উবিক – ৪

অধ্যায় ৪

প্রকৃতির মতো উদ্দাম এই নতুন উবিক সালাদ ড্রেসিং। ইতালিয়ান নয়, ফ্রেঞ্চ নয়, বরং পুরোপুরি নতুন আর ব্যতিক্রমী স্বাদ যা মুহূর্তেই তরতাজা করে তুলবে আপনাকে। জেগে উঠুন উবিকের স্বাদে, হয়ে উঠুন সতেজ। নির্দেশনা অনুযায়ী সেবন করুন।

.

বিলাভেড ব্রেদরেন মোরাটোরিয়ামে কাজ শেষ করে আবার নিউ ইয়র্কে ফিরে এলেন গ্লেন রানসাইটার। অত্যন্ত দামি আর জাঁকজমকপূর্ণ একটা লিমোজিন, যা কিনা আপাদমস্তক বিদ্যুৎচালিত এবং শব্দহীন, তাকে রানসাইটার অ্যাসোসিয়েটসের প্রধান কার্যালয়ের ছাদে নামিয়ে দিয়ে গেল। ছিমছাম লিফটে করে নেমে এলেন ষষ্ঠ তলায়, নিজের অফিসের কামরায়। এই মুহূর্তে—স্থানীয় সময় সকাল নয়টা বেজে ত্রিশ মিনিটে—তিনি বসে আছেন নিজের ডেস্কের পেছনে, দামি এবং সত্যিকারের ওয়ালনাট কাঠের তৈরি, চামড়ায় মোড়ানো পুরোনো আমলের বিশাল আকৃতির স্যুইভেল চেয়ারে। ভিডফোনে কথা বলছেন তার জনসংযোগ বিভাগের প্রধানের সাথে।

‘টার্নিশ, এইমাত্র জুরিখ থেকে ফিরে এসেছি। ইলার সাথে পরামর্শ করতে গিয়েছিলাম।’ তিনি চোখ গরম করে ব্যক্তিগত সহকারীর দিকে তাকালেন, যে প্রায় নিঃশব্দে তার বিশাল আর ব্যক্তিগত অফিস কামরায় প্রবেশ করেছে এইমাত্র। ‘কী চাই, মিসেস ফ্রিক?’ গমগমে কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন তিনি।

শুষ্ক ত্বক আর ভয়তাড়িত চেহারা মিসেস ফ্রিকের, বয়সের ধূসর ছাপ লুকানোর জন্য পুরো মুখমণ্ডল জুড়ে কৃত্রিম রঙের প্রলেপ, মাথা নেড়ে পরিষ্কার বুঝিয়ে দিলো যে রানসাইটারের আচরণ তার পছন্দ হয়নি; আর উপায়ন্তর নেই বলেই রানসাইটারকে সহ্য করছে সে।

‘ঠিক আছে, মিসেস ফ্রিক,’ এবার সংযত কণ্ঠে বললেন তিনি ‘বলুন, কী ব্যাপার?’

‘নতুন একজন গ্রাহক, মি. রানসাইটার। আমি মনে করি, মহিলার সাথে আপনার দেখা করা উচিত।’ মিসেস ফ্রিক একবার রানসাইটারের দিকে এগোচ্ছেন আরেকবার পিছু হটছেন; অত্যন্ত জটিল একটা কৌশল যা কেবল মিসেস ফ্রিকই জানেন। এই কৌশল রপ্ত করতে দশ বছর অনুশীলন করতে হয়েছে তাকে।

‘ফোনে কথা বলা শেষ করেই আমি মহিলার সাথে দেখা করবো,’ তিনি আশ্বস্ত করলেন। আর ফোনে বললেন, ‘প্রতিটি গ্রহের প্রাইম-টাইমে আমাদের বিজ্ঞাপন কতক্ষণ পরপর প্রচারিত হয়? এখনো তিন ঘণ্টা পরপর?’

‘ঠিক তা নয়, মি. রানসাইটার। সারা দিনে প্রতিটি ইউএইচএফ চ্যানেলে গড়পড়তায় তিন ঘণ্টা পরপর প্রচারিত হয়, কিন্তু প্রাইম-টাইমের খরচ—’

‘এখন থেকে বিজ্ঞাপনগুলো প্রতি ঘণ্টায় প্রচারিত হবে,’ রানসাইটার বললেন। ‘ইলা মনে করে এই মুহূর্তে আমাদের সেটাই করা উচিত।’ পশ্চিম গোলার্ধে ফিরে আসার সময় দীর্ঘ যাত্রাপথে মনে মনে তিনি ভেবে রেখেছেন প্রতিষ্ঠানের কোন বিজ্ঞাপনগুলো তার সবচেয়ে বেশি পছন্দের। ‘নিশ্চয়ই জানো যে সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি একটা আদেশ জারি করেছে যার মূল কথা হচ্ছে যে একজন স্বামী আইনসম্মতভাবেই তার স্ত্রীকে হত্যা করতে পারবে, যদি সে প্রমাণ করতে পারে যে কোনো অবস্থাতেই স্ত্রী তাকে তালাক দেবে না?’

‘হ্যাঁ, তথাকথিত—’

‘কী বলা হচ্ছে তা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। আসল কথা হচ্ছে, ঐ বিষয় নিয়ে আমরা ইতোমধ্যেই একটা বিজ্ঞাপন তৈরি করেছিলাম। কেমন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে বিজ্ঞাপনটা থেকে? আমি মনে করার চেষ্টা করছি।’

‘বিজ্ঞাপনটা ছিলো এরকম,’ টার্নিশ বললো, ‘একজন পুরুষ, মানে একজন প্রাক্তন স্বামী ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। পর্দায় প্রথমেই ভেসে ওঠে জুরিদের মুখ, তারপর বিচারক, তারপর কলম উঁচু করে রাখা বিবাদীর আইনজীবী, জেরা করছে প্রাক্তন স্বামীকে। সে বলছিলো, “আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, স্যার, যে আপনার স্ত্রী—”’

‘ঠিক, ঐ বিজ্ঞাপনটাই,’ সন্তুষ্ট হয়ে বললেন রানসাইটার। সত্যি বলতে কী, ঐ চিত্রনাট্য লেখায় তিনি নিজে যুক্ত ছিলেন। আর সেটা ছিলো—মানে তার মতে আর কি—তিনি যে অসাধারণ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, তার ছোট্ট একটা নিদর্শন।

‘তার মানে,’ টার্নিশ বলতে থাকলো, ‘নিখোঁজ পিএসআইরা যে দল বেঁধে সবচেয়ে বৃহৎ বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে কিছু একটা করতে যাচ্ছে, এটা মোটেও গুজব না। যদি ধরে নেই যে ঠিক তাই ঘটতে যাচ্ছে, তাহলে আমাদের হয়তো বিশেষ একটা বিজ্ঞাপনের প্রচার বৃদ্ধি করা উচিত। আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন আমি কোনটার কথা বলছি, মি. রানসাইটার? যেখানে দেখানো হয়, দিনের শেষে কাজ থেকে ঘরে ফিরে আসে স্বামী; তখনো তার পরনে থাকে বৈদ্যুতিক-হলুদ কোমরবন্ধ, হাঁটু পর্যন্ত লম্বা মোজা, মাথায় সৈনিকদের মতো টুপি। লিভিং রুমের নরম সোফায় ক্লান্ত ভঙ্গিতে বসে শরীরের ওজনদার পোশাকগুলো খুলতে শুরু করে, তারপরই লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায়, ভ্রু কুঁচকে বলে, “ধ্যাত্তেরি, গিল, ইদানীং আমার কী হয়েছে যদি বুঝতে পারতাম। প্রায়ই আমার মনে হয়, এবং প্রতিদিন এই অনুভূতিটা আরো জোরালো হচ্ছে, অফিসের ছোটখাটো কোনো মন্তব্য শুনলেও মনে হয় যেন কেউ আমার মাইন্ড রিড করছে!” তখন স্ত্রী বলে, “যদি এমন কিছু নিয়ে তুমি দুঃশ্চিন্তায় থাকো, তাহলে কাছাকাছি যে প্রুডেন্স অর্গানাইজেশন আছে তাদের সাথে যোগাযোগ করছি না কেন আমরা? ওরা তখন আমাদের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী একজন ইনার্শিয়াল নিয়োগ দেবে, এরপর তুমি আবার সেই আগের তুমি হয়ে উঠবে!” তারপর স্বামীর মুখে সেই পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির হাসি ফুটে ওঠে। বলে, “সত্যি বলছি, বিরক্তিকর অনুভূতিটা যেন এরই মধ্যে—”’

রানসাইটারের অফিস কামরার দোরগোড়ায় আবার দেখা গেল মিসেস ফ্রিককে। ‘প্লিজ, মি. রানসাইটার,’ মহিলা বললো, তার চশমার কাচে আলো প্রতিফলিত হচ্ছে।

‘তোমার সাথে পরে কথা বলবো, টার্নিশ। এর মধ্যে তুমি নেটওয়ার্কগুলোর সাথে কথা বলে আমি যেভাবে বলেছি সেভাবে প্রতি ঘণ্টায় আমাদের বিজ্ঞাপনগুলো প্রচারের ব্যবস্থা করো।’ ফোন নামিয়ে রাখলেন রানসাইটার; নিঃশব্দে, একদৃষ্টে তাকালেন মিসেস ফ্রিকের দিকে। ‘আমি সেই সুইজারল্যান্ড পর্যন্ত গিয়েছিলাম,’ তিনি একেবারেই নিরাসক্ত সুরে বললেন। ‘ইলাকে সক্রিয় করে তুলি, এই তথ্যগুলো, এই পরামর্শগুলো পাওয়ার জন্য।’

‘মি. রানসাইটার এখন আপনার সাথে দেখা করবেন, মিস ওয়ির্ট।’ ব্যক্তিগত সহকারী টলোমলো পায়ে একপাশে সরে দাঁড়াতেই অসম্ভব মোটা এক মহিলা আক্ষরিক অর্থেই গড়িয়ে গড়িয়ে প্রবেশ করলো কামরার ভেতরে। কাঁধের উপর তার মাথা, ঠিক যেন বাস্কেট বল, অনবরত উপর আর নিচে দোল খাচ্ছে। তার বিশাল, গোলাকার দেহটা যেন যন্ত্রের মতো একটা চেয়ারের দিকে এগোল, এরপর কালবিলম্ব না করেই বসলো সেটাতে, তার সরু পাদুটো মেঝে থেকে খানিকটা উপরে ঝুলছে। তার গায়ে স্পাইডার-সিল্ক দিয়ে তৈরি বেমানান কোট, দেখে মনে হচ্ছে যেন অমায়িক এক ছারপোকা এমন এক জালে জড়িয়ে আছে যেটা তার নিজের বানানো নয়; ও সেই জালে বন্দি। যদিও সহজভাবেই হাসছে, পুরোপুরিই সহজ আর সাবলিলভাবে। বয়স চল্লিশের বেশি, আকর্ষণীয় দেহসৌষ্ঠবের অধিকারী হওয়ার বয়স অনেক আগেই পার হয়ে এসেছে।

‘আসুন, মিস ওয়ির্ট,’ তিনি বললেন। ‘আপনাকে বেশি সময় দিতে পারবো না। তাই সরাসরি কাজের কথা শুরু করলেই ভালো হয়। কী সমস্যা বলুন?’

দেহের সাথে বেমানান সুরেলা আর উৎফুল্ল কণ্ঠে মিস ওয়ির্ট বললো, ‘টেলিপ্যাথদের নিয়ে ছোট্ট একটা সমস্যায় পড়েছি আমরা। সেরকমটাই মনে করছি, যদিও নিশ্চিত না। আমাদের নিয়োগকৃত নিজস্ব একজন টেলিপ্যাথ আছে—যার বিষয়ে আমরা সবাই অবগত, এবং যার কাজ হচ্ছে আমাদের কর্মচারীদের চিন্তাতরঙ্গে বিচরণ করা। যদি সে কোনো পিএসআই, টেলিপ্যাথ প্রিকগের সন্ধান পায়, দ্রুত সেটা তার জানানোর কথা—’ উজ্জ্বল চোখে রানসাইটারের দিকে তাকালো সে—‘আমার প্রিন্সিপালের কাছে। গত সপ্তাহের শেষের দিকে সে ঐরকম একটা রিপোর্ট জমা দেয়। প্রুডেন্স অর্গানাইজেশনগুলোর দক্ষতার মূল্যায়ন প্রতিবেদন আমাদের কাছে আছে, একটা প্রাইভেট ফার্মকে দিয়ে আমরা নিজেরাই সেটা করিয়েছিলাম। সেই মূল্যায়নে আপনার প্রতিষ্ঠানের নাম আছে একেবারে প্রথমে।’

‘আমি জানি সেটা,’ রানসাইটার বললেন। সত্যি বলতে কী, মূল্যায়নটা তিনি দেখেছেন। কিন্তু তারপরেও সেই মূল্যায়ন তাকে আশানুরূপ ব্যবসা এনে দিতে পারেনি। কিন্তু এখন তিনি ব্যবসার গন্ধ পাচ্ছেন। ‘আপনাদের নিজস্ব টেলিপ্যাথ কয়জনকে শনাক্ত করতে পেরেছিলো, নিশ্চয়ই একাধিক?’

‘কমপক্ষে দুইজন।’

‘হয়তো আরো বেশি?’

‘সম্ভবত,’ মাথা নেড়ে জবাব দিলো মিস ওয়ির্ট।

‘আমাদের কাজের পদ্ধতিটা একটু ব্যাখ্যা করে বলি,’ রানসাইটার বললেন। ‘প্রথমেই আমরা সরাসরি পিএসআই ফিল্ড পরিমাপ করি, যেন বুঝতে পারি যে কীসের মোকাবেলা করতে হবে। আর সেটা করতে সাধারণত এক সপ্তাহ থেকে দশ দিন সময় লাগে, নির্ভর করে—’

কথার মাঝখানে বাধা দিলো মিস ওয়ির্ট। ‘আমার নিয়োগকর্তা ঠিক এই মুহূর্ত থেকেই আপনার ইনার্শিয়ালদের কাজে লাগাতে চাইছেন, ব্যয়বহুল আর দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষা-নীরিক্ষার মাধ্যমে সময় নষ্ট না করেই।’

‘তাহলে আমরা বুঝতে পারবো না কতজন ইনার্শিয়ালকে কাজে লাগাতে হবে,’ রানসাইটার বললেন। ‘অথবা কোন ধরনের ইনার্শিয়ালদের কাজে লাগাতে হবে। কিংবা কোথায় গিয়ে তাদেরকে কাজ করতে হবে। একজন পিএসআইকে নিষ্ক্রিয় করার কাজটা সুনির্দিষ্টভাবে ধাপে ধাপে করতে হয়; স্রেফ জাদুদণ্ড ঘুরিয়ে কিংবা বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে দিলেই কাজ হবে ভাবলে ভুল করবেন। হোলিসের এজেন্টদের একজন একজন করে সামলাতে হবে, প্রতিটি ট্যালেন্টের বিপক্ষে একজন করে অ্যান্টি-ট্যালেন্ট। যদি হোলিসই আপনার প্রতিষ্ঠানে অনুপ্রবেশ করে থাকে, তাহলে সে নিজেও ঠিক এই পদ্ধতিই অনুসরণ করেছে: একজন একজন করে পিএসআই রোপণ করেছে সে। একজন হয়তো মানবসম্পদ বিভাগে অনুপ্রবেশ করেছে, তারপর সে আরেকজনকে নিয়োগ দিয়েছে। ঐ লোক হয়তো নতুন একটা বিভাগ চালু করেছে, অথবা বিদ্যমান একটা বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব অধিগ্রহণ করেছে এবং আরো কয়েকজনকে নিয়োগ দিয়েছে… কখনো কখনো এই কাজ শেষ করতে তাদের মাসের পর মাস লেগে যায়। দীর্ঘ সময় নিয়ে ওরা যে জাল তৈরি করেছে, চব্বিশ ঘণ্টায় সেটা ধ্বংস করা সম্ভব না। পিএসআই সেটআপ অনেকটা মেঝেতে মোজাইক বসানোর মতো; এই কাজে অধৈর্য হলে চলবে না, আর তাই আমরাও অধৈর্য হতে পারবো না।’

‘আমার নিয়োগকর্তা বাস্তবিকই অধৈর্য হয়ে পড়েছেন,’ মিস ওয়ির্ট খোশমেজাজি সুরে বললো।

‘সেক্ষেত্রে আমি সরাসরি তার সাথে কথা বলবো।’ রানসাইটার ভিডফোনের দিকে হাত বাড়ালেন। ‘তার পরিচয় এবং যোগাযোগের নাম্বারটা দিন আমাকে।’

‘যা করার সেটা আমার মাধ্যমেই করতে হবে আপনাকে।’

‘হয়তো আমি আপনাদের সাথে কাজই করবো না। আপনি কার প্রতিনিধিত্ব করছেন সেটা কেন বলছেন না?’ ডেস্কের একপ্রান্তের নিচের অংশে স্থাপন করা গোপন বোতামে চাপ দিলেন তিনি। এই বোতাম চাপার কারণে তার ব্যক্তিগত টেলিপ্যাথ নিনা ফ্রিডি পাশের কামরায় এসে বসবে আর মিস ওয়ির্টের চিন্তাতরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। এদের সাথে আমি কাজ করতে পারবো না, মনে মনে ভাবলেন তিনি, যদি নাই জানি যে ওরা কারা। যতদূর বুঝতে পারছি, রে হোলিস আমাকে নিয়োগ দিতে চাইছে।

‘আপনি একটু বেশি নিয়ম মেনে চলা মানুষ,’ মিস ওয়ির্ট বললো। ‘আমরা শুধু চাইছি যে আপনি একটু দ্রুত কাজ শুরু করবেন। আর আমরা সেটা চাইছি কারণ এছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। আপনাকে শুধু এটুকুই বলতে পারি: আমাদের যে প্রতিষ্ঠানে অনুপ্রবেশ ঘটেছে সেটা পৃথিবীতে না। যে পরিমাণ বিনিয়োগ করা হয়েছে, এবং সেখান থেকে যে পরিমাণ মুনাফার আশা করছি আমরা, সেই হিসাবে এটাই এখন আমাদের মূল প্রজেক্ট। আমার নিয়োগকর্তা এই প্রজেক্টে তার সকল বিনিময়যোগ্য সম্পদ বিনিয়োগ করেছেন। কারো সেটা জানার কথা না। ওখানে একজন টেলিপ্যাথের উপস্থিতি আমাদের জন্য বিরাট একটা ধাক্কা—’

‘মাফ করবেন,’ রানসাইটার বললেন। উঠে দাঁড়ালেন তিনি, হেঁটে দরজার কাছে গেলেন। ‘দেখছি এই মুহূর্তে কতজন ইনার্শিয়াল এখানে আছে যাদেরকে আপনাদের সমস্যা সমাধানের কাজে লাগানো যাবে।’ বেরিয়ে দরজা বন্ধ করে তার অফিসের সাথে লাগানো দুই দিকের কামরাগুলোতে চোখ বোলাতে লাগলেন এবং শেষ পর্যন্ত নিনা ফ্রিডিকে দেখতে পেলেন; ছোট্ট একটা কামরায় বসে আছে একা, সিগারেট টানছে আর গভীরভাবে মনোনিবেশ করছে। ‘জানার চেষ্টা করো মহিলা কার প্রতিনিধিত্ব করছে,’ নিনাকে বললেন তিনি। ‘তারপর জানার চেষ্টা করো বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য কী পরিমাণ চড়া মূল্য দিতে প্রস্তুত ওরা।’ আমাদের আটত্রিশজন ইনার্শিয়াল বেকার বসে আছে, তথ্যটা তিনি নিজের চিন্তার মাধ্যমে প্রতিফলিত করলেন। হয়তো ওদের সবাইকে অথবা বেশিরভাগকেই এই কাজে লাগাতে পারবো। শেষ পর্যন্ত হয়তো জানতে পারবো যে হোলিসের ধুরন্ধর ট্যালেন্টরা কোথায় গিয়ে মুখ লুকিয়েছে। হতচ্ছাড়া বদমাশ সব।

অফিসের কামরায় ফিরে এলেন তিনি, ডেস্কে গিয়ে বসলেন আবার।

‘টেলিপ্যাথরা যদি আপনাদের প্রজেক্টে অনুপ্রবেশ করেই থাকে,’ মিস ওয়ির্টের উদ্দেশে বললেন রানসাইটার, হাতদুটো ভাঁজ করে রেখেছেন সামনে, ‘তাহলে আপনাকে মানতেই হবে যে এই প্রজেক্টের গোপনীয়তা বলে আর কিছু নেই। ওরা যে পরিমাণ মূল্যবান তথ্য ইতোমধ্যেই চুরি করে নিয়েছে, সেটার কথা নাহয় বাদই দিলাম। তাহলে এই প্রজেক্টটা আসলে কী সেটা আমাকে বলতে অসুবিধা কোথায়?’

খানিক দ্বিধার পর মিস ওয়ির্ট বললেন, ‘এই প্রজেক্টটা আসলে কী সেটা আমি জানি না।’

‘প্রজেক্টটা কোথায়?’

‘সেটাও আমার জানা নেই,’ মাথা নেড়ে জবাব দিলো সে।

‘আপনার নিয়োগকর্তা কে সেটা কি আপনি জানেন?’ রানসাইটার জিজ্ঞেস করলেন।

‘আমি মূল প্রতিষ্ঠানের একটা সহায়ক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করি, যেটা তিনি আর্থিক বিনিয়োগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করেন। সরাসরি যার অধীনে কাজ করি তার নাম মি. শেপার্ড হাওয়ার্ড। কিন্তু মি. হাওয়ার্ড কার অধীন হয়ে কাজ করছেন সেটা আমাকে কখনো জানানো হয়নি।’

‘যে কয়জন ইনার্শিয়াল আপনাদের প্রয়োজন আমরা যদি সেই কয়জনকে দিতে পারি, তাদের কোথায় পাঠানো হবে, আমরা কি সেটা জানতে পারবো?’

‘সম্ভবত না।’

‘যদি তাদেরকে আমরা আর ফিরে না পাই?’

‘কেন ফিরে পাবেন না? আমাদের প্রজেক্টে অনুপ্রবেশ মুক্ত করার পর অবশ্যই পাবেন।’

‘নিষ্ক্রিয় করার জন্য যে ইনার্শিয়ালদের পাঠানো হয়,’ রানসাইটার বললেন, ‘তাদের হত্যা করার ব্যাপারে হোলিসের লোকদের যথেষ্ট কুখ্যাতি আছে। আমার কর্মচারীরা নিরাপদে আছে সেটা নিশ্চিত করা আমার দায়িত্ব। কিন্তু ওরা কোথায় আছে সেটা না জানলে তো আমি সেই দায়িত্ব পালন করতে পারবো না।’

বাম কানের ভেতর লুকানো ক্ষুদ্র শ্রবণযন্ত্রটা গুঞ্জন করে উঠতেই তিনি নিনা ফ্রিডির অস্পষ্ট কিন্তু মাপা কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন—এই স্বর কেবল তিনি একাই শুনতে পাচ্ছেন। [^১](স্ট্যান্টন মিকের হয়ে কাজ করছে মিস ওয়ির্ট। মিকের অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহকারী সে। শেপার্ড হাওয়ার্ড নামে কেউ নেই। যে প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সেটা চাঁদে অবস্থিত; মিকের রিসার্চ ফাসিলিটি টেকপ্রাইজের সাথে এই প্রজেক্টের সম্পর্ক আছে, যার অধিকাংশ শেয়ার মিস ওয়ির্টের নামে। প্রযুক্তিগত বিষয়গুলোর বিস্তারিত কিছুই সে জানে না। মি. মিক কখনোই কোনো ধরনের মূল্যায়ন প্রতিবেদন অথবা অগ্রগতির প্রতিবেদন তাকে দেখতে দেয়নি, আর এই কারণে সে ভীষণ ক্ষুব্ধ। যদিও মিকের কর্মচারীদের দেখে দেখে পুরো প্রজেক্টটা কী নিয়ে সেই ব্যাপারে নিজের মতন ধারণা তৈরি করে নিয়েছে সে। যদি অনুমান করে নেই যে তার ধারণা সঠিক, তাহলে বলা যায় যে চাঁদে অবস্থিত এই প্রজেক্ট হচ্ছে যুগোপযোগী, সম্পূর্ণ নতুন, স্বল্পমূল্যের আন্তঃমহাজাগতিক যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি পদ্ধতি, যেখানে আশা করা হচ্ছে যে প্রায় আলোর কাছাকাছি গতি অর্জন করা সম্ভব হবে, এবং প্রতিটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল আর জাতিগোষ্ঠীর কাছে লিজ দেওয়া যাবে। মিকের মতে নতুন এই পদ্ধতি মহাবিশ্বে বসতি স্থাপন আরো দ্রুত, সহজ এবং ব্যাপক করে তুলবে। এবং তখন আর নির্দিষ্ট কোনো সরকারের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকবে না।)

সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলো নিনা ফ্রিডি, আর রানসাইটার আবার ওয়ালনাট কাঠের বিশাল স্যুইভেল চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগলেন।

‘কী ভাবছেন আপনি?’ মিস ওয়ির্ট স্বভাবসুলভ উৎফুল্ল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো।

‘ভাবছি,’ রানসাইটার বললেন, ‘আমাদের সাহায্য নেওয়ার মতো সামর্থ্য আপনাদের আছে কি না। যেহেতু প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের কোনো তথ্য আমাদের হাতে নেই, আমি শুধু অনুমান করতে পারি যে কতজন ইনার্শিয়াল আপনার প্রয়োজন হবে… সংখ্যাটা সর্বোচ্চ চল্লিশজন পর্যন্ত হতে পারে।’ সংখ্যাটা একটু বাড়িয়ে বললেন কারণ তিনি জানেন স্ট্যান্টন মিকের যেকোনো সংখ্যক ইনার্শিয়াল নিয়োগ দেওয়ার সামর্থ্য আছে—সেটা সরাসরিই দিক আর তৃতীয় কোনো পক্ষের মাধ্যমেই দিক।

‘চল্লিশ,’ মিস ওয়ির্ট প্রতিধ্বনি করলেন। ‘হুম। সংখ্যাটা আসলেই বেশি।’

‘যত বেশি কাজে লাগানো হবে, তত দ্রুত ফলাফল পাওয়া যাবে। যেহেতু আপনি দ্রুত সমস্যার সমাধান চাইছেন, আমরা ওদের সবাইকে একসাথে পাঠাবো। যদি নিয়োগকর্তার প্রতিনিধি হিসেবে আপনার একটা কার্যাদেশ স্বাক্ষর করার ক্ষমতা থাকে—’ মহিলার দিকে দৃঢ়ভাবে একটা আঙুল তুললেন রানসাইটার, যদিও মহিলার দৃষ্টি বিন্দুমাত্র কাঁপলো না তাতে—‘আর যদি এই মুহূর্তেই আপনি সম্মানজনক অগ্রিম প্রদান করতে পারেন, তাহলে হয়তো আমরা বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে ইনার্শিয়ালদের পাঠানোর কাজটা শেষ করতে পারবো।’ মহিলার চোখে চোখ রেখে অপেক্ষা করতে লাগলেন তিনি।

কানের ভেতরের খুদে মাইক্রো-স্পিকারটা খরখর করে উঠলো আবার। [^২](টেকপ্রাইজের মালিক হিসেবে তার সেই ক্ষমতা আছে। কোম্পানির মোট মূল্যের সমপরিমাণ আর্থিক লেনদেন করতে পারবে এই মহিলা, আইনসম্মতভাবেই। এই মুহূর্তে সে হিসাব করছে মোট খরচের পরিমাণ কত হতে পারে, যদি আজকের বাজারমূল্যের সাথে তুলনা করা হয়। কিছুক্ষণের নীরবতা। ‘কয়েক বিলিয়ন পসক্রিড, মহিলা অনুমান করে নিয়েছে। কিন্তু কাজটা সে নিজে করতে চাইছে না; একইসাথে চুক্তি সম্পাদনকারী আর অগ্রীম প্রদানকারী হওয়ার ঝুঁকি নিতে চাইছে না সে। যদি মিকের কোনো আইনজীবী এসে দায়িত্ব নেয় তাহলেই সে খুশি হয়, এমনকি সেজন্য যদি সময়ও লাগে তাতেও সমস্যা নেই।’)

কিন্তু ওদের হাতে সময় নেই, রানসাইটার ভাবছেন। ওরা সেরকমই বোঝাচ্ছে আমাকে।

ক্ষুদ্র শ্রবণযন্ত্র বললো, [^৩](সে অনুমান করতে পেরেছে যে আপনি জানেন—অথবা ধারণা করতে পেরেছেন—সে কার প্রতিনিধিত্ব করছে। আর তাই সে ভয় পাচ্ছে যে আপনি অবিশ্বাস্য রকমের চড়া মূল্য দাবি করবেন। মিক তার সুনামের বিষয়ে ভালোমতোই অবগত আছে। নিজেকে সে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং শ্রেষ্ঠ নিদর্শন মনে করে। আর তাই সে এভাবে দর কষাকষি করে; অন্য কোনো ব্যক্তি বা ফার্মের মাধ্যমে, যারা কাজ করে তার ঢাল হিসেবে। অন্যদিকে, এই মুহূর্তে তারা যতজন ইনার্শিয়াল পাবে তাদের সবাইকে কাজে লাগাতে চাইছে। কিন্তু পারছে না কারণ সেটা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।)

‘চল্লিশজন ইনার্শিয়াল,’ অলস সুরে বললেন রানসাইটার। সাদা একটা কাগজে কলম দিয়ে আঁকিবুকি করতে লাগলেন; কাগজটা তার ডেস্কে এই ধরনের পরিস্থিতির কথা ভেবেই রাখা থাকে। ‘দেখা যাক। ছয় গুণন পঞ্চাশ গুণন তিন। গুণন চল্লিশ।’

মিস ওয়ির্টের মুখে এখনো উজ্জ্বল আর খোশমেজাজি হাসি, কিন্তু চেহারায় পরিষ্কার উদ্বেগ নিয়ে জবাবের অপেক্ষা করছে।

‘আমি ভাবছি,’ বিড়বিড় করে বললেন তিনি, ‘হোলিসের এজেন্টদের আপনার প্রজেক্টে নিয়োগ দেওয়ার খরচ বহন করেছে কে।’

‘সেটা নিয়ে মাথা ঘামানোর কিছু নেই, তাই না?’ মিস ওয়ির্ট বললো।

‘ভাববার বিষয় হচ্ছে যে ওরা আমাদের প্রজেক্টে অনুপ্রবেশ করে ফেলেছে।’ ‘সব সময় সব প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায় না,’ রানসাইটার বললেন। ‘কিন্তু পিঁপড়ার দল যেভাবেই হোক আপনার রান্নাঘরে ঢোকার পথ বের করে নেয়। আপনি কিন্তু পিঁপড়ার দলকে কখনোই জিজ্ঞেস করেন না, কেন ওরা আপনার রান্নাঘরে প্রবেশ করলো, বরং তৎক্ষণাৎ ওদেরকে তাড়ানোর কাজ শুরু করে দেন।’ শেষ পর্যন্ত তিনি খরচের একটা পরিমাণ দাঁড় করাতে পেরেছেন।

আর পরিমাণটা অবিশ্বাস্য রকমের বিশাল।

***

‘আমি—আমাকে একটু ভেবে দেখতে হবে,’ মিস ওয়ির্ট বললো। খসড়া হিসাবটা দেখে ধাক্কা খেয়েছে সে, অর্ধেক উঠে দাঁড়িয়েছে চেয়ার ছেড়ে। ‘এখানে এমন কোনো কামরা আছে… ছোট, নিরিবিলি কোনো কামরা, যেখানে আমি কিছুক্ষণ একা থাকতে পারবো আর মি. হাওয়ার্ডকে ফোন করতে পারবো?’

রানসাইটারও চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘যেকোনো প্রুডেন্স অর্গানাইজেশনের পক্ষে এতজন ইনার্শিয়ালকে একসাথে জড়ো করা অসম্ভব। যদি আপনি সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেন, পরিস্থিতি হয়তো আরো ঘোলাটে হয়ে যাবে। কাজেই আপনি যদি আমার ইনার্শিয়ালদের কাজে লাগাতে চান, তাহলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

‘আপনি সত্যিই মনে করেন এতজন ইনার্শিয়ালই লাগবে?’

মিস ওয়ির্টের হাত ধরে তাকে অফিস কক্ষের বাইরে নিয়ে এলেন রানসাইটার, হাঁটতে লাগলেন লম্বা হল ধরে। তাকে সাথে নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ম্যাপ রুমে ঢুকলেন। ‘এটাতে আমাদের ইনার্শিয়ালদের অবস্থান দেখা যাচ্ছে, সেই সাথে অন্যান্য প্রুডেন্স অর্গানাইজেশনের ইনার্শিয়ালদের অবস্থান। তাছাড়াও এটাতে দেখা যাচ্ছে অথবা দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে—হোলিসের সকল পিএসআইদের অবস্থান।’ একটা ছক বেঁধে পিএসআইদের আইডেন্ট-ফ্ল্যাগগুলো গুনলেন এবং সেগুলো একটা একটা করে ম্যাপ থেকে তুলে নিতে লাগলেন। শেষ আইডেন্ট-ফ্ল্যাগটা তুলে একটু থামলেন; সেটা ছিলো এস. ডোল মেলিপোনের। ‘এখন আমি জানি ওরা কোথায়,’ মিস ওয়ির্টকে বললেন তিনি, আইডেন্ট-ফ্ল্যাগগুলো সরিয়ে নেওয়ার ভয়াবহতা বুঝতে পেরে যার মুখের কৃত্রিম হাসি মুছে গেছে ততক্ষণে।

রানসাইটার মহিলার স্যাঁতস্যাঁতে একটা হাত তুলে নিলেন নিজের হাতে, তালুতে মেলিপোনের ফ্ল্যাগটা ধরিয়ে দিয়ে তার মুঠো বন্ধ করে দিলেন। ‘এখানে বসেই চিন্তা করতে পারবেন আপনি,’ তিনি বললেন। ‘ওখানে একটা ভিডফোন আছে।’ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন। ‘কেউ আপনাকে বিরক্ত করবে না। আমি আমার অফিসেই আছি।’ ম্যাপ রুম থেকে বেরিয়ে এলেন রানসাইটার। আমি আসলে নিশ্চিত না যে ওরা ওখানেই আছে, মানে নিখোঁজ পিএসআইদের সবাই। কিন্তু এটা অসম্ভবও না। তাছাড়া, স্ট্যান্টন মিক নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণের গতানুগতিক প্রক্রিয়া বাদ দিতে চেয়েছে। অতএব, যদি সে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত ইনার্শিয়াল নিয়োগ দিয়ে ফেলে, সেটার পুরো দায় তার একার।

চলিত আইন অনুযায়ী, সবাইকে না হলেও নিখোঁজ পিএসআইদের কয়েকজনের অবস্থান সম্পর্কে যে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এই তথ্যটা সোসাইটিকে জানাতে রানসাইটার অ্যাসোসিয়েটস বাধ্য। কিন্তু সেটা জানানোর আগে তার হাতে এখনো পাঁচ দিন সময় আছে… এবং তিনি শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন বলেই সিদ্ধান্ত নিলেন। এত বড় মাপের ব্যবসায়িক সুযোগ জীবনে একবারই আসে, খোশমেজাজে ভাবলেন তিনি।

‘মিসেস ফ্রিক,’ আউটার অফিসে ঢুকতে ঢুকতে বললেন রানসাইটার। ‘একটা কার্যাদেশ তৈরি করুন যেখানে পরিষ্কার লেখা থাকবে চল্লিশজন—’ আচমকাই থেমে গেলেন তিনি।

কামরার শেষ প্রান্তে দুজন মানুষ বসে আছে। পুরুষটা জো চীপ, দেখে মনে হচ্ছে অসম্ভব ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, আর বরাবরের চেয়ে বেশি বিমর্ষ… অবশ্য, চাইলে এটাও বলা যায় যে তাকে সব সময় যেমন দেখায় আসলে তেমনই দেখাচ্ছে, অতিরিক্ত হিসেবে যোগ হয়েছে শুধু বিষণ্ণতা। কিন্তু তার পাশেই বসে আছে লম্বা লম্বা পা, উজ্জ্বল কালো চুল আর কালো চোখের এক মেয়ে; তার বিশুদ্ধ সৌন্দর্য কামরার এই অংশটাকে আলোকিত করে তুলেছে, যেন ঐ অংশে বিষণ্ণ সুন্দর আগুন লেগেছে। মনে হচ্ছে মেয়েটা যেন নিজের সৌন্দর্য লুকিয়ে রাখতে সচেষ্ট, যেন সে তার ত্বকের মসৃণতা এবং লোভনীয় গাঢ় বর্ণের স্ফীত অধর পছন্দ করে না। মনে হচ্ছে যেন মেয়েটা এইমাত্র বিছানা থেকে উঠে এসেছে, এখনো ঘুমের ঘোর কাটেনি। যে দিনটা তাকে অতিবাহিত করতে হবে সেটা নিয়ে বিরক্ত—সত্যি বলতে কী, মনে হচ্ছে প্রতিটি দিন নিয়েই সে বিরক্ত।

হেঁটে দুজনের কাছে গিয়ে রানসাইটার বললেন, ‘জি. জি. তাহলে টপিকা থেকে ফিরেছে?’

‘ও হচ্ছে প্যাট,’ জো চীপ বললো। ‘শুধুই প্যাট, আগেপিছে আর কিছু নেই।’ রানসাইটারের দিকে ইশারা করলো সে, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। অদ্ভুত একটা পরাজিত ভাব তাকে ঘিরে রাখে সব সময়, কিন্তু তারপরেও, তার চরিত্রের গভীরে এমন কিছু একটা আছে যাতে মনে হয় সে এখনো হাল ছাড়েনি। তার আপাত পরাজিত মনোভাবের পেছনে একটা অস্পষ্ট প্রাণোচ্ছ্বাস এখনো রয়ে গেছে। রানসাইটারের মাঝে মাঝে মনে হয়, জো চীপ আসলে ভান করে যে সে আত্মিকভাবে পুরোপুরি নিঃশেষ, যদিও তার কোনো প্রমাণ নেই।

‘কীসের অ্যান্টি?’ মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলেন রানসাইটার, যে কিনা এখনো চেয়ারে আয়েশি ভঙ্গিতে বসে আছে, পাদুটো ছড়িয়ে।

‘অ্যান্টি-কেটোজেনেসিস’ মেয়েটা বিড়বিড় করে বললো।

‘মানে কী?’

‘কেটোসিস প্রতিরোধ,’ মেয়েটা অন্যমনস্ক স্বরে জবাব দিলো। ‘গ্লুকোজের সমন্বয়ের মাধ্যমে।’

‘ব্যাখ্যা করো,’ জো চীপকে নির্দেশ দিলেন রানসাইটার।

‘মি. রানসাইটারকে তোমার মূল্যায়নপত্রটা দেখাও,’ মেয়েটার উদ্দেশে বললো জো। বসে থেকেই পার্সের দিকে হাত বাড়ালো প্যাট, কিছুক্ষণ হাতড়ানোর পর জোয়ের লেখা দুমড়ানো মোচড়ানো হলুদ মূল্যায়নপত্রটা বের করে আনলো, ভাঁজ খুলে একবার দেখে তুলে দিলো রানসাইটারের হাতে।

‘অবিশ্বাস্য,’ রানসাইটার বললেন। ‘ও কি আসলেই এতটা দক্ষ?’ জিজ্ঞেস করতে না করতেই নিচে দাগ দেওয়া কাটা চিহ্ন দুটো দেখতে পেলেন; অভিযোগের প্রতীক—আরো ভালো করে বললে, বিশ্বাসঘাতকতার।

‘এখনো পর্যন্ত ও-ই সেরা,’ জো বললো।

‘আমার অফিসে এসো,’ মেয়েটার উদ্দেশে বললেন রানসাইটার। তিনি পথ দেখালেন, আর বাকি দুজন তাকে অনুসরণ করলো।

চর্বির ডিপো মিস ওয়ির্ট তড়িঘড়ি করে প্রবেশ করলো রানসাইটারের অফিসে। হাঁফাচ্ছে সে, চোখদুটো বিস্ফারিত। ‘মি. হাওয়ার্ডকে ফোন করেছিলাম,’ রানসাইটারকে জানালো সে। ‘কী করতে হবে সেই ব্যাপারে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন আমাকে।’ তারপর জো এবং প্যাট নামের মেয়েটার উপর দৃষ্টি পড়লো তার। একটু দ্বিধা করলো সে, কিন্তু কাঁধ ঝাঁকিয়ে আবার কথা বলতে লাগলো, ‘মি. হাওয়ার্ড এই মুহূর্তেই কাজ শুরু করার জন্য সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে আগ্রহী। কাজেই আমরা কি এখন শুরু করতে পারি? পরিস্থিতির গুরুত্ব ইতোমধ্যেই আপনাকে বুঝিয়ে বলেছি আমি, বিশেষ করে সময় স্বল্পতার বিষয়টা।’ আবারও চকচকে মেকি একটা হাসি দিলো মহিলা। ‘আপনাদের দুজনকে একটু অপেক্ষা করতে হলে নিশ্চয়ই কিছু মনে করবেন না?’ জো আর প্যাটকে জিজ্ঞেস করলো সে। ‘মি. রানসাইটারের সাথে আমার কাজটা অত্যন্ত জরুরি।’

মিস ওয়ির্টের দিকে তাকিয়ে হাসলো প্যাট, চাপা সেই হাসিতে অবজ্ঞার ভাব।

‘আপনাকে একটু অপেক্ষা করতে হবে, মিস ওয়ির্ট,’ রানসাইটার বললেন। ভয় পেয়েছেন তিনি। একবার প্যাটের দিকে তাকালেন, তারপর জোয়ের দিকে, আর তাতেই তার ভয়টা আরো বেড়ে গেল। ‘বসুন, মিস ওয়ির্ট।’ আউটার অফিসের চেয়ারগুলোর দিকে ইশারা করলেন তিনি।

‘আমি এখন আপনাকে নির্দিষ্ট করে বলতে পারবো, মি. রানসাইটার,’ মিস ওয়ির্ট বললো, ‘যে ঠিক কতজন ইনার্শিয়াল আমাদের প্রয়োজন। মি. হাওয়ার্ড মনে করেন, আমাদের ঠিক কী প্রয়োজন, অথবা আমাদের সমস্যাটা আসলে কী ধরনের সেটা তিনি অনুধাবন করতে পেরেছেন।’

‘কতজন?’ রানসাইটার জিজ্ঞেস করলেন।

‘এগারো জন,’ মিস ওয়ির্ট বললো।

‘আমরা একটু পরেই চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করবো,’ রানসাইটার বললেন। ‘হাতের কাজগুলো শেষ হলেই।’ বিশাল আর প্রশস্ত হাতে জো আর প্যাটকে বগলদাবা করে ভেতরে অফিসে এসে ঢুকলেন। দরজা বন্ধ করে বসলেন নিজের চেয়ারে। ‘ওরা সামলাতে পারবে না,’ জোয়ের উদ্দেশে বললেন তিনি। ‘এগারো জন… পনেরো জন… এমনকি বিশজন দিয়েও কিচ্ছু হবে না। বিশেষ করে প্রতিপক্ষের একজন যেখানে এস. ডোল মেলিপন।’ অসম্ভব ক্লান্ত বোধ করছেন তিনি, সেই সাথে অজানা এক ভয় আঁকড়ে ধরছে তাকে। ‘তাহলে এই মেয়েটাই সম্ভাব্য প্রশিক্ষণার্থী, জি. জি. অ্যাশউড যাকে টপিকাতে খুঁজে পেয়েছে? আর তুমি মনে করো যে ওকে আমাদের কাজে লাগানো উচিত? তুমি আর জি. জি. দুজনেই এই বিষয়ে একমত? সেক্ষেত্রে, স্বাভাবিকভাবেই ওকে আমরা কাজে লাগাবো।’ মিকের বিরুদ্ধে যে কাজটা করতে যাচ্ছি, হয়তো সেই কাজে ওকে লাগানো যাবে, মনে মনে পরিকল্পনাটা করে রাখলেন তিনি। এগারো জনের দলে তাকে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। ‘যদিও তোমরা কেউ নির্দিষ্ট করে এখনো আমাকে বলতে পারোনি যে কোন ধরনের পিএসআই ট্যালেন্টের বিরুদ্ধে কাজ করে সে।’

‘মিসেস ফ্রিক জানালো যে আপনি জুরিখ গিয়েছিলেন,’ জো বললো। ‘কী পরামর্শ দিয়েছে ইলা?’

‘আরো বেশি বিজ্ঞাপন দেওয়ার,’ রানসাইটার বললেন। ‘টিভিতে। প্রতি ঘণ্টায়।’ কথা শেষ করেই ইন্টারকমে বললেন, ‘মিসেস ফ্রিক, জেন ডো-র নামে একটা নিয়োগপত্র তৈরি করে আনুন। প্রাথমিক বেতন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করবেন, গত ডিসেম্বরে শ্রমিক সংঘের সাথে আমরা যে বেতন নিয়ে একমত হয়েছিলাম, স্পষ্টভাবে—’

‘প্রাথমিক বেতনের পরিমাণ কত?’ প্যাট নামের মেয়েটা জিজ্ঞেস করলো, তার স্বর বিদ্রুপাত্মক, সেই সাথে শিশুসুলভ।

চোখ গরম করে মেয়েটার দিকে তাকালেন রানসাইটার। ‘তুমি কী করতে পারো সেটাই এখনো আমি জানি না।’

‘প্রিকগ, গ্লেন,’ দাঁতে দাঁত চেপে বললো জো। ‘কিন্তু একটু ভিন্ন পদ্ধতিতে।’ বিস্তারিত কিছু বললো না সে। মনে হলো তার দম ফুরিয়ে আসছে; অনেকটা পুরোনো আমলের ব্যাটারিচালিত ঘড়ির মতো।

‘ও কি এখনই কাজের জন্য প্রস্তুত?’ জোয়ের কাছে জানতে চাইলেন রানসাইটার। ‘নাকি ওকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে, প্রস্তুত হওয়া পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে? আমাদের চল্লিশজন ইনার্শিয়াল অলস বসে আছে, অথচ আমরা নতুন একজনকে নিয়োগ দিচ্ছি। আচ্ছা… চল্লিশজন থেকে বাদ দাও… এই ধরো এগারো জন। প্রায় ত্রিশজন কর্মচারী বসে বসে মাছি মারছে আর পুরো মাসের বেতন নিচ্ছে। আমি জানি না, জো, আমি সত্যিই জানি না। হয়তো স্কাউটদের ছাঁটাই করা উচিত আমাদের। যাই হোক, আমি সম্ভবত হোলিসের নিখোঁজ পিএসআইদের খুঁজে পেয়েছি। ঐ ব্যাপারে তোমাকে পরে বলবো।’ এটুকু বলেই ইন্টারকমে বললেন, ‘স্পষ্টভাবে উল্লেখ করবেন যে আমরা এই জেন ডো-কে যেকোনো সময় কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই চাকরিচ্যুত করতে পারবো, কোনো প্রকার পাওনা পরিশোধ অথবা ক্ষতিপূরণ ছাড়াই। এবং প্রথম নব্বই দিন সে কোনো প্রকার অবসর ভাতা, স্বাস্থ্যসেবা অথবা অসুস্থ ভাতার সুবিধা পাবে না।’ এরপর প্যাটের উদ্দেশে বললেন, ‘সবার ক্ষেত্রেই প্রাথমিক বেতন প্রতি মাসে চারশো পসক্রিড, সপ্তাহে বিশ ঘণ্টা কাজের হিসেবে। আর তোমাকে কোনো একটা শ্রমিক সংঘে যোগ দিতে হবে। দ্য মাইন, মিল অ্যান্ড স্মেল্টার—এই সব হলো শ্রমিক সংঘ। তিন বছর আগে এই সংগঠনগুলোই প্রুডেন্স অর্গানাইজেশনের কর্মীদের ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব নিয়েছে। এখানে আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।’

‘টপিকা কিবুটযে ভিডফোনের লাইন রক্ষণাবেক্ষণ করে আমি আরো বেশি বেতন পাই,’ প্যাট বললো। ‘আপনার স্কাউট মি. জি. জি. অ্যাশউড বলেছিলো—’

‘আমাদের স্কাউটরা মিথ্যা কথা বলে,’ রানসাইটার বললেন। ‘আর তাছাড়া, ওরা যা বলে সেটা মানতে আমরা আইনত বাধ্য নই। সত্যি বলতে কী, কোনো প্রুডেন্স অর্গানাইজেশনই বাধ্য নয়।’ দরজা খুলে মিসেস ফ্রিক এলোমেলো, দ্বিধাগ্রস্ত পদক্ষেপে অনেকটা যেন হামাগুড়ি দিয়ে ভেতরে ঢুকলো, হাতে টাইপ করা চুক্তিপত্র। ‘ধন্যবাদ, মিসেস ফ্রিক,’ কাগজগুলো হাতে নিয়ে রানসাইটার বললেন। ‘আমার বিশ বছরের স্ত্রী শুয়ে আছে কোল্ড-প্যাকে,’ জো আর প্যাটকে বললেন তিনি। ‘চমৎকার এক মহিলা। যখন আমার সাথে কথা বলছিলো, তখন জোরি নামের এক অদ্ভুত কিশোর তাকে বিতাড়িত করে দেয়, তারপর ইলার বদলে আমাকে ঐ ছেলেটার সাথেই কথা বলতে হয়। অর্ধ-জীবনের হিমশীতলতায় ডুবে আছে ইলা, ধীরে ধীরে তার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে—আর আমাকে এখানে বসে বসে সারা দিন এই বয়স্ক সহকারীর মুখ দর্শন করতে হয়।’ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে প্যাট নামের মেয়েটার দিকে তাকালেন তিনি, উজ্জ্বল কালো চুল আর মোহনীয় মুখ। টের পেলেন নিজের অভ্যন্তরে একটা অসুখী কামনা জেগে উঠছে ধোঁয়াটে এবং অর্থহীন এক চাহিদা, যার কোনো ফলাফল নেই। অনুভূতিটা চক্রাকারে ঘুরে সম্পূর্ণ খালি হাতে আগের জায়গায় ফিরে আসতেই একরাশ শূন্যতা ঘিরে ধরলো তাকে, যেন পূর্ণ হলো নিখুঁত এক জ্যামিতিক চক্র।

‘আমি রাজি,’ প্যাট বললো, তারপর হাত বাড়ালো ডেস্ক থেকে কলম নেওয়ার জন্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *