অধ্যায় ১৩
হাত উপরে তুলুন, হয়ে উঠুন অনুপম দেহসৌষ্ঠবের অধিকারী! নতুন এক্সট্রা জেন্টল উবিক ব্রা এবং লংলাইন উবিক স্পেশাল ব্রা পরা মানেই আকর্ষণীয় দেহসৌষ্ঠবের অনুপম উপস্থাপনা! নির্দেশনা মেনে পরিধানের মাধ্যমে আপনি পেতে পারেন সারা দিনের নির্ঝঞ্ঝাট আরামদায়ক অনুভূতি।
.
অন্ধকার যেন মৌমাছির মতো গুঞ্জন করছে চারপাশে। সেই সাথে জমাটবাঁধা উষ্ণ আর স্যাঁতস্যাঁতে পশমের মতো আঁকড়ে ধরেছে তাকে। যে আতঙ্ক প্রথমে ছিলো অস্পষ্ট এক অনুভূতি, অন্ধকারের সাথে সেটাই যেন হয়ে উঠলো আরো স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং পুরোপুরি বাস্তব। আমি মোটেও সতর্ক ছিলাম না, বুঝতে পারলো সে। রানসাইটার আমাকে যা করতে বলেছিলো আমি সেটা করতে পারিনি। আমি ওকে বার্তাটা দেখতে দিয়েছি।
‘কী হয়েছে, জো?’ ডন ড্যানির কণ্ঠস্বর উদ্বিগ্ন। ‘কোনো সমস্যা?’
‘আমি ঠিক আছি।’ এখন একটু একটু করে দেখতে পাচ্ছে সে। অন্ধকার পরিণত হয়েছে লম্বালম্বি কিছু ধূসর সরল রেখায়, যেন আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। ‘আমি শুধু ক্লান্ত বোধ করছি,’ সে বললো। আর সাথে সাথেই অনুভব করলো তার শরীরটা আসলে কী পরিমাণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আগে কখনো এমন ভয়াবহ ক্লান্তি অনুভব করেছে বলে তার মনে পড়ে না। জীবনে কখনো এমন হয়নি।
‘এসো, তোমাকে চেয়ারে নিয়ে বসাই,’ ডন ড্যানি বললো। জো অনুভব করলো তার কাঁধ আঁকড়ে ধরেছে ড্যানির দুটো হাত। অনুভব করলো ড্যানি তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর এটাই তাকে আরো ভীত করে তুললো। হাল ছাড়া যাবে না। ড্যানিকে সরিয়ে দিলো সে।
‘আমি ঠিক আছি’ আবারও বললো সে। ড্যানির দেহাবয়ব আস্তে আস্তে তার সামনে আকৃতি নিতে শুরু করেছে। ওদিকে মনোনিবেশ করলো সে, তারপর আরো একবার শতাব্দী প্রাচীন লবির অলংকৃত ঝাড়বাতি থেকে জটিল হলুদাভ আলো পৃথক করতে সক্ষম হলো। ‘আমাকে একটু বসতে দাও।’ হাতড়ে হাতড়ে একটা বেতের চেয়ার খুঁজে পেল সে।
কঠিন সুরে প্যাটকে জিজ্ঞেস করলো ডন ড্যানি, ‘তুমি ওর কী করেছ?’
‘ও আমার কিছু করেনি,’ জো বললো, কণ্ঠস্বরের দৃঢ়তা বজায় রাখার চেষ্টা করলেও শোনালো কর্কশ চিৎকারের মতো। মনে হলো যেন অতিপ্রাকৃত কণ্ঠস্বর। অনেক চড়া সুর। মোটেও আমার নিজের নয়।
‘ঠিক,’ প্যাট বললো। ‘আমি ওর বা অন্য কারো কোনো ক্ষতি করিনি।’
‘আমি উপরে গিয়ে একটু শুতে চাই,’ জো বললো।
‘আমি তোমাকে একটা কামরায় পৌঁছে দিচ্ছি,’ বিচলিত কণ্ঠে বললো ডন ড্যানি। দেখা দিয়েই আবার অদৃশ্য হয়ে গেল লবির আলো হঠাৎ কমে যাওয়ার কারণে। আলো কমতে কমতে নিস্তেজ লাল বর্ণ ধারণ করলো। তারপর আবার জোরালো হলো, এরপর নিস্তেজ হয়ে গেল আবারও। ‘তুমি ঐ চেয়ারেই বসে থাকো, জো। আমি এখুনি আসছি।’ দ্রুত ডেস্কের দিকে ছুটে গেল ড্যানি। প্যাট ওখানেই থাকলো।
‘তোমার জন্য কিছু করতে পারি?’ আনন্দিত সুরে জিজ্ঞেস করলো প্যাট।
‘না,’ সে জবাব দিলো। এই কয়েকটা শব্দ জোরে বলতে গিয়ে ভয়াবহ পরিশ্রম করতে হলো তাকে। এক অসহ্য শূন্যতা, যা প্রতি সেকেন্ডে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তার হৃৎপিণ্ডের একেবারে গভীরে অন্ধকার গহ্বরে এই শূন্যতা আটকে রইলো। ‘সম্ভব হলে একটা সিগারেট দিতে পারো,’ সে বললো, পুরো বাক্যটি বলতে গিয়ে জীবনীশক্তি শেষ হয়ে গেল প্রায়। হৃৎপিণ্ডের পরিশ্রম অনুভব করতে পারছে সে। অতিরিক্ত এবং দ্রুত হৃৎস্পন্দন তার যন্ত্রণা আরো বাড়িয়ে দিলো; অতিরিক্ত একটা বোঝা যেন তাকে চেপে ধরেছে, তাকে নিষ্পেষিত করে চলেছে একটা দানবীয় হাত। ‘আছে তোমার কাছে?’ সে বললো, ধোঁয়াটে লাল আলোর মাঝ দিয়ে প্যাটকে দেখার চেষ্টা করছে। হতাশাজনক, অস্থির বাস্তবতার ঝলকানো আভা।
‘দুঃখিত,’ প্যাট বললো। ‘নেই।’
‘আমার—আমার কী হয়েছে?’ জিজ্ঞেস করলো জো।
‘কার্ডিয়াক অ্যাটাক, সম্ভবত,’ প্যাট বললো।
‘তোমার কি মনে হয় যে এই হোটেলে কোনো ডাক্তার পাওয়া যাবে?’ কোনোরকমে কথাগুলো বললো সে।
‘আমার সন্দেহ আছে।’
‘তুমি কি একটু খোঁজ নিয়ে দেখবে না? কিছুই দেখবে না? কিছুই করবে না?’
‘আমার মনে হয় পুরোটাই শারীরিক আর মানসিক অবসাদ,’ প্যাট বললো। ‘কিছুই হয়নি তোমার। একটু বিশ্রাম নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।’
ফিরে এসে ডন ড্যানি বললো, ‘তোমার জন্য একটা কামরার ব্যবস্থা হয়েছে, জো। তৃতীয় তলায়। কামরা নাম্বার ২০৩,’ বিরতি নিলো সে। নিজের উপর ড্যানির তীক্ষ্ণ দৃষ্টি অনুভব করলো জো, সেই সাথে তার উদ্বেগ। ‘জো, তোমাকে ভীষণ অসুস্থ দেখাচ্ছে। একেবারেই দুর্বল। যেন এক্ষুনি বাতাসে মিলিয়ে যাবে। হে ঈশ্বর! জো, তুমি কি জানো তোমাকে কেমন দেখাচ্ছে? ঠিক এডি ডর্নের মতো আমরা তাকে যে অবস্থায় খুঁজে পেয়েছিলাম।’
‘আরে না, ওরকম কিছু না,’ প্যাট প্রতিবাদ জানালো। ‘এডি ডর্ন মারা গেছে। জো মারা যায়নি। তাই না, জো?’
‘আমি উপরে যেতে চাই,’ জো বললো। ‘আমি একটু শুতে চাই।’
কোনোরকমে নিজের পায়ে উঠে দাঁড়ালো সে। বুকের ভেতর ধড়াস ধড়াস করছে হৃৎপিণ্ড। মনে হলো হৃৎপিণ্ডটাই দ্বিধা করছে, হয়তো ভাবছে কয়েক মুহূর্তের জন্য হৃৎস্পন্দন থামিয়ে একটু বিশ্রাম নেবে কি না। পরক্ষণেই আবার চলতে শুরু করলো। যেন সিমেন্টের দেয়ালে মাথা কুটে মরছে লোহার কোনো দণ্ড। প্রতিটি স্পন্দনের সাথে পুরো দেহ কেঁপে কেঁপে উঠছে তার। ‘এলিভেটরটা কোন দিকে?’ জিজ্ঞেস করলো সে।
‘আমি তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি,’ ড্যানি বললো। আবারও তার দুটো হাত জোয়ের কাঁধে চেপে বসলো। ‘তোমাকে হালকা পালকের মতো লাগছে,’ ড্যানি বললো। ‘কী হচ্ছে তোমার, জো? বলতে পারবে? তুমি কি জানো? আমাকে বলার চেষ্টা করো।’
‘ও জানে না,’ বললো প্যাট।
‘আমার মনে হয় ওকে ডাক্তার দেখানো উচিত,’ ড্যানি বললো। ‘এই মুহূর্তেই।’
‘না,’ জো বললো। একটু ঘুমালেই উপকার হবে, নিজেকে আশ্বস্ত করলো সে। মহাসাগরের বিশাল ঢেউ যেন তাকে টানছে, প্রচণ্ড এক জোয়ার ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে তাকে, মিনতি করে বলছে, ঘুমিয়ে পড়ো। এই স্রোত তাকে শুধু একদিকেই চালিত করছে, হাত-পা সোজা করে টানটান হয়ে পিঠের উপর ভর দিয়ে শুয়ে পড়তে বলছে—একা, উপর তলায় নিজের কামরায়। যেখানে কেউ তাকে দেখতে পাবে না। আমাকে পালাতে হবে, নিজেকে বললো সে। আমাকে একা হতে হবে। কেন? সে জানে না। একটা অযৌক্তিক সহজাত প্রবৃত্তির মতো তাকে গ্রাস করে নিলো এটা, যা বোঝা অথবা ব্যাখ্যা করা অসম্ভব।
‘আমি ডাক্তার নিয়ে আসছি’ ড্যানি বললো। ‘প্যাট, তুমি ওর সাথে থাকো। এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল হতে দেবে না। আমি ফিরে আসছি যত দ্রুত সম্ভব।’ হাঁটা শুরু করলো সে। অস্পষ্টভাবে তার অপসৃয়মান অবয়ব দেখতে পেল জো। মনে হলো ড্যানি প্রথমে সংকুচিত হতে লাগলো, পরিণত হলো ক্ষুদ্র এক বিন্দুতে। তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল পুরোপুরি। প্যাট্রিসিয়া কনলি দাঁড়িয়ে রইলো তার সাথে। কিন্তু তারপরেও তার একাকিত্বের অনুভূতি কমলো না। তার এই বিচ্ছিন্নতাবোধ মেয়েটার শারীরিক উপস্থিতি সত্ত্বেও পরম সত্য হয়ে দাঁড়ালো।
‘তো, জো,’ প্যাট বললো, ‘কী চাও তুমি? আমি তোমার জন্য কী করতে পারি? একবার শুধু বলে দেখো।’
‘এলিভেটর,’ জো বললো।
‘তুমি চাও আমি তোমাকে এলিভেটরের কাছে নিয়ে যাই? নিশ্চয়ই।’ হাঁটতে শুরু করলো প্যাট। জো সাধ্যমতো চেষ্টা করলো তাকে অনুসরণ করার। তার কাছে মনে হলো প্যাট অস্বাভাবিক দ্রুত হাঁটছে। ও মোটেও অপেক্ষা করেনি, একবারও পেছন ফিরে তাকায়নি। ওকে দৃষ্টিসীমায় রাখা প্রায় অসম্ভব বলে মনে হলো জোয়ের কাছে। এটা কি আমার কল্পনা যে প্যাট অসম্ভব দ্রুত হাঁটছে? নিজেকেই প্রশ্ন করলো সে। না, সমস্যাটা বোধহয় আমার। আমারই গতি কমে গেছে। মাধ্যাকর্ষণ আমাকে গুটিয়ে দিয়েছে। তার গোটা পৃথিবীটাই আবর্তিত হচ্ছে বস্তু আর ভরসংক্রান্ত মূলনীতিকে কেন্দ্র করে। নিজেকে নিয়ে তার কেবল একটি প্রক্রিয়ারই অনুভূতি হচ্ছে। আর সেটি হলো: কোনো বস্তুই মহাকর্ষীয় বলের প্রভাবমুক্ত নয়। এক গুণ, এক ধর্ম আর এক অভিজ্ঞতা। স্থবিরতা।
‘একটু আস্তে যাও,’ সে বললো। এখন আর প্যাটকে দেখতে পাচ্ছে না। মেয়েটা পুরোপুরি তার দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেছে। ওখানেই দাঁড়িয়ে পড়লো সে। আর এক পা এগোনোরও ক্ষমতা নেই তার, হাঁফাচ্ছে। টের পেল মুখ আর চোখ বেয়ে নামছে নোনা ঘাম। ‘দাঁড়াও,’ চিৎকার করে বললো সে।
আবার দেখা গেল প্যাটকে। তাকে দেখার জন্য যখন সামনে ঝুঁকলো, তখন মেয়েটার মুখ দেখতে পেল পরিষ্কারভাবে। তার নিখুঁত আর প্রশান্ত অভিব্যক্তি। সবকিছু থেকে তার মনোযোগের বিচ্ছিন্নতা, যৌক্তিক ব্যাখ্যার প্রতি তার অনীহা। ‘তোমার মুখ মুছে দেবো?’ প্যাট জিজ্ঞেস করলো। লেস লাগানো, সূক্ষ্ম কারুকাজ করা ছোট একটা রুমাল বের করে আনলো সে। তারপর হাসলো, ঠিক আগের মতো স্বাভাবিক হাসি।
‘আমাকে শুধু এলিভেটরের কাছে নিয়ে যাও।’ একটু একটু করে শরীরটাকে সামনে এগোতে বাধ্য করলো সে। এলিভেটর দেখতে পাচ্ছে সে এখন, সামনে অনেক মানুষ লাইন ধরে অপেক্ষা করছে। স্লাইডিং ডোরের উপর ঘড়ির কাঁটার মতো পুরোনো আমলের ডায়াল। কাঁটাটি দেখতে নকশা করা মোটা সুচের মতো, তিন আর চারের মধ্যে দুলছে। পুরোপুরি বাম দিকে এসে তিনের ঘরে পৌঁছায়, তারপর তিন আর দুইয়ের মাঝে দুলতে থাকে।
‘কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই চলে আসবে,’ জোকে বললো প্যাট। পার্স থেকে সিগারেট আর লাইটার বের করে একটা সিগারেট ধরালো। গলগল করে ধোঁয়া ছাড়লো নাক দিয়ে। ‘এটা অনেক পুরোনো আমলের এলিভেটর,’ সে বললো, তার হাতদুটো আয়েশি ভঙ্গিতে ভাঁজ করে রাখা। ‘আমার কী ধারণা জানো? আমার ধারণা, এটা পুরোনো আমলের সেই উন্মুক্ত লোহার খাঁচাগুলোর মতো। তুমি কি ওগুলোকে ভয় পাও?’
কাঁটাটা এখন দুই পার হয়েছে; একের উপর ভেসে আছে, তারপর পুরোপুরি নিম্নমুখী হয়ে থামলো। একপাশে সরে গিয়ে উন্মুক্ত হলো দরজা।
খাঁচার গরাদগুলো দেখতে পেল জো, অনেকটা জালির মতো। দেখতে পেল উর্দিপরা চালককে। একটা টুলে বসে আছে, ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এলিভেটর নিয়ন্ত্রণ করার হাতলের উপর তার হাত রাখা। ‘উপরে যাচ্ছে,’ চালক বললো। ‘দয়া করে পেছনে গিয়ে দাঁড়ান।’
‘আমি ওটাতে যাবো না,’ জো বললো।
‘কেন যাবে না?’ প্যাট জিজ্ঞেস করলো। ‘তুমি ভাবছো তারগুলো ছিঁড়ে পড়বে? ঐ ভয়ই পাচ্ছো? আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি তুমি ভয় পেয়েছ।’
‘আল ঠিক এই জিনিসটাই দেখেছিলো,’ সে জবাব দিলো।
‘ঠিক আছে, জো,’ প্যাট বললো। ‘তাহলে তোমার কামরায় যাওয়ার একটাই পথ আছে। আর সেটা হলো সিঁড়ি বেয়ে ওঠা। তুমি নিশ্চয়ই সিঁড়ি বেয়ে উঠতে চাও না, অন্তত এই অবস্থায়।’
‘আমি সিঁড়ি দিয়েই উঠবো।’ এলিভেটরের কাছ থেকে সরে গেল সে। সিঁড়ি কোন দিকে সেটা খুঁজতে লাগলো। দেখতে পাচ্ছি না! সে মনে মনে বললো। আমি সিঁড়ি খুঁজে পাচ্ছি না! দেহের উপর চেপে বসা বোঝা যেন তার ফুসফুসকে পিষে ফেলছে, কষ্টকর এবং বেদনাদায়ক করে তুলেছে নিঃশ্বাস নেওয়াকে। থামতে বাধ্য হলো সে, ফুসফুসে বাতাস ঢোকানোর দিকে মনোযোগ দিলো—সব চিন্তা বাদ দিয়ে মনোনিবেশ করলো শুধু এই একটা কাজেই। হয়তো এটা আসলেই হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার লক্ষণ, সে ভাবলো। যদি তাই হয় তাহলে আমি সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে পারবো না। কিন্তু ভেতরের আকাঙ্ক্ষাটা আরো তীব্র হয়ে উঠেছে, সাথে আছে পুরোপুরি একা হওয়ার অপ্রতিরোধ্য প্রয়োজনীয়তা। তালা-চাবি দিয়ে বন্ধ করে ফাঁকা কামরায়… পুরোপুরি সবার চোখের আড়ালে… নিঃশব্দে চিত হয়ে শুয়ে থাকবে। আয়েশ করে, কারো সাথে কথা বলার কোনো প্রয়োজনীয়তা ছাড়া, কোনোরকম নড়াচড়া ছাড়া। কোনো মানুষ বা কোনো সমস্যার মোকাবেলার প্রয়োজন হবে না। কেউ এমনকি জানবেও না সে কোথায় আছে। এই মুহূর্তে ওর মনে হচ্ছে নির্দিষ্ট করে ঠিক এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; ও এখন সকলের অগোচরে অদৃশ্য হয়ে থাকতে চায়। বিশেষ করে প্যাটের; এই মেয়েটাকে কোনোভাবেই তার ধারেকাছে আসতে দেওয়া যাবে না।
‘ঐ যে, ওদিকে,’ প্যাট বললো। পথ দেখিয়ে সামান্য একটু বাঁ দিকে ঘুরিয়ে দিলো জোকে। ‘ঠিক তোমার সামনে। স্রেফ রেলিং ধরে নাচতে নাচতে উঠে যাও উপরে, তোমার বিছানায়। দেখেছ?’ প্যাট দক্ষতার সাথে প্রথম ধাপে আরোহণ করলো, ঠিক যেন নাচের তালে তালে, আভিজাত্যের সাথে। একটু থামলো, তারপর হালকা পালকের মতো পা রাখলো পরের ধাপে। ‘পারবে তুমি?’
‘তুমি আমার সাথে আসো আমি তা চাই না,’ জো বললো।
‘ওহ।’ যেন ভীষণ কষ্ট পেয়েছে এমন একটা ভান করে বললো মেয়েটা। অদ্ভুত এক আলো ফুটে উঠলো তার কালো চোখদুটোতে। ‘তুমি কি ভয় পাচ্ছো যে আমি তোমার অসহায় অবস্থার সুযোগ নেবো? কিছু করবো তোমার সাথে? ক্ষতিকর কিছু?’
‘না,’ দুদিকে মাথা হেলিয়ে বললো জো। ‘আমি শুধু চাইছি শুয়ে থাকতে। একা।’
রেলিং আঁকড়ে ধরে প্রথম ধাপে নিজেকে টেনে তুলতে সক্ষম হলো সে। ওখানে দাঁড়িয়ে উপরে তাকালো, শেষ ধাপটা দেখার চেষ্টা করছে। বোঝার চেষ্টা করছে কত দূর, আর কতগুলো ধাপ তাকে উঠতে হবে।
‘মি. ড্যানি আমাকে বলে গেছেন তোমার সাথে থাকতে। আমি তোমাকে কিছু পড়ে শোনাতে পারি, অথবা তোমার কিছু প্রয়োজন হলে তা এনে দিতে পারি। তোমার পাশে বসে অপেক্ষা করতে পারি।’
আরেক ধাপ উঠতেই হাঁফাতে শুরু করলো জো। ‘আমি… একা থাকতে চাই।’
‘আমি কি তোমার উপরে ওঠা দেখতে পারি?’ প্যাট জিজ্ঞেস করলো। ‘আমি দেখতে চাই তোমার কতক্ষণ লাগে। ধরে নিলাম যে তুমি শেষ ধাপে উঠতে পারবে।’
‘আমি পারবো।’ পরের ধাপে পা রাখলো সে, রেলিঙে ভর দিয়ে নিজেকে উপরে টেনে তুললো। দম বন্ধ হয়ে আসছে তার, চোখ বন্ধ করে বাতাসের জন্য হাঁসফাঁস করছে।
‘আমি ভাবছি ওয়েন্ডিও কি ঠিক এমনটাই করেছিলো কি না। ও-ই ছিলো প্রথম শিকার। ঠিক বলেছি আমি?’
‘আমি—ওকে—ভালোবাসতাম,’ হাঁপ ধরা কণ্ঠে বললো জো।
‘হ্যাঁ, আমি জানি। জি. জি. অ্যাশউড বলেছিলো আমাকে। তোমার মাইন্ড রিড করেছিলো সে। জি. জি. আর আমি খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। অনেক সময় কাটিয়েছি আমরা দুজন একসাথে। তুমি হয়তো বলবে আমাদের দুজনের মাঝে একটা বিশেষ সম্পর্ক ছিলো। হ্যাঁ, এই কথা তুমি বলতেই পারো।’
‘আমাদের ধারণা তাহলে সঠিক ছিলো।’ গভীরভাবে শ্বাস নিলো সে। ‘এক,’ বহু কষ্টে এইটুকু বলে আরেক ধাপ উঠলো জো, তারপর অমানুষিক পরিশ্রম করে আরো এক ধাপ। ‘জি. জি. আর তুমি রে হোলিসের সাথে মিলে এই পরিকল্পনা তৈরি করেছিলে। আমাদের মাঝে অনুপ্রবেশ করার জন্য।’
‘একদম ঠিক বলেছ,’ একমত হলো প্যাট।
‘আমাদের সেরা সব ইনার্শিয়াল আর রানসাইটার। আমাদের সবাইকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য।’ আরো এক ধাপ উঠলো সে। ‘এটা আমাদের অর্ধ-জীবন নয়। আমরা—’
‘হ্যাঁ, তুমি মারা যেতে পারো,’ প্যাট বললো। ‘তবে তোমরা মারা যাওনি। বিশেষ করে তুমি। কিন্তু তোমরা এক এক করে সবাই মারা যাচ্ছো। যাই হোক, এটা নিয়ে কথা বলছি কেন? কেন আবার একই বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি? একটু আগে তুমি তো নিজেই সব বলেছ। আর সত্যি বলতে কী, বারবার এই এক আলোচনা করতে করতে তুমি আমাকে বিরক্ত করে তুলেছ। তুমি আসলেই বোকা আর একগুঁয়ে একজন মানুষ, জো। প্রায় ওয়েন্ডি রাইটের মতো। তোমরা দুজন ভালো জুটি হতে পারতে।’
‘সে কারণেই ওয়েন্ডি রাইট প্রথমে মারা যায়,’ জো বললো। ‘দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে না। বরং কারণ—’ বুকের ব্যথা প্রচণ্ড বেড়ে যাওয়ায় যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলো সে। আরেক ধাপ ওঠার চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না, হোঁচট খেলো। পরক্ষণেই নিজেকে আবিষ্কার করলো বসে থাকা অবস্থায়, গাদাগাদি করে। হ্যাঁ, সে ভাবলো। ক্লজেটে ওয়েন্ডির দেহাবশেষ ঠিক এই রকম গাদাগাদি অবস্থায় পড়ে ছিলো। হাত বাড়িয়ে নিজের কোটের হাতা ধরলো সে। জোরে টান দিলো।
কাপড় ছিঁড়ে গেল। শুকনো আর পচা। এমনভাবে ছিঁড়ে গেল যেন সস্তা, ধূসর কাগজের তৈরি, কোনো প্রতিরোধ শক্তিই নেই… যেন পচনশীল বর্জ্য দিয়ে প্রস্তুত কোনো বস্তু। সুতরাং, আর কোনো সন্দেহ নেই। অতি শীঘ্রই সে হারিয়ে যাবে পেছনে চিহ্ন রেখে, কালের প্রবাহে নষ্ট হয়ে শুকিয়ে যাওয়া পোশাকের টুকরো অংশ। আবর্জনার একটা পদচিহ্ন এগিয়ে গেছে হোটেল কামরার দিকে, বহু আকাঙ্ক্ষিত বিচ্ছিন্নতার পানে। তার এই সর্বশেষ পরিশ্রমসাধ্য কাজটি পরিচালিত হচ্ছে তীব্র এক আকাঙ্ক্ষা দ্বারা। একটা দৃঢ় সংকল্প তাকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর দিকে, অবক্ষয় এবং অস্তিত্বহীনতার দিকে। এক রহস্যময় এবং বিষণ্ণ আবেগ তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, সমাধিই যার চূড়ান্ত পরিণতি।
আরেক ধাপ উঠলো সে।
আমি পারবো, বুঝতে পারলো জো। যে প্রচণ্ড শক্তি আমাকে তাড়িত করছে, সেটাই আমার দেহকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সে কারণেই ওয়েন্ডি, আল, এডি আর এতক্ষণে জাফস্কিও মারা গেছে। মৃত্যুর সাথে সাথেই তাদের নশ্বর দেহ পুরোপুরি ক্ষয় হয়ে গেছে, চিহ্ন হিসেবে রেখে গেছে তুষের মতো ওজনহীন, বাতিল একটা খোলস, যার কিছুই অবশিষ্ট নেই। নেই রূপ, রস, বর্ণ, ঘনত্ব কিংবা আকৃতি। এই অদৃশ্য শক্তি লড়াই করে যাচ্ছে, আর এটাই হলো তার চরম মূল্য, প্রাণরস নিংড়ে নেওয়া এই শুষ্ক দেহ। কিন্তু এই দেহ শক্তির একমাত্র যোগানদাতা হিসেবে আমাকে উপরে নিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। একটা জৈবিক তাগিদ এখানে কাজ করছে, সম্ভবত ঠিক এই মুহূর্তে। এমনকি এই প্রক্রিয়াটা যে শুরু করেছে সে, মানে প্যাট নিজেও এটা আর থামাতে পারবে না। জো অবাক হয়ে ভাবছে, তার এই উপরে ওঠা দেখে প্যাট কী ভাবছে। সে কি প্রশংসা করছে? নাকি ঘৃণা করছে? মাথা তুলে প্যাটকে খুঁজলো জো। দেখতে পেল তাকে। তার প্রাণবন্ত, বর্ণিল মুখে শুধুই কৌতূহল, নেই কোনো বিদ্বেষ। একেবারেই সাধারণ অভিব্যক্তি। মোটেও অবাক হলো না জো। প্যাট ওকে বাধাও দিচ্ছে না আবার সাহায্য করার কোনো চেষ্টাও করছে না। তার নিজের কাছেও এটা স্বাভাবিক বলেই মনে হলো।
‘একটু কি সুস্থ বোধ করছো?’ প্যাট জিজ্ঞেস করলো।
‘নাহ।’ অর্ধেক উপরে উঠে পরবর্তী ধাপের জন্য ঝুঁকলো সে।
‘তোমাকে অন্য রকম দেখাচ্ছে। মোটেও উদ্বিগ্ন মনে হচ্ছে না।’
‘কারণ আমি পারবো,’ জো বললো। ‘আমি জানি।’
‘আর খুব বেশি দূরে নেই,’ একমত হলো প্যাট।
‘অনেক দূরে,’ সংশোধন করে দিলো সে।
‘তুমি সত্যিই অদ্ভুত। এতই সাধারণ, এতটাই নগণ্য। এমনকি নিজের মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও—’ বিড়ালের মতো চতুরতায় কথাটা সংশোধন করে নিলো প্যাট—‘বরং বলা ভালো, মৃত্যুসম কষ্ট স্বীকার করেও। আমার আসলে নিশ্চিত মৃত্যু শব্দটা ব্যবহার করা উচিত হয়নি। এটা তোমাকে হতাশ করে দিতে পারে। মনের জোর ধরে রাখো, ঠিক আছে?’
‘আমাকে শুধু বলো আর কয়টা ধাপ বাকি আছে।’
‘ছয়টা।’ জোয়ের কাছ থেকে সরে গেল প্যাট। মসৃণ পদক্ষেপে নিঃশব্দে আর অনায়াসে উঠে যাচ্ছে উপরে। ‘না, দুঃখিত। দশ। নাকি নয়টা? আমার ধারণা নয়টা।’
আরেক ধাপ উপরে উঠলো সে, তারপর আরেক ধাপ, এরপর আরেকটা। কোনো কথা বলছে না, এমনকি দেখারও কোনো চেষ্টা করলো না। যে কঠিন পৃষ্ঠের উপর বিশ্রাম নিয়েছিলো তার কাঠিন্যের উপর ভর দিয়ে শামুকের গতিতে এক ধাপ দুই ধাপ করে উঠছে জো। বুঝতে পারছে নিজের মধ্যে একধরনের দক্ষতা বিকশিত হচ্ছে। কীভাবে নিজেকে আরো পরিশ্রম করার জন্য উৎসাহিত করা যাবে সেটা বলার সক্ষমতা এবং প্রায় নিঃশেষিত কায়িক শক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা।
‘প্রায় পৌঁছে গেছ,’ উপর থেকে উৎফুল্ল কণ্ঠে বললো প্যাট। ‘কী বলার আছে তোমার, জো? তোমার এই দুর্দান্ত আরোহণের বিষয়ে কোনো মন্তব্য? মানব জাতির ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ আরোহণ। না, ঠিক বলিনি। ওয়েন্ডি, আল, এডি আর ফ্রেড জাফস্কি এই কঠিন কাজটা তোমার আগে করে ফেলেছে। কিন্তু একমাত্র এটাই আমি স্বচক্ষে দেখতে পেলাম।’
‘আমাকেই কেন বেছে নিলে?’ জিজ্ঞেস করলো সে।
‘আমি তোমার পরিণতি দেখতে চেয়েছিলাম, জো। জুরিখে তোমার অত্যন্ত নিকৃষ্ট মানের পরিকল্পনার কারণে। সেদিন রাতে ওয়েন্ডি রাইটকে নিয়ে হোটেল কামরায় রাত কাটানোর জন্যে। আর আজ রাতে পরিস্থিতি হবে অন্য রকম। তুমি একা থাকবে।’
‘ঐ রাতেও আমি একা ছিলাম।’ প্রচণ্ড কাশির দমকে পুরো শরীরে খিঁচুনি শুরু হয়ে গেল তার। মুখের ভেতর থেকে প্রবল বেগে ছিটকে বেরোলো শ্লেষ্মা। অবশিষ্ট শক্তিটুকু অপ্রয়োজনীয় খাতে নষ্ট হলো।
‘মেয়েটা ওখানেই ছিলো। তোমার বিছানাতে না, কিন্তু কামরার ভেতরেই কোনো এক জায়গায়। যদিও তুমি তার আগেই ঘুমিয়ে পড়েছিলে।’ হাসলো প্যাট।
‘আমি চেষ্টা করছি যেন কাশি না আসে,’ জো বললো। আরো দুই ধাপ উঠলো সে, বুঝতে পারলো যে প্রায় চূড়ায় পৌঁছে গেছে। কতক্ষণ ধরে সে এভাবে সিঁড়ি বাইছে? তার পক্ষে বলা অসম্ভব।
তারপর প্রচণ্ড আতঙ্কে সে আবিষ্কার করলো, পুরোপুরি নিঃশেষ হওয়ার পাশাপাশি ভয়াবহ শীতলতা তাকে আঁকড়ে ধরেছে। এটা কখন ঘটলো? জিজ্ঞেস করলো নিজেকে। অতীতের কোনো এক সময়ে? এই শীতলতা এত ধীরে ধীরে অনুপ্রবেশ করেছে যে এক মুহূর্ত আগেও সে তা লক্ষ করেনি। ঈশ্বর! নিজেকে বললো সে। সেই সাথে ভয়ংকরভাবে কাঁপতে লাগলো। হাড়গুলো পর্যন্ত কাঁপছে। চাঁদে যে অবস্থা হয়েছিলোর চেয়েও খারাপ অবস্থা। অনেক বেশি খারাপ। জুরিখের হোটেল কামরায় যে শীতলতা ভেসে ছিলো, তার চেয়েও। ওগুলো ছিলো পূর্বাভাস।
বিপাক, মনে মনে বিশ্লেষণ করছে সে, একটা জ্বলন্ত প্রক্রিয়া, একটা সক্রিয় চুল্লি। যখন এটি কাজ করা বন্ধ করে দেয়, জীবন শেষ হয়ে যায়। নরক সম্পর্কে এতদিন যা শুনেছে সে তার সবই ভুল। নরক ঠান্ডা; ওখানে যা কিছু আছে তার সবই ঠান্ডা। শরীর মানে হচ্ছে ওজন আর তাপ। ওজন আমার জন্য এমন এক শক্তি যেটার জন্য আমি মারা যাচ্ছি। আর তাপ, আমার শরীরের তাপ শেষ হয়ে যাচ্ছে। পুনর্জন্ম না হলে এই তাপ আর কখনো ফিরে আসবে না। এটাই মহাবিশ্বের নিয়তি। তবে আমাকে অন্তত একা থাকতে হবে না।
কিন্তু সে একা অনুভব করছে। অনুভূতিটা খুব দ্রুত ওকে গ্রাস করে নিচ্ছে, বুঝতে পারলো সে। সঠিক সময় এখনো আসেনি। কিছু একটা তাড়াহুড়ো করছে—কোনো অদৃশ্য শক্তি ঘটনার গতি ত্বরান্বিত করছে। শুধু বিদ্বেষ আর কৌতূহলের বশে পুরো ঘটনা অবলোকন করছে বহুরূপী, বিকৃত মানসিকতার কিছু একটা। স্বল্প বুদ্ধির প্রতিবন্ধী এক সত্তা উপভোগ করছে পুরো ঘটনা। এটা আমাকে বাঁকানো পায়ের পোকার মতো পিষে ফেলেছে, নিজেকে বললো সে। একটি ক্ষুদ্র পতঙ্গ যা মাটিকে আলিঙ্গন করা ছাড়া আর কিছুই করেনি। যা কোনোদিন উড়তে পারবে না অথবা পালাতেও পারবে না। কেবল ধাপে ধাপে নেমে যেতে পারে নোংরা নর্দমায়। নেমে যেতে পারে এক সমাধি জগতে যেখানে বিকৃত এক সত্তার চারপাশ ঘিরে আছে নোংরা কীট, যাকে তারা সবাই চেনে প্যাট হিসেবে।
‘চাবি আছে তোমার কাছে?’ প্যাট জিজ্ঞেস করলো। ‘তোমার কামরার? ভেবে দেখো, এত কষ্ট করে তিন তলায় উঠে এসে দেখলে যে চাবি হারিয়ে ফেলেছ, কামরায় ঢুকতে পারছো না। কেমন ভয়াবহ অবস্থা হবে?’
‘চাবি আছে আমার কাছে।’ পকেট হাতড়াতে লাগলো সে।
তার পরনের কোট ছেঁড়া, সাথে অসংখ্য ফুটো। ওটা আপনা-আপনি খসে পড়লো শরীর থেকে, সেই সাথে উপরের পকেট থেকে পিছলে পড়লো চাবিটা। নেমে গেল দুই ধাপ নিচে, নাগালের বাইরে।
‘আমি এনে দিচ্ছি,’ প্রাণবন্ত সুরে বললো প্যাট। তাকে পার হয়ে নিচে নেমে চাবিটা তুললো। আলোর দিকে তুলে ধরলো ভালো করে দেখার জন্য। তারপর সিঁড়ির একেবারে উপরে নামিয়ে রাখলো, রেলিঙের উপর।
‘এখানে রাখলাম,’ সে বললো, ‘যেখানে তুমি খুব সহজেই পাবে, সিঁড়ি বেয়ে তোমার আরোহণ শেষ হলেই। এটা তোমার পুরস্কার। কামরাটা সম্ভবত বাম দিকে। হল দিয়ে গেলে চারটা দরজা পরে। তোমাকে ধীরে ধীরে আসতে হবে। তবে সিঁড়ি বেয়ে ওঠা শেষ হলেই তখন অনেক সহজ হয়ে যাবে। তখন তোমাকে আর আরোহণ করতে হবে না।’
‘আমি দেখতে পাচ্ছি,’ সে বললো। ‘চাবি আর শেষ মাথা। আমি দেখতে পাচ্ছি সিঁড়ির শেষ ধাপ।’ দুই হাতে সিড়ির রেলিঙের আড়াআড়ি দণ্ড আঁকড়ে ধরে সে নিজেকে উপরে টেনে তুললো; তিন ধাপ, অমানুষিক বেদনাদায়ক শক্তি ব্যয় করে। বুঝতে পারলো এই প্রচেষ্টা তাকে পুরোপুরি নিঃশেষ করে ফেলছে; তার দেহের ওজন আরো বেড়ে গেল, তার ঠান্ডা বেড়ে গেল, তার প্রাণশক্তি ফুরিয়ে গেল। কিন্তু—
উপরে উঠে আসতে পেরেছে সে।
‘বিদায়, জো,’ প্যাট বললো। তার সামনে ঝুঁকে আছে সে, কিছুটা হাঁটু গেড়ে যেন জো তার মুখটা দেখতে পারে। ‘তুমি নিশ্চয়ই চাও না যে ডন ড্যানি তাড়াহুড়ো করে তোমার কামরায় চলে আসুক, তাই না? কোনো ডাক্তার তোমাকে সাহায্য করতে পারবে না। তাই আমি তাকে বলবো যে হোটেলের লোকদের সাহায্যে আমি একটা ক্যাব ডেকে এনেছি। আর এই মুহূর্তে তুমি শহরের অন্য প্রান্তে একটা হাসপাতালের পথে রয়েছ। তাহলে কেউ আর তোমাকে বিরক্ত করতে পারবে না। তুমি পুরোপুরি নিজের মতো থাকতে পারবে। তুমি একমত?’
‘হ্যাঁ,’ জো বললো।
‘এই নাও চাবি।’ ঠান্ডা ধাতব বস্তুটা হাতে দিয়ে ওটার চারপাশে জোয়ের আঙুলগুলো বন্ধ করে দিলো সে। ‘পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক না কেন সাহস হারিও না—১৯৩৯ সালের প্রচলিত একটা কথা। সব সময় সতর্ক থাকবে। এরকম একটা কথাও বলা হয়ে থাকে প্রায়ই।’
দূরে সরে গেল সে, ওখানেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তাকে দেখলো গভীর দৃষ্টিতে। তারপর নিচে নেমে হলের মাঝ দিয়ে এগোলো এলিভেটরের দিকে। প্যাটকে একটা বোতামে চাপ দিতে দেখলো জো, অপেক্ষা করছে। দুপাশে সরে গিয়ে দরজা উন্মুক্ত হলো, তারপর এলিভেটরের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল প্যাট।
চাবিটা মুঠোয় নিয়ে টেনেহিঁচড়ে নিজেকে কোমর বাঁকা করে দাঁড়ানোর মতো একটা অবস্থায় তুলে আনলো জো। করিডরের একপাশের দেয়ালে হেলান দিয়ে তাল সামলালো। তারপর বাম দিকে ঘুরে এক পা এক পা করে হাঁটা শুরু করলো। এখনো দেয়ালের সাহায্যে নিজের ভারসাম্য বজায় রেখেছে। অন্ধকার, ভাবলো সে। এখানে কোনো আলো নেই। চাপ দিয়ে চোখদুটো বন্ধ করলো সে, আবার খুললো, পিটপিট করলো। কপাল বেয়ে নামা ঘাম এখনো তাকে অন্ধ করে রেখেছে। ও বলতে পারবে না করিডরটা কি আসলেই অন্ধকার নাকি তার দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসছে।
প্রথম দরজার কাছে পৌঁছানোর আগেই পুরোপুরি হামাগুড়ি দিয়ে চলতে বাধ্য হলো সে। মাথা সামান্য বাঁকা করে উপরের দরজার নাম্বার দেখার চেষ্টা করলো। না, এটা না। হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে চললো সে।
সঠিক দরজাটা খুঁজে পেলে তাকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে। স্থির থাকতে হবে ফুটোয় চাবি ঢোকানোর জন্য। সেই চেষ্টা করতে গিয়ে প্রায় পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে গেল সে। চাবিটা এখনো তার হাতে, ভূপাতিত হলো সে। মাথা বাড়ি খেলো দরজায় আর সে মুখ থুবড়ে পড়লো ধূলিধূসরিত কার্পেটের উপর। নাকে আসছে নিশ্চিত মৃত্যুর সোঁদা গন্ধ। আমি কামরায় ঢুকতে পারবো না, বুঝতে পারলো সে। আমি আর দাঁড়াতেই পারবো না।
কিন্তু তাকে পারতেই হবে। এখানে কেউ তাকে দেখে ফেলতে পারে। দরজার নব আঁকড়ে ধরে নিজেকে আবার দুপায়ের উপর দাঁড় করালো। কম্পিত হাতে নবের ফুটোয় চাবি ঢোকানোর সময় শরীরের পুরো ওজন চাপিয়ে দিলো দরজার উপর। এইভাবে চাবিটা ঘোরানোর পর দরজা যখন খুলবে সে ভেতরে আছড়ে পড়বে। তারপর কোনোভাবে যদি দরজাটা বন্ধ করতে পারি, বিছানায় গিয়ে উঠতে পারি, অবসান হবে এই যন্ত্রণার।
খুট করে একটা শব্দ হলো। খুলে গেল দরজা, আর সে সামনে এগোলো হোঁচট খেয়ে। হাতদুটো সামনের দিকে প্রসারিত। মেঝেটা উঠে এলো তার দিকে, আর সে কার্পেটের খুঁটিনাটি সবকিছুই দেখতে পেল। লাল আর সোনালি বর্ণের ফুল-লতা-পাতার জটিল নকশা। অসম্ভব রুক্ষ আর বহু ব্যবহারে মলিন। রংগুলো বিবর্ণ হয়ে গেছে। মেঝেতে হুমড়ি খেয়ে পড়লেও খুব সামান্যই ব্যথা পেল। সে ভাবলো, এটা অনেক পুরোনো কামরা। যখন এই হোটেলটা প্রথম তৈরি হয়েছিল তখন হয়তো তারা লোহার তৈরি খাঁচার মতো এলিভেটর ব্যবহার করতো। কিন্তু আমি সত্যিকার এলিভেটর দেখেছি, নিজেকেই বললো সে, নির্ভরযোগ্য, আসল।
বেশ অনেকটা সময় মেঝেতে শুয়ে রইলো সে। তারপর আচমকাই সচকিত হলো। যেন জরুরি তলব পেয়েছে গতিশীল হওয়ার জন্য। হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠলো জো। হাতের তালুদুটো সমতলভাবে ছড়িয়ে আছে সামনের মেঝেতে। আমার হাত, বিস্মিত হয়ে ভাবলো সে, হায় ঈশ্বর! শুষ্ক দুটো হাত, হলুদ আর হাড়গিলে, রান্না করা, শুকনো টার্কির পশ্চাদদেশের মতো। ছোট ছোট শক্ত লোমে আবৃত ত্বক, মানুষের ত্বক বলে মনে হয় না। অনেকটা নতুন জন্ম নেওয়া পাখির ছানার মতো, যেন আমি লক্ষ লক্ষ বছর পূর্বের এমন কোনো প্রাণীতে বিকশিত হয়েছি যেটা আকাশে উড়ে বেড়াতো আর মাটিতে নেমে আসতো নিজের ডানাদুটোকে পাল হিসেবে ব্যবহার করে।
চোখ খুলে বিছানাটার অবস্থান চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে সে। দূরের জানালার ভারী পর্দার ফাঁক দিয়ে ধূসর আলো ঢুকছে। লম্বা আর বাঁকানো পায়ার কদাকার ড্রেসিং টেবিলটার পরেই বিছানা। পা আর মাথার কাছের রেলিঙের চারকোণায় চারটে পিতলের গোলক; দুমড়ানো, মোচড়ানো, বোঝাই যায় বছরের পর বছর ব্যবহারের কারণে এই অবস্থা হয়েছে। মাথার দিকে রং করা অসমতল কাঠের বোর্ড। তারপরও আমি ওখানে শুতে চাই, নিজেকে বললো সে। বিছানার দিকে এগোচ্ছে, টেনেহিঁচড়ে কামরার আরো ভেতরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে নিজেকে।
ঠিক তখনই তুলোঠাসা বিশাল চেয়ারে বসে থাকা একটা কাঠামো দেখতে পেল সে। ঠিক তার মুখোমুখি। একজন দর্শক, যে এতক্ষণ কোনো সাড়াশব্দ করেনি। কিন্তু এই মুহূর্তে দ্রুত এগিয়ে আসছে তার দিকে। গ্লেন রানসাইটার।
সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় তোমাকে সাহায্য করতে পারিনি, রানসাইটার বললেন। তার ভারী মুখ কঠিন হয়ে আছে। ‘ও হয়তো আমাকে দেখে ফেলতো। সবচেয়ে বড় কথা, আমি ভয় পাচ্ছিলাম, সে তোমার সাথে এই কামরা পর্যন্ত চলে আসে কি না। তাহলে আমরা আরো বড় সমস্যায় পড়তাম। কারণ সে—’ মাঝপথে থামলেন তিনি, ঝুঁকে জোকে তুলে দুপায়ের উপর দাঁড় করালেন যেন জোয়ের কোনো ওজনই নেই। নেই সেইসব উপাদান যেগুলো দিয়ে তার দেহ গঠিত হয়েছে। ‘এই বিষয়ে আমরা পরে কথা বলবো। এখানে এসো।’ জোকে তিনি প্রায় কোলে করেই কামরার অন্য প্রান্তে নিয়ে গেলেন—বিছানাতে নয়, বরং তুলোঠাসা চেয়ারের দিকে, যেটাতে তিনি নিজে বসেছিলেন। ‘তুমি কি আর মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত টিকে থাকতে পারবে?’ রানসাইটার জিজ্ঞেস করলেন। ‘আমি দরজার তালা বন্ধ করতে চাই। যদি প্যাট মত পরিবর্তন করে এখানে চলে আসে।’
‘হ্যাঁ,’ বললো জো।
মাত্র তিনটা বড় পদক্ষেপে দরজার কাছে পৌঁছে গেলেন রানসাইটার। শব্দ করে দরজা তালাবদ্ধ ফিরে এলেন জোয়ের কাছে। পুরোনো যুগের টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটা স্প্রে ক্যান বের করে আনলেন। যার চকচকে গায়ে উজ্জ্বল ডোরাকাটা দাগ। অসংখ্য রঙিন বেলুনের ছবি আর চোখ ধাঁধানো বর্ণবিন্যাস বস্তুটাকে অন্য একরকম মাহাত্ম্য দিয়েছে। ‘উবিক,’ রানসাইটার বললেন। ক্যানটাকে ঝাঁকালেন প্রবলভাবে। তারপর জোয়ের সামনে দাঁড়ালেন, তার দিকে লক্ষ্য স্থির করে। ‘এর জন্য আমাকে ধন্যবাদ দেওয়ার দরকার নেই,’ তিনি বললেন। তারপর দীর্ঘ সময় ধরে বামে এবং ডানে স্প্রে করলেন।
বাতাসে দেখা গেল বিদ্যুৎচমকের মতো একটা ঝলকানি, তারপর চারপাশটা ঝলমল করতে লাগলো, যেন আলোর উজ্জ্বল পরমাণুগুলো মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। মনে হলো যেন সূর্যের শক্তি জ্বলজ্বল করছে এই প্রাচীন হোটেলের জীর্ণ কামরায়।
‘কিছুটা ভালো বোধ করছো? তোমার উপর তাৎক্ষণিকভাবে কাজ শুরু করার কথা। ইতোমধ্যে তোমার উপর প্রতিক্রিয়া শুরু হওয়া উচিত।’ একরাশ উদ্বেগ নিয়ে জোয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি।
