অধ্যায় ১৬
আপনার দিনটা শুরু হোক স্বাদে ভরপুর আর স্বাস্থ্যকর এক বাটি উবিক টোস্টেড ফ্লেক্সের সাথে। এটা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, যা আরো বেশি কুড়মুড়ে, আরো বেশি গুণগত মানসম্পন্ন, আরো বেশি সুস্বাদু। উবিক ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল মানে এক বাটি স্বাদ! প্রতিবার খাওয়ার সময় নির্দিষ্ট মাত্রার অতিরিক্ত না খাওয়ার নিয়ম মেনে চলুন।
.
গাড়িগুলোর বৈচিত্র্য মুগ্ধ করলো তাকে। একাধিক সময়ের প্রতিনিধিত্ব করছে এই বাহনগুলো, একাধিক নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য নির্মাণশৈলীর সমাহার ঘটেছে এখানে। একটা বিষয় অবশ্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তা হলো, অধিকাংশ গাড়ির রং কালো এবং তার জন্য জোরিকে দোষ দেওয়া যায় না। সবকিছুই পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য।
ভাববার বিষয় হলো, জোরি এতকিছু কীভাবে জানলো?
সত্যিই অদ্ভুত, আপনমনে ভাবলো সে। ১৯৩৯ সালের খুঁটিনাটি প্রতিটি বিষয়ে জোরির এত বিস্তারিত জ্ঞান, যে সময়ে আমাদের নিজেদেরই কোনো অস্তিত্ব ছিলো না। একমাত্র গ্লেন রানসাইটার ছাড়া।
তারপর প্রায় আকস্মিকভাবেই কারণটা পরিষ্কার হয়ে গেল তার কাছে। সত্যি কথাই বলেছিলো জোরি; বাস্তবিকই সে নির্মাণ করেছে এই সব—এই পৃথিবী না, বরং এক কাল্পনিক পৃথিবী, অথবা বলা উচিত তাদের নিজস্ব সময়ের এক প্রতিরূপ। আর এই যে সময়ের প্রাচীন রূপে ফিরে আসা, সেখানে তার কোনো হাত নেই। তার শত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এগুলো ঘটছে। অতীতের প্রতিরূপে প্রত্যাগমনই স্বাভাবিক, বুঝতে পারছে জো। স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এগুলো ঘটছে, জোরি ক্রমশ দুর্বল হতে থাকার কারণে।
ছেলেটা বলেছিলো, এটা ভীষণ শ্রমসাধ্য কাজ। সম্ভবত এই প্রথম সে এমন বৈচিত্র্যময় এক পরাবাস্তব জগত সৃষ্টি করেছে, একইসাথে অসংখ্য মানুষের জন্য। এতগুলো অর্ধ-জীবিতকে একসাথে আন্তঃসংযোগ করানো মোটেও নিত্যদিনের স্বাভাবিক কাজ নয়।
জোরির উপর আমরা অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি করেছি, নিজেকেই বললো সে। আর সেজন্য আমাদেরকে চরম মূল্যও দিতে হচ্ছে।
প্রায় চারকোনা বাক্সের মতো পুরোনো একটা ডজ ট্যাক্সি দ্রুত তার পাশ ঘেঁষে চলে গেল। ওটার উদ্দেশে হাত নাড়লো জো। মোড়ের কাছে গিয়ে হোঁচট খেয়ে কর্কশ শব্দে থেমে দাঁড়ালো ট্যাক্সিটা। জোরি যা বলেছিলো সেগুলো পরীক্ষা করে দেখা যাক, আপনমনে বললো সে, যেহেতু এই কাল্পনিক জগৎটা মাত্র যাত্রা শুরু করেছে। চালকের উদ্দেশে বললো, ‘আমাকে পুরো শহরটা ঘুরিয়ে দেখাবে। তোমার যেখানে ইচ্ছে হয় সেখানে নিয়ে যাও আমাকে। যত বেশি সম্ভব অলিগলি, ঘর-বাড়ি আর মানুষ দেখতে চাই আমি। তারপর, পুরো ডি মোয়েন ঘুরিয়ে দেখানোর পর, আমি চাই তুমি আমাকে পরের শহরে নিয়ে যাবে, একইভাবে ঘুরিয়ে দেখাবে।’
‘আমি এক শহর থেকে আরেক শহরে যাই না,’ জোয়ের জন্য ক্যাবের দরজা মেলে ধরে চালক জবাব দিলো। ‘কিন্তু আমি খুশি হয়েই ডি মোয়েন ঘুরিয়ে দেখাবো। চমৎকার শহর। আপনি এই রাজ্যের বাসিন্দা নন, তাই না, স্যার?’
‘নিউ ইয়র্ক,’ ক্যাবে উঠতে উঠতে জবাব দিলো জো।
ক্যাবটা আবার যানবাহনের মূল স্রোতের সাথে মিশে গেল। ‘যুদ্ধ নিয়ে নিউ ইয়র্ক কী ভাবছে?’ আলোচনা শুরু করার মনোভাব নিয়ে প্রশ্ন করলো চালক। ‘আপনার কি মনে হয় আমরাও এই যুদ্ধে জড়িয়ে যাচ্ছি? রুজভেল্ট তো চাইছেন—’
‘রাজনীতি বা যুদ্ধ নিয়ে আমি কথা বলতে চাই না,’ বেশ রুক্ষভাবেই কথাটা বললো জো।
চালক আর কথা না বাড়িয়ে ক্যাব চালাতে লাগলো।
মনোযোগ দিয়ে বাইরের অপসৃয়মান ভবন, যানবাহন আর মানুষ দেখে আবারও নিজেকে প্রশ্ন করলো জো, কীভাবে জোরি এই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। এত বেশি বিস্তারিত আর নিখুঁত যে চমৎকৃত হলো সে। দ্রুতই এর শেষ সীমায় পৌঁছে যাবো আমি; হয়তো বা পৌঁছেও গেছি।
‘ড্রাইভার,’ সে জানতে চাইলো, ‘ডি মোয়েনে কোনো পতিতালয় আছে?’
‘না,’ জবাব দিলো চালক।
সম্ভবত জোরির ক্ষমতায় কুলায়নি, অনুমান করে নিলো জো। তার অল্প বয়সের কারণে। অথবা এটা তার পছন্দ নয়। বুঝতে পারছে, আকস্মিক এক প্রচণ্ড ক্লান্তি তাকে গ্রাস করে ফেলছে। কোথায় যাচ্ছি আমি? নিজেকেই প্রশ্ন করলো। কেনই বা যাচ্ছি? নিজের কাছে এটা প্রমাণ করার জন্য যে জোরি সত্যি কথাই বলেছিলো? আমি তো ইতোমধ্যেই বুঝতে পেরেছি যে সবই সত্যি। আমি দেখেছি চোখের পলকে ডাক্তারকে অদৃশ্য হয়ে যেতে। দেখেছি ডন ড্যানি বাতাসে মিলিয়ে গিয়ে তার মাঝখান থেকে জোরিকে আবির্ভূত হতে। ওগুলোই যথেষ্ট হওয়া উচিত ছিলো। আমি এভাবে এখন যা করছি তাতে জোরির উপর আরো বেশি চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে, যা তার ক্ষুধা আরো বাড়িয়ে দেবে। আমার এই মুহূর্তেই সব প্রচেষ্টা বন্ধ করা উচিত, সিদ্ধান্ত নিলো সে। সবকিছুই এখন অর্থহীন।
তাছাড়া, যেমনটা বলেছিলো জোরি, যেভাবেই হোক উবিকের প্রভাব শেষ হয়ে যাবে। ডি মোয়েনে এভাবে ঘুরে বেড়িয়ে জীবনের অবশিষ্ট মুহূর্তগুলো বা ঘণ্টাগুলো নষ্ট করতে চাই না আমি। নিশ্চয়ই করার মতো আরো অনেক কিছু আছে।
ফুটপাতে একটা মেয়ে সাবলিল আর অলস ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছে। দেখে মনে হলো সময় কাটাচ্ছে দোকানে দোকানে সাজানো পণ্যের পসরা দেখে। মেয়েটা সুন্দরী, স্বর্ণকেশী, লম্বা চুলগুলো বিনুনি করা। দুপাশে ঝোলানো। ব্লাউজের উপর বোতাম খোলা একটা সোয়েটার পরে আছে। উজ্জ্বল লাল রঙের স্কার্ট আর পায়ে উঁচু হিলের সরু জুতো। ‘ক্যাব থামাও,’ চালককে নির্দেশ দিলো সে। ‘ওখানে, বিনুনি করা মেয়েটার পাশে।’
‘মেয়েটা আপনার সাথে কথা বলবে না,’ চালক বললো। ‘বরং পুলিশ ডাকবে।’
‘কিছু যায় আসে না,’ জবাব দিলো জো। এখন আর ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
গতি কমিয়ে হোঁচট খেতে খেতে পুরোনো ডজটা ফুটপাত ঘেঁষে থেমে দাঁড়ালো। রুক্ষ কংক্রিটের সাথে ঘষা খেয়ে প্রতিবাদ করে উঠলো বিধ্বস্ত চাকাগুলো। শব্দ শুনে ফিরে তাকালো মেয়েটা।
‘এই যে, শুনুন,’ মেয়েটাকে ডাকলো জো।
কৌতূহলের সাথে ওকে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলো মেয়েটা। তার বুদ্ধিদীপ্ত, কোমল, নীল চোখদুটো প্রশস্ত হলো খানিকটা। যদিও সেই দৃষ্টিতে রাগ বা ভয়ের কোনো আভাস নেই। বরং মনে হলো সে বেশ আনন্দিত। যেন বন্ধুত্ব করার আভাস। ‘হ্যাঁ, বলুন?’ জবাব দিলো সে।
‘আমি মারা যাচ্ছি,’ জো বললো।
‘আহ, কী বলছেন আপনি!’ মেয়েটা বললো, তার কণ্ঠে সত্যিকারের উদ্বেগ। ‘আপনি কি—’
‘এই লোক মোটেও অসুস্থ না,’ মাঝখানে নাক গলালো চালক। ‘মেয়েমানুষ খুঁজছিলো, আপনাকেও ঐ ধরনের মেয়ে মনে করেছে।’
মেয়েটার হাসি খুব সুন্দর। সেই হাসিতে কোনো রাগ বা ক্ষোভ নেই, আর সে চলেও গেল না।
‘ডিনারের সময় প্রায় হয়ে এসেছে,’ বললো জো। ‘চলুন আপনাকে কোনো রেস্তোরাঁয় নিয়ে যাই, দ্য ম্যাটাডোর। আমার জানামতে ওটা বেশ চমৎকার।’ তার ক্লান্তি এখন আবার বেড়েছে। নিজের উপর সেই ক্লান্তির ওজন অনুভব করছে সে। তারপর সহসাই নিঃশব্দ, হিমশীতল আতঙ্কের সাথে বুঝতে পারলো, এটা সেই একই অবসাদ যে ভয়াবহ অবসাদে আক্রান্ত হয়েছিল সে হোটেল লবিতে, পুলিশের দেওয়া টিকেটটা প্যাটকে দেখানোর পরে। আর প্রচণ্ড ঠান্ডা। নিজের অজান্তে কোল্ড-প্যাকের শারীরিক অনুভূতি চারপাশ থেকে তাকে গ্রাস করে নিয়েছে আবার। শেষ হয়ে আসছে উবিকের প্রভাব, বুঝতে পারলো সে। আর বেশি সময় নেই আমার হাতে।
তার মুখের সামনে কী যেন একটা নড়লো; ক্যাবের জানালার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে মেয়েটা। সামনে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনি ঠিক আছেন তো?’
‘আমি মারা যাচ্ছি,’ বললো জো, অমানুষিক পরিশ্রম করতে হলো শুধু এই কয়েকটা কথা বলার জন্য। তার হাতের ক্ষতগুলো, কামড়ের দাগ, ব্যথায় আবার দপদপ করতে শুরু করেছে। আর সেগুলো আবারও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এতটুকুই যথেষ্ট ছিলো তাকে আতঙ্কিত করে তোলার জন্য।
‘ড্রাইভারকে বলুন আপনাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে,’ পরামর্শ দিলো মেয়েটা।
‘আমরা কি একসাথে ডিনার করতে পারি?’ জিজ্ঞেস করলো জো।
‘আপনি কি সেটাই চাইছেন?’ পালটা প্রশ্ন করলো মেয়েটা। ‘যেখানে আপনি… সে যাই হোক। অসুস্থ? আপনি কি অসুস্থ?’ ক্যাবের দরজা খুললো সে। ‘বললে হাসপাতাল পর্যন্ত যেতে পারি আপনার সাথে। সেটাই কি চাইছেন আপনি?’
‘ড্রাইভার, দ্য ম্যাটাডোরে নিয়ে চলো,’ জো নির্দেশ দিলো। ‘আমরা ওখানে অল্প আঁচে সিদ্ধ করা মাংসের পুর দেওয়া মার্শিয়ান মোল ক্রিকেট দিয়ে ডিনার করবো।’ তারপরেই মনে পড়লো যে, যে যুগে এখন আছে সেই যুগে এই ধরনের আমদানিকৃত বিলাসিতার কোনো চল ছিলো না। ‘স্টেক?’ সে জিজ্ঞেস করলো। ‘গরুর মাংস। গরুর মাংস পছন্দ করেন?’
ক্যাবে উঠে মেয়েটা চালককে বললো, ‘ভদ্রলোক দ্য ম্যাটাডোরে যেতে চায়।’
‘ঠিক আছে, মিস,’ চালক জবাব দিলো। আবার মূল সড়কে যানবাহনের স্রোতে মিশে গেল ক্যাব। পরের ইন্টারসেকশনে এসে ইউ-টার্ন নিলো। জো এবার বুঝতে পারলো, তারা সত্যিই রেস্তোরাঁর দিকে যাচ্ছে। কিন্তু বুঝতে পারছে না পৌঁছানো পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবে কি না। অবসাদ আর হিমশীতলতা তাকে পুরোপুরি গ্রাস করে নিয়েছে; বুঝতে পারছে তার শারীরিক প্রক্রিয়াগুলো থেমে যাচ্ছে, একে একে। অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোর আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই; যকৃতের আর কোনো প্রয়োজন নেই লোহিত কণিকা সৃষ্টি করার, কিডনিগুলোকে আর শরীরের বর্জ্য নিষ্কাশন করতে হবে না, অন্ত্রনালিরও আর কোনো প্রয়োজন নেই। কেবল হৃৎপিণ্ড এখনো হাল ছাড়েনি, পরিশ্রম করে যাচ্ছে বিরামহীনভাবে। শ্বাস নেওয়া কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে ক্রমশ; প্রতিবার শ্বাস টানার সময় বুকের মধ্যে কঠিন পাথরের দেয়ালের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারছে। মনে হলো, পাথরটা আসলে ওর নিজ কবরের নামফলক। হাতের দিকে তাকিয়ে দেখলো, আবার রক্তক্ষরণ হচ্ছে; ঘন রক্ত ধীরে ধীরে, ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ছে।
‘লাকি স্ট্রাইক চলবে?’ তার মুখের সামনে সিগারেটের একটা প্যাকেট ধরে মেয়েটা জিজ্ঞেস করলো। ‘এগুলো ভাজা, বিজ্ঞাপনে যেমন বলা হয়েছে ঠিক সেরকম। এল.এস.এম.এফ.টি শব্দটির উদ্ভব তখন পর্যন্ত হবে না, যতক্ষণ না—’
‘আমি জো চীপ।’
‘আপনি কি আমার নাম জানতে চান?’
‘হ্যাঁ,’ দাঁতে দাঁত চেপে বললো জো, তারপর চোখ বুজে বসে থাকলো ক্ষণিকের জন্য। ‘ডি মোয়েন ভালো লাগে আপনার?’ কিছুক্ষণ পর স্বাভাবিক গলায় বললো সে, হাতদুটো আড়াল করে রেখেছে মেয়েটার দৃষ্টি থেকে। ‘অনেক দিন ধরে আছেন এখানে?’
‘আপনাকে ভীষণ ক্লান্ত মনে হচ্ছে, মি. চীপ,’ মেয়েটা বললো।
‘বাদ দিন,’ হাত নেড়ে বললো সে। ‘এটা কোনো ব্যাপার না।’
‘অবশ্যই এটা একটা ব্যাপার।’ পার্স খুলে ভেতরে কী যেন তন্নতন্ন করে খুঁজছে মেয়েটা। ‘আমি জোরির তৈরি করা কোনো বিকৃতি না। আমি ওর মতোও না,’ চালকের দিকে ইঙ্গিত করে বললো সে। ‘অথবা ছোট ছোট এই দোকানপাট আর ঘর-বাড়ি কিংবা এই ঘিঞ্জি, অপরিচ্ছন্ন সড়ক অথবা এই সকল মানুষ আর তাদের মান্ধাতা আমলের গাড়ির মতন না। এই যে, মি. চীপ।’ পার্স থেকে একটা খাম বের করে এনেছে সে। জোয়ের দিকে এগিয়ে দিলো খামটা। ‘এটা আপনার জন্য। এখনই খুলে দেখুন। আমাদের আর দেরি করা উচিত হবে না মোটেও।’
সীসার মতো ভারী আঙুল দিয়ে খামের মুখ খুললো সে।
খামের ভেতরে একটা সনদ। চমৎকার নকশা করা, প্রায় রাজকীয় সনদের মতন। যদিও সনদের লেখাগুলো একেবারেই ঝাপসা। কী লেখা আছে সেটা পড়ার মতো একবিন্দু শক্তিও তার অবশিষ্ট নেই। ‘কী লেখা আছে এখানে?’ সনদটা কোলের উপর ফেলে মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলো সে।
‘সনদটা দিয়েছে উবিক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান,’ জবাব দিলো মেয়েটা। ‘এটা একটা নিশ্চয়তাপত্র, মি. চীপ, যার মাধ্যমে আপনি আজীবন বিনামূল্যে উবিক পাবেন। বিনামূল্যে কারণ আমি আপনার আর্থিক দুর্দশার কথা জানি, আপনার… কথাটা এভাবেও বলা যায়… নির্বুদ্ধিতার কথাও। উলটো পাশে সবগুলো ঔষধের দোকানের একটা তালিকা আছে যারা উবিক বিক্রয় করে। ডি মোয়েনের দুটো ঔষধের দোকানের নাম—যেগুলো পরিত্যক্ত নয়—আছে এই তালিকায়। আমার পরামর্শ হলো, ডিনারের আগেই আমাদের ওগুলোর কোনো একটাতে যাওয়া উচিত। এই নিন।’ সামনে ঝুঁকে চালকের হাতে কাগজের একটা টুকরো ধরিয়ে দিলো মেয়েটা, যেখানে আগে থেকেই ঠিকানা লেখা ছিলো। ‘এই ঠিকানায় নিয়ে চলুন আমাদের। দ্রুত। দোকান বন্ধ করার সময় হয়ে এসেছে প্রায়।’
ক্যাবের সিটে হেলান দিয়ে বসলো জো, শ্বাস নেওয়ার জন্য হাঁসফাঁস করছে।
‘আমরা সময়মতোই ওখানে পৌঁছাতে পারবো,’ আশ্বস্ত করার জন্য তার বাহুতে আলতো চাপড় দিয়ে বললো মেয়েটা।
‘কে আপনি?’ তাকে জিজ্ঞেস করলো জো।
‘আমার নাম ইলা। ইলা হাইডি রানসাইটার। আপনার নিয়োগকর্তার স্ত্রী।’
‘আপনি আমাদের সাথে এখানে, এই পাশে… আপনি কোল্ড-প্যাকে ছিলেন।’
‘আপনি সবই জানেন। বেশ অনেকটা সময়ের জন্য আমি ওখানে ছিলাম,’ ইলা রানসাইটার বললো। ‘শীঘ্রই নতুন এক গর্ভে পুনর্জন্ম হবে আমার, আমার সেরকমই ধারণা। অন্তত গ্লেন আমাকে সেটাই বলেছে। ধোঁয়াটে এক লাল আলোর স্বপ্ন দেখি আমি প্রায়ই, আর সেটা অশুভ। ঐ গর্ভে জন্ম নেওয়া চরম অবমাননাকর।’ তার মুখে একটা সজীব, উষ্ণ হাসি ফুটে উঠলো।
‘আপনিই তাহলে অন্য পক্ষ,’ জো বললো। ‘জোরি আমাদের ধ্বংস করছে, আর আপনি আমাদের সাহায্য করার চেষ্টা করছেন। আপনার পেছনে কেউ নেই, ঠিক যেমন জোরির পেছনে আর কেউ নেই। এই সবকিছুর সাথে জড়িত সর্বশেষ অস্তিত্বের কাছে পৌঁছে গেছি আমি।’
‘নিজেকে আমি শুধুই একটা অস্তিত্ব মানতে রাজি নই,’ তিক্ত কণ্ঠে বললো ইলা। ‘আমি নিজেকে সব সময়ই ইলা রানসাইটার মনে করি।’
‘কিন্তু এটাই বাস্তব,’ জো বললো।
‘হ্যাঁ,’ সম্মতি দিয়ে গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লো ইলা।
‘জোরির বিরুদ্ধে লড়াই করছেন কেন?’
‘কারণ জোরি আমাকে দখল করে নিয়েছিলো,’ ইলা বললো। ‘সে আমাকে একইভাবে বিপদে ফেলেছে, ঠিক যেভাবে আপনাকেও ফেলেছে। আমরা দুজনেই জানি সে কী করছে। সে আপনাকে নিজেই বলেছে, আপনার হোটেল কামরায়। কখনো কখনো সে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বেশ কয়েকবার, যখন আমার মস্তিষ্ক সক্রিয় করা হয়েছিল এবং আমি গ্লেনের সাথে কথা বলছিলাম, জোরি আমার মস্তিষ্কে অনুপ্রবেশ করে। কিন্তু আমি সম্ভবত বাকি সব অর্ধ-জীবিতদের তুলনায় জোরিকে অনেক বেশি ভালোভাবে সামলাতে পারি। আমার সাথে উবিক থাকুক বা না থাকুক। বলা যায় আপনাদের চেয়েও বেশি দক্ষতার সাথে। আপনারা একসাথে দলবদ্ধ হয়ে কাজ করার পরেও।’
‘একমত,’ জো বললো। কথাটা পুরোপুরি সত্য। তার প্রমাণ সে পেয়েছে।
‘যখন আমার পুনর্জন্ম হবে,’ ইলা বললো, ‘গ্লেন আমার সাথে আর পরামর্শ করতে পারবে না। আপনাকে সাহায্য করার পেছনে আমার অনেক বড় একটা উদ্দেশ্য আর স্বার্থ আছে, মি. চীপ। আমি চাই আপনি আমার স্থলাভিষিক্ত হবেন। আমার জায়গায় আমি এমন একজনকে চাই, যার সাথে গ্লেন পরামর্শ করতে পারবে, সাহায্য নিতে পারবে, যার উপর আস্থা রাখতে পারবে। এর জন্য আপনার চেয়ে যোগ্য আর কেউ নেই। আপনি পূর্ণ জীবনে যা করেছেন, অর্ধ-জীবিত অবস্থায়ও ঠিক সেই কাজগুলোই করবেন। কাজেই, আমি মহান কোনো আবেগে আপ্লুত হয়ে কাজ করছি না। জোরির হাত থেকে আপনাকে বাঁচানোর পেছনে বরং অতি স্বাভাবিক বোধ-বুদ্ধি কাজ করেছে।’ তারপর আরো যোগ করলো, ‘ঈশ্বর জানেন জোরিকে আমি কী পরিমাণ ঘৃণা করি।’
‘আপনার যদি পুনর্জন্মই হয়,’ জো বললো, ‘তবে আমার কি পরিপূর্ণ মৃত্যু হবে না?’
‘আপনার সারা জীবনের জন্য উবিকের সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। যে সনদটা আপনাকে আমি দিয়েছি তাতেই লেখা আছে কথাটা।’
‘আমি হয়তো জোরিকে পরাজিত করতে পারবো,’ বললো জো।
‘অর্থাৎ, ধ্বংস করতে পারবেন?’ ইলা মন্তব্যটা শুধরে দিলো। ‘সে দুর্বল নয় মোটেও। হয়তো সময়ের সাথে সাথে তার শক্তিক্ষেত্র প্রতিহত করার উপায়গুলো আপনি আয়ত্ব করে নিতে পারবেন। আমার তো মনে হয় এর চেয়ে বেশি কিছু আশা না করাই ভালো। জোরিকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারবেন কি না, এই বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। অথবা, অন্যভাবে বললে, পুরোপুরি গ্রাস করতে পারবেন কি না, ঠিক যেভাবে মোরাটোরিয়ামে তার আশেপাশের সকল অর্ধ-জীবিতদের সে গ্রাস করে নিয়েছে।’
‘ওহ, ঈশ্বর!’ জোয়ের কণ্ঠে হাহাকার। ‘গ্লেন রানসাইটারকে আমি পরিস্থিতির সবটাই অবহিত করবো। তাকে বলবো জোরিকে যেন মোরাটোরিয়াম থেকে চিরতরে বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করে।’
‘গ্লেনের সেই ক্ষমতা নেই।’
‘সোয়েনহেইট ভন ভলসাঙেরও কি নেই?’
‘জোরির পরিবারের কাছ থেকে হার্বার্ট প্রতি বছর বড় অঙ্কের মাসোহারা পায়, যেন জোরিকে অন্যান্য অর্ধ-জীবিতদের কাছাকাছি একসাথে রাখা হয়। সেটা করার পেছনে যথেষ্ট যৌক্তিক কারণও আছে। প্রতিটা মোরাটোরিয়ামেই একটা করে জোরি আছে। যেখানেই অর্ধজীবিতরা আছে সেখানেই চলছে এই লড়াই। এটাই বাস্তব, আমরা যারা একটা বিশেষ অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে আছি, তাদের জগতের অলিখিত নিয়ম এটা।’ তারপর ইলা নিশ্চুপ হয়ে রইলো বেশ কিছুক্ষণ। প্রথমবারের মতো জো তার মুখশ্রীতে দেখতে পেল রাগের আভাস। প্রতিশোধের কঠিন প্রতিজ্ঞা তার মুখের শান্ত ভাবটাকে মুছে দিয়েছে পুরোপুরি। ‘আয়নার এই পাশ থেকে, অর্থাৎ আমাদের জগত থেকেই এই লড়াই করতে হবে,’ ইলা বললো। ‘আমরা যারা অর্ধ-জীবিত তাদের সাথে নিয়ে লড়তে হবে, যাদেরকে জোরি নিজের শিকারে পরিণত করেছে। আমার পুনর্জন্মের পর আপনাকে বড় একটা দায়িত্ব নিতে হবে, মি. চীপ। আপনি পারবেন তো? কাজটা কঠিন হবে। আপনার শক্তি বিরতিহীনভাবে শুষে নেবে জোরি। আপনার উপর এমন চাপ প্রয়োগ করবে যে আপনার মনে হবে—’ ইলা একটু ইতস্তত করে বললো—‘চরম মৃত্যু এগিয়ে আসছে। সেটা যদিও অবশ্যম্ভাবী। কারণ এই অর্ধ-জীবনেও কোনো না কোনোভাবে আমরা ক্রমশ ক্ষয় হচ্ছি। জোরি শুধু সেই প্রক্রিয়াটাকেই আরেকটু গতিশীল করে দেবে। একসময় না একসময় চরম ক্লান্তি আর হিমশীতলতা আপনাকে গ্রাস করে নেবেই। কিন্তু সেটা এত তাড়াতাড়ি না।’
জো মনে মনে ভাবলো, ওয়েন্ডির সাথে সে কী করেছে আমার মনে আছে। ওটাই আমাকে শক্তি যোগাবে। জোরিকে শাস্তি দেওয়ার জন্য ঐ একটা কারণই যথেষ্ট।
‘ঔষধের দোকানে পৌঁছে গেছি, মিস,’ চালক বললো। বর্গাকৃতির পুরোনো ডজ ফুটপাথ ঘেঁষে দাঁড়ালো।
‘আমি আপনার সাথে ভেতরে যাবো না,’ যখন ক্যাবের দরজা খুলে দুর্বল আর কম্পিত দেহ নিয়ে বেরোনোর কসরত করছিলো জো, তখন ইলা তাকে বললো। ‘বিদায়। গ্লেনের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার জন্য ধন্যবাদ। ওর জন্য আপনি যা করবেন তার জন্যেও।’ সামনে ঝুঁকে জোয়ের চোয়ালে আলতো করে চুমু দিলো ইলা। ওর কাছে মনে হলো ইলার ঠোঁটদুটো জীবনের উষ্ণতায় পরিপূর্ণ। সেই উষ্ণতার খানিকটা তার মাঝেও সঞ্চারিত হলো। অনেকখানি শক্তি ফিরে পেল যেন সে। ‘জোরির বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে আপনার জন্য অনেক শুভকামনা।’ সিটে হেলান দিলো ইলা, সামলে নিলো নিজেকে। পার্সটা পড়ে আছে তার কোলের উপর।
ক্যাবের দরজা বন্ধ করলো জো। নিজেকে সামলে নেওয়ার জন্য একটু দাঁড়ালো। তারপর এলোমেলো পায়ে এগোলো ঔষধের দোকানের দিকে। প্রচণ্ড শব্দ করে পুরোনো ক্যাবটা চলতে শুরু করলো আবার। শব্দটা শুনলেও পেছন ফিরে তাকালো না সে।
ম্লান বাতির আলোতে ঔষধের দোকানের ভেতরের পরিবেশটা পুরোপুরি বিষণ্ণ আর আলো-আঁধারিতে ঢাকা। টেকো মাথার এক ফার্মাসিস্ট, যার পরনে গাঢ় বর্ণের ভেস্ট, বো টাই আর কড়া ইস্ত্রির শার্কস্কিনের ট্রাউজার। লোকটা জোয়ের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বললো, ‘দুঃখিত, স্যার, আমরা বন্ধ করে দিয়েছি। আমি এসেছি মূল দরজা বন্ধ করার জন্য।’
‘কিন্তু আমি ভেতরে চলে এসেছি,’ জো বললো। ‘আর আমি যা চাই তা দিতে আপনি বাধ্য।’ ইলা তাকে যে সনদটা দিয়েছিলো সেটা বের করে দেখালো। গোলাকার রিমলেস চশমার ফাঁক দিয়ে গথিক ধাঁচের ছাপানো লেখাগুলো পড়ার চেষ্টা করলো ফার্মাসিস্ট।
‘আপনি কি দেবেন?’ জো জিজ্ঞেস করলো।
‘উবিক,’ ফার্মাসিস্ট বললো। ‘সম্ভবত আমার কাছে আর নেই। খুঁজে দেখি।’ যেতে উদ্যত হলো সে।
‘জোরি,’ জো বললো।
ফিরে তাকালো ফার্মাসিস্ট। ‘স্যার?’
‘তুমি জোরি,’ জো বললো। আমি এখন বুঝতে পারি, নিজেকে বললো সে। ছেলেটার মুখোমুখি হলে ওকে চিনে নেওয়ার কৌশল আস্তে আস্তে শিখছি আমি। ‘এই ড্রাগস্টোর তুমি বানিয়েছ,’ সে বললো, ‘সেই সাথে এর অভ্যন্তরে যা কিছু আছে সব। শুধু উবিকের স্প্রে ক্যান ছাড়া। উবিকের উপর তোমার কোনো ক্ষমতা নেই। কারণ সেটা ইলার আবিষ্কার।’ সামনে এগোনোর জন্য নিজের উপর জোর খাটাতে হলো। এক পা এক পা করে কাউন্টারের পেছনের তাকগুলোর দিকে এগোচ্ছে যেখানে মেডিক্যাল সাপ্লাইগুলো সাজানো আছে। আধো আলোতে একের পর এক তাক তন্নতন্ন করে উবিক খুঁজতে লাগলো। দোকানের অভ্যন্তরে আলো আরো ক্ষীণ হয়ে আসছে। পুরোনো আমলের আসবাবগুলো মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে।
‘এই দোকানের সব উবিক আমি সরিয়ে ফেলেছি,’ ফার্মাসিস্ট সদ্য কৈশোর পেরোনো জোরির মতো উচ্চ আর তীক্ষ্ণ স্বরে বললো। ‘কিডনি আর লিভারের মলম নিতে পারো। যদিও ওগুলো কোনো কাজে আসবে না।’
‘আমি অন্য ঔষধের দোকানে যাবো যেখানে উবিক আছে,’ জো বললো। একটা কাউন্টারে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো সে। প্রচণ্ড পরিশ্রমে থেমে থেমে শ্বাস টানছে।
টাকমাথার ফার্মাসিস্টের অভ্যন্তর থেকে জোরি বললো, ‘ওগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।’
‘আগামীকাল,’ জো বললো। ‘আমি আগামীকাল সকাল পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবো।’
‘পারবে না,’ বললো জোরি। ‘যেভাবেই হোক, ঐ ঔষধের দোকান থেকেও উবিক সরিয়ে ফেলা হবে।’
‘অন্য শহরে চলে যাবো,’ জো বললো।
‘যেখানেই যাও, খুঁজে পাবে না। মলম, পাউডার অথবা সঞ্জীবনী ঔষধ পাবে। উবিকের স্প্রে ক্যান আর কখনো পাবে না, জো চীপ।’ ফার্মাসিস্টের রূপধারী জোরি হাসলো। মনে হলো, তার দাঁতগুলো সেলুলয়েডের তৈরি।
‘আমি পারবো—’ নিজের ভেতরে যতটুকু শক্তি ছিলো তার পুরোটাই শেষ হয়ে গেল এই কথাগুলো বলতে গিয়ে। ঠান্ডায় শক্ত হয়ে যাওয়া শরীরটাকে অবশিষ্ট শক্তি দিয়ে একটু উষ্ণ করার চেষ্টা করছে। ‘সবকিছু বর্তমানে নিয়ে আসতে পারবো,’ সে বললো, ‘১৯৯২ সালে।’
‘পারবে, মি. চীপ?’ ফার্মাসিস্ট জোয়ের হাতে পেস্টবোর্ডের তৈরি একটা কনটেইনার দিলো। ‘নাও। এটা খুললেই বুঝতে পারবে—’
‘আমি জানি কী দেখবো,’ জো বললো। লিভার আর কিডনির মলমের নীল জারের উপর গভীর মনোনিবেশ করলো সে। বিকশিত হও, জারের উদ্দেশে মনে মনে বললো, সেই সাথে তার যা প্রয়োজন সেই চিন্তার প্রতিফলন ঘটাতে নিজের অবশিষ্ট শক্তির পুরোটা প্রয়োগ করলো। কিছুই পালটালো না। এটা সাধারণ পৃথিবী, বস্তুটার উদ্দেশে আবারও মনে মনে বললো সে, তারপর শব্দ করে বললো, ‘স্প্রে ক্যান।’ এরপর চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নিতে লাগলো।
‘এটা স্প্রে ক্যান নয়, মি. চীপ,’ ফার্মাসিস্ট বললো। এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে ড্রাগস্টোরের আলোগুলো বন্ধ করছে সে। ক্যাশ রেজিস্টারের একটা বোতামে চাপ দিতেই এক ঝটকায় খুলে গেল ড্রয়ারটা। দক্ষ হাতে আস্ত নোট আর খুচরো পয়সাগুলো একটা ধাতব বাক্সে রেখে তালা লাগিয়ে দিলো সেটাতে।
‘তুমি একটা স্প্রে ক্যান,’ হাতে ধরা পেস্টবোর্ডের কন্টেইনারের উদ্দেশে বললো সে। ‘এটা ১৯৯২ সাল,’ সে বললো। নিজের পুরোটাই উজাড় করে দিলো এই প্রচেষ্টায়। শেষ আলোটাও নিভে গেল, নকল ফার্মাসিস্ট সেটা নিভিয়ে দিয়েছে। স্ট্রিট ল্যাম্পের আলোয় ড্রাগস্টোরের ভেতরটা আবছা আলোকিত। সেই আলোয় হাতে ধরা বস্তুটার আকৃতি বুঝতে পারছে জো—ওটার চারটে কোনা।
মূল দরজা খুলে ফার্মাসিস্ট বললো, ‘চলে এসো, মি. চীপ। বাড়ি ফেরার সময় হয়েছে। মিথ্যে আশ্বাস দিয়েছে সে, তাই না? তুমি আর কোনোদিন তার দেখা পাবে না। কারণ সে এখন অনেক দূরে চলে গেছে পুনর্জন্মের আশায়। তোমাকে নিয়ে সে আর ভাবছে না, ভাবছে না আমার কথা কিংবা রানসাইটারের কথা। সে এখন দেখছে অনেক আলো—লাল আর বিবর্ণ। তারপর হয়তো দেখবে উজ্জ্বল কমলা—’
‘আমি হাতে যা ধরে রেখেছি,’ জো বললো, ‘সেটা একটা স্প্রে ক্যান।’
‘না,’ ফার্মাসিস্ট বললো। ‘আমি দুঃখিত, মি. চীপ। আমি সত্যিই দুঃখিত। কিন্তু তোমার হাতে ওটা যা ভাবছো তা নয়।’
কাছের একটা কাউন্টারের উপর পেস্টবোর্ডের বাক্সটা নামিয়ে রাখলো জো। অবশিষ্ট আত্মসম্মানটুকু ধরে রেখে ঘুরলো। ড্রাগস্টোরের এই প্রান্ত থেকে মূল দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করলো মন্থর গতিতে। দরজাটা ফার্মাসিস্ট তার জন্য মেলে ধরে রেখেছে। ফার্মাসিস্টকে পেরিয়ে ফুটপাতে না আসা পর্যন্ত কেউই কোনো কথা বললো না।
ফার্মাসিস্টও বেরিয়ে এলো তার পেছন পেছন। ঝুঁকে দরজায় তালা লাগালো।
‘প্রস্তুতকারকের কাছে অভিযোগ জানাবো এই ব্যাপারে—’ মাঝপথে কথা বন্ধ হয়ে গেল জোয়ের। গলার কাছে কী যেন দলা পাকিয়ে আছে। শ্বাস নিতে পারছে না, কথাও বলতে পারছে না। ‘যে তুমি ঔষধের দোকান থেকে উবিক সরিয়ে ফেলছো,’ গলাটা একটু পরিষ্কার হতেই কথাটা শেষ করলো সে।
‘শুভ রাত্রি,’ ফার্মাসিস্ট বললো। একটু দাঁড়ালো সে। সন্ধ্যার ম্লান, বিষণ্ণ আলোয় জোকে দেখলো কিছুক্ষণ। তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাঁটতে শুরু করলো নিজের পথে।
বাঁ দিকে বেঞ্চ আকৃতির কিছু কাঠামো দেখতে পেল জো। স্ট্রিটকারের জন্য যাত্রীরা ওখানে বসে অপেক্ষা করে। শেষ পর্যন্ত ওখানে পৌঁছাতে পারলো সে, বসলো। আরো কয়েকজন ছিলো, দুই বা তিনজন, ঠিক বলতে পারবে না। ওরা সরে গেল একপাশে, হতে পারে ঘৃণায় অথবা তাকে বসার জায়গা দেওয়ার জন্য। সঠিক কারণ কোনটা, সে বলতে পারবে না, আর ওটা নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথাও নেই। সে অনুভব করছে দেহের নিচে বেঞ্চের অবলম্বন। ক্লান্ত দেহের ভার কিছুটা হলেও ছড়িয়ে দিতে পারছে। আর মাত্র কয়েক মিনিট, নিজেকে শোনালো। যদি আমার ঠিকঠাক মনে থাকে। ঈশ্বর! কী ভয়াবহ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, এই নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো।
যাই হোক, আমরা চেষ্টা করেছি, মিটমিটে হলুদ আলো আর নিয়ন সাইনগুলো দেখতে দেখতে সে ভাবলো। গাড়ির স্রোত দুই দিকেই যাচ্ছে, ঠিক তার চোখের সামনে দিয়ে। বসে বসে ভাবতে লাগলো সে। রানসাইটার চেষ্টা করেছে এবং এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছে। ইলা দীর্ঘদিন ধরে আপ্রাণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। আর আমি লিভার আর কিডনি মলমের জার প্রায় উবিকে পরিণত করে ফেলেছিলাম। সাফল্যের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলাম প্রায়। এটা জানার মধ্যে একটা অন্য রকম কিছু আছে—তার মাঝে যে অফুরান শক্তি আছে সেই ব্যাপারে সচেতনতা। তার অতীন্দ্রিয় ক্ষমতার চূড়ান্ত প্রচেষ্টা। ধাতব ক্যাঁচকোঁচ আওয়াজ করে বেঞ্চগুলোর সামনের ফুটপাথ ঘেঁষে থামলো স্ট্রিটকার। জোয়ের পাশে বসে থাকা সবাই ছুটলো স্ট্রিটকারে ওঠার জন্যে।
‘এই যে, মিস্টার!’ কন্ডাক্টর জোয়ের উদ্দেশে চিৎকার করলো। ‘আপনি যাবেন?’
জো কোনো জবাব দিলো না। কন্ডাক্টর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ঘণ্টি বাজালো। আবার বিশ্রী শব্দে চলতে শুরু করলো স্ট্রিটকার, হারিয়ে গেল দৃষ্টিসীমার বাইরে। অনেক অনেক শুভ কামনা, স্বগতোক্তি করলো জো। আর… বিদায়। তারপর চোখ বন্ধ করে হেলান দিলো বিশ্রামের জন্য।
‘মাফ করবেন,’ রিনিঝিনি কণ্ঠে সচকিত হলো জো। তাকাতেই চোখে পড়লো উটপাখির কৃত্রিম চামড়ার কোট পরা মেয়েটার উপর। মেয়েটা ঝুঁকে আছে ওর দিকে। ‘মি. চীপ?’ মেয়েটা জিজ্ঞেস করলো। সুশ্রী, একহারা গড়নের মেয়েটার মাথায় হ্যাট, হাতে গ্লাভস, পরনে স্যুট, পায়ে উঁচু হিল। তার হাতে কিছু একটা আছে। আধো অন্ধকারেও বস্তুটার কাঠামো চোখে পড়লো জোয়ের। ‘নিউ ইয়র্ক? রানসাইটার এসোসিয়েটস? ভুল লোকের হাতে জিনিসটা দিতে চাই না।’
‘আমি জো চীপ,’ সে বললো। মুহূর্তের জন্য মনে হলো, মেয়েটা সম্ভবত ইলা রানসাইটার। কিন্তু মেয়েটাকে সে আগে কখনো দেখেনি। ‘কে পাঠিয়েছে তোমাকে?’ জিজ্ঞেস করলো সে।
‘ড. সোন্ডারবার,’ জবাব দিলো মেয়েটা। ‘ড. সোন্ডারবার জুনিয়র, প্রতিষ্ঠাতা ড. সোন্ডারবারের পুত্র।’
‘কে সে?’ নামটা তার কাছে কোনো অর্থ বহন করছে না। তারপর মনে পড়লো এই নাম কোথায় দেখেছে। ‘লিভার আর কিডনি মলমের প্রস্তুতকারক?’ জিজ্ঞেস করলো সে। ‘প্রক্রিয়াজাত করা করবী বৃক্ষের পাতা, পিপারমিন্টের তেল, কাঠকয়লা, কোবাল্ট ক্লোরাইড, জিংক অক্সাইড—’ ক্লান্তি গ্রাস করে নিতেই কথা বলা থামিয়ে দিলো সে।
মেয়েটা বললো, ‘আধুনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে উন্নত পদ্ধতি ব্যবহার করে বস্তুর প্রাথমিক অবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে আবার উলটো পথে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়। এটা পাওয়া যাচ্ছে সুবিধাজনক মূল্যে। যার ফলে একজন কোনঅ্যাপ্ট মালিকও তা ক্রয় করতে পারবে। পৃথিবী জুড়ে সব বড় বড় দোকানেই উবিক বিক্রয় করা হয়। কাজেই আপনি যেখানেই কেনাকাটা করবেন সেখানেই খুঁজে দেখবেন, মি. চীপ।’
পূর্ণ সচেতন হয়ে সে বললো, ‘কোথায় খুঁজবো?’ হাঁচড়ে-পাঁচড়ে উঠে দাঁড়ালো সে। নতুন হাঁটতে শেখা শিশুর মতো দুলছে। ‘তুমি ১৯৯২ সাল থেকে এসেছ? এইমাত্র যা বললে সেটা টিভিতে প্রচার করা বিজ্ঞাপন, রানসাইটার ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ওগুলো প্রচার করতো।’
সন্ধ্যার মৃদুমন্দ বাতাস যেন হ্যাঁচকা টান মারলো তাকে। মনে হলো তাকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সে যেন ছেঁড়া আর পাতলা একটা কাপড়ের টুকরো।
‘হ্যাঁ, মি. চীপ,’ বাক্সটা তার হাতে দিয়ে বললো মেয়েটা। ‘আপনি আমাকে ভবিষ্যৎ থেকে ডেকে এনেছেন, একটু আগে ঔষধের দোকানের ভেতরে যা করেছেন তার দ্বারা। সরাসরি ফ্যাক্টরি থেকে আপনি আমাকে ডেকে এনেছেন। মি. চীপ, আপনি যদি অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে পড়েন, তাহলে আমি আপনার গায়ে উবিক স্প্রে করে দিতে পারি। করবো কী? আমি কারখানার সরাসরি প্রতিনিধি এবং কারিগরি পরামর্শদাতা। আমি জানি কীভাবে উবিক ব্যবহার করতে হয়।’ তার কম্পিত হাত থেকে প্যাকেটটা নিয়ে দ্রুত মুখ খুললো মেয়েটা। কালবিলম্ব না করে ওর উপর উবিক স্প্রে করলো। গোধূলির আলোয় সে দেখতে পেল, জ্বলজ্বল করছে উবিক। ক্যানের গায়ের সুন্দর আর বর্ণিল লেখাগুলো তার মন ভালো করে দিলো।
‘ধন্যবাদ,’ কিছুক্ষণ পর একটু সুস্থ বোধ করতেই বললো সে।
‘হোটেল কামরায় যেভাবে ব্যবহার করেছিলেন, এই মুহূর্তে আপনার অতটা প্রয়োজন নেই। নিশ্চয়ই আগের চেয়ে ভালো বোধ করছেন। নিন, ক্যানটা আপনার কাছে রাখুন। সকাল হওয়ার আগেই আবার প্রয়োজন হবে।’
‘আমি কী আরো পাবো?’ জিজ্ঞেস করলো জো। ‘যখন এই ক্যান শেষ হয়ে যাবে?’
‘অবশ্যই পাবেন। আপনি যখন একবার আমাকে এখানে ডেকে আনতে পেরেছেন, আমার ধারণা আবারও আমাকে ডেকে আনতে পারবেন। ঠিক একইভাবে।’ তার কাছ থেকে দূরে সরে গেল মেয়েটা, আধো আলো আর চারপাশের দেয়ালের সৃষ্ট ছায়ায় মিশে গেল।
‘উবিক কী?’ জিজ্ঞেস করলো জো, মনেপ্রাণে চাইছে যেন মেয়েটা চলে না যায়।
‘উবিকের স্প্রে ক্যান হচ্ছে বহনযোগ্য ঋণাত্মক আয়নাইজার, যা স্বয়ংসম্পূর্ণ, হাই-ভোল্টেজ, লো-এম্প ইউনিট, ২৫ কেভি উচ্চশক্তিসম্পন্ন হিলিয়াম ব্যাটারি দ্বারা চালিত হয়। পুরোপুরি এককেন্দ্রিক ত্বরণ চেম্বারে ঋণাত্মক আয়ন ঘড়ির কাঁটার উলটো দিকে ঘোরানো হয়, যা তাদের মধ্যে অভিকেন্দ্রিক প্রবণতা সৃষ্টি করে। ফলে আয়নসমূহ বিচ্ছিন্ন হওয়ার বদলে পরস্পরের সাথে আরো জোরালোভাবে যুক্ত হয়। বায়ুমণ্ডলে সাধারণত যে পরিমাণ এন্টি-প্রটোফেশন থাকে, ঋণাত্মক আয়নক্ষেত্র তার গতিবেগ কমিয়ে দেয়। গতিবেগ কমে যাওয়ার কারণে ওগুলো আর এন্টি-প্রটোফেশন থাকে না, এবং সমতানীতি অনুযায়ী, কোল্ড-প্যাকে থাকা হিমায়িত ব্যক্তির, অর্থাৎ যারা অর্ধ-জীবনে আছে, তাদের বিকিরিত প্রটোফেশনের সাথে যুক্ত হতে পারে না। চূড়ান্ত ফলাফল, এন্টি-প্রটোফেশন দ্বারা বিলুপ্ত না হওয়ায় প্রটোফেশনের পরিমাণ বেড়ে যায়। যার অর্থ, একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যেভাবেই হোক প্রটোফেশনিক ক্রিয়ার নিট পরিমাণ বৃদ্ধিতে আক্রান্ত অর্ধজীবিত ব্যক্তি অধিক মাত্রায় জীবনীশক্তি অনুভব করে, সেই সাথে কোল্ডপ্যাকের হিমশীতলতাও হ্রাস পায় বহুলাংশে। বুঝতেই পারছেন, কেন উবিকের বিকৃত রূপ ব্যর্থ হয়েছিল—’
‘ব্যর্থ হয়েছিল বলতে যে ঋণাত্মক আয়ন অতিরিক্ত হয়ে গেছে,’ স্বগতোক্তির মতো বললো জো। ‘কারণ এখানকার সব আয়নই ঋণাত্মক।’
মেয়েটা আবার দূরে সরে গেল। ‘হয়তো আবার আপনার সাথে দেখা হবে,’ নরম সুরে বললো সে। ‘আপনার জন্য উবিক নিয়ে আসতে পেরে আমি খুশি। হয়তো পরেরবার—’
‘আমরা একসাথে ডিনার করতে পারি,’ জো প্রস্তাব করলো।
‘সেই দিনের অপেক্ষায় রইলাম।’ মেয়েটা আরো দূরে চলে গেল।
‘উবিক কে আবিষ্কার করেছে?’ জিজ্ঞেস করলো জো।
‘একদল অর্ধ-জীবিত, যাদেরকে জোরি হুমকি দিয়েছিলো। কিন্তু মূলত এটার আবিষ্কারক ইলা রানসাইটার। তার আর তার দলের দীর্ঘ সময় লেগেছে এটা বানাতে, অনেক দীর্ঘ সময়। এখনো উবিক সবার জন্য সহজপ্রাপ্য এবং সুলভ নয়।’ ক্রমেই ওর কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে মেয়েটা। একসময় পুরোপুরি হারিয়ে গেল সে।
‘আমার মনে হয়,’ বলে যাচ্ছে জো, ‘ম্যাটাডোরে জোরি এটাকে দক্ষতার সাথেই তৈরি করেছিলো। অথবা প্রত্যাবর্তন করেছিলো বললেই সম্ভবত সঠিক হবে—সে যাই করে থাকুক না কেন।’ কান পেতে রইলো জো, কিন্তু মেয়েটার কোনো জবাব নেই।
উবিকের স্প্রে ক্যান সাবধানে হাতে নিয়ে জো চীপ সন্ধ্যার আলো-আঁধারিকে অভিনন্দন জানালো। একটা ক্যাব খুঁজছে। রাস্তার আলোতে উবিকের স্প্রে ক্যানের লেবেলে ছাপানো লেখাগুলো পড়লো সে।
আমার ধারণা মেয়েটার নাম মিরা লেনি। ঠিকানা এবং ফোন নাম্বারের জন্য কন্টেইনারের উলটো দিকে দেখুন।
‘ধন্যবাদ,’ স্প্রে ক্যানের উদ্দেশে বললো জো। রক্ত-মাংসের অশরীরী অস্তিত্বরা এখন আমাদের জীবন বাঁচাচ্ছে, ভাবলো সে। যারা কথা বলা এবং লিখতে পারার পাশাপাশি নতুন এই পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে। এরা নজর রাখছে আমাদের উপর। বুদ্ধিমান, পূর্ণ জীবিতদের পৃথিবীর রহস্যময় অস্তিত্ব, এমন এক উপাদান যা আমাদের জগতে অনুপ্রবেশকারী হলেও উপকারী। যারা সাহায্য করে চলেছে এই বিদেহ আত্মাদের। ধন্যবাদ তাদের সবাইকে, বিশেষ করে গ্লেন রানসাইটারকে—সমস্ত নির্দেশনা, লেবেল আর মূল্যবান… অতি মূল্যবান নোটগুলোর লেখককে।
১৯৩৬ সালের একটা গ্রাহাম ক্যাব থামানোর জন্য হাত তুললো সে।
