অধ্যায় ৩
ইন্সট্যান্ট উবিকে পাবেন সদ্য প্রস্তুতকৃত ধোঁয়া ওঠা কফির তরতাজা স্বাদ আর সুগন্ধ। আপনার স্বামী বলতে বাধ্য হবে, ঈশ্বর! স্যালি, আমি ভেবেছিলাম তোমার বানানো কফির স্বাদ মোটামুটি, কিন্তু এ তো দেখছি তুলনাহীন! নির্দেশনা অনুযায়ী তৈরি করলে সম্পূর্ণ নিরাপদ।
.
একরাশ ক্লান্তি আর অবসাদ নিয়ে রান্নাঘরে এসে একটা টুলে বসলো জো চীপ, তখনো তার পরনে ছিলো সঙের মতো রংচঙে পিনস্ট্রাইপ পায়জামা। সিগারেট ধরানোর পর একটা ডাইম ঢোকালো সম্প্রতি ভাড়া করে আনা খবরযন্ত্রে। হ্যাংওভার কাটেনি এখনো, ঐ অবস্থাতেই উদ্দেশ্যহীনভাবে আন্তঃগ্রহ সংবাদে ডায়াল ঘোরাতে লাগলো, মাঝে মাঝে থামলো স্থানীয় সংবাদে নজর বোলানোর জন্য। অবশেষে বেছে নিলো রসাত্মক আর রটনামূলক সংবাদ।
‘জি, স্যার,’ খোশমেজাজি সুরে বললো খবরযন্ত্র। ‘রসাত্মক আর রটনামূলক সংবাদ। ভাবতে পারেন, স্ট্যান্টন মিক, নিভৃতচারী আর প্রতিটি গ্রহে সুপরিচিত স্পেকুলেটর এবং বিনিয়োগকারী, এই মুহুর্তে ঠিক কী করতে যাচ্ছেন?’ অদ্ভুত কিছু শব্দ শোনা গেল যন্ত্রের ভেতরে। স্লট থেকে ছাপানো এবং মোড়ানো একটা রঙিন কাগজের রোল বেরিয়ে এলো; ছিটকে বেরোনো কাগজটা চাররঙা, তাতে ছাপানো অক্ষরগুলো সুস্পষ্ট আর ঝকঝকে। সেগুন কাঠের টেবিলের উপর দিয়ে কাগজটা গড়িয়ে পড়লো মেঝেতে। প্রচণ্ড ব্যথায় মাথা দপদপ করছে জো চীপের, কষ্ট করে মেঝে থেকে কাগজটা তুলে টেবিলের উপর বিছালো সমান করে।
> **বিশ্ব ব্যাংকের কাছে দুই ট্রিলিয়ন আর্থিক সহায়তা চেয়েছেন মিক (এপি) লন্ডন**
>
> নিভৃতচারী এবং প্রতিটি গ্রহে সুপরিচিত স্পেকুলেটর ও বিনিয়োগকারী স্ট্যান্টন মিক কী পরিকল্পনা করছেন? হোয়াইট হল থেকে ফাঁস হওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবসায়িক মহলে এখন এই নিয়ে চলছে বিস্তর জল্পনা-কল্পনা। আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী এবং পাগলাটে এই শিল্পপতি, যে কিনা একসময় বিনামূল্যে মহাকাশযানের বহর নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যার মাধ্যমে ইসরায়েল মঙ্গল গ্রহের মরুভূমি অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে সেখানে চাষাবাদ করতে পারবে, সেই তিনিই বিশ্ব ব্যাংকের কাছে বিস্ময়কর এবং নজিরবিহীন পরিমাণের ঋণ সহায়তা চেয়েছেন। আর হয়তো তার আবেদন…
‘এটা মোটেও রসালো গুজব না,’ খবরযন্ত্রের উদ্দেশে বললো জো চীপ। ‘এটা ব্যবসায়িক লেনদেনের জল্পনা-কল্পনা। আজকে আমি পড়তে চাই, কোন তারকা কার মাদকাসক্ত বউকে নিয়ে বিছানায় গেছে।’ বরাবরের মতোই রাতে তার ভালো ঘুম হয়নি, অন্তত আরইএম স্লিপ—মানে রেপিড আই মুভমেন্ট স্লিপের ভিত্তিতে হিসেব করলে তা-ই। ঘুমের ঔষধ সেবন করা থেকে বাধ্য হয়েই নিজেকে বিরত রাখতে হয়েছে; কারণ অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও এটাই সত্যি, তার শক্তিবর্ধক ঔষধের সাপ্তাহিক সরবরাহ, যা কোনঅ্যাপ্ট ভবনের স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত ঔষধের দোকান থেকে সরবরাহ করা হয়, তা ফুরিয়ে গেছে। অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে এর জন্য দায়ী তার নিজের বেপরোয়া আর স্বেচ্ছাচারী স্বভাব। কিন্তু সে যাই হোক, তার কাছে এখন কিছু নেই। প্রচলিত আইন অনুযায়ী, আগামী মঙ্গলবারের আগে ঔষধের দোকানে যেতে পারবে না সে। আরো দুদিন অপেক্ষা করতে হবে, দীর্ঘ দুটো দিন।
খবরযন্ত্র বললো, ‘চটুল রসাত্মক খবরের জন্য ডায়াল সেট করুন।’ তাই করলো সে, আর সাথে সাথে গোল করে পাকানো আরেকটা কাগজ বেরোলো যন্ত্র থেকে; লোলা হার্জবার্গ—রাইটের চমৎকার ক্যারিক্যাচার দেখা যাচ্ছে তাতে, দাঁড়িয়ে আছে দুষ্টু একটা ভঙ্গিতে, যা দেখে সন্তুষ্টির সাথে ঠোঁট চাটলো জো, এরপর ছাপানো অক্ষরের উপর নজর দিলো।
> লোলা হার্জবার্গ—রাইটের এক আঘাতে উত্ত্যক্তকারী কুপোকাত। ঘটনাটি ঘটেছে গতকাল রাতে নিউ ইয়র্কে। এক জাঁকজমকপূর্ণ পার্টি শেষে যখন অবাঞ্চিত ব্যক্তি নিরাপত্তা বেষ্টনীর ফাঁক গলে তার কাছাকাছি চলে আসে, তখন লোলা হার্জবার্গের ডান হাতের এক আঘাতে ঐ ব্যক্তি হুমড়ি খেয়ে পড়ে একটা টেবিলের উপর। সেখানে বসেছিলেন সুইডেনের রাজা ইয়ন গ্রোয়াট, আর তার সাথে ছিলো নাম না জানা এক সুন্দরী, যার—
কর্কশ শব্দে তার কোনঅ্যাপ্ট ভবনের দরজায় লাগানো যান্ত্রিক ঘণ্টি বেজে উঠতেই চমকে মুখ তুললো জো। দেখতে পেল আধখাওয়া সিগারেটের আগুন আরেকটু হলেই সেগুন কাঠের টেবিলের ফর্মিকা পুড়িয়ে দিতো। কোনোমতে সেটা সামলে হাতের নাগালের মধ্যে দরজার কপাটের সাথে যুক্ত স্পিকটিউব চালু করলো। ‘কে?’ ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় জিজ্ঞেস করলো জো; হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো আটটা বাজেনি তখনো। সম্ভবত ভাড়া আদায়ের রোবট, ভাবলো সে। অথবা কোনো পাওনাদার। দরজা খোলার বোতামটা চালু করেনি অবশ্য।
স্পিকারে শোনা গেল অতি উৎসাহী এক পুরুষের উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ। ‘বুঝতে পারছি একেবারে সকালবেলাতেই চলে এসেছি, জো, আসলে এইমাত্র শহরে ফিরে এলাম। জি. জি. অ্যাশউড বলছি। টপিকাতে পুরোপুরি ভিন্ন ধরনের এক প্রতিভা আবিষ্কার করেছি আমি। আমার পর্যবেক্ষণে সেটা অত্যন্ত উঁচু মানের। রানসাইটারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগে তোমার সাহায্যে আরো নিশ্চিত হতে চাই। ওহ, ভালো কথা, রানসাইটার এখন সুইজারল্যান্ডে।’
‘আমার পরীক্ষণ-যন্ত্রগুলো এখানে নেই,’ জো বললো।
‘আমি নিজে গিয়ে দোকান থেকে এখানে নিয়ে আসছি।’
‘ওগুলো দোকানেও নেই,’ বাধ্য হয়ে স্বীকার করলো জো। ‘আমার গাড়িতে রয়ে গেছে। গত রাতে আর নামানোর সময় পাইনি।’ আসল কথা হচ্ছে, গত রাতে আমোদ-প্রমোদে এতটাই আচ্ছন্ন ছিলো যে উড়াল গাড়ি থেকে যন্ত্রগুলো বের করার কথা একেবারেই মনে ছিলো না। ‘নয়টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারবে না?’ বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো সে। জি. জি. অ্যাশউডের অস্থির আর পাগলাটে উচ্ছ্বাস এমনকি দুপুরবেলাতেও তাকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়… আর, এখন সকাল সাতটা চল্লিশেও ব্যাপারটা তার কাছে পুরোপুরি অসহ্য মনে হচ্ছে। সত্যি বলতে কী, ব্যাপারটা পাওনাদারদের মুখোমুখি হওয়ার চেয়েও বিরক্তিকর।
‘চীপ, ভাই আমার, পরিমাপ করার সময় খুব মিষ্টি একটা সংখ্যা আসবে, যা অবিশ্বাস্য ঘটনার জ্বলজ্যান্ত প্রদর্শনী। এমনকি এটা পরিমাপ করার সময় তোমার যন্ত্রের কাঁটাগুলো পর্যন্ত বেঁকে যাবে। সবচেয়ে বড় কথা, এটা আমাদের প্রতিষ্ঠানকে দেবে নতুন প্রাণ, যা এই মুহূর্তে ভীষণ প্রয়োজন। আর তাছাড়া—’
‘তোমার এই নতুন আবিষ্কার কোন ধরনের শক্তির বিরুদ্ধে কাজ করবে?’ জো চীপ জিজ্ঞেস করলো। ‘টেলিপ্যাথ?’
‘আমি তোমাকে সামনাসামনি দেখাবো,’ জি. জি. অ্যাশউড প্রতিশ্রুতি দিলো। ‘আমি নিজেও এখনো ঠিকমতো বুঝতে পারিনি। শোনো, চীপ,’ কণ্ঠস্বর নিচু করলো অ্যাশউড। ‘বিষয়টা অত্যন্ত গোপনীয়, বিশেষ করে এটা। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে পারবো না, কেউ না কেউ শুনে ফেলবে। সত্যি বলতে কী, অ্যাপ্টের নিচের স্তরে আমি এরই মধ্যে বেশ কিছু অদ্ভুত চিন্তাতরঙ্গ টের পাচ্ছি। সে—’
‘ঠিক আছে,’ হাল ছেড়ে দিয়ে বললো জো চীপ। একবার শুরু করলে জি. জি. অ্যাশউডের বকবকানি থামায় সাধ্য কার। তার কথামতো কাজ করাই বরং উত্তম। ‘পাঁচ মিনিট সময় দাও, আমি তৈরি হয়ে নিচ্ছি, আর দেখি ঘরের কোথাও কফি আছে কি না।’ অস্পষ্টভাবে মনে পড়ছে গত রাতে কোনঅ্যাপ্টের সুপার মার্কেট থেকে কিছু কেনাকাটা করেছিলো সম্ভবত, বিশেষ করে মনে পড়ছে সবুজ রেশন স্ট্যাম্পের কথা, যার অর্থ হতে পারে কফি অথবা চা নইলে সিগারেট কিংবা আমদানিকৃত অন্য কোনো বিলাসবহুল দ্রব্য।
‘মেয়েটাকে তোমার পছন্দ হবে,’ জি. জি. অ্যাশউড উৎসাহ দেওয়ার সুরে বললো। ‘যদিও, বরাবর যেমনটা হয়ে থাকে আর কি, মেয়েটা এমন পিতা-মাতার সন্তান—’
‘মেয়ে?’ সচকিত হয়ে বললো জো চীপ। ‘আমার অ্যাপ্ট ভীষণ নোংরা হয়ে আছে, ভবন পরিষ্কার করার রোবটদের পাওনা বকেয়া হয়ে আছে অনেক দিন ধরে, দিতে পারছি না। গত দুই সপ্তায় আমার এখানে একবারও আসেনি ওরা।’
‘আমি জিজ্ঞেস করে দেখছি মেয়েটার কোনো আপত্তি আছে কি না।’
‘জিজ্ঞেস করতে হবে না। আমার আপত্তি আছে। আমি ওকে অফিসে পরীক্ষা করে দেখবো, রানসাইটার যখন সময় দিতে পারবে তখন।’
‘আমি মেয়েটার মাইন্ড রিড করেছি, ওর কোনো আপত্তি নেই।’
‘ওর বয়স কতো?’ হয়তো বাচ্চা একটা মেয়ে, ভাবলো সে। নতুন আর সম্ভাবনাময় ইনার্শিয়ালদের অনেকেই ছোট বাচ্চা। সিওনিক বাবামায়ের কাছ থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তাদের ভেতর এই ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে।
‘এই মেয়ে, তোমার বয়স কত?’ জি. জি. অ্যাশউড জিজ্ঞেস করলো। মেয়েটাকে প্রশ্ন করার জন্য পেছন ফিরে তাকাতে হলো তাকে, যে কারণে কিছুটা অস্পষ্ট শোনালো তার কণ্ঠ। ‘উনিশ,’ জো চীপকে জানালো সে।
বাহ, চমৎকার তো! এবার সে কৌতূহলী হয়ে উঠেছে। জি. জি. অ্যাশউডের ফুর্তিবাজ স্বভাব আর সব সময় ফিটফাট থাকার কারণে সুন্দরী মেয়েরা বরাবরই তার প্রতি আকৃষ্ট হয়। এই মেয়েটা হয়তো তেমনই একজন। ‘পনেরো মিনিট সময় দাও আমাকে,’ ও বললো। যদি দ্রুত কাজ করে এবং পরিষ্কার করার একটা ব্যবস্থা করতে পারে, আর কফি ও সকালের নাস্তা দুটোই বাদ দেয়, তাহলে ঐ সময়ের মধ্যে বাসস্থানটা মোটামুটি পরিপাটি করে তুলতে পারবে। অন্তত চেষ্টা করে দেখা যায়।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলো জো। তারপর রান্নাঘরে ঝাড়ু অথবা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার—স্বয়ংক্রিয় অথবা হস্তচালিত—আছে কি না খুঁজতে লাগলো। কোনোটাই নেই। নিঃসন্দেহে ভবনের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কখনোই তার নামে কোনো ধরনের পরিষ্কারক যন্ত্রপাতি বরাদ্দ করেনি। যাচ্ছেতাই একটা অবস্থা, ব্যাপারটা এইমাত্র আবিষ্কার করে মনে মনে ভাবলো। অথচ চার বছর ধরে এখানে বসবাস করছে সে।
ভিডফোনে ২১৪ নাম্বারে ডায়াল করলো, ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ সার্কিটের বর্ধিত নাম্বার এটা। ‘শোনো,’ অপর প্রান্ত থেকে একঘেয়ে সুরে জবাব পাওয়ার সাথে সাথে বললো সে। ‘আমার কাছে এখন পর্যাপ্ত তহবিল আছে, যা দিয়ে ভবন পরিষ্কার করার রোবটদের পাওনা পরিশোধ করতে পারবো। আমি চাই ওরা এখনই আমার অ্যাপ্টে আসবে, এবং কাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আমি সকল পাওনা মিটিয়ে দেবো।’
‘স্যার, ওরা কাজ শুরু করার আগেই আপনাকে সকল বকেয়া পাওনা পরিশোধ করতে হবে।’
এরই মধ্যে জো তার ওয়ালেট থেকে অনেকগুলো রশিদ বের করে এনেছে, সেখান থেকে সবগুলো ম্যাজিক ক্রেডিট কি আলাদা করে নিলো—এগুলোর অধিকাংশেরই অনেক আগেই মেয়াদ পেরিয়ে গেছে। এটাই হয়তো চিরন্তন সত্য, আর্থিক সচ্ছলতার সাথে তার আদায় কাঁচকলায় সম্পর্ক, আর পাহাড় সমান দেনায় ডুবে থাকাই যেন তার নিয়তি। ‘আগের বকেয়াসমূহ আমি ট্রায়াংগুলার ম্যাজিক কি দিয়ে পরিশোধ করবো,’ অদেখা কণ্ঠস্বরকে আশ্বস্ত করলো সে। ‘তখন তোমার আর কোনো দায়বদ্ধতা থাকবে না; হিসাবের খাতায় দেখাবে সব বকেয়া পরিশোধ করা হয়েছে।’
‘সেই সাথে জরিমানা এবং ক্ষতিপূরণ।’
‘ওগুলোর জন্য আমি আমার হার্ট শেপড—’
‘মি. চীপ, ফেরিস অ্যান্ড ব্রোকম্যান রিটেইল ক্রেডিট অডিটিং অ্যান্ড অ্যানালাইসিস এজেন্সি আপনাকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করেছে। মাত্র গতকাল আমাদের রিসিপ্ট স্লট সেটা পেয়েছে। ঐ প্রতিবেদনে যা লেখা আছে তা আমাদের স্মৃতিতে এখনো তরতাজা। জুলাই মাস থেকে আপনার ক্রেডিট রেটিং তিন জি থেকে চার জি হয়েছে। আমাদের বিভাগ—সত্যি বলতে কী, এই পুরো কোনঅ্যাপ্ট ভবন—রি-প্রোগ্রাম করা হয়েছে। ফলে এখন থেকে আপনার মতো যারা দেনার দায়ে অত্যন্ত করুণ অবস্থায় আছেন, তাদের জন্য সেবা কিংবা ক্রেডিট ব্যবস্থা আর বর্ধিত করা হবে না, স্যার। বিশেষ করে আপনার ক্ষেত্রে। এখন থেকে আপনাকে সকল সেবা তাৎক্ষণিক নগদ পরিশোধের মাধ্যমে নিতে হবে। আর আপনাকে হয়তো বাকি জীবন এভাবে নগদ পরিশোধের মাধ্যমেই প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণ করতে হবে। আরো পরিষ্কার করে বললে—’
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলো সে। লোভ দেখিয়ে বা ভয় দেখিয়ে ভবন পরিষ্কার করার রোবটগুলোকে তার অগোছালো অ্যাপ্টে আনার আশা পরিত্যাগ করতেই হলো। সময় নষ্ট না করে শোবার কামরায় ঢুকলো পোশাক পালটানোর জন্য; অন্তত এই কাজটা সে কারো সাহায্য ছাড়াই করতে পারবে।
একটা পিঙ্গল বর্ণের কাজের পোশাক পরলো সে, সাথে ঝিকমিকে টার্নড আপ সু এবং ট্যাসেল লাগানো ফেল্টের টুপি। রান্নাঘরে এসে কফি খুঁজতে শুরু করলো। নেই। বসার ঘরে মনোযোগ দিতেই পাওয়া গেল বস্তাটা, বাথরুমে যাওয়ার পথে যে দরজা আছে সেটার ঠিক পাশে। গত রাতে যা কিনে এনেছিলো—সাদার মাঝে নীল ছোপ দেওয়া প্যাকেট আর একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ। ওতে আছে আধা পাউন্ড খাঁটি কেনিয়ান কফির ক্যান, যা সে হয়তো শুধু বিশেষ কোনো খুশির দিনেই উপভোগ করতো। বিশেষ করে তার বর্তমান আর্থিক দুর্দশা বিবেচনা করলে।
রান্নাঘরে ফিরে পোশাকের পকেটগুলো খুঁজে দেখতে লাগলো কোনো ডাইম আছে কি না। অবশেষে পাওয়া গেল একটা। সেটা দিয়ে কফিপট চালু করলো। গন্ধ শুঁকে তার কাছে একটু অন্য রকম মনে হলো যদিও। আবারও তাকালো ঘড়ির দিকে, দেখলো এরই মধ্যে পনেরো মিনিট পার হয়ে গেছে; আর তাই সময় নষ্ট না করেই কোনঅ্যাপ্টের প্রবেশ করার দরজার দিকে এগোলো দ্রুত পায়ে, নব ঘুরিয়ে রিলিজ বোল্টে টান দিলো।
কিন্তু খুলতে অসম্মতি জানালো দরজা। বললো, ‘পাঁচ সেন্ট লাগবে।’
আবারও পকেটগুলোতে খুঁজে দেখলো জো। আর কোনো কয়েন নেই; আসলে কিছুই নেই। ‘আগামীকাল দেবো,’ দরজার উদ্দেশে বললো সে। আবারও নব ঘোরানোর চেষ্টা করলো। দরজাটাও নাছোড়বান্দা, আটকেই রইলো। ‘আমি তোমাকে যা দেই সেটা বখশিস হিসেবেই দেই,’ দরজাটাকে জানালো সে। ‘তোমাকে আমার কোনো মূল্য পরিশোধ করার প্রয়োজন নেই।’
‘কথাটা একদম ঠিক নয়,’ দরজা বললো। ‘এই কোনঅ্যাপ্ট ক্রয় করার সময় যে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন সেটা আবার দেখুন।’
ডেস্কের ড্রয়ারে চুক্তিপত্রটা পাওয়া গেল। স্বাক্ষর করার পর একাধিকবার বিভিন্ন প্রয়োজনে এটা ব্যবহার করতে হয়েছে। কোনো সন্দেহ নেই; দরজা খোলা এবং বন্ধ করার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ মূল্য পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক। সেটা কোনো ধরনের বখশিস নয় মোটেও।
‘নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে আমি ঠিক কথাই বলেছি,’ মন্তব্য করলো দরজাটা। বলার ভঙ্গিটা গা জ্বালানোর মতো।
সিংকের পাশের একটা ড্রয়ার থেকে স্টেইনলেস স্টিলের ছুরি বের করে আনলো জো চীপ, তারপর সেটা দিয়ে দরজার পয়সাখেকো বোল্টের স্ক্রু একটা একটা করে খুলে আনতে শুরু করলো।
‘আমি আপনার বিরুদ্ধে মামলা করবো,’ প্রথম স্ক্রু খুলে আসার পর হুমকি দিলো দরজাটা।
‘এখন পর্যন্ত কোনো দরজা আমার নামে মামলা করেনি,’ জো চীপ বললো। ‘তবে আশা করি আমি সেটাও হজম করে নিতে পারবো।’
কড়া নাড়ার শব্দ হলো দরজায়। ‘হেই, জো, প্রিয় বন্ধু, আমি জি. জি. অ্যাশউড! আর মেয়েটা ঠিক আমার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। দরজা খোলো।’
‘আমার হয়ে স্লটে একটা নিকেল দাও তো,’ জো বললো। ‘কীভাবে কীভাবে যেন আমার এদিকের কলকবজাগুলো বিকল হয়ে গেছে।’
স্লটে কয়েন গড়িয়ে পড়ার শব্দ শোনা গেল; একটা দোল দিয়ে উন্মুক্ত হলো দরজা। জি. জি. অ্যাশউডকে দেখা গেল, দাঁড়িয়ে আছে উজ্জ্বল মুখে। মেয়েটাকে সামনে ঠেলে অ্যাপ্টে প্রবেশ করার সময় তার মুখে ছিলো স্নিগ্ধ আর কিছুটা অস্থির কিন্তু বিজয়ীর হাসি।
মুহূর্তের জন্য দাঁড়িয়ে জোকে একপলক দেখলো মেয়েটা। নিঃসন্দেহে সতেরোর বেশি হবে না বয়স, হালকা-পাতলা গড়ন, গায়ের রং তামাটে, চোখদুটো দিঘল আর গভীর। ঈশ্বর, ও ভাবলো, মেয়েটা সুন্দরী। পরনে কৃত্রিম ক্যানভাসের ওয়ার্ক শার্ট আর জিন্স, ভারী বুটগুলোতে যে দাগ লেগে আছে সেটা নিঃসন্দেহে সত্যিকারের কাদা। উজ্জ্বল চুলের গোছা পেছন দিকে শক্ত করে ব্যান্ডানা দিয়ে বাঁধা। শার্টের হাতা গুটানো থাকায় রোদে পোড়া বলিষ্ঠ বাহুদুটো উন্মুক্ত। কৃত্রিম চামড়ার বেল্টে একটা ছুরি, একটা ফিল্ড টেলিফোন ইউনিট এবং জরুরি মুহূর্তের জন্য খাবার আর পানি। তার উন্মুক্ত গাঢ় বর্ণের বাহুতে একটা ট্যাটু। সেখানে লেখা কেভিয়্যাট এম্পটর। এই শব্দের অর্থ কী হতে পারে কে জানে।
‘ওর নাম প্যাট,’ জি. জি. অ্যাশউড বললো, যেন অনেক দিনের পরিচিত আর ঘনিষ্ঠ এমনভাবে মেয়েটার কোমর জড়িয়ে ধরে রেখেছে। ‘পুরো নাম নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই।’ তার দেহ প্রায় বর্গাকৃতির আর স্থুল, অনেকটা ভারী থান ইটের মতো। বরাবরের মতোই পরনে মোহায়ের পনচো, লাল রঙের ফেল্টের টুপি, পায়ে নকশা করা মোজা আর নরম চপ্পল। জো চীপের দিকে এগিয়ে এলো সে। মনে হচ্ছে যেন প্রতিটি রোমকূপ থেকে আত্মবিশ্বাস ঝরে পড়ছে; মূল্যবান কিছু একটা পেয়েছে, এবং সেটার পুরো সদ্ব্যবহার করতে চায় সে। ‘আর প্যাট, ও হলো কোম্পানির সবচেয়ে দক্ষ, ফার্স্ট-লাইন ইলেকট্রিক্যাল-টাইপ টেস্টার।’
নিরাসক্ত কণ্ঠে জো চীপকে প্রশ্ন করলো মেয়েটা, ‘আপনি নিজেই কি ইলেকট্রিক্যাল? নাকি আপনার পরীক্ষাগুলো ইলেকট্রিক্যাল?’
‘আমাদের মাঝে একটা বোঝাপড়া আছে,’ জবাব দিলো জো। টের পাচ্ছে, অপরিচ্ছন্ন অ্যাপ্টের দুর্গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে চারপাশে; চতুর্দিকেই ময়লা আবর্জনার স্তূপ, আর সে নিশ্চিত যে প্যাট সবকিছুই লক্ষ করেছে। ‘বসো,’ বিব্রত সুরে বললো সে। ‘এক কাপ আসল কফির স্বাদ নাও।’
‘দারুণ বিলাসিতা,’ রান্নাঘরের টেবিলে বসতে বসতে বললো প্যাট। সহজাত ভঙ্গিতে এলোমেলো পেপগুলো চমৎকারভাবে গুছিয়ে রাখলো সে। ‘কীভাবে আপনি আসল কফি উপভোগ করতে পারেন, মি. চীপ?’
জি. জি. অ্যাশউড জবাব দিলো, ‘বিশাল অঙ্কের বেতন পায় জো। ওকে ছাড়া আমাদের ফার্ম চলতে পারতো না।’ হাত বাড়িয়ে টেবিলের উপরে রাখা প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে নিলো সে।
‘ওটা রেখে দাও!’ চিৎকার করে বললো জো। ‘আমার কাছে আর নেই। আর আমি নিজের শেষ সবুজ রেশন কার্ডটাও কফি কেনার জন্য ব্যবহার করে ফেলেছি।’
‘দরজা খোলার মূল্য আমি পরিশোধ করেছি কিন্তু,’ ইশারা করে বললো জি. জি.। মেয়েটাকেও প্যাকেট থেকে সিগারেট অফার করলো সে। ‘জো বরাবরই এমন নাটক করে, পাত্তা দিও না। এই যেমন, ওর বাসস্থানের অবস্থা দেখো। এতেই বোঝা যায় সে একজন সৃষ্টিশীল মানুষ; প্রতিভাবানরা আসলে এভাবেই বাস করে। তোমার পরীক্ষণ-যন্ত্রগুলো কোথায়, জো? আমরা সময় নষ্ট করছি।’
মেয়েটার উদ্দেশে জো বললো, ‘তোমার পোশাক-আশাক বেশ অদ্ভুত।’
‘আমি টপিকা কিবুট্য-এ সাব সার্ফেস ভিডফোন লাইন রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করি,’ প্যাট জবাব দিলো। ‘শুধু মেয়েরাই ঐ নির্দিষ্ট কিবুটযে কায়িক পরিশ্রমের কাজ করতে পারে। সেজন্যই উইচেটা ফলস কিবুটযে আবেদন না করে আমি ওখানে আবেদন করি।’ তার কালো চোখগুলো গর্বে চকচক করে উঠলো।
‘তোমার হাতের ঐ লেখাগুলো, ঐ ট্যাটুটা, হিব্রু?’
‘ল্যাটিন।’ মেয়েটার চোখে কৌতুক। ‘এমন নোংরা আর অগোছালো অ্যাপ্ট আমি আগে দেখিনি। আপনার কাজের লোক নেই?’
‘ওর মতো ইলেকট্রিক্যাল বিশেষজ্ঞর ঘর-গৃহস্থালি নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই,’ জি. জি. অ্যাশউড বিরক্ত হয়ে বললো। ‘শোনো, চীপ, এই মেয়েটার বাবা-মা রে হোলিসের কোম্পানিতে কাজ করে। যদি জানতে পারে যে প্যাট এখানে এসেছিলো, ওরা হয়তো তার ফ্রন্টাল লোবোটমির ব্যবস্থা করবে।’
মেয়েটার উদ্দেশে জো প্রশ্ন করলো, ‘তোমার বাবা-মা জানে না যে তোমার কাউন্টার-ট্যালেন্ট আছে?’
‘না,’ মাথা নেড়ে জবাব দিলো মেয়েটা। ‘কিবুট্য ক্যাফেটেরিয়াতে আপনাদের এজেন্ট আমাকে বলার আগ পর্যন্ত আমি নিজেও ঠিকমতো কখনো বুঝতে পারিনি। আমার হয়তো সত্যিই ট্যালেন্ট আছে।’ কাঁধ নাচালো সে। ‘হয়তো নেই। ও বলেছে আপনি আমাকে চাক্ষুষ প্রমাণ দিতে পারবেন, আপনার টেস্টিং ব্যাটারি দিয়ে।’
‘কেমন লাগবে তোমার,’ মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলো সে, ‘যদি পরীক্ষায় দেখা যায় যে তোমার আসলেই তেমন ট্যালেন্ট আছে?’
‘আমার মনে হয় না তেমন কোনো ক্ষমতা আমার আছে,’ প্যাট নিরাসক্ত সুরে বললো। ‘আমি কিছুই করতে পারি না; হাতের স্পর্শ ছাড়া কোনো বস্তুকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরাতে পারি না, পাথরকে রুটিতে রূপান্তর করতে পারি না, কুমারী গর্ভে সন্তানের জন্ম দিতে পারি না আর অসুস্থকে সুস্থ করে তুলতেও পারি না। আমি মাইন্ড রিড করতে পারি না। অথবা ভবিষ্যৎ দেখতে পারি না। অতি সাধারণ এই ট্যালেন্টগুলোর কিছুই আমার নেই। আমি কেবল অন্যের ক্ষমতা অকার্যকর করতে পারি। অনেকটা—’ কাঁধ ঝাঁকালো সে—‘কাউকে বোকা বানানোর মতো।’
‘মানব জাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার আবশ্যকীয় উপাদান হিসেবে এটা ঠিক পিএসআই ক্ষমতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ,’ জো বললো। ‘বিশেষ করে আমাদের মতো নর্মদের জন্য। অ্যান্টি-পিএসআই ফ্যাক্টর হলো প্রাকৃতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কোনো কীট উড়ার কৌশল আয়ত্ত করে, আর তাই আরেক পতঙ্গ তাকে ফাঁদে ফেলার জন্য আয়ত্ত করে জাল বোনার কৌশল। কিন্তু এর মানে কি এই যে কেউ উড়তে পারবে না? শামুক নিজেকে রক্ষার জন্য শক্ত খোলস তৈরি করে, পাখি জানে কীভাবে শামুককে ঠোঁটে নিয়ে উপরে উঠে সেটাকে পাথরে আছড়ে ফেলতে হয়। মোদ্দা কথা, তুমি এমন এক সত্তা যারা পিএসআই শিকার করছে, আর পিএসআই এমন এক সত্তা যারা নর্মদের শিকার করছে। আর তাই তুমি নর্মদের বন্ধু। ভারসাম্য, একটা পরিপূর্ণ চক্র, শিকারি আর শিকার। এটা মনে হয় অনন্তকালব্যাপী এক প্রক্রিয়া। সত্যি বলতে কী, আমি জানি না এটাকে কীভাবে আরো গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায়।’
‘আমাকে হয়তো ওরা বিশ্বাসঘাতক হিসেবে বিবেচনা করবে,’ প্যাট বললো।
‘তাতে কি তোমার খারাপ লাগছে?’
‘আমাকে খোঁচাচ্ছে যে বিষয়টা সেটা হলো, মানুষ আমার প্রতি রাগান্বিত হয়ে উঠবে। কিন্তু আমার মনে হয়, কাউকে অসন্তুষ্ট না করে বেঁচে থাকাও সম্ভব না। আপনি সবাইকে খুশি করতে পারবেন না। কারণ সব মানুষের চাহিদা একরকম হয় না। আপনি যখন একজনকে খুশি করছেন, তার অর্থ হলো একই সময়ে আরেকজনকে অসন্তুষ্টও করছেন।’
‘তোমার অ্যান্টি-ট্যালেন্ট আসলে কী?’ জো জানতে চাইলো।
‘ব্যাখ্যা করা কঠিন।’
‘আমি যেমনটা বলেছি,’ জি. জি. অ্যাশউড বললো, ‘একেবারেই ভিন্ন ধাঁচের, আমি এমনটা আগে কখনো দেখিনি।’
‘কোন ধরনের পিএসআই-এর বিপক্ষে তোমার ট্যালেন্ট কাজ করে?’ মেয়েটাকে প্রশ্ন করলো জো।
‘প্রিকগ,’ জবাব দিলো প্যাট। ‘আমার তাই মনে হয়।’ জি. জি. অ্যাশউডের দিকে ইশারা করলো সে, যার উৎসাহে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। ‘আপনার স্কাউট মি. অ্যাশউড আমাকে ব্যাখ্যা করে বলেছেন। আমি জানি যে হাস্যকর অনেক কাজই আমি করেছি। ছয় বছর বয়স থেকেই অসংখ্য হাস্যকর ঘটনা আমার নিত্যসঙ্গী। আমার বাবা-মাকে কখনো বলিনি কারণ আমার মনে হয়েছিলো তারা জানতে পারলে মোটেও খুশি হতো না।’
‘তারা কি প্রিকগ?’ জো প্রশ্ন করলো।
‘হ্যাঁ।’
‘ঠিকই বলেছ তুমি। তোমার বাবা-মা জানতে পারলে মোটেও খুশি হতো না। কিন্তু তুমি যদি তোমার ক্ষমতা ওদের আশেপাশে কখনো ব্যবহার করে থাকো—এমনকি একবারের জন্য হলেও ওদের সেটা বুঝতে পারার কথা। কখনো কিছু সন্দেহ করেনি? তুমি কখনো ওদের ক্ষমতা অকার্যকর করার চেষ্টা করোনি?’
‘আমি—’ অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করে বললো প্যাট—‘সম্ভবত অকার্যকর করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু ওরা বুঝতে পারেনি।’ তার চেহারায় একটা হতবিহ্বল ভাব।
‘আমি বুঝিয়ে বলছি অ্যান্টি-প্রিকগ সাধারণত কীভাবে কাজ করে,’ জো বললো। ‘অন্তত তাদের যেভাবে কাজ করতে দেখেছি আর কি। প্রিকগরা একাধিক সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ দেখতে পায়, তাদের সামনেই সাজানো থাকে, একটার পাশে আরেকটা, ঠিক মৌচাকের মতো। একাধিক সম্ভাব্য ভবিষ্যতের কোনো একটা অত্যধিক উজ্জ্বল হয়ে তার সামনে ফুটে ওঠে, আর ওটাকেই সে বেছে নেয়। আর একবার বেছে নিলে অ্যান্টি-প্রিকগ তখন আর কিছু করতে পারে না। অ্যান্টি-প্রিকগকেও ঠিক ঐ সময় উপস্থিত থাকতে হবে, প্রিকগ যখন বাছাই প্রক্রিয়ায় থাকে তখন, বাছাই করে ফেলার পরে না। অ্যান্টি-প্রিকগ প্রতিটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সমানভাবে বাস্তব করে তোলে প্রিকগের কাছে, তখন নির্দিষ্ট কোনো একটা বেছে নেওয়ার ক্ষমতা অকার্যকর হয়ে যায়। আশেপাশে কোনো অ্যান্টি-প্রিকগ থাকলে একজন প্রিকা খুব সহজেই তা বুঝতে পারে। কারণ তখন ভবিষ্যতের সাথে তার যোগসূত্র এলোমেলো হয়ে পড়ে। টেলিপ্যাথদের ক্ষেত্রেও ঠিক একই রকম বিকলতা—’
‘প্যাট অতীতে যেতে পারে,’ জি. জি. অ্যাশউড বললো।
স্থিরদৃষ্টে তাকিয়ে আছে জো।
‘ও অতীতে যেতে পারে,’ জি. জি. অ্যাশউড পুনরাবৃত্তি করলো কথাটার। পরিস্থিতিটা উপভোগ করছে সে, জো চীপের রান্নাঘরের প্রতিটি কোনায় ঘুরে বেড়াচ্ছে তার দৃষ্টি। ‘তার ট্যালেন্ট দ্বারা প্রভাবিত প্রিকগরা তারপরেও একটা প্রাধান্যপূর্ণ ভবিষ্যৎ দেখতে পায়; তুমি যেমনটা বলেছ, সর্বাধিক উজ্জ্বল একটা সম্ভাব্যতা। সে ওটাই বেছে নেয়। আর মজার ব্যাপার হলো, সেটাই সঠিক। কিন্তু কেন তার বেছে নেওয়া সম্ভাব্য ভবিষ্যৎই সঠিক? কেন ওটাই সর্বাধিক উজ্জ্বল? কারণ এই মেয়েটা—’ কাঁধ নাড়িয়ে প্যাটের দিকে ইশারা করলো সে—‘ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ঐ সর্বাধিক উজ্জ্বলতম সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে কারণ সে অতীতে গিয়ে ওটাকে পরিবর্তন করে দেয়। আর অতীত পরিবর্তনের মাধ্যমে সে বর্তমানকেও পরিবর্তন করে দেয়, আর প্রিকগ বতর্মানেরই অংশ। কিছু না বুঝেই সে প্রভাবিত হয় এবং আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় তার ট্যালেন্ট ঠিকমতোই কাজ করছে, যদিও আসলে কাজ করছে না। সুতরাং, অন্যান্য অ্যান্টি-প্রিকগদের ট্যালেন্টের সাথে তুলনা করলে এটাই এই মেয়েটির অ্যান্টি-ট্যালেন্টের সুবিধা। অন্যটা… এটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ… আর সেটা হলো প্রিকগ একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরেও প্যাট সেটা অকার্যকর করে দিতে পারে। ঘটনার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও সে প্রবেশ করতে পারে, আর তুমি ভালো করেই জানো, এই সমস্যাটা সব সময়ই আমাদের সামনে এগুনোর পথ বন্ধ করে দেয়; যদি শুরু থেকেই আমরা উপস্থিত থাকতে না পারি, আমাদের আর কিছুই করার থাকে না। সত্যি বলতে কী, অন্যদের ক্ষেত্রে যেমন পেরেছি, সেইভাবে প্রিকগদের ট্যালেন্ট আমরা কখনোই পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করতে পারিনি, তাই না? এটা কি আমাদের একটা দুর্বল দিক না?’ দৃষ্টিতে প্রত্যাশা নিয়ে জো চীপের দিকে তাকালো সে।
‘কৌতূহল জাগানোর মতো,’ বললো জো।
‘কী বলছো! স্রেফ কৌতূহল জাগানোর মতো?’ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললো জি. জি. অ্যাশউড। ‘এটা এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত আমাদের সেরা অ্যান্টি-ট্যালেন্ট!’
‘আমি অতীতে যেতে পারি না,’ নিচু স্বরে বললো প্যাট। চোখ তুলে জো চীপের দিকে তাকালো সে, দৃষ্টিতে যুগপৎ ক্ষমা প্রার্থনা আর তর্ক করার আভাস। ‘কিছু একটা করতে পারি আমি, কিন্তু মি. অ্যাশউড বিষয়টাকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করেছেন।’
‘আমি তোমার মাইন্ড রিড করতে পারি,’ প্যাটের উদ্দেশে বললো জি. জি., ওকে কিছুটা রাগান্বিত মনে হলো। ‘আমি জানি তুমি অতীত পরিবর্তন করতে পারো। আগেও তুমি সেটা করেছ।’
‘আমি অতীত পরিবর্তন করতে পারি, তবে অতীতে যেতে পারি না। আমি সময় পরিভ্রমণ করি না, আপনার যন্ত্রে ঠিক যে বিষয়টা আপনি নিশ্চিত করতে চাইছেন।’
‘তুমি কীভাবে অতীত পরিবর্তন করো?’ প্যাটকে প্রশ্ন করলো জো।
‘আমি গভীর মনোনিবেশের সাথে চিন্তা করতে থাকি। কোনো বিষয়ের সুনির্দিষ্ট কোনো একটা অংশ নিয়ে। এই যেমন ছোট কোনো ঘটনা, অথবা কারো বলা কোনো কথা। অথবা এমন কোনো ঘটনা যা ঘটে গেছে, কিন্তু আমি চাইনি সেটা ঘটুক। প্রথমবার যখন আমি এটা করেছিলাম, অনেক ছোট ছিলাম তখন—’
‘ওর বয়স যখন ছয় বছর,’ জি. জি. অ্যাশউড মাঝখানে বাধা দিয়ে বললো। ‘ডেট্রয়েটে থাকতো, ওর বাবা-মায়ের সাথে। ওর বাবার অনেক শখের এবং মূল্যবান সিরামিকের একটা অ্যান্টিক মূর্তি ভেঙে ফেলে সে।’
‘তোমার বাবা কি সেটা আগেই বুঝতে পারেননি?’ জো তাকে জিজ্ঞেস করলো। ‘তার প্রিকগ ক্ষমতার মাধ্যমে?’
‘বুঝতে পেরেছিলো,’ জবাব দিলো প্যাট। ‘যেদিন আমি মূর্তিটা ভেঙে ফেলি তার আগের সপ্তাহে শাস্তিও দেওয়া হয়েছিলো আমাকে। কিন্তু বাবা বলেছিলো এটা ঘটতোই। প্রিকগদের ক্ষমতা সম্পর্কে আপনি জানেন। তারা আগে থেকেই বুঝতে পারে কী ঘটবে, কিন্তু যা ঘটবে সেটার কোনো পরিবর্তন তারা করতে পারে না। তারপর মূর্তিটা সত্যি সত্যি ভেঙে যাওয়ার পর—বরং বলা উচিত, আমি ভেঙে ফেলার পর ঘটনাটা নিয়ে আমি গভীরভাবে চিন্তা করতে থাকি। বিরামহীনভাবে ভাবতে থাকি ওটা ভেঙে যাওয়ার আগের সপ্তাহের কথা, যখন ডিনারে আমাকে ডেজার্ট দেওয়া হয়নি আর পাঁচটা বাজতে না বাজতেই ঘুমাতে যেতে হয়েছিলো। বারবার ভাবছিলাম, এই অনভিপ্রেত ঘটনা প্রতিহত করার কোনো উপায়ই কি নেই? বাবার প্রিকগ ক্ষমতা আমার কাছে তেমন কিছু মনে হয়নি, যেহেতু যা ঘটবে তার কোনো পরিবর্তন করতে পারে না সে। এখনো আমার তাই মনে হয়, একধরনের রাগ বলতে পারেন আপনি। পুরো একটা মাস ব্যয় করলাম আমি ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করে হতচ্ছাড়া মূর্তিটাকে আস্ত অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য। মনের গভীরে ওটা ভেঙে যাওয়ার আগের অবস্থার দৃশ্য ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করতে লাগলাম অবিরাম, ওটা দেখতে কেমন ছিলো সেটা কল্পনায় ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করতে লাগলাম… কাজটা ছিলো অত্যন্ত কষ্টকর। তারপর একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, মূর্তিটা দাঁড়িয়ে আছে ওটার জায়গায়। সব সময় যেমন ছিলো তেমনই। এমনকি সে রাতে আমি স্বপ্নেও দেখেছিলাম ঠিক এটাই।’ উত্তেজনায় টানটান হয়ে জো চীপের দিকে ঝুঁকলো প্যাট। এখন তার কণ্ঠস্বর তীক্ষ্ণ অথচ আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। ‘কিন্তু আমার বাবা-মা কিছুই বুঝতে পারেনি। মূর্তিটার অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকাটা তাদের কাছে মনে হয়েছিলো একেবারেই স্বাভাবিক। তারা ভেবেছিলো, ওটা তো সব সময়ই ওখানে অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। শুধু আমারই সবকিছু মনে ছিলো।’ মুচকি হেসে পেছনে হেলান দিয়ে বসলো সে, তারপর প্যাকেট থেকে আরেকটা সিগারেট বের করে ধরালো।
‘গাড়ি থেকে আমার যন্ত্রগুলো নিয়ে আসছি,’ দরজার উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে বললো জো।
‘পাঁচ সেন্ট, প্লিজ,’ হাতল ধরতেই দরজা বলে উঠলো।
‘দিয়ে দাও,’ জি. জি. অ্যাশউডকে বললো জো।
***
দুই হাতে একগাদা যন্ত্র নিয়ে ফিরে আসার পর কোম্পানির স্কাউটকে তৎক্ষণাৎ অফিসের দিকে ছুটতে বললো জো।
‘কী!’ বিস্মিত কণ্ঠে বললো জি. জি.। ‘কিন্তু আমি ওকে খুঁজে পেয়েছি, ও আমার আবিষ্কার! শক্তিক্ষেত্র অনুসরণ করে ওকে খুঁজে পেতে আমি দশটা দিন ব্যয় করেছি। আমি—’
‘তোমার শক্তিক্ষেত্র উপস্থিত থাকলে আমি ওকে পরীক্ষা করতে পারবো না, সেটা তুমি ভালো করেই জানো,’ জো বললো। ‘ট্যালেন্ট এবং অ্যান্টি-ট্যালেন্ট শক্তিক্ষেত্র সব সময়ই পরস্পরকে বিচ্যুত করে দেয়। যদি তা না করতো, তাহলে আমাদের এই ব্যবসা করার কোনো প্রয়োজন ছিলো না।’ রাগে গজগজ করতে করতে জি. জি. অ্যাশউড যখন উঠে দাঁড়াচ্ছিলো, তার দিকে একটা হাত বাড়িয়ে দিলো জো। ‘আর আমাকে কয়েকটা নিকেল দিয়ে যাও। আমরা দুজন যেন এখান থেকে বের হতে পারি।’
‘আমার কাছে খুচরো আছে,’ বিড়বিড় করে বললো প্যাট। ‘আমার হাতব্যাগে।’
‘আমার শক্তিক্ষেত্রের বিচ্যুতি বিয়োজন করে ও যে শক্তি উৎপাদন করে সেটা পরিমাপ করতে পারবে তুমি,’ জি. জি. বললো। ‘অন্তত একশোবার তোমাকে এইভাবে কাজ করতে দেখেছি আমি।’
‘ওর ব্যাপারটা ভিন্ন,’ জোয়ের সংক্ষিপ্ত জবাব।
‘আমার কাছে আর নিকেল নেই,’ জি. জি. বললো। ‘আমি নিজেও বের হতে পারবো না।’
একবার জোয়ের দিকে, আবার জি. জি.—র দিকে তাকিয়ে প্যাট বললো, ‘আমি দিচ্ছি।’ একটা কয়েন জি. জি.—র দিকে ছুঁড়ে দিলো সে।
জি. জি. সেটা লুফে নিলো, তার চেহারায় হতবিহ্বল একটা ভাব। তারপর হতাশার এবং অবশেষে চেহারায় ফুটে উঠলো রাগ।
‘তোমরা আমাকে ঠকাচ্ছো,’ দরজার স্লটে নিকেলটা ঢোকানোর সময় সে বললো। ‘তোমরা দুজনেই।’ তার পেছনে দরজাটা বন্ধ হওয়ার সময়ও সে বিড়বিড় করছিলো, ‘ওকে আমি খুঁজে বের করেছি। অবিশ্বাস্য রকমের ব্যবসা হতে পারতো যখন—’ দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়াতে আর কিছু শোনা গেল না। তারপর পুরোপুরি নীরবতা।
‘ওর প্রবল উৎসাহ না থাকলে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না,’ আনমনে বললো প্যাট।
‘ও ঠিক আছে,’ জো বললো। স্বাভাবিক সেই অনুভূতিটা আবার ফিরে এলো তার মাঝে; অপরাধবোধ। তবে পাত্তা দিলো না। ‘যাই হোক, তার যে দায়িত্ব পালন করার কথা সেটা সে করেছে। এবার—’
‘এবার আপনার কাজ,’ প্যাট বললো। ‘তাই না? আমার জুতোগুলো খুলতে পারি?’
‘নিশ্চয়ই,’ জো বললো। যন্ত্রপাতিগুলো সাজিয়ে নিচ্ছে সে, ড্রামগুলো পরীক্ষা করে দেখছে। পাওয়ার সাপ্লাই আর প্রতিটা সুচের কম্পন পরীক্ষা করে দেখলো, নির্দিষ্ট মাত্রার তরঙ্গ প্রেরণ করে ফলাফল রেকর্ড করলো।
‘গোসল করা যাবে?’ বুটজুতোগুলো সুন্দর করে একপাশে সাজিয়ে রাখার সময় জিজ্ঞেস করলো প্যাট।
‘এক কোয়ার্টার,’ বিড়বিড় করে বললো জো। ‘গোসল করার মূল্য এক কোয়ার্টার।’ চোখ তুলে তাকিয়ে জো দেখলো প্যাট ইতোমধ্যেই তার ব্লাউজের বোতাম খুলতে শুরু করেছে। ‘আমার কাছে কোনো কোয়ার্টার নেই।’
‘আমাদের কিবুটযে সবকিছুই বিনামূল্যে পাওয়া যায়,’ প্যাট বললো।
‘বিনামূল্যে!’ অবাক হয়ে প্যাটের দিকে তাকিয়ে আছে জো। ‘সেটা তো আর্থিকভাবে মোটেও লাভজনক না। তোমাদের কিবুট্য এই ব্যবস্থায় কীভাবে টিকে আছে? মাসের পর মাস?’
প্যাট তখনো বোতাম খুলছে। ‘কাজের বিনিময়ে আমাদের মাঝে ক্রেডিট বণ্টন করা হয়, আর আমাদের বেতনগুলো জমা হতে থাকে। এরপর আমাদের সবার জমাকৃত আয় একত্রে বিনিয়োগ করা হয়। সত্যি বলতে কী, টপিকা কিবুট্য বিগত বছরগুলোতে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে। আমরা সামগ্রিকভাবে যা নেই, আয় করি তার চেয়ে বহুগুণ বেশি।’
সবগুলো বোতাম খুলে ব্লাউজটা সে তার চেয়ারের হাতলে সুন্দরভাবে ভাঁজ করে রাখলো। নীল, রুক্ষ ব্লাউজের নিচে কোনো অন্তর্বাস পরেনি সে। জো তার নিটোল আর প্রস্ফুটিত স্তনযুগল দেখে মুগ্ধ: শক্ত, সুডৌল, কাঁধের পেশির সুদৃঢ় বাঁধনে আবদ্ধ।
‘তুমি… মানে… নিশ্চিত যে যা করছো সেটাই করতে চাও?’ জিজ্ঞেস করলো জো। ‘মানে বলতে চাইছি, তুমি কি এখানেই পোশাক পালটাবে?’
‘আপনার কিছু মনে নেই?’ প্যাট জিজ্ঞেস করলো।
‘কী মনে থাকবে?’
‘আমার পোশাক না খোলার বিষয়টা, অন্য এক বর্তমানে? তখন ব্যাপারটা আপনার ঠিক পছন্দ হয়নি, তাই আমি সেটা পুরোপুরি মুছে দিয়েছি। আর তাই এখন এই ব্যবস্থা।’ কমনীয় ভঙ্গিতে সোজা হয়ে দাঁড়ালো সে।
‘ক-কী করেছিলাম আমি,’ সতর্কতার সাথে জিজ্ঞেস করলো জো। ‘যখন তুমি পোশাক খুলতে রাজি হওনি তখন? তোমাকে পরীক্ষা করতে চাইনি?’
‘মি. অ্যাশউড আমার অ্যান্টি-ট্যালেন্ট নিয়ে অতিরঞ্জিত করে বলেছেন—বিড়বিড় করে এই ধরনের কিছু একটা বলেছিলেন আপনি।’
‘হতেই পারে না!’ জো বললো। ‘আমি কখনোই এভাবে কাজ করি না।’
‘এই যে।’ সামনে ঝুঁকলো প্যাট, ফলে তার স্তনযুগলও লোভনীয় হয়ে উঠলো, ব্লাউজের পকেটে কী যেন খুঁজছে। ভাঁজ করা একটা কাগজ বের করে জোয়ের হাতে দিলো সে। ‘পূর্ববর্তী বর্তমান থেকে, যা আমি বিলুপ্ত করে দিয়েছি।’
কী লেখা আছে সেটা পড়ে দেখলো জো—একেবারে নিচে এক লাইনে লেখা তার মূল্যায়ন। ‘অ্যান্টি-পিএসআই শক্তিক্ষেত্র উৎপাদন অপর্যাপ্ত প্রয়োজনীয় মানদণ্ডের অনেক নিচে। বিদ্যমান প্রিকগদের বিপক্ষে কোনো কাজে আসবে না।’ তার নিচে বিশেষ একটা কোডমার্ক, যা সে নিজে তৈরি করেছে—একটা বৃত্তকে ছেদ করেছে একটা সরলরেখা। এই প্রতীকের অর্থ: নিয়োগ দেওয়া যাবে না। কথা হলো, সে আর রানসাইটার ছাড়া আর কেউ এই প্রতীকের অর্থ জানে না। এমনকি তাদের স্কাউটরাও না, সুতরাং এই প্রতীকের অর্থ অ্যাশউডের কাছ থেকে জানার কোনো সম্ভাবনা নেই। কিছু না বলে কাগজটা প্যাটের হাতে ফিরিয়ে দিলো জো। ভাঁজ করে আবার সেটা ব্লাউজের পকেটে রেখে দিলো প্যাট।
‘আমাকে আর পরীক্ষা করার দরকার আছে কি?’ মেয়েটা জিজ্ঞেস করলো। ‘কাগজটা দেখার পর?’
‘আমাকে একটা নিয়ম মেনে চলতে হয়,’ জো বললো। ‘ছয়টা সূচক, যেগুলো—’
‘আপনি একজন ব্যর্থ, দেনায় জর্জরিত, অকর্মা কেরানি,’ প্যাট বললো, ‘যে নিজের অ্যাপ্ট থেকে বেরোনোর জন্য দরজা খোলার মূল্যটাও দিতে পারে না।’ প্যাটের কণ্ঠস্বর একেবারেই স্বাভাবিক কিন্তু বিধ্বংসী। নিক্ষিপ্ত তীরের মতো কথাগুলো তার কানে এসে আঘাত করলো। লজ্জা আর অপমানে কুঁকড়ে গেল সে, গালদুটো লাল হয়ে উঠেছে।
‘এই মুহূর্তে একটু সমস্যার মধ্যে আছি,’ জো বললো। ‘কয়েক দিনের মধ্যেই আমার আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে। অগ্রিম নিতে পারি আমি, অফিস থেকে, যদি প্রয়োজন হয়।’ টলোমলো পায়ে উঠে দাঁড়ালো সে, কফি ঢাললো দুটো কাপে। ‘চিনি?’ প্যাটকে জিজ্ঞেস করলো। ‘ক্রিম?’
‘ক্রিম,’ প্যাট বললো, এখনো দাঁড়িয়ে আছে নগ্ন পায়ে, ব্লাউজ ছাড়াই।
দুধের প্যাকেট বের করার জন্য অসহায়ের মতো রেফ্রিজারেটরের দরজা ধরে টানাটানি করতে লাগলো জো।
‘দশ সেন্ট, প্লিজ,’ রেফ্রিজারেটর বললো। ‘পাঁচ সেন্ট আমার দরজা খোলার জন্য, পাঁচ সেন্ট ক্রিমের জন্য।’
‘ক্রিম লাগবে না,’ সে বললো। ‘সাধারণ দুধ হলেই চলবে।’ টানাহ্যাঁচড়া করতেই লাগলো রেফ্রিজারেটরের দরজা খোলার জন্য। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হলো না। ‘এইবারের মতো দিয়ে দাও,’ অনুরোধ জানালো রেফ্রিজারেটরের কাছে। ‘ঈশ্বরের দিব্যি, আজ রাতেই তোমার পাওনা পরিশোধ করে দেবো।’
‘এই নিন,’ প্যাট বললো। টেবিলের উপর দিয়ে একটা ডাইম জোয়ের দিকে গড়িয়ে দিলো সে। ‘ওর পাওনা সময়মতো পরিশোধ করা উচিত,’ রেফ্রিজারেটরের স্লটে জো যখন ডাইমটা ফেলছিলো, সেটা দেখতে দেখতে বললো মেয়েটা। ‘আপনি তাহলে নিজের রক্ষিতাদের অর্থকড়ির মাধ্যমে চলেন। আপনি আসলেই ব্যর্থ, তাই না? আমি তখনই বুঝতে পেরেছি যখন মি. অ্যাশউড—’
‘থামো!’ গর্জে উঠলো জো। ‘আমার অবস্থা সব সময় এমন ছিলো না,’ দাঁতে দাঁত চেপে বললো সে।
‘আপনি কি চান আমি আপনাকে এই আর্থিক দুরবস্থা থেকে উদ্ধার করে আনি, মি. চীপ?’ মেয়েটা জিন্সের পকেটে হাত ঢুকিয়ে জোকে পর্যবেক্ষণ করছে নির্বিকারভাবে, সেখানে কোনো ধরনের আবেগ নেই, আছে শুধুই একধরনের সতর্কতা। ‘আমি যে পারবো সেটা আপনি জানেন। মাথা ঠান্ডা করে বসুন, আমাকে নিয়ে একটা মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করে দিন। পরীক্ষার কথা ভুলে যান। আমার ট্যালেন্ট সত্যিই ব্যতিক্রমধর্মী। আমি যে শক্তিক্ষেত্র তৈরি করতে পারি সেটা আপনি পরিমাপ করতে পারবেন না। ওটা তৈরি হয় অতীতে, আর আপনি আমাকে পরীক্ষা করছেন বর্তমানে, যা তৈরিই হয় স্বয়ংক্রিয় ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে। আপনি কি একমত?’
‘তোমার মূল্যায়ন প্রতিবেদনটা আবার দাও,’ সে বললো। ‘সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আবার দেখতে চাই।’
ব্লাউজের পকেট থেকে ভাঁজ করা হলুদ কাগজটা বের করে টেবিলের ওপাশে ঠেলে দিলো প্যাট, আর জো পুরোটা পড়লো আরেকবার। আমার নিজের হাতের লেখা, নিজেকেই বললো সে। হ্যাঁ, সব ঠিক আছে। কাগজটা প্যাটকে ফিরিয়ে দিলো সে, তারপর পরীক্ষা করার যন্ত্রপাতির স্তূপ থেকে ঝকঝকে নতুন আর একই রকম দেখতে আরেকটা হলুদ কাগজ তুলে নিলো।
কাগজের একেবারে উপরে প্যাটের নাম লিখলো, তারপর মনগড়া, অসাধারণ একটা প্রতিবেদন এবং সবশেষে উপসংহার। তার নতুন উপসংহার হলো: অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী। ব্যতিক্রমী অ্যান্টি-পিএসআই শক্তিক্ষেত্র, যা কাজে লাগানোর সুযোগ আছে। আছে একসাথে অসংখ্য প্রিকগকে নিষ্ক্রিয় করে তোলার ক্ষমতা, যা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। তারপর সে একটা প্রতীক আঁকলো; এবার দুটো কাটা চিহ্ন, উভয় চিহ্নের নিচেই আড়াআড়িভাবে দুটো টান। প্যাট দাঁড়িয়ে আছে তার পেছনেই, কী লিখছে মনোযোগ দিয়ে দেখছে সেটা। কাঁধের উপর তার নিঃশ্বাস টের পাচ্ছে জো।
‘নিচে টান দেওয়া কাটা চিহ্ন দুটোর অর্থ কী?’ সে জিজ্ঞেস করলো।
‘কাজে লাগাতে হবে,’ জো বললো। ‘যেকোনো মূল্যে।’
‘ধন্যবাদ।’ পার্সের ভেতর থেকে এক বান্ডিল পসক্রিড বিল বের করে আনলো মেয়েটা, সেখান থেকে বেছে একটা বিল দিলো জোকে। বড় একটা ‘এটা আপনাকে সব দায়-দেনা মিটিয়ে দৈনন্দিন খরচ মেটাতে সাহায্য করবে। আগে দিতে পারিনি। কারণ তখন আপনি আমাকে নিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করে ফেলেছিলেন। আপনি হয়তো সবকিছুই বাতিল করে দিতেন, এবং আপনার সংকীর্ণ মন নিয়ে ভাবতেন যে আমি আপনাকে ঘুস দিচ্ছি। আর তাতে করে আপনি নিশ্চিতভাবেই ধরে নিতেন যে আমার কোনো কাউন্টার-ট্যালেন্ট নেই।’ তারপর সে তার জিন্সের জিপার খুলে আবার পোশাক খোলার কাজে মন দিলো।
ওর দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে প্রতিবেদনটা আবার খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো জো চীপ। নিচে দাগ দেওয়া কাটা চিহ্ন দুটোর অর্থ প্যাটকে যা বলেছে, সেটা মোটেও সঠিক না। এই প্রতীকের অর্থ: নজর রাখতে হবে। প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকর। অত্যন্ত বিপজ্জনক।
প্রতিবেদনের নিচে নিজের স্বাক্ষর দিয়ে কাগজটা ভাঁজ করলো, তারপর প্যাটের হাতে দিলো। দ্রুত সেটা নিজের পার্সে রেখে দিলো প্যাট।
‘আমার জিনিসপত্র নিয়ে কখন এখানে আসবো?’ স্নানঘরের দিকে যেতে যেতে জানতে চাইলো প্যাট। ‘আমার মনে হয় আপনাকে যে পসক্রিড দিয়েছি সেটা এক মাসের ভাড়ার চেয়েও বেশি।’
‘তোমার যখন ইচ্ছে,’ জবাব দিলো জো।
‘পানির কল চালু করার আগে দয়া করে স্লটে পঞ্চাশ সেন্ট ঢালুন,’ স্নানঘর বললো।
প্যাট আবার রান্নাঘরে ফিরে এলো পার্সের জন্য।
