যাকের অভ্যন্তরে নেই। মানে সে এখানে নেই।’
‘এটাকে আমি বেঁচে থাকা বলবো না। তারা ওর এনসেফালোগ্রাম করেছে। তার মস্তিষ্কের কোনো সাড়া নেই। ও এখন একটা দলা পাকানো মাংসপিণ্ড, তার বেশি কিছু না। কোনো সাড়া নেই। তার মস্তিষ্কের কোনো স্পন্দন বা উদ্দীপনা নেই, সামান্য পরিমাণেও না।’
‘আর তাই স্বাভাবিকভাবেই তুমি আমাকে এটা বলার প্রয়োজন মনে করোনি।’
‘এখন বললাম।’
‘আমি জিজ্ঞেস করার পর,’ মনের ভাবনাটাকে ভাষায় প্রকাশ করলো সে। ‘আমাদের কাছ থেকে সে কত দূরে আছে? জুরিখেই আছে?’
‘আমরা আপাতত জুরিখে আস্তানা গেড়েছি, হ্যাঁ। তাকে কার্ল জাং হাসপাতালে রাখা হয়েছে। এই মোরাটোরিয়াম থেকে মাত্র সিকি মাইল দূরে।’
‘একজন টেলিপ্যাথ ভাড়া করো,’ জো বললো। ‘অথবা জি. জি. অ্যাশউডকেই ব্যবহার করো। ওর স্ক্যান করাও।’ এই কাজ বালক বয়সী কারো, নিজেকে বললো সে। দুরন্ত আর অপরিপক্ব কারো। নিষ্ঠুর, অপরিণত, অদ্ভুত স্বভাবের কারো। এটাই সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, নিজেকে বললো সে। আমরা যে অভিজ্ঞতার মাঝ দিয়ে যাচ্ছি তার সাথে এটা খাপ খায়, এই সব পরস্পর বিরোধী খামখেয়ালিপনা মিলে যায়। প্রথমে আমাদের ডানাগুলি ছিঁড়ে ফেলছে, তারপর আবার সেগুলো জোড়া লাগাচ্ছে। অস্থায়ীভাবে পুনস্থাপন করছে, যেমন আমার সাথে হয়েছে এখানে, এই হোটেল কামরায়, সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসার পর।
‘করেছি,’ রানসাইটার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন। ‘মস্তিষ্কে এ ধরনের গুরুতর আঘাতের ক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তির সাথে টেলিপ্যাথিক্যালি যোগাযোগ করা একটা সাধারণ প্রক্রিয়া। ফলাফল শূন্য; কিছুই না। মস্তিষ্কের ন্যূনতম উদ্দীপনাও নেই। দুঃখিত, জো।’ সহানুভূতির সাথে বিশাল মাথাটা অদ্ভুতভাবে দোলালেন তিনি। নিঃসন্দেহে, তিনিও জোয়ের মতোই হতাশ।
***
‘আপনি কি আমাকে ডেকেছেন, স্যার?’ হার্বার্ট সোয়েনহেইট ভন ভলসাঙ লঘু পায়ে কনসাল্টেশন লাউঞ্জে প্রবেশ করলেন। তাকে মনে হচ্ছে মধ্যযুগীয় অভিজাত ব্যক্তিদের পার্শ্বচরের মতো। ‘আমি কি মি. চীপকে অন্যদের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাবো? আপনার কাজ শেষ হয়েছে, স্যার?’
‘শেষ হয়েছে,’ রানসাইটার বললেন।
‘আপনার—’
‘হ্যাঁ, কোনো ঝামেলা হয়নি। এবার আমরা দুজন দুজনের কথা পরিষ্কার শুনতে পেয়েছি।’ একটা সিগারেট ধরালেন তিনি; শেষ সিগারেট খাওয়ার পর বেশ কয়েক ঘণ্টা পেরিয়েছ। এতক্ষণে একটু অবসর পেলেন। এতক্ষণ তিনি জো চীপের কাছে পৌঁছানোর দুঃসাধ্য আর দীর্ঘায়িত কাজে ব্যস্ত ছিলেন। ‘কাছাকাছি কোনো ঔষধের দোকান আছে যেখানে অ্যাম্ফিটামিন পাওয়া যাবে?’ মোরাটোরিয়াম মালিককে জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
‘কনসাল্টেশন লাউঞ্জের বাইরের হলে আছে,’ সেবা করার জন্য সদাব্যস্ত অদ্ভুত প্রাণীটা বললো।
লাউঞ্জ থেকে বেরিয়ে রানসাইটার ঔষধের দোকানের দিকে এগিয়ে গেলেন, একটা কয়েন ঢুকিয়ে চাপ দিলেন পছন্দের বোতামে। ড্রপ স্লটে ছোট, পরিচিত বস্তুটা টুংটাং শব্দ করে বেরিয়ে এলো।
ঔষধটা খাওয়ার পর একটু ভালো বোধ করতে লাগলেন তিনি। কিন্তু তারপরই, ঠিক দুই ঘণ্টা পরে লেন নিগেলম্যানের সাথে দেখা করার কথা মনে পড়লো। চিন্তিত হয়ে ভাবলেন যে তিনি আসলে সঠিকভাবে সব বলতে পারবেন কি না। একসাথে অনেকগুলো ঘটনা ঘটছে। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, সোসাইটির কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন পেশ করার জন্য তিনি এখনো প্রস্তুত নন। এখনই নিগেলম্যানের সাথে যোগাযোগ করে আজকের সাক্ষাৎকার বাতিল করতে হবে।
পে ফোন ব্যবহার করে সুদূর উত্তর আমেরিকান কনফেডারেশনে লেন নিগেলম্যানের সাথে যোগাযোগ করলেন। ‘লেন,’ তিনি বললেন, ‘আজকে আমি আর কিছু করতে পারবো না। গত বারো ঘণ্টা আমি কোল্ড-প্যাকে থাকা আমার কর্মীদের সাথে যোগাযোগের কাজে ব্যস্ত ছিলাম। এখন আমি ভীষণ ক্লান্ত। আগামীকাল, ঠিক আছে?’
‘তুমি যত দ্রুত তোমার আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন দাখিল করতে পারবে, আমরা তত দ্রুত হোলিসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবো। আমার আইন বিভাগ বলছে যে এটা পুরোপুরি ওপেন অ্যান্ড শাট কেস। কিছু একটা করার জন্য তারা উদ্গ্রীব হয়ে আছে।’
‘তারা কি মনে করে যে তারা একটা শক্ত দেওয়ানি মামলা দাঁড় করাতে পারবে?’
‘দেওয়ানি এবং ফৌজদারি। ইতোমধ্যে নিউইয়র্ক ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির সাথে আলোচনা সেরে ফেলেছে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি আমাদের কাছে তোমার আনুষ্ঠানিক, বৈধ প্রতিবেদন—’
‘আগামীকাল,’ প্রতিশ্রুতি দিলেন রানসাইটার। ‘আমার একটু ঘুম আর বিশ্রাম দরকার। এই ঘটনা আমাকে প্রায় শেষ করে দিয়েছে।’ আমার সেরা সব এজেন্টদের এভাবে হারানো, নিজেকে বললেন তিনি। বিশেষ করে জো চীপ। আমার প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। অনেকগুলো মাস অথবা অনেকগুলো বছর লাগবে আবার নতুন করে কাজ শুরু করতে। ঈশ্বর! তিনি ভাবছেন। যাদের হারিয়েছি তাদের শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য যোগ্য ইনার্শিয়াল কোথায় পাবো? সবচেয়ে বড় কথা, জো চীপের মতো দক্ষ একজন পর্যবেক্ষক আমি কোথায় পাবো?
‘নিশ্চয়ই, গ্লেন,’ নিগেলম্যান বললো। ‘রাতে ভালো একটা ঘুম দাও, তারপর আগামীকাল আমার অফিসে দেখা কোরো, এই ধরো আমাদের স্থানীয় সময় দশটার দিকে।’
‘ধন্যবাদ,’ রানসাইটার বললেন। ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলেন তিনি, তারপর করিডরের অপর পাশে রাখা গোলাপি প্লাস্টিক কাউচে ধপাস করে শুয়ে পড়লেন। জোয়ের মতো একজন পর্যবেক্ষক আমি আর পাবো না। তার অর্থ, রানসাইটার অ্যাসোসিয়েটস পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে।
আবারও অযাচিতভাবে ভেতরে প্রবেশ করলো মোরাটোরিয়াম মালিক। ‘আপনার জন্য কিছু আনবো, মি. রানসাইটার? এক কাপ কফি? আরেকটা অ্যাম্ফিটামিন, বারো ঘণ্টা মেয়াদি একটা স্প্যানসুল? আমার অফিসে চব্বিশ ঘণ্টা মেয়াদি স্প্যানসুলও আছে। ওগুলোর একটাই আপনাকে আবার তরতাজা করে তুলতে যথেষ্ট, সারা রাতের জন্যও।’
‘সারা রাত,’ রানসাইটার বললেন। ‘আমি ঘুমাতে চাই।’
‘তাহলে একটা—’
‘দূর হয়ে যান!’ বিরক্ত হয়ে বললেন রানসাইটার। মোরাটোরিয়াম মালিক দ্রুত পায়ে চলে গেল, তাকে একা রেখেই। এই মোরাটোরিয়াম আমি কেন বেছে নিয়েছিলাম? নিজেকেই প্রশ্ন করলেন রানসাইটার। আমার ধারণা, কারণটা ইলা। হাজার হোক, এটা সবচেয়ে সেরা আর তার ইলা এখানে আছে। বাকি সবাইকেও তাই এখানে আনা হয়েছে। চিন্তা করে দেখো, ভাবলেন তিনি, এতগুলো মানুষ, যাদের সবাই এই তো মাত্র কিছুদিন আগেই কফিনের এই প্রান্তে ছিলো… কী ভয়াবহ বিপর্যয়।
ইলার কথা মনে পড়তেই ভাবলেন, ওর সাথে আবারও কিছুক্ষণ কথা বলা উচিত। কাজের অগ্রগতি জানানোর জন্য। কথা দিয়েছিলাম যে তাকে জানাবো। উঠে দাঁড়িয়ে মোরাটোরিয়াম মালিকের খোঁজে চললেন তিনি।
এবারও কি জোরি নামের ঐ ইঁচড়ে পাকা ছোকরাটা মাঝপথে বাগড়া দেবে? প্রশ্ন করলেন নিজেকে। নাকি জো যা বলেছে সেটা জানানোর জন্য ইলার মনোযোগ পর্যাপ্ত সময় ধরে রাখতে পারবো? ওর সাথে দীর্ঘ সময় যোগাযোগ ধরে রাখা আজকাল সত্যিই কঠিন হয়ে পড়েছে, যেহেতু জোরি ক্রমশই শক্তিশালী হয়ে উঠছে এবং তার পরিসীমা বৃদ্ধি করছে। গ্রাস করে নিচ্ছে ইলাকে, সেই সাথে হয়তো অর্ধ-জীবনে যারা আছে তাদের সবাইকে। ঐ ছেলেটার ব্যাপারে মোরাটোরিয়ামের কিছু একটা করা উচিত। এখানে যারা আছে তাদের সবার জন্য জোরি একটা উটকো ঝামেলা। তাকে এভাবে স্বাধীনভাবে ভেসে বেড়াতে দেওয়া হচ্ছে কেন? নিজেকেই জিজ্ঞেস করলেন তিনি। হয়তো ওরা তাকে থামিয়ে রাখতে পারে না, ধারণা করলেন তিনি।
হয়তো অর্ধ-জীবনে জোরির মতো কেউ কখনো আগে ছিলোই না।
