উবিক – ৬

অধ্যায় ৬

আমরা আপনাকে দিতে চাই শেভ করার এমন এক আরামদায়ক অনুভূতি যা আগে কখনো অনুভব করেননি। আমরা বলতে চাই, এখনই সময় পুরুষের মুখমণ্ডল আরো আকর্ষণীয় করে তোলার। এসে গেছে স্বয়ংক্রিয় উবিক, যাতে আছে সুইস-ক্রোমিয়াম ব্লেড, যার ধার কখনো শেষ হয় না, আর তাই ঘ্যাঁষ ঘ্যাঁষ করে দাড়ি কামানোর যুগ শেষ। ব্যবহার করুন উবিক। সতকর্তা: নির্দেশনা মোতাবেক ব্যবহার করুন। এবং সতর্কতার সাথে।

.

‘চাঁদে স্বাগত,’ জোয়ি ওয়ির্ট উৎফুল্ল কণ্ঠে বললো। তার সদা হাস্যময় চোখদুটো লাল ফ্রেমের ত্রিকোণ চশমার কারণে আরো বড় দেখাচ্ছে। ‘আমার মাধ্যমে মি. হাওয়ার্ড আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছেন। বিশেষ করে মি. গ্লেন রানসাইটারকে ধন্যবাদ তার প্রতিষ্ঠানকে—নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, আপনাদের সকলের দক্ষতা আর সহযোগিতাকে—আমাদের এই বিপদের সময় দ্রুত সহজলভ্য করে তোলার জন্য। এই সাবসার্ফেস হোটেল স্যুইটের অবস্থান, যার নির্মাণ এবং সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করেছেন মি. হাওয়ার্ডের অসাধারণ প্রতিভাবান বোন মিস লাডা, ইন্ডাস্ট্রিয়াল এবং রিসার্চ ফাসিলিটি থেকে মাত্র তিনশো লিনিয়ার গজ নিচে। মি. হাওয়ার্ড বিশ্বাস করেন যে ওখানেই আমাদের প্রতিপক্ষ অনুপ্রবেশ করেছে। অনুমান করা কঠিন নয় যে এই কামরায় আপনাদের সম্মিলিত উপস্থিতি নিঃসন্দেহে হোলিসের এজেন্টদের সিওনিক ক্ষমতা দুর্বল করতে শুরু করেছে, এবং এই ভাবনাটাই আমদের জন্য ভীষণ আনন্দের।’ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামলো সে, এক এক করে তাকালো সবার দিকে। ‘কারো কোনো প্রশ্ন আছে?’

নিজের পরীক্ষণ-যন্ত্রপাতি নিয়ে ব্যস্ত জো চীপ, মহিলার কথা গ্রাহ্য করলো না। গ্রাহক যাই বলুক না কেন, চারপাশের সিওনিক শক্তিক্ষেত্র তাকে পরিমাপ করতেই হবে। পৃথিবী থেকে চাঁদে আসার দীর্ঘ যাত্রাপথে সে আর গ্লেন রানসাইটার এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

‘আমার একটা প্রশ্ন আছে,’ ফ্ৰেড জাফস্কি হাত তুললো। খিলখিল করে হাসছে সে। ‘বাথরুমটা কোথায়?’

‘আপনাদের সবাইকে একটা করে ক্ষুদ্র মানচিত্র দেওয়া হবে,’ জোয়ি ওয়ির্ট বললো, ‘যেখানে সব নির্দেশনা পাবেন।’ স্বল্পবসনা এক নারী সহকারীর উদ্দেশে মাথা নাড়লো সে। আর সেই মেয়েটা উজ্জ্বল বর্ণের চকচকে কাগজের মানচিত্র সবার মাঝে বিলি করতে লাগলো। ‘এই স্যুইট,’ আগের কথার খেই ধরলো জোয়ি, ‘নির্মাণ করা হয়েছে একটা রান্নাঘর সহকারে, যার প্রতিটি সুবিধা মুদ্রাচালিত নয়, বরং বিনামূল্যে ব্যবহার করা যাবে। বুঝতেই পারছেন, এই ইউনিট আরামদায়ক বসবাসের উপযোগী করে তোলার জন্য ব্যয় করতে হয়েছে অবিশ্বাস্য পরিমাণের অর্থ, যেখানে বিশজন মানুষ অনায়াসে আরাম-আয়েশে থাকতে পারবে। এখানে রয়েছে শ্বাস নেওয়ার মতো বাতাস তৈরির স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, পানি এবং বৈচিত্র্যময় খাবারের অফুরন্ত সরবরাহ। সেই সাথে আছে ক্লোজড সার্কিট টিভি এবং অত্যন্ত উঁচু মানের পলিফোনিক ফোনোগ্রাফ সাউন্ড সিস্টেম—পরবর্তী দুটো সুবিধা অবশ্য রান্নাঘরের মতো বিনামূল্যের নয়, ওগুলো মুদ্রার বিনিময়ে ব্যবহারযোগ্য। এই দুটো বিনোদন যেন আপনারা সহজে ব্যবহার করতে পারেন সেজন্য গেম রুমে একটা খুচরা মুদ্রার যন্ত্র বসানো হয়েছে।’

‘আমার মানচিত্রে মাত্র নয়টা শোবার কামরা দেখা যাচ্ছে,’ আল হ্যামন্ড বললো।

‘প্রতিটি শোবার কামরায় রয়েছে দুটো করে বিছানা,’ মিস ওয়ির্ট বললো। ‘অর্থাৎ মোট আঠারো জনের ঘুমানোর ব্যবস্থা। তাছাড়া, পাঁচটি কামরায় আছে ডাবল বেড, এখানে থাকার সময় আপনারা কেউ যদি একসাথে ঘুমাতে চান সেজন্যে।’

‘আমার একটা নিয়ম আছে,’ রানসাইটার বিরক্ত হয়ে বললেন। ‘নিয়মটা আমার কর্মচারীদের একে অপরের সাথে ঘুমানোর ব্যাপারে।’

‘পক্ষে না বিপক্ষে?’ জোয়ি ওয়ির্ট জানতে চাইলো।

‘বিপক্ষে,’ রানসাইটার বললেন, হাতের মানচিত্রটা দুমড়ে-মুচড়ে উত্তপ্ত ধাতব মেঝেতে ছুঁড়ে ফেললেন। ‘আমি এটাতে অভ্যস্ত নই যে কেউ আমাকে বলবে—’

‘কিন্তু আপনি তো এখানে থাকছেন না, মি. রানসাইটার,’ মিস ওয়ির্ট তাকে মনে করিয়ে দিলো। ‘আপনার কর্মচারীরা কাজ শুরু করামাত্রই আপনি পৃথিবীতে ফিরে যাবেন, তাই না?’ তার উদ্দেশে পেশাগত মেকি হাসি উপহার দিলো মিস ওয়ির্ট।

জো চীপকে জিজ্ঞেস করলেন রানসাইটার, ‘পিএসআই শক্তিক্ষেত্রের কোনো সংকেত পেয়েছ?’

‘প্রথমে আমাদের ইনার্শিয়ালরা যে পালটা-শক্তিক্ষেত্র তৈরি করছে সেটা আমাকে পরিমাপ করতে হবে,’ জো বললো।

‘যাত্রাপথেই তুমি সেটা করতে পারতে,’ রানসাইটার বললেন।

‘আপনারা কী পরিমাপ করার চেষ্টা করছেন?’ সচকিত হয়ে জানতে চাইলো মিস ওয়ির্ট। ‘মি. হাওয়ার্ড পরিষ্কারভাবে নিষেধ করেছেন, আমি আগেই ব্যাখ্যা করে বলেছি।’

‘আমরা একটা রিডিং নেওয়ার চেষ্টা করছি,’ রানসাইটার বললেন।

‘মি. হাওয়ার্ড—’

‘এটা নিয়ে স্ট্যান্টন মিককে মাথা ঘামাতে হবে না,’ রানসাইটার বললেন।

স্বল্পবসনা সহকারীর উদ্দেশে মিস ওয়ির্ট বললো, ‘মি. মিককে কি জানাবে যেন তিনি দয়া করে একবার নিচে নেমে আসেন?’ সহকারী যেদিকে এগোল, দেখে মনে হলো ওগুলো এলিভেটর। ‘মি. মিক নিজেই আপনাকে বলবেন,’ রানসাইটারকে বললো মিস ওয়ির্ট। ‘উনি না আসা পর্যন্ত আপনারা দয়া করে কিছু করবেন না। তিনি না আসা পর্যন্ত আপনাদের কিছু না করার জন্য অনুরোধ করছি।’

‘আমি একটা রিডিং পাচ্ছি,’ রানসাইটারকে বললো জো। ‘আমাদের নিজেদের শক্তিক্ষেত্রের। বেশ উঁচু মাপের।’ সম্ভবত প্যাটের জন্য, সিদ্ধান্তে উপনীত হলো সে। ‘যা আশা করেছিলাম তার চেয়েও অনেক বেশি,’ সে বললো। আমাদের রিডিং নেওয়ার ব্যাপারে ওরা এত উদ্বিগ্ন কেন? অবাক হয়ে ভাবছে সে। সময় এখন আর কোনো বিষয় না। আমাদের ইনার্শিয়ালরা চলে এসেছে, কাজও শুরু করে দিয়েছে।

‘ক্লজেটগুলো কোথায়?’ টিপি জ্যাকসন জিজ্ঞেস করলো। ‘আমাদের পোশাক ওখানে রাখা যাবে? আমার ব্যাগগুলো খোলা দরকার।’

‘প্রতিটি শোবার ঘরে একটা করে বড় ক্লজেট আছে, মুদ্রার বিনিময়ে ব্যবহারযোগ্য। আর এই যে—’ বিশাল একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ বের করে আনলো মিস ওয়ির্ট—‘আমাদের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আপনাদের সবাইকে কিছু মুদ্রা দেওয়া হবে।’ ডাইম, নিকেল আর কোয়ার্টারের রোলগুলো জন ইডের হাতে দিয়ে বললো, ‘দয়া করে সবার মাঝে সমানভাবে ভাগ করে দেবেন? মি. মিকের পক্ষ থেকে সামান্য উপহার।’

‘এখানে নার্স বা ডাক্তার আছে?’ এডি ডর্ন জিজ্ঞেস করলো। ‘মাঝে মাঝে যখন আমি গভীর মনোনিবেশ করে কাজ করি, আমার ত্বকে সাইকোসোমাটিক র‍্যাশ ওঠে। সাধারণত কর্টিসোন-বেজ অয়েন্টমেন্ট লাগালেই ঠিক হয়ে যায়, কিন্তু তাড়াহুড়োর কারণে আমি আনতে ভুলে গেছি।’

‘শিল্প-কারখানা, গবেষণাগার এবং যতগুলো লিভিং কোয়ার্টার আছে তার সবগুলোতেই তাৎক্ষণিক সেবা প্রদানের জন্য একাধিক চিকিৎসক সব সময় প্রস্তুত, তাছাড়া রোগীদের জরুরি সেবা দেওয়ার জন্য ছোট একটা হাসপাতালও আছে।’

‘মুদ্রাচালিত?’ স্যামি মুন্ডো প্রশ্ন করলো।

‘আমাদের যাবতীয় চিকিৎসা সেবা আমরা বিনামূল্যে দিয়ে থাকি,’ মিস ওয়ির্ট বললো। ‘কিন্তু আসলেই অসুস্থ কি না সেটা প্রমাণ করার দায়িত্ব পুরোটাই রোগীর নিজের। তবে ঔষধ সরবরাহকারী প্রতিটি যন্ত্র মুদ্রাচালিত। আপনাদের অবগতির জন্য বলে রাখছি, এই স্যুইটের গেম রুমে একটা স্নায়ু প্রশান্তকারী ঔষধ সরবরাহ যন্ত্র রাখা আছে। এবং, যদি প্রয়োজন মনে করেন, তাহলে অন্য কোনো স্যুইট থেকে উত্তেজনাবর্ধক ঔষধ সরবরাহ যন্ত্রও এনে দেওয়া যাবে।’

‘হেলুসিনোজেনস আছে?’ ফ্রান্সেসকা স্প্যানিশ জানতে চাইলো। ‘যখন আমি কাজ করি, এরগোট-বেস সাইকোডেলিক ড্রাগ আমার দক্ষতা বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেয়। আর ওটার প্রভাবে আমি আরো স্পষ্ট বুঝতে পারি যে কার বা কীসের বিরুদ্ধে নিজের ট্যালেন্ট কাজে লাগাচ্ছি আমি। এটা আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করে।’

‘মি. মিক সকল ধরনের এরগোট বেস হ্যালুসিনোজেনিক এজেন্ট নিষিদ্ধ করেছেন। তিনি মনে করেন, এগুলো সবই পরিপাকতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। আপনার কাছে যদি থাকে, তাহলে নির্দ্বিধায় ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু আমরা আপনাকে সরবরাহ করবো না, যদিও নিঃসন্দেহে আমাদের কাছে সেটা আছে।’

ফ্রান্সেসকা স্প্যানিশকে প্রশ্ন করলো ডন ড্যানি, ‘ঠিক কবে থেকে সাইকোডেলিক ড্রাগ প্রয়োজন হলো হ্যালুসিনেশনের জন্য? তোমার পুরো জীবনটাই তো একটা চলমান হ্যালুসিনেশন।’

একটুও না দমে ফ্রান্সেসকা বললো, ‘দুই রাত আগে কৌতূহল জাগানোর মতো অবিশ্বাস্য এক দর্শন লাভ করেছি আমি।’

‘শুনে একটুও অবাক হইনি,’ ডন ড্যানি বললো।

‘আমার দেখা সবচেয়ে সূক্ষ্ম দড়ির মই বেয়ে দলে দলে প্রিকা আর টেলিপ্যাথরা আমার জানালার বাইরে ব্যালকনিতে জড়ো হতে থাকে। দেয়ালের মাঝ দিয়ে একটা প্রবেশপথ তৈরি করে তারা আমার বিছানা ঘিরে দাঁড়ায়, অবিরাম কথা বলে আমাকে জাগিয়ে তোলে। পুরোনো দিনের সাহিত্য থেকে তারা পদ্য আর গদ্য আবৃত্তি করে শোনায়। ভালোই লাগছিলো শুনতে। ওদেরকে মনে হচ্ছিলো—’ ঠিক কোন শব্দটা ব্যবহার করলে পরিষ্কার বোঝানো যাবে সেটা একটু ভেবে নিলো সে—‘ঝলমলে। ওদের একজন নিজের নাম বলেছিলো বিল—’

‘এক মিনিট!’ টিটো অ্যাপাস্তাস বাধা দিয়ে বললো। ‘ঠিক একই রকম স্বপ্ন আমিও দেখেছি!’ জোয়ের দিকে ফিরলো সে। ‘মনে আছে, পৃথিবী ছাড়ার আগে আমি তোমাকে বলেছিলাম?’ উত্তেজিত হয়ে হাত নাড়ছে সে। ‘তাই না?’

‘স্বপ্নটা আমিও দেখেছি,’ টিপি জ্যাকসন বললো। ‘বিল আর ম্যাট। বলছিলো যে ওরা আমাকে শেষ করে ফেলবে।’

রাগে মুখ বাঁকা হয়ে গেল রানসাইটারের। জোয়ের উদ্দেশে বললেন, ‘আমাকে জানানো উচিত ছিলো।’

‘ঐ সময়, মানে… তুমি…’ বললো জো। ‘তোমাকে ভীষণ ক্লান্ত মনে হচ্ছিলো। তুমি আরো অনেক কিছু নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলে।’

ফ্রান্সেসকা ধারালো গলায় বললো, ‘ওটা কোনো স্বপ্ন ছিলো না, ছিলো সুস্পষ্ট দর্শন। পার্থক্যটা আমি বুঝতে পারি।’

‘অবশ্যই পারো, ফ্র্যান্সি,’ ডন ড্যানি বললো। চোখ সরু করে জোয়ের দিকে তাকালো সে।

‘আমিও একটা স্বপ্ন দেখেছি,’ জন ইড বললো। ‘কিন্তু সেটা ছিলো উড়াল গাড়ি নিয়ে। আমি ওগুলোর লাইসেন্স-প্লেট নাম্বার মনে রাখার চেষ্টা করছিলাম। শুধু ছয় আর পাঁচ সংখ্যাটা এখনো মনে রাখতে পেরেছি আমি শুনতে চাও?’

‘দুঃখিত, গ্লেন,’ রানসাইটারের উদ্দেশে বললো জো চীপ ‘ভেবেছিলাম শুধু অ্যাপাস্তাসই এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। অন্যদের বিষয়টা আমি জানতাম না। আমি—’ এলিভেটরের দরজা খোলার শব্দে থামতে বাধ্য হলো। কে এসেছে দেখার জন্য সে এবং বাকি সবাই ঘুরে দাঁড়ালো।

থলথলে ভুঁড়ি আর কুৎসিত মোটা দুটো পা নিয়ে মন্থর গতিতে ওদের দিকে এগিয়ে এলো স্ট্যান্টন মিক। বেঁটে লোকটার পরনে হাঁটুর খানিকটা নিচ পর্যন্ত লম্বা গোলাপি রঙের ট্রাউজার, শীতপ্রধান অঞ্চলের পাহাড়ি ষাঁড়ের রোমশ চামড়ার তৈরি স্লিপার, সাপের চামড়ার তৈরি হাতাবিহীন ছোট জামা, সাদা রং করা কোমর সমান লম্বা চুলগুলো বাঁধা একটা রিবন দিয়ে। আর তার নাক যেন গোল রাবারের মতো ফোলানো, অনেকটা নয়া দিল্লির রাস্তায় চলাচলকারী ট্যাক্সির ভেঁপুর মতো, মোলায়েম আর সহজে নিষ্পেষণ করার মতো। এবং রুক্ষ। আমার দেখা সবচেয়ে রুক্ষ নাক, জো ভাবলো।

‘স্বাগত, সবচেয়ে দক্ষ অ্যান্টি-পিএসআই বন্ধুগণ,’ স্ট্যান্টন মিক বললো, আন্তরিকভাবে স্বাগত জানানোর ভঙ্গিতে তার হাতদুটো পুরোপুরি দুই পাশে ছড়ানো। ‘বীর সৈনিকেরা চলে এসেছে—আমি আসলে আপনাদের কথাই বলছি।’ তার কণ্ঠস্বর কর্কশ, অন্তর্ভেদী, অনেকটা কাস্ট্রাটো গায়কদের মতো জোরালো, বিরক্তিকর। এই স্বর ধাতুর তৈরি যান্ত্রিক মৌচাক থেকে শোনা গেলেই স্বাভাবিক মনে হতো। ‘একটা মহামারি একাধিক সিওনিক ভাইরাসের রূপে স্ট্যান্টন মিকের নিরীহ, শান্তিপ্রিয়, বন্ধুভাবাপন্ন দুনিয়াতে আঘাত করেছে। এই মিকভাইলে—চাঁদের ছোট কিন্তু চমৎকার এই স্বর্গরাজ্যটাকে আমরা ভালোবেসে এই নাম দিয়েছি আর কি যা বলছিলাম, মিকভাইলে আমাদের জন্য সেটা যে কী পরিমাণ উৎকণ্ঠার একটা দিন ছিলো বলে বোঝাতে পারবো না। আপনারা নিশ্চয়ই ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করে দিয়েছেন, তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই। কারণ এই ক্ষেত্রে আপনারাই সবার সেরা। যখন আমি রানসাইটার এসোসিয়েটসের নাম প্রস্তাব করি, তখন এই কথাটা সকলেই একবাক্যে মেনেও নেয়। আপনাদের কার্যক্রমে আমি সন্তুষ্ট, শুধু একটা ব্যাপার ছাড়া। এই লোক নিশ্চয়ই আপনাদের পরীক্ষক, নিজের যন্ত্র নিয়ে কাজ করছে। পরীক্ষক, যেহেতু আমি আপনার সাথে কথা বলছি, দয়া করে আমার দিকে একটু মনোযোগ দেবেন কি?’

পলিগ্রাফ আর গেজগুলো গুটিয়ে রেখে পাওয়ার সাপ্লাই বন্ধ করে দিলো জো।

‘আমি কি এখন আপনার মনোযোগ পেতে পারি?’ স্ট্যান্টন মিক জিজ্ঞেস করলো।

‘হ্যাঁ,’ জো বললো।

‘তোমার যন্ত্রগুলো চালু করে রাখো,’ রানসাইটার তাকে আদেশ দিলেন। ‘তুমি মি. মিকের কর্মচারী না, তুমি আমার কর্মচারী।’

‘দরকার নেই,’ জবাব দিলো জো। ‘নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে সৃষ্ট পিএসআই শক্তিক্ষেত্রের পরিমাপ পেয়ে গেছি আমি।’ জো তার কাজ শেষ করে ফেলেছে। আসতে দেরি করেছে স্ট্যান্টন মিক।

‘ওদের শক্তিক্ষেত্র কতটুকু শক্তিশালী?’ রানসাইটার জিজ্ঞেস করলেন।

‘এখানে কোনো শক্তিক্ষেত্র নেই,’ বললো জো।

‘আমাদের ইনার্শিয়ালরা ওদেরকে নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে? আমাদের পালটা-শক্তিক্ষেত্র তাহলে অনেক বেশি শক্তিশালী?’

‘না,’ জো বললো। ‘আমি বলেছি, আমার যন্ত্রের আওতার মধ্যে কোনো ধরনের পিএসআই শক্তিক্ষেত্র নেই। শুধু আমাদের নিজেদের শক্তিক্ষেত্র পেয়েছি, যেহেতু আমার যন্ত্রগুলো যথাযথভাবে কাজ করছে, তাই আমার দৃঢ় বিশ্বাস যা পেয়েছি তা শতভাগ নির্ভুল। আমরা ২,০০০ বিএলআর ইউনিট শক্তি উৎপাদন করছি, এক মিনিট পরপর সেটা বেড়ে হচ্ছে ২,১০০। সম্ভবত ধাপে ধাপে পরিমাণটা আরো বৃদ্ধি পাবে, যখন আমাদের ইনার্শিয়ালরা সম্মিলিতভাবে কাজ শুরু করবে তখন। ধরা যাক, বারো ঘণ্টা পর, তখন এই পরিমাণ হতে পারে সর্বোচ্চ—’

‘কিছুই বুঝতে পারছি না আমি,’ রানসাইটার বললেন। ইনার্শিয়ালদের সবাই এখন জো চীপের চারপাশে জড়ো হয়েছে। পলিগ্রাফ থেকে বের হওয়া একটা টেপ তুলে নিলো ডন ড্যানি। বিচ্যুতিহীন সরল রেখাগুলো পরীক্ষা করে দেখলো, তারপর টিপি জ্যাকসনের হাতে দিলো সেটা। একে একে ইনার্শিয়ালদের সবাই সংগৃহীত উপাত্ত পরীক্ষা করে দেখলো কোনো কথা না বলে, তারপর সবাই একযোগে তাকালো রানসাইটারের দিকে।

স্ট্যান্টন মিকের উদ্দেশে রানসাইটার বললেন, ‘আপনার কেন ধারণা হলো যে চাঁদের এই প্রজেক্টে পিএসআই গুপ্তচরের অনুপ্রবেশ ঘটেছে? কেন আপনি প্রাথমিক পর্যবেক্ষণগুলো করতে বাধা দিলেন আমাদের? এমন একটা ফলাফল যে পাবো সেটা কি আপনি জানতেন?’

‘অবশ্যই সে জানতো,’ জো চীপ বললো। এই ব্যাপারে সে পুরোপুরি নিশ্চিত।

রাগ, ক্ষোভ আর শঙ্কা, একসাথে অনেকগুলো ভাব ফুটে উঠলো রানসাইটারের চেহারায়। স্ট্যান্টন মিকের উদ্দেশে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন তিনি, মত পালটে কণ্ঠস্বর নিচু করে জোয়ের উদ্দেশে বললেন, ‘পৃথিবীতে ফিরে যেতে হবে। আমাদের সব ইনার্শিয়ালদের এই মুহূর্তে নিরাপদে বের করে নিয়ে যেতে হবে এখান থেকে।’

জোরালো কণ্ঠে বাকি সবার উদ্দেশে বললেন, ‘তোমাদের সবকিছু গুছিয়ে নাও, আমরা নিউ ইয়র্কে ফিরে যাচ্ছি। ঠিক পনেরো মিনিটের মধ্যে সবাইকে মহাকাশযানে দেখতে চাই আমি। যে আসতে ব্যর্থ হবে, তাকে রেখেই আমরা চলে যাবো। জো, তোমার ঐ জঞ্জালগুলো গুছিয়ে নাও দ্রুত। ওগুলো মহাকাশযানে নিয়ে যাওয়ার কাজে আমি তোমাকে সাহায্য করবো, যদি প্রয়োজন হয়—যাই হোক, আমি ওটাকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যেতে চাই, সেই সাথে তোমাকেও।’ আবারও মিকের দিকে ফিরলেন তিনি, রাগে তার মুখ ফুলে উঠেছে। কথা বলতে শুরু করলেন তিনি—

ধাতব পতঙ্গের মতো কর্কশ কণ্ঠে কথা বলতে বলতে ভেসে ভেসে কামরার ছাদের দিকে উঠে গেল স্ট্যান্টন মিক, ফোলানো বেলুনের মতো বাহুদুটো দৃঢ়ভাবে দুদিকে প্রসারিত। ‘মি. রানসাইটার, শান্ত হোন, রাগ আর উত্তেজনা যেন আপনার স্বাভাবিক চিন্তাভাবনাকে ব্যাহত না করতে পারে। বিচক্ষণতার সাথে এই পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে, তাড়াহুড়ো করে কোনো সিন্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না; আপনার লোকদের শান্ত হতে বলুন এবং আসুন একসাথে আলোচনা করে সমাধানের একটা পথ খুঁজে বের করি।’ তার গোলাকার, বর্ণিল দেহ একটা ডিগবাজি দিলো, মন্থর গতিতে মোচড় দিয়ে ঘুরলো আড়াআড়িভাবে। যার ফলে তার মাথার বদলে পাদুটো এখন প্রসারিত হয়ে আছে রানসাইটারের দিকে।

‘এই জিনিসের কথা আমি আগে শুনেছি,’ জোকে বললেন রানসাইটার। ‘এটা একটা আত্মঘাতি স্বয়ংক্রিয় মানব বোমা। সবাইকে বের করে নিয়ে যেতে আমাকে সাহায্য করো। ওরা এইমাত্র বোমাটাকে সক্রিয় করে দিয়েছে। সেজন্যই ওটা উপরে ভেসে গেছে।’

ঠিক সেই মুহূর্তেই বিস্ফোরিত হলো বোমাটা।

ধোঁয়া আর কটু গন্ধে ভরে গেছে চারপাশ। বিস্ফোরণের ধাক্কায় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে মেঝে আর দেয়ালগুলো। সামনের কিছুই দেখা যাচ্ছে না, সব ঝাপসা, এলোমেলো কয়েকটা দেহ পড়ে আছে জো চীপের পায়ের কাছে।

জোয়ের কানের কাছে ডন ড্যানি তারস্বরে চিৎকার করছে। ‘ওরা রানসাইটারকে খুন করেছে, মি. চীপ! কোনো সন্দেহ নেই যে ওটা মি. রানসাইটার,’ উত্তেজনায় তোতলাতে শুরু করলো সে।

‘আর কে?’ জড়ানো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো জো, শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছে। বিষাক্ত ধোঁয়া দম আটকে রেখেছে তার। মাথা ভোঁ ভোঁ করছে বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দে, মনে হচ্ছে গলা বেয়ে উষ্ণ কী যেন গড়িয়ে নামছে। ছিটকে আসা ধারালো টুকরোয় আহত হয়েছে সে।

ওয়েন্ডি রাইট তার কাছাকাছিই ছিলো, যদিও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। ‘আমার মনে হয় সবাই কমবেশি আহত হয়েছে কিন্তু বেঁচে আছে।’

রানসাইটারের পাশে বসে এডি ডর্ন বললো, ‘রে হোলিসের কোনো অ্যানিমেটরকে পাওয়া যাবে?’ বিধ্বস্ত আর ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে তার চেহারা। ‘না,’ বললো জো, নিজেও বসলো মেঝেতে। ‘ভুল হয়েছে তোমার,’ ডন ড্যানিকে বললো সে। ‘রানসাইটার বেঁচে আছে।’

কিন্তু ছিন্নভিন্ন মেঝেতে শুয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন রানসাইটার।

দুই মিনিট অথবা তিন মিনিট পরে ডন ড্যানির কথাই বাস্তবে পরিণত হবে। ‘শোনো সবাই,’ জো তার কণ্ঠস্বর উঁচু করে বললো। ‘যেহেতু রানসাইটার আহত হয়েছে, আমি দায়িত্ব নিচ্ছি—আপাতত, অন্তত ডেরাতে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত।’

‘যদি কখনো ফিরতে পারি আর কি,’ আল হ্যামন্ড বললো। তার চোখের উপর একটা গভীর ক্ষত। ভাঁজ করা একটা রুমাল চেপে রেখেছে ক্ষতের উপর।

‘তোমাদের কার কার কাছে অস্ত্র আছে?’ জিজ্ঞেস করলো জো। ইনার্শিয়ালরা কোনো জবাব দিলো না। নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত সবাই। ‘আমি জানি এটা সামাজিক আইন বহির্ভূত,’ জো বললো। ‘কিন্তু এটাও জানি যে তোমাদের অনেকের কাছেই অস্ত্র আছে। আইনের কথা ভুলে যাও এখন। ইনার্শিয়াল হিসেবে কাজ করার সময় অস্ত্র বহন করার বিষয়ে যা বিধিনিষেধ শিখেছ সব ভুলে যাও।’

খানিক বিরতির পর টিপি জ্যাকসন বললো, ‘আমার অস্ত্রটা আমার ব্যাগে রয়ে গেছে। পাশের কামরায়।’

‘আমারটা সাথেই আছে,’ টিটো অ্যাপাস্তাস বললো। এরই মধ্যে অস্ত্রটা বের করে ডান হাতে নিয়েছে, পুরোনো আমলের একটা ছররা পিস্তল।

‘তোমাদের যাদের কাছে অস্ত্র আছে তারা বের করো,’ জো বললো। ‘আর ওগুলো যদি পাশের কামরায় থাকে, দ্রুত নিয়ে এসো।’

ছয়জন ইনার্শিয়াল দরজার দিকে ছুটলো।

আল হ্যামন্ড আর ওয়েন্ডি রাইট জোয়ের সাথে ছিলো, তাদের উদ্দেশে জো বললো, ‘রানসাইটারকে কোল্ড-প্যাকে নিয়ে যেতে হবে।’

‘মহাকাশযানে একটা কোল্ড-প্যাক আছে,’ আল হ্যামন্ড বললো।

‘তাহলে আমরা তাকে ওখানেই নিয়ে যাবো,’ জো বললো। ‘হ্যামন্ড, একদিকে ধরো, আর আমি অন্য দিকে ধরছি। অ্যাপাস্তাস, তুমি সামনে থাকো। হোলিসের কেউ যদি আমাদের বাধা দিতে আসে সরাসরি গুলি করবে।’

জন ইড একটা লেজার টিউব নিয়ে এলো পাশের কামরা থেকে। বললো, ‘আপনার কি মনে হয় মি. মিকের সাথে হোলিসও ছিলো?’

‘ওর সাথে,’ জো বললো, ‘অথবা নিজেই ছিলো। আমরা হয়তো কখনোই মিকের সাথে চুক্তি করিনি। সম্ভবত শুরু থেকেই হোলিস ছিলো এই সবকিছুর পেছনে।’ অদ্ভুত ব্যাপার, সে ভাবলো, মানব বোমা আমাদের কাউকেই হত্যা করতে পারেনি। জোয়ি ওয়ির্টের কথা ভেবে অবাক হলো সে। নিঃসন্দেহে বিস্ফোরণের আগেই সে নিরাপদ স্থানে চলে গেছে আশেপাশে তার কোনো চিহ্নই দেখছে না সে। যখন বুঝতে পারবে যে সে আসলে স্ট্যান্টন মিকের প্রতিনিধি হয়ে কাজ করছিলো না, তার প্রতিক্রিয়া কী হবে। তার নিয়োগকর্তা—আসল নিয়োগকর্তা—আমাদের ভাড়া করেছিলো, নিয়ে এসেছে এখানে আমাদেরকে হত্যা করার জন্য। ওরা হয়তো মিস ওয়ির্টকেও হত্যা করবে নিজেদেরকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখার জন্য। মিস ওয়ির্টের আর কোনো প্রয়োজন নেই। বরং সে এই বর্বর হামলার প্রত্যক্ষদর্শী।

অস্ত্র হাতে বাকি ইনার্শিয়ালরা ফিরে এলো; অপেক্ষা করছে জোয়ের নির্দেশের। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে তাদের সবাইকেই ধাতস্থ আর আত্মবিশ্বাসী মনে হলো।

‘রানসাইটারকে যদি দ্রুত কোল্ড-প্যাকে নিয়ে যেতে পারি, এই প্রতিষ্ঠান সে পরিচালনা করতে পারবে। তার স্ত্রী যেভাবে পরিচালনা করছে সেভাবে,’ আল হ্যামন্ডের সাথে ধরাধরি করে তাদের মৃতপ্রায় মনিবকে এলিভেটরের দিকে নিয়ে যেতে যেতে ব্যাখ্যা করলো জো। কনুই দিয়ে এলিভেটরের বোতাম চাপলো সে। ‘এলিভেটর নেমে আসবে সেই সম্ভাবনা কম। ওরা হয়তো বিস্ফোরণের সময়ই পাওয়ার সাপ্লাই বন্ধ করে দিয়েছে।’ কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে এলিভেটর নেমে এলো। দ্বিধান্বিত হয়ে সে আর আল হ্যামন্ড ভেতরে ঢুকলো রানসাইটারকে নিয়ে। ‘যাদের কাছে অস্ত্র আছে, এমন তিনজন আমাদের সাথে আসবে। বাকি সবাই—’

‘গোল্লায় যাক সবকিছু,’ স্যামি মুন্ডো বললো। ‘এলিভেটরের ফিরে আসার জন্য আমরা এখানে বিপদ মাথায় নিয়ে বসে থাকতে পারবো না। ওটা এরপর আর নেমে না-ও আসতে পারে।’ সামনে বাড়লো সে, মুখে আতঙ্কের ছাপ।

‘রানসাইটার সবার আগে যাবে,’ কর্কশ সুরে বললো জো। একটা বোতাম চাপতেই এলিভেটরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। তাকে আর রানসাইটারকে মাঝখানে রেখে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে আল হ্যামন্ড, টিটো অ্যাপাস্তাস, ওয়েন্ডি রাইট আর ডন ড্যানি। ‘এছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না,’ এলিভেটর উপরে ওঠা শুরু করতেই সবার উদ্দেশে সে বললো। ‘আর যদি হোলিসের এজেন্টরা উপরে থাকে, প্রথম হামলার ধাক্কা আমাদেরই সামলাতে হবে। তবে আমাদের কাছে যে অস্ত্র আছে, সেটা ওরা আশা করবে না।’

‘একটা আইন আছে,’ ডন ড্যানি মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলো। ‘দেখো সে বেঁচে আছে কি না,’ টিটো অ্যাপাস্তাসের উদ্দেশে বললো জো।

সামনে ঝুঁকে নিশ্চল দেহটা পরীক্ষা করে দেখলো অ্যাপাস্তাস। ‘এখনো শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে ক্ষীণভাবে,’ অন্যমনস্ক সুরে বললো সে। ‘এখনো সুযোগ আছে আমাদের।’

‘হ্যাঁ, একটাই সুযোগ আছে,’ জো বললো। এখনো তার অনুভূতিগুলো অসাড় হয়ে আছে। বিস্ফোরণের ধাক্কায় শারীরিক আর মানসিকভাবে যেমন অসাড় হয়ে ছিলো তেমনই। ঠান্ডা লাগছে তার এবং মনে হলো কানের পর্দার বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। কোনোভাবে যদি নিজেদের মহাকাশযানে একবার ঢুকতে পারি, সে ভাবলো, রানসাইটারকে কোল্ড-প্যাকে রাখার পর সাহায্য চেয়ে নিউ ইয়র্কে খবর পাঠাবো তাহলে, প্রতিষ্ঠানের সবার কাছে। প্রয়োজনে সব প্রুডেন্স অর্গানাইজেশনের কাছে সাহায্য চাইবো। যদি আমরা উড্ডয়ন না করতে পারি, ওরা আসতে পারবে আমাদেরকে সাহায্য করার জন্য।

কিন্তু বাস্তবে সেই সম্ভাবনা শূন্য। কারণ যতক্ষণে পৃথিবী থেকে সাহায্য এসে চাঁদে পৌঁছাবে, ততক্ষণে সাবসার্ফেস এলিভেটর আর মহাকাশযানে আটকে পড়া সবাই মারা যাবে। সুতরাং, এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

‘তুমি আরো কয়েকজনকে এলিভেটরে ওঠার সুযোগ দিতে পারতে,’ টিটো অ্যাপাস্তাস বললো। অভিযোগের দৃষ্টিতে তাকালো জোয়ের দিকে উত্তেজনায় হাতদুটো কাঁপছে তার।

‘হামলার প্রথম ধাক্কাটা আমরাই সামলাবো,’ জো বললো। ‘বিস্ফোরণ থেকে কেউ বেঁচে গেলে সে এলিভেটর ব্যবহার করবে, হোলিস জানে সেটা। আমরা ঠিক সেটাই করছি। হয়তো এই কারণেই ওরা পাওয়ার সাপ্লাই বন্ধ করেনি। ওরা জানে, আমরা মহাকাশযানে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করবো।’

‘তুমি ইতোমধ্যেই সেটা আমাদের ব্যাখ্যা করে বলেছ, জো,’ ওয়েন্ডি রাইট বললো।

‘আমি যা করেছি সেটার পেছনের যুক্তিটা তোমাদের বোঝানোর চেষ্টা করছি,’ সে বললো। ‘বাকি সবাইকে নিচে রেখে আসার বিষয়টা ব্যাখ্যা করছি।’

‘নতুন মেয়েটার ট্যালেন্টের কী হলো,’ জিজ্ঞেস করলো ওয়েন্ডি ‘গোমড়ামুখো, বিরক্তিকর আর অহংকারী মেয়েটা, প্যাট না কী যেন নাম? তুমি ওকে বলো অতীতে ফিরে যেতে, রানসাইটার আহত হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে। এই সবকিছুই সে বদলে দিতে পারে। ওর ক্ষমতার কথা কি তুমি ভুলে গেছ?’

‘হ্যাঁ,’ দাঁতে দাঁত চেপে বললো জো। বিস্ফোরণের ধাক্কায় আসলেই ভুলে গিয়েছিলো সে।

‘চলো নিচে নেমে যাই,’ টিটো অ্যাপাস্তাস বললো। ‘তুমি বলেছ যে হোলিসের এজেন্টরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তুমি এটাও বলেছ যে আমরা সবচেয়ে বিপদে—’

‘আমরা উপরে পৌঁছে গেছি,’ ডন ড্যানি বললো। ‘এলিভেটর থেমে গেছে।’ উত্তেজনায় তার শরীর শক্ত হয়ে আছে। ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে তাকে। দরজা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একপাশে সরে যাওয়ার সময় নার্ভাসভাবে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজালো।

সামনেই একটা চলমান ফুটপাথ সোজা উঠে গিয়ে যুক্ত হয়েছে বহুমুখী এক সঙ্গমস্থলে, যার শেষ মাথায় বায়ু চলাচলকারী দরজার পেছনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে তাদের মহাকাশযান—যেমন রেখে গিয়েছিলো ঠিক তেমনই। এবং মহাকাশযান আর তাদের মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে নেই কেউ।

অদ্ভুত, ভাবলো জো চীপ। ওরা কি এতটাই নিশ্চিত ছিলো যে মানব বোমা বিস্ফোরণে আমরা সবাই মারা যাবো? ওদের পরিকল্পনায় নিশ্চয়ই কোনো ভুল হয়েছে। প্রথমে বিস্ফোরণের সময়, তারপর পাওয়ার সাপ্লাই চালু রাখা—আর এখন সামনের ফাঁকা করিডর।

‘আমার মনে হয়, বোমাটা ভেসে ছাদের কাছে চলে যাওয়ায় তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে,’ ডন ড্যানি বললো। জো আর আল হ্যামন্ড তখন এলিভেটর থেকে রানসাইটারকে বহন করে চলমান ফুটপাথে নিয়ে যাচ্ছিলো। ‘সম্ভবত ওটা ছিলো একটা ফ্র্যাগমেন্টেশন টাইপ বোমা এবং পুরো ধাক্কাটা সামলেছে উপরের ছাদ। আমার ধারণা, ওরা কল্পনাও করেনি যে আমরা কেউ বেঁচে থাকবো। আর সেজন্যই হয়তো পাওয়ার সাপ্লাই বন্ধ করেনি।’

‘বেশ, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দাও যে বোমাটা ভেসে ছাদের দিকে উঠে গিয়েছিলো,’ ওয়েন্ডি রাইট বললো। ‘হে ঈশ্বর, এখানে প্রচণ্ড ঠান্ডা বিস্ফোরণ নিশ্চয়ই হিটিং সিস্টেম অকেজো করে দিয়েছে।’ পরিষ্কার দেখা গেল ঠান্ডায় কাঁপছে সে।

ভয় জাগানোর মতো ধীর গতিতে চলমান ফুটপাথ তাদের নিয়ে এগিয়ে চলেছে। জোয়ের মনে হলো দুই ধাপের বায়ু চলাচল দরজাগুলোর কাছে পৌঁছাতে পাঁচ মিনিট বা তারও বেশি সময় লেগেছে। যা কিছু ঘটছে তার সবচেয়ে খারাপ দিক হচ্ছে এভাবে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে এগোনো, যেন উদ্দেশ্যমূলকভাবেই রে হোলিস তাদের পালানোর এই ব্যবস্থা করে রেখেছে।

‘দাঁড়াও!’ পেছন থেকে কে যেন বললো। শোনা গেল পায়ের শব্দ। ঝট করে ঘুরলো টিটো অ্যাপাস্তাস। পিস্তল উঁচু করে ধরা। তারপর নামিয়ে নিলো।

‘দলের বাকি সবাই,’ জোকে জানালো ডন ড্যানি। কারণ পেছনে কী হচ্ছে সেটা দেখার কোনো উপায় জোয়ের নেই। সে আর আল হ্যামন্ড বায়ু চলাচলকারী দরজার জটিল ফাঁক দিয়ে রানসাইটারকে বয়ে নেওয়ার কাজে ব্যস্ত। ‘সবাই আছে, কোনো সমস্যা নেই।’ পিস্তল হাতে ধরা অবস্থাতেই সবাইকে নিজের দিকে আসার জন্য ইশারা করলো। ‘চলে এসো!’

বহুমুখী সঙ্গমস্থল থেকে প্লাস্টিকের টানেলটা এখনো তাদের মহাকাশযানের সাথে যুক্ত হয়ে আছে। ওরা কি আমাদের চলে যেতে দেবে? টানেলের মেঝে থেকে সৃষ্টি হওয়া ভোঁতা শব্দ শুনতে শুনতে ভাবছে জো। নাকি ওরা আমাদের জন্য মহাকাশযানের ভেতরে অপেক্ষা করছে? মনে হচ্ছে, একটা অশুভ শক্তি আমাদের নিয়ে যেন ইঁদুর-বিড়াল খেলছে, আর আমরা তাদের মনোরঞ্জন করছি। আমাদের পালানোর প্রচেষ্টা তাদের জন্য বিনোদন। আর যখন আমরা বাঁচার দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবো, ঠিক তখনই ওরা চূড়ান্ত আঘাত হানবে। শেষ করে দেবে রানসাইটারের মতো, যার নিথর দেহ পড়ে আছে মন্থর গতিতে চলমান মেঝেতে।

‘ড্যানি,’ সে বললো। ‘প্রথমে তুমি মহাকাশযানের ভেতরে ঢুকবে। আড়াল থেকে দেখবে ওরা কেউ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে কি না।’

‘যদি থাকে?’ ড্যানি জিজ্ঞেস করলো।

‘তাহলে ফিরে আসবে,’ দাঁত কিড়মিড় করে বললো জো। ‘আমাদের জানাবে। আমরা আত্মসমর্পণ করবো, এরপর ওরা আমাদের সবাইকে খুন করবে।’

‘প্যাট না কী যেন নাম মেয়েটার, ওকে বলো ওর ট্যালেন্ট ব্যবহার করতে,’ নিচু কিন্তু জেদি কণ্ঠে বললো ওয়েন্ডি রাইট। ‘প্লিজ, জো।’

‘তারচেয়ে বরং মহাকাশযানে ওঠার চেষ্টা করি,’ টিটো অ্যাপাস্তাস বললো। ‘মেয়েটাকে আমি পছন্দ করি না। ওর ট্যালেন্টের উপরও আমার কোনো বিশ্বাস নেই।’

‘তুমি ওকে বা ওর ট্যালেন্টকে ঠিক বুঝতে পারো না,’ জো বললো। কৃশকায় ও ছোট আকৃতির ডন ড্যানির মাপা পায়ে টানেল বেয়ে উপরে উঠে যাওয়া দেখছে। মহাকাশযানের প্রবেশমুখে কিছু যন্ত্রপাতি নাড়লো সে, তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল ভেতরে। ‘ও আর কখনো ফিরে আসবে না,’ ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললো জো। গ্লেন রানসাইটারের ওজন মনে হচ্ছে আরো বেড়ে গেছে। আর ধরে রাখতে পারছে না সে। ‘রানসাইটারকে এখানে নামিয়ে রাখা যাক,’ আল হ্যামন্ডকে বললো সে। দুজনে সাবধানে রানসাইটারের দেহ টানেলের মেঝেতে নামিয়ে রাখলো। ‘বৃদ্ধ হলেও মানুষটার ওজন আছে,’ জো বললো, সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে আবার। ওয়েন্ডির উদ্দেশে বললো, ‘আমি প্যাটের সাথে কথা বলবো।’

ইতোমধ্যেই বাকি সবাই চলে এসেছে। বিচলিতভাবে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছে মহাকাশযানে প্রবেশ করার দরজার সাথে যুক্ত টানেলে। ‘ব্যর্থ হয়েছি আমরা,’ অস্ফুটে বললো জো। ‘অথচ আমরা আশা করেছিলাম এটা হবে আমাদের জীবনের সেরা কাজ। বলতে বাধ্য হচ্ছি, এইবার হোলিস আমাদের পুরোপুরি পরাজিত করেছে।’ হাতের ইশারায় প্যাটকে ডাকলো সে। মেয়েটার মুখে ময়লা লেগে আছে আর তার হাতাবিহীন ব্লাউজের অনেক জায়গায় ছিঁড়েও গেছে। দেখা যাচ্ছে হাল ফ্যাশনের ইলাস্টিক ব্যান্ড, যার বাঁধনে আবদ্ধ তার স্তনযুগল। বোঝাই যাচ্ছে অত্যন্ত মূল্যবান অন্তর্বাস কারণ সেটাতে হালকা গোলাপি রঙের ফ্লেয়ার-ডি-লিস প্রিন্ট করা। কোনোরকম যৌক্তিক কারণ ছাড়াই সম্পর্কহীন, অর্থহীন একটা বোধ তৈরি হলো তার মনের মাঝে। ‘শোনো,’ মেয়েটাকে বললো সে, কাঁধে একটা হাত আর চোখে চোখ রেখে। সমান তালে একই রকম দৃষ্টি ফিরিয়ে দিলো প্যাট। ‘তুমি কি অতীতে ফিরে যেতে পারবে? বোমাটা ডেটোনেট করার ঠিক আগ মুহূর্তে? পারবে গ্লেন রানসাইটারকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে?’

‘অনেক দেরি হয়ে গেছে,’ প্যাট বললো।

‘কেন?’

‘কারণ বোমা বিস্ফোরিত হওয়ার পর অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। যা করতে বলছো সেটা ঠিক ঐ মুহূর্তেই করা উচিত ছিলো।’

‘তাহলে করোনি কেন?’ ক্ষোভের সাথে জিজ্ঞেস করলো ওয়েন্ডি রাইট।

ওয়েন্ডির চোখে চোখ রাখলো প্যাট। ‘তুমি নিজেও কি কথাটা ভেবেছিলে? যদি ভেবে থাকো, তুমি সেটা বলোনি। অন্যরাও বলেনি।’

‘তোমার নিজের কোনো দায়িত্ব নেই তাহলে?’ ওয়েন্ডি বললো। ‘রানসাইটারের মৃত্যুর জন্য, যেখানে তোমার ট্যালেন্ট হয়তো এই পরিস্থিতি বদলে দিতে পারতো?’

প্যাট কোনো জবাব না দিয়ে হাসলো।

মহাকাশযান থেকে ফিরে এসে ডন ড্যানি বললো, ‘ওখানে কেউ নেই।’

‘ঠিক আছে,’ বললো জো, আল হ্যামন্ডকে ইশারা করলো। ‘চলো, রানসাইটারকে মহাকাশযানে নিয়ে কোল্ড-প্যাকে রাখার ব্যবস্থা করি।’ সে আর আল হ্যামন্ড আবার নিথর, ভারী দেহটা তুলে নিলো। তারপর এগিয়ে চললো মহাকাশযানের দিকে। ইনার্শিয়ালদের সবাই তাকে ঘিরে গায়ে গা ঘেঁষে এগোতে লাগলো, সবাই নিরাপত্তার জন্য উদ্‌গ্রীব। মনে হচ্ছে তাদের দেহ থেকেই ভয়ের আভা বিচ্ছুরিত হচ্ছে, স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে জো। সম্ভাবনা আছে যে তারা হয়তো প্রাণ নিয়ে চাঁদ থেকে পালাতে পারবে, আর এই আশাটুকু তাদের আরো বেপরোয়া করে তুলেছে। তাদের বিহ্বল আর হাল ছেড়ে দেওয়ার ভাবটা চলে গেছে পুরোপুরি।

‘চাবি কোথায়?’ জন ইড তীক্ষ্ণ কণ্ঠে জোয়ের কানের কাছে চিৎকার করলো। যখন সে আর আল হ্যামন্ড রানসাইটারকে হাঁচড়েপাঁচড়ে কোল্ড-প্যাক চেম্বারের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলো, তখন জোয়ের বাহু খামচে ধরলো সে। ‘চাবি, মি. চীপ।’

আল হ্যামন্ড বুঝিয়ে দিলো। ‘ইগনিশন কি, মহাকাশযান চালু করার জন্য। ওটা নিশ্চয়ই রানসাইটারের পকেটে আছে। কোল্ড-প্যাকে ঢোকানোর আগে ওটা বের করে নিতে হবে। কারণ এরপর আর তাকে বের করে আনা যাবে না।’

রানসাইটারের পকেটগুলো হাতড়ে চামড়ার তৈরি চাবি রাখার একটা ব্যাগ পেল জো। জন ইডের হাতে দিলো সেটা। ‘এখন আমরা তাকে কোল্ড-প্যাকে রাখতে পারি?’ রাগের সাথে বললো সে। ‘এসো, হ্যামন্ড, ঈশ্বরের দিব্যি, মানুষটাকে কোল্ড-প্যাকে রাখার কাজে আমাকে সাহায্য করো।’ কিন্তু আমরা দ্রুত আসতে পারিনি, নিজেকে বললো জো। প্রচণ্ড ক্লান্তিতে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে ও। সব শেষ। ব্যর্থ হয়েছি আমরা। বেশ, তবে তাই হোক।

প্রচণ্ড গর্জন করে চালু হলো প্রাথমিক রকেটগুলো। পুরো মহাকাশযান কেঁপে উঠলো; কারণ কন্ট্রোল কনসোলে চারজন ইনার্শিয়াল একসাথে কম্পিউটারাইজড কমান্ড চালু করার চেষ্টায় গলদঘর্ম হচ্ছে।

ওরা আমাদেরকে চলে যেতে দিলো কেন? নিজেকে প্রশ্ন করলো জো। আল হ্যামন্ড আর সে তখন দাঁড়িয়ে ছিলো রানসাইটারের প্রাণহীন—অথবা বলা যায় আপাতদৃষ্টিতে প্রাণহীন দেহের পাশে। মেঝে থেকে সিলিং পর্যন্ত লম্বা কোল্ড-প্যাক চেম্বার। স্বয়ংক্রিয় কিছু ক্ল্যাম্পস রানসাইটারের উরু আর কাঁধ আঁকড়ে ধরে ঝুলিয়ে রেখেছে তাকে। আর হিমশীতলতার মাঝে চকচকে কৃত্রিম প্রাণ বজ্রের মতো ঝলসে উঠে জো চীপ আর আল হ্যামন্ডকে প্রায় অন্ধ করে দিলো। ‘আমি কিছুই বুঝতে পারছি না,’ সে বললো।

‘ওদের পরিকল্পনায় গলদ ছিলো,’ হ্যামন্ড বললো। ‘বোমা ছাড়া তাদের অন্য কোনো বিকল্প পরিকল্পনাও ছিলো না। বোমা দিয়ে হিটলারকে হত্যা করার সেই পরিকল্পনাকারীর মতো। ওরা যখন দেখে যে বাংকারে বিস্ফোরণ ঘটেছে, ওরা অনুমান করে নেয়—’

‘ঠান্ডায় মরে যাওয়ার আগে চলো এই চেম্বার থেকে বের হই,’ জো বললো। হ্যামন্ডকে নিজের সামনে ঠেলে দিলো সে। বেরিয়ে এসে চেম্বারের দরজাটা বন্ধ করলো দুজনে মিলে। ‘ঈশ্বর, কী অস্বস্তিকর অনুভূতি! ওরকম একটা শক্তি জীবন সংরক্ষণ করে রাখে, ভাবতেই কেমন যেন লাগে।’

সে যখন মহাকাশযানের ফোর সেকশনের দিকে যাচ্ছিলো, ফ্র্যান্সি স্প্যানিশ থামালো তাকে। মেয়েটার বিনুনি করা চুল ঝলসে গেছে। ‘কোল্ড-প্যাকে কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থা আছে?’ জিজ্ঞেস করলো সে। ‘আমরা কি মি. রানসাইটারের সাথে এখন পরামর্শ করতে পারবো?’

‘কোনো পরামর্শ করা যাবে না,’ জো বললো মাথা নেড়ে। ‘ইয়ারফোন নেই, মাইক্রোফোন নেই। নেই কোনো প্রোটোফেশন। নেই অর্ধ-জীবন। অন্তত আমরা পৃথিবীতে ফিরে তাকে কোনো মোরাটোরিয়ামে স্থানান্তর না করা পর্যন্ত।’

‘তাহলে কীভাবে বুঝবো যে তাকে আমরা সময়মতোই হিমায়িত করেছি?’ ডন ড্যানি জিজ্ঞেস করলো।

‘বলতে পারবো না,’ সরাসরি জবাব দিলো জো।

‘তার মস্তিষ্ক হয়তো অকার্যকর হয়ে পড়েছে,’ স্যামি মুন্ডো বললো, দেখে মনে হলো দাঁত বের করে হাসছে সে।

‘ঠিক বলেছ,’ জো বললো। ‘আমরা হয়তো আর কোনোদিন রানসাইটারের কণ্ঠস্বর অথবা চিন্তা শুনতে পাবো না। তাকে ছাড়াই হয়তো রানসাইটার এসোসিয়েটস পরিচালনা করতে হবে আমাদের। হয়তো ইলার যতটুকু এখনো কার্যকর আছে তার উপর নির্ভর করতে হবে। আমাদের হয়তো বিলাভেড ব্রেদরেন মোরাটোরিয়ামে অফিস স্থানান্তর করতে হবে, মানে জুরিখে। এবং ওখান থেকেই কাজ চালাতে হবে।’ মাঝখানের পায়ে চলার লম্বা পথের পাশের একটা আসনে বসলো সে, দেখতে পেল চারজন ইনার্শিয়াল তখন মহাকাশযানটাকে সঠিক পথে রাখার জন্য কসরত করছে। কেমন যেন এক আচ্ছন্নতা জড়িয়ে রেখেছে তাকে, ঘটনার আকস্মিকতার ধাক্কা আর নিস্তেজতা দূর করার জন্য একটা সিগারেট বের করে ধরালো।

কিন্তু সিগারেটটা এতই শুকনো আর বাসি ছিলো যে দুই আঙুলের ফাঁকে ধরার চেষ্টা করতেই ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেল। অদ্ভুত ব্যাপার, ভাবলো সে।

‘বিস্ফোরণ,’ ঘটনাটা লক্ষ করে আল হ্যামন্ড বললো। ‘প্রচণ্ড তাপ।’

‘এই ঘটনা কি আমাদের বয়স বাড়িয়ে দিয়েছে?’ আল হ্যামন্ডের পেছন থেকে ওয়েন্ডি জিজ্ঞেস করলো, তারপর হ্যামন্ডকে টপকে জোয়ের পাশে এসে বসলো। ‘নিজেকে আমার বৃদ্ধ মনে হচ্ছে। আমি বৃদ্ধ, তোমার সিগারেটের প্যাকেট পুরোনো। আমরা সবাই বৃদ্ধ। আমরা এক দিনেই বৃদ্ধ হয়ে গেছি এই ঘটনার কারণে। এটা আমাদের জন্য অন্য রকম একটা দিন।’

নাটকীয়ভাবে মহাকাশযান চাঁদের পৃষ্ঠ ছেড়ে ভেসে উঠলো, সংযুক্ত প্লাস্টিক টানেলটা মহাকাশযানের দরজা থেকে ঝুলছিলো তখনো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *